তুমিএলেঅবেলায় 🍂 (পর্ব – ১১)
লেখিকাঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
সুইজারল্যান্ডের গ্রিন্ডেলওয়াল্ডের ভোরগুলো ভীষণ চমৎকার। পূর্ব দিগন্তে চোখ রাখলে মনে হয় কোনো দক্ষ শিল্পী বোধহয় আকাশের বিশাল নীল ক্যানভাসে এক অদ্ভুত জলরঙের খেলা শুরু করেছেন। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে জমে থাকা কুয়াশাগুলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হতে থাকে। সূর্যের প্রথম কিরণে হীরের কুচির ন্যায় চিকচিক করতে শুরু করে জমে থাকা বরফগুলো।
শ্যলে-র জানালা দিয়ে সেই মায়াবী রোদ্দুর সামাইরার চোখের পাতায় আছড়ে পড়ল। সূর্য রশ্মির নরম স্পর্শে জেগে উঠল সে। চোখ পিটপিটিয়ে চারিপাশটা দেখে নিল। তার মনে হলো সে কোনো ভিন্ন জগতে অবস্থান করছে।
গতরাতের সেই আবেগী সংঘাতের পর তার ঘুম খুব একটা গভীর হয়নি। মনের ভেতর ঘোরাঘুরি করছে
হাজারটা প্রশ্ন আর অস্বস্তি। সামাইরা বিছানা ছেড়ে উঠে ধীর পায়ে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল।
বারান্দার ভারী কাঁচের স্লাইডিং ডোরটা সরাতেই হু হু করে হিমশীতল বাতাসের ঝাপটা তাকে সাদরে জড়িয়ে আপন করে নিল। কনকনে ঠান্ডা সামাইরাকে গ্রাস করে ফেলবার আগেই সামনের দৃশ্য দেখে মোহিত হল সে।
বারান্দায় কোনো গ্রিল নেই। একদম খোলা। যেন আকাশের সাথে গভীর মিতালি পেতে তৈরি এ বারান্দা। তার ঠিক সামনেই আদিগন্ত বিস্তৃত আল্পস পর্বতমালা। আইগার, মোনচ আর ইয়ুংফ্রাউ, এই ত্রয়ীর চূড়াগুলো ধবধবে সাদা বরফের মুকুট পরে গম্ভীরভাবে দাঁড়িয়ে আছে।
নিচের উপত্যকায় ছোট ছোট সুইস বাড়িগুলো খেলনাঘরের মতো দেখাচ্ছে। পাইন বনগুলোও সাদা চাদর গায়ে দিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ডিসেম্বরের এই সকালটা যেন এক প্রশান্তির বিস্তৃত বাগান।
বারান্দার ঠিক মাঝখানে একটি অত্যাধুনিক ফায়ারপ্লেস আছে। পাথর আর ইস্পাতের মিশেলে তৈরি এই ফায়ারপ্লেসটি ঘিরে আরামদায়ক সোফা পাতা। শেহজাদ সেখানেই বসা। তার পরনে কালো রঙের দামী টার্টলনেক সোয়েটার আর ডার্ক গ্রে ফ্লানেল প্যান্ট। তার চোখের মাঝে সেই চিরচেনা গাম্ভীর্যের ছায়া। তবে গতরাতের সেই ক্ষিপ্রতা এখন নেই বললেই চলে।
শেহজাদকে দেখে সামাইরা সামান্য থমকে দাঁড়াল। শেহজাদ তার দিকে না তাকিয়েই খুব শান্ত গলায় বলল,
-গুড মর্নিং। উঠেছো তাহলে?
সামাইরা স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
-গুড মর্নিং।
-এদিকে এসো। ব্রেকফাস্ট করে নাও। এই আবহাওয়ায় খাবার ঠান্ডা হতে বেশিক্ষণ লাগে না।
সামাইরা ধীর পায়ে গিয়ে ফায়ারপ্লেসের পাশের সোফায় বসল। শেহজাদের জীবনযাত্রার ছাপ ব্রেকফাস্টের আয়োজনেও স্পষ্ট। শ্যলে-র ব্যক্তিগত শেফ এবং বাটলাররা নিপুণ হাতে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে দিয়েছে। টেবিলের ওপর ধোঁয়া ওঠা খাঁটি সুইস চকোলেট ড্রিংক। সদ্য তৈরি করা ক্রোসঁ। বিভিন্ন রকমের চিজি অমলেট, ফ্রেশ ব্লুবেরি আর আল্পাইন মধু। এমনকি এখানে পরিবেশন করা পনিরগুলোও এই উপত্যকার স্থানীয় খামার থেকে আসা। একদম তরতাজা।
আগুনের ওম আর বাইরের হাড়কাঁপানো ঠান্ডার এই লড়াইয়ের মাঝখানে বসে তারা দুজনে ব্রেকফাস্ট শুরু করল। সামাইরা হট চকোলেটের মগে ছোট করে চুমুক দিল। বেশ মজা লাগল তার কাছে।
শেহজাদ হঠাৎ নীরবতা ভেঙে বলল,
-আজ আমরা ঘুরতে বেরোব। তোমাকে আমি সুইজারল্যান্ডের প্রকৃত রূপ দেখাতে চাই।
সামাইরা চোখ তুলে তাকাল। সে ধীর গলায় জানতে চাইল,
-কোথায় নিয়ে যাবেন?
-আমরা প্রথমে যাব ইয়ুংফ্রাউজোখ। একে বলা হয় ‘টপ অফ ইউরোপ’। ইউরোপের সর্বোচ্চ রেলওয়ে স্টেশন। সেখান থেকে তুমি পুরো আল্পসের বিশালতা দেখতে পাবে। তোমার মনে হবে তুমি মেঘের ওপর দাঁড়িয়ে আছো। আর তারপর যদি আবহাওয়া ভালো থাকে, তাহলে আমরা লাউটারব্রুনেন উপত্যকায় যাব। যেখানে ৭২টি জলপ্রপাত আছে।
সামাইরা মুচকি হেসে বলল,
-এই কনকনে শীতে জলপ্রপাত দেখতে যাবেন? বরফ হয়ে আছে না?
-তা আছে। তবে সেগুলোর বরফ হয়ে ঝুলে থাকা দেখতেও অবিশ্বাস্য সুন্দর লাগে।
সামাইরা উদাস দৃষ্টি মেলে তুষারশুভ্র শৃঙ্গগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকল ক্ষণিককাল। শেহজাদের এই মার্জিত রূপটা তার কাছে বড্ড অচেনা বলে মনে হচ্ছে। সে কিছুটা অবাক হয়েই বলল,
-আপনি তো এই জায়গাগুলো আগেও অনেকবার দেখেছেন। তবুও আপনার চোখে এক ধরণের মুগ্ধতা দেখতে পাচ্ছি। এর কারন জানতে পারি?
শেহজাদ হট চকলেটের মগে চুমুক দিয়ে পাহাড়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করল। বলল,
-আমি অনেকবার এসেছি ঠিকই, কিন্তু প্রতিটি সফর আলাদা হয়। ভিন্ন গল্প থাকে। আমি সবসময় একা এসেছি। এবার তোমায় সাথে করে নিয়ে এসেছি। এই অনুভূতি ভিন্ন। আচ্ছা সামাইরা, টেল মি ওয়ান থিং, তুমি তো প্রথমবার এসেছো। তোমার কাছে কেমন লাগছে?
সামাইরা সহজ ভঙ্গিতে বলল,
-ভালো। পাহাড়গুলোর স্থিরতা দেখে নিজের ভেতরে অস্থির হয়ে ওঠা মনও শান্ত হয়ে যাচ্ছে।
ক্ষণিককাল দুজনই চুপ করে রইল। নীরবতা ভাঙ্গল
সামাইরা বিষণ্ণ হাসিতে। সে বলল,
-আপনি রাইসার সাথে গতরাতে কাজটা ঠিক করেন নি। মেয়েটা কষ্ট পেয়েছে।
শেহজাদ সামাইরার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল।
-আর তুমি? তুমি কষ্ট পাচ্ছো না?
সামাইরা চুপ করে রইল। শেহজাদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-রাইসা আমার জীবনে এক সময় শূন্যস্থান পূরণ করেছিল। কিন্তু…
সামাইরা ভ্রুঁ কুঁচকে বলল,
-আমি জানি না, সামাইরা। তবে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটার মাঝে কিছু জিনিস আমি খুঁজে পেয়েছি যা রাইসা আমায় দিতে পারে নি।
সামাইরা বিদ্রুপ লুকিয়ে স্বাভাবিকভাবেই বলল,
-তাই নাকি? যেমন?
-ও কখনো আমার সোল স্পর্শ করতে পারেনি। তুমি পেরেছো। তোমাকে পুরোপুরি ভাবে পাওয়ার একটা ডিজায়ার কাজ করে আমার মাঝে। ওর ক্ষেত্রে করে নি। আরোও অনেক কিছুই আছে। শুনলে আমাকে চরিত্রহীন ভাববে।
সামাইরা ক্ষীণ স্বরে বলল,
-আপনি চরিত্রহীন। ভাবার কি আছে?
শেহজাদ দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,
-আমরা তিন বছর সম্পর্কে ছিলাম। আমাদের মাঝে কিছুই হয় নি, এটা আমি বলব না। উই কিসড। অনেকবার। কিন্তু আমি কখনো লিমিট ক্রস করি নি। এর জন্য যদি তোমার আমাকে চরিত্রহীন বলে মনে হয়, আমি নিজের ডিফেন্স এ কিছু বলব না।
সামাইরা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল,
-আমাকে এত কৈফিয়ত দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
শেহজাদ চোয়াল শক্ত করে বলল,
-হয়ত প্রথম দিকে ছিল না। কিন্তু এখন আছে। আমি এতদিন আমার জীবনে তোমাকে চাই নি। কিন্তু এখন চাই।
সামাইরা সামান্য হাসল। বলল,
-আপনি একা চাইলে তো হবে না, মিস্টার রহমান। আমারও চাইতে হবে। আর আমি এই সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই না। পরিশেষে আমি ‘বিচ্ছেদ’ চাই। সবসময় তাই চাইব।
শেহজাদ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,
-আমি ডিভোর্স না দিলে তুমি কিভাবে এই সম্পর্ক থেকে বেরুবে, সামাইরা? বাজে না বকে যাও, তৈরি হয়ে নাও। আল্পস আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।
সামাইরা কোনো উত্তর দিল না।
ব্রেকফাস্ট শেষ করে শেহজাদ থার্মাল পুলে গোসল করতে ঢুকল।
সামাইরা ঘরের ভেতর নিজের ব্যাগ থেকে ভারী ওভারকোট বের করছিল। সে ভুলবশত ড্রেসিং টেবিলের দিকে যাওয়ার সময় কাচঘেরা পুল রুমের দিকে অবচেতন মনে তাকাল।
শেহজাদ তখন সবেমাত্র পুল থেকে উঠে এসেছে। তার শরীরের ওপর দিয়ে বাষ্পের কণাগুলো দ্রুতবেগে গড়িয়ে পড়ছে। পরনে কেবল একটি সাদা তোয়ালে যা তার কোমরের নিচে জড়ানো। শেহজাদ তখন পিঠ ফিরিয়ে একটি তোয়ালে দিয়ে তার এলোমেলো চুল মুছছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই সামাইরার নজরে এল এক বীভৎস দৃশ্য। শেহজাদের পেশীবহুল পিঠের নিচ থেকে কোমরের শুরু পর্যন্ত বেশ কয়েকটা গভীর এবড়োখেবড়ো দাগ। এটি কোনো সাধারণ আঘাতের চিহ্ন নয়। খুব নিষ্ঠুরভাবে চামড়া ছিঁড়ে গিয়েছিল কোনো এক সময়। বড় বড় কাটা দাগগুলো সাদাটে হয়ে বসে গেছে। এই দাগগুলো যেন বহু বছর আগের কোনো রক্তাক্ত লুকানো অধ্যায়ের সাক্ষী বয়ে বেড়াচ্ছে!
সামাইরার হাত থেকে ওভারকোটটা প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। ছোটবেলায় কাউকে যদি বেধড়ক মারা হয়, তবেই এমন গভীর স্থায়ী দাগ থাকা সম্ভব। এই চিহ্নগুলোর সাথে কি তার বাবার কোনো সম্পর্ক আছে?
চশেহজাদ কি তবে ছোটবেলায় নির্যাতনের শিকার হয়েছিল?
সামাইরা দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। যে শেহজাদকে সে কেবল একজন অহংকারী আর ক্ষমতাধর পুরুষ হিসেবে চিনত, তার শরীরের এই দাগগুলো এক দগদগে ইতিহাসের ইংগিত দিচ্ছে।
শেহজাদ পুল রুম থেকে আয়নায় সামাইরার প্রতিচ্ছবি দেখল। সে বুঝল সামাইরা কিছু একটা গভীর মনযোগ ভাবছে। সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পোশাক গায়ে দিতে দিতে বলল,
-কী হলো সামাইরা? কি এত ভাবছ? ওভারকোটটা তো মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে তো!
সামাইরা নিজেকে সামলে নিয়ে নিচু গলায় বলল,
-কিছু না। আমি… আমি রেডি হতে যাচ্ছি।
ক্ষণিককাল পর সামাইরা ওভারকোট পোশাকের উপরে জড়িয়ে ফিরে এলো।
শেহজাদ তার কালো লঙ-কোটটা পরতে পরতে বলল,
- রেডি? চলো, ট্রেন মিস করা যাবে না। গ্রিন্ডেলওয়াল্ড টার্মিনাল থেকে আমরা ‘আইগার এক্সপ্রেস’ নেব। আইগার নর্থ ফেসের বুক চিরে যখন ট্রেনটা উঠবে, তখন তুমি বুঝতে পারবে এই পৃথিবীর সৌন্দর্যের কাছে আমাদের কল্পনা কত তুচ্ছ!
সামাইরা ম্লান হাসল।
বাইরে তখন ঝকঝকে রোদ। তুষাররাশিতে ঘেরা রূপকথার মতো সুন্দর সুইজারল্যান্ড যেন এই দুই অসম জুটিকে নিজের ভেতরে এক রহস্যময় গন্তব্যের দিকে ডাকছে।
গ্রিন্ডেলওয়াল্ড টার্মিনালটি যখন শেহজাদের মার্সিডিজ এস-ক্লাসের কাঁচের ওপাশে ফুটে উঠল, সামাইরা দেখল সেখানে কোনো সাধারণ স্টেশনের হইচই নেই। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে তৈরি এই অত্যাধুনিক টার্মিনালটি যেন আভিজাত্যের অন্যতম শিখর।
ড্রাইভার গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিল। শেহজাদ গাড়ি থেকে নেমে সামাইরার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। সামাইরা হেসে বলল,
-আমি একাই নামতে পারব।
শেহজাদ তবুও একইভাবে হাত বাড়িয়ে দিয়ে রাখল। সামাইরা বিপরীত দিকের দরজা খুলে নিঃশব্দে গাড়ি থেকে নেমে গেলো। এরপর শেহজাদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।
শেহজাদ তার ওভারকোটের কলারটা একটু টেনে দিল। নিচু স্বরে বলল,
-কতদিন আমার স্পর্শ এড়িয়ে যাবে?
সামাইরাও ফিসফিস করে বলল,
-যতদিন এক ছাদের নিচে আছি, ঠিক ততদিন।
শেহজাদ হাসল। প্রত্যুত্তরে কিছু বলল না।
টার্মিনালের ভেতরে প্রবেশ করতেই সামাইরা দেখল, শেহজাদ কোনো সাধারণ টিকিট কাউন্টারের দিকে যাচ্ছে না। বরং একজন ইউনিফর্ম পরা অফিসার মাথা নিচু করে তাদের স্বাগত জানিয়ে একটি বিশেষ লিফটের দিকে নিয়ে গেল।
সামাইরার জিজ্ঞাসু চোখের দিকে তাকিয়ে শেহজাদ মৃদু হেসে বলল,
-আমরা আইগার এক্সপ্রেসে যাচ্ছি, তবে সাধারণ কোচে নয়। আমাদের জন্য একটি প্রাইভেট ভিআইপি কেবিন বরাদ্দ করা হয়েছে।
সামাইরা কেবিনে ঢোকা মাত্র বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে গেল। কাঁচের দেয়ালঘেরা বিশাল কেবিন। ভেতরে দামী লেদারের সোফা। নরম কার্পেট আর তার ওপর একটি খাবারে সুসজ্জিত টেবিল।
সামাইরা সোফায় বসে জানালার বাহিরে দৃষ্টি রাখল।ট্রেনটি প্ল্যাটফর্ম ছাড়ল।
পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে যখন ট্রেন উঠতে শুরু করল, বাইরের দৃশ্যপট বদলে যেতে লাগল প্রতি মুহূর্তে। নিচ দিয়ে বয়ে চলা ছোট ছোট পাহাড়ি ঝর্নাগুলো এখন বরফের ভাস্কর্যের মতো স্থির।
পাইন বনের ওপর বরফের পুরু স্তরগুলো দেখতে সাদা কার্পেটের ন্যায় লাগছে।
আইগার পর্বতের সেই ভয়ংকর সুন্দর ‘নর্থ ফেস’ যখন জানালার একদম কাছে চলে এল, সামাইরার নিজের কল্পনার জগতকে সত্যিই বড় তুচ্ছ বলে মনে হল।
প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের মাঝেও এক অদ্ভুত নীরবতা বিরাজ করছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে শেহজাদের আইফোনটি বেজে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল নাম, ‘মা’।
শেহজাদ সামাইরার দিকে তাকিয়ে ইশারায় কাছে আসতে বলল।
-মা, ফোন করেছেন।
সামাইরা শেহজাদের কাছে এসে বসল। শেহজাদ সাথে সাথে তার বাম হাতটা সামাইরার কাঁধের ওপর দিয়ে দিল। তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। সামাইরা অস্বস্তিতে নড়েচড়ে বসলেও শেহজাদের শক্ত হাতের বাঁধন তাকে স্থির হতে বাধ্য করল। ভিডিও কল রিসিভ হতেই স্ক্রিনে ভেসে উঠল সুফিয়া রহমানের স্নেহমাখা মুখ।
-কিরে! কেমন ঘোরাঘুরি করছিস তোরা? আমার মা কোথায়?
সুফিয়া রহমানের কণ্ঠে আনন্দের সুর।
শেহজাদ ক্যামেরাটা ঘুরিয়ে সামাইরাকে ফ্রেমের ভেতরে নিল। সে হাসিমুখে বলল,
-ঘুরতে বের হয়েছি, মা। আমরা এখন ইয়ুংফ্রাউজোখের দিকে যাচ্ছি। তোমার মা তো সুইজারল্যান্ডের সৌন্দর্য দেখে আমাকে ভুলেই গেছে।
সামাইরা নিজের ভেতরের সবটুকু জড়তা ঝেড়ে ফেলল। মুখে এক চিলতে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলল। শুধালো,
-কেমন আছেন, মা? আপনার শরীর ভালো তো? ওষুধ ঠিকমতো খাচ্ছেন তো?
সুফিয়া রহমান হেসে উঠলেন।
-আমি ভালো আছি রে মা। তোদের দুজনকে একসাথে হাসিখুশি দেখলে আমার অর্ধেক অসুখ এমনিতেই সেরে যায়।
সামাইরা চোখ পাকিয়ে বলল,
-এসব ঘুষ দিয়ে লাভ নেই, মা। আমি জানি আপনি ওষুধ না খাওয়ার ধান্দায় থাকেন সবসময়। আমি বাড়ি ফিরে কিন্তু বাড়ির মেইডদের জিজ্ঞাসা করব!
-কি পাগল মেয়ে! তোরা ওখানে গিয়েও আমাকে নিয়ে পড়ে আছিস? নিজেদের সময় দে।
কথার মাঝখানে সুফিয়া রহমান একটু মজা করার সুযোগ ছাড়লেন না। তিনি ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
-শোন শেহজাদ, শুধু ঘুরলে হবে না। তোরা যখন ঢাকা ফিরবি, তখন কিন্তু ‘গুড নিউজ’ শুনতে চাই। এই বাড়িতে ছোট একজোড়া পায়ের বড় অভাব।আমার কিন্তু তর সইছে না!
শেহজাদ মুচকি হাসল। সামাইরা পরিস্থিতির চাপে মুখ ফসকে বলে ফেলল,
-অবশ্যই মা। আপনি যা চাইছেন তাই হবে।
শেহজাদ এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে সামাইরার দিকে আড়চোখে তাকাল। ওপাশ থেকে সুফিয়া রহমান মহা খুশি হয়ে দোয়া করতে করতে ফোন রাখলেন।
ফোনটা কাটার সাথে সাথে কেবিনের আবহাওয়া পাল্টে গেল। শেহজাদ সামাইরার কাঁধ থেকে হাত সরিয়ে নিল না। বরং তার আঙুলের চাপ আরও বৃদ্ধি করল। হীমশীতল গলায় বলল,
-অবশ্যই? বাহ সামাইরা! আমি তো জানতাম না তুমি আমার মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে এতটা উদগ্রীব। তুমি কি বুঝতে পেরেছো তুমি কী বলেছো?
সামাইরা ভড়কে গেল। সে মাত্রই বুঝতে পারল সে অনেক বড় ভুল করে ফেলেছে। সে আমতা আমতা করে বলল,
-আমি… আমি জাস্ট উনাকে খুশি করার জন্য বলেছি। উনি অসুস্থ মানুষ…
শেহজাদ সামাইরার কথা শেষ করতে দিল না। হ্যাচকা টানে তাকে নিজের ওপর শুইয়ে নিল।ওপর ঝুঁকে পড়ল।
শেহজাদ তার ওপর ঝুঁকে থাকা সামাইরার মুখমণ্ডল থেকে চুলগুলো সরিয়ে নিল। মিটিমিটি হেসে ফিসফিস করে বলল,
-আমার মা কিন্তু কোনো কথা ভুলে যান না সামাইরা। যেহেতু তুমি কথা দিয়ে ফেলেছো, তাহলে তো আমাদের বাবু হওয়ানোর প্রসেস আজ থেকেই শুরু করা দরকার। কী বলো? চলো তাহলে শুরু করা যাক!
সামাইরার চোখমুখ শুকিয়ে গেল। ভয়ে তার হৃদপিণ্ড বন্ধ হওয়ার যোগাড়। কিন্তু সামাইরার সেই ফ্যাকাশে মুখ আর ত্রস্ত চাউনি দেখে শেহজাদ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সে হঠাৎ হো হো করে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। কেবিনের নিস্তব্ধতা ভেঙে সেই হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
শেহজাদ হাসি থামিয়ে সামাইরার গাল আলতো করে টিপে দিল। তার গলায় এখন এক ধরণের অটল আশ্বাস। সে বলল,
-ভয় পেয়ো না সামাইরা। আমি তোমাকে ভয় দেখিয়ে অর্জন করতে চাই না। আমি চাই তুমি নিজের থেকে আমার কাছে আসবে। যেদিন তুমি আমাকে মন থেকে বিশ্বাস করবে , আমার কাছে ভালোবাসা চাইতে আসবে, সেদিনই আমি তোমাকে ভালোবাসার আদরে ভরিয়ে দিব। আর সেদিন থেকে, আই উইল শো ইউ ফিফটি শেডস অফ শেহজাদ, অল থ্রি হান্ড্রেড অ্যান্ড সিক্সটি ফাইভ ডেস!
সামাইরা ওর কথা শুনে রাগে চোখমুখ উল্টিয়ে বলল,
-স্বপ্ন দেখতে থাকুন মিস্টার চৌধুরী। আপনার ওই দিন কোনোদিন আসবে না।
শেহজাদ রহস্যময় হাসি গালে ঝুলিয়ে সামাইরাকে ছেড়ে দিল।
ততক্ষণে ট্রেনটি মেঘের স্তর ভেদ করে ইউরোপের সর্বোচ্চ স্টেশনে পৌঁছে গেছে। ট্রেনের দরজা খুলতেই এক অপার্থিব সৌন্দর্য সামাইরার চোখের সামনে উন্মোচিত হলো। চারদিকে মাইলের পর মাইল বিস্তৃত ‘আলেচ হিমবাহ’। আকাশের নীল রঙ আর বরফের শুভ্রতা মিলেমিশে একাকার।
তারা যখন অবজারভেটরির প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়াল, মনে হলো যেন মেঘের ওপরের কোনো রাজ্যে বিচরণ করছে। চারদিকের পাহাড়ি চূড়াগুলো আকাশের গায়ে হীরের টুকরোর মতো জ্বলজ্বল করছে। আধুনিক মানুষের তৈরি এই স্থাপত্য আর প্রকৃতির এই আদিম বিশালতা, সব মিলিয়ে সামাইরা অভিভূত হয়ে গেল।
হিমশীতল বাতাস তার চুলগুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছিল, আর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা শেহজাদ রহমান স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তি নিয়ে।
(চলবে…)
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল গল্পের লিংক
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৯
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৪
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৮