Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ১৪


আমার_আলাদিন

জাবিন_ফোরকান

পর্বসংখ্যা১৪

“অরণ্য। আমার ভীষন পেট ব্যাথা করছে। আমি একটু তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাচ্ছি।”

“তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে যাবে মানে কি? আমি আজ এক সপ্তাহ পর বাসায় ফিরলাম, আর তুমি ঘুমিয়ে যাবে? নো নো। আই নিড মাই ওয়াইফ টুনাইট।”

“অরণ্য বোঝার চেষ্টা করুন। আজ না। আমার ফুড পয়জনিং হয়েছে। মাত্রই ওষুধ খেয়েছি। কালকে, হ্যাঁ?”

ইরাম ঘুরে বেডরুমের দিকে হাঁটা দিল। অরণ্য কিছুই বললনা। খানিকটা অবাকই হলো সে। যাক তবে, তার শরীর খারাপের প্রতি একটু হলেও সহমর্মিতা পুরুষটির আছে। তবে বেডরুমের ভেতর পা দিতে না দিতেই কোমরে হাত জড়িয়ে রীতিমত শূন্যে তুলে ফেলল কেউ। ভয়ে হালকা চিৎকার করে সে মাথা ঘুরিয়ে দেখল অরণ্যকে। হেঁটে গিয়ে অরণ্য তার শরীরটা ছুঁড়ে ফেলে দিল বিছানার উপর। দ্রুত হাতে নিজের পরনের টি শার্ট টেনে মাথার উপর দিয়ে খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল। ইরাম উঠে বসার সুযোগ অবধি পেলনা। অরণ্য হামাগুড়ি দিয়ে তার উপরে উঠে এসেই তার পোশাকের চেইন টেনে খুলতে খুলতে অধৈর্য্য গলায় বলল,

“একদম বাহানা দিবি না। তুই জানিস না তোকে আমার কত প্রয়োজন? এক সপ্তাহের ক্ষুধার্ত পশুকে বলিস আরও একটা দিন অপেক্ষা করতে? নিজের শরীরকে সামলে সুস্থ রাখতে পারিসনি তোর দোষ। অপেক্ষা একটা মিনিটও হবেনা, একটা সেকেন্ডও হবেনা!”

“অরণ্য!”

অরণ্যর বুকে হাত দিয়ে ঠেকাতে চাইলেও লাভ হলোনা। ইরামের দুই হাত শক্তভাবে ধরে বিছানার সঙ্গে জাপটে ধরে অরণ্য মুহূর্তেই নিজের ঠোঁট বসিয়ে দিল তার ঘাড়ে। ছটফট করল ইরাম, অসহায় হয়ে আর্জি জানাল,

“না! না প্লীজ!”

“শাট দ্যা ফাক আপ অ্যান্ড টেইক ইট!”

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─ অতীতের ঘটনাটি মনে করতে চায়নি ইরাম। কখনোই নয়। অথচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে তার মস্তিষ্কের রাজত্ব দখল নিল অতীতের স্মৃতিরা। ভয়েরা। কষ্টরা। কেঁপে কেঁপে উঠল ইরাম। সাইবান তার বদ্ধ দুই চোখের পাতায় চুমু ছুঁয়ে ঠোঁটের কাছে এসে থেমেছে। ছেলেটার তপ্ত নিঃশ্বাস ছুঁয়ে যাচ্ছে ইরামকে। দাঁতে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরল সে, উচিত হবেনা। নিজেকে নিয়ন্ত্রণের বহু চেষ্টা করলেও শেষমেষ সম্ভবপর হলোনা। সাইবান যে মুহূর্তে তার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে গেল ঠিক অমন সময়েই তার ঠোঁট গলে অস্ফুট আওয়াজটি বেরিয়ে এলো,

“না….”

জমে গেল সাইবান। চোখ পিটপিট করল। অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্য থেকে বেরিয়েছে যেন মাত্রই। সামান্য একটু দূরে সরে ইরামের মুখটা দেখল। তার হাতের আজলায় রীতিমত কাঁপছে রমণী। সাইবান জানেনা তার বুকের ভেতর কেন ভাঙচুর হলো। মৃদু গলায় শুধাল,

“নো?”

ঝট করে চোখ মেলে তাকাল ইরাম। তার চোখের মাঝে বিন্দু বিন্দু অশ্রুফোঁটা জমতে দেখা গেল। সাইবান অপলক চেয়ে রইল। ইরামের তরফ থেকে আর উত্তর এলোনা, বাঁধাও এলোনা। দীর্ঘ একটি প্রশ্বাস টেনে বুকে অক্সিজেন ভর্তি করে নিল সাইবান, নিজের উত্তপ্ত শরীরকে ঠান্ডা করার প্রচেষ্টা যেন। তার বৃদ্ধাঙ্গুল অতি যত্ন নিয়ে ইরামের চোখের কোণ মুছে ফেলল। তারপরই ঝুঁকে এলো সে। স্ত্রীর কপালে সর্বশেষ একটি আলতো চুমু এঁকে ফিসফিস করে বলল,

“ওকে।”

তৎক্ষণাৎ দূরে সরে দাঁড়াল সাইবান। ইরাম বুঝি এতক্ষণে নিজের বুকের ভেতর আটকে রাখা নিঃশ্বাসটা ফেলতে পারল। অবাক নয়নে দেখে গেল সে সাইবানকে। তার স্বামী উল্টো ঘুরে বাড়ির ভেতরে চলে গেল। অথচ ইরাম তখনো ঠাঁয় দাঁড়িয়ে চেয়ে রইল তার পথপানে।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

জিমনেশিয়ামে এই সময়টায় মানুষ কম থাকে। সাইবান ট্রেনারের দেয়া টাস্কগুলো শেষ করে এখন ট্রেডমিলের সামনে এসেছে। গত দশ মিনিট যাবৎ একটানা দৌঁড়ে যাচ্ছে সে। কানে হেডফোন গোঁজা। তাতে বাজছে তার নিজেরই রিমিক্স করা নতুন একটা ট্র্যাক যেটা দুইদিন বাদে আসন্ন শো তে ব্যবহার করবে। ঘেমে গিয়েছে সে সম্পূর্ণ। যেন গোসল করেছে। তাই টি শার্টটা খুলে আবারও দৌঁড়াতে লাগল উদাম শরীরে। এটা শুধুমাত্র মেন্স জিম। তাই বিশেষ কোনো ঝামেলার বালাই নেই। আলোর সংস্পর্শে আসতেই তার ত্বকজুড়ে সাজা ঘামের ফোঁটাগুলো চিকচিক করে উঠল। প্রশস্ত বুক এবং তাতে শক্তিশালী মাংসপেশী দৌঁড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বিকশিত আবার সংকুচিত হতে লাগল। আয়নার প্রতিফলনে নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে হাসল সাইবান। এমনি এমনি পরিশ্রম করা হচ্ছেনা তবে।

পাশে রাখা ফোনে একটা কল আসতেই দৌঁড় থামিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফোনটা কানে তুলে নিল সাইবান। অনুরাগ কল করেছে।

“হ্যাঁ বল।”

ভারী নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে বলল সাইবান। অনুরাগ ভণিতা করলনা।

“আবির, মিজানরা এসেছে। দেখা করতে বলছিল।”

এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল সাইবান। তার চেহারায় একটা আঁধার ভর করল। পরক্ষণেই আবার সেই দূর করে হাঁটা জারি রেখে সে বলল,

“আচ্ছা। কোথায়?”

“স্কুলের পিছনের বটগাছটার নিচে। এক ঘণ্টা বাদে।”

“ঠিক আছে। আমি আসছি।”

“ইউ শিওর?”

“হুম। দেখা হচ্ছে। রাখছি।”

ফোনটা কেটে দিল সাইবান। ট্রেডমিল বন্ধ করে প্রায় মিনিটখানেক রেলিং ধরে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর তোয়ালে তুলে জিমের বাথরুমে চলে গেল। সেখান থেকেই ফ্রেশ হয়ে নতুন একসেট পোশাক পরে তারপর বাইরে চলে এলো।

স্কুলের দিকটায় যাওয়া হয়না তার বহুদিন। বোধ হয় গত বছর শেষ গিয়েছিল। তাও কিছু মিনিটের জন্য। হেঁটে বেরিয়ে গেছে। এই দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়ষ্ক ছেলেমেয়ের মনেই নিজেদের ছোটবেলার স্কুল একটা আলাদা জায়গা দখল করে রাখে। সাইবানও সেই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। তবে স্কুলের স্মৃতিগুলো মিশ্র। এখানেই কলেজ শেষ করেছে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি। আবির, মিজান দুজনই তার একেবারে ছোটবেলার বন্ধু। সেই ক্লাস থ্রি থেকে বন্ধুত্ব। তারা, সাইবান এবং অনুরাগ ছিল পুরো স্কুল থেকে কলেজ অবধি দাপিয়ে বেড়ানো সবথেকে জনপ্রিয় বন্ধুদের গ্রুপ। যেমন তুখোড় মেধা, তেমনি অংশগ্রহণ নাচ, গাছ, বিতর্ক সহ সব ধরণের ক্ষেত্রে। যে স্যাররা ক্লাসে বসে হাসাহাসি করার কারণে কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখত, তারাই আবার আড়ালে প্রশংসা করে বেড়াত। অমুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাবে, তমুক বুয়েটে চান্স পাবে ইত্যাদি ইত্যাদি। সাইবানের ক্ষেত্রেও এমন ধারণা প্রচলিত ছিল। তার মা ডাক্তার। চোখ বুঁজে সাইবান ঢাকা মেডিকেলে চান্স পাবে এটা সবাই বলতে পারত। আর কেউ না হোক, সাইবান টিকবেই টিকবে।

অথচ সাইবান টিকলনা। ডাক্তার হতে পারলনা।

মাথা ঝাঁকাল সাইবান। আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কখন যেন স্কুলের কাছে পৌঁছে গেছে। বটগাছটা নজরে আসছে। দেয়াল ঘুরে যেতেই শান বাঁধানো গাছের নিচে নিজের ছোটবেলার অবিচ্ছেদ্য প্রাণগুলোকে দেখতে পেয়ে কেমন যেন লাগল বুকের মাঝে। এগিয়ে গেল সাইবান। অনুরাগ চলে এসেছে। নিজের বাইকে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে হাসিমুখে। আবির হাঁটুর উপর হাঁটু তুলে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বাদামভাঁজা খাচ্ছে। মিজানও তার পাশেই বসে আছে। দুটো ছেলের বেশভূষায় অসাধারণ পরিবর্তন এসেছে। সেই ছন্নছাড়া কিশোর নেই কেউই। আবির ফরমাল শার্ট প্যান্ট পরে আছে, বেল্ট দিয়ে সুন্দরভাবে ইন করা। পিছনে রাখা ব্যাগ থেকে সাদা অ্যাপ্রোনের একটা অংশ বেরিয়ে এসে যেন কটূক্তি করছে সাইবানকে। যে স্বপ্নটা সে ছুঁয়ে দেখতে পারেনি সেই স্বপ্নের জীবনটাই যাপন করছে আবির। সারা দেশে মেডিকেলে তৃতীয় হয়েছিল। এখন ঢাকা মেডিকেল তার ঠিকানা। অপরদিকে মিজান একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বুয়েট থেকে বেরিয়েছে। বি সি এস দিচ্ছে, সরকারি চাকরি নিশ্চিত প্রায়। জীবনে সকলেই সেটেল। এমনকি অনুরাগও।

সাইবান এগিয়ে আসতেই আবির ঘুরে তাকাল।

“হেই ব্রো! লং টাইম নো নিউজ!”

মৃদু হেসে দুই বন্ধুকেই আলিঙ্গন করল সাইবান। তারপর বটগাছের নিচে পা ঝুলিয়ে বসে পড়ল। উত্তেজিত কন্ঠে মিজান বলে উঠল,

“তুই নাকি বিয়ে করেছিস?”

“ওহ। নিউজ ট্রাভেলস ফাস্ট!”

খিলখিল করে হাসল সাইবান। আবির হাস্যরসাত্মক কন্ঠে বলল,

“খবর শুনে আই অ্যাম তো অবাক! আমাকে কে বলেছে জানিস? সূচনা। সূচনা নাকি আবার জেনেছে রাশমিকার কাছ থেকে। পুরো ব্যাচের সবাই জেনে গিয়েছে।”

“বাবারে বাবা। এত বড় বড় পোস্টের মানুষজন আমার খবর রাখে? বেশ তো। একেবারে সেলিব্রিটি ফিল পাচ্ছি।”

“মজা করিস না। আমি বিশ্বাসই করতে চাইনি। বিয়ে যেই করুক, সবার আগে সেটা তুই হবি কেউ ধারণাই করতে পারেনি।”

অনুরাগ পাশের একটা দোকান থেকে সকলের জন্য কোন আইসক্রিম কিনে এনেছে। সেগুলো হাতে হাতে দিয়ে হেলান দিল আবার বাইকে। মন্তব্য করল,

“মনে হচ্ছে সাইবান বিয়ে করে ভালো করেছে। অন্তত এই উছিলায় তোদের মুখদর্শন তো পাওয়া গেল।”

হাসল সকলে। আইসক্রিমে মনোযোগ দিল। মিজান মুখ ঘুরিয়ে একবার আপাদমস্তক দেখল সাইবানকে। একটা কংকাল আঁকা টি শার্ট, নিচে রিপড জিন্স। হালফ্যাশনের সিলভার ব্রেসলেট কব্জিতে, ভ্রু তে চিকচিক করছে পিয়ার্সিং। ক্লাসের ব্যাকবেঞ্চারদের মতন লাগছে পুরো। অথচ সাইবান ছিল ক্লাসের ফার্স্ট বয়, ফার্স্ট বেঞ্চার। সবার মাঝে ভীষণ বেমানান লাগছে তাকে। মিজান মন্তব্য না করে আর থাকতে পারলনা,

“এখনো ডিজে মিজে গিরি করে বেড়াস নাকি? অবস্থা দেখেছিস নিজের? বিয়েও করে নিয়েছিস। সিরিয়াস হবি আর কবে?”

সাইবান উত্তর করলনা। নীরবে হেসে আইসক্রিম মুখে ঢুকিয়ে রাখল। আবির পাশ থেকে তার উরুর উপর হাত রেখে চাপড় দিয়ে বলল,

“বলি একটা চাকরি বাকরির চেষ্টা কর? প্রাইভেট থেকে পড়েছিস তো কি হয়েছে? আংকেল আন্টির টাকার অভাব? মাস্টার্স টা কর। বিদেশ যা। চাকরির অভাব হবেনা। লাইফ সেটেল।”

“কাকে আর কি জ্ঞান দিচ্ছিস? ওর উড়নচণ্ডী লাইফ ভালো লাগছে। ভালো থাকতে দে না।”

মিজান বলতেই অনুরাগ আর চুপ করে থাকতে পারলনা,

“তোরা এবার থামতে পারিস? এতদিন বাদে দেখা হয়েছে কোথায় একে অপরের খবর জানব তা না। একজনকে নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিয়েছিস। যাকগে, সাইবানের তো হয়ে গেল। তোর সানাইও শীঘ্রই বাজবে শুনছি আবির।”

মুচকি হাসল সে।

“হ্যাঁ রে। আকদ হয়েছে পারিবারিকভাবে। আমার মেডিকেল কলেজেরই। ব্যাচমেট।”

“ওয়াও! আকদ হয়ে গিয়েছে আর ডাকলি না?”

আবির কাঁধ তুলল।

“কাউকেই ডাকিনি। মিজান গিয়েছিল শুধু। অনুষ্ঠান করব পরে, তখন সবাইকে দাওয়াত করব ভেবে রেখেছি। তুই আর সাইবান গিয়েও বা কি করতি? ডি জে পার্টি তো হচ্ছিল না। আমার ফ্যামিলি ভাই রেস্ট্রিকটিভ আর ধার্মিক, সরি।”

অনুরাগের মুখটা চুপসে গেল। সে আড়চোখে দেখল সাইবানকে। আইসক্রিম শেষ করে শান্ত হয়ে বসে আছে। অভিব্যক্তি বোঝা যাচ্ছেনা।

“তোর কথা বল। তোর বউ শুনলাম সিনিয়র। অনেক বেশি! কেন ভাই? মেয়ের অভাব পড়েছিল নাকি? তিতলি না ফিতলি বলে একটা মেয়ে না ছিল কলেজ গ্যাংয়ে? ওটার কি হয়েছে? ওটাকে ধরতে পারিসনি?”

মিজানের কথায় স্পষ্ট টিটকারী প্রকাশ পেল। আবির হেসে সায় জানাল,

“ঠিকই। তোকে অন্তত এমন পজিশনে মানায় না। নিজের মত কাউকে পেলি না? নাকি কেউ মেয়ে দেয়নি? শেষমেষ বিয়ে করলি তো করলি একটা গোল্ড ডিগারকে?”

এতক্ষণ যাবৎ শান্ত থাকলেও এবার আর থাকলনা সাইবান। তীর্যক হেসে ঘুরে তাকাল আবিরের দিকে।

“গোল্ডের ভরি কত জানিস? তাও তো আমার বউ আমাকে ডিগ করেছে। তোর কাছে তো ডিগ করার মতও কিছু নেই!”

অপমানে আবিরের মুখটা টকটকে লাল হয়ে উঠল মুহূর্তেই। সাইবান বেপরোয়া, তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। লাফিয়ে সে উঠে দাঁড়াল, নিজের প্যান্ট ঝাড়তে লাগল। আবির সইতে না পেরে বলে বসল,

“আমার বউকে আমি কত ভরি স্বর্ণ দিয়েছি না দিয়েছি সেই হিসাব এখন আমার তোকে দিতে হবে? তুই তো জন্মগত বড়লোক, তুই আমাদের মতন মিডল ক্লাস ফ্যামিলিকে কি বুঝবি? আমরাই আমাদের ফ্যামিলির প্রথম এস্ট্যাব্লিশড চাইল্ড, বুঝেছিস? আমাদের বাপ মা আমাদের গড়ে দেয়নি, মাইন্ড ইট!”

“তোর আব্বাও আমাকে ডিজেগিরি শিখিয়ে যায়নি শালা! ডাক্তার ডাক্তারের মতন থাকবি, হ্যাডম নিয়ে চলবি। অন্যের লাইফ নিয়ে আলোচনা করবি কেন?”

সটান হাত বাড়িয়ে আবিরের কলার টেনে ধরল সাইবান। সকলে আঁতকে উঠল। তীক্ষ্ণ চোখে এককালের বন্ধুকে দেখে মৃদু গর্জন তুলে সে বলল,

“যতক্ষণ আমার মধ্যে ছিলি, আমি চুপ ছিলাম। আমার বউ ধরে টান দিলে শালা আমি তোর চোদ্দ গুষ্টি ধরে টান দেব! তোদের মত ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হয়ত হতে পারিনি তাই আমি বেশরম ডি জে। কিন্তু মনে রাখিস ডাক্তার সাহেব, তোর কলিজা যদি হাতি হয় তবে এই ডি জের কলিজা নীল তিমি! আমার নীল তিমিতে হাত দিতে চাইলে তোকে তোর অপারেশন টেবিলের উপরেই ফেলে সাইজ করব, একটুও হাত কাঁপবে না আমার!”

ঝটকা দিয়ে আবিরকে দূরে সরিয়ে দিল সাইবান। বেচারা হঠাৎ এমন আক্রোশে ভড়কে গিয়েছে। ঝট করে মিজানের দিকে ফিরল সে এবার,

“আর তুই, মিস্টার সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ওরফে সরকারি চাকরিধারী। তোর গার্লফ্রেন্ড কি যেন, ওহ, সূচনা রাইট? অক্সফোর্ডে আছে শুনলাম। বলছিলাম গত বছর দেশে এসে আমার ডি জে পার্টিতে গিয়েছিল বলেছে তোকে? বলেনি? খুব সুন্দর একটা সাত হাত সমান লেটারও দিয়েছে, চকলেট, টেডি, বিদেশ থেকে ইমপোর্টেড পারফিউম গিফট। তোকে দিয়েছে? বাসায় গিয়ে চেক করে দেখিস।”

“সাইবান!”

কিন্তু সাইবান আর দাঁড়ালনা। হনহন করে হেঁটে গিয়ে এক লাফে চড়ে বসল অনুরাগের বাইকের পিছনে। অনুরাগও ইশারা বুঝতে সময় নিলনা। বাইকে উঠে হেলমেট মাথায় দিয়ে ইঞ্জিন চালু করল। আবির শান্ত ভঙ্গিতেই উঠে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকাল। গম্ভীর গলায় বলল,

“তোরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস যে তোদের সাথে আমাদের বন্ধুত্ব শেষ?”

অনুরাগ শুধু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে মুখ ফুরিয়ে নিল। এদের সাথে কথা বলতেও রুচিতে বাঁধছে তার। অপরদিকে সাইবান মাথা কাত করে অতি শীতল ভঙ্গিতে তাকাল। সেই ৯-১০ বছরের দীর্ঘ বন্ধুত্ব ভাসল তার চোখের পাতায়। ছোট ছিল, ভালো ছিল। অথচ বড় বেলায় সব বদলে গেল।

“কেয়ারফুল হোয়াট ইউ সে ব্রো! আরেকবার আমার ঘরের রাণীকে তুলে কথা বলে দেখ, তোর জান শেষ করে দেব সেখানে বন্ধুত্ব তো কোন ঝাড়!”

বাইক এগোল অনুরাগ। কেউ আর পিছনে তাকালনা অবধি। সোজা বাইক ছুটিয়ে চলে গেল রাস্তা ধরে।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

সামিয়া তাড়াহুড়ো করে তৈরি হচ্ছেন। হাসপাতাল থেকে কল এসেছে। যদিও মাত্র আধ ঘণ্টা আগে ফিরেছিলেন, এক্ষুণি আবার যেতে হবে। মানুষের জীবনের দায়িত্ব বলে কথা! এই দায়িত্বের অনেক ভার। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অ্যাপ্রোন গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছিলেন ঠিক এমন সময় পিছন থেকে তাকে আলিঙ্গনে বেঁধে কাঁধে মাথা রাখল কেউ। জমে গেলেন তিনি। আয়নার প্রতিবিম্বে দেখলেন সাইবানকে। তার ঘাড়ে মুখ গুঁজে রেখেছে।

“কি হয়েছে?”

জবাব এলোনা। সাইবান তাকে আরও শক্তভাবে জড়িয়ে ধরল শুধু। সামিয়া নাকমুখ কুঁচকে ফেললেন একটা গন্ধ টের পেতেই।

“তুই আবার স্মোক করেছিস? কত্তবার নিষেধ করেছি? তুই না কিছু মাস আগেও ছেড়ে দেয়ার ট্রাই করছিলি? আবার ধরেছিস কবে?”

“উফ! জাস্ট লেট মি হাগ ইউ ইয়ার!”

“ছাড়। হাসপাতালে যেতে হবে, ফোন এসেছে। রোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক।”

সাইবান তৎক্ষণাৎ মাকে ছেড়ে দিল। দূরে সরে গেল।

“ফাইন। গো টু ইওর হসপিটাল।”

এটুকু বলেই থপথপ পা ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সে। সামিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তিনি নিশ্চিত সাইবানের কিছু একটা হয়েছে। তবে এখন ঠিক দেয়ার মতন সময় নেই তার কাছে। রোগীর জীবন আগে। তাই তিনি ছুটলেন গাড়ির দিকে।

মায়ের রুম থেকে বেরিয়েই সাইবান সোজা বেডরুমে চলে এলো। ভেতরে ঢুকতেই দৃশ্যটা চোখে পড়ল। বিছানায় বসে আছে ইরাম। তার কোলের উপর ঘুমন্ত ইযান। ছেলেকে কোলে দোলাতে দোলাতে এক হাতে ঝুঁকে ল্যাপটপে কি যেন দেখছে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। সাইবান দৃশ্যটার দিকে বেশ অনেকটা সময় একদৃষ্টে চেয়ে রইল। তারপর এগিয়ে গিয়ে বিছানায় উঠে পড়ল। ইরাম তাকে দেখে কিছুটা অবাক হলো,

“জলদি ফিরে এলে যে? বলে গিয়েছিলে রাত হবে আসতে।”

উত্তর করলনা সাইবান। বরং অদ্ভুত একটা কাজ করল। ইরামের কোল থেকে ইযানের ঘুমন্ত শরীরটা তুলে আস্তে করে বিছানায় থাকা বালিশের উপর রেখে দিল। তারপর দ্বিতীয় চিন্তা ছাড়াই চিৎ হয়ে স্ত্রীর খালি করা কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল সে। হতভম্ব হয়ে গেল ইরাম। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল।

“এই! আলাদিন? কি হয়েছে?”

“আমি পোটলার উপর জেলাস।”

বলে ইরামের উদরে মুখ গুঁজে পরে থাকল সাইবান। রমণী কয়েক লহমা বুঝতে পারলনা কি হচ্ছে। একবার বালিশের উপর ঘুমন্ত ইযান আর এখন কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকা স্বামীকে দেখল সে। একটি নিঃশ্বাস ফেলল সে শেষমেষ। হাত বাড়িয়ে সাইবানের মাথায় রাখল। তাকে দূরে সরিয়ে দিলনা। ইরামের আঙুলগুলো সাইবানের মোলায়েম চুলের ভেতর বিলি কেটে চলল, হেড ম্যাসাজের মতন। ইরাম অনুভব করল দুই বাহু জড়িয়ে ইরামকে একপ্রকার আঁকড়ে ধরে রেখেছে সাইবান।

“সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি।”

ঝুঁকে নরম গলায় বলল ইরাম, তার হাত সাইবানের মাথায়, বাহুতে আরামের স্পর্শ বুলিয়ে গেল। প্রাণভরে প্রশ্বাস নিল সাইবান, আরামবোধক গুঙিয়ে বলল,

“নো ওয়ান ক্যান সুদ মি লাইক ইউ ডু, মাই প্রেশিয়াস।”

                                  —চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply