ক্যাপ্টেনভিহানআরভিদ
লেখনীতে_সাদিয়া
পর্ব_১৩
রাগে গজগজ করতেজের রুমে এলো। কত বড় অসভ্য ইতর ছেলে মানুষ। খবিশ লোক একটা নিজের দেহ দেখিয়ে বেড়ায়। কত বড় নির্লজ্জ চিন্তা করা যায়? রাহা এটাও বুঝতে পারছে না তার এত রাগ কেন লাগছে। শরীরটা হঠাৎ কিড়মিড় করছেই বা কেন? দেহ দেখিয়ে বেড়িয়েছো তো বেড়িয়েছে ভিহান ভাই। তাতে তার কি? এই মুহূর্তে রাহার ছোট্ট মস্তিষ্ক সেসব কিছু জানার অবকাশে নেই। সে শুধু জানে তার রাগ লাগছে। শরীর জ্বলছে। ভিহান ভাই তাকে সহ্য না করলেও সে তো তাকে ভাই হিসেবে মানে। তার চাচাতো ভাই হয়। মেয়ে গুলি কতটা লুচি নজর দিচ্ছিলো? ছিঃ।
রাগা ফেটে যাওয়ার উপায় রাহার। হাতের শপিংটা তাই ছিটকে দূরে বিছানায় ফেলে দিলো। ওমনি শপিং ব্যাগ থেকে কয়েক ধরনের প্যাড বেড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ল বিছানায়। তা দেখেই চোখ চড়কগাছ রাহার। মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে দুই চোখ বের হয়ে আসছে। সে কিছুসময় বোকার মতো বিছানায় পড়ে থাকা প্যাডের প্যাকেট গুলির দিকে তাকিয়ে থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল। পরক্ষণে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে গেলো বিছানার দিকে। শপিং বের করে দেখলো না হলেও ১০ টার উপরে একেকটা একেক ধরনের প্যাড। এ দেখেই রাহা হতভম্ব হয়ে গেলো। তার খনিকের রাগটাও বোধহয় বাড়লো। ভেতরের ক্ষোভ নিয়ে বলতে লাগল,
“ভিহান ভাই আসলেই একটা বেহায়া নির্লজ্জ লোক। কত বড় ইতর বদমাইশ লোক আমার জন্যে প্যাড আনে। ওই খচ্চর খবিশ ব্যাটা কে কি আমি বলেছি আমার জন্যে এসব আনতে? এখন বুঝছি ওই জল্লাদ টা ইচ্ছে করে মেয়েদের শরীর দেখানোর জন্যে শার্ট খুলেছিলো। আবার কত বড় অসভ্য আন্ডারপ্যান্ট দেখিয়ে ঘুরেছে। আমি তো শুধু বাহানা। বদমাইশ লুচ্চা বেটা কোথাকার।”
রাহা কিছুক্ষণ ভিহান ভাই কে বকতে বকতে ধুয়ে দিলো। পরে আবার ভাবলো, এটা তো একটা স্বাভাবিক বিষয়। নরমাল। বড় ভাই বোন কে প্যাড এনে দিতেই পারে। এতে তার এতটা রিয়েক্ট করার তো কিছু নেই। সেই ভেবেই সে দ্রুত করে ওয়াশরুমের দিকে ছুটলো। বোকা মেয়েটা জানলোও না সে যাকে ভাই হিসেবে ধারনা করে বিষয়টা উড়িয়ে দিলো সেই মানুষটা তার প্রতি হওয়া অমোঘ অনুভূতি কতটা যত্নে একটা আদরে নিভৃতে মনের মণিকোঠায় লুকিয়ে রেখেছে বছরের পর বছর।
বিকেলে ভিহান বাড়ি ফিরে শাওয়ার নিয়ে ড্রয়িংরুমে এসেছে মাত্র। বাড়িটা কেমন ফাঁকাফাঁকা দেখে তার কপাল কুঁচকে এলো। কি ব্যাপার? খান বাড়ি নীরব কেন? এই বাড়ি তো একা শুধুমাত্র রাহাই মাথায় করে রাখতে পারে। বাকিরা কোথায়?
কিচেনের দিকে উঁকি দিতেই পিছন থেকে খান বাড়ির ছোট বউ নীলা বেগম ডেকে উঠলেন ভিহান কে,
“বাবা তুই কি খাবি? খাবার বেড়ে দিবো?”
ভিহান তাকালো পিছু ঘুরে। ঝটপট বলল, “খাবো ছোটমা” থামলো একটু। বাড়ির আশেপাশে তাকিয়ে বলল আবারও, “কিন্তু বাড়ির সবাই কোথায়? এতটা নীরব লাগছে কেন?”
নীলা বেগম কিচেনে যেতে যেতে জবাব দিলেন, “তোর ছোট চাচুকে কামিলি বলল কি জানি লাগবে বাজারে নিয়ে যেতে। তা শুনে বড় ভাবিও বলল রান্নাঘরের জন্যে নাকি কিছু জিনিস প্রয়োজন। সেই সাথে বাপের লেজ ধরে সামি রাফিও চলে গেলো ওদের সাথে।”
“ও” ভিহান ছোট করেই বলল। একবার চোরাচোখে তাকালোও রাহার রুমের দিকে। মনে মনে ভাবলো, “তার মানে বিচ্ছুটা যায় নি। সকালের ওই বিষয়টার কারণে শরীর কি অসুস্থ নাকি?”
ভিহান চুপচাপ খাবার শেষ করে নিজের রুমে গেলো।
সোফায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছিলো। এমন সময় জাহানারা বেগম প্রায় হন্তদন্ত হয়ে এলেন রুমে।
“বাবা আছিস?”
উনাকে বিচলিত আর উদ্বিগ্ন হতে দেখে ভিহানের কপাল কুঁচকে এলো। কোলে ল্যাপটপ রেখে নড়েচড়ে বসলো। কপালে ভাঁজ ফেলে সন্দিহানি কন্ঠে প্রশ্ন করল সে,
“কি হয়েছে মেজো মা?”
উনি অনেকটা হাপিয়ে শুধু উচ্চারণ করলেন, “রাহা।”
বুকটা ধড়াস করে উঠল ভিহানের। যেন বিষাক্ত কোনো পোকা হঠাৎ বুকে কামড়ে ধরেছে। সে চকিতে ল্যাপটপের ঢালা বন্ধ করে উঠে দাঁড়ালো। চাঁপা অস্থির আর উদ্বিগ্ন স্বরে জানতে চাইলো,
“কি হয়েছে ওর? ঠিক আছে তো মেজো মা?”
“বাবা আমার মেয়েটা ব্যথার কাঁদছে। ওকে..ওকে এখুনি একটু ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। তোর মেজো চাচ্চু গাইনি ডাক্তারকে বলে রেখেছে। একটু পর চেম্বারে বসবেন উনি। এখন এই অবস্থায় মেয়েটাকে কিভাবে নিয়ে যাবো আমি? বাড়িতে কেউ নেই। জিদানটাও নাকি দূরে আছে। তুই একটু দিয়ে আয় না বাবা। মেয়েটা আমার হাটতে পর্যন্ত পারছে না। ওকে একটু..”
বাকিটা আর শুনার প্রয়োজন মনে করলো না ভিহান। এক ছুটে বের হয়ে গেলো ঘর থেকে। ঝড়ের গতিতে দৌড়ালো রাহার ঘর পানে। পিছু পিছু চললেন জাহানারা বেগমও।
রাহা বিছানায় শুয়ে কাতড়াচ্ছিলো। মৃদু গোঙ্গানিতে পেটে হাত চেঁপে পা নাড়িয়ে ছটফট করছিলো। ব্যথায় আদুরে মুখটা এইটুকুন হয়ে গিয়েছে। রাহাকে এভাবে বিছানায় কাতড়াতে দেখে নিশ্চল হয়ে যায় ভিহান। মনে হয় বুকের ভেতরটায় বিষাক্ত কোনো পোকা খামছে ধরেছে। এক নিদারুণ চাঁপা যন্ত্রণা মুহূর্তে তার নিশ্বাস আটকে দিচ্ছে। শরীরটাও যেন তার বিষিয়ে গিয়েছে এমন লাগছে। বিমূঢ় নয়নে তাকিয়ে রইল যন্ত্রণায় ছটফট করা রাহার পানে। হৃদপিন্ডে সহস্র সুঁচ ফোটালে যে ব্যথা অনুভব হতো ভিহানের বুঝি এটাই অনুভব করছে। নির্বাক নিশ্চল রূপে নিষ্প্রভ চোখে তাকিয়ে থাকলেও কষ্টে নিশ্বাস রোধ হয়ে আসলো। রাহার ওই যন্ত্রণায় ছটফট করা দৃশ্যটা দেখে ভিহান দাঁতে দাঁত কেটে নিজেকে শক্ত করতে চাইলো। হাতটা মুষ্টিবদ্ধ করে খুব কষ্টে খুব যন্ত্রণায় ঢোক গিলল সে। তার পাখিটা ব্যথায় কাতড়াচ্ছে, যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ফুরফুর করে উড়েবেড়ানো তার আদরের প্রজাপতি টা কিভাবে দাপাচ্ছে। এই দৃশ্য তার বুক চিঁড়ে দিচ্ছে নিশ্বাস গলা টিপে রোধ করছে। বুকের বা পাশটা ঝাঁঝরা করে দিচ্ছে। এই নীরব যন্ত্রণা কাকে দেখাবে সে? তার এই চাঁপা হৃদয় নাশ করা মরণ যন্ত্রণা সে কিভাবে অনুভব করছে কাকে বোঝাবে?
জাহানারা বেগম এগিয়ে এলেন। হুড়মুড় করে বিছানায় গিয়ে বসলেন মেয়ের শিথানে। ভিহান তখনো নিজের যন্ত্রণার সাথে নীরব যুদ্ধ করতে করতে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। বিমূঢ় বিহ্বল কাতর দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে নিজ প্রেয়সীর পানে।
“আম্মা, আমার কলিজার টুকরা কষ্ট হচ্ছে?”
কাঁদোকাঁদো কন্ঠে জানতে চাইলেন জাহানারা বেগম।
রাহা ছটফট করতে করতে মায়ের মুখ পানে ভেজা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আধো কন্ঠে বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ভেঙ্গে বলে ওঠে,
“আম্মু, ব্যথা ব্যথা।”
ওই যন্ত্রণা মেশানো একটুখানি বুলি ভিহানের বুকে বিষাক্ত তীড়ের মতো গিয়ে বিঁধে। রাহার ওই পীড়িত স্বর কলিজাটা ফালাফালা করে দেয় ভিহানের। সে সঙ্গেসঙ্গে হাতটা আরো শক্তিতে মুঠো করে চোখ বুজে আনে। হায় আল্লাহ, এ কেমন যন্ত্রণা? কেন দহন? এ দহনে যে ভিহানের বুক পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে তা শুধু যেন সৃষ্টিকর্তায় জানে। তার ছোট্ট আদুরে প্রজাপতির সামান্যতম কষ্টও যে ভিহানের ভেতর তছনছ করে দেয় সে খুঁজ হয়তো এই নশ্বর দুনিয়ার কারো কাছে নেই।
ভিহানের ভেতরে যেন দাউদাউ করে আ’গুন জ্ব’লছে। ভেতরের অদৃশ্য অনলে বুকটা পু’ড়াতে পু’ড়াতে সে এক পা এগিয়ে দিলো। রাহার কান্না মিশ্রিত মুখটা দেখেই পাগল পাগল লাগলো তার কাছে। বহু কষ্টে জাহানারা বেগমের উদ্দেশ্যে বলল,
“মেজোমা ওকে রেডি করে দাও। আ..আমি গাড়ি বের করছি।”
জাহানারা বেগম ফুঁপিয়ে কাঁদেন। মেয়েটা ছোটবেলা থেকে এমন। একটু অসুস্থ হলেই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদে। এই যে উনার আদরের বাচ্চাটা এই মুহূর্তে কিভাবে কাঁদছে।
ভিহান রাহার মুখ পানে তাকিয়ে যেন আ গুন গিলে নেয়। এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে পাগলের মতো ছুটে যায় বেসমেন্টের দিকে।
গাড়ি বের করে ফিরে এসে দেখে রাহা বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসে আছে চোখ মুখ খিঁচে। ওর এলোমেলো চুল জাহানারা বেগম হাত দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছেন। ভিহান আসতেই বললেন তিনি,
“দেখ না বাবা ও বোধহয় হাটতেও পারবে না। একটুও নড়তে চাইছে না।”
ভিহান উদভ্রান্তের মতো বিচলিত কন্ঠে বলল, “তুমি গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি ওকে নিয়ে আসছি। তাড়াতাড়ি যাও মেজোমা।”
জাহানারা বেগম দ্রুত করেই বের হয়ে গেলেন।
বিছানায় তখনো চোখ মুখ খিঁচে বিবর্ণ মুখে বসা রাহা। থেমে থেমে কুঁকিয়ে উঠছে। ভিহান এগিয়ে যায় ওর কাছে। হাটু গেড়ে বসে রাহার সামনে। আদুরে নরম ভাবে রাহার দুই গাল তুলে নেয় নিজ হাতের তালুতে। কোমল আদর মেশানো স্বরে বলে,
“খুব কষ্ট হচ্ছে না রে?”
আহ্লাদী রাহা যন্ত্রণায় ঠোঁট উল্টে দেয়। বাচ্চাদের মতো ঝরঝর করে চোখের পানি ফেলে বলে,
“ব্যথা, ভিহান ভাই ভীষণ ব্যথা।”
এক গলা টগবগ করে ফুটতে থাকা লাভা ছুঁড়ে দিলে মুহূর্তে চামড়া যেমন ঝ*লসে যায় ভিহানের হৃদয়টা যেন ঠিক সেভাবেই ঝ লসে যাচ্ছে। অন্তরটা দুরুদুরু করছে তার। দাঁতে দাঁত চেঁপে সে নিজের কষ্ট দমন করে মোলায়েম চোখে তাকালো রাহার পানে। বিছানার চাদর চেঁপে ধরা রাহার হাতটা নিজের এক হাতের মুঠোয় নিয়ে আরেক হাত রাখে ওর গালে। নরম সুরে বলে,
“কিচ্ছু হবে না। একটু ধৈর্ষ ধর সোনা। এখুনি নিয়ে যাচ্ছি ডক্টরের কাছে।”
রাহা চোখ বন্ধ করে মারাত্মক যন্ত্রণায় বলে ওঠে, “আমি মরে যাবো ভিহান ভাই। এই ব্যথায় মরেই যাবো।”
ভিহানের হৃদপিন্ডের রক্ত ছলাৎ করে উঠল। শিরায় শিরায় গরম শোণিত ধারা যেন দ্রুত বেগে ছুটল। মুহূর্তেই সে রাহার থুঁতনিতে হাত চেঁপে ধরে মুখ খানিক উপরে তুলল। চাঁপা রাগ আর ধমকের সুরেই বলল এবার,
“চুপ। এসব জঘন্য কথা একদম বলবি না। একজনের বুক এভাবেই ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। এই খবর শুনার আগে দুনিয়া ত্যাগ করবে সে। খবরদার আর এসব ভয়ংকর কুৎসিত কথা মুখে আনবি না মেয়ে।”
ব্যথায় ব্যাকুল রাহা বোধহয় সঠিক ভাবে ধরতে পারলো না ভিহানের কন্ঠস্বর কিংবার তার বলা কথার মানে। ধরতে পারলে নিশ্চয়ই বুঝতো সবসময় গম্ভীর শক্ত কঠিন লোকটার গলা ভেতর থেকে ঠিক কতটা গভীরভাবে ভেঙ্গে এসেছে।
তলপেটটা বোধহয় চিলিক দিয়ে উঠেছে। তাই ভিহানের টিশার্টটা খামছে ধরল ও।
কাতর গলায় বলল, “আমি আর সহ্য করতেই পারছি না এই ব্যথা।”
বুকটাও সেই সাথে মোচড় দিয়ে উঠল ভিহানের। যেন বিষাক্ত হুল ফুটিয়ে দিয়েছে কেউ বুকের গহিনে। সে উঠে চটজলদি করে ঝুঁকে বিছানায় বসা রাহার গাল দুটি আঁকড়ে ধরল। আচমকা একদম অযাচিত ভাবে রাহার কপালে ঠোঁট ছুঁয়ে দিয়েই দুই হাতে পাজোকোলে তুলে নিলো নরম দেহটা। আকস্মিক কান্ডে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেলো রাহা। ব্যথায় কাতড়াতে থাকা রাহা বিস্ময় হতবাক নিয়ে ছোটছোট চোখে তাকিয়ে রইল ভিহান ভাই এর দিকে। কি হলো কেন করলো কিছুই আপাদত বুঝতে পারছে না সে। শুধু অনুভব করছে শূন্যে থাকা তার শরীরটা জমে গিয়েছে অদ্ভুত কারণে।
রাহার ওই অবাক বিহ্বল চাউনিকে উপেক্ষা করে ভিহান ওকে নিয়ে কঠিন চিত্তে ছুটলো নিচের দিকে। পিছনে জাহানারা বেগমের কাছে রাহাকে বসিয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে চলল ডাক্তারের উদ্দেশ্যে।
ভিহানের চোখমুখ থমথমে হয়ে আছে। মুখটা একেবারে রুক্ষ, কঠিন। যেন ভেতরে ভেতরে তীব্র রাগে ফেটে পড়ছে। বাহিরে জাহানারা বেগম আর ভিহান দাঁড়িয়ে আছে। রাহা কে ভেতরে চেকআপ করছে।
ভিহান রঙ্গিম মুখে ভারিক্কি কন্ঠে প্রশ্ন করল জাহানারা বেগম কে, “ওর এত ব্যথা অথচ এ নিয়ে আগে কেন ট্রিটমেন্ট হয়নি মেজোমা?”
জাহানারা বেগমের মুখটা ফুলে আছে। তিনি ইতস্তত নয়নে একবার তাকান ভিহানের মুখের দিকে। বেশ ভালো করে জানা আছে এই ছেলেকে। কোনো কিছুতে হেলামি পছন্দ নয় ওর। তাছাড়া বাড়ির প্রতিটা সদস্য কে নিয়ে বেশ সচেতন। মুখটাও কেমন গম্ভীর করে রেখেছে। ছেলেটা কি রেগে?
“প্রতি মাসে এত ব্যথা হয় না রে বাপ। তাছাড়া মাস চারেক আগে ডাক্তার দেখিয়েছিলাম ঔষধ দিয়ে বলেছিলো ঠিক মতো গেলে সেরে যাবার কথা। ব্যথা পুরোপুরি না কমলেও নিয়ন্ত্রণের কথা ছিলো। তুই তো জানিস মেয়েটা কেমন। ঠিক করে ঔষধ খেতে চায় বল?”
রাগে ভিহানের শরীর জ্বলে উঠল এবার। চোয়াল শক্ত করে দাঁত চাঁপলো।
“বাড়িতে এতগুলি মানুষ থাকতে সামান্য ঔষধই একটা মেয়েকে খাওয়াতে পারেন না আপনারা?”
“রাগ করিস না বাবা। তুই তো ভালো করে জানিস ও কি রকম। একমাত্র তোকে ভয় পেয়ে তোর একটু কথা শুনে।”
“তাহলে মেয়ের গোটা দায়িত্বই না হয় ছেড়ে দিন আমার উপর।”
জাহানারা বেগম টু শব্দ করলেন না। বুঝা গেলো ছেলেটা রেগে গিয়েছে বোধহয়। তাই আর কথা বাড়ালেন না তিনি। তাছাড়া রাহার রিপোর্টও চলে এসেছে। সেটা নিয়েই ভিহান আর জাহানারা বেগম আবারও ভেতরে ঢুকলেন। রাহা বিছানায় তন্দ্রাভাবে আচ্ছন্ন। ভিহান রিপোর্ট টা চেয়ারে রেখে ছুটে গেলো সে দিকে। শুয়ে থাকা রাহার মাথায় আলতো হাত রাখে।
“ব্যথা কমেছে? কষ্ট হচ্ছে এখনো?”
রাহা সঙ্গেসঙ্গে জবাব দিতে পারলো না চোখ দুটি নিভুনিভু হয়ে আসছে। ভাঙ্গা কন্ঠে বলল, “আ..আমার ঘুম পাচ্ছে ভিহান ভাই।”
ভিহান মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে, “ঠিক আছে। চোখ বন্ধ করো শুয়ে থাক। আমি আছি এখানে।”
“আ..আমার যদি আর চোখ না খু..খুলে? আমি যদি ম.মরে যা..”
কথাটা শেষ করতে দিলো না ভিহান। রুক্ষ কঠিন পুরুষালি হাতটা তুলতুলে শুষ্ক ঠোঁটে চেঁপে ধরল। চোখ রাঙ্গিয়ে বলল,
“হুশশ, এমন কথা বলবি না। আমি থাকতে তোর কিছু হতে দিবো না।”
একটু সময় নিলো ভিহান ঢোক গিলে। রাহার দিকে তাকিয়ে নিজেকে সংযত করে করুণ সুরে হিসহিস করে বলল, “চুপ থাক। এমনিতেই পু ড়ছি রাহা, আরো বেশি পু ড়াতে আজেবাজে কথা আর বলিস না।”
রাহা অস্ফুট স্বরে “ভি..ভিহান ভাই” উচ্চারণ টা করতে চাইলো। কিন্তু পুরোপুরি বলার আগেই চোখ দুটি নিস্তেজ হয়ে এলো তার। আস্তেআস্তে তলিয়ে গেলো তন্দ্রায়। ভিহানের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যায় রাহা ছোট্ট কাতর মুখটা দেখে। কানের পর্দায় রাহার বিষাক্ত কথাগুলি জ্বলন ধরায়।
“আমি মরে যাবো ভিহান ভাই।” কথাটা যতবার মনে হচ্ছে ততবার ভেতরটা পু ড়ে ভষ্ম হয়ে যাচ্ছে তার। চিনচিন ব্যথা খুবলে খাচ্ছে তার ভেতরটা। রাহার ঘুমন্ত মুখ পানে তাকিয়ে মনে মনে ভাবে ভিহান,
“ম’রে যাবো আমি রাহা। তোকে ছাড়া একদম ম’রে যাবো।”
ভিহানের ভেতর কাঁপে, গলা কাঁপে। ঠোঁট নড়তে থাকে। চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে চাইলেও তার কঠিন সত্তা বাঁধা দেয়। রাহার হাতটা মুঠোভরে নিয়ে আনমনে আওড়ায়,
“তুই ছাড়া আমি ভিহান নিঃস্ব, অস্তিত্ব হীন। তোকে মরণ ছোঁয়ার আগে মৃত্যু আমায় কবুল করে নিক, মাই বাটারফ্লাই।”
জাহানারা বেগম কাছে আসতেই ভিহান নিজেকে সামলে নিলো। রাহার হাত ছেড়ে এগিয়ে গেলো মিসেস সুপ্তি দাসের কাছে। বেশ আগ্রহ আর উৎকণ্ঠার সহিত বলল ভিহান,
“ডক্টর, আমি যতদূর জানি বাথার জন্যে ওকে দেওয়া ডাইক্লোফেনাকে তো ঘুম আসে না। তবে ও ঘুমিয়ে গেলো কেন? ঠিক আছে তো ও?”
৩৫ বছর বয়সী সুপ্তি দাস নিজের চশমা টা ঠিক করলেন। ভালো ভাবে তাকিয়ে দেখলেন ভিহান কে। এসেছে পর থেকে ছেলেটাকে অদ্ভুত ব্যাকুল দেখাচ্ছে। ইনজেকশন দেওয়ার সময় ছেলেটা কিভাবে মেয়েটার মুখ বুকের সাথে চেঁপে ধরে রেখেছিলো তা খেয়াল করেছেন উনি। তাছাড়া মেয়েটাকে নিয়ে ছেলের এই সেনসিভিটি বেশ চোখে পড়ছে। শরীরে ইনজেকশন পুশ করার সময় একবার আপনাআপনি চোখ চলে গেলে দেখেছেন উনি ছেলেটার মুখ। কি নিদারুণ দেখাচ্ছিলো কঠিন মুখটা। যেন কষ্ট মেয়েটার নয় ওরই হচ্ছিলো। পারছিলো না শুধু মেয়েটাকে বুকের ভেতর লুকিয়ে ফেলতে। অদ্ভুত আগ্রহ হচ্ছিলো উনার জানার জন্যে ওই ছেলের কি হয় এই মেয়ে? কি সম্পর্ক ওদের? কিন্তু নিজের ব্যক্তিত্বের বাহিরে গিয়ে উনি সেসব আলোচনা না করে সরাসরি বললেন,
“দেখুন ওর বয়স কম। শরীরও ভীষণ উইক। তাছাড়া ব্যক্তি বিশেষে এটা কার্যকর হয়। দূর্বলতা থেকেই ঘুমিয়ে গিয়েছে। ঘাবড়াবেন না।”
ভিহান কে চোখ বন্ধ করে নিশ্বাস নিতে দেখা গেলো। যেন একটু স্বস্তি পেয়েছে এই মুহূর্তে।
“ওর হরমোনাল প্রবলেম আছে। এই কারণে পিরিয়ড সার্কেল অনিয়মিত আর তীব্র ব্যথা। আশা করছি ঔষধ নিয়মিত খেয়ে গেলে বিশেষ চিন্তার কারণ হবে না। প্রয়োজনে ঢাকা গিয়ে আরো ভালো চেক আপ করিয়ে নিবেন।”
ভিহান খুব সাবধানে ধীরে গাড়ি চালিয়ে এসেছে। গাড়িতে রাহা জাহানারা বেগমের কোলে ঘুমিয়ে। আসার সময় আবার জিদানও এসেছিলো ক্লিনিকে। এক সাথেই বাড়ি ফিরছে। কিন্তু একটা কথাও আর মুখ ফুটে বলেনি ভিহান। বাড়ি পৌঁছে নিজ দায়িত্বে রুক্ষ কঠিন মুখে রাহা কে কোলে তুলে ওর রুমে দিয়ে আসলো। এরপর আর তাকিয়ে দেখলো না রাহার মুখ ততক্ষণে ওর ঘরে বাড়ির সকলে চলে এসেছে।
রাহাকে রুমে রেখে ঘরে এসেই ক্লান্ত ভঙ্গিতে বিছানায় ধপাস করে বসে পড়ল ভিহান। ওর ভেতরটা একেবারে অসাড় হয়ে আসতে চাইছে। শরীরের জোড়ায় জোড়ায় ক্লান্তি ভাব। বুকের ভেতরটা এখনো লাফাচ্ছে ওর তীব্র ভাবে। এতক্ষণ ধরে বয়ে চলা ব্যাকুলতা আর উদ্বিগ্ন ভাব অবসাদ করে দিয়েছে ওর শরীর আর মন। ক্লান্তি বিষাদ ভাব শিরায় শিরায় পৌঁছে গিয়েছে যেন। শরীরে যেন একটুও আর শক্তি পাচ্ছে না নিজেকে সামলানোর কিংবা স্থির রাখার। অসাড় নিস্তেজ হয়ে ভেঙ্গে এলো ওর ভেতরটা। একটু ঝুঁকে হাটুতে ভর করে চোখে মুখ ঢেকে নেয় হাত দিয়ে। কিছুক্ষণ ক্লান্ত নির্বাক ভঙ্গিতে বসে থেকে ফোঁস করে তপ্ত শ্বাস ঝেড়ে ফেলে। ভঙ্গুর অসহায় কন্ঠে বিড়বিড় করে বলে,
“তুই আমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছিস রাহা। তোকে ছাড়া আমি আমার সত্তাকেও কল্পনা করতে পারি না বেঁচে থাকা তো অসম্ভব।”
চলমান….
Share On:
TAGS: ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ, সাদিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩১
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ২৬
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১১
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ১৬
-
ক্যাপ্টেন ভিহান আরভিদ পর্ব ১৯
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৭
-
প্রণয়ের ব্যাকুলতা পর্ব ৩৬