Golpo ডিফেন্স রিলেটেড মেজর ওয়াসিফ

মেজর ওয়াসিফ পর্ব ২৬


মেজর_ওয়াসিফ

লেখনীতেঐশীরহমান

পর্ব (২৬)

পারিবারিক ভাবে একটি বিয়ের আয়োজন শেষ হতে হতে মধ্যরাত। এবাড়ির নিয়ম অনুযায়ী এবার বর কনেকে এক প্লেট এ খেতে বসানো হবে। যদিও ওয়াসিফের বিয়েতে এই নিয়মটুকু পালন করা হয়নি বলে, পালন করা হয়নি বললে ভুল হবে পরিস্থিতি ওরকম ছিলো না তখন তাই শাহেনূরের ইচ্ছে এবাড়ির বড় মেয়ের সঙ্গে সঙ্গে এবাড়ির বড় ছেলে আর তার বৌয়ের নিয়মটুকুও হোক তবে।

ডাইনিং এর ডান পাশের পাশাপাশি দু’টো চেয়ারে বসানো হয়েছে লুইপা আর সামিরকে। ওয়াসিফ ওদের কাছে দাড়িয়ে প্লেটে একে একে রোস্ট, পোলাও তুলে দিচ্ছে। ধারা বড়ো আম্মার পাশে দাড়িয়ে বারবার হাই তুলছে। রাত তো কম হলোনা ওর ভীষণ ঘুম পাচ্ছে এই মুহূর্তে। লুইপা, সামিরের প্লেট গুছিয়ে উঠতেই শাহেনূর জা কে চোখের ইশারা দিতে সামিরা টেনে নিয়ে ওয়াসিফ কে বসালো বাম পাশের একটি চেয়ারে। শাহেনূর খপ করে ধারার হাতটা ধরে বসিয়ে দিলো ছেলেকে। লোপাকে ডেকে বললো।

‘ আরেকটা প্লেট গুছিয়ে দে তো এখানে ‘

ওয়াসিফ, ধারা একে অপরের দিকে চাওয়াচাওয়ি করে পরপর দুজনেই বুঝলো কাহিনি কি ঘটতে চলেছে। ওদের প্লেটটা গুছিয়ে সামনে দিতে শাহেনূর বলে।
‘ তোরা দু’জন ও ওদের সঙ্গে খেয়ে ওঠ’

তারপর আরিয়ানকে খেতে বসতে বললে ও বসেনা। কারণ ও তখন ক্যামেরা ম্যান। সামিরের কড়া হুকুম, ওর এই ছোটখাটো হুট করে বিয়ের একটা জিনিস ও যেনো স্কিপ না হয়। তাই আরিয়ান যথাসাধ্য চেষ্টা করছে কলিগ প্লাস বন্ধু সমতুল্য ভাইয়ের কথা রাখতে।

ওপাশের নতুন বিবাহিত দম্পতি লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে এক প্রকার। লুইপা সেই যে মাথা নুইয়ে রেখেছে তা আর তুলছেনা। সামিরের লজ্জাটা আসলে ওভাবে না করলেও এবার স্যারের মুখোমুখি বসে সদ্য বিয়ে করা বৌয়ের মুখে ভাতের লোকমা তুলে দিতে আড়ষ্ট হচ্ছে।

ধারার ওতোটা লজ্জা না করলেও এখন ঠিক করছে যখন সবার সামনে নিজের লজ্জা শরম কমিয়ে ওয়াসিফ ওর মুখের সামনে ভাতের লোকমা বাড়িয়ে ধরলো। ও একপলক চোখ ঘুরিয়ে আপা আর তার বরকে দেখলো। সামির তখন ওদের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। ধারা সেখান থেকে চোখ সরিয়ে এনে তাকায় ওয়াসিফের দিকে। ওয়াসিফ ইশারায় খাবার নিতে বলে। ধারা আস্তে করে মুখ খুলে লোকমাটা নিলো। এরপর ওয়াসিফ মনোযোগ দেয় নিজের খাওয়াতে।

স্যারের এই দৃশ্য দেখে সামির বেশ সহজ হয়, নিজেই নিজেকে বুঝ দেয়, ‘ আরে বিয়ে করা বৌ তার, স্যার পারলে ও কেনো পারবেনা’
পাশ থেকে লোপা খিলখিল করে হেঁসে ওঠে, বলে।

‘ আরে দুলাভাই লজ্জা পাচ্ছেন কেনো? আপনি ও আপাকে খাইয়ে দিন’

ওর পাশ থেকে ক্যামেরা নামিয়ে আরিয়ান আড়চোখে তাকায় লোপার দিকে। ওর দিকে তাকিয়ে বিরক্ত সহিত মনে মনে বিড়বিড় করে বলে।

‘ ইঁচড়ে পাকা মেয়ে একটা, বয়স তুলনায় পকপক বেশি করে ‘

লোপা স্পষ্ট শুনতে পেলোনা, তাইতো ওর দিকে ভ্রু বাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো।

‘ আমাকে কিছু বললেন আংকেল’?

এবার আরিয়ান কটমট চোখে তাকায় লোপার দিকে, এই মেয়ে ভারি ভয়ংকর, স্যার ওর ভাই, সামিরও এখন ওর দুলাভাই। আর ও কি না অংকেল। এই মেয়ের কি কোনো কমনসেন্স নেই নাকি? ওর কি চুল পেকেছে? দাঁড়ি পেকেছে? ভুঁড়ি বেড়েছে? তাহলে ও কোনদিক দিয়ে ওর আংকেল হয়। আরিয়ান নিজের রাগ টুকু হজম করে হাসি হাসি মুখ করে আস্তে করে বলে।

‘ আংকেল ডাকেনা পিচ্চি, ওসব বলে ডাকতে হয়না, চকলেট খাওয়াবোনি, ওকে?’

লোপা কপাল কুঁচকে তাকিয়ে থেকে ওর মতোই আস্তে করে বলে।

‘ আমি পিচ্চি নই আংকেল, আমি চকলেট খাইনা’

কথাটা বলেই কাঁধের চুলগুলো ঝাটকা মেরে বেশ ভাবের সঙ্গে ওখান থেকে সরে গিয়ে আপার পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। আরিয়ান ওর যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মুখে সামান্য ভেঙছি কেটে মনে মনে বলে।

‘ আংকেল ডেকে বরেবার হার্ট অ্যাটাক না করিয়ে বাপ ডেকে একেবারে খুউউউন করে ফেলো। আমার হয়েছে যত্তসব জ্বালা’


ঘড়ির কাঁটা ঠিক রাত দুটোর ঘরে, নব দম্পতিকে ঘরে পাঠানো হয়েছে ইতিমধ্যে। নিচের সব গোছগাছ শেষে এ বাড়ির তিন গিন্নী যার যার ঘরে ঢুকেছে। এবাড়ির দোতলাটা সুনসান নিরিবিলি। অল্প পাওয়ারের একটা বাল্ব দুকদুক করে জ্বলছে দোতালায়। ধারা শাড়ির আঁচল মুঠোয় চেপে করিডোরে দাড়িয়ে আছে। ওর মাথায় এখন খেলছে দুষ্ট বুদ্ধি। ও ঘর থেকে লোপাকে ঘুম ঘুম অবস্থায় টেনে এনে পাশে দাঁড় করিয়ে রেখে বলে।

‘ আমার সঙ্গে থাক, চুপচাপ থাকবি’

লোপা বিরক্ত হয়ে তেতিয়ে উঠে বলে।

‘ আমার এসব ভালো লাগছেনা ছোট আপা, আমি ঘুমাবো’

বলেই লোপা হাঁটা ধরলো ঘরের দিকে, ধারার রাগ হলো লোপার উপর, তবুও ও আর গেলোনা লোপাকে টেনে আনতে। ধারা করলো কি? সুইচ চেপে সেই বাল্বটা নিভিয়ে গুটিগুটি পায়ে এগোলো লুইপার ঘরের দিকে। ও মনে মনে পণ করেছে আজ আপার ঘরে ও আড়ি পাতবেই। যেমন চিন্তা তেমনই কাজ। ও একেবারে দরজার সঙ্গে টিকটিকির ন্যায় গা মিশিয়ে দরজায় কান পাতে।

মিনিট পার হলো ভেতর থেকে ওদের কথার কোনো শব্দ কানে আসছেনা। মনে মনে ধারা ভাবলো, ঘুমিয়ে পড়লো কি? এতো তাড়াতাড়ি ওরা কিভাবে ই বা ঘুমাতে পারে। আপাতত সবকিছু ধারার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। শাড়ির আঁচল গুছিয়ে কাঁধে টেনে ধরে ডানহাতের নখ দাঁতে চেপে কাটছে আর কান সজাগ রেখে কপাল কুঁচকে আছে ধারা। ইচ্ছে করছে ডেকে জিজ্ঞেস করতে। ‘এই আপা তোরা কি ঘুমালি’? কিন্তু ভদ্রতা বজায় রেখে চুপচাপ রইলো।

এভাবে কয়েক মিনিট কাটলো, কিন্তু ভেতর থেকে যে দু’জন বিবাহিত মানুষের বিবাহিত জীবনের প্রথম রাত সেভাবে তাদের মধ্যে হওয়া কথাবার্তার কিছুই কানে আসছেনা ওর।

এবার ধারা শাড়ির আঁচল গুছিয়ে এনে কোমরে পেচিয়ে আরেকটু হেলে দাঁড়ালো দরজার সঙ্গে। এবং আকস্মিক ঘটনাটা ওর সঙ্গে তখনই ঘটলো, দরজাটা খুলে যেতেই হেলান দিয়ে দাড়িয়ে থাকা ধারা হুড়মুড়িয়ে পড়লো গিয়ে শক্ত কারো বুকের উপর। ঘটনাটি ঘটলো মাত্র কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে। অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট না। নাকে পরিচিত পুরুষের পারফিউমের ঘ্রাণ আসতেই ওর অবচেতন মন ওকে চেচিয়ে বললো।

‘ এই লোক বোনের বাসর ঘরে করে কি’?

নিজেকে সামলে নিয়ে ও মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই ওয়াসিফ বলে।

‘ ব্যথা পেয়েছিস’?

ধারা ওসব ব্যথা ট্যথার তোয়াক্কা করলোনা, ও গলা উঁচিয়ে বলে।

‘ আপনি এঘরে কেনো? এ ঘরে আপনার কি’?

ওর এমন কথায় ওয়াসিফ বোধ হয় আশ্চর্য হলো ভীষণ, কিন্তু অন্ধকারে ধারা তা দেখতে পেলোনা। ওয়াসিফ বলে।

‘ আমার ঘরে আমি নয় তো কে থাকবে, অবশ্য তোরও থাকার কথা, আয় ভেতরে আয়’

বলেই ওয়াসিফ ওর হাত টেনে ঘরের মধ্যে নিতেই ধারার মাথায় বড়োসড়ো বাজটা পড়ে। তারমানে অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে ও শেষমেষ কিনা এই লোকের ঘরের দরজায় এলো। তাই তো ও তখন থেকে ভাবছিলো ভেতর থেকে কোনো কথা আসে না কেনো? নিজের কপাল নিজে চাপড়ায় ধারা, ওর মতো পাক্কা বলদ আর দুনিয়ায় নেই। ওয়াসিফ সামনে এগোনোর জন্য হাত টানে কিন্তু ধারা খামি দিয়েছে। ওয়াসিফ ঘুরে বলে।

‘ কি সমস্যা ‘?

ধারা বলে ‘ সমস্যা অনেক বড়, হাত ছাড়ুন’

‘ কি হয়েছে? বল’?

সত্যি কথা তো বলা যাবেনা, বললে এই লোক কড়া ধমক দিয়ে বলবে ‘ এই তোর লজ্জা শরম নেই, চুপচাপ ঘুমা’ তাই সম্পূর্ণ বিষয় চেপে গিয়ে ধারা বলে।

‘ মাথায় ভীষণ ব্যথা করছে, বড়ো আম্মা কে খুঁজছি তেল দেবো ‘

‘ তোর বড়ো আম্মা কি দোতলায় থাকে? তুই কি নতুন হয়েছিস’?

‘ ঘরে পায়নি, তাই ভাবলাম এখানেও আসতে পারে’

ওয়াসিফ এগিয়ে গিয়ে চার্জার লাইট অন করে, ধারার দিকে তাকিয়ে বলে।

‘ এদিকে আয়, আমি লাগিয়ে দিচ্ছি ‘

ধারা পড়েছে মহা ঝামেলায়, এতো রাতে মাথায় তেল কে নেয় ভাই। আল্লাহ না জানি আপারা এতক্ষণ কতকত রোমান্টিক গল্প করছে ও সবকিছু মিস করে যাচ্ছে। ও যে কেনো লাইটটা তখন বন্ধ করতে গেলো? আর বন্ধ যখন করলোই উওর দিকে না গিয়ে এই দক্ষিণের ঘরের দিকে কেনো এলো?
ধারাকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ওয়াসিফ বলে।

‘ কি হলো আয়’!

ধারা মিনমিন করে বলে।

‘ মাথা ব্যথা সেরে গেছে, কাল বড়ো আম্মার থেকে মেখে নেবো, সবার তেল দেওয়াতে আমি আরাম পাইনা’

ওয়াসিফ ওর কথা শোনেনা, তেল নিয়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলে।

‘ মাথার তালুতে সামান্য লাগিয়ে দি তাহলে ভালো ঘুম হবে ‘

সঙ্গে সঙ্গে ধারা ‘ না’ বলে দু-হাত পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়ায়। ওয়াসিফ ওর এমন কান্ড কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে।

‘ সমস্যা কি তোর? এভাবে চেচাচ্ছিস কেনো?’

এবার ধারা মিনমিন করে বলে।

‘ আপনি তেল দিতে চাচ্ছেন কেনো’?

‘ আস্তে বলা যায় না ‘!

‘ আস্তে বললে আপনি শুনতেন না’!

ওয়াসিফ আর কিছু বলেনা, তেলের কৌটা জায়গা রেখে দেয়, ধারা এবার নরম সুরে বলে।

‘ এবার আমি যাই’?

চকিত ওয়াসিফ ঘোরে ওর দিকে, বলে।

‘ কই যাবি’?

‘ ঘ-ঘরে’

‘ ও ঘরে ওরা আছে, তুই ওদের মধ্যে কেনো যাবি’?

‘ ওদের মধ্যে যাবোনা তো, লোপার ঘরে যাবো’

‘ কেনো তোর ঘর নেই ‘?

‘ আছে একটা ‘

‘ কোনটা বলতো’?

‘ এই এটা, ফিফটি পারসেন্ট ‘

ওয়াসিফ হাসে, বৌয়ের মুখে রুম ভাগাভাগি শুনে। ও হেঁটে গিয়ে দরজায় সিটকিনি তুলে তাকায় ধারার দিকে, বলে।

‘ শুয়ে পড়, সকালে আবার উঠতে হবে, ওরা চলে যাবে’

বেচারি ধারা! নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মেরে শক্ত হয়ে বিছানায় পড়ে রয় গোটগাট হয়ে। দুঃখ ঢাকতে শাড়ির আঁচলটা চওড়া করে মুখের উপর দিয়ে রাখে।

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply