Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ৮


আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা৮

অ্যাডাল্ট ল্যাংগুয়েজ অ্যালার্ট❗

ইরামের বাবা রইজুল কিবরিয়া মারা যান যখন ইরামের বয়স ১৭। মৃত্যুটাও ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত। ফুটপাথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, নিয়ন্ত্রণহীন বাস এসে সোজা তাকে পিষে চলে গিয়েছে। এই দেশে নিয়ম কানুন মেনে চলা মানুষেরও জীবনের কোনো মূল্য নেই। বাবার চলে যাওয়ার পর সেই শোকে ইরামের মা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বসেন। তিনি জীবিত ছিলেন ঠিকই, কিন্তু মস্তিষ্ক প্রাপ্তবয়স্কদের মত কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। ইরাম বাড়ির বড় মেয়ে, তার ছোট দুটো ভাই রাহাত আর ইহান। রাহাত তাও যা একটু বড় ছিল, ইহান একেবারেই কোলের শিশু। মুহূর্তেই গোটা পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোরী ইরামের উপর। দুই ভাই, তাদের পড়ালেখা, মায়ের দেখভাল, চিকিৎসার খরচ, সাংসারিক ব্যয়, নিজের পড়ালেখা, জীবনযাপন সবকিছু। যেখানে প্রাপ্তবয়ষ্করাও এত কঠিন দায়িত্বে হিমশিম খায়, সেখানে ইরাম লড়ে গিয়েছে বছরের পর বছর ধরে। মায়ের চিকিৎসা জারি রেখেছে, ছোট দুই ভাইকে পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষ করেছে। তার নিজের দিকটা কোনোদিন দেখা হয়নি। বছরে নিজের জন্য একটা পোশাক নেয়া হত কি হত না, কিন্তু ভাইদের কমতিতে রাখেনি সে কোনোদিন। সকালে নিজের পড়াশোনা, বিকালে কোচিং সেন্টারে পড়ানো, সন্ধ্যা থেকে রাত অবধি টিউশনি। নিজের জন্য কোনো সময়ই তার রাখা হয়নি কখনো। ভাইদের জীবনে সে কোনো বড় বোন ছিল না, ছিল মায়ের ভূমিকায়। নিজের পরিবারটা চালাতে খাটতে খাটতে কখন যে বয়সটা ৩০ ছুঁয়ে গিয়েছিল সে টেরও পায়নি।

এরপরই তার জীবনে এলো অরণ্য। যে অরণ্য তাকে একটা সময় কখনো না পাওয়া সুখের স্বপ্ন দেখিয়েছিল, সেই অরণ্যই অতি যত্ন নিয়ে তার সবটুকু সুখ ধ্বংস করে দিয়ে গেল।

সাইবানদের বাড়ির লিভিং রুমে জটলা পাকিয়েছে সকলে। সাইবান সোফায় বসে আছে। সামিয়া ছেলের পাশে বসেই তার গালে আইসপ্যাক চেপে রেখেছেন। ছেলেটার চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। ধারালো নজরে সে দেখছে খানিকটা দূরে দাঁড়ানো ইহানকে। কিশোর ছেলেটাও কম যায়না। ভ্রু কুঁচকে অত্যন্ত ঘৃণা নিয়ে দেখে যাচ্ছে সাইবানকে। বাকিরা সকলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়ানো। অস্বস্তিকর নীরবতা ভেঙে প্রথম খেঁকিয়ে উঠল সারিকা,

“গ্রেট! জাস্ট গ্রেট! এখন ডিম থেকে সদ্য ফোটা একটা টিন এজ ছেলে এসে আমাদের বাড়িতে গুন্ডাগিরি করে যাবে! খুব ভালো!”

“সারিকা, প্লীজ। রিড দ্যা রুম।”

মিসির শীতল গলায় স্ত্রীকে সতর্ক করল। তবে হঠাৎ করেই মুখ খুলল ইরাম।

“না। সারিকা ঠিক বলেছে। বাড়ি এসে গুন্ডাগিরি করা মানার মত বিষয় না।”

ইরামের স্নিগ্ধ রূপ বদলে গিয়েছে। তাতে ভর করেছে কঠোরতা এবং দৃঢ়তা। নিজের ভাই ইহানের দিকে তাকাল সে।

“এই ধরনের অসভ্য আচরণ তোকে কে শিখিয়েছে ইহান?”

“ইশ! ওরা তোমাকে জবরদস্তি করতে পারে আর আমি প্রতিবাদ করতে এলেই দোষ? মিথিলা ভাবী, রাহাত ভাইয়া কেউ আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করেনি যে তুমি আমাদের বাড়িতে গিয়েছিলে। আমি বুঝতেও পারিনি রাস্তার ওপাড়ের বাড়িতেই তোমার বাস। আজ কিনা দুঃসাহস দেখিয়ে এই মহিলা যায় আমাদের বাড়িতে তোমার বিয়ের দাওয়াত দিতে? সিরিয়াসলি?”

সামিয়ার দিকে আঙুল তুলে গর্জে উঠল ইহান। বয়সে ছোট হলেও গায়ে গতরে অনেকখানি লম্বা সে। ফিনফিনে পাতলা শরীরে ঢোলা শার্ট আর ট্রাউজার। ইরামের ভ্রু কুঁচকে এলো ক্রোধে, হাতের মুঠো শক্ত করে ফেলল সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে।

“এই মহিলা আবার কি? থাপড়ে তোর দাঁত ফেলে দেব বেয়াদব। খালামণি হয় আমাদের!”

“খালামণি হবে তোমার! আমাদের তো…সৎ খালা!”

ইরাম নিজের হাতটা সহসাই উঁচিয়ে ধরল, যেন উদ্দেশ্য ইহানকে চড় দেয়া। তবে শেষ মুহূর্তে সে নিজেকে আটকে ফেলল। ইরাম নিজেকে আটকালেও আর চুপ বসে থাকলনা সাইবান। সটান উঠে পড়ল সোফা থেকে। সামিয়ার শান্ত হওয়ার ইশারা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে আইসক্যাপ মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে এগোল। তাকে দেখতে শিকারীর মতন লাগছে। ইহানের মুখোমুখি দাঁড়াল সে,

“কি বললি তুই পোংটা? আরেকবার বল তো।”

সাইবান হঠাৎ করে এমন বিপদজনক রুদ্রমূর্তি ধারণ করায় ইহান একটু হলেও ভড়কাল। তবে মাথা নত করলনা।

“সৎ…!”

শেষও করতে পারলনা ইহান। সাইবানের হাত এগোল বিদ্যুতের গতিতে। ছেলেটার কলার পাকড়াও করে এক ঝটকায় রীতিমত শূন্যে তুলে ফেলল। ইহান সাইবানের হাতে ঝুলতে লাগল, তার পা মেঝে থেকে ইঞ্চিকয়েক উপরে, যেন পুতুলমাত্র। গর্জে উঠল সাইবান,

“কনভিন্স মি! কেন আমার এক্ষুণি তোকে কে*টে কুচি কুচি করে ড্রেনে ভাসিয়ে দেয়া উচিত না? তোর জিভ দিয়ে আগুন ঝরে তাইনা? ওই জিভ আমি…”

“আলাদিন।”

মাঝখানে হস্তক্ষেপ করল ইরাম। সাইবানের বুকে এক হাত ঠেকিয়ে অন্য হাতে ছটফট করে থাকা ছোট ভাইকে ছাড়িয়ে নিল। কয়েক কদম পিছিয়ে গিয়ে কাশতে কাশতে দীর্ঘ প্রশ্বাস টানল ইহান, হিংস্র চোখে চেয়ে রইল সাইবানের দিকে। মুখটা টকটকে লাল হয়ে গিয়েছে বেচারার। সাইবানকে জোরপূর্বক ঠেলে পিছিয়ে নিয়ে গিয়ে ইরাম দুজনের মাঝখান বরাবর দাঁড়াল। তাকাল ইহানের দিকে,

“ইহান। আমার মেজাজ খারাপ হওয়ার আগে স্পষ্ট শুনে রাখ, আমাকে কেউ জোর করছেনা। আমি স্বইচ্ছায়, সুস্থ মস্তিষ্কে আলাদিনকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি। তুই কিছু না জেনে, না বুঝে জন্তুর মতন একটা নির্দোষ মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিস। উপরন্তু মানুষটা তোর চাইতে বয়সে অনেক বড়। আলাদিনকে এক্ষুণি সরি বলবি তুই, মাফ চা।”

“নো ওয়ে!”

লাফিয়ে উঠল ইহান। চিৎকার করে বলল,

“আমি এখানে এসেছি তোমার জন্য আপু, তোমাকে বাঁচাতে। আর তুমিই আমাকে উল্টো ওদের কাছে মাফ চাইতে বলছ? আমি কিচ্ছু ভুল করিনি, ঠিক করেছি, দরকার পড়লে আবার করব। কিসের বিয়ে কিসের কি? এই বিয়ে আমি মানিনা! ওই বদমাইশটাকে আমি চিনি না মনে করেছ? পুরো এলাকায় ফেমাস ওর কেচ্ছাকীর্তি। আমি এমন কারো সাথে তোমার বিয়ে কিছুতেই হতে দেব না। না না না!”

“আচ্ছা? তোমার এই অন্যায়ের প্রতিবাদ বচন কোথায় ছিল যখন তোমার বড় ভাই বোনের সব ত্যাগ তিতিক্ষা ভুলে নিজের মায়ের বাড়িতে সামান্য আশ্রয়টুকু অবধি দিতে পারেনি? কোথায় ছিল তোমার এই আগুনঢালা তেজ যখন তোমার বোনের বিবাহিত জীবন অন্য একটা পুরুষের জন্য উচ্ছন্নে গিয়েছিল? কোথায় ছিলে তুমি? কলেজে প্রেম করছিলে? নাকি ঠুলি চোখে চেপে বসেছিলে?”

প্রতিবাদটা এলো সবথেকে অপ্রত্যাশিত এক নারীর পক্ষ থেকে। সারিকা। দুই হাতেই মেহেদী শুকিয়ে গাঢ় কমলা বর্ণ ধারণ করেছে তার। কয়েক পা এগোল সে,

“এই বাড়িতে এসে অহেতুক নাটক খাড়া করবেনা। যদি মুরোদ থাকে তো বাড়ি গিয়ে রাহাত ভাইয়ের কলারটা টেনে ধরে তার মুখে দুটো ঘুষি দাও। আমার ভাইয়ের দিকে চোখ দিতে এলে ছোট মানুষ বলে আর খাতির করবনা কিন্তু!”

কিছু বলতে চাইলেও এর বিপক্ষে বলার মত আর শব্দ খুঁজে পেলনা ইহান। সত্যিই তো। তার মায়ের মত বড় বোনটার জীবনের উপর দিয়ে কালবৈশাখী বয়ে গিয়েছে, অথচ সে ভাই হয়ে কিছুই করতে পারেনি। তার বয়স, তার অক্ষমতা তাকে আটকে দিয়েছে। একটা কিশোর ছেলের চিৎকার চেঁচামেচি তো কেউ গোণায় ধরেনা। নিজেকে অসহায় লাগল তার। হাতের মুঠো শক্ত করে তাই নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। যদি ক্ষমতা থাকত, এই মুহূর্তে ইরামকে নিয়ে সে বেরিয়ে যেত বাড়ি থেকে। কিন্তু নিয়ে সে যাবেটাই বা কোথায়? বাড়িতে তো রাহাতের বউ মিথিলার হুকুম চলে।

ছোট ভাইয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব খেয়াল করে খানিকটা নমনীয় হলো ইরাম। এগিয়ে গিয়ে ইহানের বাহু ধরে তাকে টেনে এক কোণায় নিয়ে গেল। অতঃপর ভাইকে কাছে টেনে তার কপালের পাশে ঠোঁট ছুঁয়ে ফিসফিস করে মৃদু গলায় বলল,

“আমি একদম ঠিক আছি, ভাই। বিশ্বাস কর। ওরা কেউ আমাকে জোর করছেনা। আমি যা করছি ভেবেচিন্তে করছি। খালামণির মত ভালো মানুষ দুটো হয়না। ওরা সবাই আমাকে এই বাড়িতে নিজেদের পরিবারের সদস্যের মতনই মেনে নিয়েছে। রইল বাকি আলাদিন? ওর তো নিজের জীবনটাই নষ্ট হয়ে গিয়েছে আমার জন্য। তবুও মানবিকতার খাতিরে ও আমায় গ্রহণ করে নিয়েছে। তুই ভুল বুঝিস না। মাথা ঠান্ডা করে বাসায় যা। আমি পরে তোর সাথে ভালোমত কথা বলব, প্রমিজ।”

ইহান একটি দীর্ঘ প্রশ্বাস টেনে মাথা দুলিয়ে সায় জানাল। শরীর থেকে সব রাগ তার বেরিয়ে গিয়েছে শুধু বড় বোনের আদুরে ছোঁয়ায়। সকলের দিকে অত্যন্ত বিতৃষ্ণার দিকে শেষ একবার তাকালেও ইহান আর ঝামেলা করলনা। চুপচাপ হনহন করে হেঁটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

সে চলে যেতেই একটি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইরাম ঘুরে দাঁড়াল। সবার উদ্দেশ্যে চেয়ে বলল,

“আমার ভাইয়ের কাজের জন্য আমি খুবই লজ্জিত এবং দুঃখিত। সবাই প্লীজ ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

মেহেদী রাতটা কিছুক্ষণ পরেই আবার আগের মত জমজমাট হয়ে উঠল মিসির এবং সাইবানের বন্ধুদের প্রচেষ্টায়। ইযান হয়ে গিয়েছে গ্রুপের মধ্যমণি। তাকে নিয়ে কারো আগ্রহের শেষ নেই। ইরামের হাতের মেহেদী প্রায় শুকিয়ে এসেছে। তাই সুগন্ধাকে কাজে হাতে হাতে সাহায্য করল সে। ট্রেতে করে শরবত নিয়ে এসে সকলকে পরিবেশন করে দিল। আফনান, নীরব এবং অনুরাগ আরেক দফায় তাকে দেখল। বয়স শুনে যেমন চিত্র তারা মনে কল্পনা করে রেখেছিল, ইরাম তেমনটা নয়। এই কারণেই সকলে খানিক আগে অবাক হয়েছিল।

এমনটা নয় যে ইরাম বেশ সুন্দরী। তার মুখবর্ন উজ্জ্বল শ্যামলা। বয়স যে ত্রিশের কোঠায় সেটাও বোঝা সম্ভব তার অভিব্যক্তিতে। যুবতী মেয়েদের ভেতর একটা চাঞ্চল্য থাকে, সেখানে ইরামের ভেতর রয়েছে শীতলতা, প্রশান্ত অনুভব। বয়সের সঙ্গে মানানসই তার চালচলন। ইযান কেঁদে উঠলে যেভাবে ছেলেকে সামলাচ্ছে, অপর দিকে কাজেও বেশ সাহায্য করছে সেটা দেখলেই তার পারদর্শীতার পরিচয় পাওয়া যায়। ইরাম আর সাইবানকে হুট করে পাশাপাশি দেখলে সত্যিই ভীষণ বেমানান লাগে। তবে সময়ের সাথে সাথে মনে হয়, দুজনকে একে অপরের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানিয়েছে। মূলত সেই কারণেই বন্ধুদের দল হঠাৎ করে ইরামকে দেখে বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। তাদের ইমম্যাচিউর ডি জে এক ম্যাচিউর মেয়ের সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে বিষয়টা ভাবলেও কেমন অবাস্তব মনে হচ্ছে। সাইবানের মতন পাগলাটে ঘোড়ার সঙ্গে ইরামের মতন শান্তশিষ্ট প্রয়োজনে রুষ্ট নারী কীভাবে একটা সংসার সাজাবে সেটা কল্পনা করার সাধ্যও আপাতত কারো হচ্ছেনা।

বন্ধুদের দল থেকে খানিকটা সময়ের জন্য নিজেকে ছাড়িয়ে অনুরাগ এলো কিচেনে। তার হাতে মিষ্টি লেপ্টে গিয়েছে। কেমন চিটচিটে লাগছে। এই বাড়ির নাড়ি নক্ষত্র তার চেনা। সেই ছোট্টবেলা থেকেই যাতায়াত। কোথায় কি আছে সব তার মুখস্থ। সিংকে হাত ধুয়ে তোয়ালেতে হাত মুছে নিচ্ছিল সে। ঠিক এমন সময়েই পিছনে ভিন্ন এক অস্তিত্বকে টের পেল। সুঘ্রাণটা নাকে এসে ঠেকল, ওই শরীরের ঘ্রাণ তার খুব চেনা, ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

“কেমন আছেন, অনুরাগ?”

ধীরে সুস্থে ঘুরে দাঁড়াল অনুরাগ। তার সামনে দন্ডায়মান সারিকা। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। সিল্কি চুলগুলো কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। অপূর্ব মায়া মায়া লাগছে মুখটা। কতদিন পরে দেখল অনুরাগ মুখটা? হিসাব নেই। দৃষ্টি এড়িয়ে গেল সে, তাকাল তীর্যকভাবে, সারিকা যেখানে দাঁড়িয়ে ঠিক তার পিছনের টেবিলের দিকে।

“ভালো।”

এক শব্দে জবাব দিল অনুরাগ। সারিকাও বুঝি কথা হারিয়ে ফেলেছে। নীরবে দাঁড়িয়ে নিজের পায়ের দিকে তাকিয়ে রইল রমণী। অনুরাগ গলা খাঁকারি দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল,

“কতদিনের জন্য আসা হলো? বিয়ে শেষে চলে যাবেন?”

চোখ পিটপিট করল সারিকা। যেন ঘোর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

“তেমনটাই পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমাদের অ্যাপার্টমেন্টে রিনোভেশনের কাজ শুরু হচ্ছে। ও চায় আমি ততদিন বাবার বাড়িতেই থাকি।”

“ও?”

পরিহাসের হাসি হাসল অনুরাগ। একটুখানি। ঠিক পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। চোখে আঙুল চালিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“যাকগে। শুনে ভালো লাগল যে আপনি সুখে আছেন।”

সারিকার ঠোঁটে অতি সূক্ষ্ম এক বেদনার হাসি ফুটল বুঝি। অনুরাগ দেখলনা। দেখতে চায়না, শুধু কষ্ট বাড়ে।

“আমি যাই। আমাকে বোধ হয় ওরা খুঁজছে।”

একটা বাহানা দিয়ে হনহন করে কিচেনের বাইরের দিকে এগোল অনুরাগ। তবে সারিকার কন্ঠস্বর তাকে জমে যেতে বাধ্য করল,

“আপনি বিয়ে করছেন না কেন?”

প্রথমটায় কিছুই বললনা অনুরাগ। সারিকা ঝাপসা দৃষ্টিতে দেখল, তার কাঁধজোড়া উঁচু হয়ে আবার ঝুলে পড়ল। সামান্য শব্দ তুলে হাসল এবার সিনহাদের ছেলে, অতঃপর একটি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“বিয়ে? এখনো সময় হয়নি। ভগবান যখন চাইবেন, তখন হয়ে যাবে। চিন্তা নেই।”

এটুকু বলেই অনুরাগ বেরিয়ে গেল কিচেন থেকে। সারিকা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইল, যতক্ষণ বান্দাকে দেখা গেল। কখন যে তার বাম চোখ বেয়ে একফোঁটা উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে নামল সে টেরটুকুও পেলনা। দ্রুত শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে ফেলে চেহারায় জোরপূর্বক শান্তভাব ফুটিয়ে সে কিচেনের বাইরের দিকে হাঁটা দিল। যেই না সে বাইরে পা রেখেছে, অমনি এক অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যের মুখোমুখি হলো। দেয়ালের পাশেই একদম নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে ইরাম। হাতে খালি গ্লাস ভর্তি ট্রে। খুব সম্ভবত কিচেনে এসব রেখে যেতে এসেছে। সারিকা ভ্রু কুঁচকে খানিকটা শত্রুভাবাপন্ন দৃষ্টিতে তাকাল। এই মেয়ে কিছু শুনেছে নাকি?

অথচ ইরাম যেমন শান্ত ছিল, তেমনি শান্ত রইল। এগিয়ে এসে একদম নীরবে সারিকাকে পাশ কাটিয়ে কিচেনের ভেতর আড়াল হয়ে গেল সে।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

ভোররাত। চারটা বেজে এসেছে। আর কিছুক্ষণ বাদেই ফজরের ওয়াক্ত শুরু হয়ে যাবে। অথচ ইরামের চোখে কোনো ঘুম নেই। ইযান তার বুকের উপর পরম শান্তিতে নিদ্রাচ্ছন্ন। সারাদিনের কার্যক্রমে ওইটুকু দুধের বাচ্চা এমনভাবে ঘুমাচ্ছে যে একবারও ইরামকে জ্বালাতন করার জন্য জেগে ওঠেনি। ইরামের শরীর যেন ঝিম ধরে আছে। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টা। এরপরই তার জীবন নেবে এক নতুন মোড়। সে কি পারবে এই লড়াইয়ে টিকে থাকতে? জীবনটা তো তার জন্য কখনোই ভালো কিছু বয়ে আনেনি। নানান চিন্তা তাকে বিশ্রাম নিতে বাঁধা দিচ্ছে।

শেষমেষ ইরাম হার মানল। ইযানকে বিছানায় শুইয়ে কোলবালিশ দিয়ে মাঝখানে রেখে উঠে এলো। এলোমেলো চুলগুলো আঁচড়ে খোঁপা বেঁধে ওড়না গায়ে জড়িয়ে বেরিয়ে এলো বাইরে। সারা বাড়ি আধ অন্ধকার। সকলেই নিজেদের ঘরে বিশ্রাম নিচ্ছে। সকাল হতেই ব্যস্ততা শুরু হবে। ইরাম অতি নিঃশব্দে কিচেনে গিয়ে এক কাপ চা বানাল নিজের জন্য। অতঃপর গরম ধোঁয়া ওঠা কাপ নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাইরের বাগানে গেল। শেষ রাতের খোলা ঠান্ডা বাতাসে প্রাণ জুড়িয়ে এলো বুঝি। গরম চা মস্তিষ্কের অনেক প্যাচ খুলতেও সাহায্য করছে। ইরাম যখন সবেমাত্র একটু স্বস্তি অনুভব করছিল, তখনি খেয়াল করল বাড়ির লোহার মেইন গেট হালকা খোলা। সেখান দিয়ে নিঃশব্দে গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকছে কেউ। প্রথমে আবছায়া দেখা গেল। চোর টোর নাকি? ইরাম উত্তেজিত হয়ে কয়েক পা এগিয়েই থেমে গেল।

সাইবান। চোরের মতই ভেতরে ঢুকছে। পরনে কালো সিল্কের পাজামা সেট। ঘুমানোর পোশাক। চোখেমুখে একটা ধূর্ততা, সঙ্গে দুষ্টুমির ছাপ। নিশ্চয়ই কোনো কার্যসিদ্ধি করে এসেছে। তবে সবথেকে অবাক করা ব্যাপার সাইবানের পায়ের কাছে কিছু ছোট্ট প্রাণীর অস্তিত্ব। তিনটে ছোট ছোট ইঁদুর! হ্যাঁ, একদম মুরগীর বাচ্চার সাইজের, সাদা এবং বাদামী বর্ণের ইঁদুরের ছানা! ইরাম প্রথমে নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারলনা।

সাইবান বেশ খানিকটা এগিয়ে আসার পর ইরামকে দেখে থমকাল। তবে চোখেমুখে কোনো অভিব্যক্তি ফুটতে দিলনা। শুধু হালকা একটু কেশে শুধাল,

“ঘুমাননি এখনো?”

তবে ইরামের সমস্ত মনোযোগ এখন সাইবানের পায়ের কাছে ঘুরঘুর করতে থাকা ইঁদুরের ছানার দিকে।

“তুমি কোথা থেকে ইঁদুর ধরে এনেছ?”

ইরাম বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই সাইবান চোখমুখ কুঁচকে ফেলল, যেন অপমানিত হয়েছে।

“ইঁদুর? ইঁদুর হবে আপনার ভাই! এগুলো হ্যামস্টার, আমার বাচ্চারা!”

ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল ইরাম। সাইবান নুয়ে নিজের হাতের তালুর উপর তিনটি হ্যামস্টারকে তুলে নিয়ে বুকপকেটের ভেতর রাখল। তিনজনই ঠাসাঠাসি করে বসে মুখ বের করে দাঁত দেখাতে লাগল। আঙুল তুলে পরিচয় করিয়ে দিল সাইবান, ধবধবে সাদাটাকে প্রথম দেখিয়ে বলল,

“ওর নাম চেঙ্গিস খান!”

ইরামের মাথায় বুঝি বাজ পড়ল। মানুষকে বহু ধরণের প্রাণী সে পালতে দেখেছে। বিড়াল, কুকুর, পাখি, মাছ, গরু। কিন্তু ইঁদুর? তাও এমন বলের মতন কিউট কিউট প্রাণীগুলো পালছে কিনা একটা জোয়ান ছেলেমানুষ? যার চরিত্রের সঙ্গে কিউট শব্দটা একেবারে যায়ই না? উপরন্তু, পালিত পশুপাখির নাম মানুষ ছোট ছোট শব্দে রাখে। লালু, কালু, টম, টমি, পুচু, পুচি কত কি। সাইবান কিনা ওই ইঞ্চি কয়েক সাদা পশমের বলটার নাম রেখেছে চেঙ্গিস খান? এসব মানা যায়?

সাইবানের ইরামের হতবিহ্বলতার প্রতি বিশেষ মনোযোগ নেই। আঙুল দিয়ে সে সাদা আর বাদামী পশমের মিশেলের হ্যামস্টার দেখিয়ে বলল,

“কিম জং হিটলার।”

সবশেষে গোটা প্রায় বাদামীটাকে দেখিয়ে বাঁকা হেসে জানাল,

“আর এটা বারাক ওসামা।”

ইরামের প্রচন্ড হাসি আসছে, অট্টহাসি হাসতে ইচ্ছা করছে। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে সে শক্তভাবে চায়ের কাপ ধরে রাখল। তিনটা আদুরে ছোট্ট ইঁদুর বড় বড় মায়াবী চোখে তার দিকে চেয়ে আছে। আর এদের ডাকতে হবে কিনা চেঙ্গিস, হিটলার, ওবামা…থুরি ওসামা বলে!

“ওরা বাচ্চা দিলে কি নাম রাখবে? বখতিয়ার খলজি? নাকি লর্ড ক্লাইভ?”

খিলখিল করে হেসে উঠল সাইবান। ছেলেটা সবসময়ই হাসে, তবে সেই দুষ্টুমির হাসির সঙ্গে এই হাসির একটা বিস্তর ফারাক আছে। সাইবানের তীক্ষ্ণ সুঁচালো দাঁত দুটো ঠোঁটের দুইপাশ থেকে বেরিয়ে এসেছে, খানিকটা ভ্যাম্পায়ার গোছের দেখতে লাগছে। অকৃত্রিম হাসিটার দিকে ইরাম প্রয়োজনের চাইতে খানিক বেশি সময় ধরে কেন তাকিয়ে রইল বুঝতে পারলনা।

“ভালো আইডিয়া, কিন্তু আপনি ফেইল। নাম দেয়ার কম্পিটিশনে আমি সবার আব্বু লাগি।”

খানিকটা ভাব নিল সাইবান। পায়ে পায়ে এগোল। তারপর হুট করেই ইরামের হাত থেকে আধখাওয়া চায়ের কাপটা নিজের হাতে নিয়ে চুমুক দিল।

“এই এই! আমি এটা খাচ্ছিলাম!”

ইরাম হাত বাড়িয়েও চা বাঁচাতে পারলনা। সাইবান চুমুক দিয়ে সবটুকু গিলে ফেলে খালি কাপটা তার হাতে রেখে দিল। জিভ দিয়ে ঠোঁট চেটে নিয়ে বলল,

“মমম, ডেলিশিয়াস।”

নাক কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে ইরাম বলল,

“আমি চা ভালোই বানাই।”

“আমি চায়ের কথা বলিনি।”

ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকল রমণী। সাইবানের কথার অর্থটা সে এক মিনিট যাবৎ ধরতেই পারলনা। মাথা নিচু করে কাপের দিকে তাকাল সে। খেয়াল করল, যেই ধারে চুমুক দিয়ে সে পান করছিল, সাইবান ঠিক সেই স্থানেই চুমুক দিয়েছে। ইরামের ঠোঁটে দেয়া হালকা ভ্যাসলিনের প্রলেপ সেখানে এখনো লেপ্টে আছে।

“ভ্যাসলিন ত্বকের জন্য উপকারী জানতাম, খেতেও চমৎকার এটা আজ জানতে পারলাম।”

সাইবানের চেহারা কুঁচকে গেল,

“আপনি একটা মুড স্পয়লার সেটা জানেন?”

“কোন মুডের কথা বলছ?”

হঠাৎ করেই ইরামের একদম কাছে সরে এলো সাইবান। তবে সকালের মতন তাকে স্পর্শ করলনা। শুধু গভীর চোখে তাকাল তার চোখের দিকে। ইরাম হলফ করে বলতে পারবে এক সেকেন্ডের জন্য সাইবানের দৃষ্টিটা তার চোখ থেকে ঠোঁটে নেমে গিয়েছিল।

“যে মুডের জন্য মানুষ বিয়ে করে সেই মুড।”

“গেঞ্জিরা কোন মুডের কারণে বিয়ে করে?”

তীর্যক হাসল সাইবান। নুয়ে নিজের মুখটা ইরামের মুখোমুখি আনল। তার বুকপকেটে হ্যামস্টারগুলো চুকচুক করে সিল্কের কাপড় কামড়াতে কামড়াতে পালক পিতার কান্ডকারখানা দেখছে।

“জেন জি কোন মুডের কারণে বিয়ে করে সেটা আপনি আজ রাতেই টের পেয়ে যাবেন, মাই ডিয়ার আপু।”

চোখ বড়বড় করে ফেলল ইরাম। সাইবান আরেকটু বিস্তৃত হেসে যুক্ত করল,

“অন সেকেন্ড থট, এবার থেকে আমার আপু ডাকটা পরিহার করা উচিত, তাইনা? কি নামে ডাকি আপনাকে? বলুন তো?”

“তুমি না নাম দিতে ওস্তাদ? তোমার মুখ থেকেই শুনি।”

দাঁতে ঠোঁট কামড়ে গভীরতম দৃষ্টিতে তাকাল সাইবান। তার ভ্রু পিয়ার্সিং জ্বলজ্বল করে উঠল ভোরের কমলাভ আলোয়।

“দিলেন তো ঘেটু করে। আমার বউকে আমি কি নামে ডাকব জানতে পারলে আপনি সইতে পারবেন না, আপু।”

“এতটাও দূর্বল মনে হয় আমাকে?”

“হ্যাঁ, স্লো সে—**।”

চোখ পিটপিট করল ইরাম, সাইবান এত আস্তে বিড়বিড় করে কথাটা বলেছে যে সে ঠিকমত শুনতে পায়নি।

“কি বললে?”

বিরাট হাসল সাইবান, দূরে সরে দাঁড়িয়ে এবার জোর গলায় বলল,

“স্নোফ্লেক্স। সি ইউ অ্যাট আওয়ার ওয়েডিং সুন!”

স্যালুটের ভঙ্গি করে সাইবান নিজের হ্যামস্টার বাচ্চাদের আদর করতে করতে হেলেদুলে ঘরের ভেতরে চলে গেল। ইরাম তাকে জিজ্ঞেস করার সুযোগও পেলনা এই ভোররাতে ছেলেটা বাইরে কোথায় গিয়েছিল, কি কান্ড করে এসেছে। সে শুধু অথর্বের মতন দাঁড়িয়ে থাকল নিজের জায়গায়। পরক্ষণে হাতের খালি কাপটার দিকে তাকাল। সূর্যোদয় হতে শুরু করেছে। লালচে কমলা রশ্মিতে ছেয়ে গিয়েছে গোটা ধরিত্রী। দমকা হাওয়া এসে ইরামের ওড়না উড়িয়ে নিল। এক হাতে খোঁপা টেনে খুলে দিল সে। লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়তে লাগল নদীর ঢেউয়ের মতন। চোখ বুঁজে ফেলল ইরাম, অনুভব করল পৃথিবীকে।

অবশেষে এই দিনটির আলো তার শরীর ছুঁয়েই দিল। নতুন শুরু নাকি নতুন সমাপ্তি? কোনটার সূত্রপাত ঘটবে আজ? সেটা এখন শুধু সময়ই বলতে পারবে।

                                 —চলবে—

[ 🚫নোট: সেন্সর করা শব্দ দুটো শুধু এবং শুধুমাত্র চরিত্রের ভাবমূর্তি উপস্থাপন এবং জেনারেশনাল থিংকিং স্টাইলের উপর ভিত্তি করে লিখা হয়েছে। ভবিষ্যতে কিছু মনস্তাত্ত্বিক বিষয় উপস্থাপনে খোলামেলা কিছু শব্দের ব্যবহার আসতে পারে, সেক্ষেত্রে অ্যালার্ট ব্যবহার করা হবে। আশা রাখছি সবাই বিষয়টিকে শুধুমাত্র চরিত্রের পার্সোনালিটির অংশ হিসাবেই ধরবেন। ধন্যবাদ।🥀]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply