Golpo romantic golpo অবাধ্য হৃৎস্পন্দন

অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৩


#অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৭৩)

#সোফিয়া_সাফা

রাত এগারোটা। থান্ডার এস্টেটের বিশাল, রাজকীয় ডাইনিং হল জুড়ে নীরবতা বিরাজমান। সবাই খেতে বসেছে, অথচ কারও মুখে কোনো কথা নেই। নীরবতা ভেঙে রিদম গলা ঝেড়ে বলল, “কাল সবাই তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে পড়িস। বিকেলেই কিন্তু ফ্লাইট।”

কথাটা যেন শূন্যে মিলিয়ে গেল। টেবিলে বসা কেউ কোনো প্রত্যুত্তর করল না, যেন তারা আগে থেকেই এই ব্যাপারে জ্ঞাত। উর্বী একমনে প্লেটের দিকে তাকিয়ে খাবার গিলে যাচ্ছে। রিদম তার দিকে একনজর তাকাল। উদ্যানেরা ফুলকে ফেলে চলে আসার পর থেকে উর্বী একটা কথাও বলেনি তার সাথে। রিদমের বুকের ভেতর একটা অপরাধবোধ মোচড় দিয়ে ওঠে, আবার পরক্ষণেই গুলিয়ে যায়; সে এখনো বুঝেই উঠতে পারছে না যে এখানে তার দোষটা কোথায়? সে কি বলেছে রেখে আসতে? আজব!

এদিকে টেবিলের অন্যপ্রান্তে অনিলা দু-এক লোকমা মুখে দিয়েই চুপচাপ প্লেটের ওপর কাঁটাচামচ দিয়ে হিজিবিজি আঁকিবুঁকি করছিল। আনমনে চেয়ে থাকা অনিলার এই উদাসীনতা অনির চোখ এড়ালো না। সে আলতো করে অনিলার হাতের ওপর হাত রেখে নরম সুরে শুধাল, “কী হয়েছে, খাচ্ছো না কেন?”

অনিলা কোনো উত্তর দিল না। কেবল মাথাটা আরও নিচু করে নিল। ডাইনিং হলের শুভ্র আলোয় অনির চোখ এড়ালো না কীভাবে টপটপ করে দু-ফোঁটা নোনা জল অনিলার গাল বেয়ে প্লেটের ওপর ঝরে পড়ল। অনি হকচকিয়ে গেল। ফুলকে রেখে উদ্যানেরা মেক্সিকো ফিরে আসার পরপরই অনিলা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সেদিনই তারা জানতে পেরেছে অনিলা মা হতে চলেছে। এরই মধ্যে মেয়েটা কথায় কথায় এত বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ে যে অনি বেশিরভাগ সময়েই তাকে কীভাবে সামলাবে বুঝে পায় না। খবরটা শুনে তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে খুশিও হতে পারেনি ফুলের জন্য। উর্বীর মতো অনিলাও অনিকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি সফল হয়ে ওঠে না।

“ফুলের কথা মনে পড়ছে?” অনি খুব নিচু স্বরে, যেন শুধু অনিলাই শুনতে পায়, এমনভাবে প্রশ্নটা করল।

এবার অনিলা ভেজা চোখে মাথা নেড়ে বলে ফেলল, “হ্যাঁ, মেয়েটা যখন শুনেছিল মেলো নরওয়েজিয়ান এবং আমরা এ বছর সেখানে যাবো তখন এত্তো এক্সাইটেড হয়ে পড়েছিল যে কী বলবো। শুনেছি ওর ড্রিম কান্ট্রি হলো নরওয়ে। এখন যদি ও আমাদের সাথে থাকতো কতো খুশি হতো ভাবতেই খুব খারাপ লাগছে।”

কথাটা উপস্থিত সবাই শুনলো কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সবার প্রথমে নিজের আধখাওয়া প্লেট ঠেলে রেখে উঠে চলে গেল উর্বী। তার পরপরই চেয়ার ছাড়ল সোহম। একে একে মেলো আর লুহানও। অনিলাও চোখ মুছতে মুছতে টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, অনি আর বসেনি, সেও স্ত্রীর পিছু নিল।

বিশাল ডাইনিং হলে শুধু থেকে গেল উদ্যান আর রিদম। উদ্যানকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে খেতে দেখে টেবিলের ওপর ভর দিয়ে রিদম বলল, “উর্বীকে নিয়ে বাংলাদেশে যেতে চাইছি। যেতে পারি?”

উদ্যান খাওয়া থামিয়ে বরফশীতল চোখে তাকাল রিদমের দিকে। তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “আমার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার কিছু আছে বলে মনে করি না। তবে যাওয়ার আগে এটা বলে যা তুই সেখানে গেলে নরওয়ের প্রজেক্টের কী হবে?”

রিদম থম মেরে গেল। উদ্যানের চোখের প্রখরতার সামনে তার কণ্ঠস্বর যেন নিমেষেই মিইয়ে গেল। সে মিনমিনিয়ে বলল, “তুই যদি আমার কাজগুলো একটু ম্যানেজ করে নিতি কয়েকটা দিন…”

উদ্যান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে বলল, “আমি পারব না। আর অন্য কেউও তোর কাজ ম্যানেজ করতে পারবে না। তবুও তুই যেতেই চাইলে একেবারে লিভ নিয়ে যেতে পারিস।”

উদ্যানের এই অনমনীয়তা রিদমের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটাকে উষ্কে দিল। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তপ্ত গলায় বলল, “তুই সরাসরি কেন বলে দিচ্ছিস না যে বোকাফুলের সাথে আমরা দেখা করি সেটা তুই চাস না।”

“হ্যাঁ, চাই না!” উদ্যানও এবার রুক্ষস্বরে জবাব দিল, “কেন দেখা করতে যাবি ওর সাথে? কী দরকার?”

রিদম ঠোঁট কামড়ে উর্বীর নামটা মুখে এনেও শেষ মুহূর্তে গিলে ফেলল। এমনিতেই উদ্যান উর্বীকে খুব একটা পছন্দ করে না, তার ওপর উর্বী যেতে চাইছে শুনলে পরিস্থিতি আরও বিষিয়ে উঠবে।

হতাশ আর ক্লান্ত রিদম নিজের রুমে ফিরে এসে দেখল, উর্বী চুপচাপ খাট গুছিয়ে শোয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ঘরের মৃদু আলোয় উর্বীর বিষণ্ণ অবয়ব দেখে রিদমের বুকটা কেমন যেন করে উঠল। সে জড়োসড়ো হয়ে খাটের একপাশে এসে বসল।

“তুমি দেশে ফিরতে চাইছো তো? বেশ, আমি নিয়ে যাবো তোমাকে।”

​রিদমের আকস্মিক কথায় উর্বীর হাত দুটো চাদরের ওপরেই আটকে গেল। সে স্তম্ভিত চোখে তাকাল। রিদম ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটিয়ে বলল, “তেহ বলেছে বোকাফুলের সঙ্গে দেখা করতে গেলে একেবারেই চলে যেতে হবে। আমি সেটাই করতে যাচ্ছি উর্বশী। আশা করি সেটা করার পর আমার ওপর তোমার আর কোনো অভিযোগ থাকবে না।”

উর্বী দীর্ঘশ্বাস ফেলল। হাতের কাজ ফেলে সে রিদমের ঠিক পাশে এসে বসল। তার চোখে এখন আর রাগ নেই, আছে একরাশ ক্লান্তি। বলল, “আমি চাই না আমার বন্ধুর সাথে দেখা করার চড়া মূল্য হিসেবে তোমাদের এত বছরের বন্ধুত্বটা এভাবে নষ্ট হয়ে যাক, রিদম।”

এতোগুলো দিনের পর উর্বীর কথা শুনে রিদমের বুকটা ভারী হয়ে এলো। সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না; আচমকা উর্বীকে জড়িয়ে ধরে তার বুকের মধ্যে মাথাটা লুকিয়ে ফেলল। উর্বী ক্ষণিকের জন্য থতমত খেয়ে গেলেও, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল।

রিদম কাঁপা কাঁপা স্বরে বলতে লাগল, “আমাদের আর তেহুর মাঝে আর যাই হোক বন্ধুত্ব নেই উর্বশী। তেহ আমাদের বন্ধু ভাবতে পারেনি কখনো, ভবিষ্যতেও পারবে না। ওর বাবা আর ফুলের বাবাও বন্ধু ছিলেন, ফুলের বাবা ওদের সাথে কতটা খারাপ করেছে আমরা জানি। ওর ধারণা বন্ধু তেমনি হয়। তাই আমরাও এখন আর ওর বন্ধু হতে চাই না। শুধু এটুকু জানি ওদের থেকে দূরে গেলে আমার খুব কষ্ট হবে।”

উর্বী তার আকুলতা বুঝতে পারল। রিদমের চুলে আঙুল চালিয়ে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল, “হুম আমি জানি রিদম, ফুলকে ছাড়া থাকতে আমার আর অনিলার যেমন কষ্ট হচ্ছে তোমারও তেমনি হবে। হয়তো আরও অনেকগুণ বেশি হবে। তাই তো বললাম আমার জন্য নিজের বন্ধুদের ছাড়তে হবে না।”

রিদম উর্বীর বুক থেকে মাথা তুলে তার চোখের দিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে বলল, “কিন্তু আমি যে তোমাকেও এই অবস্থায় দেখতে পারছি না উর্বশী। আমি কী করবো বলো? তেহ আমাদের কারো কথাই শোনে না। ওর ওপর জোরজবরদস্তি করার শক্তিও নেই আমাদের।”

উর্বী জানলার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, “হুম, তা এতোদিনে আমিও খুব ভালো করে বুঝে গেছি। আর সত্যি বলতে, যা হয়েছে একদিক থেকে ভালোই হয়েছে রিদম। ফুল এখানে থাকলে তেহ ওকে আরও কষ্ট দিতো। চোখের সামনে মেয়েটাকে কষ্ট পেতে দেখাটা আমাদের জন্যও কষ্টদায়ক হয়ে উঠতো। তার চেয়ে ও দূরে থাকুক কিন্তু একটু স্বস্তিতে থাকুক।”

,

,

,

পরেরদিন। এস্টেট সদস্যরা লাঞ্চ করতে বসেছিল। কিন্তু অনুপস্থিত ছিল উদ্যান। অনি কল করলেও উদ্যান রিসিভ করেনি। খাওয়াদাওয়া শেষ হতেই উৎকণ্ঠা নিয়ে সবাই এসে জড়ো হলো মিটিং রুমে। সবার চোখে-মুখে উদ্বেগ।

​সোহম মাথা নিচু করে বলল, “ও কিন্তু এখনো নিয়মিত ড্রাগস নিচ্ছে।”

লুহান চেয়ার টেনে বসল। ক্লান্ত গলায় বলল, “হুম, জানি আমরা। কিন্তু আমাদের কী-ই বা করার আছে বল? ও তো এখন পুরোপুরি অ্যাডিক্টেড হয়ে গেছে।”

মেলো হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে ছিল। সে গম্ভীর মুখে যোগ করল, “ও যতক্ষণ পর্যন্ত না নিজেই ছাড়তে চাইবে ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের কিছুই করার নেই।”

রিদম এবার মুখ খুললো, “ও ছাড়ার জন্য কি আর জেনেশুনে আসক্ত হয়েছে?”

মেলো বলল, “ওর সমস্যাটা ঠিক কী সেটা জানতে পারলেও না হয় একটা উপায় বের করা যেতো।”

লুহান উদাস গলায় বলল, “সেটা জানার জন্য কি আমরা কম চেষ্টা করেছি? কোনো লাভ হয়েছে? ও যেন এক দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে রেখেছে নিজের চারপাশে।”

সোহম কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্তত করে বলল, “আচ্ছা, সমস্যাটা কি কোনোভাবে… ফুল কেন্দ্রিক হতে পারে?”

​‘ফুল’ নামটা উচ্চারিত হতেই বাকি তিনজন একযোগে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সোহমের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টির তীব্রতা সইতে না পেরে সোহম মেকি হেসে বলল, “আরে, আমি জাস্ট প্রশ্ন করেছি।”

রিদম বিরক্ত হয়ে চোখ রাঙাল, “কার কাছে প্রশ্নটা করেছিস শুনি, বুদ্ধু! উত্তরটা কে দেবে?”

রিদমের যুক্তিতে সোহমের ঠোঁটের কোণের মেকি হাসিটাও মিলিয়ে গেল।

অনি এতক্ষণ চুপচাপ সবার কথা শুনছিল। সে এবার বলল, “তেহুর কিছু হয়ে গেলে আমি একদমই দিশেহারা হয়ে পড়ব। তোদের সবাইকে আমি আমার পরিবারের সদস্য বলে মনে করি। আর তেহ হচ্ছে সেই পরিবারের প্রধান।”

‘কিছু হয়ে গেলে’—কথাটা যেন সোহমের স্নায়ুতন্ত্র সজাগ করে তুলল। সে অনির কাঁধ ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে গর্জে উঠল, “তেহুর কিছু হয়ে যাবে মানে? এই তুই কী বলতে চাইছিস? তোর মাথা ঠিক আছে?”

লুহান সোহমকে টেনে সরিয়ে নিল, “আহ সোহম, শান্ত হ! অনি ভুল কিছু বলেনি। ও যেভাবে দিনরাত ওগুলো কঞ্জিউম করছে, এভাবেই চলতে থাকলে ওর কিছু না কিছু ডেফিনিটলি হয়ে যাবে। এটা ও নিজেও জানে।”

​সোহম মাথা চেপে ধরে চেয়ারে এলিয়ে পড়ল। তার বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে, যেন ঘরের অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে। রিদম দ্রুত গিয়ে একগ্লাস পানি ঢেলে এনে সোহমের মুখের সামনে ধরল, “নে, আগে পানিটা খা।”

সোহম কয়েক ঢোক পানি গিলে নিজেকে একটু স্বাভাবিক করল। তারপরই চিলের মতো রিদমের কলার ধরে ব্যাকুল কণ্ঠে বলল, “ওই, তুই না ‘এল সেগুন্দো’! তুই কিছু কেন করছিস না?”

রিদম ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল। তর্জনী আঙুলটা নিজের মুখের দিকে তাক করে প্রশ্নবিদ্ধ কণ্ঠে বলল, “আমি? আমি কী করব?”

সোহম অল্পবিস্তর ভেবেই বলে দিল, ​“তুই লুহানকে অর্ডার দে, তেহকে হাত-পা বেঁধে ঘরের মধ্যে লক করে রাখতে! তাহলে ও আর ওসব খেতে পারবে না।”

লুহানের চোখে বিস্ময় খেলে গেল, “তুই কি তেহুর চিন্তায় পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছিস সোহম? তেহ ‘এল হেফে’ সেটা ভুলে যাস না। ওকে বেঁধে রাখার ক্ষমতা কার আছে?”

“এল হেফে হোক গে!” সোহম চিৎকার করে উঠল, “ও এখন নিজের প্রোপার কন্ডিশনে নেই। এই অবস্থায় রুলস অনুযায়ী এল সেগুন্দো যা বলবে, আমাদের তাই করতে হবে।”

সোহমের কথায় রিদম শুকনো ঢোক গিলল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। মেলো পরিস্থিতি সামাল দিতে বলল, “আরে থাম তোরা! তেহ এমন এক পর্যায়ে চলে গেছে যে এখন হঠাৎ জোর করে ওসব ছাড়াতে গেলে ওর উইথড্রল সিন্ড্রোম শুরু হবে, অবস্থা আরও খারাপের দিকে যাবে।”

“তোরা আমাকে নিয়ে একটু বেশি বেশিই চিন্তা করছিস না?”

হঠাৎ দরজার দিক থেকে আসা অতিপরিচিত শান্ত কণ্ঠস্বরটা শুনে সবাই স্ট্যাচু হয়ে গেল। তাদের চকিত দৃষ্টি একযোগে আছড়ে পড়ল দরজার দিকে।

এমনটা নয় যে দরজা খোলা ছিল। দরজাটা ভেতর থেকে লক থাকার পরেও কার্টেল বস নিজের ফিংগারপ্রিন্ট দিয়ে সেটা খুলে ফেলেছে। উদ্যানকে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বাকি চারজন অপরাধীর মতো কাঁচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল।

উদ্যান স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে এল। সবার মুখের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে রিদমের উদ্দেশ্যে বলল, “রিদম, তুই তো ‘এল সেগুন্দো’, রাইট?”

রিদম চোখ বুজে মাথা নাড়ল। ভাবল উদ্যান যেহেতু তাদের কথোপকথন শুনে ফেলেছে সেহেতু মনস্টারটা হয়তো প্রতিক্রিয়া দেখাবে। আর হলোও তাই! উদ্যান বলতে লাগল, “এল হেফের অবর্তমানে তোকে কী কী করতে হবে তা তো জানিসই নিশ্চয়ই। না জানলে সোহমের থেকে জেনে নিস, ও আবার গ্যাং-এর রুলসের ব্যাপারে খুব ডিটেইলসে জানে। কী রে সোহম! ঠিক বলেছি না?”

সোহম প্রত্যুত্তর করল না। স্রেফ অসহায় চোখে তাকিয়ে রইল উদ্যানের দিকে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “তুই লাঞ্চ করতে আসিস নি কেন? কল দিচ্ছিলাম তাও ধরলি না। ব্যস্ত ছিলি নাকি?”

“​হুম, ব্যস্ত ছিলাম বলতে পারিস,” উদ্যান অনির দিকে না তাকিয়েই জবাব দিল।

কেউ আর একটা শব্দও উচ্চারণ করার সাহস পেল না। উদ্যান নিজেই পকেটে হাত গুঁজে আবারও বলল, “তোদের এটাই জানাতে এলাম যে, আমি নরওয়ে যাচ্ছি না। আমার অবর্তমানে রিদম তোদের গাইড করবে।”

সবাই একসাথে চমকে উঠল। লুহান বলেই ফেলল, “মানে? কী বলছিস তেহ? হঠাৎ যাবি না কেন? সব প্রিপারেশন তো ডান!”

উদ্যান জবাব না দিয়েই ঘুরে চলে যেতে উদ্যত হলো। তাকে এভাবে চলে যেতে দেখে রিদম এবার দিকবিদিক জ্ঞান হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “তুই নিজের দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে চাইছিস? অথচ গতরাতে যখন আমি বাংলাদেশে যেতে চাইলাম, তুই আমাকে পরিষ্কার বলে দিলি—যেতে হলে একেবারেই লিভ নিয়ে চলে যেতে হবে! এটা কি আনফেয়ার নয়, তেহ?”

উদ্যান দরজার হাতলে হাত রেখে থমকে দাঁড়াল। তারপর ধীর পায়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আমি এড়িয়ে যাচ্ছি না। আসলে বাবার শারিরীক অবস্থার অবনতি হয়েছে। এই অবস্থায় তাকে ফেলে রেখে যেতে চাইছি না। আবার তাকে নিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। সবশেষে এল হেফের অবর্তমানে এল সেগুন্দোকেই সবদিক সামলাতে হয়। এটাও তার কাজের মধ্যেই পড়ে। তুই করতে না চাইলে আমাকে নতুন সেগুন্দো খুঁজতে হবে।”

উদ্যানের শেষোক্ত কথাটুকু যেন কারও কান পর্যন্ত পৌঁছালই না। তার বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে শুনেই বাকিরা বিচলিত হয়ে পড়ল। সোহম এগিয়ে এসে রুদ্ধশ্বাসে জানতে চাইল, “আঙ্কেল কি খুব বেশিই অসুস্থ?”

উদ্যান এক পলক সোহমের দিকে তাকাল। তারপর নিচু গলায় বলল, “হুম।”

উদ্যান আবারও হাঁটা ধরল। কিন্তু কয়েক কদম যেতেই তার পা দুটো আবার থেমে গেল। সে এবার আর পুরোপুরি ঘুরল না, শুধু ঘাড়টা সামান্য বাকিয়ে অদ্ভুত এক স্বরে প্রশ্ন করল, “তোরা কি… একবার ওনার সাথে দেখা করতে চাস?”

সবাই তৎক্ষনাৎ উপরনিচ মাথা নাড়ল। তারা অনেক আগে থেকেই দেখা করতে চাইছে কিন্তু উদ্যানকে বলার সুযোগ পাচ্ছিল না।

উদ্যান বাকিদের সাথে নিয়ে নিজের ঘরের গোপন দরজার দিকে এগিয়ে গেল। দেয়ালের এক কোণে হাত রাখতেই নিঃশব্দে সরে গেল স্লাইডিং প্যানেল। সেখান থেকে নেমে গেছে নিচে যাওয়ার সিঁড়ি। বাকি চারজন উদ্যানের পিছু পিছু সিক্রেট বেসমেন্টে নেমে এল।

জায়গাটা বড্ড নিস্তব্ধ আর শূন্যতায় ছেয়ে আছে। ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা একটা মেডিকেল বেড। নীল রঙের বেডশিট মোড়ানো সেই বিছানার ওপর অসাড় হয়ে পড়ে আছে তাশরিফ খানজাদার দেহখানা। ওপর থেকে চাদরের ভাঁজ দেখেই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, তার পা দুটো হাঁটুর কিছুটা ওপর থেকে কেটে ফেলা হয়েছে।

বেডের একপাশে দুটো মনিটর, যাতে তাশরিফ খানজাদার দুর্বল হার্টবিট ওঠানামা করছে। বর্তমানে তাকে সম্পূর্ণ লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। মনিটরের যান্ত্রিক ‘বিপ বিপ’ শব্দ ছাড়া ঘরে আর কোনো আওয়াজ নেই।

পাশেই দুজন ডাক্তার দাঁড়িয়ে আছেন, আর তাদের ঠিক মাঝখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে আকসারা।

মিনিট কয়েক নীরবতা পালনের পর লুহান নিজের গলার ভেতরের জড়তা কাটিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল, “এতোবছর ধরে ওনাকে কি লাইফ সাপোর্টেই রাখা হয়েছে, তেহ?”

বাবার পাংশুটে মুখের দিকেই দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে উদ্যান জবাব দিল, “না। গতকাল পর্যন্ত উনি স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারছিলেন। কাল মাঝরাতেই হঠাৎ করে ওনার কন্ডিশন খারাপ হতে শুরু করে। হার্ট ফেইলর ঠেকাতেই তড়িঘড়ি করে লাইফ সাপোর্টে নিতে হয়েছে।”

“আঙ্কেল কত বছর ধরে কোমায় আছেন?” মেলোর এই অবান্তর প্রশ্নের উত্তরে উদ্যান কেবল দুটি শব্দ উচ্চারণ করল, “প্রায় আঠারো বছর।”

কথাটা শুনে বাকি চারজন একে অপরের দিকে চকিত নয়নে তাকাল। আনমনেই সোহমের দৃষ্টি আটকে গেল আকসারার ওপর। মেয়েটা সেই কখন থেকে পলকহীন চোখে তাশরিফ খানজাদার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। সোহম কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে ইশারায় বাকিদেরও সেটা দেখাল। রিদম একটু ইতস্তত করে উদ্যানের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। মৃদু স্বরে প্রশ্ন করল, “আচ্ছা তেহ, আকসারা এখানে কেন? এই গোপন জায়গায় ওর কী কাজ?”

উদ্যান তখনও বাবার দিকেই একদৃষ্টে চেয়ে ছিল। লোকটার বয়স বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আজ যেন তাকে একটু বেশিই জরাজীর্ণ, বেশিই বয়স্ক দেখাচ্ছে। এক রাতেই যেন মানুষটার ওপর দিয়ে কতগুলো বছর পেরিয়ে গেছে! আচ্ছা, এই হঠাৎ ভাঙনের কারণটা কী?

“কী হলো তেহ, বল?” রিদম উদ্যানের কাঁধে হাত রাখতেই উদ্যানের যেন ধ্যানভঙ্গ হলো। সে নিচের ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড়িয়ে বলল, “সারার কাজই তো এটা। ওকে এই কাজের জন্যই বানানো হয়েছিল।”

কথাটা শুনে সবাই হতবিহ্বল হয়ে গেল। লুহান ভ্রু কুঁচকে এক কদম এগিয়ে এসে বলল, “বানানো হয়েছিল মানে? তার মানে কি… আকসারাও একটা হিউম্যানয়েড রোবট?”

উদ্যান হালকা মাথা ঝুঁকিয়ে সায় দিল, “হুম। ও আমার বানানো প্রথম সাকসেসফুল হিউম্যানয়েড রোবট। ওকে আমি আমার মায়ের আদলে বানিয়েছিলাম। ওর একমাত্র প্রোগামড কাজই হলো বাবার চব্বিশ ঘণ্টা খেয়াল রাখা।”

মেলো পানসে গলায় বলল, “এই কথাটা তুই আমাদেরকে আগে বলিস নি কেন?”

উদ্যান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “বলিনি কারণ আমি প্রথমেই একটা ফিমেল রোবট বানিয়েছি এটা বলতে চাইনি। তাছাড়াও প্রথম দিকে ওর সিস্টেমে অনেক কোডিং এরর আর ত্রুটি ছিল। তাই ওকে তোদের সামনে খুব একটা আনতামও না। এখন অবশ্য ওর ভেতরের সব বাগস আর ত্রুটিগুলো আমি সলভ করে ফেলেছি।”

সোহম বোকার মতো চোখ গোল গোল করে জিজ্ঞেস করল, “তার মানে ও কি এখন আমাদের মতো কথাও বলতে পারবে?”

উদ্যান কিছু বলার আগেই অনি বিরক্ত হয়ে সোহমের পিঠে একটা চাপড় মারল, “তুই শুনিস নি তেহ বলেছে ওকে বর্ণপ্রিয়া আন্টির আদলে বানানো হয়েছে তাই থিম অনুযায়ী ও এখনো কথা বলতে পারবে না।”

সোহম নিজের চুলে হাত বুলিয়ে জিব কেটে বলল, “ওহ, রাইট! সরি, মাথায় ছিল না।”

তাশরিফ খানজাদাকে দেখার পর সবার মন খারাপ হয়ে গেলেও, সময় তো আর থেমে থাকে না। বেসমেন্ট থেকে ওপরে এসে সবাই নরওয়ের যাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেদের লাগেজ গুছিয়ে তৈরি হয়ে নিল।

তাদের এবারের প্রজেক্টটা পুরো ছয় মাসের। উদ্যান সবাইকে আশ্বস্ত করে বলল, এর মধ্যে তার বাবার কন্ডিশন স্থিতিশীল হলে সেও নরওয়ে গিয়ে প্রজেক্টে জয়েন করবে। বাকিরা উদ্যানের এই সিদ্ধান্তে দ্বিমত করল না; শান্তভাবে মেনে নিল। এই পরিস্থিতিতে আর যাই হোক, উদ্যানকে সাথে যাওয়ার জন্য কোনোভাবেই ফোর্স করতে পারবে না তারা।

,

,

,

ভার্সিটির ক্লাস শেষ হতেই ফুল সোজা চলে গেল হসপিটালে, ব্লাড টেস্টের রিপোর্টটা রিসিভ করতে। যদিও তার পা দুটো একদমই এগোতে চাইছিল না। এতোদিন ধরে নিয়মিত কাউন্সিলিং নিয়েও রিপোর্ট দেখার জন্য পর্যাপ্ত সাহস জোগাড় করতে পারেনি সে। ব্লাড স্যাম্পল জমা দেওয়ার আগে যতটা সহজ ভেবেছিল ব্যাপারটা আদতে হাজার গুণ বেশি কঠিন।

টেস্টের রিপোর্ট নিয়ে ফুল যখন নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ফিরল, ততক্ষণে চারপাশ জুড়ে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। সে তাড়াহুড়ো করে ফ্রেশ হয়ে নিজের জন্য এককাপ গরম চা বানিয়ে পড়ার টেবিলে এসে বসল। হাতে গোনা আর মাত্র কিছুদিন পরই তার ইয়ার ফাইনাল এক্সাম শুরু হয়ে যাবে। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সে বইয়ের পাতা উল্টালো। বলে রাখা ভালো ফুল তার ভার্সিটি চেঞ্জ করে নিয়েছে। সে একদমই চাচ্ছিল না পরিচিত কারো মুখোমুখি হতে।

পড়তে পড়তে ঘড়ির কাটা রাত ১০টা ছুঁয়েছে, ফুল পড়ার টেবিল থেকে উঠে কোনোমতে রাতের ডিনারটা সেরে নিলো। খাওয়া শেষে বেডরুমে পা রাখতেই বিছানার ওপর পড়ে থাকা সাদা রিপোর্টের ফাইলটা তার নজরে এলো। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ফাইলটা তুলে নিল। বুক ভরে শ্বাস টেনে নিয়ে ফুল রুমে থেকে বেরিয়ে ভবনের রুফটপে চলে এল।

রাতের নির্জন ছাদ। চারপাশটা বড্ড ফাঁকা। বাতাসে মিশে থাকা হালকা আর্দ্রতা আর হিমেল হাওয়া ফুলের শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগাল। সে রেলিংয়ের একদম কাছাকাছি এসে দাঁড়াল। কৌতূহলবশত রেলিং গলে এক পলক নিচের দিকে তাকাতেই তার বুকটা ধক করে উঠল; ভয়ে ছিটকে পিছিয়ে গেল কয়েক পা। সে এতোটা উপরে আছে যে নিচের দিকটা অতল গহ্বর বলে ভ্রম হচ্ছে।

অথচ মাত্র মাসখানেক আগেও এই ছাদে দাঁড়িয়েই সে এক চরম সিদ্ধান্ত নিয়েছিল—রিপোর্টে যদি ‘পজেটিভ’ কিছু আসে, তবে সে এই ছাদ থেকেই নিচে লাফিয়ে পড়বে, সব যন্ত্রণার অবসান ঘটাবে। নিজের সেই আ`ত্মঘাতী ভাবনার কথা মনে পড়তেই ফুল আজ শিউরে উঠল, ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। সে তো এখন আর ম`রতে চায় না! সে বাঁচতে চায়, সুন্দরভাবে বাঁচতে চায়। কিন্তু যদি… যদি রিপোর্ট পজেটিভ আসে তবে তো তার জীবনটা অনিশ্চিত হয়ে যাবে।

ফুলের গলা শুকিয়ে এল। বুকটা হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার মনে হলো; এই টেস্টটা না করানোটাই বোধহয় ভালো ছিল। অজ্ঞতার মধ্যেও এক ধরণের শান্তি থাকে। কিন্তু এখন যখন করিয়েই ফেলেছে, তখন রিপোর্ট না দেখে এভাবে পালিয়ে বেড়ানোটাই বা কেমন দেখায়? ফুল নিজেকে ধাতস্থ করে রিপোর্টের প্রথম পৃষ্ঠা খুলল। তার হাত থরথর করে কাঁপছিল, সেই সময়েই এক দমকা হাওয়া বয়ে গেল। হাওয়ায় তোড়ে ফুলের হাত গলে রিপোর্ট টা ছিটকে পড়ল নিচে। হঠাৎ ঘটে যাওয়া এই কাণ্ডে ফুল একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে রইল। হ্যাঁ, সে রিপোর্টটা খুলতে ভয় পাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু এভাবে ফেলে দিতে তো চায়নি।

চিন্তাভাবনা দূরে সরিয়ে রাখল ফুল। তড়িঘড়ি করে ছাদের দরজা ঠেলে লিফটের বোতাম চেপে দ্রুত নিচে নেমে এল। সে অ্যাপার্টমেন্টের মেইন ফটক পেরিয়ে ফাইলটা খুঁজতে বাইরে বেরোতে যাবে, ঠিক তখনই অসাবধানতা বশত এক শক্তপোক্ত শরীরের সাথে তার জোর ধাক্কা লাগল। ধাক্কাটা এতটাই তীব্র ছিল যে ফুলের মনে হলো তার ডান কাঁধটা বুঝি শরীর থেকে আলাদাই হয়ে গেছে। ছিটকে খানিকটা দূরে সরে গেলেও, পড়তে পড়তে কোনোমতে দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিল সে।

কাঁধটা চেপে ধরে ব্যথাতুর চোখে সামনে তাকাতেই ফুলের দৃষ্টি স্থির হলো। সে দেখল তার সামনেই দাঁড়িয়ে এক সুদর্শন যুবক, যার এক হাত দিয়ে একটা ট্রলি ব্যাগ ধরা আর অন্য কোলে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে আছে একটা ছোট্ট বাচ্চা ছেলে। যুবকটি অত্যন্ত রুক্ষ ও রক্তচোখে ফুলের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন চোখের দৃষ্টি দিয়েই তাকে ভস্ম করে দেবে। ফুল ভয়ে শুকনো ঢোক গিলল। লোকটা ক্ষোভের সাথে নিজের কোলে থাকা ঘুমন্ত বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, ধাক্কা লাগলেও বাচ্চাটার ঘুম ভাঙেনি; এটাই অনেক। লোকটা কথা না বাড়িয়ে ট্রলিটা টেনে লিফটের দিকে এগিয়ে যেতে চাইল।

তন্মধ্যেই ফুল পেছন থেকে বলে উঠল, “আই অ্যাম সো সরি! আসলে… আসলে আমি একটু তাড়াহুড়োয় ছিলাম। তাই আপনাকে একদম খেয়াল করিনি। প্লিজ কিছু মনে করবেন না।”

লোকটা লিফটের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে একবার পেছন ফিরে তাকাল। ভাবলেশহীন মুখে সংক্ষেপে বলল, “ইটস ওকে।”

লোকটা লিফটের ভেতর ঢুকে যেতেই দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। ফুল অ্যাপার্টমেন্টের বাইরের লনে ফাইলটা তন্নতন্ন করে খুঁজল। কিন্তু চারপাশের অন্ধকারের মাঝে ফাইলটার কোনো হদিস মিলল না। এবার ফুলের ভীষণ মন খারাপ হলো, নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ আর ক্ষোভ দলা পাকিয়ে এল। কতগুলো টাকা খরচ করে, কত কষ্ট করে সে টেস্টটা করিয়েছিল!

ধীরপায়ে নিজের ফ্লোরে ফিরে আসতে আসতে ফুল নিজেকে শক্ত করল। ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা লক করে সে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মুখে ম্লান হাসি ফুটিয়ে মনে মনে বলল, ‘যাক, যা হয়েছে ভালো হয়েছে। টেস্ট করানোটাই আমার বোকামি ছিল। ভবিষ্যতে আমার কপালে যা আছে, তাই হবে। আল্লাহ আমাকে বেঁচে থাকার কারণ দিয়েছেন। আমি সেই কারণটাকেই আঁকড়ে ধরে বেঁচে থাকতে চাই। এই পর্যায়ে এসে শুধু শুধু ভবিষ্যতে কী হবে না হবে, সব ছাইপাঁশ ভেবে নিজেকে শেষ করে ফেলাটা একদমই ঠিক হবে না।”

,

,

,

আরও কয়েকটা দিন কেটে গেল। নরওয়ের আকাশ এখন মেঘে ঢাকা, আবহাওয়া ভীষণ প্রতিকূল আর হিমশীতল। জানালার কাচের ওপারে অবিরাম সাদা তুষারপাত হয়ে চলেছে, যেন পুরো শহর বরফের চাদরে ঢাকা পড়েছে।

​রুমের ভেতর হিটার জ্বলছে। খাটের ওপর বসে একমনে অনিলার মাথা টিপে দিচ্ছিল অনি। অনিলা চোখ বুজে থাকলেও ঘুমোয় নি। প্রেগন্যান্সির প্রথম তিন মাস তার শরীরের ওপর দিয়ে বেশ ধকল গেছে, সারাক্ষণ অসুস্থতা লেগেই থাকত। এখন সেকেন্ড ট্রাইমেস্টারে কিছুটা সহনীয় লাগছে, ভেতরের অস্বস্তিটা একটু কমেছে।

হঠাৎ পাশে রাখা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে নামটা দেখেই অনি কলটা রিসিভ করে কানের কাছে নিল, “হ্যাঁ লুহান বল।”

ফোনের ওপাশ থেকে লুহান এমন একটা খবর দিল, যা শোনার সাথে সাথে অনির হাতের আঙুলগুলো জমে গেল। সে তড়িঘড়ি করে খাট থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল, তার ফর্সা মুখটা মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার অভিব্যক্তির এমন আকস্মিক পরিবর্তন দেখে অনিলা উঠে বসে উদ্বিগ্ন গলায় শুধাল, “কী হয়েছে অনি? অমন করছ কেন?”

অনি রুদ্ধশ্বাসে ভাঙা গলায় বলল, “তেহুর… তেহুর বাবা আর নেই। আঙ্কেল মা`রা গেছেন!”

খবরটা শুনে অনিলাও ধড়ফড়িয়ে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল। অনি এর আগে তাকে উদ্যানের বাবার ১৮ বছর ধরে কোমায় থাকার বিষয়টি জানিয়েছিল। একই সাথে ফুল আর উদ্যানের শত্রুতার কারণটাও খুলে বলেছিল। শুধু বলেনি তাদের আসল পেশা সমন্ধে। উর্বীর ক্ষেত্রেও সেম। রিদম তাকেও সব জানিয়েছে, শুধু জানাতে পারেনি তারা সত্যি সত্যিই অবৈধ সিন্ডিকেটের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

খবরটা পাওয়ার আধঘণ্টার মধ্যে মিটিং রুমে সবাই এসে জড়ো হলো। আজ তাদের সাথে উর্বী আর অনিলাও টেবিলে বসেছে। সোহম কোনো একটা জরুরি কাজে বাইরে গিয়েছিল, খবরটা পাওয়া মাত্রই সে পাগলের মতো গাড়ি ছুটিয়ে চলে এসেছে। তার চুলগুলো উসকোখুসকো, চোখে তীব্র আতঙ্ক। সে রুমে ঢুকেই হম্বিতম্বি করে বলল, “আগে তেহকে কল দে! ও একা আছে ওখানে, ও এখন কী করছে, ওর মেন্টাল কন্ডিশন কেমন—তা আমাদের জানতে হবে!”

লুহান তাকে বাধা দিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল, “শান্ত হ সোহম। কল আমি, রিদম, মেলো সবাই মিলে গত আধঘণ্টায় শ-খানেক বার করেছি। ও ফোন ধরলে তো জানতে পারব, নাকি?”

সোহম অবাক হয়ে চোখ গোল গোল করে প্রশ্ন করল, “ও যদি কলই না ধরে, তবে তুই আঙ্কেলের মৃ`ত্যুর খবর জানলি কীভাবে?”

লুহান টেবিলের ওপর ঝুঁকে বসল, “লুইস বলেছে।”

চেয়ারে বসে নখ কাটছিল রিদম। সে হঠাৎ মাথা তুলে সবার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলে ফেলল, “আঙ্কেল তো মা`রাই গেলেন। এখন তো আমার বোকাফুলকে নিয়ে চিন্তা হচ্ছে।”

ফুলের কথা উঠতেই সবাই চকিত, আতঙ্কিত চোখে একে অপরের দিকে তাকাল। সোহম তো চেয়ার ছেড়ে ছিটকে দাঁড়িয়ে পরপরই বলে উঠল, “ওহ নো! ওহ নো! আমাদের এক্ষুণি, এই মুহূর্তেই বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হবে। ফুলের কাছে যেতে হবে!”

মেলো শুকনো গলায় বলল, “আমরা গিয়ে কী করবো?”

সোহমের কণ্ঠে ক্ষোভ ঝরে পড়ল, “কী করবো মানে? তোর মনে নেই তেহ কী বলেছিল?”

অনি নিজের দুই হাত কচলাতে কচলাতে বিড়বিড়িয়ে বলল, “মনে আছে সোহম, আমাদের সব মনে আছে। কিন্তু তেহুর পারমিশন ছাড়া আমরা কীভাবে মুভ করি বল তো?”

তাদের এই তর্ক-বিতর্কের মাঝেই অনিলা আর সহ্য করতে না পেরে চিৎকার করে উঠল, “তোমাদের কি মনে হয়—তেহ ফুলের কাছে যাওয়ার অনুমতি দেবে?”

রিদম টেবিলের ওপর একটা চাপড় মেরে বলল,

“একদমই দেবে না। উলটো বোকাফুলের কাছে যাওয়ার অনুমতি চাওয়ার পর ও বলেছিল বোকাফুলের সাথে দেখা করতে চাইলে একেবারেই চলে যেতে।”

উর্বী দাঁতে দাঁত চেপে, ক্ষুদ্ধ স্বরে বলল, “তার মানে তোমরা বলতে চাইছো, আমরা এখানে হাত-পা গুটিয়ে বসে তুষারপাত দেখব?”

সবাই এক গভীর ভাবনায় ডুব দিল। সোহম রীতিমতো নিজের মাথা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে ঘরের এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে পায়চারি করছে, তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। তাকে এভাবে পাগলের মতো ছটফট করতে দেখে বাকিরা কিছুটা সন্দিহান চোখে তাকালেও, আপাতত উদ্যানের হাত থেকে ফুলকে কীভাবে বাঁচানো যায়—সেই উপায় বের করতেই নিজেদের মনঃসংযোগ করল।

অনেক ভাবাভাবির পরও যখন কোনো বাস্তবসম্মত উপায় মিলল না, তখন মেলো গম্ভীর মুখে বলল, “আমার মনে হয় আমরা সবাই প্যানিকড হয়ে অযথাই বেশি ভাবছি। তেহ ছোটবেলায় আবেগের বশে কী না কী বলেছিল, সেটা নিয়ে এতো ভাবার কী আছে? ওর বাবার মৃ`ত্যুটা অ্যাক্সিডেন্ট ছিল সেটা ও নিজেও খুব ভালো করেই জানে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে ও মেয়েটাকে অলরেডি অনেক বেশিই শাস্তি দিয়ে ফেলেছে।”

অনিলা চোখের জল কোনোমতে চেপে ফিসফিসিয়ে বলল, “তুমি বলতে চাইছো তেহ ফুলকে মে`রে ফেলতে চাইবে না?”

মেলো একটু ইতস্তত করে মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি সেটাই বলতে চাইছি।”

সোহম আচমকাই খেঁকিয়ে উঠল, “জাস্ট শাট আপ মেলো! জাস্ট শাট আপ! তুই, আমি, আমরা সবাই তেহকে একটু হলেও চিনি। আজ পর্যন্ত ও যা বলেছে, ভালো হোক বা খারাপ—তাই করে দেখিয়েছে। ও কোনোদিন নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে এক ইঞ্চি নড়েনি। সেখানে তুই কী করে এতো নিশ্চয়তার সাথে বলতে পারিস যে তেহ ফুলকে মে`রে ফেলতে চাইবে না?!”

সবাই আবার সেই গোলকধাঁধায় পড়ে গেল। উর্বী বেশ অনেকক্ষণ ভেবে বলল, “কোনোভাবে যদি আঙ্কেলের মৃ`ত্যুর খবরটা ফুলকে জানিয়ে দেওয়া যেতো, তাহলে ভালো হতো। খবরটা পেলে ও অন্তত অ্যালার্ট হয়ে কয়েকটা দিন অন্য কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারত। ততদিনে পরিস্থিতি আমরাও কিছুটা আঁচ করতে পারতাম।”

উর্বীর কথাটা সবারই মনে ধরল কিন্তু প্রশ্নটা হলো ফুলের সাথে তারা যোগাযোগ করবে কীভাবে?

লুহান হঠাৎ মেলোর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল, “তুই না ফুলকে হ্যান্ডসেট গিফট করেছিলি। ওর নম্বর আছে তোর কাছে?”

মেলো না বোধক মাথা নাড়ল, “আমি শুধু ফোন দিয়েছিলাম, সিমকার্ড দিইনি। তাছাড়াও ওর সাথে অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়াতেও কানেকশন নেই।”

​অনি তখনই নিজের পকেট থেকে ফোনটা বের করতে করতে বলল, “আরে দাঁড়া, দাঁড়া! ফুলকে আমি যে ক্যাফেটা গিফট করেছিলাম, ওটার যে টেন্যান্ট ছিল, তার নম্বরটা আমার বিজনেজ ফাইলে সেভ থাকার কথা। ওখান থেকে যদি কোনো ক্লু পাওয়া যায়… দাঁড়া, আমি খুঁজে দেখছি।”

​অনি দ্রুত তার ফোনের ডিরেক্টরি স্ক্রল করতে লাগল। কয়েক সেকেন্ডের টানটান উত্তেজনার পর সে চেঁচিয়ে উঠল, “পেয়েছি! নম্বরটা এখনো অ্যাক্টিভ দেখাচ্ছে।”

সোহম মলিন গলায় বলল, “আমরা নিজেরাই যদি যেতে পারতাম তাহলেই সবচেয়ে ভালো হতো।”

রিদম এগিয়ে এসে সোহমের কাঁধে হাত রাখল। “আমরা ওর কাছে গেলে তেহ আমাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। বোকাফুলকে পেতে গিয়ে আমরা তেহকে হারিয়ে ফেলতে পারব না। তার চেয়ে উর্বী যা বলেছে তাই করি। তারপর যতদ্রুত সম্ভব এখানের কাজগুলো মিটিয়ে মেক্সিকো ফেরার প্রস্তুতি নেবো। এরমধ্যে তেহুর সাথে কথাও বলার চেষ্টা করবো। তাতে অন্তত একটু হলেও ওর মনোভাব প্রেডিক্ট করা যাবে।”

,

,

,

বাংলাদেশে তখন রাত এগারোটা। তনয়া ঘুমানোর নিয়তে মাত্রই খাটে শুয়েছিল, ঠিক তখনই বালিশের পাশে রাখা তার হাজব্যান্ডের ফোনটা তীব্র শব্দে বেজে উঠল। তনয়ার হাজব্যান্ড সাফিন তখন ওয়াশরুমে থাকায় তনয়া নিজেই কলটা রিসিভ করল।

“হ্যালো!”

ওপার থেকে মেয়েলি কণ্ঠ শুনে অনি কিছুটা ইতস্তত করল। সে একবার ফোনটা কান থেকে নামিয়ে স্ক্রিনের নম্বরটা দেখে নিয়ে বলল, “হ্যালো, এটা কি সাফিন এজাজের নম্বর?”

তনয়া বলল, “জি, আমি ওনার ওয়াইফ বলছি। উনি একটু ব্যস্ত আছেন। আপনার কোনো দরকার থাকলে আমাকে বলতে পারেন, অথবা পরে কল করুন।”

অনি আর সময় নষ্ট না করে তড়িৎ বেগে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কি ‘ফুল’ নামের কাউকে চেনেন?”

​প্রশ্নটা শুনে তনয়ার ভ্রু দুটো কুচকে গেল। একটু দমে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ, চিনি। কিন্তু আপনি কে?”

“আমি ওর বাড়ির লোক বলছি। খুব জরুরি একটা দরকার আছে ওর সাথে। ওর পার্সোনাল ফোন নম্বরটা কি আপনার কাছে পাওয়া যাবে? প্লিজ, খুব উপকার হতো।”

​তনয়া এত সহজে ফুলের নম্বরটা দিতে রাজি হলো না। কিন্তু ওপার থেকে অনির গলার আকুলতা, ব্যাকুলতা আর নানাভাবে বুঝিয়ে বলার পর, পরিস্থিতি গুরুতর আঁচ করে তনয়া শেষমেশ ফুলের নম্বরটা অনির কাছে দিতে বাধ্য হলো।

,

,

,

১৪ই ফেব্রুয়ারী। ১:২১ এএম।

গভীর রাতে চারপাশ যখন নিঝুম, তখন মোবাইল ফোনের একঘেয়ে রিংটোনে ফুলের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা ভেঙে গেল। সে চোখ না খুলেই হাতড়াতে হাতড়াতে বালিশের তলা থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনের উজ্জ্বল আলোয় একটা সম্পূর্ণ অপরিচিত নম্বর দেখে তার ভ্রু দুটো স্বতঃস্ফূর্তভাবে কুচকে গেল। এত রাতে কে কল করবে? এক অজানা আশঙ্কা বুকে নিয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অনির চেনা কণ্ঠ ভেসে এল, “হ্যালো ফুল! আমি অনি বলছি।”

‘অনি’ নামটা কানে যাওয়া মাত্রই ফুল এক ঝটকায় লাফিয়ে উঠে বসল। চোখ কচলে নম্বরটা দেখে নিয়ে থমথমে মুখে বলল, “কেন কল দিয়েছেন?”

ফুল যতটা সম্ভব রূঢ় স্বরে বললেও তার চোখ ভিজে উঠল। ওপারে অনি ফোনটা লাউড স্পিকারে দিয়ে বাকিদের দিকে তাকাল, তারপর গম্ভীর গলায় বলল, “শোনো ফুল, আমরা এখন যা বলব, খুব মন দিয়ে শুনবে।”

ফুলের ঠোঁট কাঁপল। “কী বলবেন?”

রিদম বলে ফেলল, “তোমার শ্বশুর আর বেঁচে নেই, ফুল। উনি মা`রা গেছেন।”

ফুলের বুকটা ধক করে উঠল। মনে হলো এক লহমায় তার মাথার ওপর আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়েছে। ভাঙা, কাঁপো কাঁপো কণ্ঠে সে শুধু উচ্চারণ করতে পারল, “ক… কখন?”

লুহান ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, “ঘন্টাখানেক আগেই। তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো আমরা কেন কল দিয়েছি?”

ফুলের ভেতর থেকে কান্না দলা পাকিয়ে ওপরে উঠে আসতে চাইল। সে বহু কষ্টে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকে রেখে বলল, “উনি… উনি কোথায় এখন?”

মেলো বলল, “আমরা এখন নরওয়েতে আছি ফুল। তেহুর কোনো খবর নেই আমাদের কাছে। ও আমাদের কারও ফোন ধরছে না, সম্পূর্ণ আউট অফ রিচ।”

সোহম আর ধৈর্য ধরতে পারল না, সে মেলোর হাত থেকে ফোনটা একরকম কেড়ে নিয়ে চিৎকার করে বলল, “ফুল! এসব বাদ দাও! তুমি এক্ষুণি পালিয়ে যাও! অনেক দূরে, যেখানে পারো পালিয়ে যাও!”

ফুল নিজের মুখ চেপে ধরল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে অন্ধকার ঘরের চারদিকে তাকিয়ে অসহায়ভাবে বলল, “কোথায় যাবো আমি? এই মাঝরাতে আমি কোথায় যাবো, সোহম স্যার?”

“আমি জানি না তুমি কোথায় যাবে! জাস্ট যেদিকে দুচোখ যায়, সেদিকেই চলে যাও! শুধু ওখানে থেকো না। তেহ ওই ফ্ল্যাটের লোকেশন জানে।”

ফুলের পুরো শরীর এবার ভয়ের চোটে থরথর করে কাঁপতে লাগল। সে টালমাটাল পায়ে খাট থেকে নিচে নেমে দাঁড়াল। তার পরনে তখন একটা পাতলা নাইটড্রেস, কিন্তু এই মুহূর্তে কাপড়ের শালীনতা বা তা চেঞ্জ করার মতো মানসিক অবস্থা তার ছিল না। সে দ্রুত হাতে আলনা থেকে একটা কালো বোরকা টেনে নিয়ে নাইটড্রেসের ওপরই পরতে লাগল। ফুলের ফোঁপানোর আওয়াজে সোহম নিজের ভেতরের উত্তেজনা কিছুটা শান্ত করে সান্ত্বনার সুরে বলল, “রিল্যাক্স ফুল, রিল্যাক্স। মেক্সিকো থেকে বাংলাদেশে যেতে কমসেকম ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা সময় লাগবে। তোমার হাতে সময় আছে।”

ফুলের হৃৎস্পন্দন তখন অনিয়ন্ত্রিত তালে বুকের ভেতর দপদপ করছে। মনে হচ্ছে এই বুঝি হৃৎপিণ্ড টা বুকের পাঁজর চিড়ে বেরিয়ে আসবে।

“টাইম নেই সোহম স্যার, উনি আমাকে ছাড়বেন না। আমাকে মে’রে ফেলবেন। আমি… আমি ম’রতে চাই না।”

সোহমের বুকটা ভারী হয়ে এলো। তার মনে আছে মেয়েটা এস্টেটে থাকাকালীন যন্ত্রণা সইতে না পেরে ম’রে যেতে চাইতো। কিন্তু এখন বাঁচার আকুতি জানাচ্ছে। আর এই ব্যাপারটাই তাকে ভাবিয়ে তুলছে।

ফুলের কান্নার বেগ বাড়তে দেখে লুহান ফোনটা নিয়ে বলল, “ফুল, একদম ভয় পেও না। সাহস রাখো। তুমি কিছুদিনের জন্য এমন কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকো, যেখানে কেউ তোমাকে চেনে না। আর খবরদার! যাওয়ার আগে পরিচিত কাউকে কিচ্ছু জানিয়ে যাবে না। এই নম্বরটা একটা কাগজে তুলে নিজের কাছে রেখে দাও। ফোনটাও ফ্ল্যাটেই ফেলে রেখে যেও। ওটা সঙ্গে নিও না। তেহ লোকেশন ট্রেস করতে পারে; এমন কিছুই সঙ্গে নিও না।”

অনি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল। “টাকা-পয়সা আছে তো তোমার কাছে?”

ফুল বোরকার বেল্টটা বাঁধতে বাঁধতে মাথা নেড়ে বলল, “আছে… লাখ দুয়েকের মতো।”

অনি ফের বলল, “আচ্ছা, ওটা সাথে নিয়ে নাও। পরিস্থিতি একটু শিথিল হলে আমরা টাকা পাঠিয়ে দেবো। নিজের খেয়াল রেখো, চিন্তা কোরো না।”

ফুল কিছু একটা বলতে চেয়েও ভয়ের কারণে বলে উঠতে পারল না। সে তাদেরকেও বিশ্বাস করতে পারছে না এমুহূর্তে। সে খুব ভালো করেই জানে তারা যতই সহমর্মিতা দেখাক না কেন উদ্যানের ওপর দিয়ে গিয়ে তাকে সাহায্য করবে না। এটুকু হেল্প করেছে এটাই অনেক। সে কলটা কেটে সুইচ অফ করে বিছানায় ছুড়ে মারল ফোনটা। তারপর দুহাতে চোখ মুছে লম্বা শ্বাস নিল। নিজেকেই নিজে বলল, “আমি তো এমনিতেও কয়েকদিন পর এখান থেকে চলেই যেতাম। এখন আগেভাগেই চলে যেতে হবে এই আরকি!”

ফুল তড়িঘড়ি করে আলমারি খুলে তার প্রয়োজনীয় সার্টিফিকেট, আইডি কার্ড আর টাকা-পয়সা একটা ছোট ব্যাগে ভরে নিল। তারপর রাতের অন্ধকারে নিজের শেষ আশ্রয়টুকু ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়ল; এক অজানা গন্তব্যে, দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার তাগিদে।

চলবে,,,

শব্দসংখ্যা: ৫০০০+

Share On:

TAGS:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply