Golpo romantic golpo নতুন প্রেমের গান

নতুন প্রেমের গান পর্ব ২৮


#নতুন_প্রেমের_গান

#পর্ব_২৮

সিয়াদাত দুষ্টু হেসে সুপ্রভার দিকে ঝুঁকে এলো। তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “রাতে লাল চমচম খাওয়া হবে কিন্তু।বি রেডি ফর দিস।”

সিয়াদাতের তপ্ত নিঃশ্বাস সুপ্রভার কানে লাগতেই ওর সারা শরীরে একটা মৃদু শিহরণ খেলে গেল। সুপ্রভা হকচকিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর গালের রং মুহূর্তেই পাল্টে গিয়ে আরক্ত হয়ে উঠল। সিয়াদাতের চোখের ওই দুষ্টুমিতে ভরা চাহনি সহ্য করতে না পেরে অতিসত্বর চোখ নামিয়ে নিল সুপ্রভা।মেকি রোষ দেখিয়ে বলল,” আপনার মতো অসভ্য লোক দুইটা দেখি নি!”

সিয়াদাত আরও একটু ঝুঁকে এলো। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“অসভ্য কোথায় হলাম? আমি তো শুধু মিষ্টি খাওয়ার কথা বললাম। অবশ্য লাল শাড়িতে আমার সামনের মানুষটাকে লাল চমচম থেকেও বেশি লোভনীয় লাগছে, সেটা কি আমার দোষ?”

সুপ্রভা এবার আর পারল না। দুই হাতে নিজের শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে ও দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে হাঁটা দিল।

সুপ্রভার সাথে কথা বলার জন্য আলেয়া বেগম ছটফট করছিলেন। কিন্তু নতুন দম্পতির একান্ত মুহূর্তে তিনি বাগড়া দিতে চাইলেন না।তাই দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন।দূর থেকে মেয়ে জামাইকে একসাথে দেখে তাঁর চোখের কোণ ভিজে উঠল।

সুপ্রভা দ্রুত পায়ে সিঁড়ির দিকে যেতেই আলেয়া বেগম এগিয়ে এলেন। মেয়ের লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর অস্থিরতা দেখে তিনি মৃদু হাসলেন। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে পরম মমতায় বললেন, “নতুন এক ঠিকানায় যাচ্ছিস মা। নিজের ঘর ছেড়ে অন্যের ঘরকে নিজের করে নেওয়া সহজ নয়। কিন্তু ভালোবাসা আর ধৈর্য থাকলে সব কঠিনই সহজ হয়ে যায়। আজ থেকে সিয়াদাতই তোর সব। ওর হাতটা শক্ত করে ধরে রাখিস মা।”

সিয়াদাত তখন মন্থর পায়ে এগিয়ে এসে আলেয়া বেগমের সামনে দাঁড়াল। ওর চোখে মুখে তখন আর দুষ্টুমি নেই, বরং এক গভীর দায়িত্ববোধ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সে বিনম্র স্বরে বলল, “মা, আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি কথা দিচ্ছি, সুপ্রভাকে আমি ভালো রাখব।সুপ্রভার চোখে কখনো জল আসতে দিব না। ওর নিজের মতো করে ডানা মেলে বাঁচতে দেব। আপনার আমানতের কোনো অসম্মান হবে না। সুপ্রভা আমার বাড়িতে শুধু বউ নয়, আমার ঘর আগলে রাখা সবচেয়ে মূল্যবান মানুষ হয়ে থাকবে।”

আলেয়া বেগমের চোখে পানি চলে এলো। তিনি সিয়াদাতের মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।ঠিক তখনই ঘরের এক কোণ থেকে কারো গোঙানি আর ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। সুপ্রভা তাকিয়ে দেখল, সৌরভ রহমত মিয়ার কাঁধে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এগিয়ে আসছে। কয়েকদিন আগের সেই ভয়াবহ অ্যাক্সিডেন্ট সৌরভকে শারীরিকভাবে দুর্বল করে দিলেও বোনের বিদায়বেলায় সে নিজেকে ধরে রাখতে পারল না।

সৌরভকে ওভাবে আসতে দেখে সুপ্রভা দৌড়ে গিয়ে সৌরভকে জড়িয়ে ধরল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, “ভাইয়া, তুমি এই অবস্থায় কেন নিচে এলে? তোমার তো রেস্ট নেওয়ার কথা!”

সৌরভ ম্লান হেসে বোনের মাথায় হাত রাখল। তার নিজের চোখও তখন পানিতে টলমল করছে। ভাঙা গলায় বলল, “বোনের বিদায়বেলায় ভাই কি ঘরে বসে থাকতে পারে রে? ছোটবেলা থেকে তোকে আগলে রেখেছি, আজ সেই দায়িত্বটা অন্য একজনকে বুঝিয়ে দেওয়ার দিন। এই দেখ, তোর প্রিয় চকোলেটটা এনেছি সেই ছোটবেলার মতো।”

সুপ্রভা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। হাউমাউ করে কান্না শুরু করে দিলো। সৌরভ পরম মমতায় সুপ্রভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। তাকে শান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে বলল, “ কান্না করিস না বনু।আমি সুস্থ হয়ে গেলে সপ্তাহে একদিন তোকে দেখতে আসব।”

সৌরভের কথাগুলো শুনে সুপ্রভার কান্নার বেগ যেন আরও বেড়ে গেল। ও সৌরভের বুকে মুখ লুকিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “তুমি নিজের যত্ন নিও ভাইয়া। ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো, আর একদম বেশি হাঁটাহাঁটি করবে না।”

সৌরভ আলতো করে সুপ্রভাকে নিজের থেকে সরিয়ে তার চোখের জল মুছিয়ে দিল। অতর্কিতে তার দৃষ্টি গেল স্থাণু সিয়াদাতের উপর।সে কাঁপাকাঁপা হাতে সিয়াদাতের হাতটা ধরল। আবেগ জড়ানো কণ্ঠে বলল,

“প্রফেসর ভাই, আমার বোনটা খুব জেদী, খুব অভিমানী। কিন্তু ওর মনটা কাঁচের মতো পরিষ্কার।ও …!! বাকিটা বলার আগেই সিয়াদাত তাকে থামিয়ে দিল।দৃঢ় কণ্ঠে বলল,সুপ্রভাকে নিয়ে তোমার ভাবতে হবে না।তুমি শুধু নিজের সুস্থ হওয়ার কথা ভাবো। আমি কথা দিচ্ছি, সুপ্রভার কোনো অযত্ন করব না আমি।আর হ্যাঁ সপ্তাহে একদিন কষ্ট করে তোমাকে আসতে হবে না ।আমি নিজেই সুপ্রভাকে নিয়ে তোমার কাছে হাজির হব।”

সৌরভের বুকের উপর থেকে যেন বড়সড় একটা পাথর সরে গেল।সুপ্রভা এদিক ওদিক নজর ঘুরালো। বিচলিত কণ্ঠে বলল, “ ভাবী কোথায় ভাইয়া?”

সৌরভ কিছু বলার আগেই র‌ওনক চৌধুরী নরম গলায় বললেন, “ নোরা নিজের রুমে আছে। তোমার মা গেছেন নোরাকে আনতে। এক্ষুনি চলে আসবে।”

নোরা এখনো দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করছে,

“অসম্ভব! এটা হতে পারে না। সিয়াদাত শুধু আমার। সে অন্য কারো হতে পারে না। এই জালিয়াতি, এই বিয়ে সব মিথ্যে! সব মিথ্যে!”

সহসা সে চোখের জল মুছে উঠে দাঁড়াল। নিজের রাগ কমাতে ঘরের কোণে রাখা ফুলদানিটা সজোরে আছাড় মারল দেয়ালে। কাঁচের টুকরোগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। তবুও তার রাগ কমলো না।সে আরো একটা ফুলদানি তুলে নিলো ভাঙ্গার জন্য। ঠিক তখনই দরজার অপর প্রান্ত থেকে ঈশিতা চৌধুরীর গলা শোনা গেল,

“নোরা! মা বাইরে আসো, সুভা চলে যাচ্ছে। বিদায় দিবে না?”

নোরার শরীরটা অপমানে রি রি করে উঠল। সে কোনো উত্তর দিল না। বালিশে মুখ গুঁজে নিজের আর্তনাদ চেপে ধরল। সে মনে মনে ভাবল, ‘বিদায়? আমি কেন বিদায় দিতে যাব? যে আমার সব কেড়ে নিল, তাকে আমি হাসিমুখে বিদায় দেব? কোনোদিনও না!’

ইশিতা চৌধুরী বারকয়েক নোরাকে ডাকলেন। নোরা এক পর্যায়ে বিরক্ত গলায় বলল,তোমার এসব আদিখ্যেতা আমার একদমই ভালো লাগছে না মম।তুমি প্লিজ চলে যাও।”

ইশিতা চৌধুরী নিঃশব্দে নিচে নেমে এলেন। নোরাকে দেখতে না পেয়ে মন ভার হলো সুপ্রভার। সে দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়েই বাড়ির চৌকাঠ পার করল।

নোরা ঘর অন্ধকার করে জানালার পর্দার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। নিচে দেখল সিয়াদাত অত্যন্ত যত্নে সুপ্রভাকে গাড়িতে তুলে দিচ্ছে। সিয়াদাতের আগলে রাখার ভঙ্গিটা দেখে নোরার নখ নিজের হাতের তালুতে বসে গেল। র’ক্ত জমে উঠল সেখানে, কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই।

গাড়িটা যখন দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, নোরা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হিসহিস করে বলল, “তুমি চলে গেলে ঠিকই সুপ্রভা, কিন্তু আমার জীবন থেকে সিয়াদাতকে কেড়ে নিতে পারবে না। এই বিয়ে, বাসর যতটাই মধুর হোক না কেন, আমি তোমাদের শান্তিতে থাকতে দেব না। দেখে নিও!”

গাড়িটা যখন সদর গেট পেরিয়ে মূল রাস্তায় উঠল, সুপ্রভার ভেতরের দীর্ঘদিনের চেপে রাখা বাঁধ যেন ভেঙে গেল। জানালার কাঁচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তার মনে হচ্ছে, এক অনিশ্চিত গন্তব্যে সে পা বাড়িয়েছে, যেখানে তার পুরনো সব পরিচয় মুছে গিয়ে নতুন এক পরিচয় তৈরি হচ্ছে। তার কান্নার শব্দ গাড়ির ভেতরের স্তব্ধতাকে আরও ভারী করে তুলল।

সিয়াদাত ড্রাইভ করছিল না, সে সুপ্রভার পাশেই বসে ছিল। সুপ্রভার এই বুকফাটা কান্না দেখে সিয়াদাতের বুকের ভেতরটাও এক মুহূর্তের জন্য মোচড় দিয়ে উঠল। সে জানত, সুপ্রভার জন্য এই পরিবর্তনটা সহজ নয়।

সিয়াদাত সন্তর্পণে সুপ্রভার কাঁপতে থাকা বাম হাতটা নিজের ডান হাতের মুঠোয় নিল। সুপ্রভা একবার হাতটা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু সিয়াদাত ছাড়ল না। বরং আঙুলের ফাঁকে আঙুল গলিয়ে দিয়ে হাতটা শক্ত করে ধরল।

সুপ্রভা ভেজা চোখে একবার সিয়াদাতের দিকে তাকাল। সিয়াদাত সুপ্রভার হাতটা নিজের মুখের কাছে তুলে আনল।সুপ্রভা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সুপ্রভার হাতের উল্টো পিঠে নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল।

সিয়াদাতের ঠোঁটের স্পর্শে কেঁপে উঠলো সুপ্রভা। কাঁপা গলায় বলল, কী করছেন?”

সিয়াদাত একপল সুপ্রভার দিকে তাকালো।মাতাল স্বরে বলল, দেখছো না চুমু খাচ্ছি।”

চলবে!!!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply