Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৯.খ


কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৯.খ

#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি

বউ-ভাত শেষ। বাড়িও ফাঁকা। স্যুট-কোট পরা অয়ন একটু তাড়াহুড়ো করল সবেতে। যেহেতু আগেই সব কিছু বুক করে রাখা, বাড়ির কারো গাইগুইয়েরও কোনো সুযোগ নেই। মেহমানরা খেয়েদেয়ে বিদায় নিয়ে যাওয়ার পরপরই ইউশাকে তৈরি হতে ঘরে পাঠিয়ে দিলো ও। রিসেপশনের খুব ভারি শাড়ি-গয়না, সাজ তুলে ফ্লাইটের জন্যে প্রস্তুতি নিতে যাতে দেরি নাহয়। অয়ন ফিরল সব সামলে। সন্ধ্যে নেমেছে তখন। ভেবেছিল, ইউশা হয়তো তৈরিই। কিন্তু তাজ্জব হলো রুমে এসে। মেয়েটা শাড়ি পরেছে। শাড়ি পরে ফ্লাইটে উঠবে?

অয়ন চ-সূচক শব্দ করে বলল,

“আবার শাড়ি? এজন্যে তোকে আগে আগে তৈরি হতে পাঠালাম?”

ইউশা বোকার মতো বলল,

“তা-তাহলে কী পরব?”

“কী পরবি মানে! কতগুলো ওয়ান পিস এনে দিলাম না!”

ইউশা স্বলজ্জে জানাল,

“অয়ন ভাই, আমি তো ওসব পরি না। আর মাও দেখলে খুব বকবে। জানোই তো মা কত কনজারভেটিভ!”

অয়ন নীরস শ্বাস ফেলে বলল,

“আচ্ছা৷ তাহলে যা, আপাতত শাড়ি পালটে আয়।”

ইউশা বড্ড বিব্রত হয়ে পড়ল। শাড়িতে কি ওকে খুব বাজে লাগছে? জিজ্ঞেস করল মিনমিনিয়ে,

“ভালো লাগছে না শাড়িতে?”

“লাগবে না কেন, দেখতে সুন্দর হলে সবেতেই ভালো লাগে!”

মেয়েটা অবাক হয়ে বলল,

“আমি দেখতে সুন্দর?”

“তবে কি অসুন্দর!”

ইউশা চিবুক নুইয়ে বলল,

“তুমি কখনো বলোনি তো। আজ শুনে কেমন যেন লাগল আরকি!”

অয়নের চোখমুখ শান্ত হয়ে গেল। পরপরই মৃদু হেসে এক পা এগিয়ে এসে ওর নিচু চিবুক তুলল আঙুলে। সংকোচশূন্য ভাষায় বলল,

“তাহলে আজ বলছি, দিস লিটল চেরি ইজ অলওয়েজ বিউটিফুল!”

ইউশার পেটের খাঁজে খাঁজে শত শত প্রজাপতি ঝাঁক বেঁধে উড়ে গেল বোধহয়। গাঢ় কুণ্ঠায় হাতের তালুসহ ঘামল আরেক চোট। কী করবে, কোথায় তাকাবে! অয়ন ফের হেসে বলল,

“লজ্জা পাওয়া শেষ হলে যান, চেঞ্জ করে আসুন। ফ্লাইট আমাদের জন্যে বসে থাকবে না।”

****

ইউশা খুঁজে খুঁজে একটা হাঁটুর নিচ অবধি লং ফ্রক, আর জিন্স পরল। ওড়না ছাড়া ও চলতে পারবে না। তাই একটা শিফনের স্কার্ফ দু প্যাঁচ দিয়ে ঝোলাল গলায়। সামনে এসে দাঁড়াতেই অয়ন আপাদমস্তক দেখে বলল,

“পারফেক্ট, চল…!”

দুটো লাগেজই দুই হাতে টেনে নিয়ে বেরিয়ে গেল অয়ন। ইউশা পিছু আসতে আসতে বলল,

“একটা আমাকে দাও না।”

“তুই নিজেকে সামলে হাঁট। এটুকু ক্যারি করার মতো জোর আমার গায়ে আছে।”

আর কিছু বলল না ইউশা।

নিচে সবাই ওদের অপেক্ষাতেই বসে। বের হবে এখন, জানে সকলে। একে একে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে, বাড়ির গাড়িতে করে বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল দুজন।

তুশি একটা লম্বা হাই তুলল। কদিন এত ঘুম ক্ষেপেছে কেন কে জানে! ঘরে যাওয়ার জন্যে আসর ছেড়ে উঠতেই পিছু নিলেন রেহণূমা। দোতলায়, ঠিক তুশির কামরায় ঢোকার আগমুহূর্তে ডেকে বললেন,

“শোন তুশি!”

তুশি ঘুরে চাইল।

“হ্যাঁ, কী?”

রেহণূমা মেয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। চোখেমুখে বিশদ অস্বস্তি নিয়ে বললেন,

“তোকে একটা কথা বলি?”

ঘাড় নাড়ল তুশি।

“অয়নের সামনে তুই এত সাজগোজ করবি না। ওর সাথে কথাবার্তাও কম বলবি।”

তুশি আশ্চর্য হয়ে বলল,

“দরকার ছাড়া তো কথাই বলি না। আর কোথায় সাজলাম আমি? ইউশা ওর সাথে পার্লারে যেতে বলেছিল, যাইনি। বড়ো মা শাড়ি পরতে বলল, তাও পরিনি। চোখে এক ফোঁটা কাজল অবধি দিইনি আজ। তাহলে?”

রেহণূমা মেয়ের দুই বাহু ধরে বললেন,

“খারাপ ভাবিস না, মা! দ্যাখ, অয়ন তোকে পছন্দ করত, তোর প্রতি ওর একটু হলেও দুর্বলতা থাকবেই। তুই যদি ওর সামনে পরিপাটি হয়ে ঘুরিস, ও ইউশাতে মন দিতে পারবে না। বলতে খারাপ লাগলেও তো সত্যি, ইউশার চেয়ে তোকে দেখতে সুন্দর।”

তুশি হেসে ফেলল।

“মা, যার ভালোবাসার সে এমনিই বাসবে। রূপ দিয়ে কি কাউকে আটকানো যায়? যদি আমার রূপেই সব হতো, তাহলে তোমাদের ছেলে প্রথম দেখেই আমাকে ভালোবাসত না?

বেসেছে? কত কাঠখড় পুড়িয়ে আমি ওনাকে পেয়েছি, আমি জানি! অয়ন ভাইয়ের যদি ইউশার ওপর মন আসারই হয়, সেটা আমি সামনে থাকি না থাকি তাতে কিচ্ছু এসে যায় না। আর আমার মনে হয় না, আমার প্রতি দুর্বলতা রেখে উনি ইউশার সাথে ঘর বাঁধবেন। উনি আদৌ এতটা চরিত্রহীন নন!

“ তা ঠিক…! কিন্তু…”

তুশি একটু চটে গেল, বলল,

“কিন্তু কী? উনি বাড়িতে থাকলে ঘর থেকে বের হব না, তাহলে খুশি হবে?”

“তা কখন বললাম?”

“বলোনি, বুঝিয়েছ। অয়ন ভাইকে নিয়ে আমার সাথে কখনো কোনো আলোচনা করো না তো,

আমার খুব বিশ্রী লাগে!”

“আচ্ছা আচ্ছা, মাথা ঠান্ডা কর। অল্পতেই এত রেগে গেলি কেন? সার্থ ফোন-টোন করেনি?”

তুশির সঠিক রোগ ধরা পড়ল। রাগে লাল মুখটা ফানুসের মতো হয়ে এলো অমনি। মন খারাপ করে বলল,

“উহু।”

রেহণূমা মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“আহা থাক, মন খারাপ করিস না। এটা ওর অভ্যাস। জটিল কেস নিলেই লাপাত্তা হয়ে যায়। এক সপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসবে!”

“এক সপ্তাহ!”

তুশির নিঃশ্বাস যেন বুকে আটকে পড়ল। একটা সপ্তাহ ওই মানুষটাকে ছাড়া থাকতে হবে ওর? তাকে না দেখে, তার গায়ের সুবাস না পেয়ে ঘুমাতে হবে রাতে?

তুশি মলিন মুখে ঘরের ভেতর এলেও, ওর সেই ঘুম আর এলো না। বরং ভেতরটা ফুলেফেঁপে উঠল বিষণ্ণতায়। কাল রাত ওর খুব কষ্টে কেটেছে। হাতের ডান পাশটা খালি! কতবার হাত গিয়েছে ভুলে। সার্থকে জড়িয়ে ধরতে যাওয়া বাহু ফেরত এসেছে বারবার। স্বামীর আদরে আদরে নিশি পার হয়নি। কাল কোথাও তার ছোঁয়া ছিল না। বিষাদে তুশির ঘুম হয়নি, একটুও না।

বারান্দায় সার্থর টিশার্ট আর ট্রাউজার নেড়ে রাখা। তুশি তুলে আনল। বসে বসে একেকটা বুকের কাছে চেপে ধরে রইল অনেক সময়। পুরুষালি গায়ের গন্ধ নেওয়ার এক ব্যর্থ চেষ্টার সঙ্গে, যেন অনুভব করল স্বামীকে।

চোখদুটো ভিজে উঠল অমনি। কী আশ্চর্য, ও না একজন পুলিশ অফিসারের স্ত্রী? মানুষটা তো দেশের কাজেই গিয়েছেন। ও তাহলে এমন ন্যাকামো করছে কেন? কেন এক রাতের বিরহেই এমন কাতরাচ্ছে যেন এ এক শতাব্দির বিরহ!

তুশি চোখ মুছে মন শক্ত করল। কাপড়গুলো কাবার্ডে রাখার জন্যে এক পাশ টানতেই দেখল ইউনিফর্ম রাখার শেলফটা বেঁকে আছে একটু। কাল তাড়াহুড়োয় সার্থ বোধহয় ঠিক করে লাগায়নি। তুশি ঠিক করতে গিয়ে বুঝল, ভীষণ শক্ত এটা। একটু জোর দিয়ে চাপ দিতেই, ভেতরের পাল্লাটা খট করে সরে গেল অমনি। সঙ্গে সঙ্গে একটা নরম জিনিস তুশির হাতের ওপর পড়ল এসে। একটা শিফনের ওড়না। তুশি হতবিহ্বল বনে বলল,

“এটা তো, এটা তো আমার ওড়না।”

সেদিন যখন সার্থর এক্সিডেন্ট হলো, তুশি এলো ওষুধ লাগাতে…

মানুষটা কী একটা কথার জের ধরে টেনেহিঁচড়ে ওকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছিল। ওড়নাটা ঘরেই ফেলে গিয়েছিল তুশি। সেই ওড়না উনি তুলে রেখেছিলেন? মেয়েটা জানে সার্থ ওকে ভালোবাসে। কিন্তু এসব তো জানত না। ওড়নায় রক্ত থাকার কথা, তাওনেই। ধোয়া, পরিষ্কার। আসমা ধুলে ওকে দিয়ে আসত। এর মানে উনি নিজেই এটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন? তুশির সব বিষাদ উবে যায়। ভালো লাগার তৃপ্তিতে বুকের পাঁজরে এক খণ্ড বরফ এসে বসে। মুচকি হেসে, বিড়বিড় করে বলে,

“বিটকেল!”

পরপরই তুশির গলা-বুক জ্বালিয়ে কান্না উথলে এলো। এখন সার্থ থাকলে ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরতে পারত। কিংবা একটা কল করে তার কণ্ঠ শুনতে পারত! ইস, কিচ্ছু হচ্ছে না। ওড়না গুছিয়ে আগের জায়গায় রেখে দিলো ও। সব ঠিকঠাক করে আলমারি লাগানোর মাঝেই, চেহারা পালটে গেল আচমকা। অমনি মুখ চেপে ওয়াশরুমে ছুটে গেল তুশি। বেসিনে ঝুঁকতেই, বমি করে ভাসিয়ে দিলো সব।

***

বিমানবন্দরের কাঁচের দরজা পেরিয়ে প্রথমবার বিদেশের বাতাস গায়ে লাগতেই শরীরটা ঝাঁকুনি দিলো ইউশার। এক অন্যরকম রোমাঞ্চকর অনুভূতিতে তলিয়ে গেল যেন। চারপাশে অচেনা ভাষার গুঞ্জন, ঝকঝকে আলো, বিশাল ছাদের নিচে ব্যস্ত মানুষের ঢেউ, সবকিছুই যে সিনেমার দৃশ্যের মতো। ইউশা চোখ বড়ো বড়ো করে একবার ডানে, একবার বাঁয়ে দেখছিল।

সাদা মার্বেলের মেঝেতে লাগেজের চাকাগুলো টুংটাং শব্দ তুলে ছুটছে। কোথাও পর্যটকদের হাসি, কোথাও ক্লান্ত মুখ, কোথাও আবার ফ্লাইট ধরার তাড়াহুড়ো। ইউশা ধীরে ধীরে কাঁচের দেয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। অয়ন তখন এয়ারপোর্টের নিয়মকানুন সারছে। বাইরে এখন বেশ রাত। সারি সারি আলোয় ভিজেছে ব্যাংকক শহর! অথচ ইউশার মুগ্ধতায় যেন চোখ জুড়িয়ে গেল। ভাগ্যিস ওর ভিসা-পাসপোর্ট বাবা করিয়েছিলেন। নাহলে আজ এই ট্যুর মিস হতো না?

এয়ারপোর্টের পাশেই বড়ো বড়ো শপিংমল।

কত কী সেথায়! চকলেটস, পুতুল, খাবার-দাবারের সাথে সুন্দর সুন্দর জামাকাপড় দিয়ে ভরা। কিন্তু ইউশার চোখ আটকাল রং-বেরঙের টেডিতে। বাচ্চাসুলভ মনে লোভও হলো একটু। এই জিনিসে তার বিশদ দুর্বলতা! কিন্তু, অয়ন ভাইকে মুখ ফুটে বলবে কেমন করে? একুশ বছরের মেয়ে তো সবার চোখে বুড়ির সমান। সেই মেয়ে টেডি টেডি করলে কী ভাববে অয়ন ভাই? ইউশা জানে অয়ন আগে আগে হাঁটছিল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফেরার জন্যে সামনে তাকাতেই ভড়কে গেল একটু। পাশেই দাঁড়িয়ে মানুষটা। ও তাকাতেই ভ্রু নাচিয়ে বলল,

“চাই?”

এক ঝুড়ি তারার মতো আলো ইউশার চেহারায় ভেসে উঠল। খুশি হয়ে বলল,

“ কিনে দেবে অয়ন ভাই?”

অয়ন সোজা গিয়ে সেই মলের ভেতর ঢুকল। জিজ্ঞেস করল,

“কোনটা পছন্দ?”

ইউশার বেছে বেছে মাঝারি আকারের পান্ডা ধরল । কোলে নিয়ে ঘুরল এপাশ-ওপাশ।

অয়ন খেয়াল করল, ইউশাকে ভীষণ ফুরফুরে লাগছে। ঠিক সেই আগের ইউশা যেন। তক্ষুনি মেয়েটা পাশে এসে শুধাল,

“অয়ন ভাই, ওই হ্যাটটা নেব?”

“যা ভালো লাগে নে।”

ইউশা চপল পায়ে এগিয়ে যায়। যা ভালো লাগে তাই নে বললেও, শুধু চারকোণা টুপিটাই তোলে হাতে। তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মাথায় পরে পরোখ করে নিজেকে। স্ফূর্ত মেয়েটাকে দেখে অয়নের এত ভালো লাগছিল কেন কে জানে! বোধ হয় শেষ অনেকদিন ওকে এত হাসতে দেখেনি বলে। অয়নের হঠাৎ করেই মাথায় এলো তুশির করা সেই প্রশ্নটা,

“ আর ইউশার হাসি কেমন লাগে আপনার?”

সেদিন অয়ন স্পষ্ট উত্তর দিতে না পারলেও,আজ বিড়বিড় করল আনমনে,

“ স্নিগ্ধ,খুব স্নিগ্ধ!”

ওর চেয়ে থাকার মাঝে,

কাউন্টারের মেয়েটি শুধালেন,

“এনিথিং এলস ফর ইয়র সিস্টার, স্যার?”

চকিতে ঘাড় ফেরাল অয়ন। ভ্রু কুঁচকে কার্ডটা ছিনিয়ে নিলো যেন। থমথমে গলায় বলল,

“শি ইজ মাই ওয়াইফ!”

এরপর মল থেকে বেরিয়ে এলো ওরা। গ্রাউন্ড ফ্লোরের চকচকে মেঝেতে হাঁটতে হাঁটতে ইউশা বলল,

“অয়ন ভাই, একটা কথা বলব?”

অয়নের মুখে হাসি নেই।

“বল।”

“আমি দেখেছি ব্যাংককের কিছু সুইটস খুব ভালো হয়। ডায়াবেটিস হলেও খাওয়া যায়। দিদুনের জন্যে নেব হ্যাঁ?”

“হুউউউ।”

“আর অয়ন ভাই, মিন্তুর জন্যেও নেবো। ছোচাটাও তো পছন্দ করে।”

“হুউউউউ!”

এস্কেলেটরে পা রাখল ওরা। অয়ন সামনে, ইউশা এক সিঁড়ি নিচে। এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে ওর নজর পড়ল অদূরে। আইস্ক্রিমের ভ্যান। অমনি পেছন থেকে অয়নের শার্ট টেনে বলল,

“অয়ন ভাই দেখো দেখো আইসক্রিম…”

অয়ন চোখ বুজে শ্বাস ফেলল। তাকাল না তবে!

ইউশা বলল,

“অয়ন ভাই, শুনছো?

শোনো না অয়ন ভাই!”

ছেলেটা অতিষ্ঠ চোখে ফিরল। খ্যাক করে বলল,

“আর ভাই ভাই করিস না ইউশা, হানিমুনে যাচ্ছি।”

আকাশ থেকে পড়ল ইউশা। চেয়ে রইল হতভম্ব চোখে। এস্কেলেটর থেকে নামতেই অয়ন ভীষণ গুরুতর হয়ে বলল,

“আমাদের বিয়ে হয়নি? ভুলে যাচ্ছিস কেন আমি তোর স্বামী, স্বামীকে ভাই ডাকে কে?”

ইউশা মাথা নুইয়ে বলল,

“আচ্ছা আর ডাকব না।”

“কী ডাকবি তাহলে?”

“তুমি যা বলবে!”

অয়ন কপাল চুলকে ভাবল দু সেকেন্ড। বলল,

“নাম ধরে ডাকিস।”

মেয়েটা বিরোধাভাস করল নিচু স্বরে,

“কিন্তু, তুমি আমার নয় বছরের বড়ো। নাম ডাকলে বেয়াদবি হবে না?”

“হলে হবে। নিজের বরের সাথে বেয়াদবি করছিস অন্য কারো সাথে তো আর করতে যাচ্ছিস না। বলেছি নাম ডাকতে, নাম ডাকবি।”

“আচ্ছা।”

“এখন একবার ট্রাই কর। বল, অয়ন আমাকে একটা আইসক্রিম কিনে দাও।”

ইউশার চোখ কপালে।

“হ্যাঁ?”

অয়নের তপ্ত চোখমুখ দেখে মেয়েটা আর সময় নিলো না। খুব লজ্জা লাগলেও বলল,

“অয়ন, আমাকে একটা আইসক্রিম কিনে দাও।”

অয়ন ঠোঁট চেপে হাসল। হাত ধরে টান মেরে বলল,

“আয়। কিনে দিই!”

কিন্তু ইউশা নড়ল না। গেড়ে থাকতে দেখে ও দাঁড়াল আবার,

“কী হলো?”

ইউশা ভ্রু কুঁচকে বলল,

“আমাদের বিয়ে হয়নি? ভুলে যাচ্ছো কেন আমি তোমার বউ, বউকে তুই-তোকারি করে কে?”

অয়ন তাজ্জব, স্তব্ধ। দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,

“আমার তির আমার ওপর?”

“আগে তুমি আমাকে তুমি করে বলো, এরপর আমি নাম ধরে ডাকব। আর যদি না পারো, তাহলে যেমন আছি তেমনই থাক।”

“কোনো দরকার নেই।

চলো ইউশা, তোমাকে আইসক্রিম কিনে দিচ্ছি।”

ইউশা হতাশ, সাথে বিস্মিত। অয়ন ভাই কত তাড়াতাড়ি কথা পালটে ফেলল। বাবা, মানুষ না স্পিডবোট?

**

হোটেল থেকে SUV এসেছে। এখানে থেকে ওদের গন্তব্য সোজা পাটায়ার সমুদ্রসৈকত।

সেখানকার একটা বিলাসবহুল হোটেলরুম বুক করেছে অয়ন। ইউশা SUV-য়ে বসে বসে ব্যাংককের রাত মুগ্ধ হয়ে দেখছিল। জানলার বাইরে থেকে চোখ যেন সরে না। খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল

“আল্লাহর সৃষ্টি কত সুন্দর! উফ, বাড়ির সবাই যদি থাকত না। মিন্তুটা তো লাফিয়ে বেড়াতো। আর তুশি, তুশি দেখলে পাগল হয়ে যেত। খুশিতে চ্যাঁচিয়ে চ্যাঁচিয়ে বলত,

‘ও মাই গড, হোয়াট আ জায়গা! ডোন্ট সি বিফোর।’”

কথাটা বলে নিজেই হাসল ইউশা। হাসতে হাসতেই মুখ কালো হয়ে গেল। ঝটপট ফিরল অয়নের দিকে। তুশির নাম তোলায় অয়নের খারাপ লাগল কী? কিন্তু দেখল অয়ন ট্যাব মেলে বসেছে। ম্যাপে জায়গা মেলাচ্ছিল। চোখেমুখে বদল নেই। বরং ও তাকাতেই স্ক্রিন এগিয়ে বলল,

“এটা দ্যাখ, এখানকার 26th ফ্লোরে থাকব আমরা। সি-ভিউ থাকবে। নাইস না?”

ইউশা আরো অবাক হয়। চোখে বিস্ময় নিয়ে চেয়ে রয় শুধু। অয়ন ভাই কিছু বলল না, প্রতিক্রিয়াও দেখাল না? উনি তবে স্বাভাবিক হতে পারছেন?

****

তুশির চোখদুটো এই সবে সবে বন্ধ হয়েছে, অল্প ঘুম জেঁকেছে চোখে। এর মাঝে রাতের নিশ্চুপতা চিরেখুঁড়ে ওর মুঠোফোন বাজল। রিংটোনের তারস্বরে হকচকিয়ে উঠল বেচারি। স্ক্রিনে ভেসে থাকা নামটা দেখেই রিসিভ করল তাড়াহুড়ো করে। হড়বড় করে বলল,

“হ্যাঁ.. হ্যালো,

আপনি কোথায়? কবে আসবেন? আপনাকে ছাড়া আমার একটুও ভালো লাগছে না।”

ওপাশে বাতাস শোঁ শোঁ করছে। তুশি কপাল কুঁচকে বলল,

“হ্যালো, শুনতে পাচ্ছেন?”

সাড়াশব্দ এলো সময় নিয়ে। একটা গভীর স্বর খুব আর্দ্রভাবে ডাকল,

“তুশিইইইই!”

তুশির বুক কেমন করে উঠল। উঠে বসল তড়াক করে,

“হ্যাঁ হ্যাঁ, বলুন না!”

“তুশিইইই…”

ফ্যাসফ্যাসে নিঃশ্বাসের শব্দে তুশির মুখচোখ রং হারিয়ে ফেলছে। এ কান থেকে ফোন ও কানে এনে বলল,

“হ্যাঁ বলো না, শুনছি আমি।”

সার্থ খুব নিভন্ত স্বরে বলল,

“আমার তুশিইইইই!”

তুশির গলা-বুকের খাঁ খাঁ অবস্থা। এভাবে ডাকছে কেন মানুষটা! সার্থ থেমে থেমে বলল,

“আমি যদি আর না ফিরি, আমাদের যদি আর কখনো দেখা না হয়,

আমি থাকি না থাকি,

তবু জেনে রেখ,

এই সৈয়দ সার্থ আবরার তোমাকে তার জানের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিল!”

তুশির বুকে পাঁজর ছেঁড়া টান পড়ল। অস্থির হয়ে বলল,

“এসব, এসব কেন বলছো? তুমি ঠিক আছো,

এই, এই সার্থ, হ্যালোও…”

ওপাশে ঠাস করে শব্দ হলো তক্ষুনি। বিকট- প্রকট, এক গুলি ছোড়ার শব্দ! তুশির কান চিরে গেল তাতে। ফোন বোধ হয় ছিটকে গেল কোথাও। লাইন কেটে যেতেই, তুশির চোখের মণি আটকে যায়। থমকায় শ্বাস। হাত-পা থরথরিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে,

“নায়ায়ায়ায়ায়া!” বলে আর্তচিৎকার দিয়ে এক লাফে শোয়া থেকে উঠে বসল মেয়েটা। গোটা শরীর থেকে টপটপ করে ঘাম চুইয়ে পড়ছে। তুশি উদ্ভ্রান্তের ন্যায় হাঁপাতে হাঁপাতে এদিক-ওদিক চাইল। ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিপাশে। বিশাল ফাঁকা ঘরটা যেন অজগরের মতো গিলে খেতে আসছে। ভয়ে,অস্থিরতায় দমবন্ধ হয়ে গেল ওর। অমনি মুখ উগলে বমি করে ভাসিয়ে দিলো মেঝে। ঠিক

দু মিনিট বাদেই ছুটে এলেন রেহণূমা। দরজা চাপানো ছিল। হন্তদন্ত পায়ে ভেতরে ঢুকে বললেন,

“তুশি, কী হল? চ্যাঁচালি কেন?” বলতে বলতে

দেওয়াল সুইচ টিপলেন তিনি। মেঝেতে চোখ পড়তেই আঁতকে উঠলেন আরো।

তুশি নেতিয়ে গেছে। হাঁপাচ্ছে এখনো। তুরন্ত দৌড়ে এসেই মেয়ের মাথাটা বুকে মিশিয়ে ধরলেন তিনি। উৎকণ্ঠিত হয়ে বললেন,

“কী হলো মা, কী হলো তোর?”

একটা আশ্রয় পেয়ে, ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল তুশি। মাকে দু হাতে আঁকড়ে ধরে বলল,

“ওনাকে এনে দাও মা! আমি মরে যাচ্ছি…এনে দাও ওনাকে।”

চলবে….

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply