Golpo romantic golpo কালারব্লাইন্ড

কালারব্লাইন্ড পর্ব ৫(ক+খ)


#কালারব্লাইন্ড — ০৫

#সোফিয়া_সাফা 

ঘরের এককোনায় থাকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে আলতা। গলায় প্যাঁচানো হ্যান্ড র‍্যাপটা খুলতে না পারার ব্যর্থতাই তাকে নিয়ে এসেছে আয়নার সামনে। ধীর-স্থির ভঙ্গিতে দুহাতের যৌথ প্রচেষ্টায় অবশেষে খুলে এলো র‍্যাপটি।

সফেদ কাপড়ের ওপর রক্তের ছোপ ছোপ দাগ ইতোমধ্যেই শুকিয়ে শক্ত হয়ে গেছে। নিশ্চিতভাবেই এগুলো তার নিজের রক্ত নয়—রঞ্জকের। ভাবনাটা মাথায় আসতেই সামান্য কুঁচকে গেল আলতার ভ্রু জোড়া।

​“বউমা।”

​হঠাৎ শ্বশুরের কণ্ঠ কানে আসতেই ভ্যানিটির ওপর তড়িঘড়ি র‍্যাপটা রেখে দরজার পানে ফিরলো আলতা। আরিজ মাহতাবির শূন্যহাতে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। দ্রুতপায়ে এগিয়ে গিয়ে ব্যগ্র চোখে শ্বশুর মশাইকে আপাদমস্তক পরখ করল সে। তারপর প্রশ্নাতুর দৃষ্টিতে তাকাল তার দিকে।

আরিজ মাহতাবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আলতার মাথায় হাত বুলিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে হাত বাড়াতেই মেয়েটা আতঙ্কে চোখ বুজে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। আলতার এমন আকস্মিক ব্যবহারে ব্যথিত হয়ে হাত গুটিয়ে নিলেন আরিজ।

মুহূর্তেই নিঃশ্বাস আটকে এলো আলতার। অনুশোচনায় বুকটা ভারী হয়ে উঠল; এমন আচরণ করা মোটেও উচিত হয়নি। ইচ্ছে করছে নিজের গালে দুটো চড় বসিয়ে দিতে! মাথা নিচু করে সে আবারও শ্বশুরের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। 

আরিজ মাহতাবির স্বর নরম করে আশ্বস্ত করলেন,

“আমি তোমাকে জুবার মতো কথা বলতে পারবে, এমন আরেকটা পাখি এনে দেবো, বউমা।”

​কথাটা শুনেই মুখ তুলে তাকাল আলতা। সবুজ চোখ দুটো তার আবারও জলে টলমল করে উঠল। তা দেখে ভীষণ অপরাধবোধে ভুগতে লাগলেন আরিজ মাহতাবির। কিছুটা অসহায়ের সুরে বললেন,

​“আসলে হয়েছে কী, জুবাকে রঞ্জকের খুব পছন্দ হয়ে গেছে।”

​“উনি কি জুবাকে আর ফেরত দেবেন না?” আলতা সোজাসুজি জানতে চাইল।

আরিজ মাহতাবির আর কিছু বললেন না। মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে সত্যিটা বলার সাহস হলো না তার। মনে হলো, কথাটা শুনলেই আলতা হয়তো তার সামনেই ভেঙে পড়বে। তাই তড়িঘড়ি প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন,

​“সকাল হয়ে এসেছে, তুমি এখন একটু ঘুমিয়ে নাও। আমরা পরে একদিন সময় করে নতুন পাখি আনতে যাবো। আর শোনো, আজ থেকে এই ঘরটা তোমার। নিজের মতো করে গুছিয়ে নিও। আলমারিতে তোমার দাদিশাশুড়ির কিছু শাড়ি আর কাপড়চোপড় আছে, আপাতত ওগুলোই ব্যবহার করো। আমি পরে সব ব্যবস্থা করে দেবো।”

আলতা ঠোঁট চেপে কান্না আটকানোর চেষ্টায় নিজের আঙুল কচলাতে লাগল। আরিজ মাহতাবির ক্ষণেক নীরব থেকে যোগ করলেন,

“আমার ঘর পাঁচ তলায়। যেকোনো দরকারে আমাকে জানিও।”

বলেই পা বাড়ালেন আরিজ মাহতাবির। আলতা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইল; পা দুটো যেন আচমকাই অবশ হয়ে আসছে। অন্যদের কাছে জুবা নেহাত এক পাখি হতে পারে, কিন্তু আলতার কাছে সে সন্তানের সমান! আর এই অচেনা পরিবেশে জুবাকে অন্যত্র রেখে নিশ্চিন্ত থাকা কি আদৌ সম্ভব? সবচেয়ে বড় ভয়, রঞ্জক যদি অবুঝ পাখিটার ওপর নিজের সব ক্ষোভ ঝাড়ে, তখন কী হবে?

আলতা আর কোনো কিছু ভাবতে পারল না। চিন্তায় চিন্তায় তার মাথাব্যথা শুরু হয়ে গেল। দরজায় হাত ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল আলতা। তারপর নিজেকে সামলে চারতলার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল। যেভাবেই হোক, ওই ঘর থেকে জুবাকে উদ্ধার করে আনতেই হবে। জুবার খাতিরে আজ যদি আরও কিছু তিক্ত কথা সইতে হয়, তবে তা-ই সই! 

সিঁড়ি বেয়ে দোতলা থেকে চারতলায় উঠে এলো আলতা। ধীর কদমে এগিয়ে যেতে লাগল রঞ্জকের ঘরের দিকে। দূরত্ব যত কমছে, বুকের ভেতরটা যেন ততই সংকুচিত হয়ে আসছে তার। পা দুটো যেন আর এগোতেই চাইছে না। তবুও হেলতে দুলতে কোনোমতে রঞ্জকের ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল সে। 

দরজাটা আধখোলা। আর কয়েক কদম এগোলেই দরজার ফাঁক গলে ঘরের ভেতরটা চোখে পড়বে। তখনই মনে পড়ে গেল, ওই ঘরে ঢোকার পর রঞ্জকের রূঢ় আচরণের কথা।

​মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এবার আর ঘরে ঢুকবে না সে। বাইরে থেকেই স্রেফ বলবে জুবাকে ফিরিয়ে দিতে। জুবাকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত সে নড়বে না ওখান থেকে। ভাবনা অনুযায়ী এগিয়ে গেল দরজার পানে।

দরজার কাছে আসতেই তার নজরে এলো এক অদ্ভুত দৃশ্য; সোফায় আরজু বেগমের কোলে মাথা গুঁজে শুয়ে আছে রঞ্জক। অভিযোগের ঝাঁপি খুলে বসেছে লোকটা, একে একে উগড়ে দিচ্ছে মনের জমাট বাঁধা সমস্ত খেদ আর বিরক্তি। 

এমন দৃশ্য দেখে আলতার আর দরজায় টোকা দেওয়ার সাহস হলো না; কেবল স্তব্ধ হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল। দরজার ফাঁক গলে কানে ভেসে এলো রঞ্জকের খেদোক্তি,

“বিয়ের আগে উনি আমাকে বলেননি যে মেয়েটা ধ`র্ষিতা। যদি বলতেন, তাহলে আমি কোনোদিনও এই বিয়েটা করতাম না। উনি কেন আমার কাছ থেকে ব্যাপারটা লুকিয়ে রাখলেন? আমি ওনার কী এমন ক্ষতি করেছি, যার জন্য উনি এভাবে আমার জীবনটা তছনছ করে দিলেন?”

আলতা একপাশে সরে এসে ঘরের বাইরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিল। নির্বাক হয়ে শুনতে লাগল প্রতিটি শব্দ। আরজু বেগম নিজেও যেন বাক্‌রুদ্ধ হয়ে গেছেন; বিশ্বাসই করতে পারছেন না আরিজ মাহতাবির নিজের ছেলের সাথে এমন প্রতারণা করেছেন।

“তুই চিন্তা করিস না। আমি ভাইয়ার সাথে কথা বলবো। সে কেন এমন করেছে তার উত্তর তাকে দিতেই হবে।”

ভেজা গলায় জবাব দিল রঞ্জক, 

“এখন আর ব্যাখ্যা শুনে কী লাভ, ফুপি? যা ক্ষতি করার, তা তো উনি করেই ফেলেছেন। তুমি কিন্তু এই কথাগুলো আর কাউকে জানিও না, ঠিক আছে?” 

“গোপন রাখতে চাইছিস কেন? আমার তো মনে হয় এগুলো সবার জানা দরকার।”

ক্ষণকাল চুপ মেরে রইল রঞ্জক। তারপর ক্ষুব্ধ গলায় বলে উঠল, 

“গোপন রাখতে চাইছি কারণ এএম বলেছেন এই সত্যিটা জানাজানি হয়ে গেলে উনি আমার নমিনেশন আটকে দেবেন।”

“শুধু কি এই কারণেই? আচ্ছা, তুই আবার ওই মেয়েটাকে মেনে নেওয়ার কথা ভাবছিস না তো?”

রঞ্জক আবারও সময় নিয়ে চাপা গলায় বলল, 

“মেনে নেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না! আমার শেষ বিশ্বাসটুকুও উনি যেভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিলেন, এরপর ওনাকে বাবা বলে পরিচয় দিতেও বিবেকে বাধছে। জানো ফুপি, আমার আর কোনো পিছুটান রইলো না। এখন শুধু দিন গুনছি, কবে এই নরক থেকে বের হতে পারব।”

“এভাবে বলিস না রঞ্জু। তুই কেন চলে যাবি? মাহতাবির বংশের সবকিছুর ওপর যেমন ভাইয়া আর গুঞ্জনের অধিকার আছে, তেমন তোরও আছে। তুই কিচ্ছু ভাবিস না। মনোনয়নটা পেয়ে গেলেই নির্বাচনের প্রচারণায় মন দে। একবার তুই এমপি হয়ে গেলে আমি নিজে ওই মেয়েটার সঙ্গে তোর ছাড়াছাড়ি করিয়ে তোকে আবার বিয়ে করাবো।”

আলতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এই মুহূর্তে তাদের কথোপকথনে ব্যাঘাত ঘটাতে আর মন সায় দিল না। ঠিক করল, আরও কিছুক্ষণ পর আসবে—এই সিদ্ধান্ত নিয়ে নিজের ঘরে ফিরে এল সে।

অবসন্ন পায়ে খাটের দিকে এগিয়ে গিয়ে দেখল, নীল রঙের শাড়িটা পড়ে আছে সেখানে। শাড়িটা আলতার মনে করে নাবিল রেখে গিয়েছিল এখানে। 

নিজের পরনের পোশাকের দিকে তাকিয়ে আলতা ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। কাপড়টা এখনও স্যাঁতসেঁতে। বদলে নেওয়া দরকার। এই লাল রঙটা কেমন যেন গায়ে বিঁধছে, আর সহ্য হচ্ছে না। 

অন্যদিকে খাটে রাখা নীল শাড়িটাও অসহ্য লাগছে। মন চাইছে এমন কিছু পরতে, যা একেবারেই রঙহীন, বিবর্ণ। তবেই যদি খানিকটা স্বস্তি মেলে!

চারপাশে চোখ বুলিয়ে শেষমেশ আলমারির দিকে দৃষ্টি স্থির করল সে। কপাট খুলতেই গোছানো বেশ কিছু শাড়ি চোখে পড়ল তার। বেশিরভাগই হালকা শেডের। একটু খুঁজে খুব হালকা বাসন্তী রঙের একটা শাড়ি বেছে নিল আলতা।

এরপর চারপাশটা আবার পরখ করে বাথরুমটা খুঁজে নিল সে। ধীরপায়ে শাড়িটা নিয়ে হেঁটে গেল সেদিকে। 

গোসল সেরে মিনিট বিশেক পর নতুন শাড়িতে নিজেকে মুড়িয়ে বেরিয়ে এলো সে। পিঠে ছড়িয়ে থাকা রক্তাভ চুল থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। খুব দীর্ঘ না হলেও চুলগুলো কোমর ছুঁয়েছে। মুখে-চোখে লেপ্টে আছে জলবিন্দু। কী ভীষণ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে তাকে! গোলাপের পাপড়ির মতো ঠোঁট জোড়া দাঁতের নিচে পিষে ধরে আঁচল দিয়ে চুল মুছতে লাগল সে।

চুল ঝাড়তে গিয়ে ঝরে পড়া পানিতে সাদা ব্লাউজটা গায়ের সঙ্গে লেপ্টে গেছে তার। ব্লাউজটা মাপমতো না হলেও ফিতেগুলো কষে বেঁধে কোনোমতে সামলে নিয়েছে সে। আনমনে চুল শুকাতে শুকাতে আয়নার সামনের টুলে গিয়ে বসল আলতা। তখনই আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব চোখে পড়ল। চমকে উঠে বড় বড় চোখে নিজের দিকে তাকিয়ে রইল সে।

​ঘাড়ে, গলায় আর বুকের উপরিভাগ জুড়ে থাকা বিশ্রী কালচে আঁচড়ের দাগগুলো যেন তাকে উপহাস করছে। 

মুহূর্তেই দিশেহারা বোধ করল সে—যেভাবেই হোক, এগুলো ঢাকতে হবে! ছটফট করে উঠে দাঁড়িয়ে ভ্যানিটির তাক থেকে বডি লোশনের বোতল তুলে নিয়ে অনেকটা ঢেলে নিল তালুতে। তারপর উন্মাদের মতো ঘষতে শুরু করল দাগগুলোর ওপর। অঝোরে চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল জল। এই দাগগুলোকে ঘৃণা করে সে, মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে, ছুরি দিয়ে চামড়াসহ এই কুৎসিত দাগগুলো কেটে ফেলে দিতে!

বোতলের গায়ে লেখা মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখই বলে দিচ্ছে, লোশনটার মেয়াদ ফুরিয়েছে বহু আগেই। তবে সেদিকে খেয়াল করার মতো মানসিক অবস্থা আলতার নেই। লোশন মাখা শেষে গাদা গাদা পাউডার থাপড়ে কোনোমতে ঢেকে দিল দাগগুলো। যদিও আলতা জানে এভাবে বেশিক্ষণ ঢেকে রাখা যাবে না এগুলো। তাকে ভিন্ন কোনো উপায় খুঁজতে হবে।

হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরের দরজাটা সশব্দে বন্ধ করে খাটের ওপর হাঁটু মুড়ে উঠে বসল আলতা। এক কোণে গুটিসুটি মেরে হাঁটুতে মুখ গুজে কান্নায় ভেঙে পড়ল। বুকের ভেতরটা যেন তীব্র এক ঝড়ে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। কিছু নারকীয় স্মৃতি মস্তিষ্কে চেপে বসে তাণ্ডব চালাচ্ছে। আর সহ্য হচ্ছে না, সব যেন অসহনীয় ঠেকছে তার কাছে!

​যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতেই পার হয়ে গেল কয়েক ঘণ্টা। কান্নার তোড়ে একসময় আলতার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো, ঢলে পড়ল ঘুমে। 

যখন তার ঘুম ভাঙল তখন ঘড়ির কাঁটায় দুপুর। বেখেয়ালে ঘরের ফ্যানটাও চালু করা হয়নি। আগস্টের তীব্র গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার দশা তার।

​সেই ভ্যাপসা গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে উঠে বসল আলতা। খাটের নিচে পা ঝুলিয়ে আড়মোড়া ভাঙল। মুখ ধুয়ে এসে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, রঞ্জকের ঘরে সে আরেকবার যাবে। জুবা নিশ্চয়ই তার দেখা না পেয়ে এতোক্ষণে অস্থির হয়ে উঠেছে। উঠবেই তো! এর আগে কখনো কি থেকেছে তাকে ছাড়া?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল আলতা। দাগগুলোর ওপর আরেকপ্রস্থ পাউডার মেখে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ল সে।

রঞ্জক তখন বাইরে বেরোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। বিরক্তি ফুটে উঠল তার মুখে; ঘরের দরজাটা তো খোলাই আছে, তবে আবার কড়া নাড়ছে কে? ফুপি কিংবা ভাই-বোনেরা হলে তো সোজাসুজি ঢুকে পড়ে; কড়া তো নাড়ে না! ভাবল, হয়তো কোনো পরিচারক হবে। চশমাটা ঠিক করতে করতেই সে হেঁটে গেল দরজার পানে।

​কিন্তু কপাটের ওপাশে আলতাকে দেখতেই মুখাবয়ব শক্ত হয়ে গেল তার। 

“তুমি এখানে কী করছ?” রঞ্জকের ভারিক্কি কণ্ঠে নিমেষেই শিউরে উঠে চোখ বুজল আলতা।

​তবুও সাহসটুকু কুড়িয়ে নিয়ে মিনমিন করে বলল, “দ-দয়া করে জুবাকে ফিরিয়ে দিন।”

​“অসম্ভব! ওকে আর পাচ্ছ না তুমি। যাও এখান থেকে! আর কক্ষনো আসবে না আমার চোখের সামনে।”

“আসব না! শুধু জ-জুবা…”

​“জাস্ট শাট আপ! আমি কী বলেছি তা কানে যায়নি?”

বলেই মুখ ঘুরিয়ে ঘরের ভেতর পা বাড়াল রঞ্জক। শোবার ঘরের সাইড টেবিলে রাখা গোলাকার খাঁচাটার দিকে তাকাতেই রঞ্জকের চোখে পড়ল—জুবা ডানা দুটো গুটিয়ে নিথর হয়ে বসে আছে। রঞ্জকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। খানিক আগেই ভীষণ চেঁচামেচি করছিল পাখিটা; তারপর রঞ্জকের ধমক খেয়ে একদম মিইয়ে গেছে।

হাতঘড়িতে সময়টা দেখে খাটের ওপর রাখা ছোট্ট প্লেটটা তুলে নিল রঞ্জক। তারপর এগিয়ে গেল খাঁচার দিকে। প্লেট ভর্তি মটরশুঁটি দেখে জুবা আনন্দে মিষ্টি সুর তুলল,

“জুবআ! জ-জুবআ!”

রঞ্জক খাঁচার ছোট দরজাটা তুলতে গিয়েও হাত গুটিয়ে নিল। খানিকটা শাসিয়ে বলল, 

“খাবার চাই তো? দিচ্ছি! কিন্তু বাইরে বের হওয়ার প্ল্যান একদম করবে না। যদি করো তাহলে কিন্তু ঠ্যাং ভেঙে ফেলবো। সো, ডোন্ট ইভেন ট্রায় টু এস্কেপ।”

জুবা মাথা নাড়ল বটে, কিন্তু দরজার ফাঁকটা একটু বড় হতেই ফুড়ুৎ করে বেরিয়ে আসার চেষ্টা চালাল। নিমেষেই সশব্দে খাঁচার দরজাটা বন্ধ করে দিল রঞ্জক। খাবারের প্লেটটা পাশে সরিয়ে রেখে বুকে হাত ভাঁজ করে বলল,

“হাহ! কত বড় সাহস! এর ফল ভোগ করতে হবে তোমাকে। আমি না ফেরা অবধি না খেয়ে থাকবে, তাহলেই পালিয়ে যাওয়ার ভূত মাথা থেকে নামবে।”

রঞ্জক সোজা হয়ে দাঁড়াতেই জুবা যেন দিশেহারা হয়ে চিৎকার শুরু করল, “পঁচা লোক! শয়তান লোক! আলতা কোথায়? আলতা কোথায়!”

জবাবে রঞ্জক কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল পাখিটার দিকে। পরক্ষণেই উচ্চস্বরে হেসে উঠল সে। ঠাট্টার স্বরে বলল,

“যেমন কুকুর, তেমন মুগুর! তোমাদের মতো অভদ্রদের কীভাবে সোজা করতে হয়, তা এই রঞ্জক মাহতাবির খুব ভালো করেই জানে। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড ওয়াচ!”

চাবির গোছাটা মুঠোয় পুরে নিয়ে কনুই পর্যন্ত শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে ঘরের বাইরে বেরিয়ে এলো রঞ্জক। মূল দরজাটা লক করে পাশ ফিরে তাকাতেই থতমত খেয়ে গেল সে। আলতা তখনও সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। রঞ্জক কিছু একটা উগড়ে দেওয়ার আগেই আলতা দুহাত জোড় করে আকুল গলায় মিনতি করল,

“আপনি আমাকে যত খুশি অপমান করুন। শুধু দয়া করে জুবাকে ফিরিয়ে দিন। ও তো আপনার কোনো ক্ষতি করেনি। শুধু শুধু কেন ওকে কষ্ট দিচ্ছেন?”

রঞ্জক নিস্পৃহ চোখে তাকিয়ে রইল আলতার দিকে। তার চাউনি দেখে আলতার মনে সংশয় জাগল; শরীরের দাগগুলো কি তবে দেখা যাচ্ছে? ভাবতে ভাবতেই আলতা শাড়ির আঁচল দিয়ে আরও ভালোভাবে নিজেকে ঢেকে নিল। এমনিতেই মাথায় কাপড় টানা ছিল তার। এবার ঘোমটার আড়ালে মুখের প্রায় অর্ধেকটা ঢাকা পড়ে গেল। 

রঞ্জক পুরোপুরি তাকে উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে হাঁটা ধরতেই আলতাও তার পিছু নিল।

চলবে… 

(সবাই রেসপন্স করুন প্লিজ।)

#কালারব্লাইন্ড — ০৫ (বর্ধিতাংশ)

#সোফিয়া_সাফা 

অভ্যাসমতো সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল রঞ্জক। তিনতলায় নামতেই লিফটের দরজা খোলার শব্দে পেছনে থাকা আলতা একমুহূর্ত থমকে গেলেও রঞ্জককে অনুসরণ করেই চলল। 

তখনই ভেসে এলো, “আরে আরএম, শুনলাম তুই নাকি বউকে মেনে নিসনি। অথচ বউ যেভাবে তোর পেছনে ছুটছে তাতে তো আমার বেশ সন্দেহই হচ্ছে।”

রঞ্জকের পায়ের গতি মন্থর হয়ে এলো। আলতা তার সঙ্গে ধাক্কা খেতে খেতেও নিজেকে সামলে নিয়েছে। রঞ্জক চোখ ফেরালো লিফটের দিকে। একজন যুবক মুখভর্তি হাসি নিয়ে লিফট থেকে বেরিয়ে এগিয়ে এল তাদের দিকে। 

ঘোমটার আড়ালে মুখ লুকিয়ে থাকা আলতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল, “এত বড় ঘোমটা দিয়ে রেখেছো কেন গো নতুন বউ? গরম লাগছে না?”

আলতা কোনো উত্তর দিল না। রঞ্জক পকেটে হাত গুজে আওড়াল, “তুই নিশ্চয়ই অফিসে যাচ্ছিস, ইভান?”

“ইয়েস ব্রো। আমার তো লেট নাইট ডিউটি চলছে। তাই গতরাতে নতুন বউকে না দেখেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।”

রঞ্জক শেষোক্ত কথায় গুরুত্ব না দিয়ে লিফটের দিকে ইশারা করে বলল, “তোর লেট হয়ে যাচ্ছে। ইউ শুড গো।”

“ওয়াও আরএম, তুই আমাকে নিয়ে এত ভাবছিস? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না।”

ইভান নামের যুবকটি রঞ্জকের ফুপাতো ভাই। সে আলতার দিকে মনোনিবেশ করে বলল, “নতুন বউয়ের চাঁদমুখখানি দেখি তো একটু।”

“কোনো প্রয়োজন নেই ইভান। নিজের কাজে যা।” রঞ্জকের অযাচিত হস্তক্ষেপে ইভান বিরক্ত হলো খুব। সরু চোখে তাকিয়ে বলল, “তোর সমস্যা কী হুম? দেখে তো মনে হচ্ছে নিজেও কাজে যাচ্ছিস। তো আমাকে পরামর্শ না দিয়ে নিজের কাজে মন দে না।”

রঞ্জক কোথাও গেল না। উল্টো শার্টের হাতা গুটিয়ে নিতে শুরু করল। যা দেখে ইভান বড়সড় ঢোক গিলে মিনমিনিয়ে বলল, “ভয় দেখাচ্ছিস কেন? তুই তো মেয়েটাকে বউ হিসেবে মেনেও নিসনি। তাহলে আমি একটু দেখতে চাইছি বলে তোর এতো ফাটছে কেন?”

রঞ্জকের মুখটা আরও বেশি থমথমে হয়ে এলো। ইভান পেছাতে পেছাতে লিফটের দরজায় তার পিঠ ঠেকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে লিফটের দরজা অটোমেটিক খুলে গেল। ইভান সোজা ফ্লোরে ল্যান্ড করতেই যাবে তার আগেই রঞ্জক হাত বাড়িয়ে তার প্যান্টের বেল্ট টেনে ধরল। মুহূর্তেই ইভানের শরীরটা ঝাঁকুনি খেয়ে পেছনে আটকে গেল। আতঙ্কে কণ্ঠ চিরে বেরিয়ে এল,

“ও মা গোওও…” 

তার আর্তনাদে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে আলতা ঘোমটা সরিয়ে এগিয়ে গেল। ইভানের চিল্লানি থেমে গেল আলতাকে দেখামাত্রই। হাঁ হয়ে গোল গোল চোখে চেয়ে রইল কোমলমতি মেয়েটার দিকে। তার চাউনি অনুসরণ করে রঞ্জকও ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। 

এদিকে আলতা ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইল রঞ্জকের বেল্ট টেনে ধরে রাখা হাতটার দিকে। একহাতেই ইভানের মতো প্রাপ্তবয়স্ক একজন পুরুষকে এমনভাবে ধরে রেখেছে রঞ্জক, যার জন্য ইভান শূন্যে ঝুলছে।

“মুখ ঢাকো।” গমগমে পুরুষালী কণ্ঠে উচ্চারিত দুটো শব্দ যেন আলতার কানে উত্তপ্ত লাভার মতো ঢুকে গেল। কথাটার মানে বুঝে উঠতে পারল না সে।

রঞ্জক রাগে ফুঁসে উঠে আচমকাই ইভানকে ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে ধপাস শব্দে ফ্লোরে আছড়ে পড়ল ইভান। ব্যথায় ককিয়ে উঠল যুবক, 

“গেলো রে গেলো, আমার কোমরটা ভেঙেই গেলো বোধহয়।”

আলতার স্তম্ভিত চোখ গিয়ে মিলল রঞ্জকের ধূসর চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। যেন মেয়েটার চোখদুটিই প্রশ্ন ছুড়ে দিল— ‘কেন এভাবে ছেড়ে দিলেন তাকে?’

অথচ সেই প্রশ্নভরা দৃষ্টি উপেক্ষা করে রঞ্জক তড়িৎগতিতে এগিয়ে গেল তার দিকে। কণ্ঠস্বরে ঢেলে দিল নিজের সবটুকু ক্ষোভ, “এই মেয়ে, তোমাকে আমি মুখ ঢাকতে বলেছি না? এক্ষুণি মুখ ঢাকো, নয়তো তোমার মুখের এমন হাল করব যে, না থাকবে মুখ; আর না থাকবে তা অন্য কাউকে দেখানোর ইচ্ছা।”

এহেন বর্বরোচিত মন্তব্যে আলতার গলা অবধি কিছু একটা উঠে এলো। সে তৎক্ষণাৎ ঘোমটা টেনে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। ঘোমটার আড়ালে কেঁপে উঠল তার ঠোঁট, কয়েক ফোঁটা অশ্রুজল ঝরঝরিয়ে ভূপাতিত হলো। একইসঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাঁপতে লাগল শরীর; তার অনুভূতি কেবল ঘৃণা, অপমান আর লাঞ্ছনাতেই সীমাবদ্ধ রইল না। ধীরে ধীরে শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল ক্ষোভ।

ইভান উঠে দাঁড়িয়ে লিফট থেকে বেরিয়েই আসছিল। তখনই রঞ্জক তার দিকে ধাবিত হলো। যুবকটির হাত চেপে ধরে তাকে নিয়েই লিফটের ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর বোতাম চাপতেই সেকেন্ডের ব্যবধানে দরজাটা বন্ধ হয়ে লিফটটা নিচে নামতে শুরু করল। ঘোমটা সামান্য উঁচিয়ে আলতা নিস্তরঙ্গ চোখে তাকিয়ে রইল বন্ধ দরজাটার পানে। 

এদিকে লিফটের দরজা বন্ধ হওয়া মাত্রই ইভানের হাত ছেড়ে দিয়েছে রঞ্জক। ইভান তখনও কোমর চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আঁড়চোখে রঞ্জককে দেখে নিয়ে আওড়াল,

“এটা কোন ধরনের আচরণ? মেয়েটাকে আমি দেখে ফেললে তোর তাতে কী সমস্যা?”

রঞ্জক গলার টাইটা ঠিক করতে লাগল। সাদা শার্টের ওপর কালো টাইয়ে তাকে বেশ প্রফেশনাল চাকরিজীবীই লাগার কথা, কিন্তু গুটিয়ে রাখা হাতাদুটো সেই ভাবটা ফুটতে দিচ্ছে না। একে একে হাতা দুটো নামিয়ে টানটান করে নিল সে, তারপর নিজের মধ্যে যথাসম্ভব প্রফেশনাল ভাব ফুটিয়ে তুলল।

“কী হলো, বলছিস না কেন? এমন আচরণ করার কারণ কী?”

“কারণটা সিম্পল। আমি চাইছি না কেউ ওকে গুরুত্ব দিক। বাড়ির সবাই ওর উপস্থিতি এড়িয়ে চলুক, যাতে একসময় অতিষ্ঠ হয়ে নিজেই এএমের কাছে গিয়ে আমাকে ডিভোর্স দিতে চায়।”

“ও আচ্ছা, তাহলে এই ব্যাপার? সোজাসুজি বললেই পারতি—মেয়েটাকে ঘাড় থেকে নামাতে তোর আমাদের সাহায্য দরকার।”

রঞ্জক তেরছা চোখে তাকাল। যেন ইভান কী ধরনের সাহায্যের কথা বলেছে, তা সে বুঝতেই পারেনি। ইভান একপ্রস্ত হেসে তার কাঁধে হাত তুলে দিয়ে বলল, “না বোঝার ভান করিস না। এই যে মেয়েটাকে এড়িয়ে চলতে হবে, এটা তো একপ্রকার তোকে সাহায্য করাই হলো, তাই না?”

রঞ্জক তার হাতটা নামিয়ে দিয়ে বলল, “আমি তোর কাছ থেকে কোনো সাহায্যই চাইছি না। ওর থেকে দূরে থাকতে বলছি তোর নিজের ভালোর জন্য।”

ইভানের ভ্রূ কুঁচকে গেল, “আমার ভালো?”

রঞ্জক মুখটাকে সিরিয়াস করে ব্যাখ্যা করল, “অফকোর্স, তুই নিশ্চয়ই নিজের হাড়গোড় ভাঙতে চাইবি না। রাইট?”

ইভান কথাটার মানে বুঝে ওঠার আগেই লিফট গ্রাউন্ড ফ্লোরে থেমে গেল। রঞ্জক তাড়াহুড়ো করে লিফট থেকে বেরিয়ে কাজে চলে গেল। ইভান বেকুবের মতো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কোমর থেকে হাত সরিয়ে ব্যথাটা উপেক্ষা করে নিজেও হাঁটা ধরল।

ভ্যালেনিয়ার অন্যতম পরিচিত প্রিমিয়াম ইন্টেরিয়র ও লাইফস্টাইল কোম্পানি ‘আলবা লাইফস্টাইল লিমিটেড’-এর ভাইস প্রেসিডেন্ট অব স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট হিসেবে কর্মরত আছে রঞ্জক মাহতাবির। নিজের বাবার ব্যবসায় অবশ্য কোনোদিনও যোগদান করতে দেখা যায়নি তাকে। ​

অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় তিনটা বেজে গেল রঞ্জকের। ডেস্কের ওপর রাখা ল্যাপটপটা খুলে সামনে টেনে নিল সে।

একাধারে কয়েকঘণ্টা কাজ করার পর… 

টাইয়ের গিটটা সামান্য আলগা করে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল রঞ্জক। স্ক্রিনে খোলা প্রজেক্ট রিপোর্টের স্লাইডগুলো একে একে দেখে নিচ্ছিল সে। 

এরইমধ্যে দরজায় দুবার টোকা পড়ল।

রঞ্জক তাকাতেই তার টিমের জুনিয়র স্ট্র্যাটেজি এনালিস্টকে ফাইল হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল।

“মে আই কাম ইন, স্যার?”

“কাম!”

​“স্যার, চলমান প্রজেক্টের রিভাইজড প্রপোজালটা এনেছি। আপনি একবার দেখে দিলে ক্লায়েন্টের কাছে পাঠিয়ে দিতাম।”

​রঞ্জক হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিল। কয়েক পৃষ্ঠা উল্টেপাল্টে দেখে একটা জায়গায় এসে থামল সে।

​“এখানে প্রজেক্টেড অপারেটিং কস্ট এত কম কেন?”

​এনালিস্ট একটু ইতস্তত করে বলল, “স্যার, আগের কোটেশনের ওপর ভিত্তি করেই বাজেটটা ধরা হয়েছে।”

রঞ্জক শান্ত গলায় বলল, ​“আগের কোটেশন তো তিন মাস আগের, ম্যাটেরিয়াল আর ট্রান্সপোর্টেশন কস্ট তো এর মধ্যে বেশ বেড়েছে। এই ফিগারটা আনচেঞ্জড আছে কীভাবে?”

যুবকটি সঙ্গে সঙ্গে মাথা নেড়ে বলল, “জি স্যার, আমার খেয়াল করা উচিত ছিল… আমি আবার রিচেক করছি।”

​“হিসাবগুলো আজকের মধ্যেই আপডেট করে ফাইলটা রেখে যেও।”

​“ঠিক আছে, স্যার।” ফাইলটা নিয়ে বের হয়ে গেল সে।

রঞ্জক আবার ল্যাপটপের দিকে মনোযোগ দিতে যাবে, এমন সময় ডেস্কের ওপর রাখা টেলিফোনটা বেজে উঠল। কল রিসিভ করে কানে তুলল সে। ওপাশের কথাগুলো শুনে বলল, ​“না, ওই প্রাইসে আমরা এগ্রিমেন্ট করব না। আপনারা যদি মনে করেন অন্য সাপ্লাইয়ার দিয়ে একই কোয়ালিটি পাওয়া সম্ভব, ফিল ফ্রি টু ট্রাই। তবে আপনারা যদি ডেডলাইন মেইনটেইন করতে না পারেন, তার দায় আমাদের ওপর চাপাতে পারবেন না।” 

একটু থেমে ওপাশের লোকটার কথা শুনে নিয়ে সাবলীল গলায় বলল, “ফাইন, সেন্ড মি দ্য রিভাইজড টার্মস। আমি দেখে নিচ্ছি।”

​কল কেটে ফোনটা নামিয়ে রাখল রঞ্জক। ​চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটো কয়েক সেকেন্ডের জন্য বুজে রইল সে। দুপুর থেকেই মনোযোগটা বারবার হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। না চাইতেও কোনো এক অপ্রিয় মুখশ্রী কাজের পুরো গতিটাই ধীর করে দিচ্ছে আজ।

কপালের ওপর দু আঙুল চেপে ধরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল রঞ্জক। তারপর ল্যাপটপের ব্রাইটনেসটা সামান্য বাড়িয়ে আবার রিপোর্টের দিকে মন দিল সে।

তন্মধ্যে দমকা হাওয়ার মতো একজোড়া হাত আচমকা এসে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। রঞ্জক প্রতিক্রিয়া দেখাতে যাবে তার আগেই হাতদুটো তার বাহু আঁকড়ে ধরে কাঁধে মাথা এলিয়ে দিল। 

“উফফ, এত কাজ করতে হবে না আরএম। চলো, আমি তোমাকে তোমার পছন্দের জায়গায় নিয়ে যেতে এসেছি। যেখানে তোমাকে মানায় এবং যে জায়গাটা তোমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।”

রঞ্জক বিরক্তি চেপে বলল, “তোমাকে কতবার বলেছি, কঙ্কা, কাজের সময় হুটহাট চলে আসবে না। এতে আমার কাজের অনেক ক্ষতি হয়।”

কঙ্কা মুখ তুলে তাকাতেই তার সুশ্রী মুখাবয়ব স্পষ্ট হলো। অ্যাম্বার রঙা চোখ আর একই রঙের চুলের অধিকারী নারীটি নিঃসন্দেহে সুন্দরী। কার্লি চুলগুলো একপাশে এনে সেট করা ছিল। গলায় ডায়মন্ড-স্টোনের নেকলেস, কানে মানানসই এয়ারিং। অফ-শোল্ডার ওয়েস্টার্ন ড্রেসে তার সুঠাম অবয়ব বেশ আকর্ষণীয় দেখাচ্ছিল। পুরু ঠোঁটজোড়া হালকা গোলাপি লিপগ্লোসের আবরণে ঢাকা। টানা টানা চোখজোড়ায় মোটা করে সাদা কাজল টানা, মুখজুড়ে নিখুঁত প্রসাধনের ছোঁয়া।

“আমি হুটহাট আসিনি। তবে ফোনটা সাইলেন্ট করে রাখলে তো হুটহাটই মনে হবে। চেক করে দেখো, আসার আগে কতগুলো টেক্সট আর কল দিয়েছি।”

রঞ্জক ল্যাপটপটা পুনরায় ওপেন করতে করতে বলল, “অনেকগুলো জরুরি রিপোর্ট চেক করা এখনো বাকি। মনে হয় না আজ যেতে পারব।”

“কী বললে? তুমি আজকেও লেট হয়ে গিয়েছিলে নাকি আরএম?”

কঙ্কার কথায় রঞ্জকের বিরক্তির মাত্রা বাড়লো। স্ক্রিনে মনোযোগ স্থাপন করে বলল, “হ্যাঁ।”

“ডোন্ট ওয়ারি। আমি থাকতে চিন্তা কিসের?”

“দেখো কঙ্কা, তুমি আজ একাই চলে যাও। দুদিন পরপর কাজে ফাঁকি দিতে খুব একটা ভালো লাগে না আমার।”  

“ওহ নো আরএম, আমি একা যেতে পারব না। কারণ তোমাকে ছাড়া ওখানে গিয়ে কোনো মজা নেই।”

বলেই কঙ্কা নিজের ফোনটা বের করে তার বাবাকে কল লাগাল। বাবা মুবাশ্বির আলবা কলটা রিসিভ করতেই মেয়ে তার আহ্লাদী গলায় বলল, “ড্যাড, আরএম এখনো কাজ করছে। আমি ওকে নিয়ে ডেটে যেতে চাইছি কিন্তু ও কাজের চাপে যেতে পারছে না। তুমি ওকে বলে দাও না, কাজের চেয়েও বেশি ওর সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, তাকে প্রায়োরিটি দিতে।”

রঞ্জকের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তবুও চুপচাপ সহ্য করে নিল। কঙ্কা ফোনটা এগিয়ে দিতেই অনিচ্ছাসত্ত্বেও রঞ্জক কানের কাছে নিয়ে মুবাশ্বির আলবার কথাগুলো শুনলো। তারপর ছোট্ট করে বলল, “ওকে স্যার। থ্যাংক ইউ।”

রঞ্জক ফোনটা ফিরিয়ে দিয়ে রিপোর্টগুলো সেভ করে রেখে উঠে দাঁড়াল। কঙ্কা তার বাহু আঁকড়ে ধরে বলল, “লেটস গো, আরএম।”

রঞ্জক একহাত পকেটে গুজে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে হাঁটা ধরল।

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply