Golpo romantic golpo মূল্য

মূল্য পর্ব ১


স্ত্রীর জন্মদিনের কথা ভুলে গিয়ে নিজের খালাত বোনের জন্মদিন এলাহিভাবে পালন করছে নীলার স্বামী অরিত্র।অথচ আজকে যে তার স্ত্রীরও জন্মদিন সেটা সে দিব্যি ভুলে বসে রয়েছে।
নীলার স্বামীর নীলার জন্মদিন মনে নেই কাজের চাপে, কিন্তু নিজের খালাত বোনের জন্মদিন ঠিক মনে রেখেছে। হায় রে পুরুষ! এরা শুধু নিজের ব্যক্তিগত নারীদের সময়ই বড্ড বেখেয়ালি থাকে।
আজ থেকে পাঁচ বছর আগে পারিবারিক ভাবে নীলা আর অরিত্রের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের প্রথম দুয়েক বছর অরিত্র তার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালেও, গত তিনবছর আগে একটা বড় কোম্পানিতে চাকরি হওয়ার সে দিনদুনিয়া ভুলে কাজেই ডুবে থাকে।
না, একটু ভুল হলো। শুধু নীলার বেলাতেই অরিত্রের যত ভুল। এই যেমন আজ নীলার জন্মদিন। সে রাত বারোটা থেকে অপেক্ষা করছে, এই বুঝি অরিত্র তার কাজ শেষ করে এসে নীলাকে বুকে আগলে নিয়ে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাবে। বা কাজের ফাঁকেই স্টাডি রুম বসেই একটা ছোট টেক্সট করবে বলবে “শুভ জন্মদিন প্রিয়তমা”। কিন্তু না। নীলাকে হতাশ করে দিয়ে কোন টেক্সট আসল না, নাই বা শুভেচ্ছা বার্তা।
বিয়ের পাঁচ বছর হয়ে গেছে অরিত্র আর নীলার।
পাঁচ বছরে নীলা শিখে গেছে, সময়ের সাথে সাথে প্রত্যাশা করা ছেড়ে দিতে হয়। প্রত্যাশা যত কম, কষ্টও তত কম।
তবু একটা দিন এলেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা আশা জন্মায়। সেই দিনটা তার জন্মদিন। সকালে ঘুম ভাঙতেই ফোনটা হাতে নিল সে। হয়তো অরিত্র মাঝরাতে একটা ছোট্ট মেসেজ দিয়েছে— “শুভ জন্মদিন, নীলা।”
না। হোয়াটসঅ্যাপে অফিসের গ্রুপ, ফেসবুকের নোটিফিকেশন, দু-একজন বান্ধবীর শুভেচ্ছা—সবই আছে। শুধু স্বামীর কাছ থেকে কিছু নেই।
নিজেকে বোঝাল, “হয়তো ভুলে গেছে। অফিসে যাওয়ার আগে মনে পড়বে।”
কাজ করতে করতে অরিত্র কাল স্টাডি রুমেই ঘুমিয়ে পরেছিল। অনেক রাত অব্দি কাজ করায় সকালে অরিত্র তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছে।
— “নীলা, আমার নীল টাইটা কোথায়?”
— “আলমারির ডান পাশে।”
— “নাস্তা রেডি?”
— “হ্যাঁ।”
খেতে খেতেই অফিসের নানা কথা বলল অরিত্র। কিন্তু একবারও জিজ্ঞেস করল না, আজকের দিনটা কেন যেন অন্যরকম। বের হওয়ার সময় শুধু বলল,
— “আজ ফিরতে দেরি হবে। অপেক্ষা কোরো না। রাতের খাবার খেয়ে নিও।”
অরিত্র যাওয়ার পর দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। নীলা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। একা দরজার সামনে মুখে হাসি টেনে নীলা বলল,
—”ঠিক আছে।”
কিন্তু সেই “ঠিক আছে”-র ভেতর কতটা ভাঙা মন লুকিয়ে ছিল, সেটা কেউ দেখল না।
দুপুরে নীলার মা ফোন করলেন।
— “নীলা মা, শুভ জন্মদিন। অনেক দোয়া রইল তোর জন্য। সবসময় ভালো থাকিস।”
নীলা হেসে বলল,
— “ধন্যবাদ, মা।”
মা জিজ্ঞেস করলেন,
— “জামাই কী উপহার দিল রে জন্মদিন উপলক্ষে?”
এক মুহূর্তের জন্য গলা ছিড়ে কান্না বেরিয়ে আসতে চাইল। তারপরও সে মিথ্যে হাসি দিয়ে বলল,
— “অফিসে গেছে তো। রাতে সারপ্রাইজ দেবে হয়তো।”
মায়ের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন কেটে দিয়ে বসে রইল সে। সময় নিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে ফেলল।
মিথ্যে বলতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু নিজের অপমানটাও তো সবাইকে দেখানো যায় না।
বিকেলে রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য পায়েস বানাল নীলা। ছোটবেলায় মা জন্মদিনে পায়েস করতেন।
আজ নিজের জন্মদিনে নিজের জন্য নিজেই পায়েস করছে। চামচে একটু মুখে দিয়েই মনে হলো—চিনি ঠিকই আছে, তবু কেন যেন স্বাদ নেই।
রাত নয়টার দিকে ফোনে একটা নোটিফিকেশন এল। ফেসবুক খুলতেই চোখ আটকে গেল।
অরিত্রর আইডি থেকে একটা পোস্ট করা হয়েছে। পোস্ট টায় কয়েকটা ভিডিও ছিল। নীলা সময় নিয়ে সেগুলো দেখতে থাকে একে একে। একটা ভিডিও চালু করলে দেখতে পায়, ঢাকার একটি সনামধন্য রেস্টুরেন্টে গিয়েছে অরিত্র, তার কাজিন আর অফিসের কিছু কলিগ। অরিত্র আর তার কলিগ একই অফিসে কাজ করে।
রেস্টুরেন্টটির হলরুম সাজানো হয়েছে বার্থ ডে বেলুন,, রঙিন লাইট দিয়ে। আর রুমটির মাঝে বড়সড় একটা কেক আনা হয়েছে। রুমটির এক কোণে থাকা মিউজিক প্লেয়ারে সফট মিউজিক বাজছে।
কিছু সময় পর কেকের টেবিলের মাঝখানে এসে দাড়াঁয় অরিত্র আর তার খালাতো বোন—ঈশিতা। যার জন্মদিনকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন।
ভিডিওটা শেষ হয়ে গেলে সে স্ক্রল করলে সামনে একটা পিক আসে। তার ক্যাপশনে লেখা— “আমাদের প্রিয় ঈশিতার জন্মদিন। অনেক ভালোবাসা।”
অন্য আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, অরিত্র নিজেই কেক কাটছে ঈশিতার হাতে হাত রেখে। হাসিমুখে উইশ করছে।
নীলার হাত কেঁপে উঠল। ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
বছরে একবারই তো আসে… তাহলে তার জন্মদিন?
সেটাও তো বছরে একবারই আসে।
বার্থ ডে পার্টি শেষ করে রাতে প্রায় সাড়ে এগারোটায় অরিত্র ফিরল। মুখে ক্লান্তির বদলে আনন্দের ছাপ।
ঘরে ঢুকেই সোফায় বসে পায়ের মুজো খুলতে খুলতে বলল,
— “জানো আজ খুব মজা হলো জন্মদিনে। “
নীলা যদিও জানে, তাও শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল,
— “কার জন্মদিন ছিল?”
— “ওহ্হ, তোমাকে তো বলাই হয়নি আজ ঈশিতার জন্মদিন ছিল। পোস্ট করেছিলাম, দেখো নি?”
— ” হুম দেখলাম, অনেক আয়োজন করা হয়েছিল। তা আয়োজনটা বুঝি তোমার পক্ষ থেকে ছিলো?
— “হুম, ও তো ছোট থেকে খুব আদরের আমাদের সবার। একটু না করলে হয়?”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
— “আজ আর কোনো বিশেষ দিন ছিল না?”
অরিত্র ভ্রু কুঁচকে ভাবল।
— “না তো।”
— “নিশ্চিত?”
— “হ্যাঁ। কেন?”
নীলা আর কিছু বলল না। শুধু মোবাইলটা এগিয়ে দিল। স্ক্রিনে ফেসবুকের পক্ষ থেকে আসা নোটিফিকেশন— “শুভ জন্মদিন নীলা।”
অরিত্রর মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল।
— “ওহ… আমি… আসলে…”
ব্যাখ্যা করার মতো কথা খুঁজে পেল না অরিত্র। কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর বলল,
— “সরি, সত্যি মনে ছিল না।”
মাত্র তিনটা শব্দ নিয়ে নিজের ভুলের ব্যাখ্যা দিল সে। তবে “সত্যি মনে ছিল না।” এই তিনটা শব্দ যেন নীলার পাঁচ বছরের সমস্ত অপেক্ষাকে মুছে দিল নিমিষেই।
নীলা মৃদু হেসে বলল,
— “সমস্যা নেই।”
অরিত্র স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ভাবল, ব্যাপারটা এতেই শেষ। কিন্তু তার মনের মধ্যে একটা খচখচানি রয়েই গেলো। তার অবচেতন মন হয়ত তাকে জানাচ্ছে —কিছু মানুষ চিৎকার করে সম্পর্ক ভাঙে না। নীরবে নিজের ভেতর থেকে প্রত্যাশা সরিয়ে নেয়। আর সেদিন থেকেই সম্পর্কটা শুধু দায়িত্বের হয়ে যায়।
নীলা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকাল। মনে মনে বলল,
—”আজ থেকে আমি কাউকে আমাকে মূল্য দিতে বাধ্য করব না। যে দিতে জানে, সে নিজেই দেবে। আর যে জানে না, তার জন্য নিজের সম্মান হারাব না।”
তার চোখে জল ছিল। কিন্তু সেই জলের আড়ালেই জন্ম নিচ্ছিল এক নতুন নীলা— যে আর নিজের মূল্য অন্যের স্মৃতির ওপর নির্ভর করে মাপবে না।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
#মূল্য | ০১ |
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
[অরিত্রের নীলার প্রতি উদাসীনতার জন্য তার কি শাস্তি হওয়া উচিত বলে আপনারা মনে করেন?
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
আমার পারসোনাল প্রোফাইল লিঙ্ক:

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply