Golpo romantic golpo প্রিয়তার পূর্ণতা

প্রিয়তার পূর্ণতা পর্ব ১৮


#প্রিয়তার_পূর্ণতা

#Nadia_Afrin

১৮

আজ বাড়ির পরিবেশ তেমন ভালো নয়।শুনশান নিরবতা।মারপিট ঝগড়া সেই অব্দিই ছিল।

মা সুমা আপুকে নিজের ঘরে রেখেছেন।

কবির ভাই চলে যেতে চেয়েছেন।

আমি আটকেছি।এভাবে গভীর রাতে চলে গেলে মন্দ দেখায়।

স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হতেই পারে।

এখনের সময়টা সন্ধ‍্যা হওয়ার একটু আগে।

সূর্যের আলো নেই বললেই বলে।ডুবে যায়নি পুরোপুরি।তবে মেঘলা দিনের জন্য নিভু নিভু আলো।

আমি ছাদের পেছন দিকটায় দাঁড়িয়ে আছে।বাড়ির পেছন দিকে জঙ্গল মতো।জঙ্গল বললেও ভুল হবে।বড়ো অনেক গুলো গাছ দাঁড়িয়ে।গাছের ডালপালা,পাতা পেছন থেকে আমাদের বাড়িকে আড়াল করেছে।

আমি আজ শাড়ি পড়েছি নীল রঙের।

টবে লাগানো গোলাপ গুলো ছুয়ে ছুয়ে দেখছি।প্রলয় বাড়িতে নেই।নিজের মতো সময় কাঁটাচ্ছি আমি।

হঠাৎ প্রচন্ড শব্দে বিদ‍্যুৎ চমকায়। মূহুর্ত্তেই কেঁপে উঠলাম।ঘরে যেতে হবে।বাজের শব্দে ভয় পাই ছোট বেলা থেকেই।

দ্রুত কদমে ছাদের দরজার কাছে গেলাম।দরজা টান দিতেই খেয়াল করলাম ওপাশ থেকে লাগালো।ইতিমধ‍্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

পানির হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে এদিক-ওদিক যেতে লাগলাম।ডাকলাম চিৎকার করে।রিপাকে ডাকলাম।মাকেও ডাকলাম।কেউ শুনলোনা।

ছাদে কটা কাপড় ছিল শুকনো।

কেউ সেগুলো তুলে নিয়ে গেছে আর দরজা লাগিয়ে দিয়ে গেছে।

আমি জলজ‍্যান্ত একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছি কেউ খেয়াল করলো না?

এবার কী করি আমি?

বৃষ্টি বাড়ছে।বাজ পড়ছে।বাতাসে শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠছে।দু-হাতে শরীর আগলে রেখে শীত কাঁটানোর বৃথা চেষ্টা করছি।ভিজে একাকার আমি।

ভয়ে জড়সড় হয়ে আছি।অসহায় লাগছে।রাগ হচ্ছে।সব মিলিয়ে কান্না করছি আতঙ্কে।

কিছুক্ষণ কাঁদার পর মনে হলো আমায় বের হতে হবে।আবারো দরজার কাছে গিয়ে প্রচন্ড শব্দ করলাম। ডাকছি চিৎকার করে।বৃষ্টির শব্দে কেউ শুনতে পারছেনা আমার ডাক।

এবার আমি যেন আরো ভেঙে পড়লাম।

পাশের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে কাঁদতে লাগলাম।

একটু আগে আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম,ঠিক তার একটু সামনে একটা গাছের সাইডে বাজ এসে পড়লো।

প্রচন্ড আলো!আলোর ছটা এসে মাটির টবে লাগলো।শব্দ করে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ফেঁটে ছড়িয়ে পড়লো সেটা।

আমার পায়ে এসে কী যেন লাগলো।

প্রচন্ড জ্বালা শুরু হলো।

নিজ চোখে এসব দেখে ভয়ে আমি গগনবিদারী চিৎকার করে উঠলাম।

কী করবো বুঝতে পারছিলাম না।মনে হচ্ছে মরে যাবো।এখনি এখান থেকে যেতে হবে আমায়।ছাদ থেকে লাফ দিতে হবে।

এসব এলোমেলো চিন্তা মাথাতেই ঘুরছিল।তখনই দরজা খোলার শব্দ পেলাম।

দরজা খুলে ভেতরে এলো প্রলয়।আমি ঠায় দাঁড়িয়ে।কথা বলা তো দূর, নড়ার শক্তি অব্দি নেই।শুধু বাজ পড়ার ঐদিকে তাকিয়ে আছি।

প্রলয় আমার সামনে দাঁড়ায়।নাম ধরে ডাকে।কোনো উত্তর না পেয়ে দু-হাতে গাল ধরে ঝাকায়।

আমার তবুও কোনো সারা নেই।প্রলয় ঘাবড়ে যায়।শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমায়।

তখনই জ্ঞান হারাই আমি।

প্রলয় কোলে তুলে নেয় সঙ্গে সঙ্গে।ঘরে নিয়ে আসে।সোফায় শুইয়ে দেয়।নাম ধরে ডাকে বারবার।মাথার দু-পাশে চেপে ধরে।জ্ঞান ফেরে আমার।চোখ মেলি ফট করে।

‘বাজ বাজ’ বলে চিৎকার করে উঠি।প্রলয় হাঁটু মুড়ে বসে আমার দু-হাত ধরে বলে,”ভয় নেই।আমি আছি।ভয় নেই।এই দেখুন আমি আপনার সামনে।”

প্রলয়ের দিকে তাকালাম।দু-দন্ড তাকিয়ে থেকে ফট করে জড়িয়ে ধরলাম তাকে।কান্নায় ভেঙে পড়লাম।কাঁদতে কাঁদতে বললাম,”আমি ছাদে আটকা পড়েছিলাম।পেছনের একটা গাছে বাজ পড়েছে।

আমার ভয় লাগছে।আমি মরে যাবো।”

প্রলয় আমায় শক্ত করে চেপে ধরে তার বুকে।ভয়ে কাঁপছি আমি রীতিমতো।প্রলয় আমার পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়।শান্ত হতে বলে।

মিনিট দুয়েক পার হয় এভাবেই।আমরা একে-অপরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছি।আমি পারলে প্রলয়ের বুকে ঢুকে যাই।

ধীরে ধীরে আমার কান্না থামে।একটু স্বাভাবিক হই।

প্রলয় আমায় বসিয়ে পানি আনতে চায়।

ওর হাত টেনে ধরে মাথা দিয়ে নিষেধ করি আমায় ছেড়ে যেতে।

প্রলয় আবারো বসে আমার পায়ের কাছে।

শান্ত হতে বলে।

হাত ধরে রাখে।দুজনেই ভিজে একাকার।

প্রলয় আমায় দাঁড় করায়।সঙ্গে সঙ্গে পায়ের ব‍্যাথায় কুকড়ে উঠি।প্রলয় বসে পড়ে আমার পায়ের কাছে।অনেক খানি জখম হয়েছে।সম্ভবত সেই ভাঙা ফুলের টব ছিটকে এসে আমার পায়ে লেগেছে।

প্রলয় আমায় বসিয়ে দিয়ে পাশেই ড্রয়ার থেকে মেডিসিন বক্স বের করে।

ব‍্যান্ডেজ করে দেয়।কিছুটা শান্ত হই আমি।

গায়ের ভেজা শাড়ি শরীরের সঙ্গে লেপটে আছে।আমি তা লক্ষ্য করে আচল টেনে নিয়ে শরীর ঢাকি।

পুরো ঘর তখন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে।প্রলয় ড্রয়ার হাতরে মোম খুঁজতে খুঁজতে বলে,”কারেন্ট চলে গেছে। জেনারেটরেও কী যেন সমস্যা হয়েছে।অন হচ্ছেনা।

আমার ফোন বৃষ্টিতে ভিজে এতোক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে।আপনারটাও বন্ধ কখন থেকেই।

মোম জ্বালাতে হবে আপাতত।টর্চ নিচে আছে কোথাও।”

কটা মোম পায় সে।একটা জ্বালিয়ে আমার সামনে টেবিলের ওপর রাখে।

মুখে লেগে আছে বিন্দু বিন্দুর পানির কণা।

মোমের আলোয় যেন তা আরো জ্বলজ্বল করছে।ভেজা চুল দিয়ে টপটপ পানি পড়ছে।

প্রলয় এক দৃষ্টিতে চেয়ে আমার দিকে।

আমি মোমের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। প্রলয়কে নিশ্চুপ দেখে ওর দিকে তাকাতেই দৃষ্টি সরিয়ে নেয় সে।

ঘরের জানালা দিয়ে দমকা হাওয়া বয়।

কাধের আচল সরে যায়।

শাড়ির নিচে পড়া কালো ব্লাউজ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে এবার।লজ্জায় আমি জড়সড় হচ্ছি বারবার।

প্রলয় তা বুঝতে পেরে বলল,”পোশাক বদলাতে হবে আপনার আমার দুজনেরই।কতোক্ষণ আর ভেজা কাপড়ে থাকবো!

আমায় ধরে ধীরে ধীরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করুন।

আগে বাথরুমে একটা মোম রেখে আসি।”

আমায় দাঁড় করানো হলো ধীরে ধীরে।

পা ফেলা মাত্র আবারো ব‍্যাথায় কুকড়ে উঠি।লাগছে ভীষণ।পা ফেলতেই পারছিনা।

প্রলয় কিছু সময় ভেবে হুট করে কোলে তুলে নেয় আমায়।

আমি নিষেধ করারও সময় পাইনি।

একটা নাইট ড্রেস হাতে নিয়ে আমায় বাথরুমে নিয়ে যায়।

দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড় করিয়ে দেয় আস্তে করে।জামা বদলে নিতে বলে বেড়িয়ে যায় সে।

দরজায় একটু ফাঁক রেখে দেয়।

ততক্ষণে প্রলয় পোশাক বদলাচ্ছে।সঙ্গে আমার সাথে কথাও বলছে যেন আমি ভয় না পাই।

শাড়ি ছেড়ে গা হাত-পা কোনোমতে মুছলাম।

মাথায় আগে তোয়ালে পেচিয়ে নিলাম।গায়েও পেচিয়ে নিয়েছি।এবার যেইনা জামা নিতে এক পা বাড়িয়েছি,পায়ে প্রচন্ড ব‍্যাথা পেলাম।পা টা সরিয়ে নিতে পেছনে হেলে যেতেই মাথায় দেওয়ালের সঙ্গে ঠাস করে লাগে।

মাথা আমার ঘুরে গেল।

শব্দ শুনে প্রলয় এগিয়ে এলো।ওর তখন খালি গা।সবে টাওজার বদলেছে।

বাহির থেকে আমার নাম ধরে ডাকলো।

কোনো মতে দরজাটা খুলে ঐ অবস্থাতেই বাইরে পা রাখলাম।আবারো চোখে অন্ধকার দেখছি।

মাথা ঘুরে গেল।পড়ে যেতে নিলে প্রলয় ধরে ফেলে আমায়।

একটানে আমাকে ওর বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নেয়।

এরপর ধীরে ধীরে বিছানায় নিয়ে আসে।শুইয়ে দেয়। গা ঢেকে দেয়।তখনও কাঁপছি আমি শীতে।

প্রলয় ধীর স্বরে ডাকে আমায়,”প্রিয়তা?এই প্রিয়তা শুনছেন?”

‘হুম’ বলে উত্তর নেই কোনো মতে।

প্রলয় বলল,”আপনার তো শুকনো কাপড় পড়া উচিৎ।এইভাবে থাকলে শরীর খারাপ করবে।”

আমি চুপ রইলাম।প্রলয় বলল,”একটা কাজ করুন।

আমি আপনায় হেল্প করবো।আপনাকে বসিয়ে দিচ্ছি খাটে হেলান দিয়ে।

জামাও এগিয়ে দিচ্ছি।ঐপাশ ফিরে থাকবো আমি।আপনি বদলে নিন।”

প্রলয় এগিয়ে দেয় আমার পোশাক।

কোনো মতে পাল্টে নিয়ে খাটে হেলান দিলাম।পায়ের ব‍্যাথায় শরীর অসাঢ় হয়ে আসছে।

ওরনা নেই শরীরে।পাশেই রাখা আছে।

হাত বাড়িয়ে সেটা নিতে চেষ্টা করি।নাগাল পাচ্ছিনা।

প্রলয় এগিয়ে দেয় ওরনা।

মেডিসিন বক্স থেকে একটা পেইন কিলার এনে খাইয়ে দেয় আমাকে।

চুল দিয়ে পানি পড়ছে তখনও।

মাথার পাশে বসে সে।

তোয়ালে দিয়ে চুল মুছে দেয় ধীরে ধীরে।হঠাৎ প্রচন্ড শব্দে বিদ‍্যুৎ চমকায়।

আমি প্রলয়কে জাপটে ধরেছি। প্রলয় স্থির।

আমি শুনতে পাচ্ছি ওর বুকের হৃদস্পন্ধন।খুবই দ্রুত গতির তা।

ওর বুকের উষ্ণতা আমার পুরো শরীরকে যেন উষ্ণ করে দিচ্ছে।

প্রলয়ের শান্ত ডাক,”প্রিয়তা!”

চমকে উঠি আমি।

সরে আসি দ্রুত।ওর খালি গা।

ছি ছি!কী করছিলাম আমি!

লজ্জায় মাথা নুয়ে ফেললাম।

পেইন কিলার নিয়ে ব‍্যাথাটা একটু কম মনে হচ্ছে।

খাটে মাথা ঠেকিয়ে বসে তখনও।

প্রলয় উঠে গিয়ে শার্ট পড়লো।পড়ে এসে আমার সামনে বসলো।

বলল,”আপনি ছাদে ছিলেন কেউ দেখেনি?বাহির থেকে দরজা কে বন্ধ করলো?”

“আমি জানিনা।ছাদে কিছু কাপড় ছিল রিপার।সেগুলো সম্ভবত রিপাই তুলেছিল।কিন্তু ও আমায় দেখলোনা কেন?”

প্রলয় মাথায় দু-হাত চেপে কিছুক্ষণ চুপ রইলো।

এরপর বলল,”এটার বিচার কাল হবে।

আপনি অসুস্থ।শুয়ে পড়ুন।এখন আর কোনো ধকল নিতে হবেনা।”

প্রলয় যত্ন সহকারে শুইয়ে দিল আমায়।মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগে।

সুধালাম,”আমি যে ছাদে আছি এটা বুঝলেন কী করে?আপনিতো বাড়িতেই ছিলেন না।”

“বৃষ্টি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়িতে প্রবেশ করি।ঘরে দেখি আপনি নেই।ফোনে কল করলে ফোন অফ।সবাইকে জিজ্ঞেস করলাম,কেউ জানেনা আপনি কোথায়।

হঠাৎ ছাদের দিকে চোখ গেল।মনে হলো আপনি আমায় ডাকছেন।

আসলে কী জানেন,আমাদের মস্তিষ্কে,মনে যার কথা সবসময় চলে তার নিঃশ্বাসের শব্দও আমরা শুনতে পাই।”

আমি মুগ্ধ নয়নে প্রলয়ের দিকে তাকালাম।

এই মানুষটাকে মাঝেমধ্যে চিনতে আমার ভীষণ কষ্ট হয়।বুঝিনা এর মনে কী আছে।এই ভালো তো এই খারাপ।এই কখনো অপমান করে।কখনো বা যত্ন করে।

এনার মন বোঝা দায়!

এসব ভাবতে ভাবতে ঘুম পেয়ে যায় আমার।

চোখ বন্ধ করলাম।প্রলয় মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

আমার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে ও।

অনেকক্ষণ পর অনুভব করলাম আমার কপালে কারো ঠান্ডা পরস।

তখনো পুরো ঘুম হয়নি।

ওর ছোঁয়ায় আমার কেমন যেন অসাঢ় লাগে শরীর।ভালো লাগছে।

ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি আমি।অনুভব করছি প্রলয় আমার কানে কানে বলছে,”আমার প্রাণের প্রিয়তা।আপনাকে আমি ভীষণ ভালোবাসি।কখনো হারাতে চাইনা আমি আপনায়।”

ওর কথাগুলো আমার কানে বাজছে।কিন্তু জবাব দিতে পারছিনা।ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছি প্রতিনিয়ত।

এরপর প্রচন্ড জ্বর হয়েছে আমার।মাঝরাতে আমায় উঠিয়ে প্রলয় জ্বরের ঔষধ খাইয়েছে।

সারাটা রাত জ্বরের ঘোরে একটু উষ্ণতা খুঁজেছি আমি।প্রলয়ের বুকে ঠাই নিয়েছি।আতঙ্কে একটু পরপর শরীর আমার ঝাঁকুনি দিয়েছে।প্রলয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রেখেছে আমায় ওর বুকে।

উষ্ণতা পেতে ওর শার্টের প্রতিটি বোতাম খুলে ফেলেছি আমি।আজ আমাদের মাঝে কোনো দূরত্ব ছিল না।আমরা মিশে ছিলাম একে-অন‍্যের সঙ্গে।

সকাল আটটা বেজে যায় অথচ আমাদের ঘুম ভাঙার নাম নেই।

বাড়িতে চর্চা শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যেই।

আমার ঘুম ভাঙলো বেলা নটার দিকে।

ধীরে ধীরে চোখ মেললাম।

পাশ থেকে প্রলয় বলে উঠলো,”গুড মর্নিং মিসেস সরকার।আজ আপনাকে মিসেস সরকার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে।”

পাশে তাকাতেই দেখলাম আমি ওর খুবই কাছে।প্রলয় আধশোয়া হয়ে আমার দিকে ফিরে।

আমি ঠিক ওর বুক ছুয়ে।খালি গা ওর।আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে।

লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বললাম,”কী করছেন টা কী আপনি?শার্ট কেন পড়েননি?মাথা খারাপ হলো নাকি?”

প্রলয় মুচকি হেসে উঠে বসে।পাশ থেকে শার্টটা নিয়ে গায়ে দিতে দিতে বলে,”আমার এই অবস্থার জন্য আপনিই দায়ী।”

তখনই কিছু একটা মনে পড়ে লজ্জায় মুখ ঢেকে ফেলি আমি।

প্রলয় ঘরের জানালা খুলে দেয়।গা মোড়া দেয়।

এরপর বিছানায় বসে।

আমিও বসার চেষ্টা করি।পায়ে ব‍্যাথা এখনো আছে।

প্রলয় আমায় ধরে ধরে বসায়।

পায়ের ব‍্যান্ডেজটা ভালো মতো দেখে বলে,”একটু পর আপনাকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো।

নোংরা জিনিসে পা কেটেছে। ইনফেকশন হতে পারে।”

এই বলে উঠে দাঁড়ায় সে।দরজা খোলে।খুলে সবে বিছানায় বসেছে,ওমনি সব হাজির।

কবির ভাই ও আসছে মনে হয়।বাইরে কথা শুনছি।

প্রলয় মেঝে থেকে ওরনা কুড়িয়ে আমার গায়ে দিয়ে দেয়।

মা এসে বলেন,”ঘুম ভেঙেছে বাপ?

আমি তো ভেবেছি এই ঘুম আর ভাঙবেই না।একদম চিরনিদ্রায় চলে গেছিস।”

কোনো মা তার ছেলেকে এমন কথা বলতে পারে?

আমি না হয় পরের মেয়ে।প্রলয় তো তার ছেলে।ছেলের মৃ*ত্যু চাইতে মুখে বাধেনা?

সুমা আপু বলল,”প্রলয় নাহয় পুরুষ মানুষ বেলা অব্দি ঘুমোবে।তুমি কোন আক্কেলে বেলা বারোটা পযর্ন্ত ঘুমাও?”

মানে নটাকে বারোটা বানিয়ে ফেলেছে এরা।

রিপা বলছে,”বাড়ির বউ যদি বেলা দুটো অব্দি ঘুমায় তো সংসারে শান্তি থাকে?

উন্নতি থাকে?শুধু কী একা ঘুমিয়েছে?ভাইটাকেও বস করে রেখেছে।বউয়ের কথায় নাচে।কিছু বললেই ছ‍্যাৎ করে ওঠে ভাই।আগে এমন ছিলনা।ভাবি আসার পর ভাইয়ার এমন অবনতি।মা-বোনকে দেখতে পারেনা।আমাদের কথা শুনলেই তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে।”

বেলা বারোটা থেকে আবার দুটোয় নিল প্রথমত।

দ্বিতীয়ত আবার সব দোষ দিচ্ছে আমায়।বলি ওর ভাই কী নাদান শিশু যে আমি যা বলবো করবে?

মনের ভাবনার মাঝখানে কবির ভাই বলে উঠলো,”থামো তোমরা।কিছু না জেনেই জার্জ করা ঠিক না।মেয়েটা তো কখনো এমন করেনা।এসেছি থেকে দেখছি প্রিয়তা বেশ সকাল সকাল ওঠে।প্রলয়কে নাস্তা বানিয়ে খাইয়ে অফিসে পাঠায়।নিশ্চয় আজ কিছু হয়েছে এজন্য উঠতে দেরি।একদিন এমন হতেই পারে।ইটস নর্মাল।

প্রলয় এতোক্ষণ দেয়ালে হেলান দিয়ে সবটা শুনছিল।

এবার এগিয়ে আসলো সে।

বলল,”দোষ ধরা শেষ নাকি আরো বাদ আছে?

বাদ না থাকলে এবার আমি শুরু করি।

মা তুমি আমার মৃত্যু কামনা করলে।কিন্তু শকুনের দোয়ায় গরু মরে না। প্রকৃত মা কখনো তার সন্তানের খারাপ চাইতে পারেনা।সুতরাং তুমি যেই দোয়াটা করলে সেটা শকুনের দোয়াই আমার কাছে।

আর সুমা তুই কটায় উঠিস?সারাকাল দেখে এসেছি দশটা বা বাজলে ঘুম ছাড়েনা।শীতের সময় তো রোদ না উঠলে বেরই হতে চাসনা লেপ থেকে।আমার বিয়ের পর দেখছি কদিন সকালে উঠছিস।

তুই কী পুরুষ যে বেলা অব্দি শুয়ে থাকিস?

আবার এসেছিস অন‍্যকে জ্ঞান দিতে!

আর আমার আদরের ছোট বোন।কাজ তো বাদরের মতো।খুব বড়ো বড়ো কথা শিখেছিস দেখছি।

বউ আমার।বউয়ের কথায় আমি নাচবো নাকি গান গাইবো সেটা আমার বিষয়।তোকে কে নাক গলাতে বলেছে আমাদের মাঝে?তোদের কথা শুনলে আমি এমনি কী ছ‍্যাৎ করে উঠি?

পাঁচটা মানুষ তোদের কথা আর কর্মগুলো দেখলে এসে জুতা পিটা করে যাবে বিশ্বাস কর।

একটা মেয়ে অসুস্থ,বেলা করে উঠেছে।তাতেই পারলে মেয়েটাকে মৃত্যুদণ্ড দিস তোরা।যেন ও ঘুম থেকে নয়,খুন করে উঠেছে।তোরা নিজেরাতো একেক জনের অসুখ হলে খাওয়া আর বাথরুম যাওয়া বাদে টানা দুদিন বিছানা ছেড়ে উঠিস না।

প্রিয়তা তাও নটায় উঠেছে। ওর সঙ্গে যা হয়েছে,তাতে তোরা হলে এ বছরেও উঠতি কিনা সন্দেহ!”

মা বললেন,”ভদ্রভাবে কথা বল প্রলয়।কী ভুলটা বলেছি আমরা?কোন বাড়ির বউকে দেখিস কাজ ফেলে নটা অব্দি ঘুমায় স্বামী নিয়ে?কী এমন হয়েছে তোর বউয়ের?যে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেছে!”

“কী হয়েছে সেটাতো পড়ে বলছি।আগে বলো ছাদের দরজা কাল কে বন্ধ করেছে?”

পাশ থেকে রিপা বলল,”আমি।কেন কী হয়েছে?”

প্রলয় এগিয়ে গিয়ে ঠাস করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দেয় ওর গালে।

কর্কশ কন্ঠে বলে,”ছাদের দরজা লাগানোর সময় কী চোখ আকাশে রাখিস?জলজ‍্যান্ত একটা মেয়েকে ছাদে রেখেই দরজা বন্ধ করে দিলি?

অন‍্যদিন তো ছাদে গেলে গান গাইতে গাইতে গাছের পাখি উড়িয়ে দিস ভয়ে।ছবি উঠিস,কথা বলিস।এক ঘন্টা নাহলে নামিসই না।কাল কী হয়েছিল রে তোর?চোরের মতো ছাদে উঠে নেমে গেছিস।বলি কাল যদি ঐ ঝড়-বৃষ্টিতে প্রিয়তার কিছু হতো তখন কী হতো বল?

ওর বাবা-মা তোর চুলের মুঠি ধরে পুলিশকে দিয়ে আসতো।”

কবির ভাই বলল,”কী হয়েছে প্রলয়?খুলে বলো দেখি।”

প্রলয় সবটা বলল।

সব শুনে প্রত‍্যেকের মুখ হা।

কবির ভাই বিষ্ময়ের স্বরে বলল,”ওহ মাই গড!

এতো কিছু হয়ে গেছে এক রাতে?

থ‍্যাঙ্কস গড প্রিয়তার কিছু হয়নি।

রিপা তুমি যে এমন অবিবেচকের মতো কাজ করবে ভাবতে পারিনি।”

রিপা কাঁদতে কাঁদতে বলল,”আমি জেনে বুঝে করেছি নাকি!

সন্ধ‍্যা হয়ে আসছিল এজন্য তাড়াহুড়ো করে কাপড় তুলে দরজা লাগিয়ে চলে এসেছি।”

মা বললেন,”শোন প্রলয় আমার মেয়েকে দোষ দিবিনা।কে জানতো তোর বউ ভরসন্ধ‍্যায় ছাদে গিয়ে বসে থাকবে?

নতুন বউ হয়ে ওর ওমন ভরসন্ধ‍্যায় ছাদে কেন যেতে হয় কাউকে না জানিয়ে?”

প্রলয় এবার দমে গেল কিছুটা।

কড়া চোখে রিপার দিকে তাকিয়ে বলল,”এরপর থেকে ছাদ লাগানোর আগে চেক করে লাগাবি।

আর প্রিয়তা আপনি,ছাদ লাগানোর সময় ছাদে যাবেননা কোনো দরকার ছাড়া।”

এই বলে হনহন করে চলে গেল সে।

*আমি নিয়মিত হওয়ার চেষ্টা করবো এরপর থেকে।*

ইবই,,,ওর রুপ আমায় মুগ্ধ করেছে। ওর চোখের পানি আমার আগুন হৃদয়কে শান্ত করেছে। ওর অসহায় দৃষ্টি আমার বুকে ঢেউ তুলেছে। ওর কন্ঠ আমায় পাগল করেছে। ওর রেশমি কালো চুল আমার মন কেড়েছে। ওর নমনীয়তা আমায় ধ্বংস করেছে ফাহিম। ভালোবাসার জন্য আর কী চাই বল?”

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply