Golpo romantic golpo বাঁধন রূপের অধিকারী

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৬


#বাঁধন_রূপের_অধিকারী

#লেখিকা_সুমি_চৌধুরী

#পর্ব ৬

বাঁধন তিলমাত্র বিচলিত না হয়ে অফিসারের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল।

“আপনাদের কাজ কি সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে কেবল অনুমানের ভিত্তিতে অন্যকে সন্দেহ করা। এ জন্যই কি আপনাদের পুলিশের চাকরি দেওয়া হয়েছে?”

অফিসার এবার অগ্নিশর্মা হয়ে বাঁধনের খুব কাছে এগিয়ে এলেন।

“এই ছেলে! তোমার সাহস তো কম না। তুমি কার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছো তা কি তোমার অন্তত ধারণা আছে?”

বাঁধন একটুও না দমে আগের মতোই নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল।

“হ্যাঁ জানি। আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন পেশায় একজন পুলিশ যার মূল কাজ দেশ সেবা করা। কিন্তু তিনি এখন এক মারাত্মক ভুল করছেন যার মাশুল পরে তাকেই দিতে হবে।”

পুলিশ অফিসারটি এবার সত্যিই চরম খেপে গেলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে দেখে আকাশ ভিড় ঠেলে ঝটপট এগিয়ে এল। সে বাঁধনের হাত চেপে ধরে চাপা স্বরে বলল।

“কী করছিস এসব। অযথা এই ঝামেলায় তুই নিজেকে জড়াচ্ছিস কেন?”

বাঁধন আকাশের কথার কোনো উত্তর দিল না। সে আকাশের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে সেই যুবক দুটোর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তাদের চোখের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে ঠান্ডা গলায় জিজ্ঞেস করল।

“যিনি খুন হয়েছেন তিনি আপনাদের কে হন?”

বড় ছেলে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল।

“আমার মা হন। আর মাকে খুন করেছে আমার এই ছোট ভাই।”

পাশের ছেলেটি মুহূর্তেই চিৎকার করে প্রতিবাদ করে উঠল।

“একেবারে মিথ্যা কথা। আমি মাকে খুন করি নাই।”

দুজনেই সবার সামনে উত্তেজিত হয়ে একে অপরকে দোষারোপ করে ঝগড়া শুরু করল। বাঁধন বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে অত্যন্ত কর্কশ স্বরে ধমক দিয়ে উঠল।

“চুপ করেন একদম। রিমান্ডে নিলে সত্যি কোনটা তখন এমনি এমনি বেরিয়ে আসবে।”

রিমান্ডের নাম শুনেই দুই ভাইয়ের মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেল। বড় ভাই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে চেয়ার ছেড়ে সরাসরি অফিসারের দিকে ছুটে গেলেন। তিনি অফিসারকে টেনে এক কোণে নিয়ে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে পায়ে ধরে বললেন।

“স্যার স্যার আমাকে বাঁচান। আমাকে রিমান্ডে নিবেন না স্যার আমি সহ্য করতে পারব না। বাঁচান আমাকে।”

অফিসার সন্দিগ্ধ চোখে ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন।

“বাঁচাবো মানে। খুনটা কি আপনি করেছেন?”

“হ্যাঁ স্যার সব কাহিনী পরে বলব প্লিজ আপনি শুধু আমাকে বাঁচান।”

অফিসার এবার মেকি রাগ দেখিয়ে বললেন।

“তুই ভাবলি কী করে। তুই খুন করবি আর আমরা সব জেনেও তোকে ছেড়ে দেব। চল রিমান্ডে চল।”

ছেলেটি এবার মরিয়া হয়ে উঠল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল।

“না না স্যার আমি টাকা দেব আপনাকে। যত টাকা লাগে সব দেব তবু স্যার আমাকে রিমান্ডে নিবেন না।”

টাকার কথা কানে যেতেই অফিসারের লোভী স্বভাবটা চাড়া দিয়ে উঠল। তিনি এদিক-ওদিক তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে নিচু স্বরে বললেন।

“কত দিবি?”

ছেলেটি যেন হাতে আকাশ পেল। সে দ্রুত বলল।

“আপনি যত চান।”

“ভেবে বলছিস তো?”

“হ্যাঁ স্যার। শুধু আমাকে বাঁচিয়ে দেন।”

রুম থেকে যখন ছেলেটি আর অফিসার বেরিয়ে এলেন, বাঁধন তখন দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময় দেখছিল। অফিসারকে সামনে দেখে বাঁধন সোজা হয়ে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে এক ধরনের শীতল অবজ্ঞা। সে ধীরস্থির কণ্ঠে বিদ্রূপের স্বরে বলে উঠল।

“তা আপনাদের ঘুষের মিটিংটা কি কমপ্লিট?”

কথাটা শোনা মাত্র অফিসার যেন বাজের মতো চমকে উঠলেন। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার হাঁটু তখনো থরথর করে কাঁপছে। অফিসার নিজেকে সামলে নিয়ে কোনো রকমে শুকনো ঢোক গিলে গর্জে উঠলেন।

“কী কী বলছেন এসব। দেখেন আপনি কিন্তু আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে বড্ড বেশি বাড়াবাড়ি করছেন। আপনাকে আমরা হ্যারাস করতে বাধ্য হব।”

বাঁধন একটুও ঘাবড়াল না। বরং এক মুহূর্ত দেরি না করে সে নিজের ডান হাতটা অফিসারের দিকে বাড়িয়ে দিল। তার চোখেমুখে তখন এক ভয়ংকর চ্যালেঞ্জ। সে অত্যন্ত দৃঢ় আর গম্ভীর গলায় বলল।

“এই নিন করুন।”

বাঁধনের এমন দুঃসাহস দেখে আশেপাশের মানুষগুলো রীতিমতো স্তম্ভিত হয়ে গেল। অফিসার নিজেও যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আহসান রহমান দুশ্চিন্তায় পড়ে হাজি রহমানের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললেন।

“আব্বু ও ওসব কী করছে। পুলিশের সাথে কেন এই রকম ব্যবহার করছে। না মানে রাগ আমার সাথে কিন্তু পুলিশ কী করছে। ও এই রকম করছে কেন পুলিশের সাথে?”

অফিসার মুহূর্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে তুললেন। অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন।

“সাহস দেখাচ্ছেন। তাহলে তো আপনার সাহসের পরীক্ষাটা একবার করতেই হয়।”

বলেই তিনি পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন পুলিশকে আদেশ দিলেন।

“ওকে হ্যারাস করেন।”

পুলিশটি বাঁধনের দিকে এগোতে নিলে সাথে সাথে আহসান রহমান দ্রুত গিয়ে সেই পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালেন। তিনি অত্যন্ত অনুনয় করে পুলিশকে বললেন।

“দেখুন আসলে আমার ছেলেটা একটু ওই রকম। একটু বেয়াদবি করে ফেলছে। ওকে ছেড়ে দিন।”

বাঁধন পুলিশ অফিসারের চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় আর তীক্ষ্ণ গলায় গর্জে উঠল।

“আমি কোনো বেয়াদবি করি নাই। উনি একটু আগে ঘরের ভেতরে গিয়ে চুপিচুপি ঘুষ খেয়ে আসলেন। এই সত্যটা আমি এখন সবার সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে পারব।”

বাঁধনের এই তপ্ত বাক্য শুনে অফিসারের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। তিনি বিষম খেয়ে কেশে উঠলেন। তার কপালে মুহূর্তেই অপরাধবোধ আর দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠল। পুলিশ কনস্টেবলরা তড়িঘড়ি করে তাকে পানি এগিয়ে দিল। পানি খেয়ে একটু ধাতস্থ হয়ে অফিসার বাঁধনের দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।

“বেয়াদবি করার একটা সীমা থাকে। আপনি সব লিমিট ক্রস করেছেন। এর শাস্তি আপনাকে আজ হাড়েন হাড়েন পেতেই হবে। ধরো একে। থানায় নিয়ে দুইটা জবরদস্ত ধোলাই দিলে পুলিশের সাথে মশকরা করার শখ মিটবে।”

অফিসারের ইশারায় একজন পুলিশ কনস্টেবল হিংস্র ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বাঁধনের দুই হাত টেনে ধরল। সে পকেট থেকে লোহার তৈরি হ্যান্ডকাফ বের করে সশব্দে বাঁধনের দুই কবজিতে পরিয়ে দিল। লোহার সেই বরফশীতল স্পর্শে বাঁধনের চোয়াল আরও শক্ত হয়ে এল, কিন্তু তার চোখের মনিতে এক বিন্দু ভয়ের লেশমাত্র নেই।

ছেলের এমন দশা দেখে আহসান রহমান আর্তনাদ করে উঠলেন। তিনি পাগলের মতো সামনে এগিয়ে গিয়ে বললেন।

“আরে করছেন কী আপনারা। আমার ছেলেটাকে হাতকড়া পরাচ্ছেন কেন। ও তো বাচ্চা মানুষ, না বুঝে আবেগে বলেছে।”

_______________

ময়মনসিংহের আকাশ জুড়ে তখন ভোরের নরম রোদ। ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল ৯টা। আনন্দ মোহন কলেজের সেই ঐতিহাসিক লাল ইটের দালানগুলোর ওপর রোদের আভা পড়ে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয়েছে। বিশাল রেইনট্রি গাছগুলোর ছায়ায় ঘেরা ক্যাম্পাসে তখন শিক্ষার্থীদের কলকাকলিতে মুখর।

কলেজের সামনের গেটের ঠিক বাইরে নিজের বাইকে হেলান দিয়ে আয়েশ করে বসে আছে ইশতিয়াক। পাশে তার সাঙ্গপাঙ্গরা দাঁড়িয়ে জটলা করছে। ইশতিয়াকের তীক্ষ্ণ নজর রাস্তার দিকে কখন রূপা আসবে সেই অপেক্ষায় সে অস্থির। কলেজের সামনে হঠাৎ ইশতিয়াককে দেখে সাধারণ ছাত্রীদের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হয়ে গেছে কারণ ইশতিয়াক সচরাচর কলেজে আসে না, আর এলেই কোনো না কোনো শোরগোল পড়ে যায়।

অনেকক্ষণ পেরিয়ে গেলেও রূপাকে আসতে না দেখে ইশতিয়াক কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল।

“কলেজ টাইম হয়ে যাচ্ছে, ও আসে না কেন?”

পাশে থাকা রনি কাঁচুমাচু হয়ে বলল।

“আমিও তো বুঝতে পারছি না ভাই।”

ইশতিয়াক আর দেরি করল না। বাইক থেকে নেমে ঝাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল।

“চল ভিতরে যাই। ওদের ডিপার্টমেন্টের কাউকে খুঁজে জিজ্ঞেস করব।”

ইশতিয়াক তার দলবল নিয়ে দাপটের সাথে কলেজে ঢুকল। অনেক ছেলে ইশতিয়াককে দেখে সমীহ করে ‘বড় ভাই’ বলে সালাম দিতে লাগল। কিন্তু ইশতিয়াক সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না। সে সরাসরি করিডোর দিয়ে এগিয়ে চলল। আসতেই বারান্দার এক কোণে সে কেয়া আর বৃষ্টিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল। রূপার সাথে কাল ওদের দেখেছে বলে চিনতে মোটেও সময় লাগল না।

সে সরাসরি গিয়ে তাদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াল। ইশতিয়াকের এই হঠাৎ আবির্ভাবে কেয়া আর বৃষ্টি ভয়ে কিছুটা কুঁকড়ে গেল। ইশতিয়াক তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল।

“তোমাদের বান্ধবী কই?”

বৃষ্টি কাঁপা গলায় আমতা আমতা করে বলল।

“বান্ধবী? কোন বান্ধবী?”

ইশতিয়াক বিরক্তিতে কপাল চুলকাতে চুলকাতে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল।

“ওই যে কী নাম যেন… হ্যাঁ, রূপা ও কই?”

কেয়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“ও… ও তো আসেনি।”

ইশতিয়াক ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। সে সরাসরি জিজ্ঞেস করল,

“কেন আসেনি? কিছু বলেছে তোমাদের?”

কেয়া আর বৃষ্টি দুজনেই অসহায়ভাবে না সূচক মাথা নাড়ল। ইশতিয়াক আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়াল না। একটা তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিজের দলবল নিয়ে গটগট করে কলেজ থেকে বেরিয়ে গেল। ইশতিয়াক দৃষ্টির আড়ালে যেতেই বৃষ্টি ফিসফিস করে কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,

“এই ছেলে রূপাকে কেন খুঁজছে রে?”

কেয়া আতঙ্কে ফ্যাকাশে হয়ে জবাব দিল,

“কেন খুঁজছে জানিস না? কাল কী ঝামেলাটাই না করল দেখলি না? নিশ্চয়ই এই ছেলে রূপাকে মারার জন্য খুঁজছে। উফফ, কাল কত করে বললাম যাস না, মেয়েটা শুনলই না।”

এদিকে ইশতিয়াক তার দলবল নিয়ে সরাসরি রূপাদের বাসার সামনে এসে দাঁড়াল। বেশ সুন্দর তিনতলা বাড়ি, উপরে ছাদ আর সদর দরজায় একটা বড় গেট। গেটের ওপর স্পষ্ট করে লেখা ‘রহমান বাড়ি’। ইশতিয়াক অস্থিরভাবে গেটের সামনে পায়চারি করছে। তার চোখ কখনো ছাদের দিকে যাচ্ছে, তো কখনো সারি সারি রুমের লাগোয়া ব্যালকনিগুলোর ওপর দিয়ে ঘুরে আসছে। তার সারাটা অস্তিত্ব যেন ছটফট করছে শুধু একবার রূপাকে দেখার জন্য।

তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে রূপার। শরীরটা বিষিয়ে আছে, টলমল পায়ে সে বিছানা থেকে কোনোমতে উঠল। চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। সে ওয়াশরুমে ঢুকে ব্রাশে পেস্ট নিয়ে দাঁত মাজতে মাজতে আলতো পায়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে এল। একটু মুক্ত বাতাস পাওয়ার আশায় বাইরে পা রাখতেই তার চোখ আটকে গেল নিচে।

হঠাৎ তাদের বাসার ঠিক সামনে কালকের ওই ছেলেটাকে দেখে রূপা রীতিমতো আঁতকে উঠল। আতঙ্কে আর বিস্ময়ে সে উপর থেকেই স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইশতিয়াকের নজর চলে গেল উপরে সরাসরি রূপার চোখের ওপর। রূপাকে দেখামাত্রই ইশতিয়াকের ঠোঁটের কোণে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে হাত নাড়িয়ে রূপাকে ইশারায় ‘হাই’ জানাল।

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply