#প্রণয়ঘোরের_সন্ধিতে
#লেখনীতে_সালমা_চৌধুরী
(৩০)
নৌমি দাঁত দিয়ে জিভ কেটে আড়চোখে তাকাল। তাজের আব্বুর গুরুগম্ভীর চেহারা দেখে মলিন হাসল। অতঃপর মোলায়েম কণ্ঠে বলল,
” মামা, আমি তো মজা করছিলাম।”
” সব বিষয় নিয়ে মজা করা একদম ঠিক না।”
নৌমি টিভি বন্ধ করে ওঠে দাঁড়াল। শীতল কণ্ঠে বলল,
” সরি, মামা। আমি বুঝতে পারি নি।”
“বসো।”
নৌমি সহসা বসে পড়ল। তাজের আব্বুও সোফায় এসে বসলেন। কণ্ঠ নরম করে বললেন,
” তাজ আর তোমার মধ্যে কি কোনো ঝামেলা হয়েছে?”
” কই না তো।”
“ওইযে ঘুরতে গেলে। বিপদে পড়ে রাতে থাকলে কোথাও! সেখানে কি কোনো সমস্যা হয়েছিল?”
” না মামা। কোথাও কোনো সমস্যা হয় নি। “
” আমারও তাই মনে হয়েছিল। ওখান থেকে ফেরার পরও তাজকে বেশ হাসিখুশি মনে হয়েছিল। তাহলে হুট করে ওর কি হলো৷ তাজ তো এভাবে বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার ছেলে না। আর সবচেয়ে বড় কথা। তাজ যেখানেই যায় ও আমাকে অন্তত কল করে।”
নৌমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,
” মামা, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। ভাইয়ার কিছুই হবে না। দেখবেন খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবে।”
” আমিও তাই চাই। সাথে এটাও চাই খুব তাড়াতাড়ি যেন তোমাদের বিয়েটা দিতে পারি৷ আমার আত্মীয়স্বজন দূরে দূরে না থাকলে আমি আগামী শুক্রবারই তোমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতাম। তাছাড়া তাজের এই অবনতির কথা জানলে শুভ্ররা দেশে থাকতে থাকতেই ঘরোয়াভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানটা সম্পন্ন করে ফেলতাম।”
নৌমি মাথা নিচু করে কোমল গলায় বলল,
” আমি এখন বাসায় যাই।”
” হুম যাও। আর হ্যাঁ, তুমি যদি তাজের খোঁজ পাও তবে সবার আগে আমাকে জানাবে। ঠিক আছে?”
” জি মামা।”
নৌমি বাসায় ঢুকে কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে সোজা নিজের রুমে চলে গিয়েছে। এতক্ষণ কল্পনায় ফানি বিষয় আসলেও এবারের কল্পনা ভিন্ন। নৌমির মনে আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে। নিলু তাজের বউ কিংবা তাজের পাশে নিলু বউ সেজে দাঁড়িয়ে আছে বিষয়টা কোনোভাবেই কল্পনা করতে পারছে না। ক্ষনিকের জন্য নিলুকে অসহ্য লাগছে। তাজের সাথে দূরত্ব, দেখা না হওয়া, কথা বলতে না পারাটা বুকের ভেতরের অস্থিরতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এক মুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছে,
” নিলু নামক চ্যাপ্টারটা তাজের জীবনে না থাকলেই বোধহয় বেশি ভালো হতো।”
হঠাৎ টেবিলের উপর থাকা ফোনটা বাজতে শুরু করেছে। নৌমি হাত বাড়িয়ে ফোনটা কাছে আনলো। শুভ্র কল দিচ্ছে। নৌমি আগপাছ না ভেবেই কল রিসিভ করল। অস্থির কণ্ঠে আওড়াল,
” তামজিদ ভাইয়ার খোঁজ পেয়েছো?”
” না। তোমার থেকে পাবো ভেবে কল দিয়েছিলাম।”
” আমি জানি না। হয়তো নিলু আপু জানে।”
” হয়তো বা।”
নৌমি তপ্ত স্বরে বলল,
” আমার মনে একটা কথা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছে৷ কাউকে শেয়ারও করতে পারছি না। তোমাকে বলব?”
” হ্যাঁ বলো।”
“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তামজিদ ভাইয়া নিলু আপুকে বিয়ে করে নিয়েছে। তোমরা থাকাকালীন শুনে গেলে না, আমাদের বিয়ের কথা হচ্ছে। এরকম আলাপআলোচনা প্রায়ই হয় ও বাড়িতে। মামা অসুস্থ তাই আমি কথা বলে মামার মনে আঘাত দিতে চাইনা। তামজিদ ভাইয়াকে কয়েকবার বলেছি, মামাকে বলার জন্য৷ কিন্তু ভাইয়া সেটাও করছে না। হয়তো ভাইয়াও টেনশনে আছে মামাকে নিয়ে। কিন্তু পরিস্থিতি দিনকে দিন খারাপ হচ্ছে। তামজিদ ভাইয়ার এহেন আচরণে মামা- মামি দু’জনেই বেশ বিরক্ত। এর ফলস্বরূপ পরিস্থিতি কোনদিকে যাবে বুঝতে পারছি না। ভাইয়া বউ নিয়ে হাজির হলে কি হবে সেটায় ভেবে পাচ্ছি না। যোগাযোগ ছাড়া আরও ৪-৫ দিন কেটে গেলে দেখা যাবে নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তিতে ভাইয়ার ছবি আর নাম ছড়াবে। আর পুলিশের মাধ্যমে খুঁজে পেলে ধরে এনে জোর করে আমার সাথে বিয়ে দিবেন। তখন আমার কি হবে!”
শুভ্র হঠাৎই মুচকি হাসল। মিষ্টি সুরে বলল,
“তুমি তখন আমার কাছে চলে আসবে। সমস্যা কি!”
” হুম। সেটায় করতে হবে। কিন্তু আমার যে পাসপোর্ট নেই।”
শুভ্র কৌতূহলী কণ্ঠে বলল,
” তুমি সত্যি আসতে চাও? তাহলে আমি এসে সব ব্যবস্থা করে দিব। তারপর তোমাকে নিয়ে একবারে চলে আসবো।”
নৌমি ভ্রু কুঁচকে জবাব দিল,
” আমি পার্মানেন্টলি যাওয়ার কথা ভাবছি না। আর ভাববোও না কখনও৷ আমি শুধুমাত্র এই পরিস্থিতিটার থেকে বের হতে চাচ্ছি।”
শুভ্র স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,
” আমার কাছে আরেকটা প্ল্যান আছে।”
” সেটা কি?”
” তুমি মাইন্ড করবে না তো?”
“না। বলো।”
” যদিও আমার মনে হয় না তাজ নিলুকে নিয়ে ফিরবে। তবে অবশ্যই ফিরবে। আর যদি ধরেও নেই নিলুকে বিয়ে করে ফিরবে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে তুমি বলবে, তুমি আমাকে ভালোবাসো।”
নৌমি গর্জে ওঠে,
” তোমাকে?”
” আরে সত্যি সত্যি না বাসলে মিথ্যা মিথ্যায় না হয় বললে। তাজ আর নিলুর সম্পর্কটা বাড়িতে স্বাভাবিক করতে হলে তোমাকে সরে যেতে হবে। তার একমাত্র উপায় হিসেবে আমার নাম ব্যবহার করতে পারো। আমি দেশে নেই। তাই কোনোরকম চাপও নেই। চাচ্চু আমাকে কল দিলে আমি গুছিয়ে কিছু একটা বলে দিব। তোমার কোনো সমস্যা হবে না।”
নৌমি তৎক্ষনাৎ বলল,
” না ভাই। আমাকে মাফ করে দাও। তামজিদ ভাইয়ার অত্যাচারে বাঁচতেছি না। এখন আবার তোমার নাম নিয়ে বিপদে পড়তে চাই না। এখন রাখছি। ভালো থেকো।”
শুভ্র কিছু বলতে যাচ্ছিল। তারমধ্যে নৌমি কল কেটে দিয়েছে। শরীর-মন দুইটায় অত্যধিক খারাপ। কিছুই ভালো লাগছে না। শুয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবছে। কিন্তু চোখের সামনে বারবার তাজের হাস্যোজ্জল মুখটায় ভেসে ওঠছে। তাজের এই দূরত্ব নৌমিকে পদে পদে মনে করিয়ে দিচ্ছে, নৌমি তাজকে ঠিক কতটা মিস করে। একসাথে থাকে, সামনাসামনি হলেই ঝগড়া করে মানে এই নয় তাদের মধ্যে কোনো অনুভূতি নেই।
★
আকাশের কিনারায় হালকা লালচে আলো ফুটেছে। ক্ষণে ক্ষণে লালচে আলো গাঢ় হতে শুরু করেছে। ঘড়িতে তখন সকাল ৮ টা বেজে ২৭ মিনিট।
তাজদের বাড়ি থেকে হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ শুনা যাচ্ছে। আন্নিও ওই বাড়িতেই আছে। নৌমির আম্মু নৌমিকে ডেকে ডেকে ওনিও চলে গিয়েছেন। এদিকে নৌমি বিছানায় শুয়ে রুমের দেওয়াল ঘড়িটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। সেকেন্ডের কাটা ঘুরেঘুরে মিনিটের কাটা অতিক্রম করছে সেই যাত্রায় দেখছে সে। আম্মুর ডাকাডাকি, ওই বাড়ি থেকে আসা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ কোনোকিছুতেই বিন্দুমাত্র মনোযোগ নেই। সকাল সবার মনে অজানা প্রশান্তি আনে অথচ নৌমির মনে হচ্ছে প্রতিটা সকাল ওর মনে নতুনভাবে অশান্তির সৃষ্টি করছে। এই অশান্তি মুখে প্রকাশ করার সাধ্য নেই অথচ ভেতরটাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে।
অকস্মাৎ রাফি উঁচু গলায় ডাকল,
” নৌমি আপু, দেখে যাও কে এসেছে।”
নৌমি ঝটপট করে ওঠে বসল। জানালা থেকে পর্দা সরিয়ে ঘুমঘুম কণ্ঠে আওড়াল,
” কে এসেছে?”
” তোমার তামজিদ ভাইয়া।”
মুহুর্তেই নৌমির দু’চোখের তারাগুলো ঝলমলিয়ে ওঠেছে। বুকের বাঁ পাশটা অস্বাভাবিক কম্পন শুরু হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিতভাবেই ঠোঁটে হাসি ফুটেছে। যে হাসি মেঘাচ্ছন্ন আকাশেও রঙধনু ফুটাতে সক্ষম। নৌমি এক ছুটে ওয়াশরুমে ঢুকল। ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে কোনোমতে মুখটা মুছেই ছুটল নিচে৷ একটা একটা করে সিঁড়ি অতিক্রম করছে আর মনের ভেতর ভয় ঢুকছে। প্রশ্ন জাগছে মনে,
” তামজিদ ভাইয়া কি একা এসেছে? নাকি নিলু আপুকেও সঙ্গে নিয়ে এসেছে।”
কয়েকটা সিঁড়ি নামার পরপরই চোখেমুখের উজ্জ্বলতা বিলীন হতে শুরু করেছে। নিচতলায় নেমে দু-টানায় পড়েছে। যাবে কি না ঠিক ভেবে ওঠতে পারছে না৷ এদিকে রাফি, আন্নিদের ডাকে বাধ্য হয়ে বেরিয়ে গেল৷ গতিহীন চলন, শান্ত মুখের মলিন হাসি নিয়ে উপস্থিত হলো তাজদের ড্রয়িং রুমে। তাজ সোফায় বসে আছে৷ সামনেই তাজের আব্বু আর চাচ্চু বসা। মা-কাকিমাও পাশেই আছেন। বাকি ভাইবোনেরা ঘিরে আছে তাকে। তাজকে একা দেখে নৌমির বুকের ভেতর থেকে প্রশান্তির নিঃশ্বাস বেড়িয়ে এলো। ঠোঁটের কোনে স্নিগ্ধ হাসি ফুটল। কোমল পায়ে এগিয়ে গেল সোফার কাছে। নৌমি স্বাভাবিক কণ্ঠে আওড়াল,
“ভাইয়া, কেমন আছো?”
তাজ শুনেও না শুনার ভান করে রইল। বাকিদের কথার জবার দিলেও নৌমিকে নিখুঁতভাবে এড়িয়ে গেল। নৌমি কিছু সময় চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। বুকটা অস্বাভাবিকভাবে কাঁপছে। কেন কাঁপছে কে জানে!
তাজের আব্বু বললেন,
” নৌমি, তাজের পাশে বসো।”
মামার আদেশ মতো নৌমিও তাই করল। তাজের পাশে বসতেই তাজ অতর্কিতে সরে বসল। নৌমি কথা বলতে পারছে না। একটু পরপর আড়চোখে শুধু তাজের দিকে তাকাচ্ছে। তবে তাজ একবারের জন্যও নৌমিকে দেখছে না।
Share On:
TAGS: প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে, সালমা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৮
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২০+এক্সট্রা
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ২২+বর্ধিতাংশ
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৫
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৭
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১০
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ৩১
-
প্রণয়ঘোরের সন্ধিতে পর্ব ১৯