#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;৩৪
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
প্রকৃতির সেই তাণ্ডবময় ঝড়ের অবসান ঘটেছে। শান্ত, নিস্তব্ধ রজনীর বক্ষজুড়ে ধীর পদক্ষেপে হেঁটে চলেছে এক জোড়া নবদম্পতি।
বৃষ্টি থেমে গেছে যে আধা ঘন্টা পেরিয়েছে। তবে এখনো মৃদ্যু বাতাস বইছে। বাতাস আসতেই গাছের পাতার পানি গুলো ঝরে পড়ছে শরীরে। তরঙ্গের বাহুতে মিশে হাঁটছে তরী। বাতাসের তালে কেঁপে কেঁপে উঠছে দু’জন। যদি ও তরীর থেকে তরঙ্গের বেশি শীত করছে। কারণ, তরঙ্গের কালো শার্টটা তার তরীজানের গায়ে। ছেলেটা সেন্টু-গেঞ্জি পরা। তরীর কালো শাড়িটা বৃষ্টিতে ভিজে শরীরের সাথে সিটিয়ে গিয়েছিলো। যার দরুন শরীরের অপ্রত্যাশিত অঙ্গ গুলো প্রতীয়মান হয়ে উঠেছিলো। যদিও এখন রাত; তবুও তরীর ব্যাপারে ছেলেটা ন্যানো পার্সেন্ট ও রিস্ক নিতে চায় না। ফলস্বরূপ, এখন শীতের তোপে কাঁপছে সে।
বৃষ্টির পানিতে এর্লাজি থাকার কারণে তরঙ্গের চোখ মুখ লাল হয়ে কিঞ্চিত ফুলে হয়ে উঠেছে। তা তরীর আঁখি খোচরেই রয়ে গেছে তা। তরঙ্গের বুকের কাছে পড়ে থাকা তরী অন্ধকারের মাঝে অতো কিছু দেখেনি। বাড়ির কাছে আসতেই ল্যাম্প পোস্টের আলোয় টলতে থাকা তরঙ্গের পা জোড়া দেখতেই ভ্রু- সংকুচিত হয়ে এলো তরীর। ছেলেটা ঠিক ভাবে হাঁটতে পারছে না। তবুও তরীর সাথে পা মিলিয়ে হাঁটছে সে।
–” আপনার বেশি খারাপ লাগছে তরঙ্গ?”
–” এতক্ষণ লেগেছিল। এখন বেটার ফিল করছি।”
দীর্ঘ শ্বাস চাপলো তরী। সে ও ভেবেছে কি! এই ছেলে বলবে নাকি নিজের সমস্যার কথা? সে তো একাই একশো। শরীর খারাপের কথা তরীকে বললে তো তার জাত পড়বে। বাড়ির দরজায় আসতেই কলিংবেল চাপলো তরঙ্গ। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে, চুল থেকে বাড়তি পানি গুলো ঝেরে নেওয়ার মাঝেই; ভেতর থেকে ভেসে এলো কুঁড়ি বছরের এক তরুণীর রিনরিনে গলা।
–” আসছি।”
মেয়েটির কণ্ঠ কর্ণকুহরে প্রবেশ করতেই তরীর মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেলো। তরঙ্গ অবশ্য শান্তই আছে। সে নিজের মতো পকেট থেকে ফোন আর ঘড়ি বের করতে ব্যস্ত। বৃষ্টির পানিতে ফোনের কিছু না হলে ও ঘড়ির চামড়া ভিজে ফুলে উঠেছে। মিনিট দুইয়ের মাঝে দরজার কপাট দুটো দু’দিকে মেলে গেলো। দরজার ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে এলো লাবণ্যের গোলগাল সুন্দর মুখটা।
–” কেমন আছো তরঙ্গ? এতোক্ষণ কোথায় ছিলে তুমি? জানো, সেই বিকেল থেকে অপেক্ষা করছি।”
একসাথে লাবণ্যের এতো প্রশ্নে বিরক্ত হয়ে মুখে ‘চ’ সূচক উচ্চারণ করলো তরঙ্গ।
–” আমার জন্য তোকে অপেক্ষা করতে কে বলেছে? যার অপেক্ষা করার কথা। সে তো পাশেই আছে। দ্বিতীয়ত, আমি তোর বড় ভাই। ভাইয়া ডাক!”
–” ভিজলে কি করে? তোমার তো বৃষ্টির পানিতে এর্লাজি আছে।”
–” মনের খুশিতে ফড়িং এর মতো লাফাতে লাফাতে।”
তরঙ্গের ত্যাড়া কথার অপমানে লাবণ্যের সুন্দর মুখশ্রী মলিন হয়ে গেলো। থতমত খেয়ে তরীর দিকে তাকালো সে। তরী নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। লাবণ্যে ফের সুধালো;-
–” এমন করে বলছো কেন তরঙ্গ? আমার বুঝি কষ্ট হয় না!”
–” সরি, তরী জান ছাড়া কারো দুঃখ আমার চোখে পড়ে না। শ্যামবর্ণ ছাড়া সব রঙের ক্ষেত্রে আই’ম কালার ব্লাইন্ড।”
গজগজ করতে করতে লাবণ্যের সাথে কথা শেষ করে তরীর দিকে তাকালো সে।
–” ভেজা শাড়ি পাল্টে আমার রুমে এসো। শরীর খুবই খারাপ লাগছে জান! মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। বিয়ের পর ও একা বিছানায় জ্বর নিয়ে কাতরাতে পারবো না। বউ বুকে থাকলে জ্বর ও মধুময় লাগবে। নিজে নিজে আসলে ভালো। আমি গেলে সুদে আসলে হিসেব তুলে নিবো। তাই ভালোয়, ভালোয় লক্ষী মেয়ের মতো চলে এসো।”
তরঙ্গের এহেন থ্রেটে অসহায় মুখে তরী তাকিয়ে রইলো। ছেলেটা তাকে হুকুম করলো? নাকি আবদার? এর মাঝে আবার চেঁচিয়ে উঠলো তরঙ্গ।
–” এখন কি বাড়িতে ও ঢুকতে দিবি না আমাকে? সর দরজা থেকে।”
বিরস মুখে এক পাশে সরে দাঁড়ালো লাবণ্য। বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বিড়বিড়িয়ে উঠলো ছেলেটা।
–” যাকে তরঙ্গ বলে ডাকতে বলি। সে ডাকছে না। অন্যজন হেদিয়ে মরছে। শালা আমার জীবনে লাভ লস নাই।”
তরঙ্গ সিঁড়ির দিকে যেতেই লাবণ্য সরাসরি তরীর দিকে তাকালো। মেয়েটা অসম্ভব সুন্দরী নয়; শ্যামলা। এই গায়ের রঙ কে সমাজের চোখে কালো হিসেবেই ধরা হয়। অন্তত ফর্সা তরঙ্গের পাশে বেমানান। লাবণ্যের ধারে কাছে ও দাঁড়ানোর যোগ্যতা নেই এই মেয়ের। কিসের অভাব তার? তরীর থেকে শতগুণ সুন্দর। ছেলেরা পাগল তার কথা শুনতেই। সেখানে তরঙ্গ তাকে পাত্তাই দেয় না। ঠিক করে তাকিয়ে ও দেখে না। তার পাশে বেমানান লাগা মেয়েটার পেছন পেছন ঘুরে সারাদিন।
******
ক্লান্ত শরীরে তরী রুমে প্রবেশ করতেই কোথা থেকে ছুটে এসে তরীর কোমর জড়িয়ে ধরলো তিন্নি। জড়িয়ে ধরা শেষে বোনের কব্জি টেনে কামড় বসিয়ে দিলো বাচ্চাটা।
–” আমাদের ছেড়ে পালিয়ে চলে যাচ্ছিলে কেন?”
বোনের কামড়ে শিনশিন করে উঠলো তরীর হাত। সাথে নিজের পিঠের ব্যথা ও হঠাৎ করে বেড়ে গেলো মনে হলো। বৃষ্টির ফোঁটায় চামটা মনে হয় উঠে গেছে পিঠ থেকে। নিজের কষ্ট আড়াল করে কোমল হাসলো তরী। আহ্লাদি বোনকে আবার জড়িয়ে নিলো সে।
–” আমি পালাইনি তো পাখি। পালাতে পারিনি তোদের জন্য। আমি আর তোর তরঙ্গ ভাইয়া একটু কাজে বাহিরে গিয়ে ছিলাম। দেখ ফিরে এসেছি।”
চুপটি করে বোনের কথা শুনে খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো তিন্নি। বোনের রাগ পড়েছে ভেবে সস্থির শ্বাস ফেললো তরী। হুট করে তরীকে ছেড়ে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ালো তিন্নি।
–” ওও তরঙ্গ দুলাভাই? দুলাভাইয়ের সাথে বাইরে গিয়েছিলে?”
নিমিষেই তরীর মুখ হা হয়ে গেলো। হাঁটুর বয়সি বোনটাও তাকে পঁচাচ্ছে? এই দিন ও দেখতে হচ্ছে তাকে? বোকা বোকা চাহনি নিক্ষেপ করে তাকিয়ে রইলো তরী। প্রথমে সর্বোচ্চ সাহস সঞ্চার করে তরঙ্গ কে দুলাভাই ডাকলে ও এখন আর বোনের সামনে দাঁড়ানোর সাহস হচ্ছে না তিন্নি। ফলস্বরূপ লেজ গুটিয়ে রুম ছেড়ে পালালো সে।
******
পরণের ভেজা শাড়ি পাল্টে; নিত্যদিনের পরিহিত থ্রি-পিজ গায়ে জড়ালো তরী।
ভেজা চুলে, ক্লান্ত শরীরে বিছানায় এসে বসলো সে। তিন্নিটা এখনো রুমে আসেনি। হয়েছে একটা ফাঁকিবাজ। পড়ার টেবিল থেকে একবার ছাড়া পেলে তার আর ফেরার খবর থাকে না। অথচ মাস দুয়েক পরই বাচ্চাটার পরীক্ষা। চুলে গামছা না পেঁচিয়েই রুম থেকে বেরোলো তরী। চুল থেকে টুপটাপ পানি পড়ে; ঘাড়ের কাছের জামা ভিজে যাচ্ছে। রুম থেকে বেরিয়ে, করিডোরে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকালো তরী।
সোফায় বসে কাটুন দেখছে বাচ্চাটা। উপর থেকে বোনকে ডাকার প্রস্তুতি নিতেই হাতে টান পড়লো তরীর। পাশ ফিরে তাকাতেই উষ্কখুষ্ক চুলের তরঙ্গ কে দেখতে পেলো। জিন্স, শার্ট বদলে ট্রাউজার, র্টি-শার্ট পরেছে। তরীকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টানতে টানতে নিজের রুমে নিয়ে এলো সে। তরীকে ডিভাইনে বসিয়ে দিয়ে নিজের আধ ভেজা টাওয়াল এনে তার পেছনে এসে দাঁড়ালো তরঙ্গ।
–” ভাই মানলাম আমি একটু বেশিই যত্নবান। তাই বলে জামা কাপড় ভিজিয়ে আমাকে সিডিউস করবি?”
তরীর লম্বা চুল গুলো আলতো হাতে টাওয়াল দ্বারা মুছতে শুরু করলো তরঙ্গ। সে চুলে হাত দিতেই, তরীর মনে ভয় জাগলো। ছেলেটা পিঠের ক্ষত দেখে ফেললে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলবে। উঠে যাবার জন্য, উদ্যত হতেই তরীর চুল টেনে ধরলো সে।
–” সকালে উঠেই বাড়ি ছেড়েছিস কেন? কি সমস্যা তরীজান? এখন কি প্রতিদিন তোকে বাচ্চাদের মতো রাস্তা থেকে তুলে আনা লাগবে?”
তরী আমতা আমতা করে উঠলো। তরঙ্গ মনোযোগ দিয়ে নিজের কাজ করছে। ডান পাশের চুল বাম পাশে সরাতে গিয়ে তার ভ্রু জোড়া সংকুচিত হয়ে এলো। অবাক নয়নে, বাকি চুল গুলো সরিয়ে পিঠের দিকে তাকালো তরঙ্গ। তাজা দগ*দগে ক্ষতটা দেখতেই শির শির করে উঠলো তার শরীর। তরঙ্গের মনে হলো তার হৃদয়ে বেশ জোরে কেউ চাবুক ছুঁড়েছে। নিভে আসা গলায় তরীকে ডাকলো সে।
–” তরীজান???”
তরঙ্গের হিমশীতল স্বর শুনে শিউরে উঠল তরী। জবাব খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠল তার মস্তিষ্ক, মনের মধ্যে সাজানো কথা গুলো গলায় এসে আটকে যাচ্ছে। এরই মাঝে তরঙ্গ শক্ত হাতে, তার হাত চেপে ধরে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। বড় বড় পদক্ষেপে তরীকে নিয়ে সোজা ড্রয়িংরুমে নেমে এলো ছেলেটা। হাঁক ডাক ছেড়ে ডাকলো মা-চাচিকে।
–” মা? মা? চাচি?”
এই রাত দুপুরে তরঙ্গের এমন গলা ফাটানো চিৎকারে বিরক্ত হয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন, ফারহান দেওয়ান, ফোরকান দেওয়ান এবং ওনাদের সঙ্গীনিরা। ড্রয়িং রুমে পা রেখেই গম্ভীর কন্ঠে ফারহান দেওয়ান সুধালেন।
–” এই রাত – দুপুরে এমন চিৎকার করছো কেন তরঙ্গ? এটা ভদ্রলোকের বাড়ি।”
–” হ্যাঁ চাচ্চু, আমি ও আগে তাই জনতাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল জানতাম এতোদিন।”
ফারহান দেওয়ান এসে সোফায় পিঠ এলিয়ে দিলেন। তার দেখাদেখি ফোরকান দেওয়ান ও বসলেন। বুসরা আর সাহনারা দাঁড়িয়ে আছে। সাহানারার মুখ জুড়ে ভয়ের অস্তিত্ব। কপালের পাশটাতে ঘেমে উঠেছে। ছেলের রাগী কন্ঠ শুনেই; তিনি বুঝে গেছেন। যে তরঙ্গ ওনার কুকীর্তি সম্পর্কে জেনে গেছে। মনে মনে আল্লাহর নাম জপতে লাগলেন তিনি। পাঞ্জাবির পকেট থেকে চশমা টা নিয়ে চোখে পরে নিলেন ফারহান দেওয়ান।
–” এমন হম্বিতম্বি না করে এখানে এসে বসো তরঙ্গ। বসে বলো কি হয়েছে।”
চাচার এমন গা ছাড়া ভাব দেখে আরেক কাঠি রাগ ভাবলো তরঙ্গের। সিঁড়ির পাশে থাকা বড় ফ্লাওয়ার বাসটায় লাথি বসালো সে। মূহুর্তে নীরবতা চাপিয়ে ঝনঝন করে কাঁচের টুকরো গুলো ড্রয়িং রুমের মেঝেময় ছড়িয়ে পড়লো।
–” তুমি কোনোদিন ভালো বাবা হতে পারোনি বলে! আমাকে ও ইররিস্পনসাবল হাজবেন্ড ভেবো না, চাচ্চু!”
–” তরঙ্গ!”
–” আমাকে তরী ভেবে থাকলে তুমি ভুল চাচ্চু। আমি তোমার মেয়ে না। যে তোমার হুংকারে থেমে যাবো। বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে? চাচি মারা যাওয়ার পর থেকে একটা দিন তুমি নিজের মেয়েদের খবর রেখেছো।”
কাঁচুমাচু হয়ে গেলো ফারহান দেওয়ানের মুখ। বড় ভাইয়ের সাথে নিজের ছেলের এমন আচরণে তিনি বড়ই বিব্রত। ছুটে এসে তরঙ্গের বাম গালে ডাটিয়ে বসিয়ে দিলেন একটা চড়। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন তিনি।
–” এই অজাতের বাচ্চা। মুখে মুখে কার সাথে তর্ক করছিস! বুঝতে পারছিস না?”
বাবার হাতে চড় খেয়ে দ্বিগুণ ক্ষেপে গেলো ক্ষেপা তরঙ্গ। রাগে তিরতির করে কাঁপছে তার চোয়াল। ফর্সা মুখ লাল হয়ে গেছে বহু আগে।
–” এক ব্যর্থ বাবার সাথে কথা বলছি। যে নিজের মেয়েদের রক্ষা করতে পারে না। দ্বিতীয় ওয়াইফের কথায় উঠে বসে।”
( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! কাল একবার কেঁটে গিয়েছিলো। তাই আর দিতে পারিনি। সেইম লেখা আবার লিখলাম। হাতের ব্যথায় মরে যাচ্ছি।”
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩০
-
She is my Obsession পর্ব ৩৩
-
She is my Obsession পর্ব ১০
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৮
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২২
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ৩৯
-
She is my Obsession পর্ব ২৩
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৯