#কালারব্লাইন্ড — ১৫
#সোফিয়া_সাফা
রাত এগারোটা।
বিছানায় শুয়ে আছে আলতা। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চোখ বুজে ঘুমানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে সে, কিন্তু কোনো ফায়দা হচ্ছে না। ঘুম এসে ভাব জমাচ্ছে না তার সাথে।
সন্ধ্যার পর থেকে রাত দশটা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা একটানা ফারিশ পড়িয়েছে তাকে। ইরার চেয়েও দ্বিগুণ সময় ধরে বইয়ের পাতায় চোখ আটকে বসে থাকতে হয়েছে ষোড়শীকে। ইরার ঘরের স্টাডি টেবিলে বসেই কেটেছে তাদের এই সুদীর্ঘ সময়।
এভাবে শুয়ে থেকে কোনো লাভ নেই বুঝে শেষমেষ বিছানা ছেড়ে উঠে বসল আলতা। তার পরনে লাল পাড়ের হালকা হলুদ রঙের মসলিন শাড়ি। এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে এক তোড়ায় এনে খোপা করতে করতে মেঝের ওপর খালি পা দুটো রাখল সে। তারপর শ্রান্ত পায়ে হেঁটে গেল ব্যালকনির দিকে।
একফালি চাঁদের রূপালী আলো ঝরে পড়ছে ধরনীতে। সেই আলোয় গা ভিজিয়ে ব্যালকনির কোণে রাখা কাঠের বেঞ্চটিতে বসল সে। আলতার ঘরের সবক’টি আসবাবপত্রই উন্নতমানের কাঠের তৈরি।
কাঠের বেঞ্চে পা তুলে নিয়ে হাঁটুতে গাল ঠেকিয়ে বসে রইল কিশোরী। দৃষ্টি দূর আকাশের চাঁদের পানে নিবদ্ধ থাকলেও মন ভেসে গেল কয়েক মাস পেছনের ফেলে আসা অতীতে। মস্তিষ্কের সংরক্ষিত এক প্রকোষ্ঠ থেকে পুরনো স্মৃতিগুলো একে একে ভেসে উঠতে লাগল চোখের পাতায়।
মাস তিনেক আগে…
ভ্যালেনিয়ার ডেলভিয়া প্রদেশটি মূলত পাহাড়ি অঞ্চল হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত। কেবল পাহাড়িই নয়, এটি এই দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী এক অঞ্চল। রাজধানী অ্যাল্টানিয়ার মতো আধুনিক, নগরকেন্দ্রিক জীবন এখানে নেই; ডেলভিয়ার অনেক গ্রামে এখনো পুরনো দিনের সামাজিক রীতি, বংশীয় পারিবারিক মর্যাদা এবং স্থানীয় প্রভাবশালী পরিবারগুলোর দাপুটে কর্তৃত্ব প্রবলভাবে টিকে আছে।
এই ডেলভিয়া প্রদেশেরই এক দুর্গম, প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে আলতা। তার বাবা আর কাকা এখনো তার দাদার তৈরি করা ভিটেবাড়িতেই যৌথভাবে বসবাস করেন। আলতার বাবা সংসারের প্রতি চরম উদাসীন আর দায়িত্বজ্ঞানহীন হওয়ায় এত বছরেও তাদের হাঁড়িকুড়ি আলাদা হয়নি।
সকালে আলতার ঘুম ভাঙে পাখির কলতানে। সারাটাদিন কাটে সাংসারিক কাজকর্মে। তার কাকিমা পুরোটা দিনই তাকে কাজের ওপর রাখেন। আলতার বাবা মাহমুদ রেহবার স্বভাবগতভাবেই জুয়ারি; গ্রামের জমিদারবাড়ির ক্ষেতে দিনমজুরি করে যা উপার্জন করেন, সবটাই জুয়া খেলে নষ্ট করে ফেলেন।
এই টানাপোড়েনের সংসারে আলতা ও আলতার মাকে দুমুঠো ভাতের জন্য নির্ভর করতে হয় আলতার চাচি হালিমা বেগমের করুণার ওপর। তাই আলতা তার কাকির সব কটু কথা হজম করে সারাটাদিন মুখ বুজে কাজ করে যায়।
তবে পরিবারে এমন একজন আছে, যার উপস্থিতি আলতাকে খানিকটা স্বস্তি দেয়—তার চাচাতো ভাই মুবিন। সে বাড়িতে যতক্ষণ থাকে, আলতাকে কোনো ভারী কাজ করতে দেখলেই মায়ের ওপর চড়াও হয়ে প্রতিবাদ করে, ‘এটুকু মেয়েকে দিয়ে তোমার এতো কেন কাজ করানো লাগবে?’
হালিমা বেগম আবার ছেলেকে খুব মান্য করেন। তাই ছেলের সামনে আলতাকে কিছুই বলেন না। তবে মুবিন বেশিরভাগ সময়েই বাড়িতে থাকে না। সে জমিদারের একটি ফলের বাগান দেখাশোনার কাজে নিয়োজিত আছে। মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও অভাবের কারণে উচ্চমাধ্যমিকে আর ভর্তি হওয়া হয়ে ওঠেনি তার। রাতের বেলা ফলের বাগান পাহারা দেওয়ার জন্য সেখানেই গাছের ডালের ওপর বানানো মাচা ঘরে থাকতে হয় তাকে।
একদিন ভোর সকালে আলতা চলে যায় জমিদারের ফলের বাগানে। পাহাড়ের উর্বর, উঁচু জমিতে সুপরিকল্পিতভাবে রোপিত রয়েছে সারি সারি কমলার গাছ। মাঝেমধ্যেই সে বাগানে ঢুকে ইচ্ছামতো ফল পেরে নিয়ে যায়। মুবিন তাকে দেখলেও কিছুই বলে না। আজ আলতা কমলার আচার বানানোর জন্য কমলা সংগ্রহ করতে এসেছে। সঙ্গে আছে জুবা। আলতাকে বরাবরই জুবার সাথে চলাফেরা করতে দেখা যায়। পাখিটা হরহামেশা তার কাঁধের ওপর বসে থাকে।
একটি ডালপালা ছড়ানো কমলা গাছের নিচে এসে থামল আলতা। আলতো হাতে কোমর থেকে শাড়ির আঁচলটা খুলে নিল সে। তার পরনের কালো-হলুদ রঙের তাঁতের শাড়িটা বেশ পুরনো হলেও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। লালচে রঙের চুলগুলো একপাশে এনে বেণি করা।
গাছের পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা পাকা কমলাগুলোর দিকে একবার বিচক্ষণ দৃষ্টি বুলিয়ে নিল আলতা। তারপর জুবাকে ইশারা করতেই জুবা ডানার ঝাপটানি দিয়ে উড়ে গিয়ে বসল কমলার উঁচু ডালে। আর আলতা গাছের নিচে হাঁটু গেড়ে বসে নিজের শাড়ির আঁচলটা দু-পাশে মেলে ধরল; যাতে ওপর থেকে পড়া কমলাগুলো সোজা আঁচলে এসে পড়ে, মাটিতে পড়ে থেঁতলে না যায়!
এরমধ্যে আলতা কারো পদধ্বনি শুনতে পায়। ঘাবড়ে যায় কিশোরীর তনুমন। একবার নিজেকে এই ভেবে স্বান্তনা দেয় হয়তো এটা মুবিন। কিন্তু যতই আওয়াজ কাছে আসতে থাকে আলতার সমস্ত সাহস মিলিয়ে যায়। গাছের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে সে। উঁকি দিয়ে দেখে একজন তরুণ গোছের লোক মোবাইলের স্ক্রিনে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে এগিয়ে আসছে। পথেই নিচে পড়ে থাকা একটা কমলা দেখে থমকে যায় সে। মাথা তুলে তাকায় গাছের দিকে। গাছে কমলা ঝুলে থাকতে দেখে খুশি হয়ে যায় সে। ফোনটা পকেটে পুরে মাটি থেকে একটা কমলা তুলতেই আলতা আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসে।
গলায় রাশ টেনে বলে, “ওটা নিচে রাখুন! ওগুলো আমি পেরেছি!”
আচমকা মেয়েলি কণ্ঠ শুনে চোখ তুলে পাশ ফিরে তাকায় লোকটা। চোখাচোখি হয়ে যায় আলতার সাথে। অপরিচিত লোকটাকে অপলক নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে গলা শুকিয়ে আসে আলতার। দূর! কেন যে সে আড়াল থেকে বের হতে গেল? একটা কমলা নিয়ে গেলে কী আর এমন ক্ষতি হয়ে যেতো?
আলতার অস্বস্তি টের পেয়ে লোকটা দৃষ্টি সরিয়ে বলল, “তুমি পেরেছো? কীভাবে পেরেছো শুনি?”
বলতে বলতেই লোকটার মাথার ওপর ‘টুপ’ করে একটা কমলা পড়ল।
“আহ্!” লোকটা চমকে উঠে মাথায় হাত দিয়ে ওপরে তাকাতেই জুবাকে দেখতে পেল। দৃষ্টিতে ব্যাথা ফুটে উঠল তার। হাসির রিনিঝিনি শব্দে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল আলতা হাসছে। লোকটার সাথে আবার চোখাচোখি হতেই আলতার হাসি থেমে গেল। হাত দিয়ে মুখ চেপে অন্যদিকে তাকাল। সে জানে না লোকটা কে? যদি জমিদারের আত্মীয় হয় তাহলে কী হবে? ভাবনাটা মাথায় আসতেই শুকনো ঢোক গিলল কিশোরী।
“তোমার হাসিটা সুন্দর।”
অযাচিত প্রশংসায় আলতা সংকোচে গুটিয়ে গেল। লোকটা হয়তো তা বুঝতে পেরে বলল, “বাই দ্য ওয়ে… আমি তোমাকে কীভাবে পেরেছো তা মুখেই বলতে বলেছিলাম। প্রাকটিক্যালি গাছ থেকে পেরে দেখাতে বলিনি।”
এই কথার পৃষ্ঠে আলতা প্রশ্ন করল, “আপনি কি জমিদারের নাতি?”
লোকটা প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাতেই আলতা সংশোধনের সুরে বলল, “না মানে আত্মীয়?”
লোকটা বার দুয়েক পলক ঝাপটে কথাটা বোঝার চেষ্টা করল। তারপর বুঝতে পেরে ঠোঁটের বাঁক প্রসারিত করে বলল, “আমি তো জমিদারকে চিনিই না।”
আলতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। কিন্তু কথাটা শুনে সন্দিহান চোখে তাকাল, “আপনি জমিদারকে চেনেন না? তাহলে কি আপনি অন্য গ্রাম থেকে এসেছেন?”
তরুণটি নিজের শার্টের কলারটা একটু সোজা করে বলল, “অন্য গ্রাম থেকে? শুধু অন্য গ্রাম নয় আমি ডেলভিয়ার কেউ নই। অ্যাল্টানিয়া থেকে এসেছি।”
ব্যস আলতার মনে চেপে বসা ভয়টা ভ্যানিশ হয়ে গেল। একহাত কোমরে রেখে বলল, “আপনি জমিদারের কেউ হন না। তাহলে তার বাগানের ফলে হাত দেওয়ার কোনো অধিকার নেই আপনার। রাখুন ওটা।”
লোকটা হাতে থাকা কমলার দিকে তাকিয়ে বলল, “তাহলে তুমি নিশ্চয়ই জমিদারের নাতনি? তিনি কি এই বাগানটা তোমার নামে লিখে দিয়েছেন?”
আলতা হাঁ হয়ে গেল। লোকটা কথা সম্পূর্ণ করল, “সেই জন্যই এই ভোরবেলা ফল পারতে এসেছো?”
অকস্মাৎ এমন যুক্তিতে আলতা থতমত খেয়ে গেল। হাত-পা নেড়ে আমতা আমতা করে বলল, “আমি জমিদারের নাতনি না হলেও আমার ভাইয়া এই বাগানের মালি। এই গাছগুলো সেই লাগিয়েছে। তাই… তাই আমি ফল পারতেই পারি।”
লোকটা এবার নিজের পেটে হাত রাখলো। কপালে সামান্য ভাঁজ ফেলে করুণ গলায় বলল, “আমি অনেকক্ষণ যাবত না খেয়ে আছি। খুব ক্ষুধা লেগেছে। তোমার ভাই যেহেতু গাছ লাগিয়েছে সেহেতু তুমিই এটা খাওয়ার অনুমতি দিয়ে দাও।”
আলতার ডাগর ডাগর চোখ দুটো নরম হয়ে এলো। উদ্বিগ্ন হয়ে শুধাল, “না খেয়ে আছেন কেন?”
“আমি আমার বন্ধুদের সাথে ট্যুরে এসেছিলাম। রাতে ক্যাম্পের আশেপাশে হাঁটতে বেরিয়ে রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি।”
কথাটা শুনে খারাপ লাগল আলতার। সে বলে উঠল, “আপনি দাঁড়ান আমি আমার ভাইয়াকে ডেকে আনছি। সে আপনাকে পথ খুঁজে পেতে সাহায্য করবে।”
লোকটা হেসে বলল, “ধন্যবাদ, তবে এখানে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে। আমি ওদের সাথে যোগাযোগ করতে পেরেছি। ওরা এক্ষুণি আমাকে নিতে এসে পড়বে।”
“ও আচ্ছা।”
“তো, এটা কি আমি খেতে পারি?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ, অবশ্যই।”
লোকটা প্রসন্ন মুখে কমলার খোসা ছাড়াতে লাগল। আলতাও নিজের কাজে মন দিয়ে নিচে ছিটকে পড়ে থাকা কমলা গুলো তুলে আঁচল ভরতে শুরু করল।
“আমার নাম শ্রেয়ান। তোমার?” হঠাৎ প্রশ্ন ছুড়ল লোকটা।
আলতা কমলা কুড়োনোর জন্য মাটিতে ঝুঁকে পড়েছিল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে চোখ বড় বড় করে তাকাল, “দুঃখিত?”
“আমি তোমার নাম জানতে চেয়েছি।”
আলতা শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরে আবার কমলা কুড়োতে মন দিল। স্বাভাবিক গলায় বলল, “ভাইয়া বলেছে অপরিচিত কাউকে নিজের নাম না বলতে।”
শ্রেয়ান খোসা ছাড়ানো কমলার একটি কোঁয়া মুখে পুরে রসিকতার সুরে বলল, “কিন্তু আমি তো নিজের নাম বলেছি। তারপরও অপরিচিত রইলাম কীভাবে?”
“নাম বলে দিলেই কেউ কারো পরিচিত হয়ে যায় না।”
“তাহলে আর কী কী করতে হয়?”
আলতা কিছু বলতে যাবে তার আগেই দূর থেকে মুবিনকে হেঁটে আসতে দেখতে পেল। থমকে গেল কিশোরী। তড়িঘড়ি ফলভর্তি আঁচলটা বুকের কাছে গুটিয়ে নিয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে জুবাকে আওয়াজ দিল, “জুবা! আর লাগবে না। ভাইয়া আসছে।”
বলেই আলতা চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। শ্রেয়ান ভ্রূকুটি করে বলল, “আরে আরে! তুমি এভাবে চোরের মতো পালিয়ে যাচ্ছো কেন? উনি না তোমার ভাই হয়?”
আলতা না থেমে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে পেছনের দিকে মুখ ফেরাল, “আপনিও পালান, ভাইয়া আমাকে চোর মনে না করলেও আপনাকে নির্ঘাত চোর ভেবে লাঠিপেটা করবে।”
শ্রেয়ান তার পিছুপিছু কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে নিচু গলায় বলল, “আমি কালকে আবার আসবো। তুমিও এসো কিন্তু।”
আলতা চলন্ত পথেই একবার পিছন ফিরে তাকাল শ্রেয়ানের দিকে। তারপর কিছু না বলেই দৌড়ে চলে গেল।
সেদিন সন্ধ্যার পর…
সারাদিনের পরিশ্রমের পর মুবিন যখন বাড়িতে ফিরলো, তখন রাতের আঁধার চারপাশ গ্রাস করেছে। পরিশ্রান্ত শরীরে বসার ঘরের পুরনো কাঠের তক্তপোশে এসে ধপাস করে বসে পড়ল সে।
আলতা ভাইয়ের জন্য একগ্লাস ঠান্ডা পানি নিয়ে এগিয়ে গেল। মুবিন পানিটা মুখে নিল ক্লান্ত হাতে। ভাইয়ের ফোলা ফোলা মুখশ্রী দেখে আলতা চিন্তিত বদনে শুধালো, “কী হয়েছে ভাইয়া? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
মুবিন খালি গ্লাসটা পাশে নামিয়ে রেখে অত্যন্ত ক্লান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ রে বোনু। জ্বর জ্বর লাগছে। সেই জন্যই দুদিন ছুটি নিয়েছি। এই দুদিন আমার বদলে কালু বাগানের দেখাশোনা করবে।”
আলতা বিচলিত হয়ে নিজের কোমল হাতটা ভাইয়ের কপালের সংস্পর্শে নিতেই কেঁপে উঠল, “তোমার তো অনেক জ্বর ভাইয়া। আমি এক্ষুণি কাকিমাকে ডেকে আনছি।”
আলতা চলে যেতে উদ্যত হতেই মুবিন বলল, “তোকে আমি অপরিচিত কারো সাথে কথা বলতে নিষেধ করেছিলাম বোনু।”
আলতা ভাইয়ের দিকে ফিরে মাথা নিচু করল। বুঝতে পারল, সকালে সেই লোকের সাথে কথা বলতে দেখে ফেলেছে মুবিন।
“কী বলেছে লোকটা?” মুবিনের প্রশ্নে আলতা রিনরিনে গলায় বলল, “তেমন কিছু বলেনি ভাইয়া। উনি ক্ষুধার্ত ছিলেন তাই আমি ওনাকে একটা কমলা খেতে দিয়েছি।”
“আর কিছু বলেনি?”
ভাইকে খুব শ্রদ্ধা করে আলতা। লোকটা তার নাম জানতে চেয়েছে শুনলে ভাইয়া রেগে যাবে ভেবে আলতা কথাটা চেপে গেল। ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বোঝালো আর কিছুই বলেনি। মুবিনও আর কোনো প্রশ্ন করল না।
রাতে মুবিনের জ্বর আরও বাড়লো। হালিমা বেগম সারারাত আলতাকে ঘুমাতে দেয়নি। নিজে দিব্যি বেঘোরে ঘুমালেও মেয়েটাকে দিয়ে একটানা ছেলের মাথায় পানি ঢালিয়েছেন। মুবিন জ্বরে প্রায় অচেতন হয়ে ধুঁকছিল বিধায় কোনোপ্রকার প্রতিবাদ করতে পারেনি আলতার হয়ে। যদিও আজ না ঘুমাতে পারার জন্য আলতার খারাপ লাগেনি। ভাইয়া তো তাকে কতো স্নেহ করে, সে না হয় বোন হয়ে একটা রাত জেগে ভাইয়ের মাথায় পানি দিলো তাতে নারাজ হওয়ার কী আছে? এমনিতেই ভাইয়ের জন্য খারাপ লাগছে তার।
যদি আজ মুবিনের জায়গায় আলতার জ্বর হতো, কখন তার ভাই তার জন্য ডাক্তার ডেকে আনতো। অথচ তার ভাইয়ের বেলায় ডাক্তার ডাকার কেউ নেই। আলতার বাবা আর চাচা তো নাকে তেল দিয়ে ঘুমোচ্ছেন। তাদেরকে ডেকে তোলার সাহস নেই কারো। কখন তাদের ঘুম ভাঙবে আর কখন ডাক্তার ডেকে আনবে ভাবতে ভাবতেই আলতার মুখটা ছোট হয়ে গেল।
ভোরের দিকে হালিমা বেগম ধড়ফড় করে উঠে আলতার হাত থেকে মগটা একপ্রকার কেড়ে নিয়ে বললেন, “আমি মাথায় পানি দিতাছি। তুই গিয়া চুলায় জ্বাল ধরা।”
আলতা মুখ ফুটে কাকিমাকে একবার ডাক্তার আনার কথা বলতে চেয়েও বলে উঠতে পারল না। ঘর থেকে বের হয়ে উঠোনটা ঝাড়ু দিল প্রথমে, তারপর চাল-ডাল ধুয়ে এনে চুলায় আগুন ধরাল। একটু পরেই ইছাপূর্ণা এসে রান্নার কাজে হাত লাগালেন।
সবজি কাটতে কাটতে আলতা বিরক্তির সুরে বিড়বিড় করল, “অন্য সময় তো কাকা, ‘আমার ছেলে, আমার ছেলে’। করে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। এখন অসুস্থ ছেলেটা রোগে কাতরাচ্ছে আর উনি নিশ্চিন্তে নাক ডেকে ঘুমাচ্ছেন!”
ইছাপূর্ণা কথাটা শুনলেন কিন্তু কিছুই বললেন না। চুলার আগুনের লালচে আলোয় তার ঠোঁটের কোণে থাকা তাজা ক্ষতটা যেন জ্বলজ্বল করে উঠল। গত রাতে ছাগল বিক্রির বিষয় নিয়ে আলতার বাবা তার গায়ে হাত তুলেছেন। ছাগলটা গাভিন, বড়জোর মাস দুয়েকের মধ্যে বাচ্চা দেবে; এই অবস্থায় ছাগল বিক্রি করা কি বুদ্ধিমানের কাজ? ইছাপূর্ণা শুধু এটুকুই বোঝাতে চেয়েছিলেন।
আলতা মায়ের মুখের দিকে তাকায়নি। ভাইয়ের চিন্তায় অস্থির সে। মায়ের সাড়াশব্দ না পেয়ে পেছন থেকে ডাকলো, “ও মা, কিছু বলছো না কেন? কাকাকে গিয়ে ডেকে তুললে কি উনি খুব রাগ করবেন? ভাইয়া অসুস্থ সেটা বলেও কি পাড় পাওয়া যাবে না?”
ইছাপূর্ণা যেন শুনতেই পেলেন না আলতার কথা। উদাস ভঙ্গিতে চুলার মুখে আরো দুটো কাঠের টুকরো ঢুকিয়ে দিলেন। আলতা ঠোঁট চেপে একটা পরিকল্পনা করে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে জুবাকে ডাকলো, “জুবা!”
জুবা কাছেপিঠেই ছিল। আলতার ডাক শুনেই উড়ে এসে এক চকিতে কাঁধের ওপর বসল। আলতা ফিসফিস করে পাখিটাকে শিখিয়ে দিল, “তুই কাকার ঘরে যা জুবা! গিয়ে যেভাবেই হোক কাকার ঘুমটা ভাঙিয়ে দিয়ে আয় তো!”
“জুব-আ! জুব-আ!” শব্দে ডানা মেলে ঘরের খোলা জানালা গলে ভেতরে ঢুকে গেল পাখিটা।
কয়েক মিনিটের মধ্যেই দেখা গেল মুবিনের বাবা জুবাকে গালাগাল করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়েছেন। জুবার জন্য খারাপ লাগলেও আলতা এগিয়ে গিয়ে সাহস করে বলল, “কাকা, ভাইয়ার জ্বরটা এখনো কমেনি। আপনি ডাক্তার ডেকে আনুন না।”
ছেলের অসুস্থতার কথা মনে পড়তেই একটু দমে গেলেন আলতার কাকা। চোখের কোণের ময়লা পরিষ্কার করতে করতে খিটখিটে গলায় বললেন, “আমার শার্ট খান লইয়া আয়।”
আলতা তাড়াহুড়ো করে শার্ট এনে দিলো। তবে ডাক্তার আসতে আসতে বেলা বেশ অনেকটাই গড়িয়ে গেল। ডাক্তারবাবু এসে মুবিনকে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন, তারপর কিছু ওষুধপত্র বুঝিয়ে দিয়ে বিদায় হলেন।
সারাদিন খাটাখাটুনির পর বিকেল বেলা আলতার মনে পড়ল শ্রেয়ানের কথা। লোকটা তাকে যেতে বলেছিল। আলতা ভাবনাটা পায়ে দলে সরিয়ে দিল। কেন যাবে সে, একটা মেয়ে মানুষ হয়ে পুরুষ মানুষের সাথে দেখা করতে? অপরিচিত কেউ ডাকলেই যেতে হবে নাকি? হুহ! যাবে না সে। একদম যাবে না।
কিন্তু সকাল হতেই আলতাকে যেতে হলো বাগানের দিকে। কারণ জ্বরের তীব্রতায় কোনো কিছু মুখে তুলতে পারছে না মুবিন। পুরো একটা দিন না খেয়ে আছে সে। ছেলেকে দুর্বল হয়ে পড়তে দেখে টনক নড়েছে মুবিনের মায়ের। সাতসকালেই আলতাকে হুকুম করেছেন বাগান থেকে তাজা ফলমূল নিয়ে আসতে। বাড়িতে কমলা তো আছেই এখন শুধু আলতা কয়েকটা মুসাম্বি আর নাশপাতি সংগ্রহ করতে যাচ্ছে।
হাতে একটা ছোট বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে পাহাড়ের আঁকাবাঁকা মেঠো পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগল আলতা। বুকটা কাঁপছে দুরুদুরু। জুবা সাথে আছে এই ভেবে একটু স্বস্তি। তাছাড়াও লোকটা গতকাল আসবে বলেছিল। আজকেও আসবে তা তো বলেনি। আলতার সমীকরণ এলোমেলো করে দিয়ে পথিমধ্যে সামনে এসে দাঁড়ালো শ্রেয়ান।
তাকে হঠাৎ সামনে দেখে আঁতকে উঠল কিশোরী। শ্রেয়ান মুখটাকে ভার করে বলল, “কালকে আসোনি কেন? তুমি জানো, আমি সারাটাদিন তোমার অপেক্ষায় ছিলাম।”
আলতা শংকিত হয়ে দুই পা পিছিয়ে গেল, “আ-আমি প্রতিদিন আসি না। যেদিন দরকার…”
“আমি তোমাকে আসতে বলেছিলাম, রঙ্গবতী! কিন্তু তুমি এলে না।”
‘রঙ্গবতী’ ডাকটা শ্রবণগোচর হওয়া মাত্রই আলতার পুরো শরীর হিম হয়ে এলো! ভয়ে শাড়ির আঁচলটা মুষ্টিবদ্ধ করে চেপে ধরল সে, “আমার পথ ছাড়ুন!”
শ্রেয়ান তৎক্ষণাৎ সরে দাঁড়াল। কিন্তু আলতা দ্রুতপায়ে সামনে এগোতেই সে-ও তার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করল।
আলতা ঘাড় না ফিরিয়েই প্রশ্ন করল, “আমার পিছু পিছু আসছেন কেন?”
“নামটা বললে না।”
“নাম জেনে কী করবেন?”
“বলেই দেখো কী করি।”
“দয়া করে আমার পিছু নেওয়া বন্ধ করুন।” বলতে বলতেই ভীতিতে আলতার কণ্ঠরোধ হয়ে এলো।
শ্রেয়ান ঈষৎ হেসে বলল, “তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছো কেন?”
এমন প্রশ্নে আলতার মনের ভয়টা আরও জেঁকে বসলো। ইচ্ছে করল হাতের ঝুড়িটা ফেলে দৌড়ে পালিয়ে যেতে। কিন্তু ফল না নিয়ে বাড়িতে ফিরলে কাকিমা আস্ত রাখবে না তাকে। সেটাও সে খুব ভালো করে জানে। কণ্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে আলতা বলল, “আপনি ভয় দেখাচ্ছেন তাই।”
“আমি ভয় দেখাচ্ছি?”
“হ্যাঁ, বাজে লোকেদের মতো পিছে পিছে হাঁটছেন।”
শ্রেয়ান লম্বা লম্বা কদম ফেলে আলতাকে টপকে তার আগে আগে হাঁটতে শুরু করল, “এখন ঠিক আছে?”
এহেন কাণ্ডে আলতার পা থমকে গেল। কেমন যেন অদ্ভুত লাগল তার। লোকটা পাগল নাকি? আলতাকে থেমে যেতে দেখে শ্রেয়ান পেছনে কদম ফেলে তার পাশাপাশি এসে দাঁড়ালো।
“কী হলো?”
আলতা না বোধক মাথা নাড়ল। সে আর কোনো কথা বলবে না। নিজের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করে চলে যাবে। ভাবনা মোতাবেক আলতা পায়ের গতি বাড়িয়ে দিয়ে মুসাম্বির বাগানে ঢুকে পড়ল। জুবা ফল পারতে সাহায্য করল তাকে। শ্রেয়ান আশেপাশে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “তোমার ভাই কোথায়?”
আলতা ভেবেছিল চুপ থাকবে কিন্তু এখন নিজের সুরক্ষার স্বার্থে মিথ্যা কথা বলাই বুদ্ধিমানের কাজ। সে একদিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল, “ভাইয়া? সে তো আছে ওই দিকটায়।”
শ্রেয়ান আলতার দেখানো দিকটায় একবার তাকিয়ে বলল, “উনি কালকে আসেননি, না?”
আলতার চোখের পাতা কাঁপল। শ্রেয়ান দুই হাত পকেটে গুঁজে সহজ গলায় বলল, “আমি কালকে সারাদিন বাগানেই ঘোরাঘুরি করেছি ওনাকে তো দেখিনি। উনি ডিউটিতে থাকলে নির্ঘাত আমাকে চোর ভেবে লাঠিপেটা করতো। কি বলো?”
আলতা বুঝতে পারল, লোকটা বানিয়ে বানিয়েই বলছে না। সে সত্যিই গতকাল তার অপেক্ষাতে ছিল। কিন্তু কেন? ভাবনাটা আলতার রূহ কাঁপিয়ে দিলো।
শ্রেয়ান চোখ দুটো ছোট ছোট করে শুধাল, “তুমি নিশ্চয়ই আমাকে লাঠিপেটা খাওয়াতে চেয়েছিলে?”
আলতা অবাক চোখে তাকালো। শ্রেয়ান যোগ করল, “সেই জন্যই আসোনি?”
আলতার মাথা গরম হয়ে গেল। গলার জোর বাড়িয়ে বলে উঠল, “আপনি ভাবলেন কী করে যে আপনি আসতে বললেই আমি চলে আসবো?”
“তা তো ভাবিনি, রঙ্গবতী। শুধু আমি মনেপ্রাণে চেয়েছি তুমি আসো। শুনেছি মন থেকে চাইলে নাকি পুরো কায়নাত সেই জিনিসটা তোমাকে পাইয়ে দেওয়ার কাজে লেগে পড়ে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। হতে পারে কাল তুমি আসোনি, কিন্তু আজ তো এসেছো, তাই না? আমি আশা ছেড়ে দিয়ে আজ না এলে তোমার দেখা পেতাম না।”
আলতা তার কথাগুলো শুনে রাগী চোখে তাকালো, “আপনি আমাকে দেখতে চাইলেও আমি আপনাকে দেখতে চাই না, বুঝলেন? আমাদের আর দেখা না হলে ভালো হবে।”
মুহূর্তেই শ্রেয়ানের চেহারার চপল ভাবটা উধাও হয়ে গেল! মুখশ্রী বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে এল। তার এই হঠাৎ বদলে যাওয়া থমথমে অভিব্যক্তি দেখে আলতার বুকের ভেতরটা ভয়ে কেঁপে উঠল। সে আর কথা না বাড়িয়ে তড়িঘড়ি মাটিতে ঝুঁকে ফল কুড়াতে শুরু করল। শ্রেয়ান কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। অতঃপর সেও আলতাকে ফল কুড়োতে সাহায্য করতে লাগল।
“তুমি কি সত্যিই চাও আমাদের আর দেখা না হোক?” ফল তুলে দিতে দিতেই আবার প্রশ্ন ছুড়ল শ্রেয়ান।
আলতা উত্তর দিল না। এমন পরিস্থিতিতে এই অচেনা পুরুষটিকে চটিয়ে দেওয়া মোটেও নিরাপদ হবে না।
শ্রেয়ান শেষ মুসাম্বিটা আলতার ঝুড়িতে রেখে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ভারী গলায় বলল, “বেশ, আমি আগামীকালও তোমার অপেক্ষায় থাকবো। তুমি নিজেই ঠিক করবে আমাদের আর দেখা হবে কী না।”
কথাটা বলেই শ্রেয়ান উঠে চলে গেল। আলতা মৌন হয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর মাথা থেকে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলে ঝুড়িভর্তি ফল নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো।
দুপুরের দিকে মুবিনের জ্বর কিছুটা কমলো। আলতা একটি কাঁসার থালায় গরম ভাত আর তরকারি বেড়ে এনে ভাইয়ের সামনে রাখল। মৃদুস্বরে বলল, “কালুকে আর কখনো ভরসা কোরো না, ভাইয়া।”
মুবিন থালায় হাত দেওয়ার জন্য পানি দিয়ে হাত ধুচ্ছিল। আলতার মুখে এমন কথা শুনে চমকে উঠে মুখ তুলে তাকাল, “কেন? ও কি তোকে কিছু বলেছে? কী বলেছে ও? এত বড় সাহস! ওকে তো আমি মেরেই ফেলব!”
মুবিন ধড়ফড়িয়ে তক্তপোশ থেকে উঠে দাঁড়াতে উদ্যত হতেই আলতা হাত নেড়ে বলে উঠল, “আরে না না! আমাকে কিছুই বলেনি ভাইয়া! বলছিলাম ও একটা অকর্মার ঢেকি। তুমি ওকে বিশ্বাস করে বাগানের দায়িত্ব দিয়ে এলে, অথচ আমি সকালে বাগানে গিয়ে ওর টিকিটাও খুঁজে পাইনি।”
“তুই বাগানে গিয়েছিলি কেন?”
আলতা মৃদুস্বরে বলল, “সকালে কাকি পাঠিয়েছিলেন তোমার জন্য ফল আনতে।”
“আমি বাগানে নেই এটা জানার পরেও একা একা কেন গেলি?”
“উফফ ভাইয়া, আমি ভেবেছিলাম কালু আছে। তাই সাহস করে গিয়েছিলাম।”
মুবিন আলতার দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বলল, “আর যাবি না!”
আলতা কোনো পাল্টা প্রশ্ন করল না। কেন যেতে পারবে না, বা কী কারণ—তা জানতে চাওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করল না। সে খুব ভালো করেই জানে, তার ভাইয়া যা-ই করে বা বলে, তা সবসময় তার ভালোর জন্যই বলে। হ্যাঁ… একশ বার ভালোর জন্যই বলে!
ব্যালকনির কাঠের বেঞ্চে বসে থাকা ষোড়শী আলতার চোখের কোণ দুটো টলমল করে উঠল। নিমেষের মধ্যে বাঁধ ভাঙা নোনাজলের অবিরল ধারা তার ফর্সা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল। অতীতের স্মৃতিতে ঘেরা প্রকোষ্ঠটি জোর করে বন্ধ করে দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে অঝোরে অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগল সে।
বুকের ওপরে কেউ যেন পাথর চাপিয়ে দিয়েছে। পিষে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছে হৃৎযন্ত্রটা। সেই রাতটা তার জীবনের সবচেয়ে যন্ত্রণাময় ও দীর্ঘতম রাত ছিল। আলতা শ্রেয়ানের সাথে দেখা করতে যায়নি, কারণ সে উঠে দাঁড়ানোর মতো অবস্থাতেও ছিল না। গ্রামের শেষ সীমানার এক পরিত্যক্ত ঘন জঙ্গলের কাঁটাঝোপের মধ্যে থেকে সংজ্ঞাহীন, রক্তাক্ত আর নিথর অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল তাকে।
ফোঁপাতে ফোপাঁতে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম হলো আলতার। বুকের বাঁ পাশটা খামচে ধরে সে আকুতি করল, “আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, খোদা! কী করবো আমি? কী করবো? কী করলে এই অসহনীয় যন্ত্রণা থেকে নিস্তার পাবো? আমি চাই না, আমি চাই না এমন জীবন। যে জীবনের প্রত্যেকটা মুহূর্ত মৃত্যুর মতো যন্ত্রণাদায়ক।”
কিশোরীর আকুল প্রশ্নটা রাতের অন্ধকারের বুক চিরে শূন্যেই মিলিয়ে গেল, কোনো উত্তর এল না। আলতার বুকের ভেতরের যন্ত্রণা একটুও লাঘব হলো না; বরং সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আরও বিশ্রীভাবে ক্ষতবিক্ষত হতে লাগল তার হৃদয়।
***
দ্য ফল্টে নিজের প্রাইভেট কমব্যাটে ঢুকে দরজা লক করে দিয়েছে রঞ্জক। দ্য ফল্টে আন্ডারগ্রাউন্ড বক্সিং লড়তে আসা হেভিওয়েট ফাইটারদের প্রত্যেকের জন্যই আলাদা আলাদা প্রাইভেট কমব্যাট বরাদ্দ আছে। এই কমব্যাটে ঢোকার জন্যও রয়েছে আলাদা আলাদা রাস্তা।
রঞ্জক ঘরের আলো জ্বালায়নি, চারপাশটা একবার তীক্ষ্ণ চোখে পরখ করে পকেট থেকে ফোন বের করে ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে নিল। সে নিশ্চিত এই ঘরে হিডেন ক্যামেরা আছে। তাকে সেই ক্যামেরা খুঁজে বের করতে হবে।
কঙ্কা ব্ল্যাকমেইল করার পর সে আর এই ঘরে আসেনি। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? তাকে রিংয়ে ফিরতে হবে। আসন্ন নির্বাচনের প্রচারাভিযানে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে, সেগুলোও তো জোগাড় করতে হবে। যদিও দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর পার্টি ফান্ড থেকে মোটা অঙ্কের আর্থিক সহায়তা পাবে সে, কিন্তু তা মোটেও যথেষ্ট নয়। রঞ্জককে আরও বড় পরিসরে খেলায় নামতে হবে; কারণ নির্বাচনের মাঠে তার প্রতিপক্ষ কোনো সাধারণ বা দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং বহু বছরের অভিজ্ঞ ও শক্তিশালী এক চতুর খেলোয়াড়।
রাজনীতির ময়দানে রঞ্জক নিজেও নতুন বা অপরিচিত মুখ নয়। অ্যাল্টানিয়ার মানুষজন তাকে ভালোভাবে চেনে। উঁহু, অ্যাল্টানিয়ার প্রখ্যাত শিল্পপতি আরিজ মাহতাবিরের ছোট ছেলে হিসেবে নয়! কেবল ‘রঞ্জক’—এই একক পরিচয়েই জনসাধারণের কাছে সে অতি পরিচিত মুখ। তাদের চোখে সে একজন সৎ, আপোসহীন ও মানবতাবাদী তরুণ নেতা।
খুব অল্প বয়সেই রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েছিল রঞ্জক; তারপর কালক্রমে এটা তার রক্তে মিশে এক মারাত্মক নেশায় পরিণত হয়েছে। কর্পোরেট ক্যারিয়ার ও আন্ডারগ্রাউন্ড বক্সিং তার পেশা হতে পারে, কিন্তু রাজনীতি? সেটা রঞ্জকের নেশা; এমন এক তীব্র, ভয়াবহ নেশা, যা তাকে আর তার মস্তিষ্ককে পুরোপুরি বশীভূত করে রেখেছে!
রঞ্জক ফোনের আলোটা উঁচু করে ধরে ধীরপায়ে এগোলো ঘরের ভ্যানিটি কাউন্টারের দিকে। টেবিলের ওপর সাজিয়ে রাখা প্রসাধনী আর জিনিসপত্রগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে সে কাউন্টারের আয়নাটার দিকে তাকাল। বড় আকৃতির আয়নাটার ওপর চোখ পড়তেই দৃষ্টি সরু হয়ে এলো তার।
ফোনের ফ্ল্যাশের আলোছায়ার খেলায় আয়নায় ভেসে ওঠা তার নিজস্ব প্রতিচ্ছবিটা কেমন যেন রহস্যময় দেখাচ্ছে। চশমার কাচের আড়ালে থাকা তার ধূসর চোখ জোড়া আয়নায় প্রতিফলিত আলোর ছটায় অতিরিক্ত মাত্রায় স্বচ্ছ আর উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আয়নার সমতল উপরিভাগটা ছুঁয়ে আঙুল দিয়ে কিছু একটা সূক্ষ্মভাবে পরীক্ষা করতে শুরু করল সে। কয়েক মুহূর্তেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার।
চোখের পলকে কাউন্টার থেকে আয়নাটা টেনে তুলে সজোরে ফ্লোরে আছড়ে মারল সে! বিকট শব্দে আয়নাটা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ঘরজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল।
বেশ কিছুক্ষণ অন্ধকারাচ্ছন্ন ঘরে নিস্প্রভ দাঁড়িয়ে রইল রঞ্জক। অতঃপর ঘরের মূল আলোটা জ্বালিয়ে দিয়ে ঢুকে গেল ওয়াশরুমে। চোখমুখে পানি ছিটিয়ে ফিরে এলো সে। শান্ত ভঙ্গিতে একটা পলিব্যাগ হাতে ফ্লোরের কাছাকাছি ঝুঁকে পড়ে ভাঙা কাচের টুকরোগুলো তুলতে লাগল সে।
মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল একটাই প্রশ্ন কঙ্কা এই ঘরের চাবি পেলো কোত্থেকে? এটা নিশ্চিত যে, রঞ্জকের অনুপস্থিতিতে কঙ্কাই এই ঘরে ঢুকে সাধারণ আয়নাটা বদলে ক্যামেরাযুক্ত টু-ওয়ে স্পাই গ্লাস বসিয়ে দিয়ে গিয়েছিল!
ভাবতে ভাবতেই রঞ্জক ফ্লোর পরিষ্কার করে বক্সিং ম্যাচের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল। আয়না না থাকায় সে এবার ফোনের ফ্রন্ট ক্যামেরা অন করে পুরো চেহারায় আর্ট করে নিল। চোখের মণি দুটিতে পরে নিল গাঢ় লাল রঙের বিশেষ লেন্স; যদিও এই লাল রঙটা তার কালারব্লাইন্ড দৃষ্টিতে স্রেফ গাঢ় বাদামি হিসেবেই ধরা দিচ্ছে! দোকানদার বলে দিয়েছে এটাই লাল রঙ। পরিচয় আড়াল করতে রঞ্জক রিংয়ে ওঠার আগে প্রায়শই চোখে নানা রঙের রঙিন লেন্স ব্যবহার করে থাকে, যাতে প্রতিপক্ষ বা দর্শক তার চোখের আসল রঙ ধরতে না পারে।
রঞ্জক আজ রিংয়ে নামবে এটা ঘোষণা হওয়া মাত্রই রিংসাইডে বসে থাকা দর্শকবৃন্দ উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল। উত্তাল জনতার ভিড়ে একদম সামনের সারিতে চুপচাপ বসে ছিল ফারিশ। যেদিন রঞ্জক রাত দশটার মধ্যে বাড়িতে না ফেরে সেদিনই সে আসে এখানে। রঞ্জককে ফাইট করতে দেখাটা প্রচণ্ড রোমাঞ্চকর ও উপভোগ্য। সেও দারুণ উপভোগ করে। রঞ্জকই যে রিংয়ে রাউডি পরিচয়ে লড়তে নামে; তা শুধু ফারিশ নয়, মাহতাবির পরিবারের প্রায় প্রতিটি সদস্যই খুব ভালোভাবে জানে!
আজকের রোমাঞ্চকর লড়াই দুটো রাউন্ডেই শেষ হয়ে গেল। যথারীতি প্রতিবারের মতো বিজয়ের মুকুট পরল ‘রাউডি’। গ্যালারি জুড়ে করতালির শব্দে মুখর হয়ে উঠল। এরপর রঞ্জক নিজের প্রাইভেট কমব্যাটে ঢুকে ড্রেস চেঞ্জ করে বাড়িতে ফিরে এলো।
পুবের আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। রঞ্জক বাথরুমে ঢুকে একটা রিফ্রেশিং শাওয়ার নিয়ে আরামদায়ক স্লিপিং পায়জামা-স্যুট পরল। তারপর মাছেদের খাবার দিলো।
জুবার জন্য ফলের টুকরো কাটতে কাটতে চাপাস্বরে বলল, “তোমার মায়ের খুব বাড় বেড়েছে জুবা। আজ আমি ওকে আচ্ছা মতো একটা শিক্ষা দেবো।”
জুবা খাঁচার ভেতরেই উসখুস করে ডেকে উঠল, “জুবা! আলতা!”
রঞ্জক হালকা হেসে জুবার দিকে নজর ফেরাল। অমনি ডানা ঝাপটে পাখিটা অস্পষ্ট স্বরে চেঁচিয়ে বলল, “জুবা আলতা যাবে!”
তৎক্ষণাৎ কপালে ভাঁজ পড়ল রঞ্জকের। ফল কাটায় মনোযোগ দিয়ে বলল, “একটু হেসেছি বলে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখো না। আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেবো না।”
জুবা কর্কশ গলায় বলল, “পচা লোক! বাজে লোক!”
রঞ্জক ভ্রূ উঁচিয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল, “তোমার হয়তো আজকে খাবার খাওয়ার ইচ্ছা নেই, তাই না? ঠিক আছে, কোনো ব্যাপার না। এগুলো আমি ফেলে দিচ্ছি। ডাস্টবিনে থাকা পিঁপড়ে গুলো খেয়ে নেবে।”
রঞ্জক ডাস্টবিনের দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই জুবা অস্থির হয়ে খাঁচার মধ্যে ডানা ঝাপটাতে লাগল, “খাবে! জুবা খাবে!”
রঞ্জক একটা ফলের টুকরো নিজের মুখে পুড়ে বলল, “আহা, কী মিষ্টি! কী মিষ্টি! কেউ যদি খেতে চায় আমার নাম ধরে ডাকুক।”
জুবা অবুঝের মতো উচ্চস্বরে ডেকে উঠল, “বাপ! বাপ!”
আচমকা এই অপ্রত্যাশিত ডাকে রঞ্জক খুক খুক করে কেশে উঠল। তড়িঘড়ি গ্লাসে পানি ঢেলে পুরোটা পানি এক চুমুকে গিলে নিল সে। বড়বড় চোখে জুবার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি এটা এখনো ভোলোনি?”
প্লেটটা সরিয়ে রেখে রঞ্জক জুবার খাঁচাটা দুহাতে এগিয়ে এনে বলল, “শোনো জুবা, আমার নাম ‘বাপ’ ন…”
বাক্যটা সম্পূর্ণ করার সুযোগ দিল না জুবা! গলা আরও উঁচুতে চড়িয়ে আবার জপতে শুরু করল, “বাপ! বাপ! বাপ!”
রঞ্জক হড়বড়িয়ে গেল, “ঘাট হয়েছে আমার! হিশশ! হিশশ! চুপ করো। আর ডাকতে হবে না।”
জুবার মুখ বন্ধ হতেই রঞ্জক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তোয়ালে দিয়ে হাতটা মুছে ফলের প্লেটটা সাবধানে খাঁচার ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।
চলবে…
(আপনারা যদি ৫ হাজার লাইক করার চেষ্টা করেন তাহলে আমিও পরবর্তী পর্বটা আগামীকাল দেওয়ার চেষ্টা করবো। না হলেও সমস্যা নেই, এখনকার নিয়মেই পরের পর্বটা পেয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।)
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭২
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৬
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭১