Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৮২


জান্নাত_মুন

পর্ব :৮২
🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:
এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

মাগরিবের দিকে শাওয়ার নিয়ে বিছানায় ল্যাপটপ সমেত বসেছে ইফান। এখন অব্ধি একই জায়গায় বসে আছে। উরুর উপর ল্যাপটপ, কানে ব্লুটুথ লাগিয়ে নিবিষ্ট মনে নিজ কাজে ব্যস্ত। বেলকনি দিয়ে আসা বাতাসের প্রবল ঝাপটায় রুমের সকল পর্দাগুলো দোল খেতে লাগল। এতে ইফানের মনযোগ ক্ষুন্ন হল। সে বিরক্ত মিশ্রিত নয়নে সেদিকে দৃষ্টিপাত করল। পরক্ষণেই তার ধূসর বাদামী অক্ষিযুগল শীতল হয়ে আসল।

সন্ধ্যার পর থেকেই দেশের আবহাওয়া বিরূপ ধারণ করেছে। আকাশের উদিত হওয়া ঝলমলে চাঁদও ঘন কালো মেঘের আড়ালে ক্ষণে ক্ষণে ঢাকা পড়ছে। বাইরে মদমত্ত ঝড়ো হাওয়া বইছে। তীব্র বাতাসের তোপে বাগানের বড় বড় গাছপালাগুলোও এক পাশ থেকে আরেক পাশে দোল খাচ্ছে। চারপাশ অমানিশার মতোই নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ছেয়ে আছে। বাগানের একখানা টিমটিমে লাইটের ম্লান আলোয় সবকিছু আবছা দেখা যাচ্ছে। দূরের বিল্ডিংগুলোতেও আজ তেমন একটা আলো জ্বলছে না। ঝড় আসার পূর্বাভাস পেয়েই সারা শহরে লোডশেডিং হয়েছে। যার কারণে আমার মনে হচ্ছে চৌধুরী বাড়ির সাথে তাল মিলিয়ে ব্যস্ত ঢাকা শহরও যেন অন্ধকারে তলিয়ে গেছে।

আমি বেলকনির রেলিঙ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। বাগান থেকে ভেসে আসা নানান দেশ বিদেশি ফুলের সুবাস চারপাশ মাতিয়ে রেখেছে। যার দরুন কেমন এক ঘোর লেগে আসছে আমার। পরক্ষণেই শীতল হাওয়ার ঝাপটায় বারবার আমার শরীরের রোমকূপগুলো শিহরিত হচ্ছে। প্রবল ঠান্ডায় বেলকনিতে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা দায়। তবে কেন জানি এই স্থানে আসলেই আমার সব অনুভূতি ছন্নছাড়া হয়ে পড়ে। শুধু গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি ওই অনন্ত আকাশের পানে। লক্ষ-কোটি তারার ভীড়ে খুব কাছের একজনের খোঁজ করি। নীরবেই এই ছোট্ট জীবনের সকল ক্লান্তি, অপূর্ণতাগুলো বিনা বাক্যে সঁপে দিই।

বাতাসের বেগ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে যেন। দেহের উন্মুক্ত অঙ্গগুলো হীম হয়ে আসছে। বাতাসের দাপটে চোখ দুটোও আবেশে বুজে আসছে। এমতাবস্থায় হঠাৎ দেহে উষ্ণ কিছুর পরশ অনুভব করলাম। অতি পরিচিত পুরুষালি দেহের ক্লোনের সুঘ্রাণ নাকে আছড়ে পড়তেই বুঝতে এক মূহুর্ত বিলম্ব হলো না কে হতে পারে। ইফান আমার দেহে ওড়না জড়িয়ে দিল। অতঃপর হাস্কি স্বরে বলল,
–“রুমে যাও, শরীর খারাপ করবে।”

–“এখানে থাকতে ভালো লাগছে।”

আমার কথার পর ইফান আর কোনো প্রত্যুত্তর করল না। বরং নিঃশব্দে পুনরায় রুমে চলে গেল। আমি ওড়নাটা দিয়ে ভলো করে নিজেকে ঢেকে নিলাম। বারবার দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসছে। একের পর এক ঘটে চলা অপ্রত্যাশিত ঘটনাগুলো বড্ড বেশি পীড়াদায়ক। চোখ বন্ধ করলেও ব্যথারা পিছু ছাড়ে না। বারংবার কানে ভেসে আসে কিছু পুরনো স্মৃতিকথা, যেগুলো কখনো ভুলবার নয়। কিন্তু যখনই মনে পড়ে হাসপাতালে সুমির বলা সেদিনের কথাটা,“মেডিকেল টেস্ট করে আমরা জানতে পেরেছি জুইয়ের দেহে পৃথক তিনজন পুরুষের ডিএনএ” তখনই নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। ঊষর বর্তমানটা মূহুর্তেই এলোমেলো হয়ে পড়ে। সকল দিশা হারিয়ে নিজেকে শূন্য মনে হয়।

আচমকা চারপাশ হলদেটে আভায় আলোকিত হয়ে উঠায় সহসা দৃষ্টি ঘুরালাম। ইফান বনফায়ার ধরিয়েছে। আমার দৃষ্টি লক্ষ্য করতেই আদুরে কণ্ঠে ডেকে উঠল,“জান এদিকে আস।”

–“এসবের কি দরকার ছিল?”

ইফান আমার জন্য চেয়ার পাততে পাততে বলে উঠল,“এত ঠান্ডায় অসুখ বাঁধাতে চাও নাকি? নিজের দেহের অবস্থা দেখেছ? কদিন আগেও মুটি ছিলে, আর এখন কাঠির মতো শুকিয়ে যাচ্ছ দিনে দিনে।”

আমি আড়ালে তপ্তশ্বাস ছেড়ে এগিয়ে গেলাম। ইফানের কথা ভুল নয়। সত্যিই আজকাল দেহ নেতিয়ে পড়ছে। অজস্র চিন্তার ভার আর দায়িত্ব আমি একা আর বহন করতে পারছি না। বোধহয় আমি বলেই এখনো নিজেকে শক্ত রাখতে পারছি। যদিও ভেতরে আর কোনো প্রাণশক্তির উপস্থিতি নেই। তবে আমার জায়গায় অন্য কেউ হলে নিশ্চিত অনেক আগেই ঝড়ে পড়ত।

ইফান মুন চেয়ারে বসে কুশন সরিয়ে আমাকে বসার জায়গা করে দিল। আমি বিনা বাক্যে এগিয়ে গেলাম। তবে বসার আগেই ইফান আমাকে টেনে নিজ কোলে বসিয়ে দিল। আমি কিছু বললাম না। এত ঠান্ডায় তার দেহের উষ্ণতা আমাকে বেশ স্বস্তি দিচ্ছে। ইফান কিছুক্ষণ আমাকে ঝাপটে ধরে নিজের দেহের সাথে মিশিয়ে রাখল। তীব্র বাতাসের তোপে আগুনের শিখাগুলো লকলকিয়ে উঠছে। খানিকটা সময় নৈঃশব্দেই পেরিয়ে যায়।

বাতাসের উন্মত্ততা ধীরে ধীরে কিছুটা শিথিল হয়ে আসে। আকাশের সেই উদ্ধত কালো মেঘগুলোও ক্রমশ সরে যেতে থাকে। পুনরায় স্নিগ্ধ, ঝলমলে চাঁদের দেখা মেলে। তার জোছনায় চারপাশ অদ্ভুত সুন্দর হয়ে ওঠেছে। ইফান আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। অতঃপর শব্দ করে আমার মাথায় চুম্বন এঁকে দিয়ে হাস্কি স্বরে বলে উঠল,
–“কদিন ধরে ঠিক মতো ঘুমাও না তুমি। এবার কিন্তু সত্যি তোমার শরীর অনেক খারাপ হবে, জারা।”

–“ঘুম না আসলে আমি কি করব?”

–“সিরিয়াসলি ঘুম আসে না?”

আমি কোনো প্রত্যুত্তর করলাম না। সত্যি বলতে চোখ দুটো ঘুমে বারংবার বুজে আসে। কিন্তু কেন জানি আমার ঘুম হয় না। চোখের পাতা এক মূহুর্তের জন্য বন্ধ করলেই মনে হয় এই বুঝি কোনো একটা অঘটন ঘটলো! প্রতি মূহুর্তে আঁতকে থাকি আমি। বিশেষ করে জুইয়ের কথা ভাবলেই শরীর অবশ হয়ে আসে, শিউরে ওঠি। কদিন একনাগাড়ে হাসপাতালে জুইয়ের পাশে থেকেছি। পরিবারের সকলকে মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছি। তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিল জুই। জ্ঞান ফিরার পর থেকেই মেয়েটা কারো সাথে কথা বলছে না। গতকাল জিতু ভাইয়া বাড়ি নিয়ে গেছে। আমি চেয়েছিলাম চৌধুরী বাড়িতে ওকে আমার কাছে রাখতে, কিন্তু শেখ বাড়ির কেউ তাতে সম্মত হয়নি। বড় আম্মু আর আম্মু তাদের কলিজার টুকরোকে আর এক মুহূর্তও চোখের আড়াল করতে চান না, তাই নিজেদের সাথেই নিয়ে গেছেন। এই বাড়িতে দিনরাত আমি অস্থির হয়ে থাকি। ইফানও বাসা থেকে কম বের হচ্ছে। হলেও কিছু সময়ের জন্য। তবে ঢাকার বাইরে কোথাও যাচ্ছে না। যত সম্ভব নিজের কাজ ঘরে বসেই করার চেষ্টা করে।

ইফান আলতো করে আমার ওড়না টেনে পা দুটো ভালো করে ঢেকে দিল। তারপরও আমাকে গুটিয়ে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকাল। কিছুটা মেকি রাগ নিয়েই বলল,
–“এই মেয়ে, রুমে চল। ঠান্ডা লাগছে তো তোমার।”

–“ভালো লাগছে এখানে থাকতে। ওয়েদারটা ভীষণ মনোরম।”

আমি আরও মিশে গেলাম ইফানের সাথে। ইফান আমাকে ছেড়ে উঠে রুমে চলে গেল। আমি সোজা হয়ে বসলাম। আকাশের দিকে তাকাতেই লক্ষ্য করলাম মেঘ কেটে গেছে। ঝলমলে চাঁদের পাশে অসংখ্য তারা ঝিকিমিকি করছে। আমি হাঁটু জড়িয়ে ধরে কাচুমাচু হয়ে বসে সেই মুগ্ধকর দৃষ্টি উদাস মনে দেখতে লাগলাম। ইফান মূহুর্তের মধ্যেই ফিরে আসল কম্ফোর্টার নিয়ে। আমাকে কম্ফোর্টারে মুড়িয়ে দিল। কফি বানিয়ে আমাকেও সাধল। আমি মানা করলাম। অতঃপর সে পাশে বসে আমাকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে কফি কাপে চুমুক দিতে লাগল।

চারপাশ জুড়ে নৈঃশব্দ বিরাজ করছে। বাগান থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক ভেসে আসছে। হঠাৎ সকল নীরবতা ভেঙ্গে বাতাসের সাথে ভেসে আসল ইফানের কণ্ঠ,
–”তোমার আর আমার সম্পর্কটা ঠিক প্রশান্ত আর আটলান্টিক মহাসাগরের বিশাল জলধারার মতো—মিলেও মিলে না।”

–“মাইলের পর মাইল, ক্রোশ ক্রোশ দূরত্বের চেয়ে থাক না কিছু অমিল। জীবনের অপূর্ণতাতেই তো ভালোবাসা সবচেয়ে গভীর।”

আমি থামলাম। আকাশের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ইফানের পানে দৃষ্টি স্থির করলাম। ইফান আগে থেকেই আমার দিকে তাকিয়ে। ওর চোখ দুটো অদ্ভুত রকমের সুন্দর। কখনো মনে হয় জলন্ত অগ্নিগিরি, আবার কখনো মনে হয় মহাকর্ষের ব্ল্যাকহোল। এই নয়ন জোড়ায় কিছু তো একটা গূঢ় রহস্য আছেই! আমি আনমনে হাসলাম। তরল গলায় ফের বলে উঠলাম,
–“যে গল্পে বিরহ যত বেশি, সে গল্পগুলোই অন্তহীন। হোক না আমাদের গল্পটাও একটু ভিন্ন।”

ফের বাতাসে তান্ডব শুরু হলো। খোঁপার গোছা থেকে বেরিয়ে আসা অবাধ্য চুলগুলো অবিরত চোখমুখের উপর দোল খেতে লাগল। সামনের জ্বলন্ত বনফায়ারের শিখাগুচ্ছ লকলকিয়ে উঠে চারপাশ গ্রাস করার এক বৃথা প্রয়াস চালাতে মগ্ন। সেই জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের হলদেটে আভা যখন আমার ফর্সা চেহারায় আঁচ লাগাচ্ছে, তখন যেন আমাকেই জলন্ত কোনো অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ভ্রম হচ্ছে। ইফান বিমুগ্ধ নয়নে আমার এই রূপান্তর লক্ষ্য করল। তার ধূসর-বাদামী অক্ষিযুগলে এক ঘোর নেমে এল। আমি অনুভব করতে পারছি তার সেই অতলান্ত গভীর চাহনি। ইফান হাত বাড়িয়ে আমার মুখের উপর উড়ন্ত চুলগুচ্ছ কানের পিছনে ঠুসে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে আওড়াল,
–“তুমি সত্যিই অগ্নিকন্যা!”

আমি ঠোঁট প্রসারিত করে নিঃশব্দে হাসলাম। সাদা ফকফকে মুক্তোর মতো চিরল দন্তপাটিগুলো দৃশ্যমান হলো। ইফান পলকহীন আমার দিকে তাকিয়ে। আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে তাকালাম তাঁর পানে। মিলন ঘটল দু’জোড়া তৃষ্ণার্ত নয়নের। বাতাসের তোড়ে লোকটার ঘন কালো ঘাড়-ছোঁয়া উষ্কখুষ্ক চুলগুলো আরও এলোমেলো হয়ে কপাল ঢেকে দিচ্ছে। আমি হাত বাড়িয়ে সেগুলো আরও অগোছালো করে দিতে লাগলাম। ইফান ক্লান্তিহীনভাবে এখনো তাকিয়ে। হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“ভালোই ছিলাম গন্তব্যহীন মরীচিকাময় অন্ধকার জীবনে। পাপে জর্জরিত হয়ে র’’ক্তের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। দাপিয়ে বেড়াতাম পুরো কালো দুনিয়া। হঠাৎ সাধ জাগল তোমার আগুনের তোড়ে তীব্রভাবে পোড়ার। এখন প্রতিনিয়ত পুড়ছি। পুড়ে ছারখার হচ্ছে আমার পাহাড়সম সকল ঔদ্ধত্য। যন্ত্রণায় ছটফট করছে এই পাষণ্ড রুহ। বল তো, তবুও কেন তোমার এই তীব্রতায় আরও বেশি পুড়ে যাওয়ার সাধ জাগে আমার? এবার তো শুধু ধূলিসাৎ হওয়াটুকুই বাকি।”

–“চাইলেই কি আর সব ভুলা যায়? মন যে মস্তিষ্কের উর্ধ্বে। তার উপর কারো অধিপত্য খাটে না। আমি চেষ্টা করি সব ভুলে থাকতে। কিন্তু মন যে মানে না।”

ইফান এক চিলতে হাসল। আমার দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সে প্রজ্বলিত বনফায়ারের শিখার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। পরনে অ্যাশ কালার টি-শার্ট। বলিষ্ঠ দেহে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। এতে দেহের ভাজগুলো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। উন্মুক্ত হাতে আঁকা হিজিবিজি ট্যাটুগুলো আগুনের আলোয় আরও রহস্যময় ঠেকছে। আমি ইফানের বাহু জড়িয়ে ধরে তার কাঁধে মাথা রাখলাম। মৃদু কণ্ঠে বললাম,
–“একটু সময় দাও আমাকে।”

–“কিসের?”

–“তোমার জন্য নিজেকে গোছানোর।”

–“প্রয়োজন নেই তার। তুমি যেমন তেমনই ঠিক আছ।”

–“রাগ করেছে আমার প্রতি?”

–“এটা কেন মনে হলো?”

–“তাহলে এত শান্ত হয়ে গেল কেন?”

–“আমি এমনই।”

–“কেমন?”

–“তুমি যেমন ভাব।”

–“আমি কেমন ভাবি তুমি কি করে জানলে?”

–“মন বলল।”

–“কি বলল?”

–“কি জানি!”

–“ইফান।”

–“হু?”

–“চল আমরা সব নতুন করে শুরু করি।”

ইফান আমার দিকে দৃষ্টি স্থির করল। আমি বলে উঠলাম,“চল একটা সংসার সাজাই। আমি সব বিসর্জন দিয়ে শুধু তোমার সংসারে মন দিব। আর তুমিও তোমার কালো অশুভ দুনিয়া ছেড়ে দিবে। সাজাবে আমার সাথে একটা সংসার?”

–“এটা সম্ভব নয়।”

–“কোনটা?”

ইফান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেঝেতে দু’হাটু গেড়ে বসে আমার কোমর জড়িয়ে ধরল। অতঃপর উদরে মুখ গুঁজে দিল। আমার হাত দু’টো নিজ থেকেই ইফানের মাথায় চলে এলো৷ চুলের ভাঁজে বিলি কেটে দিতে লাগলাম। ইফান নিচু গলায় বলে উঠল,
–“আমি কোনো কর্মচারী নই যে মন চাইলেই সব ছেড়ে দিব। আমি কালো দুনিয়ার অধিপতি। গোটা একটা পাপের সাম্রাজ্য চালাই। আমার সামনের পথ গন্তব্যহীন মরীচিকাময়। আর পিছনে মরণফাঁদ। কোনো উপায় নেই বের হয়ে আসার।”

–“আর আমি?”

আমার আকস্মিক প্রশ্নে সে থমকে গেল এক লহমায়। ইফান কিছু বলছে না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমার কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমার উদরে মুখ গুঁজে রাখায় ওর তপ্তশ্বাস সেখানে আঁচড়ে পড়ছে। আমি অনুভব করতে পারছি। ইফান সেখানে খড়খড়ে ওষ্ঠ জড়ো ছুঁইয়ে হাস্কি স্বরে বলে উঠল,
–“তুমি আমার বেঁচে থাকার কারণ। তোমার জন্য আমি সব করতে পারি।”

–“তাহলে এসব পাপ কাজ ছেড়ে দাও।”

–“অসম্ভব! তুমি ভুলে যাচ্ছ আ’ম আ ফা’কিং আন্ডারওয়ার্ল্ড মাফিয়া, ক্রিমিনাল। আ টোটাল ভিলেন। কোনো রুপালি পর্দার হিরো নই যে হিরোইনের জন্য এক নিমেষে সব বিসর্জন দেব। আমি প্রয়োজনে হিরোইনের জন্য ধ্বংসযজ্ঞ চালাব। খু”নের পর খু”ন করে চরাচর তছনছ করে দেব। তবুও আমার নিজ সত্তা থেকে এক চুলও বিচ্যুত হব না”

–“ইফান!!”

ফুঁস করে তপ্তশ্বাস ছাড়লাম। কি করব আমি এই লোককে নিয়ে, কিই বা আছে এই ডেসটিনিতে? জানা নেই! হতাশ কণ্ঠে আওড়ালাম,“পাপীরা পথ ভ্রষ্ট হয়। অচিরেই হারিয়ে যায়। তবে কি আমাদের এই বিরহী গল্পটাও..!

আমার হতাশাজনক চাহনি দেখে ইফান আমার দু’গাল হাতের তালুতে আগলে নিল। কপালে গভীর চুম্বন এঁকে দিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
–“বাট তুমি যদি আমাকে চাও, তাহলে আমি তোমাকে কখনোই একা ছাড়ব না। তুমি আমার এই নশ্বর দেহের আত্মা, আমার প্রাণশক্তি। যে করেই হোক পৃথিবীর সকল বাস্তবতার উর্ধ্বে গিয়ে হলেও তোমার কাছে থেকে যাব।”


ড্রয়িং রুমে বিষণ্ণ মনে বসে আছেন নাবিলা চৌধুরী। পাশেই ইতি বই-খাতা মেলে বসেছে, আর নোহা চিপস চিবুতে চিবুতে ইতির পড়াশোনার তদারকি করছে। জুইয়ের ঘটনা শুনার পর থেকেই মায়ের আঁচল ছাড়ছে না ইতি। নাবিলা চৌধুরীও পড়েছেন বিপাকে। একা হাতে অফিস আর সংসার সামলানো তার জন্য বড্ড কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগে মনিরা বাড়িতে থাকায় তিনি নিশ্চিন্তে থাকতেন, কিন্তু এখন আর কোনো কূল-কিনারা পাচ্ছেন না। অপরদিকে চৌধুরী বাড়ির দুই কর্তা হঠাৎ উধাও। ইমরানও ব্যবসার কাজে চট্টগ্রাম আছে। একজন মহিলা হয়ে একা হাতে কীভাবে এত বড় সাম্রাজ্য আর ব্যবসা সামলাবেন, তা ভেবেই তিনি হিমশিম খাচ্ছেন।

পলি এক পাশে রাতের রান্না চড়িয়ে দিয়ে দু’কাপ চা আর এক কাপ কড়া কফি বানিয়ে লিভিং রুমে এল। নাবিলা চৌধুরীর হাতে একটি চায়ের কাপ ধরিয়ে দিয়ে সে নুলক চৌধুরীর দিকে তাকাল। নুলক চৌধুরী অস্থির হয়ে সারা লিভিং রুম হেঁটে বেড়াচ্ছেন। কানে তার ফোন ধরে রাখা। এত উচ্চ স্বরে কথা বলছেন যে সবাই শুনতে পারছে।

–“কেমন বাবা তুমি? আজ কতদিন ধরে ছেলেটা বাড়িতে আসছে না। মানলাম সে বড় হয়েছে। কিন্তু এর আগেও কখনো দীর্ঘদিনের জন্য কোথাও গেলে আমাকে জানিয়ে গেছে।….শুন আমার ভীষণ টেনশন হচ্ছে। তুমি কিছু একটা কর…।”

পলি নুলক চৌধুরীর মেজাজ দেখে তাকে ডাকার সাহস পেল না। সে এগিয়ে গেল পাশের সোফার দিকে। মীরা সামনে ল্যাপটপ নিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজে ডুবে আছে। পলি কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল,
–“আপু তোমার কফি।”

–“থ্যাংক্স।”

গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিয়ে কফি কাপ হাতে তুলে নিল মীরা। পলি আড়চোখে মীরার হাবভাব লক্ষ্য করল। আগের মতো আর কথা হয় না তাদের মধ্যে। পলির এখন মনে হয় আগের মীরা চৌধুরীর সাথে বর্তমান গম্ভীর মীরা চৌধুরীর বিশাল ফারাক। পলি পুনরায় রান্নাঘরের দিকে এগোতে যাবে তার আগেই নজর আটকায় সিঁড়ির দিকে। ইফান আপাদমস্তক কালো পোষাকে রেডি হয়ে নিচে নামছে। পলি ঢেকে জিজ্ঞেস করল,
–“ভাইয়া আপনাকেও কি কফি বানিয়ে দিব?”

সকলেই ইফানের দিকে তাকাল। ইফান তার স্বভাবজাত গম্ভীর কণ্ঠে প্রত্যুত্তর করল,
–“নো নিড।”

পরক্ষণেই নাবিলা চৌধুরীর সাথে চোখাচোখি হল। ইফান মায়ের চোখের দিকে বেশিক্ষণ দৃষ্টি রাখতে পারল না। নাবিলা চৌধুরী শান্ত কন্ঠে শুধালেন,
–“কোথায় যাচ্ছ এই অসময়ে?”

–“দরকার আছে।”

নুলক চৌধুরী এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন,“বেটা, ভাইয়ের খবর কি তোমার কাছে আছে?”

ইফানের ভ্রু কুঞ্চিত হলো, যার দরুন কপালে কয়েকটি সূক্ষ্ম ভাঁজের সৃষ্টি হলো। ইফানের থেকে উত্তর না পেয়ে নুলক চৌধুরী ফের শুধালেন,“পঙ্কজের খবর জান কিছু? না আসলে ছেলেটা তো হুটহাট কোথাও যায় না।”

ইফান বাম ভ্রু’র নিচে আলতো চুলকে বিরক্তি নিয়ে বলল,“আমি কি করে জানব? গিয়ে দেখ কোথায় মরে-টরে পড়ে আছে।”

কথা শেষ করেই ইফান এগিয়ে যেতে লাগল। নুলক চৌধুরীর চেহারা অন্ধকার হয়ে গেল ইফানের এহেন উত্তর শুনে। তবে বেশি ভাবলেন না। কারণ এর আগেও ইফান এমন ত্যাড়া উত্তরই দিয়েছে। ইফানকে মীরা পিছন থেকে ডেকে উঠল,
–“ভাই।”

ইফান স্থির দৃষ্টিতে মীরার পানে তাকাল। মীরা ল্যাপটপ ছেড়ে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। ইফানের খানিকটা কাছে এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠা নিয়ে বলল,“মাহিন ভাইয়ের খোঁজ পেলাম না কোথাও। এখন কি করব বল তো? ওর জন্যই আমি বিডিতে আটকে আছি বাইরের সকল কাজ ফেলে।”

–“ডোন্ট ওয়ারি, আই’ল হ্যান্ডল ইট।”

নিজের কথা শেষ করেই ইফান গটগট করে চৌধুরী ম্যানশন থেকে বেরিয়ে পড়ল।


চারপাশ মৃদু অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে আছে। আশেপাশের জরাজীর্ণ দৃশ্য দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে এটা কোনো পরিত্যক্ত গোডাউনই হবে। চোখ দুটো বন্ধ করে চেয়ারে গা ছেড়ে বসে আছে মাহিন। তার ঠিক সামনেই নিথর হয়ে পড়ে আছে তিনটি ছেলের বী”ভৎস লা”শ। মাহিন নিজ হাতে গু’’লি করে মে’’রেছে। অপরাধ ছিল তারা জুইয়ের ঠিকঠাক দেখাশোনা করে নি। আর তাদের এই গাফিলতির জন্য এত বড় একটি অঘটন ঘটল। মাহিন নিজের ভেতরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ মিটিয়ে এখন স্মৃতির অতলে গা ভাসিয়েছে। এই তো বছর কয়েক আগের কথা, ইফানের অনুপস্থিতিতে তাকে প্রায়ই বাংলাদেশে আসতে হতো। এমনকি আমার সুরক্ষার খাতিরেও ইফান নানান প্রয়োজনে মাহিনকে পাঠাত। সেই সুবাদেই শেখ বাড়ির প্রতিটি মানুষকে মাহিন খুব কাছ থেকে চেনে।

জুইয়ের প্রতি মাহিনের অনুভূতিগুলো বরাবরই ভীষণ রকম অদ্ভুত। আমার দেখাশোনার পাশে জুইয়ের জন্যও লোক লাগিয়েছিল। সে জানে না কেন? শুধু তার মন বলেছিল জুইয়ের সেফটিও দরকার। জুই ধীরে ধীরে বড় হয়। মাহিন না চাইলেও এক দুর্নিবার আকর্ষণ অনুভব করে মেয়েটার প্রতি। তবে তা ছিল বরাবরই বিরক্তিকর। মাহিন অনুভব করেনি সেটা আসলে ভালোবাসা। সে শুধু জেয়লাসি অনুভব করত। বয়সের সাথে জুইয়ের চঞ্চলতা অনেকটা স্তিমিত হয়ে আসে। কিন্তু কাছের মানুষদের সাথে সবসময় উড়ন্ত পাখি। বাইরে সবসময় নিজেকে শান্ত স্বভাবের দেখালেও, আড়ালে সে ছিল বড্ড দুরন্ত আর ছটফটে। যাকে বলে মিচকে শয়তান। মাহিনের এই বিষয়টি কখনো সহ্য হতো না। সে সবসময় চাইত জুই যেন শান্ত প্রকৃতির হয়, সবার সাথে অকাতরে না মিশে, একটু ধীরস্থির থাকে।

বছর খানেক আগের কথা, মাহিন দেশে এসে সর্ব প্রথম কেরানীগঞ্জ গিয়েছিল জুইকে এক নজর দেখার জন্য। সে জানতো প্রতিদিন সকালে জুই প্রাইভেটে যায়। তাই কাজের বাহানা ধরে নিজেই নদীর ঘাটে যায়। কে জানত তাদের অপ্রত্যাশিত ভাবে দেখা হয়ে যাবে!

হঠাৎই কল্পনার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসে মাহিন। তার নির্ঘুম, রক্তবর্ণ ও ক্লান্ত চোখ দুটো সামনে স্থির হতেই ভয়ে ঢোক গিলল আলাল আর দুলাল। মাহিন অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
–“কি বললি শুনতে পাই নি?”

–“ভাই বাসায় যাবেন না?”

আলালের কথার পিছে কিছু বলল না মাহিন। পুনরায় চোখের উপর হাত ধরে স্থির বসে রইল। কদিন ধরে তাদের পুরাতন ফ্যাক্টরিতেই আছে সে। অনর্গল নে’শা দ্রব্য সেবন করেছে। আর তিনজন ছেলেকে এই কদিনে নড়ক যন্ত্রণা দিয়ে আজ খেলা খতম করেছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে মাহিন হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। কাঁধে তার কালো কোটটি তুলে নিয়ে কারো দিকে দৃকপাত না করে টালমাটাল পায়ে সে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। আলাল আর দুলাল একে অপরের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, অতঃপর নিঃশব্দে মাহিনের পিছু নিল।

কেরানিগঞ্জ।।

কলিং বেল দু’বার বেজে উঠতেই জিয়াদ এসে সদর দরজা খুলে দিল। বাইরে তাকানোর আগেই তীব্র বাতাসের এক ঝাপটা তার চোখেমুখে এসে আছড়ে পড়ল। জিয়াদ চোখ বন্ধ করতেই সামনের আগন্তুক ঝড়ের বেগে ভেতরে প্রবেশ করল। জিয়াদ দরজা বন্ধ করে পেছনে তাকাতেই মাহিনকে দেখতে পেল। সে খানিকটা এগিয়ে এসে মাহিন ও তার সাথে আসা লোকগুলোকে ভালোভাবে পরখ করে নিল। জিয়াদ শুধাল,
–“আপনি এখানে?”

–“জুই কোথায়?”

ভ্রু কুঁচকে নিল জিয়াদ। এরইমধ্যে বড় আম্মু এসে হাজির হলেন। মাহিন দেখে চিনতে ভুল করলেন না। হাসিমুখে এগিয়ে এসে শুধালেন,
–“বাবা তুমি? কেমন আছ, আর আমাদের এখানে হঠাৎ?”

–“জুইয়ের রুম কোনটি?”

অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন বড় আম্মু। তবুও ম্লান হেসে বললেন,“উপরে ঐদিকে…।”

বাকি কথা শোনার প্রয়োজন বোধ করল না মাহিন। সে বড় বড় কদমে সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত উপরে উঠতে লাগল। বিষয়টি জিয়াদের মোটেও ভালো লাগল না। মাহিনের পেছনে যাওয়ার জন্য সে উদ্যত হতেই আলাল আর দুলাল তার পথ আটকে দাঁড়াল।

চোখ দুটো বন্ধ করে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে আছে জুই। বুক অব্ধি কম্ফোর্টার টানা। মাহিন রুমের দরজা খুলে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বেডের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। অতঃপর জুইয়ের পা জড়িয়ে ধরে সেখানে মুখ গুঁজে দিল। এক মূহুর্তের জন্য ধরফরিয়ে উঠল জুই। চোখ মেলে তাকাতেই লক্ষ্য করল একজন শ্বেতশুভ্র রঙের শার্ট পরহিত পুরুষকে। প্রথমে জুইয়ের চোখে আতংক ভেসে উঠলেও পরক্ষণেই তা হীম হয়ে আসল। জুই আপ্রাণ চেষ্টা করছে মোচড়ামুচড়ি করে পা সরিয়ে নিতে। কিন্তু মাহিনের সেই লৌহকঠিন বাঁধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে সে ব্যর্থ হচ্ছে।

মাহিন হঠাৎ অনুভব করতে লাগল জুইয়ের দেহ অস্বাভাবিক ভাবে থরথর করে কাঁপছে। সে গলার স্বর খাদে নামিয়ে তরল কন্ঠে বলে উঠল,
–“আই’ম সরি। ভেরি ভেরি সরি। আই কুডে’ন্ট প্রটেক্ট ইউ।”

অপর প্রান্ত থেকে কোনো রা আসল না। মাহিন পুনরায় বলে উঠল,“এই জন্য তুমি আমাকে যা শাস্তি দিবে আমি মাথা পেতে নিব। বল কি শাস্তি দিতে চাও আমাকে?”

ফের অপর পক্ষ থেকে কোনো প্রত্যুত্তর এল না। মাহিন মাথা তুলে তাকাল জুইয়ের পানে। এক প্রকার ভয়ে কুঁকড়ে আছে জুই। ফ্যাকসে চেহারায় কিছু ক্ষত লক্ষ্য করতেই মাহিনের আহত হৃদয়ের যন্ত্রণাগুলো যেন আবারও প্রকট হলো। সে হৃদয়ে ভীষণ বাজে রকম চিনচিনে ব্যথা অনুভব করছে। ইচ্ছে হচ্ছে এখনই বুকের ভেতরের অঙ্গটা ছিঁড়ি দেহ থেকে খুলে ফেলে দিতে। মাহিন শুকনো ঢোক গিলল। এগিয়ে গিয়ে জুইয়ের মুখাবয়ব নিজের দু’হাতের মুঠোয় পুরে নিল। জুই চোখ খিঁচে নিল সহসা। নিজেকে ছাড়াতে অস্থির হয়ে উঠল। মেয়েটার এমন প্রাণান্তকর অস্থিরতা দেখে মাহিন তাকে ছেড়ে দিল। অতঃপর কোনো প্রকার পূর্বাভাস না দিয়ে জুইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। জুই নিজেকে ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে মাহিনের ঘাড়ে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মাহিন জুইয়ের মাথায় হাত ভরসার হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মাথায় চুমু খেল। বলতে লাগল,
–“কিচ্ছু হয়নি তোমার। কিচ্ছু হয়নি।”

বাঁধ ভাঙলো মেয়েটার কান্নার। বুকের ভেতরের তীব্র দহনে শ্বাস ভারী হয়ে আসছে মাহিনের। সে ঢোক গিলে ফের বলে উঠল,
–“আমার জানবাচ্চা কাঁদে না প্লিজ। আমি মরে যাচ্ছি।”

–“আ..আমি সবাইকে মনে করেছিলাম, আ..আপনাকেও। আ…”

আজ এতদিন পর বুলি ফুটল মেয়েটার মুখ দিয়ে। সকলে অনেক চেষ্টার পরও একটা শব্দও বের করতে পারে নি জুইয়ের মুখ থেকে। এখন খুব কসরত করে এটুকুই আওড়াতে পারল কন্দনরত মেয়েটা। মাহিন আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নিজের প্রতি তার পুঞ্জীভূত ক্ষোভ যেন দাবানলের মতো বেড়ে গেল। তার ইনো গার্ল তাকে মনে করেছিল! আর সে সেইভ করতে পারল না। চরম অপরাধবোধে মাহিনের নিজের অস্তিত্ব বিলীন করে দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। এ কেমন এক শ্বাসরুদ্ধকর আর তীব্র যন্ত্রণাদায়ক অনুভূতি? এর চেয়ে তো মৃত্যুই ঢের ভালো ছিল। মাহিনের নির্ঘুম, রক্তবর্ণ নয়নজোড়া বড্ড বেশি জ্বালাতন করছে। চোখের কোণে জমে থাকা বেদনাদায়ক অশ্রুগুলো নক্ষত্রের মতো ঝলঝল করছে। পুরুষ হয়েও এতদিন সবার আড়ালে সে নিঃশব্দে অঝোরে কেঁদেছে। অসহ্য যন্ত্রণাগুলোকে লাঘবের জন্য কড়া ড্রা”গসও নিয়েছে। কি লাভ হলো এসব করে? এক মূহুর্তের জন্য কি ভুলতে পেরেছে?

–“ডোন্ট ক্রাই ইনো গার্ল। আই হেইট ইউর টিয়ার্স।”

–“আ..আমাকে আর এই নামে ডাকবেন না। আমি আর পবিত্র নই।”

জুইয়ের একটা বাক্যেই রাগে মস্তিষ্ক ধবধব করে জ্বলে উঠল। জুই পুনরায় বলতে লাগল,“সেদিন কেন আপনি আসেন নি? আ..আপনি জানেন ওরা আ..আমায় খ..খুব কষ্ট দিয়েছে…”

কান্নায় ভেঙে পড়ল জুই। এদিকে জুইয়ের মুখে ওরা শব্দটা শুনে মস্তিষ্ক ক্রোধে ফেটে পড়ল। দুচোখের মধ্যে চিকচিক করতে থাকা অশ্রু কণাগুলো নিমিষেই উবে গিয়ে হানা দিল এক হিংস্র দানবীয় সত্তা। মাহিন নিজের বুক থেকে ঝটকা মেরে জুইকে সরিয়ে চোখের সামনে নিয়ে আসল। ভড়কে গেল জুঁই। মাহিনের সেই অস্বাভাবিক ও উন্মত্ত চাউনির তোপে ভয়ে তার দেহ জমে হিম হয়ে যাওয়ার উপক্রম অস্বাভাবিক ভাবে কাঁপতে লাগল জুই। মাহিন চোয়াল শক্ত করে হিসহিসিয়ে বলে উঠল,
–“ওরা কি?”

কিছু বলতে পারল না জুই। একটু আগে যে তার কি হয়ে গিয়েছিল, যার কারনে এভাবে দুর্বল হয়ে পড়ল মাহিনের সামনে বুঝেতে পারছে না সে! মাহিন উত্তর না পেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে পুনরায় শুধাল,
–“আনসার মি। টেল মি এভরিথিং। আই ওয়ান্ট টু হিয়ার ইট অল।”

মাহিনের বজ্রকঠিন কণ্ঠে জুঁইয়ের সারা শরীরে এক শীতল শিহরণ বয়ে গেল। সে তীব্র যন্ত্রণায় চোখ বুজে ফেলল। ওই বী”ভৎস স্মৃতিগুলো সে আর মনে করতে চায় না। এক অসহ্য অস্থিরতা তাকে গ্রাস করল। মাহিনকে কিছু বুঝতে দেওয়ার আগেই বিছানা ছেড়ে দৌড়ে পালাতে চাইল। কিন্তু মাহিন থাবা মে’রে ধরে আটকে নিল। জুই মোচড়ামুচড়ি করেও নিজেকে ছাড়াতে পারছে। মাহিন শেষবার হুশিয়ারী দিয়ে বলল,
–“আমার থেকে লুকানো বন্ধ কর। সব বল আমায়।”

পরের কয়েক মুহূর্ত রুমের ভেতর এক থমথমে নীরবতা বিরাজ করল। মাহিন নিজের চরম ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে চোখ বুজে দু’হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করে রইল। অতঃপর নিজেকে কিছুটা শান্ত করে চোখ মেলে কম্পমান মেয়েটার দিকে তাকাল। ধীর ও নমনীয় কণ্ঠে শুধাল,
–“কারা ছিল?”

সেদিন জুইকে কড়া ড্রাগস দেওয়া হয়েছিল। যার কারণে হুঁশও তেমন একটা ছিল না মেয়েটার। অস্ফুট স্বরে বলল,
–“সবাই কে চিনতে পারি নি।”

–“পঙ্কজ বাস্টার্ড বাদে আর কাকে চিনতে পেরেছিলে?”

–“বললে বিশ্বাস করবেন না।”

–“করব।”

–“আআপনি কেন বিশ্বাস করবেন আমার কথা?”

জুইয়ের এমন সংশয়পূর্ণ কথা শুনে মাহিনের কুঁচকে থাকা ভ্রুদ্বয় সোজা হয়ে গেল মাহিনের দৃষ্টি আরও শীতল হল। সে ঠান্ডা গলায় বলল,
–“এই পৃথিবীতে আমার এমন আপন কেউ নেই, যার খাতিরে আমি তোমার কথা অবিশ্বাস করব। আমাকে বিশ্বাস করে শুধু একবার নামটা বলেই দেখো কি করি।”

জুই এবার স্থির দৃষ্টিতে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির চোখের দিকে তাকাল।


মাহিন যেভাবে শেখ বাড়িতে এসেছিল ঠিক সেভাবেই কোনো বাক্য বিনিময়হীন বেরিয়ে যায়। হঠাৎ এভাবে এসে, কিছু না বলে চলে যাওয়ার কারণ উপস্থিত কেউ ঠাহর করতে পারল না।

রাত সাড়ে এগারোটার দিকে জিতু ভাইয়া বাড়িতে ফিরেছে। কাজেকর্মে মন বসে না তার। শুধু দায়ে পড়ে নিজ কর্তব্য পালন করছে। বাড়ি এসে দেখে সকলে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাই কাউকে ডেকে তোলার ইচ্ছে হলো না। সিঁড়ি দিয়ে হেটে একেবারে জুইয়ের রুমের সামনে এসেই থেমেছে তার পা জোড়া।

জুইয়ের ঘরের লাইট জ্বলছে। সে একা একাই ঘুমায়। মা, চাচি কাউকেই নিজের সাথে রাখে নি। থাকলেই কানের কাছে বিলাপ করা, কান্নাকাটি করতেই থাকে। সহ্য হয় না জুইয়ের। তাই নীরবে থাকলে বেশি স্বস্তি অনুভব করে।

জিতু ভাইয়া রুমের ভেতর ঢুকে বিছানার কাছে বসে পড়ল। হাত বাড়িয়ে ঘুমন্ত জুইয়ের মাথায় স্নেহের স্পর্শ বুলিয়ে দিতে লাগল। মাথায় চুমু দিয়ে আদুরে কণ্ঠে বলতে লাগল,
–“আমার বনুর কিছু হয় নি। সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাইয়া আছে তো? বনু সুস্থ হলেই ভাইয়া মেলায় ঘুরতে নিয়ে যাবে। যা চাইবে সব কিনে দিবে।
কি করে যে দেখতে দেখতে যে তুই বড় হয়ে গেলি, বুঝতেই পারলাম না। আজও মনে হয় এই তো সেদিন আমার সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়ে আছিস দশ টাকার জন্য। বলতি, ভাইয়া আমাকে তাড়াতাড়ি দশ টাকা দাও, ঝালমুড়িওয়ালা এসেছে। আশেপাশে মেলা বসলেই বায়না ধরতি নিয়ে যাওয়ার জন্য। আমার আঙুল না ধরে এক কদমও এগোতে পারতি না। দিনগুলো কতই না সুন্দর ছিল। রাতে সবকটা মিলে আমার রুম দখল করে রাখতি। জিয়াদের সাথে ঝগড়া লেগে আমার কাছে এসে কাঁদু কাঁদু গলায় নালিশ করতি। ভাইয়া বলেই পাগল ছিলি।”

বলতে গিয়ে আনমনে হাসল জিতু ভাইয়া। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সোনালি দিনগুলো। জিতু ভাইয়া আবারো বলতে লাগল,
–“তুই কি যে দুষ্ট ছিলি বনু। আমাকে সবচেয়ে বেশি ভরসা করতি, ভালোবাসতি। আবার আমাকেই বাঘের মতো ভয় পেতি। তুই কোনো দোষ করলে সারাদিন আমার থেকে লুকিয়ে থাকতি, আমার বকুনি খাওয়ার ভয়ে। আবার হাজারটা মিথ্যাে বলে সব দোষ জিয়াদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতি। আমি সব জেনে বুঝেও তোর সাইড নিতাম। জানিস বনু, ছোট বেলায় তোকে কাধে নিয়ে পাড়া ঘুরে ঘুরে ছড়া না কাটলে তো তুই ঘুমাতিই না। আমি তোকে কাঁধে নিয়ে পিঠ চাপড়ে দিতে দিতে ছড়া কাটতাম।”

জিতু ভাইয়া খানিকটা সময় তাকিয়ে রইল জুইয়ের পানে। মেয়েটা আরেক দিকে মুখ ঘুরে শুয়ে। তার বুকের ভেতরটা এক অসহ্য চিনচিনে ব্যথায় মুচড়ে উঠছে। জিতু ভাইয়া জুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
–“তোর পাশে আছি তো সবাই। কিসের ভয়ডর তোর? একটা ভালো ছেলে দেখে তোর বিয়ে দিব। যে তোকে কোনো দিন কষ্ট দিবে না। তুই তো ছোট বেলায় রুপকথার রাজপুত্রের মতো একটা ছেলেকে বিয়ে করতে চাইতি। দেখিস তোর জন্য আমি রাজপুত্রই খুঁজে আনব…..।”

ঘড়ির কাঁটা তার আপন গতিতে চলছে। রাত ক্রমশ গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। নিঝুম ঘরজুড়ে কেবল জিতু ভাইয়ার সেই আদুরে কণ্ঠের প্রতিধ্বনি ভাসছে। তিনি গুনগুন করে ছড়া কাটছেন,
“চাঁদ উঠেছে ফুল ফুটেছে
কদম তলায় কে?
হাতি নাচছে, ঘোড়া নাচছে,
সোনামণির বে।”

জুইয়ের বন্ধ চোখ জোড়ার ঘন পাপড়িগুলো নোনা জলে ভিজে উঠেছে। প্রতি মূহুর্তে কাঁপছে। জিতু ভাইয়া আর কিছুটা সময় পর ধীরে ধীরে রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যেতেই জুই চোখ মেলে তাকাল। দরজার পানে এক পলক বিমর্ষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বালিশে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে এক পর্যায়ে ক্লান্তি আর অবসাদে চোখ জোড়ায় ঘুম নেমে এল।

ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে ঘুরতে ঘুরতে রাতের শেষ প্রহরে এসে উপনীত হলো। আর কিছুক্ষণ পরই হয়তো মুয়াজ্জিনের আজানে চরাচর মুখরিত হয়ে উঠবে। পুরো শেখ বাড়ি এখন গভীর নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন। সবাই ঘুমের রাজ্যে বিভোর। সদর দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকল আগুন্তকঃ। নিকষ অন্ধকারের মাঝেই অত্যন্ত সন্তর্পণে ধীর পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সে এসে পৌঁছাল জুঁইয়ের ঘরের সামনে। আস্তে করে ধাক্কা দিতেই রুমের দরজা খুলে গেল। অতঃপর ভেতরে ঢুকে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। নজর বিছানায় ঘুমন্ত অবস্থায় শুয়ে থাকা জুইয়ের দিকে।

হঠাৎই জুইয়ের অস্বস্তি লাগছে ঘুমের ঘোরে। আচমকা চোখ মেলতেই দৃষ্টি আটকাল সুদূরে দাঁড়িয়ে থাকা মাহিনের পানে। ধরফরিয়ে উঠে বসল জুই। চোখেমুখে আতংক, কারণ মাহিন স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। বৃষ্টির পানিতে আধভেজা তার দেহ। পরনের সফেদা রঙের শার্ট এখন র”ক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। হাতে একটা কালো পলিথিন ব্যাগ। সেখান থেকেও চুইয়ে চুইয়ে র”ক্ত পড়ছে। জুই ভয়ার্ত দৃষ্টি মাহিনের দিকে ঘুরাল। কাঁপা কাঁপা হাতের ইশারায় পলিথিন ব্যাগটিকে দেখাল। থিরথির করে কাপছে জুইয়ের ওষ্ঠপুট। সে অস্ফুটে আওড়াল,
–“ক..কি এটায়?”

চলবে,,,,,,,,

পিলিজ রিয়েক্ট আর বেশি বেশি কমেন্ট করে দিবেন। হ্যাপি রিডিং🥹🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply