Golpo romantic golpo আদিল মির্জাস বিলাভড

আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৪০



জমিদার বাড়ির বসার ঘরের পিনপতন নীরবতা ভাঙে শবনম বেগমের মোলায়েম ডাকে –

‘ভা…ভাইজান!’

বোনের দিকে ফিরে তাকালেন না নাসির শিকদার। মুখ ফিরিয়ে রাখলেন। শুনতে রাজি নন অনুনয়, যুক্তি। কীভাবে শুনবেন? শোনার মতো কাজ যে ভাগ্নি তার করেনি। এটা তার ভাগ্নি এতটুকু ভাবতেও যে লজ্জা লাগছে।

‘ভাইজান, ভাইজান… মাইয়া আমার এমন করতে পারে না। কোনো একটা ভুল আছে এহান…’

জব্বার শিকদার চুপ থাকতে পারলেন না। চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলেন –

‘কথা বইলো না তুমি আর!! মাইয়ারে লাই দিয়া কী বানাইছো দেহো!! আমার পোলার মানসম্মান নিয়া টান দিলো।’

শবনম চুপ করে গেলেন। ভেজা চোখে শুধু তাকিয়ে থাকলেন ভাইয়ের মুখের দিকে। উপস্থিত সকলের শ্বাস রীতিমতো গলায় আটকে আছে। সকলের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে আছে কাজল। মাথাটা নোয়ানো, কান্নার তোড়ে কাঁধ দুটো কাঁপছে। শান্ত তখুনি প্রবেশ করল ঝড়ের গতিতে। গলার মালাটা সে টেনেহিঁচড়ে খুলে আছড়ে ফেলল ফ্লোরে। নাসির শিকদার সোফায় বসে ছিলেন থমথমে মুখে। শান্তকে ওভাবে প্রবেশ করতে দেখে দ্রুতো দাঁড়িয়ে পড়েছেন। কিছু বলার সুযোগটুকুও পেলেন না। ক্রোধে কাঁপতে থাকা শান্ত এসেই কাজলের গালে চড় বসিয়েছে। সেই চড়ে ছিলো না বিন্দুমাত্র ছাড়। পুরুষালি রুক্ষ হাতের চড়ে মেয়েটা ছিটকে গিয়ে পড়ল জব্বার শিকদারের পায়ের কাছে। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে গলগল করে নামল র ক্ত। জব্বার শিকদার মুখ খুলতে চেয়েও পারলেন না শান্তর ওমন র ক্তিম চোখজোড়া দেখে। ছেলেটা মুহূর্তে হুলস্থূল বাজিয়ে ফেলল। লাথি মে রে ভাঙল টি-টেবিলের মোটা কাঁচটা। ভয়ে সেঁটে গিয়েছে স্ত্রীলোকেরা। কাজল এতক্ষণ নীরবে কাঁপছিল ফ্লোরে বসে। এযাত্রায় চিৎকার করে বসে থেকেই সমানে পেছনে যাচ্ছে। শবনম ছুটে এসে আগলে নিলেন মেয়েকে।

‘শান্ত, শান্ত… থাম, থাম। আমার মাইয়াডারে মারিস না। ভাইজান কিছু কন…’

নাসির সাহেব, জব্বার সাহেব সহ তারা ভাইয়েরা ভাইয়েরা একটা কথাও বললেন না। মুখ ফিরিয়ে রাখলেন শুধু। শান্ত তেড়েমেড়ে এলো কাজলের সামনে ফের। উপেক্ষা করে ফুপির কথাগুলো। মার তে নিয়েও মা রল না শেষমেশ। শুধু দাঁতে দাঁত পিষে প্রশ্ন করল –

‘এতো বড়ো স্পর্ধা পেলি কোথায় তুই জা নো য়ারের বাচ্চা? কার কথায়? কার ইশারায়? দ্রুতো বল, দ্রুতো বল। আমি কিন্তু ভুলে যাবো তুই আমার ফুপুর মেয়ে। এখুনি আমি তোকে শুট করে ফেলব। মে রে ফেলব।’

আঁতকে ওঠেন শবনম। মেয়েকে নিজের পেছনে লুকোতে চেয়ে হতবাক হয়ে উচ্চারণ করেন নামটা –

‘শান্ত!!’

শব্দ করে কাঁদছে কাজল। ভুল করেও মাথা তুলে তাকাল না শান্তর দিকে। শান্ত পুরোপুরি এড়াল ফুপিকে। তাকে ডিঙিয়ে ফের এলো কাজলের সামনে। নিজেকে ঠান্ডা রেখে পুনরায় প্রশ্ন করল –

‘শেষবার জানতে চাইছি, কেনো.. কীজন্যে…কার ইশারায় এই কাজ করছিস বল!’

এবারে শবনম বেগমও মেয়েকে তাড়া দিলেন, ‘ক ওরে, জানা তুই কিছু করছ নাই। কী কথা কবার জন্য ডেকে নিছিলি ম্যাডামরে? গল্প করতে নিশ্চয়ই? ক…ক সত্য করে কইয়া।’

সুপ্তি লুকিয়ে ছিলো মায়ের পেছনে। মাথাটা বের করে ভয়ার্ত গলায় আস্তে করে জানাল –

‘আপু প্রথম থেইকা ম্যাডামরে তেমন একটা দেখতে পারতো না। আমি খেয়ালে রাখছি। এমনকি কথাবার্তাও কইতে চাইতো না। মিশতে আসতো না। দূর থেকে তাকাইয়া থাকতো খালি।’

জাহানারা বেগমের কণ্ঠে কেমন হতাশা মেশানো, ‘আমাগো বাড়ির মাইয়ামানুষ যে এমন নির্লজ্জ হইবো এইতো আমি এহজন্মে কল্পনা করবার পারি নাই। এই মাইয়া কি লোভে পইড়া এমন করল?’

নাসির সাহেব গর্জে উঠলেন, ‘শবনম, তোর মাইয়ারে সব জানাইতে ক। পোলা কিছু উল্টাপাল্টা কইরা লাইব কিন্তু।’

শবনম বেগমকে কিছু বলতে হলো না। কাজল আষ্ঠেপৃষ্ঠে মায়ের হাত জড়িয়ে ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বলল –

‘আমি, আমি উনার কোনো ক্ষ তি করতে চাই নাই। আমি শুধু একটু কথা কইতে ডাইকা নিছিলাম…’

মেয়েটা কথাটুকু শেষ করতে পারেনি। শান্ত হাতের কাছে পাওয়া ছোট্ট ফুলদানিটা ছুঁড়ে মার ল। তা সোজা গিয়ে লেগেছে মেয়েটার কপালে। কপালে র ক্ত ভাসল, শোনা গেল চিৎকার। শবনমের আর্ত নাদ মিইয়ে গেলো শান্তর বাঘের গর্জনে –

‘গাঁধা পাইছস মাদা***! তোর করা কীর্তিকলাপ সম্পর্কে কি এখনো অজানা আছি? ফকিন্নির বাচ্চা!’

শান্ত তাকাল বড়ো চাচার দিকে। তার চোখমুখ র ক্তিম। শক্ত চোয়ালটা কাঁপে কথা বলার সময় –

‘চাচ্চু ওরে কউ পরিষ্কার করে সব বলতে। এইবার আমার হাত চলব, মুখ না।’

শান্ত বলতে বলতে লুঙ্গির পেছন থেকে পি স্তল বের করে নিয়েছে। সেদৃশ্যে কাজল শীৎকার করে ওঠে। দ্রুতো বলে –

‘ওই… ওই জিহাদ নামের লোক আমাদের গ্রামে আহে যেদিন বস আইয়া পৌঁছায়। আমি সন্ধ্যায় যখন পান কিনতে গেছিলাম… উনি আইসা আমার লগে গল্প জুড়ে দিলো। আমারে জানাইল বসের বউ উনার হবু বউ। তাগো দুজানার ছবিও দেখাইছে। কইছে, তাগো বিয়া হবার কথা ছিলো। তখুনি নাকি বস জোরপূর্বক তুইলা নিয়া বিয়া করে ম্যাডামরে। ম্যাডাম এই বিয়া মানে না। থাকতে চায় না। একবার দেখা করাইয়া দিলে ম্যাডাম উনার সাথে চইলা যাইব। ম্যাডাম চইলা গেলে.. আম..আম…’

‘থামবি না.. বলতে থাক।’

কাজল শব্দ করে কেঁদে ফেলল, ‘আমারে লোভ দেখাইছে। কইছে ম্যাডাম চইলা গেলে আমার রাস্তা ক্লিয়ার হইব। বস..বস আমারে…’

শবনম বেগম আর শুনতে পারলেন না। সজোরে চড় মারলেন মেয়ের গালে। চড়ে থামলেন না। এলোপাতাড়ি মার তে লাগলেন। জাহানারা বেগম কপাল ধরে রেখেছেন। শান্ত ইতোমধ্যে ভীষণ স্থির হয়ে গিয়েছে। পায়ের পাতায় ভর দিয়ে বসেছে মার খেয়ে বিধ্বস্ত হয়ে পড়ে থাকা কাজলের সামনে। তখনের কথাগুলোর শেষটা মিলিয়ে আওড়াল –

‘বস তোরে মাইনা নিব? নিজের বউ করব? এই স্বপ্ন দেখছিস?’

কাজল হু হু করে কেঁদে ফেলল। শান্ত কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে অবশেষে নির্বাক কণ্ঠে বলে গেলো –

‘তুই এখনো বেঁচে আছিস কারণ তুই এই শান্ত শিকদারের র ক্ত। নাহলে এতক্ষণে বসের পি স্তলের গু লি তোর কপালে থাকতো। এতক্ষণে আমি হয়তোবা তোর দা ফনের ব্যবস্থা করতাম।’

কাজল হামাগুড়ি খেয়ে জড়িয়ে ধরল শান্তর পা-জোড়া, ‘আমি.. আমি বুঝতে পারি নাই ভাইয়া। আমারে ক্ষ মা কইরা দাও। তখন.. তখন আমার.. আমার কী হইসে আমি জানি না! মাথা কাজ করে নাই। কিন্তু আমি কোনো ক্ষ তি করতে চাই নাই। আল্লাহর কসম।’

শান্ত শোনে না ওসব অনুনয়। বাবা-চাচাদের দিকে চেয়ে আদেশ দেবার মতো করে বলল –

‘আজ রাত্রের ভেতর ওর বিয়া দিবেন। ওরে বিয়ে দিয়ে যতো দূরে সম্ভব পাঠাবেন। এই গ্রাম কিংবা শহর সবখান থেকে দূরে। যদি এতে আপত্তি থাকে ফুপুর..উনার পরিবার সহ যত দূরে সম্ভব চলে যাক।’

চওড়া রাস্তা পিষে ছোটা বৃহৎ গাড়িটার ভেতরটা অস্পষ্ট হলদেটে আলোয় নিমজ্জিত। পিনপতন নীরবতা নেমে আছে। কালো রঙের সিটে এলিয়ে রাখা মাথাটার উষ্কখুষ্ক চুলগুলো ভেজা। কিছুক্ষণ আগেই এক বোতল ঠান্ডা পানি মাথায় ঢেলেছে আদিল। র ক্ত লাল চোখজোড়া আপাতত বন্ধ। কপাল ছোঁয়া হাতটার নীল শিরা ভেসে আছে। হাতের মুঠোয় ভীষণ পুরাতন একটি ছবি। এখনো যত্নের ফলে রঙিন! স্তব্ধ, বন্ধ চোখের পাতায় তখন পুরনো কিছু স্মৃতিরা ভাসা ভাসা ভাবে সতেজ হয়ে উঠেছে। এখনো কী নিখুঁত প্রত্যেকটা দৃশ্য! আজও স্পষ্ট, আজও ততটাই উপভোগ্য। আজও আদিলের ভেতরটা নাড়িয়ে তোলে। ডুবিয়ে আনে দীর্ঘবছর ধরে পেরিয়ে আসা আকাঙ্ক্ষার সমুদ্রে –

এই বেনামি শহরের আকাশচুম্বী সব দালানগুলোর ভিড়ে, আজও বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানে আছে একটাই নাম—মির্জা গ্লোবাল কনগ্লোমারেট। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীক বাজারের প্রতিটি খাতে যার বিস্তর প্রভাব। মাথা উঁচু করে আধিপত্যের এক অদৃশ্য সাম্রাজ্য বনে আছে যে। যার প্রভাবে কাঁপে গোটা ব্যবসায়ীক ভূখণ্ড। বারিধারার বাসস্ট্যান্ড থেকে দু-কিলোমিটারের পথ পেরুলেই মির্জা গ্লোবাল কনগ্লোমারেট কোম্পানি, চব্বিশ তলা। কোম্পানির উদ্দেশ্যেই
তপ্ত দুপুরের সময় ছুটছিল কালো কুচকুচে এলিগেন্ট মার্সিডিজ-টি। হাউজিং পেরিয়ে বারিধারার বাসস্ট্যান্ডের সামনে জ্যামে পড়েছে মাত্রই। ব্যাকসিটে বসা পুরুষালি শরীরের নড়চড় নেই অনেকটা সময় হলো। পায়ের ওপর পা তোলা জুতোর মাথাতে ভীষণ ছোটো পিতলের বাজপাখি বসানো। আভিজাত্য ধরে নেয়াই যায়। ডান ঊরুতে রাখা ম্যাকবুক প্রো-য়ের কি-বোর্ডে চালানো আঙুল গুলো লম্বা, রুক্ষ, শক্তিশালী। হাতের নীল শিরাগুচ্ছ ফুটে আছে। কয়েক মিনিট পেরুলো পিনপতন নীরবতায়। গাড়িটা নড়ে না অনেকক্ষণ, অবশেষে স্ক্রিন থেকে সরে ধূসর চোখজোড়ার দৃষ্টি। অসন্তুষ্ট চোখের দৃষ্টি পড়ে উইন্ডো গ্লাসের বাইরে। ধীরেসুস্থে, মেপে-মেপে বলল কয়েকটি শব্দ –

‘দেখ কী সমস্যা!’

আদিল মির্জার দৃষ্টির সামনে একটি ক্যাফে। নাম ‘দ্য রয়্যাল ক্যাফে’। চমৎকার রং, ডেকোরেশন। বিদেশি একটা আবহাওয়া ক্যাফে জুড়ে। ম্যানেজার আনোয়ার খন্দকার হাতের ডকুমেন্টস রেখে বেরুতে নিয়ে বললেন –

‘আমি দেখছি।’

আদিল নামাল গ্লাসটা। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি, মানুষ সবকিছুর কোলাহল ছাপিয়ে কানে এসে বিঁধল একটি তেজস্বিনী কণ্ঠ –

‘হাত ছাড়, দ্বিতীয়বার মুখে বলব না কিন্তু!’

আদিলের নির্বিকার মুখের নির্বাক ধূসর চোখের মণি ঘোরে। তাকায় সামনে। সিগনালের সামনে, মেইনরোডে কয়েকটি ছেলেপুলের সামনে দাঁড়ানো মেয়েটির পিঠ তার দৃষ্টির সামনে। মেয়েটার হাত শক্ত করে টেনে ধরা ছেলেটার কণ্ঠে কৌতুক –

‘করবে কী? ছাড়ব না। লেট মি সিইই বিউটি…’

ছেলেটি কথাটুকু শেষ করতে পারল না। চোখের পলকে ওমন পাতলা শরীরের মেয়েটা আশ্চর্যজনক এক কাজ করে ফেলল। ছেলেটার গলার দিকের শার্ট আর হাঁটুর দিকে জিন্স ধরে সোজা মাথার ওপরে তুলে আছড়ে ফেলল রোডের শক্ত রাস্তায়, গাড়িটার সামনে। আদিলের স্থির মণিদুটো কিঞ্চিৎ নড়ে। রোড থেকে দৃষ্টি উঠে এসে থামল ঘুরে দাঁড়ানো মেয়েটির মুখের দিকে। সূর্যের আলো পড়া ঐ মুখে আদিলের দৃষ্টি থামল। থমকাল, দৃঢ় হলো ক্রমশ। ছেলেপুলেদের মধ্যে আরেকটা তেড়েমেড়ে এগুতেই মেয়েটা ঝড়ের বেগে ডান উঁচিয়ে বসাল ঘাড়ে। মুখ থুবড়ে পড়া ছেলেটা আর্তনাদ করে চেঁচাল –

‘তোরে আজকে যদি শিক্ষা না দিসি! কার গায়ে হাত তুলছস বুঝাইয়া ছাড়মু মা*।’

মেয়েটা বেশ নির্ভয়ে এগুতে এগুতে বলে গেলো –

‘কী করবি? বারিধারার ওসি আমার চাচার বন্ধু। আমি তোদের হাজতে ঢোকাব।’

‘ওমন ওসি আমার বাপে পকেটে নিয়ে ঘোরে। তুই শুধু তোর ভাগ্য দেখবি। দেখবি তোর কী অবস্থা করিইইই! এই সুন্দর মুখ দেখানোর রাস্তা রাখমু না।’

মেয়েটা বোধহয় এক মুহূর্তের জন্য থমকেছিল। পরমুহূর্তেই বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দিলো –

‘মির্জা গ্লোবাল কনগ্লোমারেট কোম্পানির আদিল মির্জা আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয়।’

সবেমাত্র কার ডোর খুলেছিল আনোয়ার সাহেব।বাইরে কী হচ্ছে জানাবে বলেই! তখুনি মেয়েটার এমন উক্তি শুনে চমকে ওঠেন। আদিলের অভিব্যক্তির কোনো পরিবর্তন না দেখে নিজেও চুপ থাকলেন। ড্যাবড্যাব করে ফিরে তাকালেন রূপবতী মিথ্যেবাদী মেয়েটার দিকে। ছেলেপুলের একজন শব্দ করে হেসে বলল –

‘তাহলে নিশ্চয়ই দেশের প্রধানমন্ত্রী তোমার আন্টি খুকি?’

মেয়েটা দমে না –

‘আন্টি না। তবে নিয়মিত দেখাসাক্ষাৎ না হলেও মাঝেমধ্যে হয়।’

বলতে বলতে অধৈর্য্য হয় মেয়েটা। রাগান্বিত ভঙ্গিতে আশেপাশের মানুষদের চিৎকার চেঁচামেচি করে জড়ো করে। ছেলেপুলে গুলো লোকজনের তাড়া খেয়ে পালালে মেয়েটা প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে আদিলের পাশ দিয়েই যায়। সোজা ঢোকে ‘দ্য রয়্যাল ক্যাফে’ – তে। আদিলের গাঢ় দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকল পুরোটা সময় জুড়ে। একটা ‘দ্য রয়্যাল ক্যাফে’ লিখা অ্যাপ্রোন পরতে পরতে সম্ভবত বিড়বিড় করে কথা বলছিল মেয়েটা। পা থেকে মাথা অবধি ঘুরে বেড়াল ধূসর চোখজোড়া….

নীরবতা ভাঙল গোঙানির মৃদু শব্দে। আদিল চোখ মেলল। ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাল পাশে। সিটে লম্বা করে শুইয়ে দেয়া রোযা ঘুমের ঘোরে কিছু একটা অস্পষ্ট ভঙ্গিতে আওড়াচ্ছে। সামান্য নড়তেই গায়ের ওপরে থাকা আদিলের বেইজ রঙের কোট নিচে পড়ল নিঃশব্দে। আদিলের কোলে থাকা নগ্ন, ফর্সা পা-দুটো নড়েচড়ে তার পেটের সাথে আরও আরাম করে গুঁজেছে। ও দৃশ্যে চোখ বুলিয়ে তাকাল রোযার গলায়। মৃদু আলোয় স্পষ্ট দেখল পাঁচ আঙুলের দাগ। কী বিভৎস দৃশ্য! যত সময় গড়াচ্ছে তত আরও র ক্তিম দেখাচ্ছে। ওতো বলপ্রয়োগ তো করেনি সে। হালকা ভাবেইতো ধরেছিল! গায়ের রং-টাই ওমন। সামান্য চেপেও ধরা যায় না। আদিল ঝুঁকল, তুলল কোট। ওটা গায়ে মেলে দিতে গিয়ে কান পাতল। শুনল অস্পষ্ট বাক্যটি –

‘আদিল, ডোন্ট ডু দিস।’

আদিলের দৃষ্টি থমকাল সুন্দর মুখখানিতে। কী সরল, নিষ্পাপ, অবলা! অথচ এই অবলা নারী কেমন অনায়াসে, এক ডাকে তার পুরো সত্ত্বাকে কাবু করে ফেলতে পারে। থমকে দিতে পারে তার দুনিয়া। আদিলের বুকের হৃৎপিণ্ড তখনো বেসামাল। অস্থিতিশীল অবস্থায়। চোখে ভাসে সেই উড়নচণ্ডী রোযার চোখমুখ। যে তেজস্বিনী.. দুঃসাহসী, বুদ্ধিমতী! যার আগা থেকে মাথা অবধি প্রত্যেকটা অঙ্গ, তার প্রত্যেকটা ইশারা, প্রত্যেকটা ছোটোখাটো ব্যাপার যেন খোদা আদিলের পছন্দ মাফিক বানিয়ে পাঠিয়েছে।

‘কিছুইতো করতে হলো না। নাম ধরে ডেকেই আমার দুনিয়া দুলিয়ে ফেলেছো।’

‘ড্যাড?’

হৃদির ঘুম ভেঙেছে। চোখমুখ ফুলো। এই গাড়িটা তিন সারির। একেবারে পেছনের সারিতে রোযা আর আদিল ছিলো। মধ্যেরটায় হৃদি ঘুমিয়ে ছিলো এতক্ষণ অবধি। বাচ্চাটা উঠেই সিট ধরে দাঁড়িয়েছে হুড়োহুড়ি করে। আদিল বাম ঊরু থেকে ম্যাকবুক সরিয়ে রাখল। হাত বাড়াতেই হৃদি চলে এলো তার কোলে। মেয়েকে ঊরুতে বসিয়ে এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে জিজ্ঞেস করল –

‘খুদা লাগল? কী খাবে?’

হৃদি বাবার বুকে মাথা এলিয়ে মাথা নাড়িয়ে বোঝাল খাবে না কিছু। তাকাল রোযার দিকে। চিন্তিত গলায় প্রশ্ন করল, ‘হোয়াট্‌স রং উইথ মম?’

‘নাথিং, শি’জ টায়ার্ড।’

হৃদি খিলখিল করে হেসে উঠল। দু-হাতে আদিলের গলা জড়িয়ে গাল রাখল কাঁধে। মেয়ের হঠাৎ হাসির শব্দে আদিল ভ্রু তুলে পিঠ বুলিয়ে প্রশ্ন করল –

‘কী? এতো হাসছে কেনো আমার প্রিন্সেস?’

‘বিকজ আই’ম হ্যাপি। দ্য হ্যাপিয়েস্ট ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’

আদিল আগ্রহ নিয়েই মেয়ের কিচিরমিচির শুনে প্রশ্ন করে গেলো, ‘হটাৎ? কী কারণ…’

হৃদি কাঁধ থেকে মাথা তুলে তাকাল বাবার চোখে। একইরকম একজোড়া চোখ আদিলের চোখ চেয়ে মিটিমিটি করে হেসে ফিসফিস করে বলে –

‘কারণ মম এখন আমার সাথে থাকছে। সারাজীবন থাকবে। তুমি আমাকে বলেছিলে না এটা আমার মম। এখন আমার সাথে থাকে না –কিন্তু ইন ফিউচার আমার সাথে থাকবে। আমাদের বাড়িতেই থাকবে। আই হ্যাভ আ শার্প মাইন্ড। আমার সব মনে আছে। তখন থেকে আমি অপেক্ষা আর অপেক্ষায়।’

আদিল দেখল মেয়ের উজ্জ্বল মুখখানি। সূর্যের মতন ঝলমল করছে। যবে থেকে রোযাকে পেয়েছে তবে থেকেই মেয়েটা প্রজাপতির মতো উড়েবেড়ায়, সূর্যের মতন ঝলমল করে। মেয়ের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে মাথা বুলিয়ে দিলো….


চলবে ~~
® নাবিলা ইষ্ক।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply