Golpo romantic golpo কাছে আসার মৌসুম

কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৬


কাছেআসারমৌসুম!__(৭৬)

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

বাড়ির অবস্থা ভালো নয়। চারদিকে বিরাজ করছে থমথমে হাওয়া। একমাত্র তুশি ছাড়া বিয়ে নিয়ে কারো আনন্দ নেই, হাসি নেই গুরুজনদের মুখে। কিন্তু তাতে অয়নের খুব বেশি যায় এলো না। নিজের মতো বিয়ের বন্দোবস্ত শুরু করল সে। একটা লম্বা ছুটি নিলো হাসপাতাল থেকে। দুহাত ভরে কেনাকাটা করল,যা যা দরকার। চাচার হাতে একটা এমাউন্ট ধরিয়ে দিলো ক্লাব বুকিং দেয়ার জন্যে! তার এসব কার্যকলাপে সবাই বুঝে ফেললেন,এই বিয়েতে তাল মেলানো ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তবে ইউশার পরীক্ষা তো আর এসব মানবে না। পরীক্ষা দেখবেও না ওর বিয়ে কবে! মেয়েটা বিয়ের চিন্তায় এমনিই ছটফট করছিল,তারওপর শেষ পরীক্ষার প্যারা আরো বোঝা বাড়িয়ে দিল ঘাড়ে। কোনোরকম ওই চিন্তা ঠেলেঠুলে মাথা থেকে সরিয়ে, আজকে ছাদের মেঝেতে একটু পড়তে বসল ইউশা। বিকেল তখন! সোনালী আলোয় আশপাশ মেখেছে। হঠাৎ কানে এলো সদর গেইট খোলার শব্দ। কৌতূহলে মাথা তুলে উঁকি দিয়ে দেখল,অয়নের গাড়ি ঢুকছে। গাড়িটা লনে যাওয়া অবধি চেয়ে রইল ইউশা । অয়ন ভাই ভীষণ ব্যস্ত মানুষ! বিয়ে নিয়ে এখনই ছোটাছুটি শুরু করেছেন। নতুন নতুন ফার্নিচার তুলছেন রুমে। ওর যাবতীয় জিনিস, বেনারসি সবই কেনা শেষ তার। হয়ত এতে খুশি হওয়ার কথা,কিন্তু কেন যেন ইউশার এসব কিচ্ছু ভালো লাগছে না। হঠাৎ করে অয়ন ভাই বিয়ে নিয়ে এত উদ্বেগী কেন হয়ে উঠল? কবুল বলে একসাথে থাকারই তো ব্যাপার। এমন জাকজমকের দরকার তো নেই। কোনোভাবে এসব তুশিকে দেখাতে নয় তো! ইউশার বুক কাঁপে ওসব ভাবতে গেলেও। না,এমন না হোক। ও সব পারবে শুধু পারবে না এটুকু। এমন অদ্ভুত কপাল ওর,যাকে পাওয়ার জন্যে এক সময় প্রতিনিয়ত আনচান করেছে, যাকে একবার ছুঁতে আবেগে উদ্বেল হয়ে মরেছে,সে আজ খাতাকলমে ওর হতে যাচ্ছে; অথচ বুকের ভেতর ইউশা একটুও শান্তি অনুভব করছে না। অয়ন ভাই জোর করে সংসার করবে,জোর করে মানবে ওকে,জোর করে চাইবে জীবন পাড়ি দিতে এই জোরাজোরির সঙ্গ ও চায়নি। কিন্তু আজ ইউশার হাতে কিছু নেই। কিচ্ছু না!
তক্ষুনি পায়ের শব্দ হলো, আসছে কেউ। পাশ ফিরল ইউশা। অয়নকে দেখেই অবাক হলো একটু। মলিন চোখের চাউনি লুকোতে ধড়মড়িয়ে উঠতে চাইল। তোড়ে গা থেকে ওরনা খসে মেঝেতে পড়ে যায়।। কুণ্ঠায় ইউশা থমকে যায়,নুইয়ে পড়ে। তুশি ওরনা গলায় ঝুলিয়ে পরলেও,ও সব সময় রাখ-ঢাক রেখে পরে। ওরনা গলা থেকে নামানো থাকে পেট অবধি। আর সেই পড়ল এমন পরিস্থিতিতে? চট করে বুকের সাথে হাতের বইটা চেপে ধরল ও। অস্বস্তিতে চুইয়ে পড়া চোখের কোণ তুলে তাকাল একটুখানি। অয়ন নিজেও কিছু থতমত খেয়েছে। গলা ঝারল সে। ঝুঁকে গিয়ে মেঝে থেকে ওরনা তুলে,অন্যদিকে ফিরে বাড়িয়ে দিলো। তাড়াহুড়ো করে ওরনা নিয়ে গায়ে পরল ইউশা।
ইতস্ততবোধ কাটিয়ে শুধাল,
“ তুমি, ছাদে? তুমি তো ছাদে তেমন আসো না।”
“ শুনলাম তুই ছাদে,তাই।”
“ আমার জন্যে এসেছো?”
চোখ ছাপানো অবিশ্বাস নিয়ে মুখ তুলল মেয়েটা। অয়নের কাছে তাজ্জব লাগল বৈকি।
ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ কেন,আসা বারণ?”
ইউশা হাসল কেমন করে,
“ না,তা কেন হবে?”
অয়ন এই হাসির মানে বোঝে। বাচ্চা তো আর নয়। প্রসঙ্গ কাটাতে বলল,
“ তোর কোনো ড্রিম কান্ট্রি আছে? যেখানে ঘুরতে যেতে চাস?”
দুপাশে মাথা নাড়ল ইউশা।
“ না, আম্মু তো শহরের বাইরেই কোনোদিন যেতে দিলো না। বন্ধুদের সাথে কত ট্রিপ,কত পিকনিক হাসতে হাসতে ক্যান্সেল করে দিতাম। এখনো নিজের দেশটাই ঘুরলাম না,আবার ড্রিম কান্ট্রি!”
অয়ন নিজের হাতের দিকে চাইল। ইউশাও তাকাল দেখাদেখি। এতক্ষণে খেয়াল করল ওর হাতে খামের মতো কিছু একটা আছে। জিজ্ঞেস করার আগেই খামটা বাড়িয়ে দিলো অয়ন। বলল,
“ এটা তোর কাছে রাখ। আমার আজকাল জিনিস খুব হারায়,তাই তোকে দিচ্ছি।”
ইউশা নিলো।
খাম উল্টেপাল্টে তাকাল আবার।
“ কী এতে?”
“ হানিমুন-স টিকিট। বিয়ের দুদিন পর তোকে নিয়ে পাটায়া যেতে চাচ্ছি।”
মুঠো খসে খামটা পড়ে গেল ইউশার। হাঁ করে চেয়ে রইল দু পল। হতবিহ্বল চোখে বলল,
“ তুমি আমার সাথে হানিমুনে যাবে?”
অয়ন আবার তুলে দিলো। বলল,
“ বিয়ে যখন তোকে করব,হানিমুনে তো অন্য কাউকে নেব না। যাক গে, সাবধানে রাখিস। এই সিজনে ওখানকার টিকিট পাওয়া খুব মুশকিল।”
অয়ন ফিরে যাচ্ছিল,
হঠাৎ ডাকল ইউশা,
“ শোনো!”
ঘুরে চাইল সে,
“ কী?”
“ বেশি তাড়াহুড়ো হয়ে যাচ্ছে না?”
“ কী নিয়ে?”
ইউশা এগিয়ে এলো। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“ নিজের মনের ওপর এত চাপ দিও না,অয়ন ভাই। এসব হানিমুন টানিমুন এগুলো জোর করে হয় না। তুমি বরং সময় নাও। আমার কোনো অসুবিধে নেই।”
“ ইউশা আম…”
মেয়েটা কথা কেড়ে নিলো,
“ অয়ন ভাই,যেদিন তোমার মনে হবে তুমি শুধু আমাকে ভালোবাসো, পৃথিবীর আর কোনো নারীর প্রতি তোমার আর কোনো দূর্বলতা নেই,আমি সেদিন তোমার সাথে হানিমুনে যাব। সেই অবধি এটা তোমার কাছেই থাক।”
অয়নের হাতটা টেনে এনে টিকিটের খামটা ধরিয়ে দিলো ইউশা। পুরোটা সময় অয়ন চুপ করে চেয়ে রইল। ইউশা গিয়ে আবার ওর আগের জায়গায় বসলো। শীতলপাটির ওপর বিছিয়ে রাখা বইখাতা নিয়ে ব্যস্ত হলো পড়ায়। গোধূলির ঠান্ডা বাতাসের স্পর্শে অয়নের চোখমুখ শীতল হয়ে গেল।
একা,ফাঁকা চৌচির বুকটা নিয়ে ঘুরে পা বাড়াল ফিরতে। নিচে নামতে নামতে অন্তঃপটের চারিধার খুব আক্ষেপ করে চ্যাঁচাল,
“ কেন অয়ন, কেন শুরুতেই এই মেয়েটাকে তুমি সেই নজরে দেখতে পারলে না,যে নজরে প্রথম দিন তুমি তুশিকে দেখেছিলে!”


দুপুর বারোটা বাজে। তুশি এখনো নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। হাসনা কটমট করতে করতে তেড়েমেরে সিঁড়ি বেয়ে উঠলেন। আজ পণ করেছেন গিয়েই জোরসে দুটো কানের নিচে মারবেন ওর। সেদিন এত করে বোঝালেন,তাও এই মেয়ের ঘটে কিছু ঢুকলো না? সেই একইরকম পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে? দোর চাপানো ছিল। সার্থ সেই সাত সকালে কাজে চলে গেছে। বৃদ্ধা তড়বড়িয়ে ঢুকলেন। তুশি কম্বল গায়ে শুয়ে আছে। বাইরে গরম, অথচ বরফ পড়ছে এখানে। হাসনার রুগ্ন শরীর ঝাঁকুনি দিলেও, হনহনিয়ে এলেন তিনি। কিছু বলতে গিয়েও থামলেন পরপর। তুশির ঘুমন্ত মুখটা দেখে রাগ পড়ে গেল। উলটে ভীষণ মায়া লাগল হাসনার। এমন মরার মতো ঘুমোচ্ছে কেন মেয়েটা? হাসনা পাশে বসে আস্তে করে ডাকলেন,
“ ও তুশি, উডোস না? বেলা বাজে কত জানোস?”
তুশি চোখ বুজেই বলল,
“ উম দাদি, আবার সাতটা বাজে এসে জ্বালাচ্ছ তাই না?”
“ ছেরি কয় কী, সাতটা? ওই দ্যাখ বারোটা বাইশ বাজে। কাইল তোর বইনের বিয়া, আর তুমি ঘুমাস। বাড়িত কত কাম!”
তুশির টনক নড়ল। তাকাল, পরপরই উঠে বসল তড়াক করে। এক নজর ঘড়ি দেখেই খাট থেকে নেমে এদিক-ওদিক ছুটল মেয়েটা। হাসনা তব্দা খেয়ে বললেন,
“ হইল কী? ওই!”
তুশি কথা বলে না। এদিকে ছুটে তোয়ালে আনে, ওদিকে ছুটে জামাকাপড়। তারপর এক দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকতেই হাসনা ঠোঁট চেপে হাসলেন। উঠে এলেন,কান পাততেই টের পেলেন ভেতরে শাওয়ার ট্যাপ চলছে।
দরজায় টোকা দিয়ে বললেন,
“ গুসোল দিতাছস?”
“ হ্যাঁ।”
“ ক্যান, আইজকা ঠান্ডা লাগব না? আইজ শীত করে না তোমার?”
“ না করে না।”
“ শোয়ামি সুহাগ করলে কাউরই করে না। বুজি তো!”
তক্ষুনি রুমে এলো ইউশা। দুহাতে এত্তগুলো কার্ড। হাসনাকে দেখেই বলল,
“ দাদি, আপনি এখানে? মা আপনাকে নিচে ডাকল যে।”
“ হ যাই। হুনো বু, একখান কথা কই। মনে কিছু নিবা না তো?”
“ জি না,বলুন না!”
“ তুমি অহন নতুন বউ। এত ঘুরঘুর করবা না। বাইরেও বাইর হবা না। ঘরে বইয়া থাকপা। নজর লাগব!”
ইউশা হেসে ফেলল। তবে যুক্তি দিতে গেল না। বুড়ো মানুষ, আগের দিনের, এদের বোঝালেও লাভ নেই। ঘাড় নেড়ে বলল,
“ আচ্ছা।”
হাসনা ভারি খুশি হলেন। হাত দিয়ে ওর চিবুক ছুঁয়ে,ওই হাতেই চুমু খেয়ে বললেন,
“ লক্কীমন্ত। তুশিডা যে ক্যামনে তোমার বইন হইল!”
তুশি ওয়াশরুমের ভেতর থেকে চ্যাঁচাল,
“ এই দাদি,তুমি যাবে?”
হাসনা ফিসফিস করে বললেন,
“ দেখছোনি কারবার,আমার লগে গলা দ্যাখায়। ওরে আমি ডরাই?”
তারপর বেরিয়ে গেলেন দ্রুত। ইউশা দুপাশে মাথা নেড়ে হাসল। তুশি বেরিয়ে এলো এর মাঝে। কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“ এসি অফ করো, আল্লাহ শীত!”
ইউশা বলল,
“ এত বাড়িয়ে রেখেছ কেন?”
“ আমি করেছি? করেছে তো তোমার ভাই!”
তুশি কাঁপতে কাঁপতে এসে বসল। ইউশা হতাশ গলায় বলল,
“ এত্ত বড়ো হলে,দুদিন পর বাচ্চার মা হবে,এখনো চুল মুছতে পারো না।”
তুশি ঠোঁট উলটে বলল,
“ কীভাবে পারব? ছোটো থেকে দাদি মুছে দিতো। এ বাড়িতে আসার পর তুমি। আর এখন তো উনি থাকলে উনি দেন। উনি না থাকলে দাদি দেয়। আমি নিজে তো মোছার সুযোগই পাই না।”
ইউশা তোয়ালে নিয়ে চুল মুছতে মুছতে বলল,
“ তোমার একটা মেয়ে হলে, সেই মেয়ের যত্ন-আত্তি করতে করতে ঠিক পেকে যাবে।”
তুশি ভারি লজ্জা পেলো। মুখটা লাল হতেই ইউশা বলল,
“ থাক, এত লজ্জা পেতে হবে না। আচ্ছা শোনো, এখানে কিছু ইনভাইটেশন কার্ড আছে। তোমার কোনো বন্ধু থাকলে বিয়েতে ডেকো।”
“ আমার বন্ধু তো তুমি।”
“ ওমা,আর কেউ নেই?”
তুশি দুপাশে মাথা নেড়ে বলল,
“ আসলে আমি ছোটো থেকে খুব ডানপিটে ছিলাম তো। আর ছেলেদের মতো জামাকাপড় পরতাম,তাই মেয়েরা কেউ আমার সাথে মিশতে চাইত না। ওহ হ্যাঁ, তবে আমার দুটো শিষ্য আছে। সারাক্ষণ আমার সাথে থাকতো। ওদের কার্ড-ফার্ড দেয়ার দরকার নেই,বললেই আসবে। কিন্তু ওদের ডাকলে যদি কেউ কিছু বলে?”
“ কে আবার কী বলবে? তোমার কাছের মানুষদের তুমি তোমার বোনের বিয়েতে ডাকবে না? আশ্চর্য! কেউ কিছু বললে ভাইয়াকে বলে দেবে। ভাইয়া একাই একশো!”
তুশি খুশি হয়ে বলল,
“ ঠিক আছে। তাহলে আমি একটু পরেই যাব।”
“ যেও। আর বাকি দশটা কার্ড মেজো ভাইয়ার জন্যে। যদি আরো লাগে,বাবার থেকে নিতে বোলো কেমন!”
তুশি কার্ড মেলল। কত সুন্দর লেখাগুলো! ওপরে আবার রাজকীয় কাজ। সুতো দিয়ে এক জোড়া বর-বউয়ের প্রতিচ্ছবি বানানো। ওর চোখ আটকালো দুটো নামে, সৈয়দ অয়ন আবসারের সাথে নওরীন নাজ ইউশার শুভ বিবাহ সম্পন্ন হবে!
তুষ্টি আর তৃপ্তিতে তুশির চোখ জ্বলে ওঠে। মুখ তুলে ডাকে,
“ ইউশা?”
“ হু?”
“ তুমি খুশি তো?”
ইউশার চেহারা মলিন হয়ে যায়। নিস্পন্দ চোখে বলে,
“ বুঝতে পারছি না। কোনো অনুভূতি কাজ করছে না। অয়ন ভাইকে দেখে আরো বেশি খারাপ লাগছে। মনে হচ্ছে কেউ রিমোর্ট দাবালো,আর অয়ন ভাই একটা কলের পুতুলের মত চলাফেরা করছে।
যার মাঝে আমাকে বউ হিসেবে পাওয়ার আনন্দের চেয়েও,তোমাকে না পাওয়ার বিরহ বেশি।”

“ এগুলো বলো না। ওনার জীবনে আমি শুধুই একটা মরিচীকা! ওনার এক এবং একমাত্র ভবিষ্যৎ তো তুমি। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে দেখো। একদিন অয়ন ভাই সব ভুলে তোমাকেই ভালোবাসবেন। খুব সুখের সংসার হবে তোমাদের।”
ইউশা মুচকি হেসে বলল,
“ আমার কথা আমাকে ফেরত দিচ্ছ? এই কথা তো একদিন আমি তোমায় বলেছিলাম।”
“ তোমার কথা ফলেছিল, এবার আমারটাও ফলুক।“
ইউশা নিশ্চুপ থেকে ভাবল,
“ তাই হোক। অন্তত বেঁচে থাকতে থাকতেই যেন অয়ন ভাইকে পাই। এত ভালোবাসার অভাব নিয়ে আমাকে যেন মরতে নাহয়!”


সার্থ লাঞ্চে বসেছে। শরীফ ছিলেন পাশে। ও খেতে খেতে বা হাত দিয়ে তুশির নম্বরে কল দিলো। ফোন রিসিভ করল সময় নিয়ে৷ অমনি ওপাশ থেকে গাড়ি-ঘোড়ার প্যাপু হর্নে কান ধরে যাওয়ার অবস্থা হলো।
সার্থ কপাল কুঁচকে বলল,
“ তুশি, কোথায় তুমি?”
তুশির কণ্ঠ স্ফীত শোনাল,
চ্যাঁচাল যেন,
“ হ্যালো? হ্যালো…”
“ আরে মেয়ে, তুমি কোথায়?”
লাইনটা খট করে কেটে গেল।
শরিফ শুধালেন,
“ স্যার, কিছু হয়েছে?”
উত্তর দেবার আগে,ম্যাসেজ টোন বাজল। স্ক্রিনে লেখা
“ ami amr vostithe jassi. Ushar viyr kad devo.”
ফোস করে শ্বাস ফেলল সার্থ। বিড়বিড় করে বলল,
“ দুনিয়া এক দিকে আর এই মেয়ের লেখায় বানান ভুল আরেকদিকে।”
ও লিখে পাঠাল,
“ একা যাচ্ছো?”
“ ji…”
সার্থর খাওয়া বন্ধ হতে এটুকুই যথেষ্ট। চট করে মাঝপথে হাত ধুয়ে উঠে পড়ল ও। শরিফ বললেন,
“ স্যার খেলেন না? রান্না ভালো হয়নি?”
“ আমি বের হচ্ছি। তুমি খেয়ে নাও।”

হাত মুখ মুছে, ইউনিফর্ম পালটে গায়ে শার্ট চড়িয়ে বেরয়ে গেল সে। শরিফ ভারি অবাক হলেন। বুঝলেন, মানুষটা যাচ্ছে কোথায়! তারপর হাসলেন একা একা। ভালোবাসা কী জিনিস! নাহলে তার প্রথম সাক্ষাতের সেই এ-এস-পি সার্থ আবরার কী ছিল,আর ভালোবাসা তাকে কী বানিয়ে দিলো আজ!


গলির মুখে পা রাখতেই তুশির বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপা শব্দ উঠল একটা।
একসময় এই সরু রাস্তা, টিনের চাল, ড্রেনের কটু গন্ধ, সব ওর পৃথিবী ছিল। আজ এত বছর পর জায়গাটা ছোটো লাগে, অচেনাও লাগে একটু। তবু কোথাও যেন ভেতরের একটা অংশ ঠিক চিনে নেয় এসব। পায়ের নিচে ভাঙা ইট। মাথার ওপর জট পাকানো বৈদ্যুতিক তার। দূরে কেউ পুরোনো রেডিওতে গান বাজাচ্ছে। তুশি থেমে তাকাল। ওই মোড়টার পাশেই তো একসময় বর্ষার রাতে পানি জমত। হাঁটু সমান পানিতে দাঁড়িয়ে কাগজের নৌকা ভাসাতো ওর দলবলের সাথে। তুশি আলগোছে হাসে। হঠাৎ খেয়াল করল আশপাশ থেকে লোকজন উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। চোখ-নাক ঘুরিয়ে তাকাচ্ছে এদিকে। কানাঘুষা করছে কেউ কেউ। কী বিস্ময় এদের! কত কৌতূহল মনে! তুশির এসবে অস্বস্তি হল না। এগুলো ওর রগে রগে চেনা দৃশ্য। বস্তিতে একটু ভালো জামাকাপড় পরে কেউ ঢুকলেই, সবাই তাকিয়ে থাকত,মন্তব্য ছুড়তো। তুশি নিজেও কত করেছে এমন!
ও সোজা এগিয়ে চলল বাবলুদের বাড়ির দিকে। ৫৪ নম্বর ঘরটা ওদের। মুখোমুখি লাইনে টিনটিনদের বাড়ি। যাবার পথে ওর দাদির ঘর পড়ল। সেখানে এখন অন্য কেউ থাকে। দাদি ছেড়ে দেয়ায় ভাড়া হয়ে গেছে। তুশি এক কদম থেমে আবার হাঁটা শুরু করল। ওর পরনে আকন্দ রঙের জর্জেটের আনারকলি। ওরনা গলায় ঝুলছে, খোলা লম্বা চুল। এত সুন্দর একটা মুখ বস্তিতে বেমানান যেন!

বাবলুদের ঘরের দোর প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থা। জায়গায় জায়গায় টিন ফুটো হয়ে আছে। তুশি দরজায় দাঁড়িয়ে ডাকল,
“ বাবলু!”
তারপর এপাশ ফিরে ডাকল,
“ টিনটিন,আছিস বাড়িতে?”
বাবলুদের ঘরে কেউ সাড়া দেয় না। তবে টিনটিনদের অন্তপুর থেকে এক রোগাশোকা ছিপছিপে নারী বেরিয়ে এলেন। ঘামে ভেজা মুখ, রান্না করছিলেন।
মাথায় আঁচল টেনে বললেন,
“ কেডা?”
“ টিনটিন কোথায়?”
“ হেতে কি গরে থাহোনের লোক! গেছে কই কেয় জানে। তয় আমনে কেডা?”
তুশি হেসে বলল,
“ চিনতে পারোনি, আমি তুশি।”
ভদ্রমহুলার কান চিড়ে যেন গুলি চলে গেল। চোখ কপালে তুলে আর্তনাদ করলেন
“ কীইইইইই? তুশিইই?”
চিৎকার শুনে কিছু ভড়কে গেল তুশি। ভদ্রমহিলা হন্তদন্ত পায়ে বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন ওর সামনে। নিজের দুইগালে হাত দিয়ে বললেন,
“আল্লাহ… কী রূপ হইছে রে! সিনেমার নায়িকা লাগে দেহি। তর চুল্ডি না কোকড়াইন্না আছিল? এমনে সোজা হইল ক্যামবায়? ও মা! উচা জুতা পরছস?”
এর মাঝে আরো অনেকে বেরিয়ে এলো। জটলা বাঁধল মূহুর্তে। তিন্নির মাও খবর পেয়ে কাজ ফেলে ছুটে এলেন।
তুশি চেনা মুখগুলো দেখে শুধাল,
“ কেমন আছো তোমরা?”
তিন্নির মা কিছু পল হাঁ করে চেয়ে রইলেন ওর দিকে। এইত, একটা বছর আগে তুশির মাথার চুলে কাকের বাসা বসতো। ছেঁড়া-ফাঁটা জিন্স,টাইট ফিট টিশার্টের নিচে একটা আলখোল্লা শার্ট পরে ঘুরতো সারা দিকে। সেই মেয়ে!
উনি দুচোখ ঝাপটে ঝাপটে বললেন,
“ তুশিরে,তোরে তো চেনোনই যাইতাছে না।”
আরেকজন বললেন,
“ হ, শউর বাড়িত খুব আল্লাদ করে মনে হয়।”
“ করেই তো। ওর দাদিও যে গেল আর তো আইল না।”
“ তোর কি সত্য পুলিশের লগে বিয়া হইসে রে তুশি? কয় মাস আগে তোর দাদিরে নিতে আইল যে বেডায়,হেইডা না?”
তুশি বলল,
“ হ্যাঁ।”
“ খোদা,তর কপাল তো সোনায় গড়া। তোর জামাই তো এক্কারে সিনিমার হিরো! যেমন উঁচা লোম্বা হেমন দ্যাকতে।”
তুশি সব শুনে হাসে। বস্তির মানুষগুলো ওকে কেমন ঘিরে ধরেছে। কেউ মুগ্ধ হয়ে দেখছে, কত কী বলছে নিজেদের সাথে। গায়ের জামা,জুতো, গয়না সব নেড়েচেড়ে দেখল অনেকে। শাশুড়ী কেমন, শ্বশুর কেমন ওকে দিয়ে রান্না করায় কিনা! কত শত প্রশ্ন তাদের! তুশি শুধু হাসল, হু-হা করল। এরা তো জানে না ওটাই ওর বাবার বাড়ি।
তারপর আস্তেধীরে বিদায় নিলো সবার থেকে। যেতে যেতে শুনতে পেলো ওদের ফিসফিসে কথা,
“ কী মাইয়া কী হইছে! কফাল খুললে এমনেই খোলোন লাগে। আমাগো কফালও নাই,খোলার রাস্তাও নাই।”
“ আগে কইতাম আমরার মাইয়াডি যেন তুশির নাহান নাহয়,অহন তো আফসোস লাগতাছে! বড়োলোক হইলে মাইনষে ক্যামনে বদলায় দেখছস? চোর-ছ্যাচরও দ্যাকতে নায়িকা হইয়া যায়।”
তুশির কথাগুলোয় খারাপ লাগল না। বরং মুক্ত শ্বাস টানল ও।
মনে মনে বলল,
“ আমি বদলেছি, কারণ অন্যদের কাছে যা নেই, আমার তা আছে। আর সেই থাকার নাম, সৈয়দ সার্থ আবরার। ”


টিনটিন অনেকক্ষণ ধরে একটা দোকানের সামনে ঘুরছে। দুপুরে ওদের বাড়িতে কাঁচকলা রাঁধবে। টিনটিন বাসি গাঁজা খাবে,তাও ওই কাঁচকলা খাবে না। বাবলু একটু দূরে দাঁড়িয়ে। আশেপাশে চেয়ে দেখছিল, লোকজন কেমন!
দোকানি অন্যদের দিকে ব্যস্ত ছিলেন। টিনটিনকে দেখে বললেন,
“ কী রে টুনটুন, কী নিতে আইছস?”
ও ঝুলন্ত কলার গাঁদিতে হাত দিয়ে বলল,
“ এইডির দাম কত?”
দোকানি হাঁ করলেন,তুরন্ত কলার গাঁদিতে টান দিয়ে ছিঁড়ে আনল ছেলেটা। ভো দৌড় দিয়ে চোখের সামনে থেকে উধাও হলো নিমিষে। বলদ বনে চেয়ে রইলেন দোকানি। পরপরই চ্যাঁচিয়ে গালি-গালাজ করলেন।

টিনটিন-বাবলু প্রানপটে ছুটছিল। আচমকা পেছন থেকে টিনটিনের প্যান্টের ফিতে টেনে ধরল কেউ একজন। ও এমনিই খালি গায়ে, প্যান্ট খুলে যাওয়ার ভয়ে দাঁড়িয়ে গেল অমনি।
চেয়ে দেখল এক সুন্দরী, সুশ্রী মেয়ে মানুষ কপাল কুঁচকে আছে। টিনটিনের কপালটাও বেঁকে গেল। চোখ পিটপিট করে বলল,
“ এ আপনে ক্যাডা? চিনা চিনা লাগে দেহি।”
তুশি চোখ রাঙিয়ে বলল,
“ চুরি করছিস কেন? যা, দিয়ে আয়।”
টিনটিন গলা ফাটিয়ে চ্যাঁচিয়ে উঠল,
“ ওরেএএএ আল্লাহ, ওস্তাদ?”
সঙ্গে সঙ্গে কলার গাঁদি হাত থেকে ফেলেই তুশির কোমর জড়িয়ে ধরল ছেলেটা। বাবলু ভেবেছিল বিপদ,যখন বুঝল এটা তুশি তিরতির করে ছুটে এলো নিজেও। দুইপাশ থেকে দুইজন জাপটে ধরে বলল,
“ ওস্তাদ, আমগো ওস্তাদ, তুমি আইছো?”
তুশির চোখ ভিজে যাওয়ার উপক্রম। এত্ত ইমোশনাল যে কবে থেকে হল! তাও হেসে বলল,
“ এসেছি। এবার তো ছাড়!”
টিনটিন দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলল,
“ তুমি হেই যে খাওন আনতে গেলা,আর আইলা না। তোমার মতো আমগো কেউ ভালোবাসে না,ওস্তাদ। চুরির বাগ দেয় না।”
বাবলু বলল,
“ ওস্তাদ, তুমি কত বদলাই গেছো! তোমার লুডুসের মতো চুল এমনে সোজা হইল কী দিয়া?”
“ সব বলব,আগে কলা তোল।”
ওরা কলার গাঁদি তুলল। কিছু কলা ছড়িয়ে গেছিল চারপাশে,তুলল তাও। তুশি সব নিয়ে ফিরে এলো দোকানে। দোকানি কলা সহ ক্ষতিপূরণ পেলেও টিনটিনকে কটমট করে বললেন,
“ আইজকা বাঁইচা গেলি। নাইলে বিচার লইয়া যাইতাম!”
টিনটিনের বিচারের ভয় নেই। আব্বা ধরে দু ঘা দেবে,ওসব ওর সয়ে গেছে। আপাতত তার সব আগ্রহ তুশিকে ঘিরে।
বারবার জিজ্ঞেস করল,
“ ওস্তাদ, কিছু কইবা তো! তুমি কি অনেক বড়োলোক হইসো? মেলা ট্যাকা কামাও ওস্তাদ? ও খোদা, তোমার ব্যাগে এত ট্যাকা আইল ক্যামতে?”
তুশি ওদের বিরিয়ানি,কোক কিনে দেয়। আরো কিছু শুকনা খাবার দেয় সাথে।
বাবলুর কাঁধ প্যাঁচিয়ে বলে,
“ চল বসি।”
ইট রাখা সেই উঁচু জায়গাটায় ফিরে এলো ওরা। বাবলুর জিভ থেকে লালা পড়ার অবস্থা। কতদিন পর বিরিয়ানি খাবে! কিন্তু প্যাকেট খুলতে নিয়েও থামল সে। বলল,
“ পরে খামু, আগে তুমি কও আমাগো লগে দেখা করো নাই ক্যা? আমাগো মনে পড়েনাই?”
তুশি মুখ কালো করে বলল,
“ পড়েছে। চেয়েও আসতে পারিনি। এত ঝামেলা গিয়েছে জীবনে! এই সবে একটু শান্তিতে শ্বাস নিচ্ছি।”
বাবলুর খটকা লাগল। টিনটিনের কানে ফিসফিস করে বলল,
“ আমার মনে হইতাছে, এইডা আমাগো ওস্তাদ না। এইডা কেডা জানি একটা!
আমাগো ওস্তাদ তো ইংরেজিতে কতা কইত। এই বেডি ইংরেজি পারে না।”
তুশি হেসে ফেলল। বলল,
“ তোর কথা শোনা যাচ্ছে মোটু!”
বাবলু লজ্জা পেয়ে গেল। জিভ কাটল সরে এসে। টিনটিন খুব সিরিয়াস হয়ে বলল,
“ ওস্তাদ,অহন থেইকা আমাগো লগে থাকবা তো?”
তুশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ না রে! যে পৃথিবীতে গেছি, আর কী ফিরে আসা যায়?”
“ কোন পিথিবি? গাড়িতে যাওন যাইব না?”
তুশি হাসল। বলল,
“ ওসব ছাড়। কাল আমার বোনের বিয়ে। তোদের দাওয়াত দিতে এলাম। আসিস কিন্তু। তোদের ছোটো ছোটো দুটো ভাইবোন আছে না? ওদেরও নিয়ে আসিস।”
“ আমরা যামু? ও আল্লাহ আমরা তো চিনিই না।”
“ আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব।”
বাবলু চোখ গোল করে বলল,
“ ওস্তাদ, তোমার গাড়িও আছে? আমাগো চড়াইবা?”
“ আজ তো আনিনি। পরে একদিন। আমি এখন যাই,তোরা আসিস।”
টিনটিন হাত চেপে ধরল। মন খারাপ করে বলল,
“ আরেটু থাহো না ওস্তাদ!”
তুশির ভেতরটা হুহু করে উঠল। বলল,
“ বাড়িতে বিয়ে রে! দাদিও আসতে পারল না সেজন্যে। একা বেরিয়েছি, সবাই চিন্তা করবে। তবে আমি এরপর থেকে মাঝে মাঝে আসব। দেখা করে যাব। আর কাল তো দেখা হচ্ছেই তাই না? মন খারাপ করিস না। যাই?”

দুজন এক সঙ্গে ঘাড় ঝাঁকাল। তুশি ওদের গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে উঠে এলো ফিরতে। যেতে যেতে একবার চাইল আবার। দেখল,খাবার লোভী বাবলুটাও মুখে অন্ধকার নিয়ে তাকিয়ে আছে। টিনটিনের তো হাসি আগে থেকেই গায়েব। তুশির ভীষণ খারাপ লাগল। বুঝতে পারল, ওর দুনিয়া আসলেই পালটে গেছে এখন। এই বস্তি ওকে মানুষ করেছে, এটা ওর বেড়ে ওঠার গল্প, অথচ আজ ও এখানকার স্রেফ একজন অতিথি মাত্র!
তুশি ছলছল চোখ ফিরিয়ে সামনে ঘুরতেই,একটা বুকের সাথে ধাক্কা লাগল কপালে। এক পা পিছিয়ে এলো মেয়েটা। হকচকিয়ে মুখ তুলতেই ছড়িয়ে গেল ভ্রু। সার্থ উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ কাঁদছো কেন, তুমি?”
তুশি চটজলদি চোখের জল মুছল।
হেসে বলল,
“ আসলে অনেক দিন পর এলাম তো! ফিরতে খারাপ লাগছিল!”
“ বেশি খারাপ লাগছে? চাও তো এখানে একটা ঘর ভাড়া নিই?”
তুশি খুশি হয়ে বলল,
“ সত্যি নেবেন? আমাদের জন্যে?”
“ আমি না,শুধু তুমি থাকবে।”
তুশির হাসি শেষ। মুখ কালো দেখে,
সার্থ ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ পছন্দ হলো না?”
“ না। আপনি যেখানে নেই, সেখানে আমি থাকব কী করে?”
সার্থ ঠোঁট কামড়ে হাসে।
জিজ্ঞেস করে,
“ কীভাবে এসেছেন?
“ মেট্রোতে।”
“ যাবেন কীভাবে?”
তুশি সব দাঁত বের করে বলল,
“ আপনার সাথে।”
“ আমি যদি না নিই?”
তুশি মূহুর্তে সার্থর শার্ট খামচে ধরে বলল,
“ আমি এইভাবে ধরে থাকব। না নিয়ে পারবেনই না।”
সার্থ এপাশ ফিরে হাসল।
ঘুরে তুশির মাথায় হেলমেট পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
“ এভাবে একা বের হবে না। চিন্তা হয়! সাথে মিন্তুকে আনতে পারতে।”
“ চিন্তা কীসের? আমি তো রাস্তাঘাট চিনি। আগে যখন চুরি…”
“ এখন তুমি চোর নেই তুশি। এখন তুমি আমার বউ!”
কড়া কণ্ঠে মেয়েটা মিইয়ে এলো। মাথা নুইয়ে বলল,
“ আচ্ছা।”
“ দুপুরে খেয়েছ?”
“ না।”
“ কিছু খেতে ইচ্ছে করছে?”
“ তেমন কিছু না। আপনার কাজ নেই আজ?”
“ খুব একটা না।”
“ তাহলে, চলুন না ঘুরি!”
“ আচ্ছা,ওঠো।”
তুশি দ্বিতীয় বায়না ছুড়ল,
“ আজকে আমি চালাই?”
“ কীহ!”
“ আমি পারি তো। একবার ভ্যান চালিয়ে যে হাসপাতালে গেলাম,মনে নেই?”
“ সেটা ভ্যান,এটা বাইক। ডিফরেন্স জানো?”
“ আমি বললাম তো পারব। একবার দেখুনই না। পারব আমি। দিন না!”
এত অনুনয় ফেলা যায়? সার্থ নেমে এসে বলল,
“ আচ্ছা।”
তুশি উচ্ছ্বসিত হয়ে চালকের সীটে বসল। সার্থ বসল পেছনে। ওকে ড্যাশোবোর্ডে চাবি ঘোরাতে দেখে বলল,
“ বাইক চালানো কীভাবে শিখেছ?”
“ বললে রাগ করবেন না তো?”
“ না।”
“ আমাদের বস্তিতে, কুদ্দুস নামে একটা ছেলে আমাকে খুব লাইন মারতো। আমি তো প্রথমে পাত্তাই দিতাম না। তারপর রামছাগলটা ওর সাত আঙুল কপালের জোরে লটারিতে মোটরসাইকেল পেলো। সেসময় বলতো, আমি প্রেমে রাজি হলে আমাকে নিয়ে বাইকে করে প্রতিদিন ঘুরতে যাবে। আমি বললাম, আমাকে মোটরবাইক চালাতে দিলে ওর প্রেম মেনে নেব। তারপর ছাগলটা চালাতে দিলো, আর আমি শিখে ফেললাম।”
সার্থ গলায় নিঃশ্বাস ঝুলে আছে।
ভীষণ গুরুতর হয়ে বলল,
“ প্রেম করেছিলে?”
তুশি নাক সিটকে বলল,
“ ইস, না! কাজ শেষে টাটা বাইবাই করে দিয়েছি। আর আমাকে যা ভয় পেতো,কিছু বলতেই পারেনি।”
মেয়েটা হাসলেও, চেহারা গুটিয়ে গেল সার্থর।
“ ফাজিল তো কম ছিলে না!”
তুশি তক্ষুনি বাইকে টান দিল। ও ভড়কে বলল,
“ আস্তে!”
“ সরি সরি! আসলে অনেক দিন পর তো! আপনি আমাকে শক্ত করে ধরুন।”
সার্থ বিড়বিড় করে বলল,
“ এমনিতে ভার নিতে পারে না,আবার নাকি শক্ত করে ধরব।”
“ উফ! পেছনের হাতলটা ধরুন তাহলে। পড়ে গেলে আমি কিন্তু কিছু জানি না।”
সার্থ ওসব কিছুই ধরল না। বরং একটু ঝুঁকে এসে নিজের দুইহাত বাইকের থ্রটলেই রাখল। তুশি মূহুর্তে বন্দি হলো ওর বুকের ভেতর। সার্থ পিঠ থেকে চুল সরিয়ে যেই ঘাড়ে চুমু দিলো,
মেয়েটা ফ্রিজ হয়ে বলল,
“ একসিডেন হয়ে যাবে তো!”
সার্থ শ্বাস টেনে বলল,
“ চুলে কী মেখেছ?”
“ কিছু না তো। আল্লাহ, আপনি এরকমম করবেন না, আমার হাত কাঁপছে।”
সার্থ গালের ভেতর জিভ ঠেলে হাসল। গলায় নাক ঘষতেই, ঝট করে বাইকে ব্রেক কষল তুশি। পেছন ফিরে বলল,
“ আমি চালাব না। আপনি অনেক জ্বালাচ্ছেন! পরে কিছু ঊনিশ-বিশ হলে আমার কথা শুনতে হবে।”
সার্থ কিছু না বলে,নেমে দাঁড়াল। নিজেই বসল ড্রাইভিং সীটে। ঠোঁটে দুষ্টুমির চাপা হাসিটায়, তুশি বেশ বুঝল ইচ্ছে করে ওকে জ্বালানো হচ্ছিল। এইবার বদলা নিতে চলন্ত বাইকে দুহাত বাড়িয়ে সার্থর কোমর প্যাঁচিয়ে ধরল ও। কানে ফুঁ দিতেই সার্থ বলল,
“ রিভেঞ্জ নিচ্ছ?”
“ হ্যাঁ।”
“ কিন্তু আমার তো হাত কাঁপবে না। বরং বেশি কিছু হলে সোজা বাড়ি গিয়ে রুমের দরজা আটকাতে পারি।”
তুশি নাক ফুলিয়ে বসে থাকে। সার্থ ভাবল,ওর হুমকি কাজে দিয়েছে। মেয়েটা তক্ষুনি ফিসফিসিয়ে মধুর সুরে ডাকল,
“ শুনুন না!
“ হু!”
“ আই লাভ ইউ!”
এতক্ষণে হাত কাঁপল বোধ হয়। সার্থ চমকে ফিরল পেছনে।
নিশ্চিত হতে বলল,
“ কী?”
তুশি সামনে চেয়ে আর্তনাদ করে উঠল,
“ আরেএএএএ গেলোওঅঅঅঅ…”
বাইকের চাকা এঁকেবেঁকে মাথাটা সামনের দেওয়ালে ঠুকে গেল অমনি । সঙ্গে সঙ্গে ওদের নিয়ে কাত হয়ে লুটিয়ে পড়ল সেটা। তুশি ছিটকে গেল এক হাত দূরে। ব্যথায় পিঠ, ঘাড় শেষ। হাত-হাঁটু ছুলেছে! তাও হুড়মুড় করে উঠল মেয়েটা। সার্থর কপাল কেটে গেছে। উঠে বসতেই, রক্ত দেখে আঁতকে উঠল তুশি।
ছুটে এলো কাছে। উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল,
“ আপনি,আপনি ঠিক আছেন? কতখানি কেটেছে দেখি!”
রক্ত পরা থামাতে ক্ষততে ওরনা চেপে ধরল তুশি। ফুঁ দিলো বারবার। অথচ সার্থর মুখে ব্যথা পাওয়ার চিহ্ন নেই। তার রক্ত মাখা কপালে এখনো দু তিনটে ভাঁজ। খুব অনিশ্চিত চোখে শুধাল,
“ তুমি কি আমাকে আই লাভ ইউ বলেছ?”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply