Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬৩


#রোদ্দুরের_ছেঁড়া_মানচিত্র

#পর্ব_৬৩

#নিলুফা_নাজমিন_নীলা

★★★

মেহরাব দেওয়ান তূর্ণার স্কুল ছুটির সময় ঠিকঠাকই পৌঁছালেন। প্রতিদিনের মতোই স্কুলের গেটের সামনে গাড়িটা পার্ক করে মেয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। তাঁর মনের গহীনে এক অজানা অস্বস্তি রিনি নেই, আজ স্কুলে গিয়ে রিনিকে না পেয়ে তূর্ণার মনের অবস্থা কেমন হবে, তা ভেবে মেহরাব নিজেই কিছুটা দিশেহারা।

​ছুটির ঘণ্টা পড়ল। সব বাচ্চারা একে একে তাদের পরিবারের সাথে হাসিমুখে বেরিয়ে আসছে। কিন্তু অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেলেও তূর্ণার দেখা মিলল না। মেহরাবের বুকের ভেতরটা তখন ধক করে উঠল। তিনি আর অপেক্ষা না করে নিজেই স্কুলের ভেতরে ঢুকলেন। ক্লাসরুম, করিডর, খেলার মাঠ সবখানে তূর্ণাকে খুঁজলেন, কিন্তু কোথাও নেই তাঁর ছোট্ট মেয়েটা।

মেহরাব অস্থির হয়ে অফিস রুমে গিয়ে শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করতেই তাঁরা জানালেন, তূর্ণা নাকি কাউকে কিছু না বলে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেছে। খবরটা শুনে মেহরাবের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে দৌড়ে আবার গেটের দারোয়ানের কাছে গেলেন। কাঁপাকাঁপা হাতে মোবাইলে তূর্ণার ছবি দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“এটা আমার মেয়ে তূর্ণা। একে কি বের হতে দেখেছেন?”

​সিকিউরিটি গার্ড ছবিটা দেখে মাথা নাড়ল,

“হ্যাঁ, এই বাচ্চাটা তো বেশ কিছুক্ষণ আগেই বেরিয়ে গেছে। আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কোথায় যাচ্ছ, কিন্তু কোনো উত্তর দেয়নি।”

​মেহরাব আর্তনাদ করে উঠলেন, “কোথায় গিয়েছে দেখেছেন?”

​গার্ড আঙুলের ইশারায় ডান দিকের রাস্তাটা দেখিয়ে দিয়ে বলল,

“এই দিক দিয়ে গিয়েছে।”

মেহরাব আর এক মুহূর্তও দেরি করলেন না। উন্মাদের মতো রাস্তার ডান দিক ধরে ছুটতে লাগলেন। রাস্তার প্রতিটি মানুষের মুখে, প্রতিটি অলিতে-গলিতে ব্যাকুল নয়নে তূর্ণাকে খুঁজতে লাগলেন। বুকের ভেতরের হাহাকার তখন ক্রমশ বড় হচ্ছে। ​বেশ কিছুটা পথ যাওয়ার পর হঠাৎ মেহরাবের দৃষ্টি স্থির হলো। রাস্তার পাশে একটা পরিত্যক্ত টেবিলের ওপর তূর্ণা নিঃশব্দে বসে আছে। মেহরাব দেওয়ান বিলম্ব না করে দৌড়ে গিয়ে তূর্ণার সামনে দাঁড়ালেন। হাঁপাতে হাঁপাতে মেয়ের নাম ধরে ডাকলেন। কিন্তু অবাক কাণ্ড! তূর্ণা তার বাবাকে দেখেও কোনো রকম প্রতিক্রিয়া দেখাল না।

মেহরাব দেওয়ান তূর্ণার সামনে ফুটপাতে হাঁটু গেঁড়ে বসলেন। ব্যাকুল হয়ে মেয়ের দুই কাঁধ ধরে বললেন,

“মামণি, তুমি এখানে এভাবে একা একা কেন বসে আছো? কী হয়েছে আমার সোনামণিটার?”

​বলতে বলতে মেহরাব যখন তূর্ণার হাত ধরতে গেলেন, তূর্ণা এক ঝটকায় নিজের হাত সরিয়ে নিল। মেহরাব চরম বিস্ময়ে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তূর্ণার দুগাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ছে, ফর্সা নরম গালগুলো কান্নায় একদম টকটকে লাল হয়ে উঠেছে। তূর্ণা ভিজে গলায় চিৎকার করে বলে উঠল,

“আমাকে একদম ছুঁবে না পাপা! একদম না!”

মেহরাব দেওয়ান বজ্রাহতের মতো স্তব্ধ হয়ে গেলেন। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না তিনি। অস্ফুট স্বরে বললেন,

“কী হয়েছে মাম্মাম? পাপা কী করেছে?”

তূর্ণা এবার হিক্কা তুলে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তোমার জন্য! শুধু তোমার জন্য আমার আম্মুকে আমি আবার হারিয়ে ফেলেছি। তুমি একদম ভালো পাপা নও। তুমি খুব পচা, তুমি ব্যাড পাপা! আই হেইট ইউ পাপা! আমি তোমাকে একটুও ভালোবাসি না।”

মেহরাব দেওয়ানের পৃথিবীটা যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। তূর্ণার মতো একটা ছোট বাচ্চা তাকে ঘৃণা করছে? এই ছোট্ট হৃদয়ে এতটুকু বয়সে এতটা ক্ষোভ কোত্থেকে এল? মেহরাব তূর্ণাকে শান্ত করার জন্য কাছে টানতে চাইলেন, গলার স্বর নরম করে বললেন,

“এভাবে বলে না মা। আমি তো তোমাকে অনেক ভালোবাসি। দেখো, সব ঠিক হয়ে যাবে। কেঁদে না লক্ষ্মী মা আমার।”

তূর্ণা এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। “আম্মু” বলে শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। সেই কান্নায় মা হারানো সন্তানের যে কী গভীর অসহায়ত্ব মিশে ছিল, তা মেহরাব দেওয়ানের বুকের ভেতর দিয়ে তপ্ত ঝড়ের মতো বয়ে গেল। তিনি কী বলে মেয়েকে শান্ত করবেন, কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছিলেন না। জোর করে তূর্ণাকে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন, কিন্তু তূর্ণার কান্না থামার কোনো লক্ষণই নেই।

মেহরাব কাঁপাকাঁপা হাতে মেয়ের চোখের জল মুছে দিলেন। খুব ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি সত্যিই আমাকে ঘৃণা করো মাম্মাম? পাপা খুব কষ্ট পেয়েছে তোমার কথা শুনে। পাপা কি সত্যিই এত খারাপ?”

তূর্ণা এবার তার বাবার বিষণ্ণ মুখের দিকে তাকালো। শব্দ করে কান্নাটা থামাল ঠিকই, কিন্তু চোখের নোনা ধারা থামল না। সে অসীম মায়ায় মেহরাবের গলা জড়িয়ে ধরল। কান্নারত ভারী কণ্ঠে আবদার করল, “পাপা, আমার আম্মু কোথায় গিয়েছে? আমাকে আমার আম্মুর কাছে নিয়ে চলো। ওকে এনে দাও পাপা!”

মেহরাব দেওয়ান আকাশের দিকে তাকিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। রিনিকে যে ফিরিয়ে আনা সম্ভব না, সেই রূঢ় সত্যটা তিনি তাঁর এই ছোট্ট মেয়েটাকে কীভাবে বোঝাবেন? মেহরাবের মুখ দিয়ে আর কোনো শব্দ বের হলো না, কেবল এক বুক অপরাধবোধ তাঁকে কুরে কুরে খেতে লাগল।

★★★

মির্জা কনফারেন্স রুমে বসে আছেন মির্জা পরিবারের পুরুষগণ। আরিয়ান, রোহান এবং বাকিরা। মিটিং রুমের থমথমে পরিবেশে এনামুল মির্জা ফাইলের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বললেন,

“আগামী কোয়ার্টারের এক্সপোর্ট রিপোর্ট বলছে আমাদের টেক্সটাইল ইউনিটে প্রোডাকশন কস্ট ১৫% বেড়েছে। এভাবে চললে গ্লোবাল মার্কেটে আমরা কম্পিটিটিভ প্রাইস ধরে রাখতে পারব না।”

আহাদ মির্জা মাথা নেড়ে সায় দিলেন,

“ঠিক। আমাদের সাপ্লাই চেইন অপটিমাইজ করতে হবে। রেহান, তুমি কি লজিস্টিক পার্টনারদের সাথে নতুন কন্ট্রাক্ট নিয়ে কথা বলেছ?”

রেহান সংক্ষেপে উত্তর দিল, “জি চাচ্চু, তারা রেট কমাতে রাজি। তবে আরিয়ানের সিগনেচার ছাড়া তো আমরা ফাইনাল ড্রাফট পাঠাতে পারছি না।”

মিটিং রুমে তখন গুরুত্বর্পূণ ব্যবসায়িক ছক আঁকা হচ্ছে, কিন্তু আরিয়ানের চোখ জানালার বাইরের নীল আকাশে আটকে আছে। ওর মনের ভেতরটা ছটফট করছে এক চিলতে হাসির জন্য, একটা মায়াবী ডাক শোনার জন্য।

আহাদ মির্জা আরিয়ানের এই আনমনা ভাবটা লক্ষ্য করে ভ্রু কুঁচকে বললেন,

“হোয়াট হ্যাপেন্ড আরিয়ান? কোথায় আছ তুমি?”

হঠাৎ বাবার ডাকে আরিয়ান সচকিত হয়ে সংবিতে ফিরে এল। যেন কোনো এক গভীর স্বপ্ন থেকে কেউ তাকে টেনে তুলল। আহাদ মির্জা কিছুটা বিরক্ত হয়ে আবার জিজ্ঞেস করলেন,

“এতক্ষণ আমরা লজিস্টিক আর কস্টিং নিয়ে যা বললাম, সেটা কি বুঝতে পেরেছ?”

আরিয়ান ছোট করে বলল, “সরি, কী বললে আবার একটু বলবে?”

মিটিং রুমে বসা সবাই একে অপরের দিকে অবাক হয়ে তাকালো। ব্যবসার এত সূক্ষ্ম আর জটিল হিসেব নিয়ে কথা হচ্ছে, অথচ আরিয়ানের মতো ফোকাসড একজন মানুষের এই উদাসীনতা সবাইকে ভাবিয়ে তুলল। ইকবাল মির্জা পরিস্থিতি সামলে নিতে হালকা হেসে বললেন,

“ঠিক আছে আরিয়ান, তোর মনে হয় একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার। তুই বরং বাইরে থেকে একটু হেঁটে আয়, আমরা এখানে বাকিটা দেখছি।”

আরিয়ান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। মিটিং রুম থেকে বের হওয়ার সাথে সাথেই সে পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত হাতে তৃণাকে কল দিল। রিং হচ্ছে, কিন্তু ওপাশে কেউ ফোন তুলছে না। পরপর দুইবার কল করার পরও যখন কোনো সাড়া মিলল না, আরিয়ানের অস্থিরতা তখন দ্বিগুণ হয়ে গেল। ​উপায় না দেখে সে মায়মুনা বেগমের ফোনে কল দিল। ফোন তুলতেই ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“মা, তৃণা কোথায়? ও কি ঠিক আছে?”

​মায়মুনা বেগম শান্ত গলায় বললেন,

“আরে আরিয়ান, তুই এত অস্থির হচ্ছিস কেন? তৃণা তো একটু আগে ঘুমিয়েছে। ও তো ভালো আছে বাবা।”

আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“আচ্ছা মা, তাহলে ওকে এখন ডেকো না। ও ঘুমাক।”

ফোনটা রেখে করিডোরের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল সে। ভেতরের হাঁসফাঁসানিটা যেন কমছেই না। এই মুহূর্তে যদি একবার ওর গলার স্বর শুনতে পেত, হয়তো মনের এই ঝড়টা থেমে যেত। আরিয়ান অবচেতন মনেই নিজের বুকপকেটে হাত দিল। আঙুলের স্পর্শে ঠান্ডা ধাতব কিছু একটা অনুভব করতেই তার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ​পকেট থেকে সেই রূপালি নূপুরটা বের করে আনল সে। নূপুরটা চোখের সামনে ধরতেই নূপুরের সেই সূক্ষ্ম শব্দ আর তৃণার পায়ের নূপুর পরানো সেই মুহূর্তটা চোখের সামনে ভেসে উঠল। আরিয়ানের তীব্র ইচ্ছে করছে এখনই সব কাজ ফেলে তৃণার কাছে উড়ে যেতে, ওকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু অফিসের এই জরুরি মিটিং আর দায়িত্ব তাকে শেকল দিয়ে বেঁধে রেখেছে।

সে নূপুরটা আবার সযত্নে নিজের হৃদপিণ্ড বরাবর পকেটে রেখে দিল। যেন এই ছোট্ট জিনিসটাই এখন তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন। আরিয়ান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ধীরস্থিরভাবে মোবাইলটা বের করল। বাইরের খোলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে সে হোয়াটসঅ্যাপের ভয়েস রেকর্ডিং বাটনটা চেপে ধরল। তার ভরাট আর মায়াবী কণ্ঠে গানের সুর তুলে ওপাশে থাকা মানুষটির জন্য একরাশ

আবেগ পাঠাতে শুরু করল,

​“দেখলে তোকে বদলায় দিন,

বদলায় রাত, বদলায় ঘুম, সঙ্গে সময়।

সন্ধ্যে হলে বন্ধ ঘরে…

মনে পড়ে তোরই কথা, এমনই হয়।

কেন যে তোকে পাহারা পাহারা দিলো মন।

কেন রে এতো সাহারা সাহারা, সারাদিন।

কেন যে তোকে পাইনা পাইনা মনে হয়… সারাদিন!”

​রেকর্ডিংটা শেষ করে সেন্ড করার পর সে মুচকি হাসল। তৃণা যখন ঘুম থেকে উঠে এই গানটা শুনবে, ওর মিষ্টি হাসিমাখা মুখটা কল্পনা করেই আরিয়ানের মনটা ভালো হয়ে গেল। সে আবারও রেকর্ডিং অন করল, তবে এবার গানের সুরে নয়, শাসনের স্বরে,

“তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠে খেয়ে নিবে, বুঝলে বউজান? একদম অবহেলা করবে না, তা না হলে কিন্তু আমি এসে ভীষণ বকব। আমার অনাগত সন্তানের একটুও কষ্ট আমি মেনে নেব না, হুহ! আর শোনো, যদি ঠিকমতো না খাও, তবে শাস্তিস্বরূপ আমাকে কিন্তু টানা একশটা চুমু দিতে হবে। এতে নিশ্চয়ই তোমার খুব কষ্ট হবে, আর আমি তো চাই না আমার শ্যামলিনী কোনো কষ্ট পাক। তাই লক্ষ্মী বউয়ের মতো খেয়ে নেবে। আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি, শ্যামলিনী।”

​ভয়েস মেসেজগুলো পাঠিয়ে আরিয়ান মোবাইলটা আবার নিজের বুকপকেটে সযত্নে রেখে দিল। মনের ভেতর যে অস্থিরতা ছিল, তা যেন এই কয়েক মিনিটের কথা বলাতেই অনেকটা শান্ত হয়ে এল। এবার সে আত্মবিশ্বাসের সাথে কনফারেন্স রুমের দিকে পা বাড়াল। মিটিংয়ের বাকি কাজগুলো দ্রুত শেষ করে প্রিয়তমার কাছে ফেরার এক তীব্র তাড়া এখন তার প্রতিটি কদমে। তবে আজ কিসের এত তাড়া?

★★★

আরিয়ান সন্ধ্যায় গাড়ি নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়ে পড়ল। অফিসের কাজের স্তূপ তখনো শেষ হয়নি, কিন্তু তার মন আর সেখানে সায় দিচ্ছিল না। শহরের রাস্তায় সোডিয়ামের হলদেটে আলোয় চারপাশটা এক মায়াবী রূপ নিয়েছে। গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ আরিয়ানের নজর কাড়ল ফুটপাতের ধারের একটা ছোট ফুলের দোকান। দোকানটা সাদামাটা হলেও এই সায়াহ্নে ফুলগুলো অদ্ভুত এক সতেজতা ছড়িয়ে রেখেছে।​ রাস্তার একপাশে গাড়ি থামিয়ে সাবধানে রাস্তা পার হয়ে দোকানটির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার চোখে পড়ল সযত্নে গেঁথে রাখা বেলি ফুলের শুভ্র একগুচ্ছ গাজরা। সেটা হাতে তুলে নিল। মুহূর্তেই তার কল্পনার ক্যানভাসে ভেসে উঠল তৃণার মুখটি, তার সেই লম্বা ঘন কালো চুলের ভাঁজে এই সাদা বেলির গাজরাটি কতটাই না স্নিগ্ধ দেখাবে! নিজের অজান্তেই সে যেন এক ঘোরের মধ্যে হারিয়ে গেল।

আরিয়ানকে এভাবে ফুল হাতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে বিক্রেতা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,

“কী হলো ভাই? সব ঠিক আছে তো?”

লোকটির গলার স্বরে আরিয়ান সম্বিত ফিরে পেল। লোকটি আবার হেঁসে বলল,

“নিশ্চয়ই ভাবির কথা ভাবছিলেন? যা বুঝলাম, ভাবি নিশ্চয়ই অনেক সুন্দরী, তা না হলে কেউ এভাবে ফুলের দিকে তাকিয়ে ঠাসকি খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না!”

আরিয়ান ম্লান কিন্তু তৃপ্তির হাসি হাসল। সে গাজরাটার দিকে তাকিয়ে গভীর অনুরাগে বলল,

“তাহার সৌন্দর্যে আকাশের চাঁদের সাথে তুলনা করলেও ফিকে হয়ে যাবে। চাঁদের তো নিজস্ব কোনো আলো নেই , কিন্তু আমার শ্যামলিনীর সৌন্দর্য এতটাই যে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে অনায়াসেই এক জীবন পার করে দেওয়া সম্ভব।”

বিক্রেতা আরিয়ানের উত্তর শুনে মুগ্ধ হয়ে হাসল। সে গাজরাটি একটা কাগজে মুড়িয়ে আরিয়ানের হাতে বাড়িয়ে দিল। আরিয়ান বিক্রেতাকে টাকাটা দিয়ে গাড়ির দিকে পা বাড়াতেই তার নজর পড়ল একটু দূরে। সেখানে ফুটপাতে একটা মলিন মাদুর বিছিয়ে এক বৃদ্ধ লোক রঙ-বেরঙের কাঁচের চুড়ি সাজিয়ে বসে আছেন। আরিয়ান এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। সে কালক্ষেপণ না করে সেই চুড়িগুলোর সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সুট-কোট পরা এমন একজন অভিজাত মানুষকে ফুটপাতে বসে চুড়ি কিনতে দেখে বৃদ্ধ লোকটি হয়তো কিছুটা অবাক হলেন, কিন্তু আরিয়ানের সেদিকে খেয়াল নেই। ​সে একগুচ্ছ টকটকে লাল কাঁচের চুড়ি হাতে তুলে নিল। হলদেটে আলোয় লাল রঙের আভাটা যেন ঠিকরে পড়ছে। আরিয়ান মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল,“চাচা, এই চুড়ির প্যাকেট কত করে?”

বৃদ্ধ লোকটিও হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “চল্লিশ টাকা বাজান।”

আরিয়ান এক জোড়া চুড়ি কিনে নিল এবং বৃদ্ধ লোকটিকে দামের চেয়ে বেশ কিছু টাকা বেশি ধরিয়ে দিল। লোকটি কাঁচুমাচু করে নিতে না চাইলেও আরিয়ান জোর করে টাকাটা দিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়াল। তার হাতে এখন একগুচ্ছ বেলি ফুলের গাজরা আর এক জোড়া লাল কাঁচের চুড়ি তৃণার জন্য শ্রেষ্ঠ উপহার। আরিয়ানের গাড়িটা রাস্তার ওপারেই রাখা। সে ব্যস্ত হাইওয়েটা পার হওয়ার জন্য পা বাড়াল। রাস্তার প্রায় শেষ প্রান্তে যখন সে পৌঁছে গেছে, ঠিক তখনই এক দানবীয় ট্রাক যমদূতের মতো প্রচণ্ড গতিতে ধেয়ে আসল। আরিয়ান কিছু বুঝে ওঠার বা নিজেকে সামলে নেওয়ার সামান্য সুযোগও পেল না। এক তীব্র, ভয়াবহ আঘাতে আরিয়ানের দেহটা পিচঢালা রাস্তা থেকে ছিটকে বেশ কয়েক হাত দূরে গিয়ে আছড়ে পড়ল।

​তার হাতের সেই লাল কাঁচের চুড়িগুলো ঝনঝন শব্দে ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল আর বেলি ফুলের গাজরাটা ধুলোমাখা রাস্তায় ছিটকে পড়ল। আরিয়ান শুধু অনুভব করতে পারল, শরীরটা অবশ হয়ে আসছে আর চারপাশটা নিদারুণ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ঝাপসা হয়ে আসা চোখে সে শেষবারের মতো তাকিয়ে রইল সেই ধুলোয় পড়ে থাকা রক্তাক্ত বেলি ফুলের দিকে।

​মৃ’ত্যুর আগে মানুষের নাকি তার সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আরিয়ানের ঝাপসা দৃষ্টিতে এখন শুধুই তার শ্যামলিনীর সেই সর্বনাশা, কাজল কালো এক জোড়া চোখ। পিচঢালা কালো রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আরিয়ান অস্ফুট স্বরে কেবল একটি নামই ডাকল,

​“শ্যামলিনী, আমার শ্যামলিনী!”

★★★

সন্ধ্যা সাতটা। বাইরের আকাশে অন্ধকার গাঢ় হতে শুরু করেছে। ড্রয়িংরুমে তখন এক বিচিত্র পরিবেশ। একদিকে আদনান আর নৌশি বিয়ের এত দিন পরেও যাদের রিমোট নিয়ে খুনসুটি থামেনি। নৌশির জেদ সে কার্টুন দেখবে, আর আদনান ক্রিকেট ছাড়া কিছুই বোঝে না। দুজনের এই চুল টানাটানি আর হাসাহাসিতে ড্রয়িংরুম সরগরম।

​কিন্তু তৃণা যেন এই কোলাহলের মাঝেও এক নির্জন দ্বীপে বাস করছে। তার সমস্ত মনোযোগ ফোনের স্ক্রিনে। আরিয়ানের পাঠানো সেই গানটা সে বারবার শুনছে। প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি সুর যেন তার হৃদস্পন্দনের সাথে মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে শাসনের সুরে দেওয়া সেই ভয়েজ মেসেজটা শুনে তার ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসির রেখা ফুটে উঠছে বারবার। আরিয়ানকে একটু আগে কল দিয়েছিল সে, কিন্তু ফোনটা বন্ধ পেল। মনে মনে একটু অভিমানও হলো, লোকটা তাড়াতাড়ি ফিরবে বলে এখনো কেন আসছে না?

​ঠিক সেই মুহূর্তে মায়মুনা বেগম এক প্লেট গরম নুডলস নিয়ে ঘরে ঢুকলেন। তৃণা নুডলস দেখে একটু অনিচ্ছার সাথে বলল,

“মা, এসব কেন আনলেন? একদম খেতে ইচ্ছে করছে না।”

মায়মুনা বেগম বললেন,

“অল্প করে তেল দিয়ে বানিয়েছি। ভালো লাগবে।”

​তৃণা কিছু বলতে যাবে, অমনি সামনের টেবিলে রাখা ল্যান্ডফোনটা শব্দ করে বেজে উঠল। ফোনের একদম কাছে থাকায় তৃণা হাত বাড়িয়ে রিসিভারটা তুলল।

“হ্যালো?”

​ওপাশ থেকে এক গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে এল,

“এটা কি আরিয়ান মির্জার বাসভবন?”

তৃণার বুকের ভেতরটা মুহূর্তেই ছ্যাঁৎ করে উঠল। এক অজানা আশঙ্কায় তার কণ্ঠস্বর কিছুটা কেঁপে গেল,

“জি, বলছি। আপনি কে?”

“আমি এভারকেয়ার হসপিটাল থেকে বলছিলাম, ম্যাম।”

হসপিটালশব্দটা কানে আসতেই তৃণার হাতের ফোনটা যেন কয়েক মণ ভারী হয়ে গেল। ঘরের বাকি সবাই আদনান, নৌশি, মিতু নিমিষেই শান্ত হয়ে তৃণার দিকে তাকাল। নৌশি আর আদনানের হাতের রিমোটটা কখন যে সোফায় পড়ে গেছে, তারা নিজেরাও জানে না।​তৃণা আতঙ্কিত স্বরে চিৎকার করে উঠল,

“হসপিটাল? কেন? কী হয়েছে? আরিয়ান কোথায়?”

ওপাশ থেকে ধীরস্থিরভাবে প্রশ্ন এল, “আরিয়ান মির্জা আপনার কে হন?”

তৃণার সারা শরীর তখন কাঁপছে। সে আর্তনাদ করে বলল, “হি ইজ মাই হাসবেন্ড! প্লিজ, আমাকে বলুন কী হয়েছে? কেন আপনারা এসব জিজ্ঞেস করছেন? আমার আরিয়ান ঠিক আছে তো? উত্তর দিন!”

ল্যান্ডফোনের রিসিভার ধরে রাখা তৃণার হাতটা থরথর করে কাঁপতে লাগল। ওপাশ থেকে কয়েক সেকেন্ডের এক নিস্তব্ধতা। সেই নীরবতা যেন তৃণার কাছে কয়েক যুগের চেয়েও দীর্ঘ মনে হলো। তারপর ওপাশ থেকে ভারী গলায় বলা হলো,

“ম্যাম, বাসায় অন্য কোনো অভিভাবক বা পুরুষ কেউ থাকলে ফোনটা তার কাছে দিন, প্লিজ।”

তৃণা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে সোফা ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে বলল,

“অন্য কাউকে কেন দেব? আমি ওর স্ত্রী! আমাকে বলুন কী হয়েছে আরিয়ানের? প্লিজ, মুখ খুলুন!”

তৃণার এমন পাগলামি দেখে আদনান দ্রুত এগিয়ে এসে ওর হাত থেকে ল্যান্ডফোনের রিসিভারটা নিয়ে নিল। আদনানের হাতও তখন কাঁপছে। সে গম্ভীর কিন্তু কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“হ্যালো, আমি আরিয়ান মির্জার ছোট ভাই বলছি। কী হয়েছে আমার ভাইয়ের?” ​

“মিস্টার আরিয়ান মির্জা এক ভয়াবহ রোড এক্সিডেন্টের শিকার হয়েছেন। তাঁর অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। আপনারা দেরি না করে ইমিডিয়েটলি এভারকেয়ার হসপিটালে চলে আসুন।”

টেলিফোনের স্পিকার অন থাকায় ঘরে উপস্থিত সবার কানেই কথাগুলো তীরের মতো বিঁধল। মুহূর্তের মধ্যে পুরো ড্রয়িংরুমটা যেন মৃত্যুপুরীর মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তৃণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু হসপিটালের ওই একটা শব্দ ‘আশঙ্কাজনক’ ওর কান দিয়ে ঢুকে মাথার ভেতরটা ভনভন করে দিল। চারপাশটা ঝাপসা হয়ে এল ওর কাছে। সে কোনো কথা বলতে পারল না, শুধু দুই হাতে নিজের মাথাটা চেপে ধরে সোফায় আছড়ে পড়ল।

মায়মুনা বেগম ছেলের এই দুঃসংবাদ শুনে পাথর হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু তৃণার অবস্থা দেখে তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে ওকে জাপ্টে ধরলেন। তিনি নিজে তখন ডুকরে কাঁদছেন, নিজের নাড়িছেঁড়া ধনের জন্য তাঁর বুকটা ফেটে যাচ্ছে। ​তৃণা সোফায় পড়ে থেকেই হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কানে তখনো বাজছে আরিয়ানের সেই মায়াবী ভয়েজ মেসেজটা “আমি তাড়াতাড়ি ফিরে আসব শ্যামলিনী।”

তৃণার ভেতরে তখন কিছু শব্দ চিৎকার করে বলছে “আপনি তো বলেছিলে তাড়াতাড়ি আসবেন রাগি সাহেব। আপনি তো বলেছিলে ঠিক করে না খেলে আমাকে শাস্তি দেবেন, তবে কেন আপনি হসপিটালে রাগি সাহেব? কেন ওরা বলছে আপনার অবস্থা আশঙ্কাজনক?”

​পুরো বাড়িটা তখন আর্তনাদে ভরে উঠেছে। কিছুক্ষণ আগের হাসিখুশি ড্রয়িংরুমটা এখন কেবল ধ্বংসস্তূপের মতো পড়ে আছে।

#চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply