Golpo romantic golpo প্রেমবসন্ত প্রেমবসন্ত সিজন ২

প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬৬


#প্রেমবসন্ত_২ ।৬৬।

#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat

স্বার্থ সেই তখন থেকে বাজে বকে যাচ্ছে। অর্ণ ওকে চোখ রাঙিয়ে কায়নাতকে নিয়ে নিজের ঘরে রওনা হলো। স্বার্থ মুখ বাকিয়ে বসল সোফায়। পায়ের উপর পা দিয়ে মাথার চুল গুলো পেছন দিকে ঠেলে দিল। নিশা বলল,

“এখানে রাত্রি যাপন করতে চাইছ?”

“তুই রাজি থাকলে আমার কোনো সমস্যা নেই। একটু পাপ হবে কিন্তু কাল সকালে পাক্কা কাজী অফিসে গিয়ে কবুল পড়ে ফেলব।”

“ছি! তুমি খুব খারাপ স্বার্থ ভাই। এসব কোন ধরনের কথা?”

“ছি আবার কী? তোর জন্য আমি এখনও কুমার সেজে বসে আছি। হারামি, তোর কী চোখ নেই? আমার সব বন্ধুর পটলা ভরা ছাও আবার এখন তো তোর বজ্জাত ভাইয়েরও ছানা আসতে চলেছে। আমি কী দোষ করেছি বল? দাদা শোনার বয়সে বাবা ডাক শুনতে পারছি না।”

ভীষণ আফসোস নিয়ে বলল স্বার্থ। ওর বলার ভঙ্গি দেখে নিশা খিলখিল করে হেসে উঠল। বেহরুজ বেগম ওকে দেখতে পেয়ে এদিকটায় পা বাড়িয়ে গাল ভরে হাসলেন।

“আরে স্বার্থ যে? কতদিন পর এলে তুমি।”

স্বার্থ সালাম দিয়ে বলে,

“কাজের এত চাপ আন্টি। বয়স হয়েছে বিয়ে টিয়ে করতে হবে না? বিয়ের জন্যই তো এত পরিশ্রম আমার।”

বেহরুজ বেগম বসলেন সোফায়। নিশাও বসল মায়ের পাশে।

“সবাই তো এখন সিরিয়াল ধরে বিয়ে করছে। ভাবছি আদালের বিয়েটাও দিয়ে দেব। তোমার আঙ্কেলও চাইছেন।”

নিশা মাথা নিচু করল। হাতের মুঠোয় হাত নিল। স্বার্থ কপাল কুঁচকে বলল,

“মেয়ে দেখেছেন নাকি আন্টি? আদাল তো কিছু বলল বা আমায়।”

বেহরুজ বেগম নিশার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“বাড়ির মেয়েকে বাড়ি রাখব খবরটা কেউ-ই জানে না সেভাবে।”

“মানে?”

নিশা মাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

“মা তুমি যাও তো! আপু কল করেছিল, তোমার সাথে কথা বলতে চায়।”

বেহরুজ বেগম খুব করে চাইলেন স্বার্থকে সত্যি কথাটা বলতে। স্বামীর বিরুদ্ধে তো আর কথা বলতে পারবেন না অন্তত স্বার্থকে সত্যি তো বলতে পারবেন? একদিন না একদিন সত্যিটা জানতেই পারবে তার চেয়ে বরং এখনই জানিয়ে দেয়া ভালো। কিন্তু মেয়ের জন্য পারলেন না। প্রস্থান করলেন নীরবে। নিশা হাসার চেষ্টা করল একটু।

“তুমি ভাইয়ার সাথে কথা বলবে না? আমি ফ্রেশ হব একটু। কাল ভার্সিটি যেতে হবে।”

স্বার্থ কোনো কথা বলল না। চুপটি করে নিশার ছটফটানি দেখল। নিশা এক প্রকার দৌড়ে পালাল সেখান থেকে। এমন সময় বাড়িতে আদাল আর প্রেম প্রবেশ করল। স্বার্থকে চৌধুরী বাড়ি দেখে প্রেম মেয়েদের মতো মুখে হাত দিয়ে বলল,

“মাগো মা, বাড়িতে কে এসেছে? আমার বাচ্চার বাবা আক্তার মা?”

স্বার্থ কপাল কুঁচকে পায়ের উপর পা রাখল।

“আদালের বিয়ের কথা চলছে কবে থেকে?”

প্রেমের হাসি-খুশি মুখটা চুপসে গেল। আদাল বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলল। বলল,

“এসব বিয়ের কথা আবার কে তুলেছে?”

“তোর মা বলল। বিয়ের করছিস কবে? তোরা সবাই বিয়ে করে ফেললে আমার কী হবে? নিশুকে নিয়ে আজই পালিয়ে যাব?”

প্রেম আড়চোখে আদালকে দেখে মিনমিন গলায় বলল,

“আদালের বিয়ে কার সাথে জানো?”

“কার সাথে? মেয়েও ঠিক করা হয়ে গেছে?”

প্রেম কিছু বলতে চাইল কিন্তু আদাল বাঁধা দেয়ায় আর বলা হলো না। সাঈমা এসে ওদের জন্য কফি দিয়ে গেল। প্রসঙ্গ পালটে আড্ডায় মেতে উঠল।

•••

কায়নাত এখন আর শাড়ি পরে না। উঁচু পেটের জন্য গোল গোল জামা পরে—যার জন্য দেখতে পুরো বাচ্চা বাচ্চা মনে হয়। ওর ভেজা চুল তখন তোয়ালে দিয়ে প্যাঁচানো। অর্ণ তার তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। কায়নাত এলো নিকটে। বলল,

“আসুন আমি মাথা মুছিয়ে দেই।”

এত লম্বা মানুষের মাথা ধরা সম্ভব এই উঁচু পেট নিয়ে? কায়নাত গাল ফুলিয়ে কপাল কুঁচকে তাকাল অর্ণর দিকে। অর্ণ চোখ ছোট ছোট করে বলল,

“এত পাকামো করতে বলেছি আমি? আমি কী আমার কাজ করতে পারি না?”

কায়নাত খুব বুদ্ধিমানের মতো মাথা নাড়িয়ে উত্তরে বলে,

“আমাকে এখন আর আপনার ভালোলাগে না। আগের মতো তো আর সুন্দর নেই। আমার পেট বেড়েছে, মোটা হয়েছি, চোখের নিচে কালি পড়েছে। এখন কী আর আমাকে ভালো লাগবে? আপনি তো সুন্দর মানুষ তাই আপনার পাশে সুন্দর মেয়েই মানাবে।”

অর্ণ ওর ছোট্ট শরীরটা মুহূর্তেই কোলে তুলে নিল। গিয়ে বসল সোফায় আর কায়নাত ওর ঊরুর উপর। অর্ণ ছোট্ট করে ওর আলুর মতো ফুলো ফুলো গালে ঠোঁট দাবাল। নাক টেনে দিয়ে বলল,

“এত নাটক কোত্থেকে শিখেছ বউ?”

“আমি মোটেও নাটক করছি না। আপনি আর আমাকে ভালোবাসেন না।”

“কে বলেছে ভালোবাসি না?”

“আমি বুঝি।”

“আর কী বোঝো?”

“অনেক কিছু।”

“যেমন?”

“আপনার মাথা।”

অর্ণ ওর মাথার তোয়ালে খুলে যত্ন করে মুছিয়ে দিতে শুরু করল। রাগে ফুলে থাকা এক গাল টেনে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আপনাকে আর আপনার পুঁচকু সোনাকে নিয়ে আমরা ঘুরতে যাচ্ছি আগামী সপ্তায়।”

কায়নাত ঝটফট দৃষ্টি ফেরাল।

“ঘুরতে যাচ্ছি? কোথায়?”

“সাজেক। আপনার মেঘের দেশে।”

কায়নাতের চোখ মুখ খুশিতে চিকচিক করে উঠল। ঝাঁপিয়ে পড়ল অর্ণর বুকে। সে প্রেগন্যান্সির প্রথম থেকে বায়না করে যাচ্ছে সাজেক যাবে কিন্তু অর্ণ কিছুতেই রাজি নয় এই ঝুঁকিপূর্ণ সময়ে সাজেক নিয়ে যেতে। হঠাৎ কায়নাতের খুশি হাওয়া হয়ে গেল। ওর গলা থেকে মুখ উঠিয়ে বলল,

“বাবুকে নিয়ে কিভাবে যাব? পেটে ব্যথা লাগবে না?”

অর্ণ ওর নাকে নাক ঘষে বলল,

“বাবুর বাবা থাকতে তার কষ্ট হবে কেন? আমি আছি না?”

“শুনেছি সেখানে অনেক আঁকাবাঁকা রাস্তা। ঝাঁকুনি খেলে বাবু খুব ব্যথা পাবে।”

“আমরা গাড়ি দিয়ে যাব না।”

কায়নাত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তাহলে কিভাবে যাব?”

অর্ণ ঠোঁট টিপে বউয়ের গাল টেনে দিয়ে বলল,

“আকাশে উড়ে উড়ে যাব।”

“হেলিকপ্টারে যাব? ওমাহ! পড়ে টরে যাব না?”

অর্ণ কপাল গোটাল। মেয়েটা বেশি কথা বলে। কায়নাত স্বামীর একটু আদর পেয়ে মোমের মতো গলে যাচ্ছে। অর্ণর দুই গালে দুটো চুমু এঁকে ঘাড়ে নাক ঘষে বলল,

“কে কে যাব গো?”

“তুমি, আমি আর তোমার পুঁচকু।”

“কেন? বাকিরা যাবে না কেন?”

“বউ নিয়ে একা ঘুরব।”

“আমি ওদের রেখে কোথাও যাব না। ওদের রেখে গেলে আমার খারাপ লাগবে।”

“আচ্ছা সবাইকে নিয়ে যাব। খুশি এবার?”

মেয়েটার খিলখিল হাসির শব্দ শোনা গেল। ভার্সিটির পড়াশোনা তো বোধহয় ভুলেই বসেছে। অর্ণও জোর করতে পারে না পড়ার জন্য।

••

“কেন মারামারি করবে ও? কাল স্কুলে ভর্তি করেছ আর আজই মারামারি করে এসেছে?”

নুসরাত ক্ষেপে গেছে ভালোই। আদি ভয় পাচ্ছে মায়ের হাতে মার খাওয়ার। শেহের শুকনো ঢোক গিলে বলল,

“রাতপাখি, বন্ধুদের মধ্যে তো এমন একটু-আধটু হয়েই থাকে বলো?”

“কেন হবে? একদিনেই কী এমন হয়ে গেছে যে ওকে মারামারি করতে হবে? ওর বয়স কত? এই বয়সেই মাস্তানি শিখেছে?”

আদি এবার ভয়ের জায়গায় বিরক্ত হয়ে বলল,

“তুমি অমন করে চেচাচ্ছ কেন মা? আস্তে কথা বললেও তো শুনতে পাই।”

নুসরাত চোখ রাঙিয়ে বলল,

“দিন দিন ধারণার বাইরে বেয়াদব হচ্ছ আদি। কিভাবে বড়দের সাথে কথা বলতে হয় জানো না?”

“ছোটদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তুমি জানো না?”

“আবার?”

শেহের দুই মা ছেলের ঝগড়া থামাতে হাত জোর করে বলল,

“আচ্ছা বাবা থামো এবার। দুজন মিলে কী শুরু করেছ? এবার ঘরে বাড়ির সবাই এসে হাজির হবে তো!”

আদি গাল ফুলিয়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। ঘাড়ে মুখ গুঁজে বলল,

“তোমার বউ আমায় খুব বকে। আমি কী কিছু করেছি? ওই ছেলেই তো আগে আমাকে মেরেছে।”

শেহের ফিসফিস করে বলল,

“ক্যামেরায় সব রেকর্ড হয়েছে। আগে তো তুই-ই মেরেছিস।”

“তুমি আমার বাবা হয়ে আমাকে সাপোর্ট করছ না কেন?”

“কারণ অন্যায় তুই করেছিস।”

“ভালো করেছি। মাকে বলে দিলে তোমার বউকে অন্য জায়গায় বিয়ে দিয়ে দিব আমি।”

শেহের মুখে কুলুপ আটল। বউ আর ছেলে দুটোই সমান। কেউ কারোর থেকে এক ফোঁটা কম নয়। নুসরাত নিজের মতো বকবক করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। গতকাল আদিকে নিউ স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছিল। আজ প্রথম ক্লাস থাকায় যথারীতি সে ক্লাসেও গিয়েছিল কিন্তু সেখানেই এক ছেলের সাথে ছুটির সময় মারামারি করেছে। স্কুল থেকে বিচার এসেছে। এসব নতুন কিছু নয়। এমন ধরনের ছোট-খাটো বিচার প্রত্যেকদিন আসবে জানা কথা। আর সব ঝড় শেহেরের উপর দিয়ে যাবে সেটাও শেহের খুব ভালো করেই জানে। নুসরাতকে বিয়ের আগে থেকেই ওর স্কুলের সব ঝড় ওর উপর দিয়েই যাচ্ছে আর আগামীতেও যাবে।

আদির জন্য সৈয়দ বাড়িতে আলাদা ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাঝে মধ্যে আদি বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকলেও বেশিরভাগ সময় আলাদাই থাকে। তাকে বেহরুজ বেগম বলেছেন এখন থেকেই অভ্যাস করতে। তার অবশ্য কোনো সমস্যা হয় না। মায়ের ফোন নিয়ে দিব্যি রাত কেটে যায়। আজও নিয়মের ব্যতিক্রম হয়নি। কূটনী দাদির সাথে ঝগড়া সেরে সে নিজের ঘরের দরজা দিয়েছে। নুসরাত শেহেরের ঘরে তখন বিছানা ঠিক করছে। শেহের ল্যাপটপ রেখে বিছানায় এলো। পা মেলে দিয়ে বসতেই প্রচুণ্ড শব্দ হলো শেহেরের ফোনে। শেহের কল রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে নিশার চিৎকার ভেসে এলো,

“দুলাভাইইইইইইই, কেমন আছো?”

শেহের চোখ বড় বড় করে বলল,

“এত লম্বা করে ডাকছিস যে? আবার টাকা চাই?”

নিশা মুচকি হেসে বলল,

“তুমি খুব সুইট জানো? মনের কথা কিভাবে জেনে যাও বলো তো?”

“তোর কী একটুও লজ্জা নেই? বড় ভাইয়ের ব্যাংক খালি করে এখন আমার পিছু লেগেছিস?”

নিশা গাল ফুলাল। স্বর টেনে ডাকল বোনকে।

“এই আপুউউ, তোর জামাইয়ের কথা শুনেছিস? খুব বেশি টাকা নেই আমি তোদের থেকে?”

নুসরাত কাজ সেরে শেহেরের পাশে এসে বসল। ক্যামেরার সামনে আসতেই নিশা ফের বলল,

“তোর জামাইকে বল আমার একাউন্টে টাকা পাঠাতে। বোন বিয়ে দিয়েছি শুধু শুধু নাকি? তার একটা শালি আছে এটা মাথায় রাখতে হবে না? একটা মেয়ের কত খরচ সেটা কী সে জানে না? নাকি জেনেও ঢঙ করে? বিয়ে যে করেছে, বউয়ের পেছনে টাকা ঢালতে হয় না? হু?”

শেহের হতাশার নিশ্বাস ফেলল।

“একটু শ্বাস নিয়ে কথা বল মা। এত কথা কোত্থেকে শিখেছিস?”

“তুমি টাকা দেবে কিনা?”

“কী উপলক্ষে টাকা চাই?”

“জেনেও নাটক করছ কেন? সাজেক যাব আগামী সপ্তায় জানো না? মার্কেটে যেতে হবে তো।”

নুসরাত কপাল কুঁচকে বলল,

“সাজেক? কার সাথে যাচ্ছিস?”

“তোদের সাথেই তো যাচ্ছি। ভাইয়া তোদের বলেনি? আমরা সবাই সাজেক যাচ্ছি আগামী সপ্তায়।”

নুসরাত অবাক হলো। বলল,

“কায়নাতকে রেখে ভাইয়া সাজেক যেতে চাচ্ছে?”

“কায়নাতও যাবে।”

“ও কিভাবে যাবে? ওসব রাস্তায় ওকে নিয়ে যাওয়া কত রিস্ক জানিস?”

“ওরা গাড়ি করে যাবে না আপু। তুই ওদের চিন্তা না করে তোদের চিন্তা কর।”

“কিন্তু ভাইয়া তো এখনও কিছু বলেনি আমাদের।”

শেহের বলল,

“আমাকে বলেছে। তোমায় আজ সারপ্রাইস দিতে চেয়েছিলাম।”

নুসরাত আর কথা বাড়াল না। অনেক দিন ধরে সত্যিই কোথাও ঘুরতে যাওয়া হয় না। এই উছিলায় যদি একটু ঘুরে আসা যায় তাহলে মন্দ হয় না। মাইন্ড ফ্রেশেরও তো একটা ব্যাপার আছে।

(পরশু নতুন গল্প দিব?)

#চলবে.

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply