Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২৯


ডাকপ্রিয়র_চিঠি

লেখিকা:_রিক্তা ইসলাম মায়া

২৯
মারিদ হুংকার দিয়ে ওঠে। ১০-১২ জন চেপে ধরা লোককে ঠেলে সে গর্জে ওঠে দাঁড়াতে চায়। সকলেই হিমশিম খাচ্ছে মারিদকে আটকাতে। মারিদ মোল্লা চেয়ারম্যানের দিকে তেড়েফুঁড়ে যেতে বাধা পেয়ে বলল…

‘এক রাতে দিন যায় না চেয়ারম্যান। রাতটা তোর, সকালটা কিন্তু আমার হবে। আর খুব ভয়ংকরভাবে হবে। যে তামাশায় তুই নূরজাহানকে আঘাত করছিস, তার ভোগান্তি তোর চৌদ্দ গুষ্টি গুনবে—মনে রাখিস চেয়ারম্যান!

কেঁচি নেই তাই ঠিক করা হলো রানদা দিয়ে নূরজাহানের চুল কাটা হবে। যে গাছটায় বেঁধে ডাকাত দল নূরজাহানকে চাবুক মেরেছিল, সেই একই গাছে নূরজাহানকে ফের বাঁধা হলো ব্যভিচারের শাস্তি দিতে। হাসিনা নূরজাহানের চুলের বেণি মুষ্টি করে ধরে হাতে রানদা দিয়ে কয়েকটা টান দিয়েও সুবিধা করতে পারল না। রানদায় শক্ত মোটা চুলের গোছা কাটছে না। তাই ঠিক করল নূরজাহানের চুল আগুনে পুড়িয়ে দিবে। আগুন নূরজাহানের মাথায় লাগার আগে নিভিয়ে দেওয়া হবে—সিদ্ধান্ত শুধু মোল্লা চেয়ারম্যান নিল। তাতে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী হৈ হৈ চিৎকার করছে। নূরজাহান মাথা নুইয়ে বসে আছে, কোনো নড়াচড়া নেই। হাসিনা কিছুক্ষণ আগে নূরজাহানের চুলের বেণি টেনে রানদা দিয়ে কাটতে চেয়েছিল, তখনো নূরজাহান বাধা দেয়নি, চুপ ছিল। মারিদ বারবার গর্জে উঠছে। আশনূর, রাদিল চিৎকার করছে নূরজাহানের চুল না কাটতে। পরিস্থিতি বিগড়ে সবটা শেষ হওয়ার পথে, তক্ষুনি কোথা থেকে হৈ হৈ চিৎকারের গর্জন শোনা গেল। হাসান সিকদার পাহাড় বেয়ে হৈ হৈ চিৎকার করে কালিঘাটি আস্তানায় পৌঁছায়। হাতে মস্ত বড় লাঠি। পিছনে মাজিদও এসেছে। হাসান মাজিদ মারিদের যাওয়ার পরপরই মূলত খরব পেয়ে হাসপাতালে প্রজেক্টে গিয়েছিল কারা মাল চুরি করতে এসেছে দেখতে কিন্তু ওখানে গিয়ে জরুরি তলবে রাশেদ সওদাগর সংবাদ পাঠায় ওদের থানচি সদরে যেতে এই রাতে। দিকদিশা না পেরিয়ে হাসান মাজিদ থানচি সদরে দিকে রওনা দেয়। তাড়াহুড়ো হাতের ফোন গুলো বাড়িতে ফেলে যায়। ভাগ্য সহায় হওয়ায় সদরের যাওয়ার পথে এই এলাকার মাসুদ মাস্টারের বড় ছেলে তৌহিদ, হাসান আর মাজিদকে নূরজাহানের সংবাদ দেয়। এবং এটাও জানায় আশনূর মারিদের নিয়ে এই কালিঘাটিতেই আছে নূরজাহানের জন্য। খবরটা পেয়ে হাসান উম্মাদনায় পাগল। হাসপাতালের প্রজেক্টের কাজে কাজে হাসানের মাথা থেকে ছুটে গিয়েছিল উনার অনুপস্থিতিতে নূরজাহান হেফাজতের না। মানিক সওদাগর গ্রামের আছে। নূরজাহানের জন্য বিপদ চারদিক থেকে মুখিয়ে ছিল হাসান সেটা বুঝতে পারেনি কীভাবে? হাসান পুরাটা রাস্তা পাগলের মতো ছুটে এসেছে। ছোট এই রাস্তাটা যেন বছরের নেয় দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। হাসান পুরোটা রাস্তা ছুটেছে আর হু হু শব্দ করে কেঁদে আল্লাহ কাছে ভিক্ষা চেয়েছেন যেন উনার অনুপস্থিতিতে উনার কলিজার টুকরো মেয়ের হেফাজত আল্লাহ তালা করেন।

নূরজাহানের খবর পেয়ে পাগল উম্মাদ হয়ে ছুটে আসা হাসান আরও উন্মাদ হয়ে যায় হাসিনাকে আগুন হাতে নূরজাহানের চুল চেপে ধরে রাখতে দেখে। মাথার রক্ত টগবগিয়ে উঠতে হাসান হাতে লম্বা লাঠি উঁচিয়ে শক্ত বাড়ি বসায় হাসিনার পিঠে। মাগো’ মাগো’ করে চিৎকারের ধ্বনি তোলে হাতের আগুনের মশালটা নিয়ে ছিটকে পড়ে কাদামাটিতে। হাসিনা আহাজারি চিৎকার করে ছটফটিয়ে ওঠে। ইকবাল হাসিনার পেছনেই ছিল। হাসিনাকে আঘাত পেতে দেখে বোনের জন্য চিৎকার করার সাথে সাথে হাসান একই লাঠি দিয়ে ইকবালকেও মাথায় ভারি মারে। কপাল ফেটে ইকবাল নূরজাহানের পায়ের কাছে ছিটকে পড়ে চিৎকার করে। মেয়ের জন্য উন্মাদ হাসান গর্জনে চিৎকার করে গ্রামবাসীকে বলে…

“এই শুয়োরের বাচ্চারা, আই কে আমার মাইয়ারে মারবি আই? দেখ হাসান সিকদার এহনো জীবিত, মরে নাই। আমার মাইয়ার কসম একটাও জানে ছাড়ুম না।

হাসানের সঙ্গে মাজিদও গর্জে উঠে। মতিন জাফরের বয়সী হবেন। এলাকার মুরব্বিদের একজন। হাসান মতিনকে বেশ মান্য করে চলেন। মতিন হাসানকে শান্ত করতে বলল..

“হাসান, তোর মাইয়ার বিচার হুদাই কেউ করবার চায় না। তোর মাইয়ারে আমরা গেরামবাসী এই কালিঘাটিতে অকাম করতে ধরছি। আমাগো গেরামের নিয়ম, ব্যভিচারকারীর বিচার অবশ্যই হইব। এইডা কেউ টেকাইতে পারব না। তুই শান্ত হ।

মতিনের কথায় হাসান শান্ত নয় বরং উত্তেজিত হয়। হাসান ক্ষিপ্ত হয়ে হাসিনার কাদামাটিতে ফেলা রানদাটি তুলে নিয়ে বলল…

“যদি কারও বুকের পাটা থাকে তাইলে আয়, আমার মাইয়াগোর বিচার করতে আয়। আমি হেগো বাপ হাসান সিকদার ওইহানেই খাঁড়ায় আছি। আয় জানোয়ারের দল!

হাসানের উপস্থিতিতে গ্রামবাসী সকলেই ছিটকে দূরে সরে যায়। হাসান বেপরোয়া মানুষ। মেয়েদের জন্য জানও দিতে পারে। বিশেষ করে নূরজাহানের জন্য সে সবকিছু বাজি ধরতে প্রস্তুত। তার সেই কলিজার টুকরো নূরজাহানের এমন করুণ দশা দেখে হাসান বাবা হিসেবে সে উন্মাদ পাগল হবে সেটাই স্বাভাবিক। এখন এই মুহূর্তে যে বা যারা হাসানের মোকাবেলা করতে যাবে তাকে হাসান শিরশ্ছেদ করতে দ্বিধাবোধ করবে না। মোল্লা সওদাগর হাসানকে গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে উস্কে দিতে চাই যাতে করে গ্রামবাসী হাসানের বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়ে মোল্লা সওদাগরদের পক্ষে চলে আসে। হাসান এই মূহুর্তে মেয়ের জন্য উত্তেজিত। এই অবস্থায় হাসানকে আরও উত্তেজিত করতে বেশি কষ্টের কাজ নয়। মোল্লা সওদাগর ক্ষিপ্ত গলায় বলল…

“মুখ সামলাইয়া কথা ক হাসান। এইহানে আমরা সমাজের লোক হুদাই কারও বিচার করতে বয়নাই। আমাগো এতডি সময় নাই। তোর মাইয়া আকাম করছে হেইটা গেরামবাসী হুগলে নিজের চক্ষে দেখছে। তোর মাইয়ার বিচার না করলে গেরামে বাকি পোলাপাইন এর থেইক্কা শিক্ষা নিতে পারব না। একজন ছাড় পাইলে হেরাও গেরামে অবাধে আকাম-কুকাম কইরা বেড়াইব। আমাগো গেরাম নষ্ট হইব।

হাসান হৈ হৈ করে ক্ষেপে গেল মোল্লা সওদাগরের ওপর। লাঠি নিয়ে তেড়েফুঁড়ে গেল সবার সাথে বসে থাকা মোল্লা সওদাগরের দিকে। হাসানকে তেড়ে আসতে দেখে মোল্লা সওদাগর লাফিয়ে সরে গেল, তারপরও রেহাই পেল না। হাসান অতিরিক্ত উন্মাদনায় রাগান্বিত মস্তকে একটা ভুল করে বসল। গ্রামবাসীর কথা ঠেলে মোল্লা সওদাগরের ওপর আচানক হামলা করে বসল। হাতের লাঠিতে মোল্লা সওদাগরের মাথায় পরপর আঘাত করে চিল্লাতে লাগল…

“এই কাহিনি তুই সাজাইছস মোল্লা, তুই আমার মাইয়ারে এহানে ষড়যন্ত্র কইরা নিইয়া আইছস। আমি বুঝি না মনে করছস? তুই তোর পোলা আমার মাইয়ার জীবনটা ধ্বংসের দুয়ারে ঠেলে দিছস। তোর রক্তে আজ আমি আমার মাইয়ার জীবন অভিশপ্তমুক্ত করুম জানোয়ার।

মোল্লা সওদাগর মাটিতে লুটিয়ে চিৎকার করছে। গেরামে বুজুর্গ লোক যারা বাঁশের চৌকিতে বসে ছিল, তাঁরাও হৈ হৈ করে দাঁড়িয়ে গেল হাসানের কাণ্ডে। মাজিদ হাসানের সঙ্গেই লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। পেছন থেকে ইকবাল রক্তাক্ত কপালে হাসানের ওপর আক্রমণ করতে চাইলে মাজিদের সাথে ইকবালের ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে যায়। হাসান মোল্লা সওদাগরকে মারছে সেজন্য ক্ষেপে যায় গ্রামবাসী। হাসান গ্রামবাসীর কথা শুনছে না। সেজন্য যাঁরা এতক্ষণ নিরপেক্ষ হয়ে নূরজাহানের পক্ষে ছিল তাঁরাও হাসানের কাণ্ডে ক্ষেপে গিয়ে হৈ হৈ করে হাসানের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলে। গ্রামবাসীর হারুন সওদাগর, জাফর, মতিন, ইয়াকুব, আজিজসহ গ্রামের বেশ কিছু বুজুর্গ লোক আদেশ করল হাসানকে বন্দি করতে। মারিদ, রাদিলের মতোই একই কাজ হাসানের বেলাও হয়। একদল লোক হাসান মাজিদকে ধস্তাধস্তি করে কাদামাটিতে চেপে ধরে। মাজিদ বাধা দিতে চাইলে মাজিদকেও বন্দি করা হয়। সকলেই বন্দি। আশনূর আহাজারি করে কাঁদছে হাসান ও মাজিদকে ছেড়ে দিতে। নূরজাহান তখনো মাথা নুইয়ে বসে আছে। কেমন শান্ত নদীর মতো চোখে জল ফেলছে নীরবে। নূরজাহানের নীরবতা বেশ কিছু মানুষের নজর কাড়ছে। গ্রামবাসী ফের মজলিসে বসেছে। মোল্লা সওদাগরের কপাল ফেটে রক্ত পড়ছে। হাত দিয়ে কপাল চেপে ধরে দুজন লোকের সাহায্যে মোল্লা সওদাগর কাদামাটি থেকে উঠে চৌকিতে বসল। হৈচৈয়ের মাঝে ইয়াকুব বলল…

‘ পরিস্থিতি এহন গরম। হাসানের মাইয়ার বিচার কাইল্কা হইব। এহন বৃষ্টি মাথায় লইয়া বিচার…

ইয়াকুবের কথার মাঝে বাধা দেয় হারুন। আজ এখানে নূরজাহানের বিহিত না করলে কাল সকালে মানিক হস্তক্ষেপ করবে। নূরজাহানের পিছন তখন আর মানিককে ছাড়ানো যাবে না। হারুন নূরজাহানকে কারও সাথে বিয়ে দিয়ে গ্রাম ছাড়া করতে চাই যাতে মানিক কাল ফিরে এসেও নূরজাহানকে না পাই। হারুনের সিদ্ধান্ত দিয়ে বলে….

‘ পরিস্থিতি গরম হোক আর যাই হোক। হাসানের মেয়ের বিচার আজ রাতেই হবে ইয়াকুব। যাতে গ্রামের বাকি যুবক যুবতী ছেলে-মেয়েদের কাছে এটা একটা দৃষ্টান্ত বিচার হিসাবে সবার মনে দাগ কেটে থাকে। পাপের ছাড় দেওয়া যাবে না।

ইয়াকুবের কথায় যাঁরা নূরজাহানের বিচার কাল সকালে করতে চেয়েছিল তাঁরা আবার হারুনের কথায় ঘুরে গিয়ে তৎক্ষনাৎ সম্মতি দিয়ে হ হ করে উঠলো। সিদ্ধান্ত নিল আজ এখানে বসেই নূরজাহানের ব্যভিচারের কি বিচার হবে তা সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কাল সকালে না-হয় বিচার হবে। মজলিসের সভা ফের বসলো। বেশ সময় নিয়ে সবার মাঝে আলোচনা হচ্ছে নূরজাহানের ব্যভিচারের কী বিচার হওয়া যায়। একেক জনের একেকটা রায় দিচ্ছে। যে যেটা পারছে সেটাই রায় দিয়ে কথা বলছে। হাসান, মাজিদ, আশনূর, মারিদ কিংবা রাদিল—কারও চিৎকার কানে নিচ্ছে না কেউ। যেন সবাই জোরপূর্বক বিচার করবে নূরজাহানের।
আলোচনার এক পর্যায়ে দুই পক্ষের মতের বিরোধিতা দেখা যায়। একদল ইসলামিক মোতাবেক নূরজাহানের ব্যভিচারের বিচার করতে চাচ্ছে অন্য দল তার বিরুদ্ধে।

যারা সওদাগর পরিবারের লোক তাদের পক্ষে একদল ব্যভিচারের জন্য ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক নূরজাহানের মাথা কামিয়ে, মুখে কালি মেখে, গলায় জুতোর মালা পরিয়ে ১৮০টা চাবুক মারার যৌক্তিকতা দেখাচ্ছে। আর যারা নিরপেক্ষ, সওদাগর পরিবারের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত নয়, তারা এটা মেনে নিচ্ছে না। বলছে এটা নূরজাহানের জন্য জুলুম হয়ে যাবে। দুই পক্ষে দ্বিধাদ্বন্দ্বে দীর্ঘক্ষণ পর জেলা মন্ত্রী হারুন সওদাগর শক্ত গলায় অবস্থান নিয়ে বললেন…

“এই মিয়ারা সবাই থামেন। আপনাদের কথা বন্ধ করেন। যে যেটা পারছেন সেটাই রায় দিচ্ছেন। এইভাবে মজলিসে তর্ক করতে থাকলে আপনারা কেউ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারবেন না। আপনারা শেষবার আমার কথাটা শুনুন। আপনাদের যুক্তিতে বনলে মেনে নিবেন আর নয়তো বাধা দিয়েন। আপনাদের আমার ওপর বিশ্বাস আছে তো?

হারুন জেলা মন্ত্রী। এতো বড় মন্ত্রী হয়ে গ্রামের কোনো মজলিসে উপস্থিত আছে এটাই অনেক বড় কথা। সওদাগর পরিবার গ্রামবাসীকে দমিয়ে রাখলেও হারুন সওদাগরের বেশ সুনাম আছে গ্রামে। আর এই সুনামের জোরেই আজ হারুন মন্ত্রী হয়েছে। গ্রামবাসীর সকলে নিজেদের মাঝে তর্ক বন্ধ করে হৈ হৈ করে সম্মতি দিল হারুনের কথায়। ইয়াকুব হাসানের বয়সী হলেও সে একজন নিরপেক্ষ মানুষ। ইয়াকুব বলল…

“হ মন্ত্রী সাহেব, আপনে কন কী কইবেন। আপনের কথা আমরা হুগলেই শুনমু এবং মাইনা লমু। কন।

হারুন শুধু মানিকের জন্য এখানে বসে আছে। নূরজাহান ১৮০টা চাবুকের বাড়িতে মরে গেলে পরবর্তী সময়ে সমস্যা হতে পারে। হারুন আপাতত চায় না নূরজাহান মরে যাক। আবার সে মানিকের জীবনেও নূরজাহানকে চায় না। আজ নূরজাহান শাস্তি পেয়ে বেঁচে গেলে মানিক নূরজাহানের পিছু কখনো ছাড়বে না, বরং আরও পাগল হয়ে যাবে নূরজাহানকে বিয়ে করতে। এজন্য হারুন নূরজাহানের ব্যভিচারের নাম করে গ্রামবাসীর কারও সঙ্গে বিয়ে দিতে চায়। একবার নূরজাহানের বিয়ে হয়ে গেলে মানিককে থামানোর রাস্তা হবে। হারুন কূটনীতি করে বলল…

‘ আপনাদের যাদের নূরজাহানের শাস্তি বেশি মনে হচ্ছে তাদের জন্য আরেকটা উত্তম পথ হলো নূরজাহানের বিয়ে। আমরা সবাই জানি এবং দেখেছি হাসানের ছোট মেয়ে নূরজাহানের ঢাকা থেকে আসা মারিদ সাহেবের সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্কটা। এটা তো কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। যদি গ্রামবাসীর কেউ নূরজাহানের শাস্তি মওকুফ করতে চান, তাহলে আজ উপস্থিত গ্রামবাসীর যে কাউকে হাসানের এই মেয়ে নূরজাহানকে এই মুহূর্তে বিয়ে করতে হবে। নয়তো নূরজাহানের আগের শাস্তিই থাকবে। নূরজাহানের মাথা নেড়া করে মুখে কালি মেখে ১৮০টা চাবুক মারা হবে। যদি কেউ আমার কথায় অমত থাকেন তাহলে এক্ষুনি কথা বলুন।

গ্রামবাসীর সকলেই হারুনকে বিশ্বাস করে। সেজন্য এক কথায় হারুনের কথা গ্রামবাসী সবাই মেনে নিল। আজিজ বলল…

“উত্তম কথা কইছেন চাচা। আমাগো গেরামবাসীর হুগলেই আপনের কথায় রাজি। দুইডার এক বিচার হইলেই হইব।

“বেশ, তাহলে যদি গ্রামবাসীর কেউ নূরজাহানকে বিয়ে করতে চান তাহলে হাত তুলুন।

উপস্থিত গ্রামবাসীর ছোট বড় বয়স্ক বেশ ত্রিশ-চল্লিশটা হাত উপরে উঠে গেল নূরজাহানকে বিয়ে করতে। যে ইকবাল নূরজাহানের বাবার বয়সী, সেও হাসানের মার খাওয়ার পরও হাত তুলেছে নূরজাহানকে বিয়ে করতে। হারুন বেশ অবাক হলো এতো মানুষ একত্রে নূরজাহানকে বিয়ে করার জন্য হাত তোলায়। সকলেই হৈ হৈ করে বলছে তারা নূরজাহানকে বিয়ে করতে চায়। হারুনের বুঝতে বাকি নেই কেন মানিক নূরজাহানের জন্য পাগল। শুধু মানিক নয়, গ্রামবাসী ছোট-বড় সকলেই হাসানের মেয়ে নূরজাহানের রূপে পাগল। এর মাঝে হাসান, মাজিদ, আশনূর, রাদিল চিৎকার করে উঠল নূরজাহানের বিয়েতে বাধা দিয়ে। হাসান চিৎকার করে বলল…

” এই জানোয়ারের দল, আমি হালি একবার ছাড়া পাই হারুন সওদাগর। তোদের বংশের সব কয়ডারে কোপাইয়া মারুম।

হারুন সওদাগর ভালোমানুষির মুখোশ পরে ভালো সেজে গম্ভীর কণ্ঠে বলল…

“চিল্লাচিল্লি করে লাভ নাই হাসান। গ্রামবাসীর সঙ্গে আপোসে আসো। নয়তো গ্রামের মানুষের সাথে উল্টে তুমি পারবে না গ্রামে থাকতে। তোমার দুটো ছেলেও বাপের ভিটেমাটি ছাড়া হবে তোমার মেয়ের জন্য।

হাসান ও হারুনের তর্কের মাঝে একটা উচ্চ স্বরে ডাক শোনা গেল গ্রামবাসীর উদ্দেশে…

“যদি কারও নূরজাহানকে বিয়ে করতেই হয়, তাহলে আমি করব নূরজাহানকে বিয়ে। আমার সঙ্গেই যখন আপনারা নূরজাহানকে ব্যভিচারে পেয়েছেন, তখন আমিই অপরাধী। তাহলে নূরজাহানকে অন্য কেউ নয় আমি বিয়ে করতে চাই।

অল্প সময়ে অসৎ গ্রামবাসীর অনেকে নূরজাহানকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখেছিল। মাঝে মারিদ বিয়ের প্রস্তাব রাখায় সবাই ভীষণ অবাক হয়। মারিদ নূরজাহানকে বিয়ে করা মানে নূরজাহান সকলের থেকে হাতছাড়া হয়ে যাওয়া। হাসানকে ফ্যাসাদে ফেলে এই উত্তম সুযোগ নূরজাহানকে বিয়ে করা। কিন্তু মারিদ মাঝে বিয়ের প্রস্তাব রাখায় সবার মাঝে হৈচৈ দেখা গেল। হাসান, মাজিদ, আশনূর, রাদিল সকলেই ছটফটানি থামিয়ে মারিদের দিকে তাকিয়ে। মারিদ শক্ত অবস্থানে। মোল্লা সওদাগর ভাইয়ের দিকে তাকাল। হারুন সওদাগর কপাল কুঁচকে মারিদের দিকে তাকিয়ে। মারিদের মতো প্রভাবশালী কেউ নূরজাহানকে বিয়ে করা মানে হাসান ক্ষমতাধর হওয়া। হারুন তৎক্ষণাৎ মারিদের প্রস্তাব নাকচ করে বলল…

“আমরা অপরিচিত ভিন্নদেশি কারও হাতে আমাদের গ্রামের মেয়ে তুলে দিতে পারি না মারিদ সাহেব। আপনাকে আমরা তেমন ভালো করে চিনি না। আমাদের গ্রামের হাসপাতাল বানাতে এসেছেন এতটুকুই চিনি। আর এতটুকু চেনায় বিয়ে হয় না। আমাদের গ্রামের মেয়েকে বিয়ে করে নিয়ে গেলে আপনার কাছে সে হেফাজতে থাকবে এর কী গ্যারান্টি আছে?

যারা নূরজাহানকে বিয়ে করার আশায় হাত তুলেছিল, তারা সকলেই হারুনের কথায় হৈ হৈ করে সম্মতি দিল। মানে উল্টো রীতি সবার। মারিদ বুঝেছে এখানে ষড়যন্ত্রের চক্র বুনে আছে চারপাশে। খুব সাবধানে কথা না বললে পরিস্থিতি বিগড়ে যাবে। এখানে কেউ ব্যভিচারের বিচার করতে আসে নাই। এখানে একদল লোক নূরজাহানকে পেতে আর হাসান সিকদারের বিচার করতে এসেছে। অসৎ উদ্দেশ্যের মাঝে কয়েকজন আছে নিরপেক্ষ মানুষ। মারিদ তাদের হাতিয়ার বানিয়ে ষড়যন্ত্রের চক্র হতে নূরজাহানকে বের করতে চাই। মারিদ বলল…

“আপনারা যে শাস্তি নূরজাহানের জন্য ঠিক করছেন, সেটা বুঝি হেফাজতের? ১৮০টা চাবুকের আঘাতে নূরজাহান জায়গায় প্রাণ হারাবে এতে আপনাদের কোনো সমস্যা নেই, আর আমি বিয়ে করতে চাইলেই সমস্যা? আপনাদের গ্রামবাসীর কাছে আমি অপরিচিত হতে পারি কিন্তু হাসান সিকদারের পরিবারের কাছে আমি অপরিচিত নই। আপনারা সবাই হাসান আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন, তিনি আমাকে আরও এক বছর আগে থেকেই চেনেন। আমরা পূর্বপরিচিত হওয়ায় হাসান আঙ্কেল আমাকে উনাদের বাড়িতে থাকার জায়গা দিয়েছিলেন। কথাটা সত্য কিনা সবাই এক্ষুনি হাসান আঙ্কেলকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন উনি আমাকে আরও এক বছর পূর্ব থেকে চেনেন কিনা।

মারিদের কথার প্রসঙ্গে সকলের দৃষ্টি ঘুরে গেল হাসানের দিকে। হাসান ভারি অবাক হয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিয়ে জানায় সে এক বছর পূর্ব থেকে মারিদকে চেনে। তারপরও হারুনসহ একদল গ্রামবাসী মারিদের বিরোধিতা করে নূরজাহানকে মারিদের সঙ্গে বিয়ে দেবে না বলে। এর মাঝে হাসিনা, হাসানের আঘাত পেয়ে এতক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে মজলিসের বিচার দেখছিল, মানিকের জায়গায় মারিদ নূরজাহানকে বিয়ে করবে দেখে হঠাৎ নূরজাহানের দিকে থুতু ছিটিয়ে দিয়ে বলল…

“মা-ডা যেমন পথেঘাটে ধর্ষিতা হইয়া মরছে, মাইয়াডাও বেডা লইয়া ফষ্টিনষ্টি কইরা ধরা পড়ছে। নষ্ট মায়ের নষ্ট জি ছিঃ।

“এইইইই!

হাসান নূরজাহান গর্জনে চিৎকার করে ওঠে বাপ-মেয়ে দুজন একত্রে। এতক্ষণ নিশ্চুপ নিস্তব্ধ বসে থাকা নূরজাহান শিকলে বাঁধা অবস্থায় হুংকার দিয়ে হাসিনার দিকে হিংস্র বাঘিনীর দৃষ্টিতে তাকায়। যেন শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে হাসিনার উপর হামলা করতে চাই। একই কাণ্ড হাসানও করল। হাসিনা হাসান আর নূরজাহানের হুংকারের ভয়ে লাফিয়ে উঠে গিয়ে লুকায় মানুষের ভিড়ে। আয়েশা সিদ্দিকা নামটা হাসান ও নূরজাহানের জন্য বড্ড ইমোশনাল। হাসিনার কথায় কলিজায় রক্তক্ষরণ হয়েছে বাপ-মেয়ে দুজনেরই। জাফর মসজিদের ইমাম সাহেব। উনার কথাও গ্রামবাসী বেশ মান্য করে চলে। জাফর হাসান ও নূরজাহানকে থামিয়ে গ্রামবাসীর সকলের উদ্দেশে বলল…

” হেফাজত-টেফাজত এত্ত কিচ্ছু বুঝি না। হাসানের মাইয়ার লগে যে খারাপ কাজ করছে, ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক অনুযায়ী তার লগেই বিয়ে দেওয়া উত্তম। এর লাইগা হাসানের মাইয়ার লগে এহোন মারিদ সাহেবের বিয়া হইব। এইডা লইয়া কেউ ঝামেলা করুন যাইব না, এই তোরা সবাই হাসানের পরিবাররে ছাইড়া দে। ওরা কেউ আর ঝামেলা করব না । ছাড়।

আজিজ, ইয়াকুবসহ বেশ বড় একটা দল জাফরের কথায় সম্মতি দেওয়ায় সওদাগর পরিবারের কেউ আর বিরোধিতা করেও ঠাঁই পায়নি মজলিসে। সকলে নূরজাহানের সঙ্গে মারিদের বিয়েটাকে উত্তম মনে করছে। হাসান, মাজিদ, আশনূর, রাদিল, মারিদ সকলকেই ছাড়া হলো। মজলিসে সকলে আবারও গোল হয়ে বসেছে। মারিদ নূরজাহানের দিকে তাকাতে পারছে না অপরাধবোধে। নূরজাহান ফের নিজের দিকে তাকিয়ে ফুপিয়ে উঠে। ছাড়া পেয়ে আশনূর দৌড়ে গিয়ে কাদামাটি থেকে মানিকের রক্তাক্ত ছেঁড়া সাদা শার্টটি নূরজাহানের শরীরে পেঁচিয়ে দিয়ে নূরজাহানের হাত-পায়ের বাঁধন খুলে বুকে চেপে ধরল। বিয়ের জন্য কাজি, কাবিননামা বেশকিছু প্রয়োজন হয়। যেহেতু ব্যভিচারের মজলিসের বিয়ে তাই ঠিক করা হলো আপাতত মসজিদের ইমাম সাহেব জাফর আলী উপস্থিত গ্রামবাসীর সামনে ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক দোয়া-দরুদপাঠ করে বিয়ে পড়াবেন। কাবিননামাসহ বাকি যেসব প্রয়োজন হয় সেসব হাসান পরবর্তী সময়ে নিজের মতো করে রেজিস্ট্রেশন করে নিবে। বিয়ে ছাড়াও মারিদকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হলো, গ্রামের মেয়ের মানহানি করার দায়ে। মারিদ মাথা পেতে নিল। টাকা দিতে তার সমস্যা নেই। জাফর ইসলামিক মোতাবেক বিয়ে পড়ানোর শুরু করতে আশনূর মানিকের শার্টটা নূরজাহানের মাথায় ঘোমটা টেনে দেয়। মানিকের সাজানো স্বপে বসে নূরজাহান আজ অন্য কারও নামে কবুল বলছে। আজ মানিক এখানে থাকলে হয়তো গল্পটা অন্য কিছু হতে পারতো। গ্রামবাসীর কয়েকজন মহিলা এগিয়ে এসে আশনূর পাশাপাশি তাঁরাও নূরজাহানকে ঘিরে বসে মজলিসের ভিতর। রাত ২ঃ২৫। জাফর কন্ঠে আল্লাহর পবিত্র কালামের ধ্বনি আর চারপাশে উত্তাপ মশালের আগুনে গোটা গ্রামবাসী স্বাক্ষী থাকল নূরজাহান আর মারিদের ইসলামি শরীয়ত মোতাবেক বিয়ের।
~~
ঢাকা যান্ত্রিক শহর। ঘনবসতি বেশি। এখানে রাত দশটা, এগারোটা, বারোটা মানে সেই সন্ধ্যা ছয়টার মতোই মনে হয়। মানুষ যাতায়াত, গাড়ি চলাচল আর কোলাহলে নির্দিষ্ট সময়ের ঠাহর করা মুশকিল যদি না কেউ হাত উঠিয়ে ঘড়িতে সময় না দেখে। সময় দশটা পয়তাল্লিশ। প্রায় এগারোটার ঘরে। এই রাতে রিফাত গাড়ি নিয়ে বের হয়েছে উত্তরার দিকে। মারিদ অপরিচিতা মেয়েটির লোকেশন পাঠিয়েছে। মেয়েটির সাথে দেখা করার কথা রাত দশটায় অথচ রাস্তার জ্যামে আটকে এখানেই পয়তাল্লিশ মিনিট লেট। চার গলির মোড়ে রিফাতের গাড়ি আটকে। যেদিকে তাকাই সেদিকে সমাহার গাড়ির এলোমেলো লাইন দিয়ে আটকে। এতসব গাড়ির জ্যাম কবে ছাড়বে জানা নেই। মারিদের সঙ্গে রিফাতের লাস্ট কথা হয়েছিল সাড়ে নয়টায়। তখন মারিদ কিসের তাড়াহুড়োয় জানি ছিল, খুব ব্যাকুলতায় রিফাতকে অপরিচিতার লোকেশন পাঠিয়েই সে গায়েব। এরপর আর কোনোভাবে রিফাতের সঙ্গে মারিদের যোগাযোগ হয়নি। এই নিয়ে রিফাত অসংখ্য বার মারিদকে কল করেছে কিন্তু বরাবরই মারিদের নম্বর বন্ধ। তারপর হাসিব, রাদিল দুজনকেই কল দিল—ওদের নম্বরে কল যাচ্ছে কিন্তু কেউ রিসিভ করছে না। রিফাত বেশ চিন্তায় পড়ে গেল মারিদকে নিয়ে। থানচিতে ওদের কোনো বিপদ হয়েছে কিনা টেনশন করল। রিফাত একবার ভেবেছিল মারিদের দেওয়া ঠিকানায় আজ ওহ অপরিচিতার সঙ্গে দেখা করতে যাবে না, কাল সকালে যাবে। কিন্তু পরে আবার মারিদের কথা ভেবে মত বদল করল। বিগত এক বছরেরও অধিক সময় ধরে মারিদ অপরিচিতাকে পাগলের মতো খুঁজছে। এই অপরিচিতার জন্য দিনের পর দিন থানচিতে পড়ে আছে। এই অপরিচিতা মারিদের জন্য কতটা ইম্পরট্যান্ট সেটা রিফাতের জানা বাকি নেই। আজ মারিদ থানচিতে আটকে আছে বলেই রিফাতকে যেতে বলেছে, নয়তো মারিদ কোনোদিন মারিদের জায়গায় রিফাতকে পাঠাত না কারণ মারিদ ওর অপরিচিতাকে নিয়ে ভীষণ পজেসিভ। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই মুহূর্তে রিফাত যদি কোনো কারণে অপরিচিতা মেয়েটির সঙ্গে দেখা করতে না যায়, তাহলে পরে যদি মেয়েটি আবারও গায়েব হয়ে যায় তখন রিফাত শত চাইলেও মেয়েটির সন্ধান মারিদকে দিতে না পারে। এত কষ্ট করে মারিদ অপরিচিতার অবধি পৌঁছেও যদি রিফাতের জন্য হারিয়ে ফেলে তাহলে সেটা মেনে নেওয়া যায় না। রিফাত অনেক চিন্তার পর ফোনটা হাতে নিল। মারিদের পাঠানো অ্যাড্রেস আর তনিমার নম্বরটা হোয়াটসঅ্যাপে দেখে নিয়ে তনিমার কন্টাক্ট নম্বরে ছোট করে মেসেজ লিখে পাঠাল…

‘ আপনি যাবেন না প্লিজ, একটু অপেক্ষা করুন। আকাশের অবস্থা ভালো না, বাইরে বৃষ্টি হবে তাই জ্যামে আটকে আছি। আমার আসতে আরও খানিকটা লেট হতে পারে মিস অপরিচিতা।

রিফাত নিজের পরিচয় দিল না। আপাতত সে মারিদের পরিচয়ে মেয়েটির সঙ্গে দেখা করবে। রিফাতের পরিচয় পেয়ে যদি মেয়েটি দেখা না করে চলে যায়, তাহলে মেয়েটির সম্পর্কে সঠিক তথ্য নেওয়া যাবে না। তাই সে আপাতত রিফাত নয়, মারিদের ভূমিকা পালন করবে। তারপর যখন মারিদ কাল ঢাকা ফিরে আসবে তখন না হয় মারিদ নিজে সবটা ক্লিয়ার করে নিবে মেয়েটির সাথে। আপাতত এক রাতের জন্য পরিচয় গোপন করাটাই উত্তম।
রিফাত ফোনটা পাশের সিটে রেখে গাড়ির কাঁচ খুলে বাইরে তাকাল। আকাশে ঘন মেঘে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। সেই সাথে ঝড়ো হাওয়া বইছে। মনে হচ্ছে ভীষণ ঝড়-তুফান হবে। গাড়ি না নিয়ে আসলে এতক্ষণে রিফাত হেঁটে জ্যামের পথটা পার হয়ে পুনরায় রিকশা নিয়ে লোকেশন অনুযায়ী চলে যেত। রিফাত বিরক্ত হয়। তক্ষুনি ফোনে রিংটোন বেজে উঠতেই দ্রুত ফোনটা হাতে নেয়। ভেবেছিল মারিদ, রাদিল, হাসিবের মধ্যে কেউ রিফাতকে কল করেছে। অথচ কল এলো মারিদের অপরিচিতার। রিফাত খানিকটা দ্বিধা নিয়ে ফোনটা রিসিভ করতেই তনিমা সালাম দিয়ে বলল…

“আসসালামু আলাইকুম। আপনি কি চিঠিওয়ালা বলছেন?

মারিদ অপরিচিতার সঙ্গে চিঠিতে কথা বলেছে এই কথাটা সে জানে। তবে কখনো এই বিষয়ে তেমন মনোযোগী ছিল না। আজ মারিদও রিফাতকে বলেছে অপরিচিতার সঙ্গে ওর চিঠিতে কথা হয়েছে। আর চিঠির মেয়েটাই তার সাথে দেখা করতে আসার কথা। এই মেয়েটি যখন চিঠির প্রসঙ্গ তুলেছে, তার মানে মারিদের অপরিচিতা সে-ই। রিফাত বেশ স্বাভাবিকভাবে সম্মতিসূচক বলল…

“জি মিস।

“ওহ! তাহলে আপনার ঐ নম্বরটা বন্ধ কেন? আমি কতবার কল করেছি এই নিয়ে। আরেকটু হলে আমি চলেই যেতাম। ভেবেছিলাম আপনি আর আসবেন না, আবার আমাকে ধোকা দিয়ে হারিয়ে যাবেন।

রিফাত দ্বিধায় ভুগল। রিফাত যতটুকু জানে অপরিচিতা মারিদকে ধোকা দিয়ে হারিয়ে গেছে, অথচ এই মেয়ে বলছে ভিন্ন কথা। মারিদের অনুপস্থিতিতে রিফাত এমন কিছুই বলতে চায় না যাতে মেয়েটির সন্দেহ হয় সে মারিদ নয়, ভিন্ন কেউ। রিফাত আপোস করে প্রসঙ্গ পাল্টে বলল…

“এটা আমার আরেকটা নম্বর মিস। তাড়াহুড়োয় বাসা থেকে বের হতে গিয়ে হাতের ওই ফোনটা বাসা রেখে এসেছি। হঠাৎ মনে হওয়ায় আপনাকে এই নম্বরে মেসেজ পাঠালাম।

” ওহ! আপনি বুঝি দুটো ফোন চালান?

“জি, কাজের সুবাদে চালাতে হয়।

“আপনি এখন কোথায় আছেন?

‘ এইতো উত্তরার কাছাকাছিই আছি। বাইরের পরিস্থিতি ভালো না, হয়তো ঝড়-তুফান হবে। ভীষণ বাতাস বইছে। তারপর আবার ট্রাফিক জ্যাম, বুঝতেই পারছেন কেন লেট হচ্ছে আমার।

“আপনার কি বেশি লেট হবে আসতে?

“বেশি লেট হবে না। আশা করছি আর আধা ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাব। আপনি কি একা এসেছেন? নাকি সঙ্গে কেউ আছে?

” আমি একা নয়। আমার সাথে আমার এক ফুফাতো বোন আছে।

” ওকে ব্যাস। তাহলে তো কোনো সমস্যা হবে না আশা করছি। আপনি একটা কাজ করুন মিস। আপনার বোনকে নিয়ে ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে বসুন, আর আমাকে আপনাদের লোকেশনটা পাঠিয়ে দেন। আমি যথাসম্ভব দ্রুত আপনাদের লোকেশনে পৌঁছে যাব। আমাদের কথা বলা শেষে আমি নাহয় আপনাদের নিজ দায়িত্বে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসলাম ইনশাআল্লাহ।

রিফাতের আন্তরিকতায় তনিমা চুপ করে যায়। রিফাত কল কেটে ড্রাইভিংয়ে মনোযোগ দেয়। তনিমা মাত্র একবার মারিদের সঙ্গে ফোনে কথা বলায় এই মুহূর্তে রিফাতের কণ্ঠ চিনতে পারেনি। তাছাড়া মারিদ, রাদিল, রিফাত তিনজনের ভয়েস একই রকম শোনায় যখন ওরা গম্ভীর গলায় কথা বলে, তাই এই মুহূর্তে রিফাতের কন্ঠ চিনতে ভুল করে তনিমা। ছাত্রী হিসেবে রিফাতের সঙ্গেও কখনো তনিমার ফোনে কথা হয়নি যার জন্য বরাবরই রিফাতও তনিমাকে চিনতে পারিনি।
রিফাত জ্যামজট পেরিয়ে অবশেষে উত্তরায় পৌঁছে তনিমার দেওয়া লোকেশন চেক করতে কপাল কুঁচকে গেল। এটা উত্তরার বাইরে কোনো গলি দেখাচ্ছে। কোনো ভদ্রলোক সেই গলির মোড়ে যাবে না। অনিষিদ্ধ কাজের দরদাম হয় এই গলিতে দাঁড়িয়ে। ঢাকায় অবস্থানরত দিনের আলোয় ভদ্রলোক সাজা মেয়েরা শরীর বেচে সেই গলিতে দাঁড়িয়ে। দিনের আলোতে সেই মেয়েগুলো সুশীল সমাজের ভদ্র মেয়ে হলেও তারা অন্ধকার রাতের শাহবাগী। সেজন্য এখানে বেশ ঘনঘন পুলিশ রেড দেখা যায়। এই গলিতে দাঁড়ানোও কলঙ্ক। রিফাত বেশ চিন্তায় পড়ে যায়—মেয়েগুলো কি খারাপ? মারিদকে ফাঁসানোর জন্য কি এখানে ডেকেছে নাকি মেয়েগুলো না জেনে ওই গলিতে দাঁড়িয়েছে? রিফাত বেশ দ্রুত গলির মোড়ে গাড়ি থামিয়ে বেরিয়ে তনিমাদের খোঁজ করে। তনিমাকে কল করে আশেপাশে তাকায়। ল্যাম্পপোস্টের নিচে মেয়েদের ভদ্র পোশাকে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে ছেলেদের সঙ্গে কথা বলতে দেখা যায়। রিফাতের শরীর ঘিনঘিন করে ঘৃণায়। তনিমাকে কল করে জানতে চায়…

“আপনারা কোথায় আছেন?

“সি-অফ হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনি কোথায়?

হোটেলের নাম শুনেই অতি ঘৃণায় রিফাতের রাগ উঠে যায়। এই গলিতে সব খারাপের শুরুই হয় এই হোটেল থেকে। রিফাত খানিকটা ক্ষিপ্ত স্বরে বলে…

“আপনি কি এই গলিতে আগেও এসেছেন মিস?

তনিমা অসহায় এবং রিনরিনে গলায় রিফাতকে শুধাল…

“আমি এখানকার কিছুই চিনি না। কোথায় আছি তাও বুঝতে পারছি না। আমার ফুফাতো বোন আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ও হোটেলের ভেতরে আছে আর আমি বাইরে একা দাঁড়িয়ে আছি। আশেপাশের পরিবেশটা কেমন জানি। ছেলে-মেয়েরা খুব উশৃঙ্খল বিহেভ করছে। আমার খুব ভয় করছে, আপনি প্লিজ একটু দ্রুত আসবেন?

রিফাত দ্বিধায় পড়ে যায়। মেয়েটি ওকে ফাঁসানোর জন্য এমন জায়গায় ডেকে এনেছে কিনা বুঝতে পারছে না। আবার সবটা ক্লিয়ার না করেও চলে যেতে পারছে না কাল মারিদ ঢাকা ফিরলে কী জবাব দিবে সেই ভেবে। রিফাত হোটেলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। গাড়ি রাস্তার মাথায় পার্কিং করে মুখে রুমাল বাঁধল। এসব জায়গায় রিফাতকে কেউ দেখলে তাঁর সম্মান যাবে। নাক-মুখ কুঁচকে প্রচণ্ড অনিহা আর ঘৃণা নিয়ে পৌঁছায় হোটেলের সামনে। আশেপাশে জায়গায় জায়গায় ছেলে-মেয়ে দাঁড়িয়ে। কেউ কথা বলছে, কেউ এক রাতের কত নিবে সেই দরদাম করছে। রিফাত বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে হোটেলের সামনে এসে তীক্ষ্ণ চোখে তনিমার খোঁজ করে কল মেলাল। তনিমা কল রিসিভ করতেই রিফাত বলল…

“আপনি কোথায় আছেন?

“হোটেলের পেছনে।

” আবার ওইখানে কী করছেন?

‘ আসলে বুঝতে পারছি না কোনো কিছু, আমার ফুফাতো বোন এদিকটায় এসেছে, আমি ওকে নিতে এসেছি। আপনি এদিকটায় আসুন।

রিফাতের মনে তনিমার জন্য ঘৃণা জন্মাল। ভালো পরিবেশ ছেড়ে নোংরা পরিবেশে কেন মেয়েটি ঘুরছে বুঝতে পারছে না। হতে পারে মেয়েটি এই নোংরা পরিবেশের কেউ একজন, হয়তো মারিদকে ফাঁসানোর জন্য এখানে ডেকেছে। মারিদের জায়গায় রিফাত এসেছে, তাই রিফাতকে চেনার শঙ্কা কম। রিফাত নিজেকে আড়াল করে হোটেলের পেছন দিকটায় গিয়ে দাঁড়াল। হোটেলের পেছনে ছোটখাটো বাগান আছে। বেশ আলো দেখা যাচ্ছে। এখানে একটা মেয়েকে দেখা যাচ্ছে সাদা থ্রি-পিস পরা, মাথায় ঘোমটা টেনে চঞ্চল চোখে এদিক-সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছে। কাঁধে একটা ব্যাগ ঝুলিয়ে। রিফাত শিওর হওয়ার জন্য বিল্ডিংয়ের আড়াল থেকে অপরিচিতাকে কল করতেই বাগানে দাঁড়িয়ে থাকা তনিমা রিসিভ করল। রিফাত নিশ্চিত হতে বলল…

“আপনি কি সাদা ড্রেস পরে আছেন মিস?

“জি। আপনি কি আমার আশেপাশে?

“ওয়েট, আমি আসছি।

আসছি বলে রিফাত ফোন কেটে মোবাইল পকেটে গুঁজে নিল। বাইরের বাতাসের বেগ বেড়েছে, বৃষ্টি হবে। রিফাত মুখের রুমাল খুলল না। মেয়েটিকে পেছন থেকে ডাকতেই তনিমা ঘুরে দাঁড়াল। রিফাত থমকে যায় তার ছাত্রী তনিমাকে দেখে। মুখ বাঁধা থাকার পরও তনিমা রিফাতকে চিনে ফেলে চোখ আর বডি স্ট্রাকচার দেখে। তাছাড়া রিফাতকে সন্দেহ করেই তনিমা ফোনে কথা বলেছিল, আজ রিফাতই তনিমার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। তনিমা থমকে যায় বহু আকাঙ্ক্ষিত চিঠিওয়ালার রূপে রিফাতকে দেখে আর রিফাত স্তব্ধ নিজের অপ্রত্যাশিত ছাত্রীকে দেখে। রিফাতের গলা চিপে আসে কথা বলতে। তনিমার টুকটাক ডিটেইলস রিফাত কলেজ থেকেই সংগ্রহ করতে পারবে, এর জন্য নিজের ছাত্রীর সঙ্গে এই রাতে দাঁড়িয়ে কথা বলার প্রয়োজন নেই। রিফাত অস্বস্তি বোধ করে বলল…

“এখানে থাকা সেফ নয়। আমার সাথে এসো।

রিফাত স্বভাববশত নিজের ছাত্রীকে ‘তুমি’ করে সম্বোধন করেছে। অথচ তনিমা রিফাতের পেছনে না গিয়ে টইটম্বুর টলটলে চোখে বলল…

“আপনি কি আমাকে এতদিন চিনে চিঠি লিখতেন স্যার?

‘স্যার’ শব্দটাতে রিফাত আটকে যায়। তনিমা ওকে চিনতে পেরেছে। রিফাত অবাক চোখে ঘুরে তাকিয়ে বলল…

“আপনি আমাকে চেনেন?

“আপনাকে না চিনলে কি আমি এতো রাতে পাগলের মতো চলে আসতাম অপরিচিত পরিবেশে স্যার?

তনিমা মারিদের সাথে রিফাতকে গুলিয়ে ফেলছে। আপাতত রিফাত নিজের পরিচয় দিয়ে ঝামেলা পাকাতে চায় না। বৃষ্টি আসছে, আকাশ ভালো না। সবচেয়ে বড় কথা, এখানকার আশেপাশের পরিবেশ ভালো না, যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপদ ঘটে যেতে পারে। রিফাত বলল…

“তোমার সাথে পরে কথা বলব। আপাতত আমার সাথে এসো। এখানকার পরিবেশ ভালো না। বিপদ হতে পারে। জলদি এখান থেকে বের হতে হবে এসো।

তনিমা চিঠিওয়ালাকে পেয়ে ইমোশনাল। খুব করে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছা করছে চিঠিওয়ালাকে। অথচ রিফাত আনমনা ব্যবহার করছে। তনিমা জায়গা থেকে নড়ছে না দেখে রিফাত পুনরায় তাগাদা দিল। তনিমা মাথা নুইয়ে চোখের পানি মুছে বলে…

‘ আমার ফুফাতো বোন সানিয়া আপু এই হোটেলে আছেন, আপনি প্লিজ আমার সাথে একটু হোটেলের ভেতরে আসবেন? আসলে এতক্ষণ একা সাহস পাচ্ছিলাম না ভেতরে যাওয়ার।

রিফাত হঠাৎ রেগে গিয়ে বলল…

“তুমি কি স্টুপিড? এই মুহূর্তে তোমাকে নিয়ে হোটেলের ভেতরে গেলে কী হবে জানো? সবাই ভাববে আমরা খারাপ উদ্দেশ্যে এখানে এসেছি। কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ এসো, তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিচ্ছি। তোমার আপু যার সাথে এখানে এসেছে, কাজ শেষে সে-ই তোমার আপুকে বাসায় পৌঁছে দিবে। তুমি আমার সাথে এসো।

তনিমা তৎক্ষণাৎ আকুতি-মিনতি করে বলল…

” প্লিজ স্যার, আমার সাথে একটু হোটেলের ভেতরে চলুন না। সানিয়া আপুকে ছাড়া বাসায় গেলে বিপদে পড়ে যাব। প্লিজ স্যার চলুন। প্লিজ, প্লিজ।

“নো ওয়ে। তোমার যাওয়ার হলে তুমি যাও, আমি পারব না এসব জায়গায় পা রাখতে।

রিফাত ঘৃণায় চলে যেতে নিলে তনিমা তৎক্ষণাৎ রিফাতের এক হাত দুই মুঠোয় চেপে মিনতি করে বলল…

“স্যার আপনার কাছে হাত জোড় করছি। প্লিজ স্যার। আমার সাথে একটু চলুন না। প্লিজ। প্লিজ।

তনিমার আকুতি-মিনতিতে রিফাত নরম হলো। সিদ্ধান্ত নিল সে তনিমাকে নিয়ে পেছনের রাস্তা দিয়ে হোটেলে যাবে। অথচ রিফাত বা তনিমার কারও জানা নেই এই মুহূর্তে পুলিশের রেড পড়েছে হোটেলের ভেতর। রিফাত তনিমাকে নিয়ে হোটেলের ভেতর নিচতলায় কয়েকটা ঘর খুঁজতে গিয়ে হৈচৈ শোনা গেল হোটেলের ভিতরে। ছেলে-মেয়েরা অর্ধ-উলঙ্গ অবস্থায় পুলিশের তাড়া খেয়ে দৌড়ে বের হচ্ছে। রিফাত পুলিশ দেখে উত্তেজিত ও ব্যাকুল হয়ে ওঠে। “শিট শিট শিট” বলে চিল্লাতে চিল্লাতে তনিমার হাত ধরে দৌড়ে পালাতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। তনিমা ও রিফাতের এতো করে মানা করার পরও পুলিশ ওদের কথা শোনেনি। বাকিদের সাথে করে ওদের দুজনকেও পুলিশ জিপে করে থানায় নেওয়া হয়। রিফাত সম্মানের ভয়ে তিলমিলিয়ে উঠছে বারবার। সে শত চেষ্টা করেও পুলিশকে কিছু বোঝাতে সক্ষম হচ্ছে না। এর মাঝে রিফাত মারিদ ও রাদিলকে বেশ কয়েকবার কল করে নম্বর বন্ধ পাচ্ছে। নিকটতম বন্ধু-বান্ধব বলতে মারিদ ও রাদিলই আছে রিফাতের। এই মূহুর্তে ওরা দুজনই অনুপস্থিত। আর যারা নামসর্বস্ব বন্ধু আছে তাদের কানে আজকের পুলিশ কেসের ঘটনা যাওয়ার সাথে সাথে সব জায়গায় ভাইরাল হয়ে যাবে। রিফাত বিপদে পড়ে কী করবে না ভেবে নিজের মেজো মামা সৈয়দ রবিউল আলমকে কল দেয়। কিন্তু তিনিও এই মূহুর্তে ঢাকার বাইরে। এরই মাঝে পুলিশ জনে জনে আটকে রাখা ছেলে-মেয়েদের আলাদা আলাদা জবানবন্দি নিচ্ছে। সেই জবানবন্দিতে তনিমা বলেছে ওর রিফাতের সঙ্গে কয়েক মাসের চিঠিতে প্রেম ছিল, সেই প্রেমের সূত্রে আজকেই ওদের প্রথম দেখা ছিল। আর রিফাত বলেছে, তনিমা শুধুই ওর একজন ছাত্রী, এর বাইরে ওর সাথে কোনো সম্পর্ক নেই। রিফাত আজকে হোটেলে নিজের জন্য নয় বরং অন্য একজনের জন্য দেখা করতে গিয়েছিল তনিমার সাথে। কিন্তু এরমাঝে পুলিশরা ভুল করে রিফাত আর তনিমাকে ধরে নিয়ে এসেছে। রিফাত ও তনিমা দুজনের দুই ধরনের জবানবন্দি হওয়ায় পুলিশের সন্দেহ বাড়ে। সারারাত তনিমা ও রিফাতকে আটকে রেখে ওদের পরিবারকে কল দেওয়া হয়।

মেয়ের খবর পেয়ে বাবা জাবেদ শেখ, মা হাফেজা,
বড় ভাই তুহিন তিনজনই ছুটে আসে উত্তরা থানায়। তনিমাকে কোনো ছেলের সঙ্গে অন্তরঙ্গ অবস্থায় হোটেলে পুলিশ ধরেছে খবরটা শোনার সাথে সাথে হাফেজা বেগম জ্ঞান হারায়। বাবা হিসাবে জাবেদ শেখ বাকরুদ্ধ। নীরবে শুধু চোখের পানি পরেছে গুলশান থেকে উত্তরা থানায় আসার পুরোটা রাস্তায়

রিফাতের বাবা খালেদ খন্দকারের কাছেও কল করেছেন থানা পুলিশ। ছেলের খবর পেয়ে রিফাতের বাবা, মারিদের বাবা আর ছোট চাচাকে নিয়ে থানায় হাজির হন। এরই মাঝে তনিমার মা তিনবার জ্ঞান হারিয়েছেন আদুরে মেয়ের কাণ্ডকীর্তি শুনে। পুলিশ বলছে ওদের হোটেলে হাতেনাতে ধরেছে। এই কথায় রিফাত ও তনিমা দুজনেরই মাথা নত হয়ে যায় লজ্জায়।

[ গল্পটার পড়ে ভালো মন্দ যায়-ই ফিল করেন অবশ্যই রিভিউ দিবেন]

চলিত….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply