Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৩৯ এর শেষাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

৩৯ এর শেষাংশ

মেহেরুন্নেসার চোখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো বাইজিদ। তারপর ধীরে কথা শুরু করলো। এতে শুধু চরম সত্যই নয়, ইতিহাসের ভারও মিশে আছে।
“উত্তরের প্রাসাদ আসলে একটা গোপন কেন্দ্র ছিল।”
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে শুনছে। বাইজিদ বলতে লাগলো
“আট বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ মিশর, শাম, পারস্য, ইয়েমেন, আনাতোলিয়ার কিছু অঞ্চল, এসব জায়গা থেকে একে একে নিখোঁজ হতে থাকে নামকরা চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা।”

সে একটু থামলো।
“প্রথমে কেউ গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল রাজনৈতিক টানাপোড়েন, কিংবা অন্য কোনো কারণে তারা লুকিয়ে গেছে।”
তার কণ্ঠ ধীরে কঠিন হয়ে উঠলো।
“কিন্তু পরে বোঝা গেল এটা পরিকল্পিত।”
মেহেরুন্নেসার আঙুল শক্ত হয়ে এলো।
“পঞ্চাশজন জন ব্যাক্তি”
বাইজিদ স্পষ্ট করে বললো
“একজনও সাধারণ কেউ না। প্রত্যেকে নিজ নিজ দেশে খ্যাত, দক্ষ, আর সবচেয়ে বড় কথা তারা নতুন কিছু আবিষ্কারের পথে ছিল। কারও কাজ ছিল ভেষজ চিকিৎসা নিয়ে, কারও ছিল শরীরের ভেতরের গঠন নিয়ে, কারও আবার রাসায়নিক তরল নিয়ে।”

মেহেরুন্নেসার চোখে বইয়ের পাতাগুলো আবার ভেসে উঠলো। বাইজিদ বলেই চললো
“ওদের একে একে অপহরণ করা হয়। রাতে, ভোরে, যাত্রাপথে বিভিন্ন জায়গা থেকে। কেউ নিখোঁজ হয়ে গেছে নিজের ঘর থেকে, কেউ আবার দূরের পথে। তারপর জাহাজে করে তাদের নিয়ে আসা হতো সাহাবাদ অঞ্চলে।”
তার কণ্ঠে এখন অদ্ভুত ভারী সুর।
“তারপর সবাইকে এনে রাখা হয় উত্তরের সেই প্রাসাদে।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো
“কিন্তু… কেন?”
বাইজিদ গভীর নিঃশ্বাস নিল
“এই পঞ্চাশজনের জ্ঞান একত্র করলে… এমন কিছু তৈরি করা সম্ভব, যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। কিন্তু সেই জ্ঞান অনেকের কাছেই লোভনীয় হয়ে উঠেছিল। শুধু এখানে না, পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের কিছু মানুষ বিজ্ঞানের এই ভুল ব্যাবহার কে কেন্দ্র করে বহু গুম-খু*ন আর অপরাধ করে। তারা তখন স্বার্থ পূরণ আর অর্থ উপার্জন করতে মরিয়া। প্রকৃতিকে তারা রুপান্তর করতে শুরু করে বিষে।”

বাইজিদ চোখ সরু করলো।
“ওদের বাধ্য করা হয় একসাথে কাজ করতে। দিন-রাত কঠোর পাহারা, বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কয়েকজন তো আত্ম*হত্যাও করেছে তাদের কথা মানবে না বলে। তারা মানব কূলের এত বড় ক্ষতি নিজ হাতে করতে পারবে না। তারপরেই শুরু হয় আরেক ভয়ানক খেলা। প্রত্যেকের বাড়ি থেকে তুলে আনা হয় তাদের পরিবার লোকেদের। কথা না মানলে হত্যা করা হবে প্রিয়জন দের। সেই বাধ্যকতা থেকে পেরিয়ে গেছে এতগুলো বছর।”

মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে এলো।
“তারা কি বানাচ্ছিল?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর নিচু গলায় বললো
“বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক তরল যেগুলো মানুষের শরীরে প্রয়োগ করলে…..”
সে থামলো। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এলো এক পা।
“কি হতো?”
বাইজিদ তাকালো তার দিকে। তার চোখে স্পষ্ট দ্বিধা তবুও বললো
“শরীর বদলে যেত। শক্তি বাড়তো… সহ্যক্ষমতা বাড়তো…”
তার কণ্ঠ ধীরে আরও নিচু হলো
“কিন্তু… মানুষ আর পুরোপুরি মানুষ থাকতো না। তার মানসিকতা থেকে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত সব কিছু হয়ে যেত জংলী পশুর ন্যায়। রাত হলে ওদের ছেড়ে দেওয়া হয়। ওরা ছড়িয়ে পড়তো গোটা সাহাবাদ অঞ্চল জুড়ে। ধরে নিয়ে যেত কত মানুষ। কাওকে খেয়েও ফেলতো। বিভৎস ভাবে হ*ত্যা করতো তাদের। কিন্তু হঠাৎ বছর খানেক ধরে রাতে তাদের আনাগোনা নেই। তাদের কেউ দেখেনি গত এক বছরে। মাত্র ৩ বার দেখা গেছে উত্তরের জঙ্গলে। লোকালয়ের কেউ তাদের দেখে নি।”

কক্ষের ভেতর হঠাৎ ঠাণ্ডা নীরবতা নেমে এলো।
মেহেরুন্নেসার মনে ঝড় বইতে লাগলো। সেই অদ্ভুত আক্রমণকারীরা, অস্বাভাবিক শক্তি, অদ্ভুত আচরণ সে ফিসফিস করে বললো
“তাহলে… তারা কি এখন দিনের বেলায় ই বের হচ্ছে?”

বাইজিদ ধীরে মাথা নাড়লো।
“আমি নিশ্চিত না। কিন্তু সবকিছু মিলিয়ে… মনে হচ্ছে সেই পরীক্ষার ফলই হয়তো এখন ফিরে এসেছে।”
মেহেরুন্নেসার হাতে ধরা বইটা কাঁপলো সামান্য।
পঞ্চাশজন চিকিৎসক, রোমান ভাষায় লেখা রাসায়নিক তরল। আর আজকের সেই দানবসদৃশ মানুষ সবকিছু যেন এক সুতোয় বাঁধা।

বাইজিদ ধীরে বললো
“যদি এটা সত্যি হয়…”
তার চোখে ভয়ংকর এক দৃঢ়তা জ্বলে উঠলো
“তাহলে আমরা শুধু একটা যুদ্ধের সামনে না,
আমরা দাঁড়িয়ে আছি এমন কিছুর সামনে যা থামানো খুব কঠিন হবে না, হবে অসম্ভব প্রায়”

মেহেরুন্নেসার হাত ধীরে কাঁপতে লাগলো।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো, যেন কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। তারপর ধীরে, একটু ভয় মিশে থাকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো
“তাদের… কে ধরে এনেছিলো?”
বাইজিদ কিছুক্ষণ নীরব রইলো। তার দৃষ্টি কঠিন হয়ে উঠলো, যেন বহুদিনের জমে থাকা কোনো সত্যি আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
অবশেষে সে বললো
“অঙ্কুর।”
শব্দটা খুব ধীরে বের হলো তার মুখ থেকে। মেহেরুন্নেসা ঈষৎ ভ্রু কুচকালো
“অঙ্কুর কে?”

“নাসিরাবাদ এর বড় শাহজাদা।”

মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল।
“আপনি কি জানেন? আমরা যাকে রত্নপ্রভা ভাবছি সে আসলে…..”

“চন্দ্রা”

মেহেরুন্নেসার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাইজিদ এর অকপট শিকারোক্তি।
“আর চন্দ্রার চাচাতো ভাই ই অঙ্কুর”

“অঙ্কুর…?”
মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে এলো। বাইজিদ মাথা নাড়লো।
“হ্যাঁ, নাসিরাবাদের সেই পতনের আগে সবকিছু তার পরিকল্পনাতেই হয়েছিল।”

সে সামনে তাকিয়ে বলতেই থাকলো
“ওই পঞ্চাশজন চিকিৎসক… তাদের অপহরণ, উত্তরের প্রাসাদে বন্দি করে রাখা, জোর করে গবেষণা করানো সবকিছুর পেছনে ছিল অঙ্কুর।”

তার কণ্ঠে এখন দমিয়ে রাখা রাগ স্পষ্ট।
“আর আজ যা কিছু ঘটছে, এই নরপিশাচের মতো মানুষগুলো… এই আক্রমণ এসব সেই অপকর্মের ই ফল”

মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো।
সবকিছু যেন আরও ভয়ংকর হয়ে উঠছে।
দ্রুত বলল
“কিন্তু চন্দ্রপ্রভা? সে তো… অঙ্কুরের বোন। সে ও তো…. ”
বাইজিদ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।
“না”
দৃঢ় গলায় বললো সে
“চন্দ্রা এর মধ্যে নেই।”
মেহেরুন্নেসা থেমে গেল। বাইজিদের চোখে এবার আলাদা এক নিশ্চয়তা।
“আমি তাকে চিনি। সে এমন কিছুতে জড়িত থাকবে না। উল্টো এতগুলো বছর তাদের বানানো সেই রাসায়নিক জিনিস গুলো নিজ দ্বায়িত্বে সাহাবাদ এর বাইরে পাঠিয়েছে বিদেশি বণিক দ্বারা। অন্তত রাজ্যের মানুষ যাতে এর ভুল প্রয়োগ না শিখে।”

তার কণ্ঠে সন্দেহের কোনো জায়গা নেই।
“অঙ্কুর যা করছে সে একাই করছে।”

কক্ষ আবার নীরব হয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা ধীরে বসে পড়লো। তার মাথার ভেতর সবকিছু ঘুরছে। সবকিছু এখন পরিষ্কার হতে শুরু করেছে কিন্তু সেই পরিষ্কার হওয়াটাই আরও বেশি ভয়ংকর।
একটা একটা করে প্রশ্ন গুছিয়ে নিলো।
“আচ্ছা আগে বলুন। বিজ্ঞানীদের বানানো এই সকল উপাদান দিয়ে সেই লোকটা কি করে?”

“অন্যান্য দেশে মোটা অর্থে বিক্রি করে।”

মেহেরুন্নেসা দ্বিতীয় প্রশ্ন করলো
“নাসিরাবাদ তো দেখলাম পরিত্যক্ত। সে রাজত্ব ও করছে না। তাহলে এত অর্থ দিয়ে সে করে টা কি?”

বাইজিদ বৃদ্ধাঙুল দিয়ে ঠোঁটের কার্নিশ মুছলো
“ও সব অর্থ একত্রিত করছে। খুব শিঘ্রই নরপিশাচের ডেরা বানাবে। এমন এক শক্তি শালী প্রাসাদ তৈরি করবে যা হবে অভেদ্য। শক্তি শালী দলের আক্রমণ ঠেকাতে প্রস্তুত এবং বলা যায় তার সুরক্ষা বলয়। দিন দিন ওর এই গবেষণার ফল গুলো ভুল পথে নিতে নিতে প্রকৃতি ধ্বংসের পরিকল্পনা করছে ও। সেক্ষেত্রে কয়েকটা রাজ্য জোট হয়ে যে আক্রমণ করবে, তাতে যেন ওর কোনো ক্ষতি না হয় সেই ব্যাবস্থা করছে। আর বোকার দলেরা জেনে বুঝে সেগুলো কিনছে”

মেহেরুন্নেসা মনোযোগ দিয়ে শুনলো
“বুঝলাম। কিন্তু ওই মানুষ গুলো বিকৃত করার কারণ কি?”

“তার দুইটা কারণ রয়েছে। প্রথমত, তাদের গবেষণা পরীক্ষা করা। আদৌ কি তাদের বানানো দ্রব্য কাজ করছে কিনা তা প্রয়োগ করে দেখছে। দ্বিতীয়ত, ওর ওপর আক্রমণ হলে ওই মানুষ রুপি দানব গুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যাবহার করবে”

মেহেরুন্নেসা নিশ্চুপ বসে আছে। তার দৃষ্টি স্থির, কিন্তু ভেতরে জমে উঠছে ভয়।
বাইজিদ ধীরে বললো
“তুমি যা ভাবছো… তার থেকেও ভয়ংকর সত্যি আছে।”
মেহেরুন্নেসা তাকালো তার দিকে।
“গত আট বছর ধরে…”
বাইজিদের কণ্ঠ ভারী হয়ে এলো,
“ওই প্রাসাদে নির্মম অত্যাচার চলছে। যাদের ওপর ওই রাসায়নিক তরল প্রয়োগ করা হয়…” সে থামলো এক মুহূর্ত,
“তারা আর স্বাভাবিক থাকে না।”
মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে গেল।
“রাত নামলেই তাদের বের করে দেওয়া হয়।”

“কোথায়?”
খুব আস্তে জিজ্ঞেস করলো সে।
“প্রাসাদের চারপাশে… অন্ধকারে”
“তখন…”
বাইজিদের চোখে অদ্ভুত কঠোরতা
“তারা মানুষ থাকে না আর।”
মেহেরুন্নেসার আঙুল শক্ত হয়ে এলো।
“তাদের দেহ বদলে যায়। কাউকে দেখলে মনে হবে মানুষ… আবার ঠিক মানুষও না।”
“কেমন?”
“কারও হাত অস্বাভাবিক লম্বা আর শক্ত, কারও শরীর মোচড়ানো… যেন হাড়গোড় ঠিক জায়গায় নেই। কারও চোখে কোনো চেতনা নেই শুধু শূন্যতা আর হিংস্রতা। আর তাদের থামানো যায় না সহজে। সাধারণ অস্ত্র তেমন কাজ করে না।”

মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে যাচ্ছে যেন।
“তারা আক্রমণ করে বসে যাকে পায়… তাকে।”
সে থামলো। মেহেরুন্নেসা চোখ বন্ধ করলো এক মুহূর্ত। বাইজিদ এর কন্ঠে চাপা রাগ
“নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। কোনো দয়া নেই… কোনো বোধ নেই। আর অনেক সময়……
বাইজিদ চোখ সরিয়ে নিলো। যেন কথাটা মুখে আনতেও দ্বিধা হচ্ছে
“কিছু মানুষ বেঁচে থাকে না শুধু…তাদের দেহও অবশিষ্ট থাকে না।”

কথাটা বলেই সে চুপ করে গেল। কক্ষের ভেতর হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেল যেন। মেহেরুন্নেসার ঠোঁট কাঁপছে। তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।
সে ধীরে ফিসফিস করে বললো
“এরা… মানুষ না আর। ওরা এখন শুধু… সৃষ্টি করা এক ভয়ংকর অস্তিত্ব।”

মেহেরুন্নেসার চোখ ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠলো।
তার মুখের রঙ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। সে যেন হঠাৎ করেই ঠান্ডা হয়ে গেল ভয়ের এক অদৃশ্য ছায়া তাকে ঢেকে ফেলেছে।
মনে পড়ে গেল সেই প্রাসাদ সেই অন্ধকার পথ সুনেহেরার সাথে তার যাওয়া। কত বড় বিপদের মধ্যে সে না জেনেই চলে গেছিলো।
এক মুহূর্তের জন্য তার শ্বাস আটকে এলো।
কিন্তু সে কিছু বললো না।
সবটুকু চেপে রাখলো নিজের ভেতরে। শুধু বাইজিদের দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করলো
“তাহলে… এত কিছু জানার পরও আপনারা কিছু করছেন না কেন? অঙ্কুরের এই নোংরা কাজ সহ্য করছেন কেন?”

প্রশ্নটা তীক্ষ্ণ হয়ে ছুঁয়ে গেল। বাইজিদ চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ। তার দৃষ্টি নিচু হয়ে এলো। মেহেরুন্নেসা অপেক্ষা করছে। অবশেষে সে বললো
“কারণ… আমরা বাধ্য।”
মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে গেল
“বাধ্য?”
বাইজিদ মাথা তুললো। তার চোখে এবার এক ভিন্ন যন্ত্রণা।
“অঙ্কুরের কাছে বন্দি আছে আমার মা। মাইমুনা শেখ।”
মেহেরুন্নেসা স্তব্ধ। তারমানে সে মারা যায়নি? বাইজিদ আবার বললো
“শুধু উনিই না, অরণ্যের ছোট বোন অর্ষা…আর রুবা।”
“রুবা?”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“সে কে?”
এক মুহূর্ত থামলো বাইজিদ। তারপর বললো
“নাসিরাবাদের বড় শাহজাদি।”
সবকিছু যেন আরও জটিল হয়ে উঠলো।
মেহেরুন্নেসার চোখে এখন শুধু ভয় না বিস্ময়, সংশয়, আর অজানা এক চাপা আতঙ্ক। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর হঠাৎ বললো
“সে… মরে নি?”
বাইজিদ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো
“সে না… আপনাকে বিয়ে করতে না পেরে আত্মহত্যা করেছিলো?”
কথাটা শেষ হতেই বাইজিদ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।
“তুমি… এসব কি করে জানলে?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট অবাক ভাব। মেহেরুন্নেসা একটু ইতস্তত করলো। তারপর বললো
“মিরান বলেছিলো…”
একটু থামলো সে।
“সবটা বলতে পারেনি… কিন্তু যতটুকু বলেছে তাতেই বুঝেছি।”
বাইজিদ স্থির হয়ে গেল। তার চোখে চিন্তার ছাপ।
মেহেরুন্নেসা এবার ধীরে, খুব সাবধানে প্রশ্ন করলো
“আপনি কি সত্যিই…”
তার গলা কেঁপে উঠলো সামান্য
“রুবায়েত ফারনাজকে ভালোবাসেন?”

প্রশ্নটা বলেই সে চুপ করে গেল। বাইজিদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
তার এই নীরবতা যেন আরও ভারী হয়ে উঠলো।
মেহেরুন্নেসার বুক ধড়ফড় করছে। তার নিশ্বাস আটকে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। তাকিয়ে আছে বাইজিদের দিকে শুধু একটুখানি উত্তর পাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই নীরবতাই সবচেয়ে কঠিন হয়ে উঠলো তার জন্য। নীরবতা যেন আরও কিছুক্ষণ ঝুলে রইলো। মেহেরুন্নেসার চোখ স্থির বাইজিদের মুখে উত্তরের অপেক্ষায় তার বুকের ভেতরটা কাঁপছে। অবশেষে বাইজিদ ধীরে বললো
“আমি তাকে কখনো দেখিই নি।”

মেহেরুন্নেসা থমকে গেল।
বাইজিদ তার দিকেই তাকিয়ে রইলো
“ভালোবাসা তো দূরের কথা।”
শব্দগুলো খুব সহজ কিন্তু তার ভার যেন মুহূর্তেই বদলে দিল সবকিছু। মেহেরুন্নেসার বুক থেকে যেন এক অদৃশ্য পাথর সরে গেল। সে ধীরে শ্বাস নিল। কখন যে শ্বাস আটকে ছিল, নিজেই বুঝতে পারেনি।
বাইজিদ কেমন ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকায় মেহেরুন্নেসার দিকে
“আমার ইহকালের সবটুকু প্রেমসুধা তোমার জন্য বরাদ্দ দিওয়ানী। কোনো নারী আমার জীবনে বিন্দু পরিমাণ জায়গা পায়নি। আর মনে? সেখানে তো আমাকেই আসামী সাজিয়ে ভালোবাসতে বাধ্য করেছেন আপনি। আপনাকে ছাড়া যে আমি সম্পূর্ণ রুপে বাষ্পীভূত।”

মেহেরুন্নেসা লজ্জা পায় বাইজিদ এর কথায়। চোখ নামিয়ে ফেললো সে, ঠোঁটের কোণে অল্প এক শান্তির রেখা। ছোট করে জিজ্ঞেস করলো
“আমি মহলে ফিরছি কবে?”


সুনেহেরা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে পুকুরপাড় ধরে হাঁটছিল। পুকুরের পানিতে বিকেলের আলো পড়ে চিকচিক করছে, আর সেই আলোয় তার নুপুরের শব্দ যেন তাল মিলিয়ে ভেসে উঠছে বাতাসে টিং টিং করে এক মায়াবী সুর। সে নিজের মতো করে হাঁটছিল, হালকা বেখেয়ালে।
পুকুরের সিঁড়ি বেয়ে নামতে গিয়ে ঘাগড়ার নিচের অংশটা একটু ভিজে গেছে কিন্তু তাতে তার হাঁটার ভঙ্গি একটুও থামেনি। ঠিক তখনই সামনে চোখ পড়লো নেওয়াজে আবিদের ওপর। সে ধীরে ধীরে হাঁটছিল, মাথা নিচু, যেন কোনো গভীর চিন্তায় ডুবে আছে। সুনেহেরা মুহূর্তেই দৌড়ে গেল।
“এই যে!”
বলে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নেওয়াজ থেমে গেল। মাথা তুলে তাকাতেই যেন এক মুহূর্তে থমকে গেল তার দৃষ্টি। সুনেহেরা একটু হেসে বললো
“আমার আরেকটা কাজ আছে… করে দিতে পারবেন?”
নেওয়াজ কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ স্থির হয়ে আছে সুনেহেরার মুখে। ভেজা কাপড়ের কিনারায় হালকা জল, বাতাসে এলোমেলো হয়ে পড়া সোনালি চুল, আর সেই নিষ্পাপ মুখ। সব মিলিয়ে যেন তার দৃষ্টি আটকে গেল। সুনেহেরা একটু কুঁচকে তাকালো।
“কি হলো?”
বলেই হাত নেড়ে দিল।
তবুও নেওয়াজের চোখ সরছে না। তার দৃষ্টি যেন ঘোর লাগার মতো, একটা পুতুলের মতো সুন্দর মুখের দিকে স্থির হয়ে আছে, যেখানে বাস্তব আর বিস্ময় একসাথে মিশে গেছে। সে ধীরে গলা নামিয়ে বললো
“কী কাজ…?”
সুনেহেরা একদম স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললো
“গোলাবারুদ এনে দিতে হবে।”
কথাটা যেন আবিদ কে ঝাঁকুনি দিল। বলে কি? মেয়ে মানুষ হয়ে গোলাবারুদ চায়? নেওয়াজের মুখে হঠাৎ রঙ পাল্টে গেল। সে একবার কাশি দিয়ে উঠলো, বিষম খাওয়ার মতো অবস্থা।
“কি…?”
তার কণ্ঠ প্রায় ভেঙে গেল। সুনেহেরা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলো, তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সামনে এগিয়ে এসে তার মাথায় আলতো করে চাপড় দিতে লাগলো।

নেওয়াজ কোনোভাবে শ্বাস সামলানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু পরিস্থিতি তার নিয়ন্ত্রণে নেই। অনর্গল কাশতেই আছে। আর সুনেহেরা মাথা চাপড়ে দিচ্ছে। আবিদ কাশতে কাশতেই বলল
“এ কি। মারছেন কেন?”

“আরে আকাঠা, মারছি না। বিষম খেলে এমন করলে ঠিক হয়”

“হ্যা কারণ মরে গেলে মানুষ আর বিষম খায় না”

সুনেহেরা মুখ কাচুমাচু করে সরে দাঁড়ালো
“বেশি জোরে চাপটেছি?”

আবিদ হেসে বলল
“না না। ওই ছাদের ঢালাই একটু নড়বড়ে হয়েছে শুধু। তেমন কোনো ব্যাপার না”

সুনেহেরা কিছু বলতে গিয়েও ফিক করে হেসে ফেলল। নেওয়াজও মাথা চুলকে হেসে ফেলল সাথে সাথে।
ঠিক তখনই বাগানের দিক থেকে সিমরান এসে পড়লো। সে কয়েক পা এগিয়ে থমকে গেল।
তার চোখে প্রথমে বিস্ময়, সন্দেহের ছায়া। সুনেহেরার মত মেয়ে নায়েবের সাথে হাসছে? তার চাইতে বড় কথা সে সিমরান এর হবু বর। হবু বরের কথা মনে হতেই ভেঙচি কাটলো সিমরান। তারপর বাগানের পিছন দিকটায় চলে গেলো হাঁটতে হাঁটতে। ফুল গুলোকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলো। এমন সময় পাঁচিলের ওপার থেকে ভেসে আসে গড়গড় গড়গড় শব্দ। সিমরান এর বুকটা ধক করে ওঠে ভয়ে। এমন বিভৎস আওয়াজ করছে কোন প্রাণী। ধীরে ধীরে মনে হচ্ছে শব্দ টা এগিয়ে আসছে আরো।

কথাটা একটু মন দিয়ে, লক্ষ্য করে শুনবেন। পরবর্তী যে পর্ব আসতে চলেছে, তা গল্পের মেইন প্লট। এখন থেকে সব কিছু হবে ভীষণ সিরিয়াস। তাই আমায় একটু সময় নিয়ে জেনে বুঝে ভাষা চয়ন ঠিক করে লিখতে হবে। নয়তো গল্পটা নিজের সৌন্দর্য হারাবে আর এ সকল বিষয়ে কোনো ভুলভাল তথ্য বা অযৌক্তিক কথা গোটা উপন্যাস কে হাসির খোরাক বানাতে পারে। তাই এ ক্ষেত্রে ভুল-চুক গ্রহণযোগ্য না। দোয়া রাখবেন যেন আমি এটা সেভাবেই চালিয়ে যেতে পারি। এক্ষেত্রে অনেক ভাবনা চিন্তা করে সবটা গোছাতে হয় লেখার জন্য। আমার একটু সময় প্রয়োজন হতে পারে। আপনারা জানেন আমি কতটা নিয়মিত। কিন্তু মাঝেমধ্যে একটু আকটু দেরি মেনে নিয়েন।

আশা করি আমার পাঠকরা আমার বিষয়টা বুঝবে এবং সমর্থন করবে। আর আমি খুব হলে একদিন গ্যাপ দিয়েছি হঠাৎ মাঝেমধ্যে এর বেশি কখনোই হবে না। তাই আপনারা যে-ভাবে গল্পটিকে ভালোবেসে আমার পাশে আছেন। এমনই যেন থাকবেন। ভালোবাসা আপনাদের কেআ। আর আজকের পর্বটা পড়ে কেমন অনুভূতি হলো অবশ্যই জানাবেন কিন্তু। ৩.৫k রিয়্যাক্ট না করলে কিন্তু সাহাবাদ এ আপনাদের নিবো না। 🫣💟

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply