#পদ্মপ্রিয়া
#ঈশিতা_রহমান_সানজিদা
‘তোর লাজ লজ্জা সব কি নদীর স্রোতে ভেসে গেছে? বাপের সামনে কি সব কথাবার্তা বলছিস? এখন আমার বিরক্ত লাগতেছে।’
আজমাঈন বিনীত স্বরে বলে,’ভুল কিছু বলেছি? পায়ের তলায় কাটেনি তো?’ পাজামা টাকনুর উপরে তুলে দেখায়,’এই দ্যাখ!! হাঁটতে মোটেও অসুবিধা হবে না। শুধু ভাঁজ করে বসতে গেলে ব্যথা করবে। সামান্য কারণে বিয়ের মতো প্রয়োজনীয় অনুষ্ঠান বন্ধ করা মোটেও ঠিক হবে না।’
আজমল শিকদার বলেন,’ছেলে আমার কতবড় দায়িত্ববান ব্যক্তি হয়ে গেছে। অনেক বেশি বুঝে গেছে।’
আজমাঈন কাচুমাচু হয়ে উঠে বসে। ভ্রু নাচিয়ে ফয়েজ কে বাপের অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করতে বলে। ফয়েজ পারে না, আজমল শিকদারের মন বহুত শক্ত এবং লুকায়িত। তিনি কখন কি ভাবেন তা আল্লাহ ব্যতীত কেউই জানে না। ওকে যখন ফোন করে খবরটা দিল তখন কন্ঠস্বর কেমন কাঁপছিল। তাই ভেবেছে কি না কি হয়ে গেছে। ছুটে এসেছে, কিন্তু এসে বাপ ছেলের হাঙ্গামা দেখতে হচ্ছে। বাড়িতে কত কাজ রয়েছে, সব ফেলে ছুটে এসেছে বেচারা। আর সেই বন্ধু চটাস চটাস করে কথা বলছে। এখন আর দেরি করা যাবে না। একটু পায়েস মুখে দিয়েই সে বেরিয়ে পড়েছে।
তবে আজমাঈনের কড়া হুঁশিয়ারি, রাশেদ সাহেব কে যেন কিছু না জানানো হয়। উনি যেমন প্রকৃতির মানুষ, দেখা গেল বিয়েটা পিছিয়ে দিল। আজমাঈনের কথা বিয়ে তো করতেই হবে। পেছানোর দরকার কি তাতে? এইতো দিব্যি হাঁটতে পারছে। চেষ্টা করলে দৌড়াতে পারবে সে। অযথা সবাই চিন্তা করছে। তবে যার জন্য এতকিছু হলো তার কোন প্যারা নেই। সে ঘটা করে সবাইকে কাহিনী বলতেছে।
বাড়ির গেইট পেরিয়ে কয়েকজন কে হাত ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে। তবে আইশা আরেকটা কাজ করে ফেলেছে। তা হলো নূরকেও জানিয়েছে, তবে মেসেজে। এখনও নূর দেখেনি ওর মেসেজ। সে তো রান্না ঘরে সাহায্য করছে। তবে অনুপমা এখন তাকে কিছু করতে দিচ্ছে না। অগত্যা দাঁড়িয়ে রয়েছে সে। অনুভব হুট করে এসে বলে,’দাদুভাই তোমাকে ডাকছে ফুপি।’ অতঃপর মায়ের দিকে তাকিয়ে নূরকে ইশারায় বোঝায়, সালামি চায়। নূরও ইশারায় বলে সে ফোনে পাঠিয়ে দিয়েছে। অনুভব খুশি মনে চলে যায়।
নূর বাটিতে সামান্য একটু পায়েস আর পানি নিয়ে বাবার কাছে যায়। রেহানা আজ বাইরে গেছেন, ওনার বান্ধবীর বাড়িতে। প্রতিবারই যাওয়া হয়। আজ অবশ্য বিশেষ কারণ আছে। আগামীকাল মেয়ের আকদ হবে। অন্তত কিছু সংখ্যক আত্মীয়দের তো দাওয়াত দিতে হবে।
নূর সেন্টার টেবিলে ট্রে রাখে, মেডিসিনের বক্স কোলে নিয়ে বসে। খাওয়ার আগের ওষুধ গুলো বের করতে করতে বলে,’সকালে তো তাড়াহুড়া করে চলে গেলে। এখন দেরি করে ওষুধ খাও।’
রাশেদ সাহেব হাসেন,’ঈদের মত পবিত্র এবং খুশির দিনে অসুখ বাড়ে না রে মা। একদিন দেরি করে ওষুধ খেলে কিছু হবে না।’
নূর অসন্তুষ্ট চোখে ওষুধ গুলো হাতে দিয়ে বলে, ‘সুগার কন্ট্রোলে আছে তাই একটু খাবে।’
পায়েস দেখে খুশিতে মনটা ভালো হয়ে যায় রাশেদ সাহেবের। কেমন বাচ্চাদের মত করে উঠেন। এক চামচ মুখে দিয়ে বলেন,’আহা!! কতদিন বাদে খেলাম। তোর হাতের রান্নার স্বাদ অমৃত।’
নূর চোখে হাসে, এমনিতেও ওর হাসি মুখ রাশেদ সাহেব ব্যতীত কেউ দেখনি। এই মানুষটার সামনে মন খুলে হাসতে পারে মেয়েটা। মনের কথা গুলো উজাড় করে দিতে পারে। প্রতিটা পদক্ষেপে এই মানুষটার সঙ্গ না পেলে কেমন দম বন্ধ হয়ে যায়। নূর মুচকি হেসে বলে,’মেহমান আসবে তাই বানিয়েছি। তোমার জন্য সামান্য এনেছি, এরপর আর খেতে পারবে না।’
রাশেদ সাহেব মাথা দুলিয়ে আরেক চামচ মুখে তোলেন। হঠাৎ করে নূর কেমন অন্যমনস্ক হয়ে যায়। আগামীকালের পর কি হবে ওর জীবনে তা জানে না। একটা সম্পর্কের বিচ্ছেদ কি এতই সহজ, তাও বাবা মেয়ের? রাশেদ সাহেব হয়তো মেয়ের মনের কথা বুঝলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,’তুই খুশি তো মা?’
‘তোমার খুশিতেই আমি খুশি।’
রাশেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘একজন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করছি। আর কতটা দায়িত্ব পালন করতে হবে জানি না। কিন্তু ছেলেটা সত্যি খুব ভালো। আমার অবর্তমানে তোর খেয়াল রাখবে, তোকে বুঝবে।’
মাথা তুলে দেখেন মেয়ে তার নিঃশব্দে কাঁদছে। চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে গাল বেয়ে। রাশেদ সাহেব নিজেকে সংযত রাখেন। বলেন,’কাদছিস কেন? তোকে তো কাল নিয়ে যাবে না। আমি এত তাড়াতাড়ি যেতে দিচ্ছি না।’
নূরের চাহনি অন্যরকম হয়ে গেল, রাশেদ সাহেবের এক হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রাখলো। ফুঁপিয়ে উঠে বলে,’এই বিচ্ছিরি নিয়মটা কেন তৈরি হলো বলতো?’
মেয়ের সামনে বাবারা কখনো ভেঙে পড়ে না। রাশেদ সাহেব ও নিজেকে ধরে রাখলেন। মাথায় হাত রেখে বলেন,’ওভাবে বলতে নেই। সব মেয়েদের স্বামীর ঘরে যেতে হয়। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্য করেন।’
নূর মাথা তুলে বলে,’তোমার আমার দূরত্ব! ভালোর জন্য হচ্ছে বলছো?’
‘এভাবে বলতে নেই, তোকে বোঝানোর কিছু তো নেই। সব জেনেও বাচ্চামো করতে নেই।’
তবে নূরের বাচ্চামো গেল না। সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,’আমি যেখানেই যাব তুমি আমার সাথে যাবে। নাহলে আমি কোথাও যাবো না।’
বলতে বলতে রুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। রাশেদ সাহেব শান্ত চোখে মেয়ের প্রস্থান দেখলেন। নিজের ভেতরের ঝড়টা বাইরে আসতে দিলেন না। তবে খেয়াল করলেন চোখ জোড়া ভিজে এসেছে। চশমা চোখে থাকা অবস্থায় ঝাপসা দেখছেন। আগামীকাল তিনি কিভাবে নিজেকে সামলাবেন ভাবতে লাগলেন। কোনভাবেই মেয়েকে চোখের পানি দেখানো যাবে না।
—————-
সময় গড়ালো, পশ্চিম আকাশে সূর্য ডুবে ফের পূবে উঁকি দিলো। তার আগে নূর ফজরের নামাজ আদায় করে কোরআন তেলাওয়াত করলো। মোনাজাতে অনেকক্ষণ বসে দোয়া করেছে সে। আজকের দিনটা নিয়ে সংশয়ে আছে নূর, জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটা দিন। সবকিছু যেন ভালোভাবে হয়। গতকাল রুমে যাওয়ার পর আর বের হয়নি। সাহারার শ্বশুর বাড়ির সকলে এসেছিল, আজমাঈনরা এসেছিল কিনা জানে না সে। সাহারার সাথেও দেখা হয়নি। মন মেজাজ ভালো নেই, এজন্য হয়তো কেউ ডাকেনি। অনুপমা এসে ওকে নিয়ে গেল। খাবার টেবিলে বসিয়ে বললো,’তোমার জন্য কাউনের পায়েস বানিয়েছি, খেতে পছন্দ কর তো।’
নূর একবার রাশেদ সাহেবের দিকে তাকায়। ওনার চোখে মুখেও বিষ্ময়। মেয়েকে ইশারা দিতেই নূর মাথা নাড়ে। চুপ থাকতেও বলে, ঝামেলা করার দরকার নেই। সাইমন আজ বাবার সাথে বিয়ে নিয়ে কথা বলছে। কোন কোন আত্মীয় আসবে এবং কি কি খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি। রেহানা বলেন, ‘তুই বাবার সাথে যা, কি কি বাজার করা লাগবে দেখে আয়। মাছ মাংস বাদে সবই কেনা আছে। তোর বাবা ভালো বুঝবে না। তাজা মাছ মাংস কিনে আনিস।’
রাশেদ সাহেবের কিছু বলতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু ওই যে মেয়ে না করেছে। তাই তিনি শান্ত আছেন। তবে তিনি গতকাল সবকিছু অর্ডার করে রেখেছেন। এখন কাউকে কিছু করতে হবে না। তাই স্বাভাবিক ভাবে বলেন,’অতো কষ্ট করতে হবে না। আমি সবকিছু অর্ডার করে রেখেছি। এখন দেখে শুনে রিসিভ করলেই হলো।’
সাইমন আশ্বাস দেয়, সে সবকিছু দেখে রাখবে।
আজমাঈনদের বাসা থেকে বের হতে হতে এগারোটা বেজে যায়। নারায়ণগঞ্জ যেতে দেড়ঘন্টা সময় লাগবে যদি ট্রাফিক জ্যাম না থাকে। জুমার নামাজের পর বিয়ে পড়ানো হবে। সাথে আজমল শিকদার, আইশা তানাজের হাজবেন্ড এবং বড় মামা যাচ্ছেন। যদিও মামাদের পরিবারের সবাই খুঁতখুঁতে স্বভাবের। বড় মামা তো দোষ ধরার একজন। এজন্য ওনাকে সাথে নেওয়ার ইচ্ছা ছিলো না। মায়ের জোড়া জুড়িতে সাথে নেওয়া।
আজমাঈনের পায়ের ব্যথা কমেছে, তবে তাড়াতাড়ি হাঁটতে গেলে পায়ে টান লাগে। ধীরে সুস্থে হাঁটতে হয়। গাড়ি সে চালাচ্ছে না। তানাজের হাজবেন্ড রাফিন চালাচ্ছে। আজমাঈনের উপর সে ভরসা করতে পারছে না। গাড়ি গন্তব্যে পৌঁছায় পৌনে একটায়। ফয়েজের পরিবারের সদস্যরা আরো আগে পৌঁছে গেছে। লনের একপাশে রান্না হচ্ছে অতিথিদের জন্য। ফয়েজ সবাইকে ভেতরে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসায়।
আজমাঈনকে একদম অন্যরকম লাগছে। সাদা পাঞ্জাবি গায়ে, বাম হাতে সিলভার কালারের ঘড়ি গায়ে আতর মেখেছে। যার সুগন্ধ চারিদিক ভেসে বেড়াচ্ছে। বসার পর সবাইকে শরবত মিষ্টি পরিবেশন করা হলো।
আইশা চুপচাপ বসে রইল না। সে দৌড়ে গেল নূরের ঘরে, হাতে তার লাগেজ। এক প্রকার টেনে টুনে নিয়ে গেল। কাউকেই ধরতে দিলো না। দরজায় টোকা দিতেই নূর খুলে দিল। মাত্র ওযু করে বের হয়েছে। নামাজ পড়তে দাঁড়ানোর আগেই আইশা চলে এসেছে। ও লাগেজ সহ ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলে, ‘তোমাকে রেডি করানোর দায়িত্ব আমার।’
নূর জবাব দিলো,’এখনও নামাজ পড়িনি।’
আইশা খাটের উপর বসে হাঁফ ছাড়ল,’হাতে যথেষ্ট সময় আছে। এখন সবাই নামাজ পড়তে যাবে তারপর বিয়ে। তুমি নামাজ পড়ো আগে। তারপর রেডি হবে কেমন?’
‘রেডি হব মানে?’
আইশা বললো,’ঘাবড়ে যেও না, রেডি হবে মানে বোরকা পড়বে। বিয়ে তো মসজিদে হবে।’
‘ওহ।’ ছোট্ট করে জবাব দেয় নূর। আর কথা না বাড়িয়ে নামাজ শেষ করে। পরনে একটা সুতি কামিজ, ওড়না দুপ্যাচ দেওয়া মাথায়। আইশা ততক্ষণে লাগেজ খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফেলেছে। নূরকে সব দেখিয়ে বলে,’তোমার পছন্দ তো জানি না তাই আপাতত এসব কিনেছি, এরপর তুমি সাথে যাবে বুঝেছ?’
নূর তাকিয়ে দেখে নিলো সবকিছু। কতগুলো বোরকা এনেছে গোনা গেল না। গাউন কামিজেরও একই দশা। তবে দু প্যাকেট আতর দেখতে পেলো। এর ভেতরে বারোটা বোতল রয়েছে। আগেরবার দিয়েছিল। নূর কিছুটা হতভম্ব হলো। এতগুলো আতর কেনার কোন মানে হয়! লাগেজের একপাশে দু’টো জায়নামাজ এবং তসবি দেখতে পেলো। তাছাড়া নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র রয়েছে। নূর আর সেদিকে তাকায় না। সে চুপচাপ বসে রয়। পরার জন্য একটা কালো বোরকা হাতে তুলে নেয়।
মসজিদে সকলে উপস্থিত, উৎসবমুখর পরিবেশ। ইমাম সাহেব খুতবা দিচ্ছেন। সকলে চুপ করে শুনছেন। আজমাঈন ফয়েজের পাশে বসেছে। ফয়েজ ওর হাত ধরে বসে আছে। আসার পর পায়ের অবস্থা সম্পর্কে জেনেছে। অবশেষে ঘাড়ত্যাড়া টা বিয়ে করেই ছাড়লো।
নামাজ শেষে সবাই থেকে গেল। আত্মীয়ের বাইরে যারা এসেছিলো তাদের সবাইকে বিয়েতে শামিল হওয়ার আহ্বান জানালেন রাশেদ সাহেব। তিনি চান সবাই যেন নূরকে দোয়া করে যায়। বাড়ির পাশেই মসজিদ, আলাদা কক্ষ তৈরি করে রাখা আছে মসজিদে। রাশেদ সাহেব নিজে গেলেন নূরকে আনতে। আইশা সুন্দর করে নেকাব বেঁধে দিয়েছে। ও নিজেও হিজাব পড়েছে আজ। সাহারা ও আইশা নূরের সাথে গেল। ছেলে মেয়েকে আলাদা বসানো হলো। আইশা ওর হাতের লাল রঙের ওড়না নূরের মাথায় পরিয়ে দিলো। সাহারা বললো,’এবার ঠিক আছে, লাল ছাড়া বিয়ে জমে না।’
আইশা ঠোঁট চেপে হাসে। বলে,’ভাইয়া বলেছে, আমার মাথায় এত বুদ্ধি আসে না বাবা।’
সাহারাও হাসল তবে নূর কেন জানি হাসতে পারে না। নেকাবের আড়ালে থাকা চোখদুটো রাশেদ সাহেব কে খুঁজছে। কিছুক্ষণ বাদেই ইমাম সাহেব ওয়ালি এবং সাক্ষী নিয়ে হাজির হলেন। এতক্ষণ পর রাশেদ সাহেব কে দেখতে পেয়ে নড়েচড়ে বসে নূর। কিছু বলতে চেয়েও বলে না। এত মানুষের সামনে কেঁদে কেটে অস্থির হতে সে পারবে না। কিন্তু কবুল ওর মুখ থেকে বের হচ্ছে না কেন যেন! ইমাম সাহেব চেয়ে আছেন কন্যার সম্মতির জন্য। অথচ হবু বউ কাঁপছে, সাহারা শক্ত করে হাত চেপে ধরে আছে। নূরের কাঁপুনি ও টের পাচ্ছে। আরেকটু হলেই মেয়ে তার কেঁদে ভাসাবে ভেবেই তিনি দ্রুত মেয়ের হাত ধরে ওর পাশে বসেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলেন, ‘এইতো আমি আছি, তোর কোন সমস্যা হবে না!’
আমি আছি, এতটুকু বলাতেই নূরের মনে প্রশান্তি বয়ে গেল যেন। সে চেষ্টা করলো নিজেকে স্বাভাবিক রাখার। কম্পিত গলায় নিচু কন্ঠে বললো, ‘আলহামদুলিল্লাহ কবুল।’ সবাই খুশিমনে ফিরে গেল। ছেলের থেকে আগেই সম্মতি নিয়ে এসেছেন। আজমাঈন এক সেকেন্ড সময় লাগিয়েছে কবুল বলতে। সেখানে মেয়ে তো মিনিট দশেকের মতো সময় লাগিয়েছে। অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছে না আজমাঈনের। ইমাম সাহেব কে ফিরতে দেখেই হাসির ফোয়ারা ঝরলো ওর মুখে। তারপর মোনাজাত শেষে খেজুর ছিটিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হলো। সবাই নব দম্পতির জন্য দোয়া করে ফিরে গেল। বাড়ি ফেরার সময়টুকুতে রাশেদ সাহেবের হাত ছাড়লো না নূর। ধরেছে তো ধরেছে, ছেঁড়ে দিলে বুঝি এখনই হারিয়ে যাবে। আজমাঈন ফিরলো ওদের পিছু পিছু। ফয়েজ কে ডেকে বলে,’নিয়ম অনুযায়ী বাবা মেয়েকে আমার হাতে তুলে না দিয়ে নিজেই নিয়ে যাচ্ছে। একটু ভুল হলো না? কোথায় তুই শুধরে দিবি। তা না করে চুপচাপ হাঁটছিস।’
ফয়েজ নিচু গলায় বলে,’বেশি কথা বাড়াস না, এমন চটকানা মারব যে কিছুক্ষণ আগে বিয়ে করেছিস, সেটা ভুলে যাবি।’
আজমল শিকদার ছেলেকে টেনে ধরে বলেন,’বিয়ে করতে এসছিস, বেশি গুজুর গুজুর করলে লোকে মন্দ বলবে।’
‘নানা ভাই বেঁচে থাকা অব্দি পর্যন্ত তোমাকে খারাপ বলে গেছেন, বিয়ে করতে গিয়ে কি তুমিও এমন করেছিলে নাকি?’
চোখ পাকিয়ে তাকান আজমল শিকদার,’তোরে বিয়ে করানোই ভুল হয়েছে আমার। খাওয়া দাওয়ার পর তোকে বাড়িতে নেওয়ার ব্যবস্থা আমি করছি।’
আজমাঈন আঁতকে উঠলো, বেচারা বিয়ে করলো অথচ বউকে একবার চোখের দেখা না দেখেই চলে যাবে। এতো অসম্ভব ব্যাপার স্যাপার। সে হাত জোড় করে ইশারায় থামতে বললো। আজমল শিকদার ভাব দেখিয়ে শালার সাথে কথা বলতে বলতে সরে গেলেন।
আজমাঈনের মুখের ভঙ্গি দেখে হাসি পেলো ফয়েজের। খ্যাক খ্যাক করে হেঁসে উঠতেই বাকি সবাই সেদিকে তাকায়। ফয়েজ চুপ করে যায়, তবে মুখে হাত চেপে হাসে।
খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলো। সবাই বাইরে বসে গল্প গুজব করছে। বাড়ির ভেতরে মহিলারা মিলে কিছু নিয়ম কানুন মানছেন। আজমাঈন কে ভেতরে ডাকা হলো। অনুপমার হাতে এক গ্লাস দুধ। আজমাঈনের হাতে দিয়ে বললো,’এই নাও, অর্ধেক তুমি খাবে আর বাকি অর্ধেক নূর। এতে করে মহব্বত বাড়বে।’
আজমাঈন মৃদু হেসে গ্লাসটা হাতে নিলো। পুরো গ্লাস ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে নিয়ে বললো,’সামান্য এক গ্লাস দুধ কখনো মহব্বতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে পারে না। মহব্বত তো অন্তর থেকে সৃষ্টি হয়, তবে দেওয়া নেওয়ার ব্যাপারটা আলাদা।’
অনুপমা ভ্রু নাচায়, এই ছেলে বেশ শেয়ানা। কথা ছোঁয়ানো মুশকিল। আজমাঈন ফের বললো,’তবুও যখন বলছেন অবশ্যই খাব। তবে আমি আগে না, আগে তাকে দিন।’
অনুপমা বলে উঠলো,’এটা তো নিয়ম না।’
‘একটু নিয়ম ভাঙলে ক্ষতি কিসের? মহব্বতের বেশিরভাগ নাহয় আমিই নিলাম।’
গ্লাসটা ট্রে তে রেখে দিলো। অনুপমা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তবে সাহারা ভীষণ মুগ্ধ হলো, ছেলেটার দম আছে। নাহলে নূরকে জয় করা এতটা সহজ ছিলো না। মায়ের পরিবর্তে সাহারা গ্লাস নিয়ে ছুটলো। নূরের রুমে গিয়ে হাঁপিয়ে উঠলো। বললো, ‘এই গ্লাস থেকে অর্ধেকটা তুই খাবি জান্নাত, তাড়াতাড়ি কর।’
নূর মুখ তুলে তাকায়। সাহারার হাঁপিয়ে ওঠা মুখ দেখে চিন্তিত হয়ে বলে,’এজন্য দৌড়ে এসেছ মাম্মাম? যদি পড়ে যেতে?’
‘উফফ তুই তাড়াতাড়ি শেষ কর তো? আরো কত কাজ বাকি আছে।’
আইশা এগিয়ে এসে বলে,’দুধ কেন?’
সাহারা মৃদু হেসে বলে,’অর্ধেক জান্নাত খাবে বাকি অর্ধেক তোমার ভাইয়া। এতো স্বামী স্ত্রীর মধ্যে মহব্বত বাড়ে।’
‘বাহ! ইন্টারেস্টিং ব্যাপার তো! আগে শুনিনি।’
‘আমার বিয়ের সময় এমনটাই হয়েছিল। তোমার ও হবে।’
অতঃপর গ্লাসটা নূরের হাতে দেয়,’তাড়াতাড়ি শেষ কর। আমাকে নিচে যেতে হবে।’
এতক্ষণ কথাবার্তা শুনে তব্দা খেয়ে গেছে নূর। সবার হুকুম পালন করা ছাড়া তো আর কাজ নেই ওর। অগত্যা বিসমিল্লাহ বলে এক নিঃশ্বাসে অর্ধেক দুধ পান করে নিলো। তারপর বাকিটা আজমাঈন পান করলো। তবে ও বুঝলো না যে এর সাথে মহব্বতের সম্পর্ক কোথায়। তবে সবার কথামতো কাজ করলেই হলো। আরেকটা কাজ বাকি ছিলো তা হলো আয়নায় মুখ দেখা। আজমাঈন এতে রাজি হয়নি, কিছুতেই না। এভাবে সে নূরের মুখ দেখবে না। এতে মেয়েটা কতখানি অস্বস্তিতে পড়বে তা ও ভালো করেই জানে। এজন্য আর কোন নিয়ম কানুনে মত দেয়নি। যদিও মিষ্টি মুখ করার পর্ব ছিলো।
তবে বিয়ের পর স্বামী স্ত্রী মিলে শোকরানা নফল নামাজ পড়তে হয়। একথা আজমাঈনের বলা লাগলো না। বাকিরাই কথাটা তুলল। তাছাড়া এখন সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মাগরিবের নামাজ টা নাহয় দুজনে একসাথে পড়লো। অনুপমা যেহেতু ভাবি তাই আজমাঈনকে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব তার ঘাড়েই পড়লো। এতসব আদিখ্যেতা করার ইচ্ছা মোটেই ছিল না অনুপমার। কিন্তু উপায় নেই।
আজমাঈন যখন অনুপমার পেছন পেছন সিঁড়ি বেয়ে উঠছে তখন মাগরিবের আজান কানে ভেসে এলো। পায়ের ব্যথা আগের মতোই রয়েছে। পা টেনে টেনে উঠতে একটু কষ্ট হলো বটে। তবুও সে উঠলো।
অনুপমা নূরের রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে ভেতরে থাকা সাহারা কে বললো,’এখন সবাইকে নিয়ে বের হও! ওরা নামাজ পড়বে এখন।’
আজান পড়েছে তাই কেউ উচ্চস্বরে কথা বললো না। সাহারার পিছু পিছু আইশাও বেড়িয়ে গেল। ওদের তো বাড়ির পথে রওনা হতে হবে। আজমাঈন আজ থাকবে কিনা জানে না। বাবার কাছ থেকে জেনে নিতে হবে।
সবাই চলে যেতে অনুপমা ভেতরে ঢুকলো। পার্পেল কালারের একটা গাউন পরেছে নূর। এটা ওর শ্বশুর বাড়ি থেকে দেওয়া। আইশার কথায় পরেছে সে। সাথে নূরের পছন্দ করা গহনা গুলো পরেছে। হাতে চিকন চুড়ি, নড়াচড়া করলেই ঝুনঝুন শব্দ করে ওঠে। মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে বসে আছে। সাহারা বেরিয়ে যাওয়ার পর কৌতুহল হয়ে অনুপমার দিকে তাকায় সে। অনুপমা ফিসফিস করে বলে,’বিয়ের পর শোকরানা নফল নামাজ পড়তে হয়। এখন পড়ে নাও দু’জনে কেমন? আমি যাচ্ছি।’
বিষয়টা বুঝতে সময় লাগে না নূরের। ভাবিকে বলতে ইচ্ছে করে, আরেকটু থেকে যাও আমার ভয় করছে। কিন্তু গলার কথা গলায় আটকে রইল। দেওয়ালের দিকে খানিকটা পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াল।
আজমাঈন স্বাভাবিক ভাবেই রুমের ভেতর পা রাখলো। হাল্কা নিচু হয়ে চামড়ার জুতা খুলতে গিয়ে চোখমুখ খিচে এলো। নামাজ পড়ার সময় এমন ব্যথা করেছিল, সহ্য করে নিয়েছে। আরেকটু সহ্য করলে সমস্যা হবে না। তারপর দরজাটা আলগোছে বন্ধ করে দিলো প্রবল অধিকার বোধ থেকে।
চলবে,,
Share On:
TAGS: ঈশিতা রহমান সানজিদা, পদ্মপ্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৩
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৫
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৯
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২১
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ৬
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ১৮
-
পদ্মপ্রিয়া পর্ব ২৫