#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৫৫
#সুহাসিনি_ফাতেহা
“হাগতে গেছিস নাকি?”
হালিমা বেগমের কথা শুনে ঝিলিকের চোখজোড়া রসগোল্লার ন্যায় বড়বড় হয়ে গেল। যেন কোটর হতে বেরিয়ে আসবে চোখ। তুষার স্বাভাবিক। ঝিলিক বেকুবের মতো তাকিয়ে আছে তুষারের দিকে। একথা শুনে তুষারের স্বাভাবিক থাকাটা কেমন যেন সন্দেহের ঠেকলো ঝিলিকের কাছে। মনেমনে ভাবলো,
” কেন যে ফুপু কে বলতে গেলাম আমি বাথরুমে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল যে ফুপু গ্রামে থাকেন, আর মুখে যখন যায় আসে তাই বলে দেয়। এখন তুষার ভাই আমাকে এটা বলে জ্বালাবে নাতো আবার?”
ঝিলিকের ভাবনাটা যেন বাস্তবে রূপান্তর হতে চলল। ঝিলিককে জ্বালানোর জন্য তুষারের নতুন কোনো কারণ খোঁজতে হলো না। তুষার ঝিলিকের ভাবুক মুখখানার পানে দৃষ্টিপাত করে তক্ষুনি দুষ্ট গলায় ফিসফিস করে বলে উঠলো,
“হাগার রানী যে কি ভাবছো ?”
ঝিলিক চোখ পাকিয়ে তাকায় তুষারের দিকে। পরপর মাথা নত করে নিলো। এতক্ষণ সে তুষারের দিকে তাকিয়ে ছিলো? ভুল হয়েছে তার। আর তাকাবে না। কেন তাকাবে সে? একদম তাকাবে না। সে নাহয় আবেগে পড়ে ভুল করে সিমকার্ড খুলে রেখেছিল তাই বলে তিনদিন পর মনে পড়লো তাকে? সে ভেবেছিল সিমকার্ড খুলে রাখলে তুষার সেদিনই তার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকবে। কিন্তু তার ভাবনার সাথে তো বাস্তবের কোনো মিল হয়নি। তুষার আসেনি সেদিন। ঝিলিকের ভাবনার মাঝেই আবার দরজায় করাঘাতের শব্দ! হালিমা বেগম অধৈর্য হয়ে চেঁচিয়ে বললেন,
“হাগা শেষ হলে দরজা খোল ঝিলিক। এত দেরি করছিস ক্যান? আমার মনে হইতাছে তুই রুমেই আছিস।”
“কিছু লাগবে ফু্পু?”
“কিচ্ছু লাগবো না। তুই দরজা খোল, আমার হাগা ধরছে। আর সহ্য করতে পারছি না।”
“গেস্ট রুমে তো বাথরুম আছে সেটায় যাও না ফু্পু।”
“ওটাতে তোর ফু্পা গেছে।”
ঝিলিক পড়ে গেল মহা বিপদে। একবার দৌড়ে দরজার সামনে দাঁড়ালো। দাঁতে নখ কাটতে কাটতে ভাবুক হয়ে রইল। হালিমা বেগম দেখলে কেমন দেখাবে ব্যাপারটা? কী জবাব দিবে সে? এতরাতে তুষার এখানে তার সাথে? তারা একই রুমে? আর দরজা লাগিয়ে তারা কি করছিলো? হালিমা বেগম আরও দুবার দরজায় করাঘাত করলেন। ঝিলিক ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তুষার এখনো রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। মুখে কোনো চিন্তার চাপ নেই। যেন দরজা খুলে দিলেও সে এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে। আর তখন হালিমা বেগম তাকে দেখলে ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বলবে,
“হবু বউয়ের কাছে আসা কি পাপ ফুপু?”
আশ্চর্য! ঝিলিক নিজের অদ্ভুত চিন্তা বাদ দিয়ে দৌড়ে তুষারের সামনে দাঁড়িয়ে অনুরোধের সুরে আস্তেআস্তে বলল,
“আপনি প্লিজ তাড়াতাড়ি খাটের নিচে লুকিয়ে পড়ুন প্লিজ। আমি যখন বলব তখন বের হবেন।”
হতবিহ্বল তুষার! কি বলে এই মেয়ে? তার শরীর খাটের নিচে ঢুকলেই তো? বলল,
“মাথা ঠিক আছে তোমার? আমি খাটের নিচে লুকাবো?”
“তিতলি লুকাতে পেরেছে তাহলে আপনিও লুকাতে পারবেন। একি রক্ত তো। স্বভাবও একই নিশ্চয়ই।”
তুষার ঝিলিকের হঠাৎ বলা কথাটার মানে বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে বলল,
“মানে?”
ঝিলিক কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই বলল,
“মানে খুব সোজা, তিতলি বাসর রাতে ফারাজ ভাইয়ার ভয়ে খাটের নিচে লুকিয়ে ছিলো। এখন আপনি খাটের নিচে লুকান যান।”
“তোমাকে কে বলল এসব?”
“তিতলি নিজেই হাসতে হাসতে আমাকে বলছে। অন্য কেউ বলা লাগেনা।”
তুষারের বোনটা আর বড় হলো না। বিয়ে দিয়েছে বোনকে। সেই ছোট থেকে তিতলি অবাধ্য,বাচাল, বাচ্চামো,ভীতু,আবার সাহসী,অভিমানি, রাগী স্বভাবের। সেই তিতলি এখন বড়ো হয়েছে। শুধু নামে তার বড়ো হওয়া। বাবা, মা, ভাই,ভালোবাসার মানুষের সামনে সেই ছোট্ট তিতলি রয়ে গেল। কি জানি ফারাজ ভাই তার বোনকে কিভাবে সামলায়। মেয়েটার মাথায় ভালো কোনো বুদ্ধি না থাকলেও মাথায় ভরা কুবুদ্ধি আছে। তুষারের কাছে বোনের এমন স্বভাবই ভালো লাগে। সব ভাইয়ের কাছে ছোট বোনেরা সেই ছোট্ট বাচ্চাই রয়ে যায়। তিতলি তার বড্ড আদরের বোন।
তুষার বোনের চিন্তা একপাশে রেখে কপাল চুলকে জবাব দেয়,
“তিতলি না হয় ফারাজ ভাইয়ের ভয়ে খাটের নিচে লুকিয়েছিল, কিন্তু তুমি কোথায় লুকাবে শুনি?”
ঝিলিক হতভম্ব হয়ে বলল,
“আমি কোন দুঃখে লুকাতে যাবো।”
তুষার ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“আমার ভয়ে।”
ঝিলিক ঠোঁট বাঁকায়। কোথাকার কোন রয়েল বেঙ্গল টাইগার চলে এসেছে তার সামনে মন হয়।
“আপনাকে আমি ভয় পায় নাকি?”
“খুব সাহস বেড়েছে দেখছি তোমার হুম। আগে তো আমার সামনে দাঁড়ালেই ফার্মের মুরগীর মতো কাঁপাকাঁপি শুরু করতে , মুখ ফুটে কথায় বের হতো না তখন।”
ঝিলিক চিন্তায় শেষ। তার ফুপু হয়তো এখনো দাঁড়িয়ে আছে দরজার বাইরে। এরমাঝে হালিমা বেগম আরও দুবার দরজায় করাঘাত করলেন। শেষে অধৈর্য হয়ে চেঁচামেচি করতে করতে চলে গেলেন। ঝিলিক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল। এই লোক তো যেতোই না উল্টো বড় ঝামেলা হতো। বাঁচা গেলো। মনেমনে ভেবে আড়চোখে তুষারের দিক তাকাল ঝিলিক। তারপর মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে ফিরে বলল,
“আমি ফার্মের মুরগীর মতো কাঁপাকাঁপি করতাম?”
“তো কি?”
তুষারের পাল্টা প্রত্যুত্তরে ঝিলিক হালকাপাতলা আপমান বোধ করল। গাঢ় অভিমানে মুখশ্রী অন্ধকার করে বলল,
“এখন তো ফার্মের মুরগী বলবেন কারণ এখন আপনার অফিসে বিশ্বসুন্দরী রুপসী কন্যা কটকটি কিরণমালা সানভী আছে। তো তার কাছে যান! আমার কাছে কি?”
তুষার বোধহয় পন করে নিয়েছে ঝিলিকের রাগ ভাঙানো পর্যন্ত এক পাও নড়বে না সে। তুষার হঠাৎই ঝিলিকের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়াল। কিছুটা ঝুঁকে ঝিলিকের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে চ’মকপ্রদ পন্থায় কাজটা করে বসলো। নাহ, ঠোঁটে নয়। ঝিলিকের কোমল হাতদুটো মুঠোয় পুরে ধীরে ধীরে ঠোঁট নামালো তুষার। তারপর অতি সংবেদনশীল ভাবে পরপর দু’টো চুমু খেলো ঝিলিকের হাতের পৃষ্ঠে। ডিমলাইটের হালকা মৃদু আলোর ঝিলিকের উজ্জল মুখপানে পূর্ণ দৃষ্টিপাত করে তুষার মাদকীয় কন্ঠে শুধালো,
“আশেপাশে যত ফুলই থাকুক আমি তুষার দেওয়ান শুধু তার ঝিলিকের হুমম।”
তুষারের এমন মাদকীয় সুরে কথাটা, ঝিলিকের অভিমানি হৃদয় মুহুর্তে শান্ত হয়ে গেল। প্রশান্তিতে চোখ বুজে এলো। ভালোলাগায় মন জুড়িয়ে গেল। ব্যস, এতটুকুই তো সে চেয়েছে। যেন তুষার এসে তাকে নরম গলায় আদর করে বলুক আমি শুধু তোমার, শুধু তোমার। ঝিলিক চোখ বুঁজে থাকার মাঝেই হঠাৎ কানের কাছটায় উষ্ণ নিশ্বাসের ইঙ্গিত পেল। সহসা কেঁপে উঠলো ঝিলিক। সে কিছু বুঝে উঠার আগেই অন্যকিছু টের পেল। তুষারের নাক তার ঘাড়ে ছুঁয়েছে। ঝিলিক থরথর করে কেঁপে দেয়ালে লেপ্টে গেল। গলা শুকিয়ে গেল ঝিলিকের। মুখ খুলে কিছু বলতে গিয়েও পারল না অদৃশ্য কোনো কারণে। পরপর গলায় দাঁড়ির খোঁচা খেল ৷ এমন অসহ্যনীয় স্পর্শগুলো সহ্য করতে না তুষারকে সরাতে তার বুকে দু’হাত রাখল ঝিলিক। তীব্র ভাবে অনুভব করতে পেলো তুষারের বুকের অস্বাভাবিক ভাবে উঠানামার গতি। ঝিলিকের রুমের বেলকনির দরজা খোলা। ঠান্ডা হওয়া ভেসে আসছে। এই ঠান্ডা হাওয়াটা যেন আগুনে কেরাসিন ঢেলে দেওয়ার মতো কাজ করল। তুষার নিজের সম্পূর্ণ খৈ হারিযে ফেলল। ঝিলিকের পাতলা কোমরে হাত রাখল। ঝিলিক যেন অন্য এক রাজ্য হারিয়ে গেল। কোমরে তুষারের আঙুল নড়ছে। তুষার ঝিলিকের গলা থেকে যেই ঝিলিকের ঠোঁটের দিকে মুখ এগিয়ে নিয়ে আসছিল ওমনি ঝিলিকের টনক নড়ে উঠল। কি করছে? কি হচ্ছে? সে বুঝলো তুষার নিজের মধ্যে নেই। ঝিলিক তুষারকে থামানোর জন্য শরীরের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে তুষারের বুক ধাক্কা দিয়ে অস্পষ্ট মৃদু স্বরে চিৎকার করল,
“কি করছেন আ…আপনি…”
ধাক্কা দেওয়ায় তুষার নিজের মধ্যে না থাকায় দুকদম পেছনে সরে গিয়েছে। মস্তিষ্ক কাজ করতে শুরু করেছে তার। যা বুঝলো তাতে সম্পূর্ণ শরীর থমকে গেল তার। পেছনে ফিরে থাকা ঝিলিকের কাঁধ থেকে কামিজের গলা হালকা নামানো দেখে পুরো তাজ্জব বনে গেল তুষার। ঝিলিক তখনো কাঁপছিল। তুষার কম্পিত ঝিলিকের পানে ফ্যালফ্যাল নয়নে তাকিয়ে ভাবছে কি করছিল সে? কিভাবে হয়ে গেল? চোখজোড়া খিঁচে বন্ধ করে আওড়াল,
“শীট! শীট! শীট!”
তুষার আর ঝিলিককে কিছু বলার সাহস করল না। হন্তদন্ত ভঙ্গিতে রুম থেকে বেরিয়ে বেলকনিতে চলে গেল। মেয়েটা তাকে ভুল বুঝবে নাতো? কেন সে হঠাৎ এমন একটা কাজ করে বসল। আর একসাপ্তাহ পেরোলেই তো একেবারের জন্য নিজের করে নিতো। তাহলে কি আর একসাপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারতো না সে? পারতো তো? এতদিন পেরেছে এই একসাপ্তাহও পারতো। কিন্তু এই ঘটনাটা যেন হঠাৎ ঘটে গেল। নিজের প্রতি একটু কন্ট্রোল রাখা যেতো না?
ঝিলিক এখনো পাথরের ন্যায় রুমের মাঝখানে দাঁড়িয়ে। লজ্জায় চোখ মুখ লাল। এখনো শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক। তুষারের ভেজা ঠোঁটের স্পর্শ এখনো তার গলার ঘাড়ে অনুভব করছে। তুষারের এমন রুপ পূর্বে কখনো দেখেনি ঝিলিক। সবটা যেন চোখের পলকেই ঘটে গেল।
★
পাক্কা দু ঘন্টা বাইরে ঘুরাঘুরি করিয়ে তারপর তিতলিকে নিয়ে ফ্ল্যাটে উঠেছে ফারাজ। এত সুন্দর সুন্দর জায়গায় ঘুরতে পেরে তিতলি খুশিতে আত্মহারা। তার এই খুশির কারণ ফারাজ। তাই ফারাজকে একটা ধন্যবাদ তো দিতেই হয়। ফারাজ ওয়াশরুমে। তিতলি কালো খয়েরী রঙা কারুকাজ করা জামদানি শাড়ি পরেছে। সুগন্ধিওয়ালা কাঁচা ফুলের গয়না দিয়ে নিজেকে সাজিয়েছে। কোমর সমান খোলা চুল। মুখে হালকা মেকআপ। সব মিলিয়ে ভীষণ মিষ্টি লাগছে দেখতে। সে সাজুগুজু করে অপেক্ষা করছিল ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। ফারাজ কখন বের হবে? বের হলে সাথেসাথে ধন্যবাদ জানাবে সে। একটু পর ফারাজ বের হলো। কোমরের সফেদ রঙা তোয়ালে জড়ানো। ভেজা চুল বেয়ে বেয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। উন্মুক্ত শক্তপোক্ত বলিষ্ঠ শরীরটায় পানির ফোঁটা চকচক করছে। পুরুষালী শরীরটা বড্ড আকর্ষণীয় লাগছে। তিতলি ফারাজের দিকে লাজুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিলো। ফারাজ ভ্রু কুঁচকে তিতলির মুখের দিকে তাকিয়ে। যেন বোঝার চেষ্টা করছে কিছু একটা। এর মাঝে হঠাৎ তিতলি নাচতে নাচতে ফারাজের কোলের উপর এক লাফ দিয়ে উঠে গেল। ফারাজের গলা জড়িয়ে ধরে মুখে নাকে চুমু খেতে খেতে বলল,
“আমার হানিমুনে আসার স্বপ্নটা পূরণ করছেন আপনি ইশশ্ আমার যে কি খুশি লাগতেছে। বলুন আপনার কি চাই আমার থেকে? আপনি যা চাইবেন তাই দেবো।”
তিতলি এভাবে হুট করেই লাফিয়ে কোলে উঠে যাওয়ায় ফারাজের কোমরের তোয়ালে ঢিলে হয়ে যায়। সে না পারছে তিতলিকে ধরতে আর না পারছে কোমরের তোয়ালে ধরতে। তিতলিকে না ধরলে তিতলি টাইলেসে পড়ে যাবে আর তোয়ালে না ধরলে খুলে পড়ে যাবে। অথচ সেদিকে তিতলির কোনো ভাবাবেগ নেই। সে ফারাজের মুখে চুমু দিতে দিতে ঠোঁটের সব লিপিস্টিক লাগিয়ে দিয়েছে। ফারাজ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে। কিছুক্ষণ পর তিতলিকে ধরে দুপা সামনে এগোতেই ফারাজের তোয়ালে খুলে টাইলেসে পড়ে গেল। ফারাজের শরীরে কোনো কাপড় থাকলো না আর। কোলে থাকায় ফারাজের নিচের দিকে এসব কিছুই নজর নেই তিতলির। ফারাজের মুখের অভিব্যক্তি কঠিন। চোয়াল শক্ত হয়ে আসছে ক্রমশ। শরীরে সব স্নায়ু তন্ত দাউদাউ করে জ্বলে উঠছে যেন। সে হঠাৎ তিতলির খুশিখুশি মুখের দিকে তাকিয়ে রহস্যময় হাসি হাসল। অতঃপর মৃদুস্বরে বলে উঠলো,
“আমার তো অনেক কিছুই চাই বউ। তবে সেটা মুখে বলার নয় প্র্যাকটিক্যালি ভাবে করিয়ে দেখায়?”
তিতলি খুশিখুশিতে গদগদ। ফারাজ তাকে কি দেখাবে? সেও বলল,
“দেখান তাড়াতাড়ি। আমিও দেখতে চাই আপনি কোন মহামূল্যবান জিনিস আমাকে দেখান।”
তিতলি এটা বলতে না বলতেই ফারাজ তিতলিকে কোল থেকে ধপাস করে বিছানায় ফেলে দিলো। তিতলি নিজেকে ঠিক করে ফারাজের দিকে তাকাতেই রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল। আর বলতে লাগল,
“ভুল হয়ে গেছে বেঁচে থাকলে আর জীবনেও হানিমুনে যাবার নাম মুখে নিবো না। ধন্যবাদ দিতেও আসব না। এটাই প্রথম হানিমুন এটাই শেষ হানিমুন।”
চিৎকার করে কথাগুলো বলতে বলতে কাউকে লাথি মারল তিতলি। ফারাজ তিতলির পা ধরে ফেলল। আবার আলগোছে ছেড়ে দিলো। তিতলি আবার ঘুমে তলিয়ে গেল। ফারাজ কিছুক্ষণ আগে ঘুম থেকে উঠে ওয়াশরুমে গিয়েছে ব্রাশ করতে। যেতে না যেতে রুম থেকে তিতলির চিৎকার শুনে দৌড়ে এসেছে। আর এসেই বিছানার পাশে বসার পর একথা শুনলো। বুঝতে সময় লাগলো না তিতলি ঘুমের ঘোরে স্বপ্ন দেখে ভুলবাল বকছে। তবে এটা নতুন কিছু নয়। তিতলি যখন কোনো কিছু নিয়ে দিনে বসেবসে ভাবনা-চিন্তা করে রাতে ঘুমালে সেটা স্বপ্ন দেখে। বিয়ের পর থেকেই তিতলির এ অদ্ভুত স্বপ্নগুলো দেখে আসছে ফারাজ। ঘুমের মধ্যে হাত পা লাফায়। কথা বলে। পাশের জনকে লাথি দেয়। বা খাট থেকে নিচে পড়ে যায়। আরো কত কি। বলে শেষ হবার নয়। ফারাজ ভ্রু কুঁচকে ভাবছে, “কি এমন স্বপ্ন দেখল যে হানিমুনে যাওয়ার নাম জীবনেও মুখে নিবেনা।”
ফারাজ তিতলির পাশে বসে তিতলিকে কয়েকবার ডাকল। বেশ কয়েকবার ডাকার পর তিতলি চোখ পিটপিট করে তাকাল। নিজের অবস্থান ধাতস্থ করে ধরফরিয়ে উঠে বসল। ঘুমঘুম চোখে ফারাজকে দেখেই চোখ থেকে ঘুমের রেশ পুরোপুরি কেটে গেল। চোরাচোখে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফারাজকে দেখল। না সব তো ঠিকঠাক। বুঝল সে স্বপ্ন দেখছিল। আর স্বপ্নের কথা মনে হতেই দুগাল লাল হয়ে দেল।
ফারাজ তিতলির কাচুমাচু করা মুখের গেল। মাথা নত করে নিলো। ফারাজ তিতলির লাজুক মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলল,
“কি হয়েছে?”
তিতলি আমতাআমতা করে বলল,
“হানিমুনে না গেলে হয়না?”
ফারাজ ভ্রু নাচাতে নাচাতে বলল,
“কেন? যাওয়ার আগেই শখ মিটে গেছে?”
“হানিমুনে যাওয়া কী ভালো বলেন? খুব খারাপ ব্যপার না?”
ফারাজ তিতলিকে একটা ধমক দিয়ে উঠল। ধমক খেয়ে তিতলির মুখটা দেখার মতো হয়ে গেল। ফারাজ তিতলির চুপসে যাওয়া মুখের পানে তাকিয়ে বাঁকা হেসে গুন গুন করে সুর তুলে আবার ওয়াশরুমে চলে গেল। তিতলি বিছানায় বসে স্বপ্নের কথা ভেবে গায়ের লোম কাঁটা দিয়ে উঠল। আল্লাহ কি হবে? যদি তার স্বপ্ন সত্যি হয়ে যায়? কেন যে স্বপ্নে ধন্যবাদ জানাতে গেল। স্বপ্নে ধন্যবাদ জানাতে গিয়েছে সেটা বাদ বাস্তবে তিতলি ধন্যবাদ জানাবেনা। যদিও কালকে ভেবেছিল ধন্যবাদ জানাবে কিন্তু সেটা ক্যন্সেল এখন। পরে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে দেখা যাবে স্বপ্ন সত্যি হয়ে গেল। তাই তিতলি এসব ধন্যবাদ টন্যবাদ সব বাদ দিলো।
★
ঘড়ির কাঁটা এগারোটা পঁয়তাল্লিশে। ধবধবে পরিষ্কার আকাশ। তিতলি রাতে ল্যাগেজে সব জামাকাপড় গুছিয়ে রেখেছিল তাই কাপড় গুছানো নিয়ে এখন চিন্তা নেই। কক্সবাজার যাওয়া নিয়ে শুধু ফারাজ,তিতলির প্ল্যানিং থাকলেও এখন তাদের সাথে নতুন তিনজন যোগ হয়েছে। ফারাজের বন্ধু শাওন আর ওর স্ত্রী যাচ্ছে। নতুন বিয়ে হয়েছে তাদের। সাথে আলভী তো আছেই। মোট পাঁচজন যাচ্ছে ওরা। ফারাজ যদিও ওদের যাওয়া না যাওয়া নিয়ে তেমন একটা মাথা ঘামাচ্ছে না। কিন্তু তিতলি খুশিতে আত্মহারা। ওরা গেলে একটু আনন্দফূর্তি করতে পারবে। ফারাজ তো আবার ওসব আনন্দ ফূর্তিটূর্তি করতে জানেনা। তিতলি গুগলে সার্চ করে কক্সবাজার বাজার সম্পর্কে সব রকমের ডিটাইল বের করে ফেলেছে রাতে শুয়ে শুয়ে। ওখানে ওটা করবে সেটা করবে। তখন ফারাজ হয়তো তাকে একটা ধমক দিয়ে বলবে,
“এটা করবেনা তুমি। ওটা করলে তোমাকে এখানে একা রেখেই চলে যাব। বা এক্ষুনি বাড়িতে চলে যাব।”
এসব বলে ভয় দেখাবে। তখন আলভী ভাইয়া বা শাওন ভাইয়া থাকবে। তখন তিতলি আর ফারাজের কথায় ভয় পাবেনা। তাই ওরা যাবে শুনে তিতলি মনেমনে ভীষণ খুশি। কিন্তু সেটা ফারাজকে বুঝতে দিচ্ছেনা। বুঝলেই বিপদ!
তিতলির সফেদ রঙা এমব্রয়ডারি কারুকাজ করা চুড়িদার পরেছে। সাথে গলায় হোয়াইট রঙা ওড়না ঝুলানো। মুখে আলগা কোনো সাজগোজ নেই। ফারাজের নিষেধ। কিন্তু এভাবে সাজগোজ ছাড়া কি যাওয়া যায়? তাই অবাধ্য তিতলি কপালে ছোট কালো টিপ দিয়ে ঠোঁটে হালকা লিপিস্টিক দিয়েছে। ব্যস এতেই অনেক সুন্দর লাগছে ওকে। শাওন আলভীরা ফারাজদের বাড়িতে এসেছে। ওরা এতক্ষণ ড্রয়িংরুমে ছিল। এখনই বাইরে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। তিতলি, ফারাজ রেডি হয়ে নিচে নেমে আসতেই ফারিন বেগম ব্যাগে বেশ কিছু খাবারের বক্স ঢুকিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“পথে খিদে লাগলে খেয়ে নিবে। আর সবকিছু নিয়েছো তো ঠিকঠাক।”
তিতলি হাসিমুখে জবাব দিলো,
“জ্বি আম্মু সব নিয়েছি। “
ফারিন বেগম পুত্রবধুকে ভালো খারাপ বুঝিয়ে দিয়ে শেষে ফারাজকে বলল,
“ফারাজ বাবা তিতলিকে দেখে দেখে রাখবি। একটুও যেন চোখের আড়াল না হয়। আর গাড়ি সাবধানে চালাবি। গিয়ে ফোন দিবি।”
মায়ের কথা শুনে ফারাজ মোবাইলের স্ক্রিন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“জ্বি আম্মু।
তিতলি আড়চোখে ফারাজের দিকে তাকায়। তাকে নকল করছে নাকি জ্বি আম্মু বলে? ফারিন বেগম আবার ছেলেকে বললেন,
“তোর আব্বুর তো অফিসে জরুরী মেটিং থাকায় সকাল সকাল চলে গেছে। ফোন দিয়ে বলে দে এখন বেরোচ্ছিস।”
ফারাজ এবারও আগের ন্যায় বলল,
“যাওয়ার সময় বলে গেছে। এখন আবার বলে দেবো।”
ফারাজ আফজাল খানকে ফোন দিয়ে কথা বলে জানিয়ে দিলো তারা এখন বেরোবে।
মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে তারা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলো। মোট দুইটা গাড়ি। বাস ট্রেন বাদ দিয়ে নিজস্ব গাড়ি করে যাবে ওরা। একটাতে ফারাজ আর তিতলি অন্যটায় শাওন,শাওনের স্ত্রী শিফা আর আলভী সেটায় ডাইভিং করবে। ব্যাস।
তিতলি বাইরে এসে ফারাজের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়েছে। একপ্রকার লেপ্টে আছে সে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের চিহ্ন এখন থেকেই। কি গরম উফফ। নাকের ডগায়ও খানিক ঘাম ফুটে আছে। ফারাজের হাত তিতলির কাঁধে। শক্ত করে ধরে আছে। অন্যহাতে ল্যাগেজ।
শাওনের বউ তিতলিকে দেখেই জিজ্ঞেস করল,
“কেমন আছো তিতলি?”
তিতলি চিনতে পারল না ঠিক। শাওন ভাইয়ার বউ? হতেই পারে কারণ তাদের সাথে শাওন ভাইয়া যাবে আর ওনার বউ যাচ্ছে। তিতণি নতুন আর দেখেনি ওনাকে। তাই অসুবিধা হলো চিনতে। তাই বলল,
“জ্বি ভালো আপনি ভালো আছেন আন্টি?”
“আন্টি না আমাকে আপু ডাকবে কেমন?”
“জ্বি আপু। ভুল করে আন্টি ডেকে ফেলেছি। কিছু মনে করবেন না।”
“মানুষ মাত্রই ভুল করে সমস্যা নেই। তুমি হয়তো আমাকে চিনতে পারো নি তাইনা?”
“শাওন ভাইয়ার বউ রাইট? “
“ঠিকই ধরেছো। তুমি দেখতে খুব মিষ্টি তিতলি।
তিতলি মেকি হাসি দিয়ে শিফাকে বলল,
“আপনিও খুব মিষ্টি আপু।”
হঠাৎ পাশ থেকে আলভী ফারাজকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলল,
“ভাবি তো দেখছি দিনদিন সুন্দর হয়ে যাচ্ছে, সব আমাদের দয়াল বাবাজির কারসাজি।”
শাওন মিটিমিটি হেসে বলল,
“দয়াল বাবাজি নারে ফারাজ বাবাজি বল।”
“আমি কি আগে কম সুন্দর ছিলাম নাকি?”
তিতলি ভ্রু কুঁচকে কথাটা বলেছে সবে। ফারাজ তিতলির হাত ধরে সোজা এনে গাড়িতে বসিয়ে দিলো। তিতলি হতভম্ব। কি হলো হঠাৎ?
তিতলি মুখ ভেংচি কেটে জিজ্ঞেস করল,
“আমার কারো সাথে কথা বলা আপনার সহ্য হয়না তাইনা?”
ফারাজ আলভী আর শাওনকে হারেহারে চিনে। ওরা কত বাটপার। এরা তিতলিকে হঠাৎ এমন এমন কথা বলে বসবে তখন দেখা যাবে তিতলি তাকে জ্বালিয়ে মারবে তখন। যেটা ফারাজের অজানা নয়। তাই গাড়িতে বসিয়ে একেবারে সিটবেল্ট লাগিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি তোমাকে বলছি কথা বলতে?”
তিতলি সবার সাথে কথা বলতেই অভ্যস্ত। চুপচাপ থাকলে তার মনে শান্তি লাগেনা। সবার সাথে মিলেমিশে থাকতে পছন্দ করে। আর ফারাজ শুধু তাকে আড়ালে রাখে ছেলেদের সাথে কথা বলতে দেয় না। যেন তাকে চোপিসে সাজায় রাখতে চাই দূর। তিতলির আর কিছু ভালো লাগেনা। বলল,
“আল্লাহ মুখ দিছে কথা বলতে, তো কথা বলব কি করবো বাল।”
ফারাজ চোখ রাঙিয়ে গাড়ির দরজা ঠাস করে লাগিয়ে আবার বাইরে বেরিয়ে এলো। আলভী শাওনও বাইরে এখনো।
ফারাজকে দেখেই আলভী আবার বলে উঠল,
” তো হানিমুনের প্রিপারেশন কেমন স্যার?”
ফারাজ গাড়ির দিকে একবার নজর দিয়ে দেখল তিতলি,মোবাইল দেখছে নজর স্ক্রিনে। কাঁচের জানালা খোলা। এদিকে নজর নেই। ফারাজ আলভিকে গম্ভীর গলায় বলল,
“কি বলতে চাস বলতে?”
‘মানে কনড…”
ফারাজ অগ্নিদৃষ্টিতে আলভীর দিকে তাকায়। আলভীর অর্ধেক বলা কথাটা আর পূর্ণ করা হলোনা। কিন্তু পরপরই মেকি হেসে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল,
“দেখিস আবার নাদান শিশুটাকে অজ্ঞান করে ফেলিস না। যাই করিস একটু হুশিয়ার করে করবি নয়তো পরে দেখবি হাসপাতালে ছু্টা লাগবো।”
#চলবে।
পর্যাপ্ত রেসপন্স না হলে নেক্সট পর্ব আর কবে আসবে বলতে পারিনা। তোমরা গল্প পড়ো অথচ রিয়েক্ট কমেন্ট কিছুই করোনা। যদি গল্প চাও রিয়েক্ট কমেন্ট দুটোই করো। আল্লাহ হাফেজ।
Share On:
TAGS: রাগে অনুরাগে, সুহাসিনি ফাতেহা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৬
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৯
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৪৭(প্রথম অংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৭(প্রথম অংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৩৪
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ৬১
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১১
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৩
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ২৭(প্রথমঅংশ+শেষাংশ)
-
রাগে অনুরাগে পর্ব ১২