অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭২
#সোফিয়া_সাফা
“তুই এখন এটা শুনছিস, যার মানে আমি চলে গেছি…”
কথাটা কানে যেতেই যেন পায়ের তলার মাটি সরে গেল ফুলের। শরীরের সমস্ত শক্তি হারিয়ে সে পাংশু মুখে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল। রেকর্ডারের ওপাশ থেকে উদ্যান একটু থামল, যেন সে অদৃশ্য থেকেই অনুভব করতে পারছে ফুলের ভেঙে পড়া। ফুল ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করল, “এখনও তো দুমাস হওয়ার তেরো দিন বাকি ছিল…”
ঠিক তখনই উদ্যানের কণ্ঠ আবারও তীরের মতো বিঁধল তার কানে, “আমার মনে হয় না তোকে পুরো দুমাস সময় দিতে পেরেছি। আসলে… চেয়েছিলাম দুমাস পর তোর বাবার সাথে দেখা করিয়ে দিয়ে তারপর ফিরে আসবো। কিন্তু তুই যখন বার্থডের কথাটা মনে করিয়ে দিলি, তখন ভাবলাম… এটাই সঠিক সময়।”
ফুল খাটের কিনারায় মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজল। নোনা জলগুলো গাল বেয়ে চিবুক ছুঁয়ে নামছে।
“ভাবতে পারিস এই অপ্রয়োজনীয় কথাগুলো কেন এমন ক্রিঞ্জ পদ্ধতিতে শোনাচ্ছি তোকে। একটা কারণ আছে অবশ্য।” উদ্যান একটু থামল। এবার তার কণ্ঠস্বর নিচু হলেও তা যেন আরও ধারালো হয়ে উঠল, “আমি তোকে ‘সরি’ বলতে চেয়েছিলাম। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সেটা তো সামনাসামনিই বলতে পারতাম। তাহলে কেন…?”
উদ্যানের এই থেমে থেমে কথা বলাটা ফুলের কাছে সম্পূর্ণ নতুন। মনে হচ্ছে, ওপাশে থাকা মানুষটা মনের ভাব প্রকাশ করতে গিয়ে বারবার শব্দ হারিয়ে ফেলছে। ফুলের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে করুণ হাসি ফুটে উঠল, অথচ চোখের পাতা বেয়ে অবিরাম জল গড়িয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে তার গাল।
উদ্যানের কণ্ঠস্বর এবার আরও কঠোর হলো, “কারণটা হলো, তোর সামনে দাঁড়িয়ে কথাটা বলা আমার পক্ষে সহজ ছিল না। আমি যাই বলি, তাতেই তুই কান্না শুরু করে দিস। আঘাত করলেও কাঁদিস, আবার আদর করলেও কাঁদিস। তবে এটা ভাবিস না যে আমি তোর কান্না সহ্য করতে পারি না। সত্যিটা হলো, আমি তোর কান্না দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তোর চোখের জল এখন আর আমাকে আগের মতো তৃপ্তি দিতে পারছে না। আমি বড্ড হাঁপিয়ে উঠেছি তোকে ‘ভালোবাসি’ বলতে বলতে, তোকে চুমু খেতে খেতে, তোর শরীরের ঘ্রাণ মিশ্রিত বাতাসে শ্বাস নিতে নিতে।”
উদ্যান দম নিল, তারপর যোগ করল, “তোর চুলের মিষ্টি সুবাস… ওই নরম তুলতুলে হাত… এমনকি তোর পেটের কালো কুচকুচে তিলটার প্রতিও জন্মেছে আমার চরম বিতৃষ্ণা। তোর হিমশীতল শরীরটা আমার কাছে অসহ্যকর ঠেকছিল। তোর কাছাকাছি গেলেই আমি ক্রমশ নিজের উষ্ণতা হারিয়ে ফেলতে বসেছিলাম। এতোটা অসহ্যকর কেউ কীভাবে হয়ে উঠতে পারে? হ্যাঁ ঠিকই শুনেছিস… অসহ্যকর হয়ে উঠেছিলি তুই। তাই পুরো দুমাস তোকে সহ্য করা আর আমার পক্ষে সম্ভব হলো না।”
উদ্যান থামল। ফুলের মনে হলো, অদৃশ্য কোনো হাত তার হৃৎপিণ্ডটা মুঠো করে ধরে নির্দয়ভাবে মুচড়ে দিচ্ছে। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। কাঁপা হাতে সে রেকর্ডারটা তুলে নিতেই উদ্যানের কণ্ঠস্বর ঘরজুড়ে প্রতিধ্বনি তুলল।
“আরে, আসল কথাটাই তো বলা হয়নি। হুম, শোন… সরি। আই এম এক্সট্রিমলি সরি। ভাবছিস হয়তো এতো ঘটা করে কেন ক্ষমা চাইছি? ক্ষমা চাইছি আমার ওই অভিনয়টার জন্য, ওই-যে জেন্টেলম্যান হওয়ার অভিনয় টা করলাম না ওটার জন্য। তাছাড়াও কারণে-অকারণে তোর গায়ে হাত তোলার জন্যও… সরি। আচ্ছা, সরি বলে দিলেই তো সব চুকেবুকে যায়, তাই না? ধ্যাৎ, জিজ্ঞেস করছি কেন! আমি জানি, এই একটা শব্দেই সব ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়। তুইও হয়তো বাকিদের মতো ভাববি, আমি যা করেছি সব প্রতিশোধ নিতে করেছি। কিন্তু ধারণাটা ভুল। আসলে আমার বড্ড একঘেয়ে লাগছিল সবকিছু। একঘেয়েমি কাটাতে একটা খেলনার প্রয়োজন ছিল। আমি এমন কিছু খুঁজেই পাচ্ছিলাম না যা আমাকে আমোদ দেবে। নইলে দেখ না, আমি তো কারো থেকেই প্রতিশোধ নিইনি, তবে তোর থেকে কেন নিতে যাব? আমি তো স্রেফ তোর মাঝে বিনোদন খুঁজে পেয়েছিলাম। মনে আছে আমাদের প্রথম দেখা হওয়ার কথা? আমি সবেমাত্র বাড়িতে পা রেখেছি, আর তুই হন্তদন্ত হয়ে আবেশের মার কাছে ছুটে গিয়ে চোখমুখ কুঁচকে বললি—‘মামি দেখো না, চোখে কী যেন গেছে! খুব ব্যথা করছে।’ আবেশের মা তোর চোখের পাতা উল্টে বললেন, ‘আইল্যাশ গেছে।’ তিনি সেটা বের করে দেওয়ার পর তুই যখন চোখ ডলতে ডলতে আমার দিকে প্রথমবার তাকিয়েছিলি; তোর সেই ভেজা চোখ দেখে আমি বুঝে গিয়েছিলাম, মেক্সিকো থেকে আমার দেশে ফেরাটা সার্থক হয়েছে। আমি আমার মনোরঞ্জনের মাধ্যমটা পেয়ে গেছি।”
ফুলের মাঝে কোনো ভাবান্তর পরিলক্ষিত হলো না। সে চিৎকার করল না, বুক চাপড়ে বিলাপও করল না। কেবল শূন্য, ঝাপসা চোখে রেকর্ডারটার দিকে চেয়ে রইল। এভাবে জড় বস্তুর মতো ফুল অনেকক্ষণ বসে রইল। যখন সে টলমল পায়ে উঠে দাঁড়াতে চাইল, তখনই রেকর্ডার থেকে উদ্যানের কণ্ঠ আবার আছড়ে পড়ল। এবার তার গলায় এক অদ্ভুত ভারিক্কি ভাব, যেন সে ফুলের প্রতিটি পদক্ষেপ আগে থেকেই দেখতে পাচ্ছে।
“গুগল বলল, চলে যাওয়ার আগেও নাকি বউকে গুডবাই গিফট দিয়ে যেতে হয়। আমি ভেবে পাইনি তোকে কী দিয়ে যাবো। বাকিরা তো তোকে প্রয়োজনীয় সবকিছুই দিয়ে গেছে। থাকা-খাওয়ায় তোর কোনো অসুবিধা হবে না। আর আমিও তো নিজের সবটুকু… তোকে দিয়ে দিয়েছি। দিইনি বল? দিয়েছি তো। তোকে দেওয়ার মতো আমার কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বিশ্বাস কর, তেহজিব খানজাদার কাছে আর কিছুই নেই। আচ্ছা, সবকিছু পাওয়ার পরেও কেন তুই… ম`রে যেতে চাইবি?”
শেষোক্ত প্রশ্নটা শুনে ফুল নিজেকে আর ধরে রাখতে পারল না। বুকের বাঁ পাশটা খামচে ধরে আহত বাঘিনীর ন্যায় গর্জে উঠল সে।
“কেন জানতে চাইছেন? আমি ম`রি বা বাঁচি তাতে আপনার কী? কিচ্ছু না, কারো কিচ্ছু না। যেই লোকটা আমার বেঁচে থাকার সব কারণ কেড়ে নিয়েছে সেই লোকটাই কেন আদিখ্যেতা করে জানতে চাইবে আমার মৃ`ত্যুর কারণ? হাস্যকর… আপনি খুবই হাস্যকর তেহজিব। পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রাণী হলেন গিয়ে ‘আপনি’। কার্টেল বস এল হেফে হার্দিন; যার পুরো অস্তিত্বটাই ফেক। আই অ্যাপ্রিশিয়েট ইওর হার্ড ওয়ার্ক। মানতেই হবে, আপনি একজন অসাধারণ অভিনেতা। কেমন মনস্টার হয়েও মানুষের মুখোশ পরে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আমার যদি সাধ্য থাকতোনা; আমি তাহলে কোনো এক বিশাল মঞ্চে মাইক হাতে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতাম, ‘অ্যান্ড দ্য বেস্ট অ্যাক্টর অব দ্য ফা`কিং ইয়ার অ্যাওয়ার্ড গোজ টু তেহজিব খানজাদা! আ বিগ তালিয়া ফর হিম! ট্রফি হিসেবে তার ইউজলেস বউয়ের হৃৎপিণ্ডটাই এবার তার হাতে তুলে দেওয়া হোক।”
ফুলের এই হাহাকার রেকর্ডারের ওপাশে থাকা উদ্যান শুনতে পেল না। সে তার পূর্বনির্ধারিত কথার খেই ধরে বলে চলল, “আচ্ছা ওসব বাদ দে। আমার মনে হয় প্রত্যেকটা মানুষ নির্দিষ্ট একটা সময়ের জন্যই পৃথিবীতে আসে। সেই সময়ের আগে কেউই ম’রতে পারে না। তুই এতো কম সময়ের জন্য এসেছিস, সেটা আমি বিশ্বাস করি না।”
ফুল দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, “আপনি বিশ্বাস করেন না যে আমি আপনাকে ছাড়া সত্যিই বাঁচতে পারব না? তবে দেখে নিন…”
ফুল উন্মাদের মতো উপরের দিকে তাকাল, কিন্তু উদ্যানের ঘরে কোনোকালেই সিলিং ফ্যান ছিল না। এক মুহূর্তের জন্য সে থমকে গেল, তারপর উন্মত্তের মতো ধারালো কিছুর সন্ধানে ঘর তছনছ করতে শুরু করল। ড্রয়ার, টেবিল, আলমারি; সব উলোটপালোট করে ফেলল সে। তবুও তেমন কিছুই খুঁজে পেল না। ঘর থেকে বেরিয়ে সে টালমাটাল পায়ে কিচেনে ঢুকল। সেখানেও কোনো ছুরি বা বঁটি নেই। ধারালো কোনো কিছু খুঁজে না পেয়ে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হলো। যখন সে দিশেহারা হয়ে চারদিকে ছুটছে, তখনই হাতের রেকর্ডার থেকে উদ্যানের ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠ ভেসে এল।
“একটু জিরিয়ে নে, এত তাড়াহুড়ো কিসের? শোন না, তোকে আজ একটা গান শোনাতে ইচ্ছে করছে। হয়তো আবেশের মতো অত ভালো গাইতে পারব না, একটু মানিয়ে নিস…”
থমকে দাঁড়াল ফুল। কয়েক সেকেন্ডের এক অসহ্য নীরবতা। তারপর সেই গুমোট পরিবেশে উদ্যানের গম্ভীর কণ্ঠ গুনগুনিয়ে উঠল:
“ভুলা দেনা মুঝে, হ্যায় আলবিদা তুঝে…
তুঝে জিনা হ্যায়… মেরে বিনা…
সাফার ইয়ে হ্যায় তেরা, ইয়ে রাস্তা তেরা
তুঝে জিনা হ্যায়… মেরে বিনা।”
উদ্যানের গভীর, নেশা ধরানো কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যা ফুলের অস্থির পা দুটোকে নিস্তেজ করে দিল। গান নয়, এ যেন কোনো এক জাদুমন্ত্র যা তাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে। অবশ হয়ে আসা শরীরে সে যখন গানের মাঝে ডুবে ছিল তখনই—
“মিস্ট্রেসা…”
আকস্মিক কারো ডাকে ফুলের হাত থেকে রেকর্ডারটা ছিটকে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। ফুলের ঘোর কাটল নিমিষেই। সে বিদ্যুৎবেগে মেঝে থেকে ওটা কুড়িয়ে নিয়ে চেক করতে লাগল। বারবার বাটন টিপল, ঝাঁকালো, কিন্তু না। ভেতর থেকে উদ্যানের কণ্ঠ আর ভেসে এল না।
সে ক্ষুব্ধ হয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখল লুইস দাঁড়িয়ে আছে। এই লোকটাকে সে আজ বহু দিন পর দেখেছে; তবুও ভ্রুক্ষেপ করল না। সে পাগলের মতো রেকর্ডারটা অন-অফ করার চেষ্টা করতে লাগল, কিন্তু সব চেষ্টাই বিফলে গেল।
হঠাৎই প্রচণ্ড রাগ আর অসহায়ত্ব ফুলকে গ্রাস করল। সে দুই হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে কেঁদে উঠল। লুইস ভড়কে গিয়ে মাথা নিচু করে বলল, “সরি মিস্ট্রেসা।”
“সরি? কী করবো আমি আপনার সরি দিয়ে? এটা তো চালুই হচ্ছে না।”
ফুলের কান্নার মাত্রা বেড়েই চলল। লুইস দিশাবিশা না পেয়ে বলল, “শহরে গিয়ে কোনো টেকনিশিয়ান দিয়ে ঠিক করিয়ে দেব, মিস্ট্রেসা। আপনি প্লিজ শান্ত হোন।”
কথাটা শুনে ফুলের কান্না থেমে গেল। ছুটে এসে অস্থির গলায় শুধাল, “এটা ঠিক করা যাবে?”
লুইস সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “কেন যাবে না? শুধু তো একটু পড়েই গেছে। তেমন কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না।”
,
,
,
সন্ধ্যার আকাশে সূর্য প্রায় অস্তমিত। ফুল অস্থির পায়ে টেকনিশিয়ানের দোকানে দাঁড়িয়ে আছে। শীতকালে দিনের নাগাল পাওয়া বেশ কঠিন। দীর্ঘ আধঘণ্টার উৎকণ্ঠা শেষে যখন রেকর্ডারটি সচল হলো, এক মুহূর্তের জন্য ফুলের ফ্যাকাশে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
“কত হয়েছে?” ফুলের প্রশ্নে টেকনিশিয়ান যন্ত্রটি মুছতে মুছতে বললেন, “তিনশো টাকা।”
ফুল তার ব্যাগ থেকে টাকাটা পরিশোধ করে দিল। সে টাকা পেয়েছে সোলার এস্টেটে গত কয়েকমাস মেইড হিসেবে কাজ করে। যদিও সে টাকা নিতে চায়নি তবুও উদ্যান বলেছে সব মেইডদেরই স্যালারি দেওয়া হয় তাই তাকেও নিতেই হবে।
কাজ শেষে ফুলের আর সোলার এস্টেটে ফেরা হলো না। লুইস তাকে নিয়ে এল সোহমের দেওয়া ফ্ল্যাটের সামনে। পুরোটা রাস্তা ফুল গাড়ির সিটে মাথা এলিয়ে দিয়ে রেকর্ডারটার দিকে অপলক চেয়ে ছিল।
“আমরা এসে গেছি মিস্ট্রেসা।”
ফুল নির্লিপ্ত স্বরে বলল, “আমার নাম ফুল, মিস্ট্রেসা নয়। ওই নামেই ডাকবেন।”
লুইস উত্তর দিল না। ফুল ব্যাগপত্র নিয়ে গাড়ি থেকে নামতেই লুইস বলল, “একটু অপেক্ষা করুন। গাড়িটা গ্যারেজে রেখে আপনাকে চাবি ফিরিয়ে দিচ্ছি।”
ফুল থমকে দাঁড়াল। গাঢ় গোলাপি রঙের দামী গাড়িটার দিকে একবার চোখ বুলিয়ে সে ক্লান্ত গলায় বলল, “আপনার কাছেই রাখুন। আমি তো গাড়ি চালাতে জানি না, চাবি দিয়ে কী করব?”
“শিখে নেবেন। মাস্টার আমাকে শুধু এইটুকুই বলে গেছেন, আপনাকে যেন সোলার এস্টেট থেকে নিরাপদে এখানে পৌঁছে দিই।”
“মানে? আপনিও কি ফিরে যাবেন মেক্সিকোতে?”
“জি, আমি শুধু আপনাকে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই এসেছিলাম।”
ফুলকে আর কোনো প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে লুইস গাড়িটা গ্যারেজে রেখে ফুলকে চাবি ফিরিয়ে দিল। তারপর কোনো বাড়তি কথা না বলে হাঁটা ধরল এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে।
ফুল নির্লিপ্ত চোখে ফ্ল্যাটের দিকে ঘুরে তাকায়। তার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে সতেরো তলাবিশিষ্ট এক সুউচ্চ দালানকোঠা। সোহমের দেওয়া চাবিটা হাতে নিয়ে দেখল তাতে ফ্লোর নম্বর লেখা আছে। সে নিরাসক্ত পায়ে হেঁটে হেঁটে এসে দাঁড়ায় লিফটের সামনে। সতেরো নম্বর বাটনটা টিপতেই এক মাঝবয়সী দম্পতি লিফটে উঠে পড়ল। তারা পনেরো তলার বাটন টিপল। মহিলাটি কৌতুহলী চোখে ফুলকে আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখে বললেন, “তোমাকে তো আগে দেখিনি। বেড়াতে এসেছ নাকি?”
ফুল কোনো উত্তর দিল না। মহিলাটি কিছুটা অপমানিত বোধ করে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। লিফট যখন সতেরো তলায় পৌঁছাল, ফুল টলমলে পায়ে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকল। ভেতরে ঢুকতেই তার বুকটা ধক করে উঠল। এস্টেটে থাকাকালীন তার রুমটা যেমন ছিল এই রুমটাও ঠিক সেই আদলেই সাজিয়ে রাখা। চারদিকের এতো এতো সৌন্দর্য চাকচিক্য কিছুই ফুলের মনে দোলা দিতে পারল না। সে দরজাটা ভালোভাবে লক করে ব্যাগগুলো সব ড্রইংরুমই ছুড়ে রাখল। তারপর জুতোও খোলার প্রয়োজন বোধ করল না। টলতে টলতে সোফায় গিয়ে গা এলিয়ে দিল সে।
রেকোর্ডার টা অন করে উদ্যানের কথাগুলো আবারও শুনতে শুনতে কখন যে তার চোখ লেগে গেল সে নিজেও টের পেল না।
নিস্তব্ধ রুমের ভেতর ঘড়ির কাটার টিকটিক শব্দ যেন ক্রমশই ঘনীভূত হচ্ছে। ফুলের ঘুম ভাঙল রাত বারোটায়। ঘুমোতে ঘুমোতে তার মুখাবয়ব ফুলে ভারী হয়ে গেছে একদম। ব্যাগগুলো নিয়ে কাপড় গোছানোর জন্য সে বেডরুমের ওয়ার্ডরোবটা খুলল। ড্রয়ার খুলতেই নজরে এল একটা সাদা খাম। ফুল খামটা খুলে দেখল সেটা একটা ক্যাফের দলিল। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে নিজের নামখানা দেখে বুঝতে পারল, এটাই অনির দেওয়া সেই গিফটটা। অনি তাকে একটা ক্যাফে গিফট করেছে।
ফুল বেশি ভাবাভাবি করল না। ব্যাগগুলো সমেত কাপড় গুলো রেখে শাওয়ার নিতে চলে গেল। প্রায় এক ঘণ্টা ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে রইল। সারাদিন পেটে দানাপানি পড়েনি। খিদে নেই, তবুও শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে। কিচেনে ঢুকতেই তার চোখ আটকে গেল দেয়ালে সাঁটানো কিছু মোটিভেশনাল স্টিকারের ওপর। ইতিবাচক সব উদ্ধৃতি লেখা সেখানে। ফুল সেগুলো দেখতে দেখতেই কেবিনেট থেকে এক প্যাকেট কুকিজ বের করে আনমনে চিবোতে লাগল।
,
,
,
এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল।
ব্যালকনির রেলিং ধরে ফুল বাইরের ঝলমলে শহরের দিকে তাকিয়ে আছে। আজ থার্টি ফার্স্ট নাইট—হ্যাপি নিউ ইয়ারের উন্মাদনায় মেতেছে পুরো শহর। চারদিকে আতশবাজির রোশনাই আর উৎসবের আমেজ। হাতে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা নিয়ে এই দৃশ্য দেখাটা বেশ উপভোগ্য হলেও ফুল তেমন কিছুই অনুভব করতে পারল না।
সে শুধু ফাঁকা চোখে চেয়ে আছে বাইরের অন্ধকার চিরে হঠাৎ হঠাৎ জ্বলে ওঠা ক্ষণস্থায়ী আলোর দিকে। তখনই তার ফোনে একটা মেসেজ এল। সে কাপটা টেবিলে রেখে ফোনটা হাতে তুলে মেসেজ টা ওপেন করল। বুঝতে পারল, গতকাল যে টেস্টের জন্য সে হাসপাতালে গিয়েছিল, কালই তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট।
ফুল কিছুক্ষণ স্থির চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থেকে দু আঙুলে কপাল ঘষতে লাগল। সে জানে, এটা কোনো সাধারণ রক্ত পরীক্ষা নয়; এই টেস্ট বলে দেবে তার শরীরে ‘এইচডি’ (Huntington’s Disease) জিনের মিউটেশন আছে কি না। আর এই টেস্টের রিপোর্ট সে কয়েক ঘন্টা কিংবা কয়েক দিনের মধ্যেই পেয়ে যাবে না বরং তাকে মাসখানেক অপেক্ষা করতে হবে। তাছাড়াও গুনতে হবে মোটা অংকের টাকা।
ফুল নিজের ভাবনাতে নিজেই অবাক হলো যেই সে কয়েকদিন আগেও নিজের মৃ`ত্যু কামনা করতো সেই সে আজ চাইছে টেস্টের রেজাল্ট যেন নেগেটিভ আসে। অবশ্য সে ততোটাও আশা রাখেনি, তার মতো কপালপোড়া মেয়ে যা চাইবে তার বিপরীত কিছুই হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যদি সেটাও হয় তবুও সে ভাগ্যকে সাদরে গ্রহণ করবে। এখন হয়তো প্রশ্ন আসবে কেন সে এই টেস্ট করাতেই বা চাইছে। তো কারণ টা হলো সে নিশ্চিন্ত হতে চায়; জানতে চায় আদৌ সে কখনো এইচডি রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়বে কিনা।
ফুল আনমনেই ফোন টিপছিল, কখন যে সে উদ্যানের ইনস্টাগ্রাম প্রোফাইলে ঢুকে পড়ল সে নিজেও জানেনা। উফফ ফোনটা হাতে নিলেই সে সজ্ঞানে হোক বা অজ্ঞানে সেই লোকটার প্রোফাইলে যাবেই যাবে। এটা যেন বদ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে তার। ফুল জানে লোকটা কোনো কিছু পোস্ট করেনা। লাস্ট পোস্ট করেছিল তারা যখন বান্দরবানে ঘুরতে গিয়েছিল তখন। তাও আবার সবুজে মোড়া একটা পাহাড়ের ছবি; ক্যাপশনে লিখেছিল ‘Green-y Green-y’ এরপর থেকে আর কোনো পোস্ট করেনি তবুও সে দিনের মধ্যে শতবার চলে যায় লোকটা কোনো পোস্ট করেছে কিনা দেখতে।
“তুই এতো বেহায়া কেন ফুল? আমার করুণা হয় তোর প্রতি। ইচ্ছে করে গাল বরাবর ঠাসঠাস করে কয়েকটা লাগিয়ে দিই।”
নিজেকেই নিজে কথা শুনিয়ে ফুল পেজটা একবার রিফ্রেশ করতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল তার। নতুন একটা ছবি পোস্ট করেছে উদ্যান! ছবিতে তাকে ছায়ামানবের মতো লাগছে। পকেটে হাত গুঁজে সে আকাশের ঝুলে থাকা চাঁদটার দিকে নির্লিপ্ত মুখে তাকিয়ে আছে। দেখে মনে হচ্ছে সে চাইলেই চাঁদটাকে ধরে ফেলতে পারবে; অথচ সে চাইছেই না। ফুলের চোখ আটকে গেল ক্যাপশনে—
‘Not everything seems close is meant to be held.’ (একটা জিনিস খুব কাছে মনে হলেও সবসময় হাত বাড়িয়ে ধরা যায় না।)
ফুলের মাথায় হঠাৎ এক অদ্ভুত চিন্তা খেলে গেল। বাংলাদেশে এখন মাঝরাত মানে মেক্সিকোতে তো এখন দিনের বেলা; সময়ের পার্থক্য তো বারো ঘণ্টার। তবে লোকটা এই ভরদুপুরে রাতের ছবি পোস্ট করল কেন? পরক্ষণেই সে মাথা ঝাকিয়ে চিন্তাটা ঝেড়ে ফেলল। সে হয়তো অযথাই সবকিছু নিজের দিকে টেনে নিতে চাইছে।
ফুল প্রায় অনেকক্ষণ ছবিটা একমনে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখল। পোস্টের কমেন্ট সেকশন যথারীতি অফ, পার্সোনাল ভাবে মেসেজ করারও কোনো অপশন শো করছে না। তবে কয়েক মিনিটেই লোকটা লাইক এবং শেয়ার পেয়েছে প্রচুর৷ ফুলের একটু হিংসে হলো। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেডরুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরেরদিন!
শীতের সকালের রোদ সাধারণত মিষ্টি হয়, কিন্তু আজকের রোদটা যেন একটু বেশিই কড়া। এই প্রখর রোদের মধ্যেই ফুল এসে দাঁড়িয়েছে একটা ক্যাফের সামনে। তার বাসা থেকে ক্যাফেটার দূরত্ব খুবই সামান্য। সে এই প্রথম এসেছে এখানে। কাঁচের ভারী দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই ফুল দেখল, এক তরুণী হাতে নোটপ্যাড নিয়ে নিবিষ্ট মনে কাস্টমারদের অর্ডার নিচ্ছে। ফুলের পদশব্দে সে মুখ তুলে তাকাল। ছিমছাম গড়নের মেয়েটা, বয়স তেইশ-চব্বিশের কোঠায় হবে। গায়ে তার লাল-সাদার মিশ্রণে চমৎকার এক প্যাটার্নের অ্যাপ্রন।
“ওয়েলকাম ম্যাম… আপনি বোধহয় প্রথমবার এসেছেন? ভেতরে আসুন প্লিজ।” মেয়েটা একগাল হেসে বলল।
ফুল কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করল। তবুও সৌজন্যমূলক হেসে এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।
“কী অর্ডার করবেন ম্যাম?”
“আসলে আমি কিছুই অর্ডার করবো না। একটু কথা ছিল। ক্যাফের টেন্যান্টকে পাওয়া যাবে?”
মেয়েটা মাথা নেড়ে সায় দিল, “আপনি আমাকেই বলতে পারেন। আমি ওনার স্ত্রী।”
ফুল একটু ইতস্তত করে ব্যাগ থেকে দলিলপত্রগুলো বের করল। তারপর মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিতেই সে দ্রুত একবার পড়ে নিল। কাগজটা পড়ামাত্রই মেয়েটার হাসিতে যেন আরও উষ্ণতা যোগ হলো।
“সরি ম্যাম। আমি প্রথমে আপনাকে চিনতে পারিনি।”
“আরে না না, আমাদের তো এই প্রথম দেখা হলো। চিনতে না পারাটাই স্বাভাবিক।”
“আপনি বসুন না একটু, আমি আপনার জন্য আমাদের স্পেশাল একটা ডিশ বানিয়ে আনছি।”
ফুল আলতো করে মাথা নেড়ে অসম্মতি জানাল, “আজ নয়, অন্য একদিন আসব। আজ আসলে অন্য কাজে বেরিয়েছি, হাতে একদম সময় নেই।”
মেয়েটা হাসতে হাসতেই করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিল, “অবশ্যই আসবেন। আমার নাম তনয়া। আপনার?”
ফুল তার হাত স্পর্শ করে বলল, “ফুল।”
তনয়া তাকে নিয়ে কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে এক মাঝবয়সী মহিলা চশমা এঁটে খুব মন দিয়ে হাদিসের বই পড়ছিলেন। তনয়া ডাকল, “আম্মু, দেখুন কে এসেছে।”
মহিলাটি চোখ তুলে তাকাতেই ফুলের সাথে দৃষ্টি বিনিময় হলো। মুহূর্তেই দুজনের মনে পড়ে গেল সেই লিফটের ঘটনাটা। ফুলের চেহারায় কোনো বিশেষ ভাবান্তর হলো না, কিন্তু মহিলাটি বেশ অবাক হলেন। তনয়া কাউন্টারে ঢুকে নিচু স্বরে তার শাশুড়িকে বলল, “আম্মু, ইনি এই ক্যাফের ওনার। মনে হয় ভাড়া নিতে এসেছে। আপনার ছেলে প্রতি মাসে কত দেবে বলেছিল?”
মহিলাটি ফুলের থেকে দৃষ্টি না সরিয়েই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিলেন, “পঞ্চাশ হাজার।”
তনয়া চটজলদি ড্রয়ার খুলে টাকা গুনে নিয়ে ফুলের দিকে বাড়িয়ে দিল, “এই নিন ম্যাম। পুরো দুইমাসের ভাড়া। গুনে দেখুন ঠিক আছে কিনা।”
ফুল টাকা গুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে ম্লান হেসে বলল, “প্রয়োজন নেই আপু। আর আমাকে নাম ধরে ডাকলেই খুশি হবো।”
“ঠিক আছে ফুল। তোমার বাসা কি খুব দূরে?” তনয়া বেশ সহজভাবেই জানতে চাইল।
“আগে দূরেই ছিল, এখন সানরাইজ টাওয়ারে উঠেছি।”
তনয়া আকাশ থেকে পড়ল, “বলো কী! আমরাও তো সেখানেই থাকি। তুমি কত তলায়?”
“সতেরো।”
“আর আমরা পনেরোতে! কী অদ্ভুত তাই না? এর আগে আমাদের আর দেখাই হয়নি।”
ফুলের মনে হলো তার দেরি হয়ে যাচ্ছে তাই সে বলল, “বাকি কথা অন্য কোনো দিন হবে আপু। আজ আসি।”
“ঠিক আছে, সাবধানে যেও। বাই!”
ক্যাফে থেকে বেরিয়েই ফুল মুখে মাস্ক টেনে নিল। বোরকা পরার অভ্যাস তার কোনোকালেই ছিল না, কিন্তু ইদানীং সে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। তাই হিজাব-বোরকায় নিজেকে ঢেকেই সে বাড়ি থেকে বের হয়। ফুল হাত নেড়ে একটা অটো থামিয়ে উঠে পড়ল। হাসপাতালের করিডোরে বসে সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। তারপর রক্ত পরীক্ষার জন্য ব্লাড স্যাম্পল জমা দিয়ে ফিরে গেল বাড়িতে।
,
,
,
ফেব্রুয়ারী মানেই ভালোবাসার মাস। তবে যাদের জীবনে ভালোবাসাই নেই তাদের কাছে কিন্তু আলাদা করে এই মাসের কোনো গুরুত্বও নেই।
জনশূন্য ক্যাফেতে তনয়ার মুখোমুখি বসে ছিল ফুল। রাত ক্রমশ বাড়ছে। তনয়ার শাশুড়ি কিছুক্ষণ আগেই বাড়ি ফিরে গেছেন। ক্যাফের দুজন ওয়েটার তখন ব্যস্ত শেষ মুহূর্তের গোছগাছে; ডিশ পরিষ্কারের টুংটাং শব্দ আর চেয়ার সরানোর খসখস আওয়াজ নিস্তব্ধ হতে যাওয়া পরিবেশটাকে কিছুটা সচল রেখেছে।
গরম চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে। তনয়া সেই কাপে আলতো চুমুক দিয়ে তার জীবনের গল্প বলছিল।
“তোমার ভাইয়া আর আমি সমবয়সী। বেশ দাপিয়ে প্রেম করেই বিয়েটা হয়েছিল আমাদের। তখন আমরা সবেমাত্র অনার্স তৃতীয় বর্ষে। সমবয়সী হওয়ার কারণে আমার শাশুড়ি মা প্রথমে কোনোভাবেই রাজি ছিলেন না। তবে তোমার ভাই তাকে রাজি করিয়েই নিয়েছিল। অবশ্য তাতে আমার শ্বশুর আর ভাসুরও অনেকটা মদত দিয়েছিলেন। তারপর আমার মাথায় পাগলামি চাপল একটা ক্যাফে খোলার। এবারও শাশুড়ি মা বেঁকে বসলেন। বাড়ির বউ ক্যাফে চালাবে, সেটা তিনি মেনে নিতে পারবেন না। কিন্তু ওইযে তোমার ভাই সেটাও ম্যানেজ করে ফেলেছে। এখন আম্মুও মাঝেমধ্যে এসে ক্যাফেতে বসেন। মুখে না বললেও আমি বুঝি যে কাস্টমারদের আনাগোনা দেখতে তারও ভালো লাগে।”
ফুল একদৃষ্টে তাকিয়ে তনয়ার কথাগুলো শুনছিল। তার নির্লিপ্ত চোখের পাতায় কোনো প্রশ্ন বা বিস্ময় নেই। তনয়া সামান্য বিরক্ত হয়ে বলল, “তুমি কেমন যেন ফুল, আমিই শুধু বকবক করে যাই আর তুমি একটি কথাও বলো না।”
ফুল ম্লান হেসে মাথা নিচু করে বলল, “তেমন কিছুই না আপু। আমি শুনছি তো।”
“শুধু শুনলেই হবে? নিজের ব্যাপারেও বলো কিছু।”
“বলার মতো কিছু থাকলে তো বলবো।”
তনয়া একটু ঝুঁকে এল ফুলের দিকে, “একদমই কিছু নেই? নাকি আমাকে বলতেই চাও না, কোনটা?”
“যা ছিল তাতো বলেই দিয়েছি।”
তনয়া ঠোঁট উল্টে মুখ গোমড়া করল, “তুমি শুধু বলেছো কেউ নেই তোমার। আর এটাই যে তুমি বর্তমানে অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়ো। কিছুদিন পরেই সেকেন্ড ইয়ারে উঠবে। ব্যস এইটুকুই!”
ফুল আর বসল না। কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে উঠে দাঁড়াল। বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “হুম। আচ্ছা আপু, আমাকে এখন যেতে হবে। তোমার হাজব্যান্ড তো কিছুক্ষণ পরেই নিতে আসবে তোমাকে। তার সাথে চলে এসো।”
কোনোমতে ক্যাফে থেকে বেরিয়ে পড়ল ফুল। কাউকে নিজের ব্যাপারে কিছুই বলতে চায় না সে। এই জন্যই সারাক্ষণ ঘরের মধ্যেই থাকার চেষ্টা করে কিন্তু কতোক্ষণই বা একজন মানুষ ঘরবন্দী হয়ে থাকতে পারে? সেও পারেনা। মাত্রাতিরিক্ত একা একা থাকলে পুরোনো কথাগুলো বেশি বেশি মনে পড়ে যায়। তখন আর বাইরে বের না হয়ে পারা যায় না।
,
,
,
মেক্সিকোর আকাশে এখন গোধূলির রক্তিম আভা। তবে থান্ডার এস্টেটের বিশাল পানিশমেন্ট বেসমেন্টে সেই আলোর রেশটুকুও পৌঁছায়নি; সেখানের বাতাস ভারী হয়ে আছে জমাটবদ্ধ আতঙ্ক আর ঘামের গন্ধে। মাটির নিচের এই স্যাঁতসেঁতে বেসমেন্টে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে পড়ে আছে অনেকগুলো লোক। তাদের মধ্যে রিহান, ক্রাশার, চার্লস আর মরগ্যান যেমন আছে, তেমনি আছে বডিশপ ক্লাবের সেই রাতে উপস্থিত থাকা সকল অতিথিবৃন্দ।
লোকগুলি ভিন্ন ভিন্ন দেশের হলেও ফুলকে ফেলে রেখে মেক্সিকোতে ফিরে আসবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরপরই তাদেরকে এক এক করে খুঁজে বের করে বন্দি করেছে উদ্যান।
বন্দিদের সারির পাশে দাঁড়িয়ে আছে রিদম আর লুহান। চারদিকে পাহারায় আছে উদ্যানের তৈরি করা রোবট আর সশস্ত্র গার্ডের দল। বন্দিদের মুখে কালো স্কচটেপ লাগানো, তাদের আর্তনাদ কেবল গোঙানি হয়ে ঘরের দেয়ালে ধাক্কা খাচ্ছে। রিহান আর তার সঙ্গীরা বাদে বাকিরা জানেই না যে এতোদিন ধরে তাদেরকে কেন এভাবে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে।
রিদম আর লুহানও এই আকস্মিক ধরপাকড়ের রহস্য উদ্ধার করতে পারছিল না। অবশেষে কৌতুহল দমাতে না পেরে লুহান ফিসফিসিয়ে প্রশ্ন করল, “শোন, রিহান আর ক্রাশারদের আটকে রাখার যথেষ্ট কারণ আছে সেটা বুঝলাম কিন্তু বাকিদের আটকে রাখার কারণ কী?”
উদ্যানের চোখের কোণে লালচে আভা, চোখের মণি অস্থির। পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে, সে কড়া কোনো ড্রাগের নেশায় আচ্ছন্ন। সে একনাগাড়ে নিজের ঘাড় চুলকাচ্ছিল; যেন অদৃশ্য কোনো স্নায়বিক উত্তেজনা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে ঘাড় চুলকাতে চুলকাতেই দাঁত খিঁচে বলল, “ওরা ফ্লাওয়ারের মুখ দেখে ফেলেছিল। তাই তুলে এনেছি।”
রিদম কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিল না। সে শুধু নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করছিল নিজের হাতেই নিজের ভাইকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। লুহানই আবারও কথা বাড়াল, “ফুলকে দেখে নিয়েছে তো কী হয়েছে? তার ওপর বডিশপ ক্লাবের চৌদ্দগোষ্ঠীকে কেন তুলে আনতে বললি? তোর কথামতো তো ওরা ক্লাব বন্ধও করে দিয়েছিল।”
উদ্যান চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, “বললাম না ওরা ফ্লাওয়ারকে দেখে ফেলেছে? বুঝতে পারছিস না? ওরা ফ্লাওয়ারের ক্ষতি করার চেষ্টা করবে?”
লুহান ব্যপারটা বুঝতে পারলেও মেনে নিতে পারছে না, “ক্ষতি করার চেষ্টা করবে সেটা ঠিক আছে। কিন্তু তাতে তোর কী?”
উদ্যান এবার লুহানের দিকে রক্তচক্ষু মেলে তাকাতেই লুহান দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মিনমিনিয়ে বলল, “না মানে, ফুলের কোনো ক্ষতি হয়ে গেলেও তোর তো টেনসড হওয়ার কথা নয়।”
“আমি টেনসড হচ্ছি না। আমি শুধু চাইছি না আমার শিকারকে অন্য কেউ শিকার করে ফেলুক।”
“তাই বলে তুই এতোগুলো লোককে এভাবে বন্দি করে রাখবি?”
“হ্যাঁ রাখব। মে`রে যে ফেলছি না সেটাই তো অনেক। যতদিন ফ্লাওয়ার মুক্ত থাকবে, ততদিন ওরা বন্দি থাকবে।”
লুহান বিরক্তিতে বিড়বিড় করলো, “এর চেয়ে ওই একটা ফুলকেই বন্দি করে রাখা সহজ ছিল।”
“কিছু বললি লুহান?”
“নাথিং!”
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৬০০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৩
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৫ (এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২১