কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৯.ক
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
সকাল সকাল ঘুম ভেঙে, বিছানা খালি পেল অয়ন। বাঁ পাশটা পুরো ফাঁকা পড়ে আছে। ঘরে কোথাও ইউশা নেই। এত ভোর ভোর কবে থেকে উঠতে শিখল মেয়েটা? অয়ন শোয়া থেকে বসতে গেল, টের পেল ওর বাঁ হাত অবশ। ব্যথায় নাড়ানো যাচ্ছে না! কীসের ব্যথা এটা? ভাবতে গিয়ে মনে পড়ল কালকের কথা। ও তবে সারারাত ইউশাকে বুকে নিয়ে ঘুমিয়েছে? কিন্তু অয়নের ঘুম তো এত ভালো না! এমনি সময় এক মাথায় শুলে, সকালে নিজেকে আবিষ্কার করত খাটের অন্য মাথায়। সেই ছেলে এত বড় রাতটা একভাবে পাড় করে দিল? এত নিশ্চিন্তে শেষ কবে ঘুমিয়েছিল অয়ন? না, ঠিক মনে পড়ল না। তবে কী ভেবে মাথা নুইয়ে হাসল একটু। তক্ষুনি বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। এদিকেই আসছে কেউ। অয়ন ঠিকঠাক হয়ে বসল সাথে সাথে। ইউশা ঘরে ঢুকেছে, পরনে তাঁতের শাড়ি। শুকনো হলুদের মতো রং, সাথে হাফ হাতার ব্লাউজ! মাথায় গামছা প্যাঁচানো। কফি এনেছে। স্নিগ্ধ পাঁপড়ির মতো দুই ঠোঁট টেনে বলল,
“গুড মর্নিং!”
অয়ন আবিষ্কার করল, ইউশার দিকে তাকাতে ওর কেমন কেমন লাগছে! একটু নার্ভাস, কিংবা অনেকটা জড়তা!
চোখ না মিলিয়ে ছোট করে বলল,
“গুড মর্নিং!”
ইউশা এগিয়ে আসে। কফির মগ বাঁ পাশে রাখতেই, মুখটা ডান দিকে ফিরিয়ে নিল অয়ন। ইউশা আবার মগটা ওর সামনে দেওয়ার জন্য ডান দিকে গিয়ে দাঁড়াল। অয়ন তড়িৎ মুখ ফিরিয়ে আনল বামে। ও খেয়াল করল, কিছু বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
“কী হয়েছে, অয়ন ভাই?”
“ কই?”
“তোমার কফি! দু চামচ চিনি খাও না? দেখো তো ঠিক আছে কিনা!”
অয়ন না তাকিয়েই মগ হাতে নিল। চুমুক দিয়ে চারপাশে চোখ রেখে বলল,
“তুই বানিয়েছিস?”
“হ্যাঁ।”
“দরকার ছিল না। ঘরেই তো টি কর্নার আছে।”
“আমি ওপরে আসছিলাম, ভাবলাম নিয়ে আসি। কিন্তু তুমি এরকম করছ কেন?”
অয়ন সেই এদিক-ওদিক চেয়েই বলল,
“কী করছি?”
ইউশার একটু মন খারাপ হলো। কিন্তু আর ঘাঁটল না অয়নকে। চুপ করে পাশ কাটিয়ে আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। পাতলা গামছার আড়াল থেকে মুক্ত করল ভেজা চুল। মুহূর্তে তড়বড় করে তা ছড়িয়ে পড়ল পিঠের নিচে। ইউশা সামনে চুল এনে গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে পেছনে ছুড়ে মারতেই, পানির ফোঁটা ছিটকে অয়নের মুখে গিয়ে লাগল। চোখটা খিচে নিয়ে, আবার খুলল সে। চাইল ঘাড় ঘুরিয়ে। একটা চিকন, বাঁকানো কোমরের সঙ্গে দুলতে থাকা চুলের গোছা নড়ছে। হাত নাড়াতে নাড়াতে ফাঁক গলে উঁকি দিয়েছে মসৃণ পেট। অয়ন চোখ সরিয়ে নিলো। কেমন অস্থির হাবভাব নিয়ে কফিতে ঠোঁট ছোঁয়াতে গেল, জিভে ছ্যাঁকা লাগল অমনি। মৃদু শব্দে ‘উফ’ করে উঠল সে!
ইউশা চমকে পিছু ফিরে বলল,
“কী হয়েছে?”
অয়ন বিব্রত হয়ে পড়ল। খুব ব্যস্তভাবে বলল,
“কিছু না! নিচে কে কে আছে?”
“ মেজো ভাইয়া বাদে সবাইকে দেখলাম।”
চটজলদি উঠে দাঁড়ায় ছেলেটা, কফি নিয়েই নিচে যাবে বলে। ওকে দরজা অবধি যেতে দেখে ইউশা চোখ ফিরিয়ে আনল। মন দিল নিজের কাজে। মাথা নাড়াতে গিয়ে বিড়বিড় করল,
“ব্যাঙের ঘাড়টা এত ব্যথা করছে!”
কিন্তু শুনতে পেয়েই দাঁড়িয়ে গেল অয়ন। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“ব্যথা কেন?”
“হুঁ? না, ওই…”
আমতা-আমতা করার মাঝেই অয়ন এগিয়ে আসে। সামনে দাঁড়ায়। চোখেমুখে ডাক্তারি পেশাদারিত্ব ফুটিয়ে বলে,
“কোথায় ব্যথা, দেখি!”
ইউশার মুখ শুকিয়ে গেল। ঘাড়ের ডান পাশটা দেখাল দোনামনা করে। আঙুল আলতো বসিয়ে ঘাড়ের পেছনের পেশি ছুঁতেই, ব্যথায় সসসস করে উঠল মেয়েটা। অয়ন বলল,
“এখানে?”
“হুউ!”
“ঘাড় অনেকক্ষণ একভাবে উঁচু করে রাখলে এখানকার ছোট ছোট নার্ভে টান লাগে। তখন পেছনের পেশিতে ব্যথা হয়! উঁচু করে রেখেছিলি?”
ইউশা বোকা বোকা হাসল,
“মনে হয়…”
মেয়েটার ওই হাসিতেই অয়নের চোখের দৃষ্টি পালটে গেল হঠাৎ। কী যেন ভাবল সে! বুঝল অনেক কিছু। জিজ্ঞেস করল শান্ত গলায়,
“রাতে ঘুমাসনি?”
ইউশা হকচকিয়ে বলল,
“হ্যাঁ, ঘুমিয়েছি তো, ঘুমিয়েছি।”
“মিথ্যে বলছিস কেন?
আমাকে দেখছিলি, তাই তো?”
ইউশার চেহারার রং বদলে যায়। রক্ত সরে সাদা দেখায় মুখটা। মাথা নুইয়ে নিতেই, কথাবার্তা খুইয়ে ফেলল অয়ন। দু পল থম ধরে চেয়ে রইল। পরপর ফোঁস করে শ্বাস ফেলে ড্রয়ার হাতিয়ে ওষুধ বের করল।
ইউশার সামনে রেখে সেই না তাকিয়েই বলল,
“ এটা খাওয়ার আগে,এটা খাওয়ার পর।”
তারপর উত্তরের আশায় না থেকে দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল বাইরে।
****
থানার পরিবেশ শান্ত। চ্যাঁচামেচি বা হইহুল্লোড় নেই। পুরোদস্তুর ব্যস্ততা তবে। এই কেস, ওই কেস, এই ক্লু, সেই ক্লু নিয়ে সবার যেন হিমশিমে দশা। সার্থ একটা ফুটেজ চেক করছিল। পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন শরিফ। দুজনের চোখ যখন মনিটরে, পুলিশের আরেক কর্মী দরজায় এসে দাঁড়ালেন। সালাম ঠুকে বললেন,
“স্যার, জনাব জামিল এসেছেন।”
সার্থ অবাক হলো বটে! জামিল দেশে এলো কবে? ভ্রু কুঁচকে হাতঘড়ি দেখল এক পল। বলল,
“পাঠিয়ে দাও।”
স্ক্রিন পজ করতেই শরিফ বললেন,
“তাহলে স্যার আমি আসি। আপনারা কথা বলুন!”
“যাও।”
সার্থ চেয়ারে পিঠ ছাড়তেই ওপাশ থেকে ভেতরে এসে দাঁড়াল জামিল। শরিফ যাওয়ার সময় সালাম দিয়ে হ্যান্ডশেক করে গেল। সার্থ-তুশির বিয়ের দিনই দুজনের বেশ ভাব হয়ে গেছে! উনি যেতেই জামিল প্রফুল্লচিত্তে বলল,
“কী রে, কেমন আছিস? খুব মিস করছিলি মনে হয়। এত কল, ম্যাসেজ, দারোয়ান আবার বললেন বাড়িতে লোক এসেছিল। ব্যাপার কী হ্যাঁ?”
বলতে বলতে চেয়ার টেনে বসতে গেল,
সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কে আপনি?”
অমনি থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল জামিল।
“এ্যাহ!”
“সরি, চিনতে পারছি না। সেন্ট্রি… এটাকে বের করো তো।”
চ্যাঁচানো শুনে জিভ কাটল জামিল। অসহায় গলায় বলল,
“এমন কিডনি পুড়িয়ে দেওয়া ইয়ার্কি করিস না ভাই! এমনিই জেল-হাজত ভয়ের জায়গা। তুই আবার না চেনার ভান করলে আমি তো বিপদে পড়ে যাব।”
সার্থ শক্ত মুখে চুপ করে রইল। ও ঠোঁট উলটে বলল,
“রেগে আছিস?”
“ কেন, কী আশা করেছিলি? এইভাবে উধাও হবি, আর আমি তোকে আপ্যায়নের জন্য ডালা সাজাতে বলব? এমন না বলে-কয়ে লাপাত্তা হওয়া মানুষদের কী বলে জানিস?”
জামিল সহসা বলল,
“লাপাত্তা লেডিস!”
সার্থ রেগে ছিল। কিন্তু হেসে ফেলল এবার। ও হাঁপ ছেড়ে বলল,
“যাক বাবা, হাসলি! আমি ভাবছিলাম তোকে কীভাবে ম্যানেজ দেব! সো সরি, আমি বলে যেতে পারিনি।”
“এত আর্জেন্ট কোথায় গিয়েছিলি?”
“আর বলিস না, শনিবার হঠাৎ আমার এক কলিগ ম্যাসেজ দিলেন। আমি যে প্রজেক্ট শেষ করে এলাম, যেটা পাবলিশ হওয়া বাকি, সেটার ক্রেডিট নাকি অন্য কেউ পাচ্ছে। মাথা গরম হলো, সন্ধ্যার ফ্লাইট ধরে ছুটলাম সাথে সাথে।”
“আর বাকিরা? বাড়ি তো খালি ছিল শুনেছি।”
“তাই? নানুকে নিয়ে মামা গ্রামে গিয়েছিলেন নানার কবর দেখতে। তোর লোক বোধ হয় সেই সময় গিয়েছিল!”
“ওহ।”
“ এবার বল,কোনো সিরিয়াস ইস্যু?”
“বিয়ের কথা হচ্ছিল। তোর খোঁজ না পেয়ে লোক পাঠালাম, জানলাম পুরো বাড়িতেই কেউ নেই।”
“বিয়ে? কার, তোর?”
“কবার বিয়ে করব? অয়নের ছিল!”
জামিল চমকে বলল,
“হ্যাঁ?
ক-কবে ঠিক হলো? কার সাথে হলো?”
“সেসব বলব বলেই তো এত খোঁজা। চাচ্চু তোদের পুরো ফ্যামিলিকে জানাতে বলেছিলেন।”
জামিল আফসোসে ফেটে পড়ল যেন। মন খারাপ করে বলল,
“আরে রে, এটা হলো কিছু! অয়ন, পুচকে ছেলেটাও বিয়ে করে ফেলেছে! আমি তো ভাবিইনি ও এত জলদি মুভ করতে পারবে। কী যে চিন্তা হচ্ছিল ছেলেটার জন্য। মনে মনে ভেবেওছিলাম, যেদিন ও বিয়ে করবে খুশিতে আমি নাচব ভাই! ওর শালীদের সাথে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে নাচব। কিছুই হলো না তো!”
সার্থ বিড়বিড় করে বলল,
“দিবাস্বপ্ন!”
“কেন,শালি নেই?”
“আছে। কিন্তু সেটা আমার জন্যে।”
জামিলের ভ্রু দুটো বেঁকে গেল এবার। সিরিয়াস চোখে বলল,
“মানে কী বলতো! অয়নের সাথে কার বিয়ে হয়েছে?”
“ইউশার!”
এই এক ঘোষণায় এতক্ষণের সব উচ্ছ্বাস, ফুর্তি দপ করে নিভে গেল তার। সদা হাস্যোজ্জ্বল মুখে একটা বিশদ কালো মেঘের ভেলা এসে বসল। অস্পষ্ট আওড়াল,
“ইউশার!”
সার্থের চোখ ছোট হয়ে যায়। খেয়াল করে বন্ধুকে। জামিল দু পল থমকে থেকে হেসে ফেলল হঠাৎ। ওই মাথা নাড়তে নাড়তে হাসিটা দেখে, সার্থ সোজাসুজি বলল,
“ডিড ইউ লাইক ইউশা?”
জামিল চোখ তুলে চাইল। দৃষ্টিতে ভয় নেই। নিসংকোচে বলল,
“স্টিল আই ডু…”
সার্থ তাজ্জব হয়ে বলে
“এর মানে পার্টিতে ওটা মজা ছিল না?”
“না। আমি ওকে পছন্দ করতাম।”
জামিল শ্বাস ফেলল ফের। বলল,
“দেশে আসার কথা তো অনেকদিন ধরেই হচ্ছিল। নানু বারবার বলছিলেন একবার এসো, মরার আগে তোমাকে দেখে যাই। আবার তুইও বললি, চলে এলাম। সেদিন তোদের বাড়ি গিয়েই আমার নজর সবার প্রথম পড়ল ইউশার দিকে। শান্ত নদীর মতো স্থির একটা মেয়ে। ভালো লেগেছিল। বিয়ের প্রস্তাবও দিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, ও রাজি হলেই তোকে জানাব!”
“রিজেক্ট করেছিল, রাইট?”
“হুম। বলেছিল ও অন্য একজনকে ভালোবাসে। আমার অবশ্য আগেই একবার মাথায় এসেছিল। কারণ ইউশাকে দেখেই মনে হতো হেসেও যেন হাসছে না। চেহারায় কোনো স্ফূর্তি নেই। কিছু নিয়ে আপসেট খুব। এখন না বুঝলাম কেন! ও তাহলে অয়নকে ভালোবাসত, সার্থ।”
“হু, লাস্ট ফাইভ ইয়ার্স…”
জামিল হতবাক চোখে বলল,
“কী বলছিস! পাঁচ বছর?
এর মানে যে সময়টায় অয়নের তুশির সাথে বিয়ের কথা চলছিল তখনও? ওসব ও নিজের চোখে দেখছিল? নিজেই বিয়ের আয়োজন করছিল? এত শক্তি কারও হয়!”
সার্থ বলল,
“সত্যি বলতে, অবাক আমিও হয়েছি। ওর ভাই হয়ে, আমি তুশির দিকে কারও আড়চোখও নিতে পারি না। সেখানে ও কীভাবে অয়নের পাশে তুশিকে নিয়েছিল? বিয়ের কথাটাও তো ইউশারই তোলা।
বিয়ের শপিং করতেও সাথে গিয়েছিল! ধরে ধরে নিজের হাতে জিনিসপত্র কিনেছে। আর আমি, সামান্য চুড়ি পরানোর জন্য মলের ম্যানেজার তুশির হাত ধরাতে থাপ্পড় মেরে বসেছিলাম!”
“শি ইজ ডিফারেন্ট না?”
“হু, আফটার অল আমার বউয়ের বোন!”
জামিল হাসতে হাসতেই চুপ করে গেল।
সার্থ ওর হাতের ওপর হাত রেখে বলল,
“ডোন্ট বি আপসেট!”
“হুউউউউউ!”
“বাড়ি যাবি? মা তোর কথা বলছিল।”
“না রে! আর ইচ্ছে নেই। প্রপোজালের আগের মিনিটটা অবধি ইউশাকে নিজের ভেবেছিলাম। ও মানা করলেও মনে মনে একটু আশা রেখেছিলাম আমি! হয়তো যদি কোনোভাবে রাজি হয়, মন ঘুরে আসে। তাকে এখন আরেকজনের স্ত্রী হিসেবে দেখব, না ভাই, এই অল্প বয়সে আমি লটকে যেতে চাই না। এনিওয়ে, লাঞ্চ করবি তো?”
সার্থ বুঝল জামিল কথা কাটাচ্ছে। লুকোচ্ছে তার খারাপ লাগা। মাথাও বেঁকে গেছে বোধ হয়। নাহলে সদ্য বারোটা বাজে এখন। এই সময় লাঞ্চ করবে কেউ? তাও বলল,
“চল!”
***
সৈয়দ নিবাসে আজকেও এলাহি আয়োজন হলো। সার্থ না থাকলেও, একসাথে একই টেবিলে বসে খেল সকলে।
আনন্দ করল, গল্প করল। সবার হইহইয়ের মাঝেও, কেবল মনমরা হয়ে রইল তুশি। সার্থ কোন ভোরে বেরিয়েছে, ও দেখেনি। টেরও পায়নি কিছু। আল্লাহ যে কেন ওকে এত মরার ঘুম দিল! তুশি আজ যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে সকাল সকাল জাগতে। পারেনি।
দাদি এ নিয়ে ওকে আবার ঝেড়েছে, বকেছে। কিন্তু তুশিই বা কী করবে? কী দিয়ে বোঝাবে দাদিকে, একটা রাতেও ওর ঘুম হয় না। ঘুমোতে দেয় না বিটকেলটা!
তুশি গালে এক হাত দিয়ে, আরেক হাতের এক আঙুল পিরিচে থাকা চানাচুরে নাড়ছিল। স্বামীর অনুপস্থিতিতে তার মন পুড়ে যাচ্ছে। বাড়িভর্তি মানুষ, কত আত্মীয়, যাদের তুশি নতুন চিনেছে-জেনেছে, তাদেরও ভালো লাগছে না।
দিনের ক ঘণ্টায় সার্থকে হাজারবার ফোন করে ফেলেছে ও। আর আছরের আজান পড়তেই আরেকবার কল করল।
মুহূর্তে ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই আদরে চুইয়ে পড়া মোলায়েম স্বর,
“তুশি, কাজ করছি! পরে ফোন দিই?”
তুশি যা বলতে চাইল, গিলে নিল সেটা। ছোট শব্দে বলল,
“আচ্ছা।”
তারপর ঢুলুঢুলু চেহারায় এসে সোফায় মায়ের কোলে শুয়ে পড়ল সে। রেহনূমা মেয়ের চুলে হাত বোলাতে বোলাতে আশেপাশে বসা মানুষদের সাথে গল্প জুড়ে দিলেন।
ইউশা একটু পর হাজির হলো সেথায়। হাসনার পাশে বসতেই বৃদ্ধা ফিসফিসিয়ে বললেন,
“তুমি আবার এইহানে বইলা ক্যান?”
ইউশা ভড়কায় একটু।
“ক-কেন দাদি?”
“আবার কয় ক্যান দাদি!
তুমার নতুন বিয়া হইসে। এহন সুয়ামির পাছায় লাইগ্যা থাকোনের সময়। হে না খাইয়া ঘরে গেল? তুমিও যাও।”
ইউশা ঠোঁট টিপে রইল।
তুশি বলল,
“আহ, কী যে ভালো লাগছে! আমাদের দুই বোনের এখন দুটো স্বামী।”
মিন্তু বড় দুঃখ নিয়ে বলল,
“আজ যদি বড় মায়েরও একটা মেয়ে থাকত,কতই না ভালো হতো তাহলে!”
তনিমা শুধালেন,
“কেন রে?”
“কেন আবার, এই যে তোমার দুই ছেলে আমার দুই বোন জিম্মি করে নিল। তোমার একটা মেয়ে হলে আমিও তাই করতাম।”
সেই সাথে দাঁত সব বের করে হাসল মিন্তু। ইউশা থমথমে গলায় বলল,
“কী শখ, বড় মা এমন ফেলটু ছেলে মেয়ের জন্য জীবনেও নিতেন না!”
মিন্তু ফুঁসে বলল,
“দেখলে বড় মা, দেখলে?
নিতে না তুমি, বলো!”
তনিমা হাসলেন।
“নিতাম নিতাম!”
“শুনলি পেত্নি?”
ইউশা ভেংচি কেটে বলল,
“ এটা তোর সান্ত্বনা পুরস্কার।”
হাসনা মুখ বেঁকিয়ে বললেন,
“তোমার এত কতা কওনের দরকার নাই। যাও শোয়ামির কাছে যাও। যাইয়া হাত-পাও টিপো।”
তুশিও তাল মিলিয়ে বলল,
“হ্যাঁ যাও যাও। নতুন বিবাহিত মানুষ! তোমাকে আমাদের সাথে মানাচ্ছে না!”
“ওরে রে, দুই মাস বিয়ে হলো আর আমাকে বলছে নতুন। হুহ, যাই চলেই যাই।”
ইউশা উঠেই গেল। সবাই হাসল তার যাওয়ার দিকে চেয়ে। অথচ,পথিমধ্যে ইউশা টের পেল ভীষণ লজ্জা লাগছে ওর । অয়ন ভাই সকালে ওইভাবে ধরে ফেললেন! সামান্য ঘাড়ব্যথা দিয়েই বুঝে গেলেন, ইউশা রাত জেগে ওনাকে দেখছিল? কিন্তু এত লজ্জা দিয়ে তো আর বুক জুড়াবে না। সবাই যেভাবে ঠেলেঠুলে পাঠিয়ে দিল, এখন তো এখানেই থাকতে হবে, অভ্যাস করতে হবে। ইউশা দম নিয়ে ঢুকল ঘরে। চোখের হোঁচটে যেন অদৃশ্যভাবে থুবড়ে পড়ল অমনি। বিছানার ওপর দুটো লাগেজ তুলে কিছু করছে অয়ন। কাবার্ডটাও হাঁ করে খোলা। ইউশা এগিয়ে এলো ত্রস্ত পায়ে। অয়ন জামাকাপড় ভাঁজ করে লাগেজে ভরছে। আঁতকে উঠল ও। অয়ন ভাই আবার দেশ ছেড়ে যাওয়ার পাঁয়তারা করছেন নাকি!
মূহুর্তে উদ্বিগ্ন হয়ে বলল,
“কোথাও যাচ্ছ অয়ন ভাই?”
“ব্যাংকক!”
“আমাকে তো বললে না।”
“এই যে বললাম।”
ইউশা কষ্ট ঠিকভাবে অনুভব করার সময় পেলো না, সবে সবে মুখটায় মেঘ জমতে নিল, অয়ন তক্ষুনি বলল,
“কী কী নিবি বের কর।”
চমকে উঠল সে,
“আমিও যাব?”
অয়নের ব্যস্ত হাত থামল। সোজা হয়ে বলল,
“সেদিনই তো বললাম, বিয়ের দুদিন পর আমরা পাটায়া যাচ্ছি!”
ইউশার বিস্মিত চাউনি জোড়া সহসা মলিন হয়ে গেল। চোখ নামিয়ে বলল,
“কিন্তু, আমি তো তোমাকে বললাম, আমি…”
অয়ন কথা কেড়ে নেয়। দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
“আমি জানি কী বলবি। তোর তখনকার কথা আমার মনে আছে। কিন্তু,
ইউশা, আজ আমাদের মাঝে যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব আছে, একটা সময় এসব থাকবে না। আর সেই সময় কবে আসবে ওই অপেক্ষায় বসে না থেকে আমরাই বরং সময়টাকে আমাদের কাছে টেনে নিয়ে আসি!”
“অয়ন ভাই আমি…”
ও আবারো কথা টেনে নিলো,
“ ইউশা, আমি তোকে এতটুকু নিশ্চয়তা দিচ্ছি, অয়ন আবসারের মনে তুই প্রথম নারী না হলেও, তার জীবনে তুই এক আর একমাত্র নারী হয়ে থাকবি!”
ইউশার চোখে আজ জল এলো না। চেয়ে রইল কেমন নিস্পন্দ হয়ে। অয়ন গাল ছুঁয়ে মৃদু হেসে বলল,
“ভালোবাসিস না আমায়?”
ঘাড় নাড়ল মেয়েটা। কণ্ঠে বুজে গেল,
“হুউউ!”
“ ভালোবাসলে ভরসা রাখতে হয়।”
পরপরই অয়নের শিথিল চোখমুখ স্বাভাবিক হয়ে গেল। ফের লাগেজে হাত চালাতে চালাতে বলল,
“আর তাছাড়া আমার ওখানে হোটেল রুম থেকে সবকিছু বুকড। লাখের ওপরে টাকা লেগেছে! এখন ক্যানসেল করা মানে, সব যাবে। স্বামীর এত বড় লসটা তুই হতে দিবি?”
উত্তর দেওয়ার বদলে প্রচণ্ড নুইয়ে গেল মেয়েটা। আঁচলের কোণা আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে লাজুক ঠোঁটে বিড়বিড় করল,
“স্বামী!”
“ইউশা, লজ্জা পরে পাবি। আগে কাপড় নিয়ে আয়।”
আগের থেকেও এবার মাত্রাতিরিক্ত কুণ্ঠায় ইউশার মুখ লাল হয়ে গেল।
“দি-দিচ্ছি!” বলেই কোনোরকম কাবার্ডের এই অংশটা খুলে নিজের একেকটা কাপড় নিয়ে বিছানায় রাখল সে। অয়ন ভালো স্বামীর মতো সব পাশের লাগেজে তুলে রাখে। যত্ন নিয়ে গোছায়। ইউশা ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সব একে একে জমা করল সেখানে। আস্তেধীরে লাগেজ ভরে গেল। জানান দিল, আর জায়গা নেই। সব শেষ করে দুটো লাগেজের চেইন টেনে দাঁড় করাল অয়ন। বিস্তর শ্বাস ফেলে বলল,
“সোওঅঅ, গেট রেডি ফর টুমরো!”
*******
সার্থ বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার পরে। কিন্তু এক্ষুনি আবার বের হতে হবে। আলমারি খোলার মাঝেই পেছন থেকে দুবাহুর নিচে দুই হাত গলিয়ে জড়িয়ে ধরল তুশি। মাথার এক পাশটা এলিয়ে দিল পিঠে। লম্বা শ্বাস টেনে বলল,
“আপনি এলেন তাহলে!”
“কোথায় ছিলে?”
“দাদির ঘরে। সবাই গল্প করছিলাম!
ইউশা কাল বিদেশ যাচ্ছে। সবাই ওর কাছে এত বায়না করছে না! এটা আনবে, ওটা আনবে!”
সার্থ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“বিদেশ? কী জন্য?”
“মধুচন্দ্রিমায়।”
“কীহ?”
“হানিমুনে যাচ্ছে। এত শিক্ষিত লোক বাংলা বোঝেন না।”
সার্থ ঘুরে চাইল এবার। বিশদ কৌতূহল নিয়ে বলল,
“কাল তো ওদের বউভাত হওয়ার কথা।”
“হ্যাঁ, তারপর যাবে। গাড়ি তো সন্ধ্যায়।”
“গাড়ি না, ফ্লাইট!”
“ওই আরকি।”
সার্থ দেখল তুশি ঢুলছে। স্থির নেই এক জায়গায়। কী ভেবে জিজ্ঞেস করল,
“তুমি যাবে, তুশি?”
“আমি ওদের সাথে কেন যাব?”
“নির্বোধ, ওদের সাথে যাবে কেন! আমার সাথে যাওয়ার কথা বলেছি। আমরা তো সেভাবে হানিমুনে যাইনি। তাহলে এই কেসটা শেষ করেই প্ল্যান করব।”
তুশি ক্লান্ত গলায় বলল,
“উহু, আমি আপাতত কোথাও যাব না। আমার ইদানীং খুব ঘুম পায়, কেমন কেমন লাগে!”
“কেমন লাগে?”
“জানি না। বোধ হয় এত বিয়ে-টিয়ে খেয়ে হাঁপিয়ে গেছি। নিজের বিয়ে, বোনের বিয়ে…”
বলতে বলতে তুশির চোখ পড়ল সার্থের হাতে। এতক্ষণে ইউনিফর্মটা দেখল। জিজ্ঞেস করল হড়বড়িয়ে,
“আপনি কি আবার থানায় যাবেন?”
সার্থ ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভাবল। এক দণ্ড সময় নিয়ে বলল,
“তুশি, আমি আজ রাতে ফিরব না। আমার অপেক্ষায় থাকার দরকার নেই। আর একা শোবে না। তোমার দাদিকে এনে রেখ।”
তুশি উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,
“ফিরবেন না, কেন!”
“একটা মিশনে যাচ্ছি। খুব বড় একটা গ্যাং ধরব।”
তুশির গলা শুকিয়ে গেল শুনেই। সার্থ সকালে সিভিল ড্রেসে বের হয়েছিল। এবার ইউনিফর্ম চড়াল গায়ে।
তুশি জিজ্ঞেস করল,
“ফোন করব?”
“না, বন্ধ থাকবে।”
“কাল কখন আসবেন, তাহলে?”
“জানি না।”
হোলস্টারে রিভলভার গুঁজতে গুঁজতে একবার চোখ তুলে স্ত্রীকে দেখল সার্থ। তুশির চেহারা বিবর্ণ। ও ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“এত চিন্তা করলে হবে না। এ এসপির বউ হয়েছেন ম্যাডাম, মনকে শক্ত রাখতে শিখুন!”
বললেই কি আর হয়? তাও ঠোঁটে হাসি আনার চেষ্টা করল তুশি। ইউনিফর্মের শার্টের ওপরের বোতাম আটকে দিতে দিতে বলল,
“ সাবধানে থাকবেন।”
“তুমিও, আর শরীর খারাপ করলে মাকে বলো। নিজের মধ্যে রেখো না।”
“হুউউ।”
সার্থ ওর কপালে চুমু দিয়ে বেরিয়ে গেল। তুশি এগিয়ে এলো কিছু পথ। স্বামীর সদর থেকে বেরিয়ে যাওয়া অবধি দেখল চেয়ে চেয়ে। বুকের ভেতরটা কেমন নড়বড়ে হলো অমনি! দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে কোনো শঙ্কার তোড়ে।
হাত তুলে বুকের বাঁ দিকটা চেপে রাখল তুশি। মন বলছে কিছু হবে!
কিন্তু যা হবে, তা ভালো না খারাপ?
চলবে
Share On:
TAGS: কাছে আসার মৌসুম, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৭
-
সমুদ্রকথন গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬৮.৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩১
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৯