Golpo ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ ডিফেন্স রিলেটেড

ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৪


ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ

লেখনীতে_সাদিয়া

পর্ব_৪

 সবাই নীচের নোর্ট পড়ে নিবেন। 

ভয়ে রাহার অন্তর আত্মা কাঁপছে। ছোট্ট শরীরটা নড়ছে। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসছে। ভিহান ভাই এর আগানোর তালে হতভম্ব কিংকর্তব্যবিমূঢ় রাহা একপা একপা করে পিছিয়ে যেতে লাগল। সমস্ত চিন্তা তার দলা পাকিয়ে যাচ্ছে। কি ভয়ংকর ব্যাপারস্যাপার! ভিহান ভাই এভাবে এগিয়ে আসছে কেন?

রাহার কথা জড়িয়ে যায়। ক্ষীণ ধরে আসা গলায় বলে তবুও, “আ আপনি..”

ভিহান অযথা কথা বলে না কখনো। মেপে মেপে কম কথা বলার গম্ভীর লোক সে। শার্টের লাস্ট বাটন টায় এবার হাত রাখে আরেকটা পা এগিয়ে গেলো সে।

“ক কি করছেন ভিহান ভাই?”

“আমি কেমন সেটা তোকে দেখাচ্ছি।”

“আ আপনি শার্ট খুল খুলছেন কেন?”

“গাঁধা নাকি তুই? বললাম না দেখাচ্ছি?”

“আ আপনি কি পা পাগল হয়ে গেলেন নাকি? আমার সামনে শার্ট খুলছেন? এ কেমন কাজ আপনার? ছিঃছিঃ।”

ভিহান শেষের বোতামটা খুলে শার্টটা আরেকটু নামিয়ে নিলো। কলারটা পেশীবহুল বাহুর কাছে এনে প্রস্থ বুকটা উদাম করলো। এরপর ধমকে বলল,
“শাট আপ ড্যাম। জাস্ট লুক এট মি।”

ভীতু রাহার হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেলো। ভিহান ভাই এর কি হলো হঠাৎ? এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেন? মাথা কাজ করে না রাহার। কি বলবে কি করবে সব যেন গুলে খেয়ে নিয়েছে পেটুক রাহা।

“কি যেন বলছিলি? কোন গানটা গাইছিলি? কি লাভ হবে না বল তো আবার।”

“আপনি এত বেহায়া ভিহান ভাই? ছিঃ লজ্জা শরম বোধহয় গোসলের সাথে ধুয়ে ফেলেছেন।”

“তাতে তোর কি? তাকা এদিক। এবার ভালো করে দেখে বল কোন দিক দিয়ে আমি কাইল্লা?”

ভয়ে ভেতরটা কাঁপে রাহার। কথা ঠিক করে আসে না গলা দিয়ে। আমতাআমতা করে জানায়,

“আ আমি কি আপনায় বলেছি নাকি?”

“তো কাকে বলেছিস স্টুপিড?”

“আ আমি তো গান গাইছিলাম।”

“ওই গানটাই কেন গাইতে হলো তোর? সাবান সোডা আমি ছাড়া কে মাখছিলো?”

“আশ্চর্য তো ভিহান ভা ভাই। আমি এমনি এমনি গান গাইছিলাম।”

“কেন?”

“আমার ইচ্ছা হয়েছিল।”

“ওটা আমাকে দেখেই গেয়েছিস।”

“না।”

“হ্যাঁ।”

“একদমই না।”

ভিহান আরেক কদম এগিয়ে এলো। কুঞ্চিত ভ্রুর মাঝে একটা ভ্রু সুকৌশলে দুলিয়ে প্রশ্নাত্মক সুরে বলছিল, “হ্যাঁ?”

“কিছ কিছু না।”

“গানটা আমাকে দেখেই গেয়েছিস তো?”

রাহা ভয়ে পিছিয়ে যায়। নির্বোধ নিস্তেজের মতো ভিহান ভাই এর দিকে তাকিয়ে একবার উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। পরক্ষণে মাথা দুই পাশে নাড়িয়ে দ্রুত বলে আবারও, “না, একদম না।”

ভিহান গম্ভীর শক্ত অভিমুখে এবার রাহার চিবুক চেঁপে ধরে। ধারালো সূক্ষ্ম কন্ঠে বলে,

“এদিক তাকা, ভালো করে দেখে বল আমায় কাইল্লা লাগে কি না।”

কি আশ্চর্য! ভিহান ভাই এর মাথামোথা কি আজ খারাপ হয়ে গিয়েছে নাকি? রাহা চোখ মুখ খিঁচে নিয়েছে। মেয়েটাকে অস্বস্তিতে জমে যেতে দেখে বাঁকা হাসে ভিহান তার কেমন পৈশাচিক এক আনন্দ হলো মনে। সে আবারও শক্ত গলায় ধমকে বলল,

“তাকা এখানে রাহা।”

থুতনি থেকে হাত না সরানোতে উপায়ন্তর না পেয়ে রাহা সত্যিই তাকালো সামনের দিকে। লাজ শরম ভুলে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল। ভিহান ভাই এর খাঁজকাটা ওই ফুলো বুক দেখে শিউড়ে উঠল রাহার শরীর। তড়িতের ঝলকে সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠল। অদ্ভুত ভাবে বুকের ভেতরের স্পন্দন হঠাৎ তীব্র আকার ধারন করল তার। দিনদুনিয়া ভুলে বোকার মতো এক নজরে রাহা তাকিয়ে রইল ভিহানের উদোম বুকের দিকে। তার এমন চোখের পলক না পড়া দৃষ্টি দেখে কপাল কুঁচকে এলো ভিহানের। ভ্রুকুটি করে সে একবার নিজের উদাম বুকের দিকে তাকিয়ে আবারও চোখ দিল রাহার উপর। মেয়েটা নিশ্বাস আটকে বরফের মতো জমে দাঁড়িয়ে আছে। ভেতরের মাত্রাতিরিক্ত তীব্র ঝড়ের প্রভাবটা সামলে উঠতে পারলো না ওইটুকুন রাহা। তাল জশ সামলাতে না পেরে ওখানেই জ্ঞান হারালো সে। নিস্তেজ শরীরটা নিয়ে ঢলে পড়ল নিচের দিকে। ফ্লোরে পড়ার আগেই ভিহান এক হাত বাড়িয়ে চেঁপে ধরল রাহার ছোট্ট শরীরটা। মুহূর্তে অচেতন রাহা সমস্ত ভারটা ছেড়ে দিলো ভিহানের উপর। আচমকা ঘটনায় ভিহানও খানিকটা আশ্চর্য হলো সেই সাথে কিছুটা বিরক্তও। কপাল কুঁচকে তার বুকের উপর ঢলে পড়া রাহার দিকে নজর দিলো। ক্ষীণ স্বরে চিবিয়ে বলল, “স্টুপিড মাথামোটা একটা।”

একটা লম্বা শ্বাস ছাড়ল ভিহান। নিজের বুকের সাথে রাহা লেপ্টে আছে। ওর শরীর থেকে মিষ্টি একটা বাচ্চাবাচ্চা ঘ্রাণ আসছে। গাঁধা টা যে এখনো বেবি পাউডার মাখে। উদোম বুকে রাহার গরম নিশ্বাস আছড়ে পড়ছে। ভিহানের বুকে জলোচ্ছ্বাস বইতে শুরু করল বুঝি। দাঁতে দাঁত চেঁপে নিজের অশান্তি দমন করতে চাইলো। রাহার কানের কাছেই ছিল তার মুখটা। ফিসফিস করে বলল সে,

“তুই আমার সেই অশান্তির নাম রাহা, যে অশান্তি সইবার ক্ষমতা আমি ভিহান আরভিদের নেই।”

ভিহানের শরীর মেজাজ গরম হতে শুরু করলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁতে দাঁত চেঁপে বলল, “তুই আমার বিরক্তির আরেক নাম মেয়ে। যে ক্ষণেক্ষণে অশান্তি অস্থিরতা দিয়ে আমার বুক ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে।”

ঢোক গিলল ভিহান। গলার অ্যাডামস অ্যাপল টা দারুণ ভঙ্গিমায় উঠানামা করলো। ভিহান অনেকটা বিরক্ত সুরে বলল, “তোকে দেখলে আমার বড্ড বিরক্ত লাগে রে রাহা। সেই সময়টা আমি খুব অশান্তি আর অস্থিরতায় ভোগি। খুব বেশি। আমার বিরক্তি আর অশান্তির কারণ তুই। আই হেইট ইউ রাহা।”

অচৈতন্য রাহা ভিহানের কোনো কথাই শুনতে পেলো না। অবশ হাত পা নিয়ে মিশে রইল ভিহানের বুকের উপর। মেয়েটাকে ওভাবেই তার বুকে মিশিয়ে রেখে আস্তেধীরে নিজের শার্টের বোতাম গুলি আবারও লাগিয়ে নিলো ভিহান। এরপর রাহার ছোট্ট তুলতুলে শরীরটা কে পাজোকোলে তুলে নিয়ে ছুটল তার রুমের দিকে।

রাত হয়েছে অনেক। তাই নিচে কেউ নেই। ভিহান ধীর পায়ে রাহার রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। রুমে ঢুকতেই হতাশ হলো সে। লম্বা করে গরম নিশ্বাস ঝেড়ে ফেলল। রুমটা পুরো এলোমেলো হয়ে আছে। রাহা সবসময়কার মতো অগোছালো। উল্টো দিকে সবকিছু তার গোছানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ছাড়া কিছু ভালো লাগে না। সব দিক দিয়েই রাহা আর সে উল্টো পথের পথিক।

বিছানায় কিছু জামাকাপড়, টেডি, বই ছড়িয়ে আছে। ভিহানের একটু বিরক্তই লাগলো। চোখ মুখ কুঁচকে সে রাহার অচৈতন্য শরীরটা বিছানায় রাখলো নরম ভাবে। এরপর সটান হয়ে দাঁড়িয়ে টাউজারের দুই পকেটে হাত গুঁজে ঘাড় নুয়ে তাকালো রাহার মুখের দিকে। নিষ্পাপ এক বাচ্চার মতো আদুরে লাগছে রাহার মুখটা। ভিহান ওর মুখের দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,

“তুই বড্ড আদুরে রাহা, তবুও আমার অশান্তি আর অস্থিরতার কারণ।”

ভিহান গভীর তীক্ষ্ণ ভাবে তাকিয়ে রয়েছে রাহার মুখ পানে। মেয়েটা সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে অথচ তার জ্ঞান ফেরানোর বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলো না ভিহান। উল্টে খানিক ঝুঁকে রাহার কপাল থেকে ছোটছোট চুল গুলি সরিয়ে দিলো। তখনি নজর গেলো মেয়েটার গলার কাছে। ফর্শা শিমুল তুলার মতো তুলতুলে দুধে ধওয়া গলাটা উন্মুখ হয়ে আছে। স্কার্ফ সরে গিয়ে গলার অনেকটা নিচ পর্যন্ত দৃশ্যমান। ভিহান তাকিয়ে থাকার দুঃসাহস করলো না। ঘাড় ফিরিয়ে নিজের কপাল স্লাইড করতে করতে শুকনো ঢোক গিলল সে। পায়ের কাছে থাকা কম্বলটা হাত বাড়িয়ে দিয়ে ঢেকে দিলো রাহা কে। মনে মনে ভাবে কোন লেভেলের গাঁধা হলে বডি দেখে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে? অতঃপর বাঁকা চোখে নজর বুলিয়ে ফিসফিস করল সে,

“মাথামোটা স্টুপিড কোথাকার। আমার বডি দেখেই সেন্সলেস হয়ে গেছিস ইডিয়েট অথচ..”

দাঁত চিবিয়ে ভিহান থেমে গেলো। অতঃপর বিরক্ত নিয়ে প্রস্থান করল রাহার রুম থেকে। নয়তো দেখা যাবে বিরক্তির মাত্রা এত বাড়বে তার যে অচৈতন্য রাহাকেই তুলে ঠাটিয়ে চড় বসাতে ইচ্ছা করবে।

সকালের মিষ্টি রোদ অম্বরে সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ বাড়ছে। সেই সাথে খান বাড়ির ব্যস্ততাও। তিন গিন্নি আর বাড়ির কাজের লোক মিলে বাড়ির সকলের জন্যে সকালের নাস্তা বানাচ্ছে। শনিবারের দিন বিধায় আজও রাহা অনেক বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছে। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে বাকিদের মতো তার চা খেতে মন চায় না। সে খায় গরমগরম এক গ্লাস দুধ। হরলিক্স কমপ্লেইন রাহার খুব পছন্দের। যেখানে সামি রাফি ১৩, ৯ বছরের হয়েও ওদের এসব ভালো লাগে না সেখানে রাহা প্রতিদিন হরলিক্স খায়। মাঝেমাঝে পাউডার দুধ বাচ্চাদের মতো চেটে চেটে খাওয়ার অভ্যাস আছে তার।

ঘুম থেকে উঠে ফোলাফোলা চোখ আর এলোমেলো চুল নিয়ে রাহা হাতে এক মগ হরলিক্স নিয়ে বারান্দায় এলো। এই বারান্দা টা দিয়ে সকালের বাগানের স্নিগ্ধ কোমল দৃশ্য উপভোগ করা যায়। মগে এক চুমুক দিয়ে সে বাগানে তাকাতেই থমকে যায়। চোখ দুটি মারবেলের মতো বড়বড় করে তাকিয়ে থাকে ওদিকেই। ভিহান ভাই আটশাট কালো একটা গেঞ্জি পরে ব্যায়াম করছে বাগানে। উনার ফুলো চেস্ট আর পেশিবহুল বাহু দেখে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে রাহা। বোকার মতো ভ্যালভ্যাল করে তাকিয়ে আছে সেদিকেই। ফর্শা হাতের নীল রগ গুলি ফুলে ফেঁপে উঠছে। মারাত্মক লাগছে ভিহান ভাই কে। এক ঘোরের মধ্যে রাহা যেন বিভোর হয়ে গিয়েছে। মনে পরল কাল রাতের সেই ভয়ংকর পরিস্থিতির কথা। এত কাছ থেকে ভিহান ভাই এর উদোম বুক দেখে ভেতরের সেই অনুভূতি স্মরণ হলো তার। কিছুক্ষণ নিজের সেই ব্যাকুল মিষ্টি অনুভূতির মাঝে ডুবে থেকে হঠাৎ মাথা ঝাড়া দিয়ে উঠল। টের পেলো তার গাল আর কান গরম হয়ে গিয়েছে। যেন ধোয়া বের হচ্ছে। আশ্চর্য!

নিজের গালে নিজেই মৃদু চাপড় মারে রাহা। একাএকাই বিড়বিড় করে বলে,

“ছিঃ রাহা, ভিহান ভাই এর দিকে কবে থেকে তুই দুষ্টু দুষ্টু নজর দেওয়া শুরু করলি?”

রাহা বারবার চোখের পাপড়ি ঝাপটিয়ে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে। তবুও তার বেহায়া চোখ জোড়া ঘুরেফিরে বাগানের দিকে যায়। ভিহান ভাই তখন দুই হাত মাটিতে ঘাসের উপর ফেলে একেরপর এক পুশআপ দিচ্ছে। রাহার গলা শুকিয়ে আসে। এই লোক এত সুন্দর বডি বানালো কি করে তাই তার চিন্তার বিষয়। ভেতরটা তার কেমন ছটফট করে। কোনোরকম ঢোক গিলে নিজের সাথে এক প্রকার যুদ্ধ করেই পিছন ফিরে যায়। চোখমুখ খিঁচে নিজেকে শাসিয়ে বলে,

“নজর দিতে হলে অন্যদের দিকে নজর দে। দেশে কি ছেলের অভাব আছে নাকি রে রাহা? দরকার পরলে ফোনে কোরিয়ান ছেলেদের দিকে নজর দে তবুও ওই খাডাস ভিহান ভাই এর দিকেই কেন রে?”

রাহা ঢোক গিলল। নিজেকে কোনোরকম বুঝিও বেহায়া রাহা আবারও ঘাড় ফিরিয়ে একপলক দেখে নিলো ভিহান ভাই কে। এরপর মাথা থেকে দুষ্টু ভাবনা ঝেড়ে দৌড় দিলো একটা।

রাহা বারান্দা ছাড়তেই ভিহান তীক্ষ্ণ নজরে তাকালো সেদিকেই। যেন বেশকিছুক্ষণ ধরে বোকা রাহা কে সে পর্যবেক্ষণ করছিল ওর আড়ালেই। এবার ও যেতেই গম্ভীর ভিহান ঠোঁট নাড়িয়ে বলে উঠল, “স্টুপিড একটা।”

সকালে নাস্তার টেবিলে ভিহান ফ্রেশ হয়ে এসে দেখল বাকি সবাই আছে শুধু রাহা ছাড়া। সবটা দেখেই সে চুপচাপ বসল। কপাল কুঁচকে খানিক তিক্ত সুরে জানতে চাইল,

“সবাই কি এসেছে?”

পাশ থেকে জিদান বলল, “সবাই উপস্থিত আছি ভাইয়া।”

“তাহলে রাহা কোথায়?”

কামিলি হাসি মুখে জবাব দিলো, “ও তো নিজের খাবার নিয়ে রুমে চলে গিয়েছে ভিহান ভাই।”

মুহূর্তে মুখটা কেমন লাল হয়ে গেলো ভিহানের। বজ্জাৎ টা নিজের রুমে খাওয়া কবে থেকে শিখলো আবার?

ভিহানের মেজাজটা এরপরই খারাপ হলো। কোনো রকম করে সে নাস্তাটুক শেষ করে উঠে পড়ল।

রাহা বিছানায় শুয়ে শুয়ে কার্টুন দেখছিল ল্যাপটপে। দুই বছর আগেই খুব অনুনয় করে হাতে পায়ে ধরে ভিহান ভাই কে দিয়ে আনিয়েছিল এটা। ল্যাপটপে পড়াশোনার বদলে কার্টুন আর মুভি দেখেই বেশ পজা পায় সে। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। কার্টুন দেখতে দেখতেই রাহা গলা উঁচু করল “কে?”

আর কোনো শব্দ এলো না। পকেটে হাত গুঁজে স্বয়ং ভিহান ভাই উপস্থিত হলো রুমে। আচমকা নিজের ঘরে ভিহান ভাই কে দেখে থতমত খেলো রাহা। ল্যাপটপ ফেলে দিয়ে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো। পাগলের মতো এদিকওদিক খুঁজে টেবিল থেকে স্কার্ফ টা গলায় তুলে নিলো। দুই হাত দিয়ে চুল ঠিক করে ঢোক গিলতে গিলতে প্রশ্ন করল,

“আ আপনি?”

ভিহান উত্তর দিলো না। পকেটে হাত গুঁজে থম মেরে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ রাহার কর্মকাণ্ড দেখছিল। এবার সুচালো নজর বুলালো ঘরের উপর। কাল রাতে যেমন দেখে গিয়েছিল ঠিক তেমনিই আছে। উল্টে সকালে বোধহয় আরো এলোমেলো করেছে অলস অগোছালো মেয়েটা। ভিহান ভাই কে এভাবে গম্ভীর রাশভারী মুখে নিজের ঘর পর্যবেক্ষণ করতে দেখে ঘাবড়ে যায় রাহা। নিজের ঐতিহাসিক বোকাবোকা মন ভুলানো হাসি হাসার চেষ্টা করে বলল,

“আ আসলে আম্মু এখনো রুমে আসেনি তো তাই..”

“রুমটাকে এমন বস্তির মতো করে রাখিস কেন? তুই কি যাযাবর?”

মুহূর্তে হাসি গায়েব হয়ে গেলো রাহার। মাথা নিচু করে নিলো সে। আমতাআমতা করে মন খারাপ সুরে বলল,

“আম্মু এসে গুছিয়ে দিবে।”

“মেজো মা কে কেন করতে হবে? তুই কি প্রতিবন্ধী? নিজের কাজ গুলি নিজে করতে পারিস না?”

প্রতিবন্ধী শব্দটা রাহা কে যেন আঘাত করলো। সামান্য এইটুকুর জন্যে ওই পাষাণ লোকটা তাকে প্রতিবন্ধী বলবে? অভিমানি রাহার চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। গাল ফুলিয়ে দিয়ে সে চোখ তুলে তাকালো ভিহান ভাই এর দিকে। ক্লেশ কন্ঠে আধোআধো ভাবে শুধালো,

“আপনি এভাবে বলতে পারলেন আমায় ভিহান ভাই?”

রাহার ওমন মুখ আর কন্ঠ শুনে ভিহান দাঁত কেটে নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিলো। অতঃপর চিবিয়ে জানতে চাইল,

“কিভাবে বলেছি তোকে?”

“ওই যে প্রতিবন্ধী। নিহাত আমি গোছগাছ করতে জানি না। আমার কাজ গুলি আম্মু করে দেয় তাই বলে আপনি আমায় প্রতিবন্ধী ডাকবেন? আমার কাজ তো আম্মুই করে দেয়। আপনাকে তো আর বলি না আমার কাজ গুলি করে দিতে।”

কথার জোরে শেষের বাক্যটা রাহার মুখ দিয়ে যে আচমকা ফসকে গিয়েছে তা তার মুখ দেখে বেশ বুঝা যাচ্ছিল। বেচারি বোধহয় নিজেকে সামলাতে না পেরে বলে ফেলেছে কিন্তু এখন আফসোসও করছে বুঝায় যায়। রাহা আবারও মাথা নিচু করে নিলো।

ভিহান শক্ত কন্ঠে বলল, “সেই সাহস তোর আছে? আর না তুই বললেই আমি তোর কাজ করে দিবো।”

“সেটা তো আমি জানিই। আর যাই হোক আমার কাজ ভিহান ভাই ইহজন্মে করে দিবে না। আকাশপাতাল এক হয়ে গেলেও না। দুনিয়া কেয়ামত হলেও না।”

ভিহান দাঁত কটমট করে মনে মনে বলল, “সব জেনে বসে আছিস তুই, স্টুপিড।”

“সকালে নাস্তার টেবিলে গেলি না কেন? সবাই কে রেখে নিজের রুমে খাবার এনে খাওয়া এটা কোন ধরনের অসভ্যতা?”

“আপনার জন্যেই তো। আপনার থেকে দূরে থাকার জন্যেই তো ঘরে নিয়ে চলে এসেছি। আপনার সামনে যেতে চাই না বলেই তো। আপনার সামনে গেলে আমার কেমন কেমন জানি লাগে ভিহান ভাই।”

“কিরে কি জিজ্ঞেস করলাম তোকে?”

ধমকে উঠল ভিহান। রাহা নড়েচড়ে দাঁড়ালো। মনের কথাগুলি সাহস করে আর মুখে বলা হলো না।

“ও ওই আসলে আমার ইচ্ছা হয়েছিল।”

“তোর আজেবাজে ইচ্ছার লাগাম টান, নয়তো তোর লাগাম আমি এমন ভাবে টানবো যে আর উঠেও দাঁড়াতে চাইবি না।”

রাহা নীরবে মাথা নিচু করে ফোঁসফোঁস করতে লাগল। ভিহান ভাই কে মনে মনে ইচ্ছা মতো বকছে মেয়েটা নিশ্চিত।

“ফারদার যেন তোর এমন মনে হওয়া কাজ করতে না দেখি। গট ইট?”

রাহা উপর নিচ মাথা নাড়ালো। ভিহান আগাগোড়া রাহা তে এক পলক বুলিয়ে নিয়ে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে চলে যেতে লাগল আবারও। রাহা কটমট করে মিনমিন সুরে বলল,

“উমম, লাগাম টানবে সাহস কতো। যেন আমার লাগাম শয়তানটার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।”

আচমকা রাহা মাথা তুলে তাকিয়ে দেখে ভিহান থেমে গিয়েছে। তাকে থামতে দেখেই ঘাবড়ে গেলো রাহা। ভয়ে ঢোক গিলল সে। জাঁদরেল টা কি শুনে নিলো নাকি? সে তো মনেমনে বলেছে। ওই খাডাসটা শুনবে কি করে? এখন কি হবে?

ভিহান প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে রেখেই খানিক ঘাড় ঘুরালো। ডান হাতটা উঠিয়ে তর্জনী আঙ্গুল উঁচু করে শাসিয়ে বলল রাহাকে,

“আর কখনো তোর এমন ফুলকো ফেস নিয়ে আমার সামনে আসবি না। আই রিপিট এগেইন আসবি না।”

সেই কখন থেকে রাহা কেঁদেকেটে অস্থির। বাড়িতে বাবা চাচা নেই। দুজনেই বেড়িয়েছে। পারিবারিক ব্যবসা আছে তাদের। তিন চারটা ইট ভাটা আছে। রড সিমেন্টের বড় ব্যবসাও আছে। তাছাড়া ধানের মিল সহ বাজারে কয়েকটা সবজির বিশাল বড় আড়দ আছে। আবার এলাকায় একটা কারখানা খুলার চেষ্টা করছে গত বছর থেকে।
ব্যবসা বাণিজ্যের সব কাজ আরমান খান আর সাদমান খানই দেখাশোনা করেন। সাথে থাকে জিদান খান। রায়হান খান যেহেতু এলাকার চেয়ারম্যান তাই উনাকে দুইদিকটাই সামলাতে হয়। বাকি দুজন বাড়িতে নেই। তিনি এখনো বের হন নি। তাই রাহা বড় বাবা কে পেয়ে কেঁদেকুটে বিচার দিচ্ছে ছেলের নামে। ভিহান ভাই তাকে খুব বকেছে। প্রতিবন্ধী বলেছে। বড়বাবা কে এর বিচার করতেই হবে। তিনি সেই কখন থেকে মেয়েকে বুঝাচ্ছেন ঠিক আছে বলবে কিন্তু তার কান্নার নাম নেই। এখনি বকতে হবে ভিহান ভাই কে।

“আর কাঁদে মা। ভিহান তো বাড়িতে খুব একটা থাকে না তাই সবাই কে নিয়ে একসাথে বসে খাবার খাওয়া পছন্দ করে। তুমি খাবার ঘরে নিয়ে গিয়েছো বলে হয়তো একটু রেগে গিয়েছে মা।”

“না বড়বাবা তুমি এখনি বিচার করো। তোমার ছেলেকে বকা দাও।”

“কি হয়েছে এখানে? কে কাকে বিচার করবে?”

হঠাৎ গুরুগম্ভীর কন্ঠ শুনে চমকে যায় রাহা। হকচকিয়ে পুরো শান্তও হয়ে যায়। আতঙ্কিত নয়নে তাকিয়ে দেখে বুক টান টান করে দাঁড়িয়ে থাকা ভিহান ভাই কে। সমসময় কার মতো সেই গম্ভীর ভাব। রাহা মুহূর্তে কান্না ভুলে যায়। এতক্ষণ রায়হান খান এত বুঝ দিয়েও যাকে কান্না থামাতে পরলো না সে ভিহান কে দেখামাত্র স্বাভাবিক হয়ে গেলো। রাহার এহেন কাজে রায়হান খান হতভম্ব হয়ে যান। বিষয়টা কি ঘটলো তিনি বুঝার চেষ্টা করলেন।

ভিহান রসকষহীন মুখ নিয়ে রাহার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। যেন নিজের প্রশ্নের উত্তর চাইছে আবারও। রাহা ঢোক গিলল। রায়হান খানের উদ্দেশ্যে বলল,

“বড়বাবা, আমার কাজ আছে। ওই বড়মা তখন অনেকগুলি কাজ দিয়েছে আমায়। সেগুলি করতে হবে। কত কাজ করতে হয় আমার তুমি তো জানোই না। আমি যাই হ্যাঁ? তুমি সাবধানে যেও কেমন?”

রাহার হঠাৎ পল্টিবাজি রূপ দেখে রায়হান খান ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলেন। রাহা ভদ্র মেয়ের মতো ভিহান ভাই এর পাশ কাটিয়ে সুড়সুড় করে চলে গেলো। ও যেতেই রায়হান খান শব্দ করে হাসলেন।

“আমাদের রাহা একটু ছেলেমানুষি বাপ। ওকে তুমি বেশি শাসন করো না।”

“বেশি শাসন না করলে অল্পতেই ইঁচড়ে যাবে বাবা।”

“শাসন ভালো। কিন্তু অতিরিক্ত শাসন ভালো না। আমাদের বাড়িতে ওই রাহাই অনেকটু বেশি ছেলেমানুষি করে। কিন্তু মেয়েটা একদম নিষ্পাপ বাচ্চার মতো। ওকে বেশি শাসন করলে হিতে বিপরীত হতে পারে বাবা। পড়ে দেখা যাবে অতিরিক্ত শাসনে বিগড়ে গিয়েছে।”

ভিহান এবার আর জবাব দিলো না। কিন্তু মনে মনে ঠিকই বলল, “ওকে বিগড়ে যেতে দিলে তো। ও বিগড়ে যাওয়ার ধারেকাছে গেলেও ওর লাগাম আমি ভিহান আরভিদ খান খুব শক্ত হাতেই টেনে ধরবো। এমন ভাবে ধরবো যেন উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতা না থাকে ওই ইডিয়েটের।”

“ও আপু এবার ভিহান ভাই তো আমাদের জন্যে কিছু আনলো না।”

রুশমি নিজের ল্যাপটপে বসে মুভি দেখছে। কিন্তু রাহা সেই কখন থেকে কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করছে। সে কিছুতেই শান্ত ভাবে মুভি দেখতে পারছে না রাহার জন্যে। পাজিটা একটু পর পর এটা ওটা জিজ্ঞেস করছে। শান্তিতে মুভিটা পর্যন্ত নিজেও দেখছে না তাকে দেখতে দিচ্ছে না।

“ও আপু বলো না আপু, ভিহান ভাই এবার আমাদের জন্যে কিছু আনলো না কেন?”

“আহহ রাহা, ভাইয়া কিছু আনলো না কেন সেটা আমি কি করে বলবো বল তো?”

“ভিহান ভাই তো প্রতিবার বাড়ি ফেরার সময় আমাদের জন্যে এত এত গিফট আনে।”

“প্রতিবারই আনতে হবে এমন কোনো কথা আছে রে পাজি?”

“তো আনতে হবে না? আমরা এত গুলি ভাই বোন আছি। বাড়িতে দেড় বছর পর লোকটা এলো আমাদের জন্যে কিছু আনবে না?”

এবার রুশমি টু শব্দটিও করলো না। রাহা বড় আপুর উত্তরের অপেক্ষা করে আর ধৈর্য ধরতে না পেরে বলল আবারও, “ও আপু বলো না কেন আনেনি?”

রুশমি হতাশ হলো। রাহার চরিত্র তার জানা। যতক্ষণ মনমতো একটা উত্তর না পাবে আর সমাধান হবে ততক্ষণ বকবক করে সবাই কে অস্থির করে দিবে। লম্বা নিশ্বাস ফেলে বলল রুশমি,

“আমি জানি না। তুই ভাইয়া কে জিজ্ঞেস কর গিয়ে। এবার কোনো বিরক্ত নয় রাহা। আমাকে মুভিটা শেষ করতে দে এরপর পড়া আছে আমার।”

বড় আপুর ধমক শুনে বাধ্য রাহা চুপ হয়ে গেলো। কিন্তু স্থির হতে পারলো না। যেন কেন গিফট আনলো না সেটার জন্যে সে অস্থির হয়ে গিয়েছে। কপালে ভাঁজ তুলে বেহায়া রাহা আবারও ক্ষীণ আওয়াজ তুলে,

“ও আপু? আপু? ভাই কি এবার আমাদের গিফট দিতে ভুলে গিয়েছে?”

“সেটা তো আর আমার জানার কথা না?”

“না এমনো তো হতে পারে ভিহান ভাই আমাদের সকলের জন্যে গিফট এনেছে কিন্তু কাল দিতে ভুলে গিয়েছে। হ্যাঁ হতেই পারে। ভিহান ভাই নিশ্চয়ই ভুলে গিয়েছে। যাই আমি গিয়ে মনে করিয়ে দিয়ে আসি।”

ছটফটে রাহা দ্রুত বিছানা থেকে নেমে খালি পায়ে ছুটল ভিহান ভাই এর দিকে। রুশমি পিছন থেকে বারণ করছে। সেসব উপেক্ষা করে রাহা চলে গেলো।

“রাহা? বোন আমার যাস না ভাইয়ার রুমে। আবার বকা খাবি।”

রুশমি কপাল কুঁচকে বিড়বিড় করতে থাকে, “না জানি গাঁধা মেয়েটা আবার গিয়ে কি করে ভাইয়ার ঝাড়ি খেয়ে এসে চোখ ফুলায়।”

চলমান…

নোর্ট:- প্রতি পর্বে এতএত ভিউ হলেও রীচ এত কম কেন পাঠক? আপনারা গল্প পড়লেও রীচ কেন করতে চান না? এই পর্বে ১৪০০ রিয়েক্ট হলেই পরবর্তী পর্ব দিবো। যতক্ষণ সর্ত পূরণ না হয় ততক্ষণ আমার আরাম। বাকিটা আপনাদের কাছে। কারণ লিখতে আমারও কষ্ট হয়। বিনিময়ে সামান্য রিয়েক্ট মন্তব্য করতে আপনাদের কৃপণতা বেমানান।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply