নুসাইবা_ইভানা
অর্ধাঙ্গিনী সিজন পর্ব -৫০
জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না। জীবন জীবনের নিয়মে চলতে থাকে বয়ে চলা নদীর মতো। গত কয়েকটা মাস চৌধুরী পরিবার শোক কাটিয়ে সবেমাত্র সাধারণ জীবনযাপন শুরু করেছে।
মেহনুর জারিফকে নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে। জারিফকে নিয়ে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টায় যেন সফল মেহনুর। কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ দমকা হাওয়ার মতোই মন খারাপ এসে মেহনুরের মনটা বিষণ্ণ করে দেয়। যদিও তা সামান্য কিছু সময়, তবুও মেহনুরের ভীষণ কষ্ট হয়। তার সন্তান কোনোদিন বাবার ভালোবাসা পাবে না।
জারিফ বাড়ির বাইরে গাড়ির সামনে জিয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দৌঁড়ে গিয়ে “পাপা” বলে জড়িয়ে ধরল জিয়ানকে। জিয়ান জারিফকে কোলে তুলে নিয়ে কপালে চুমু খেয়ে বলল, “পাপা, স্কুল যাওয়ার জন্য রেডি তো?”
জারিফ হেসে বলল, “ইয়েস পাপা, আমি তো অনেক বড় হয়ে গেছি।”
মেহনুর গাড়ির সামনে এসে বলল, “ড্রাইভার কোথায়? তুমি এখানে কী করছ রেজা? তোমার কি আর কোনো কাজ নেই!”
জিয়ান গাড়ির পেছনের দরজা খুলে মেহনুরকে বলল, “আমিও যাব তোমাদের সাথে। আজকে আমার ছেলেটার প্রথম স্কুল, তার পাপা তার সাথে যাবে—এটাই তো স্বাভাবিক মেহনুর।”
মেহনুর ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল, “এসব ঢং আমার একদম পছন্দ না রেজা। জারিফ তোমার ছেলে না। জারিফ সেটা না বুঝলেও তুমি তো বোঝো? কয়েকদিন পর যখন তোমার নিজস্ব সন্তান আসবে, তখন আমার ছেলেকে এভাবে ভালোবাসতে পারবে না। আমার ছেলেটাকে আমি কোনো কষ্ট পেতে দেখতে পারব না। তাই জারিফ এখন থেকেই জানুক তার বাবা এই পৃথিবীতে নেই। তার মা তার জন্য যথেষ্ট।”
জিয়ান নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে বলল, “মেহনুর, কোনোদিন শুনেছ প্রথম সন্তানের পর দ্বিতীয় সন্তান হলে মানুষ প্রথম সন্তানকে ভালোবাসা ছেড়ে দেয়?”
“দয়া করে তুমি আর তোমার বউ আমাদের মা-ছেলের জীবন থেকে একটু দূরে থাকো রেজা। আমি এখন জীবনে কোনো অশান্তি চাই না। যদি তোমরা তোমাদের আলগা দরদ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারো, তবে আমি বাধ্য হব জারিফকে নিয়ে কানাডা চলে যেতে। আমি চাই না জারিফ তার দাদা-দাদির ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হোক। কিন্তু আমার ছেলের প্রতি তোমাদের এই অতিরিক্ত ভালোবাসা আমাকে সেটা করতে বাধ্য করবে।”
জিয়ান জারিফকে গাড়ির ভেতর বসিয়ে দিয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ করল। মেহনুরকে লক্ষ্য করে বলল, “দেখো মেহনুর, আমার হয়তো কথাটা এভাবে বলা উচিত হবে না, তবুও বলতে বাধ্য হচ্ছি—তোমার এই অতিরিক্ত জেদের কারণেই তোমার জীবনে কোনো ভালোবাসা নেই। বিদেশ থেকে ফিরে তোমার জেদ হলো আমাকে বিয়ে করার। এরপর যখন আমাকে পেলে না, তোমার জেদ হলো জাহিনকে বিয়ে করার। এখন তোমার জেদ হচ্ছে জারিফকে আমাদের থেকে দূরে রাখার। আমার ভাইয়ের ছেলে, তার প্রতি আমার ভালোবাসা, স্নেহ ও দায়িত্ব আমার নিজের সন্তানের মতোই। তুমি সবসময় জেদ করে করে নিজেকে কষ্ট দিয়েছ। প্লিজ, এবার নিজের ছেলেটাকে কষ্ট দিও না। যাও গাড়িতে গিয়ে বসো। আমি তোমাদের স্কুলে নামিয়ে দিয়ে প্রিন্সিপালের সাথে কথা বলে চলে আসব। দয়া করে আর কোনো সিন ক্রিয়েট করো না।”
জাহিনের মৃত্যুর মাসখানেক পরেই জিয়ানকে নিজের কাজে ফিরতে হয়েছিল। তিন মাস পর ছুটিতে এসেছে বাসায়। মেহনুরের মনে যে বিষ বিস্তার লাভ করছে তা হলো—সুনয়না প্রেগন্যান্ট। এই বিষয়টা মেহনুর মানতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে সুনয়নার সন্তান হলে জারিফের ভাগ কমে যাবে; জিয়ান আর জারিফকে এতটা ভালোবাসবে না বা আগলে রাখবে না। সুনয়না নিজের প্রেগন্যান্সির কথা এতদিন কাউকে জানায়নি। জিয়ানও এখনো জানে না। কিন্তু মেহনুর নয়নার ওপর নজর রেখে সেটা উদঘাটন করেছে। মেহনুর এই খবরে কোনোভাবেই খুশি হতে পারেনি। মেহনুর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “মেয়েমানুষ নিজের ব্যক্তিগত পুরুষের সব অন্যায় ক্ষমা করে দেয়; শুধু নিজের ব্যক্তিগত পুরুষ অন্য নারীকে ভালোবাসে—এই অন্যায় ক্ষমা করতে পারে না। এই অন্যায়ের শাস্তি বিচ্ছেদ পর্যন্ত গড়ায়। অথচ আমার স্বামী আমার শরীর ছুঁয়েও মনে করিয়ে দিত যে সে ভালোবাসে সুনয়নাকে। আমি তো বিচ্ছেদও চাইতে পারিনি, কারণ আমি আশ্রয় চেয়েছি। আর যাই হোক, সুনয়নাকে আমি কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না। ওকে দেখলেই আমার মনে পড়ে আমার স্বামী এই মেয়েটাকে পাগলের মতো ভালোবাসত।”
“এসব সুনয়নার কী দোষ! অন্যকে দোষ দিয়ে সুখে থাকা যায় না। দোষ-গুণ না খুঁজে নিজের পরিবার ভেবে একসাথে ভালো থাকা শেখো মেহনুর। নিজের সন্তানকে সুস্থ একটা পরিবেশে বেড়ে উঠতে দাও। এত বিদ্বেষ আর ঘৃণা নিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না।”
মেহনুর কোনো কথার উত্তর না দিয়ে গাড়িতে গিয়ে জারিফের পাশে বসল।
জিয়ান জারিফের স্কুল থেকে ফেরার পথে নয়নার জন্য বেলি ফুলের গাজরা নিল। এরপর নয়নাকে কল করল। নয়না সবে সকালের নাস্তা করে একটু শুয়েছে। ফোনের রিংটোন বেজে উঠতেই হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে কল রিসিভ করল।
জিয়ান হাসিমুখে বলল, “কী করছ বাটার মাশরুম?”
“এই তো বসে আছি, সবে না তুমি দেখে গেলে!”
“এই, তোমার কি লাল পাড় সাদা শাড়ি আছে?”
“আছে তো, কেন?”
“এক্ষুনি শাড়ি পরে রেডি হয়ে নিচে আসো, আমি গাড়ি নিয়ে আসছি। আজকের আকাশ দেখেছ আকাশপ্রিয়া? চলো আজ হারিয়ে যাই এই প্রেমময় আবহাওয়ায়।”
নয়নার শরীরে একদম এনার্জি নেই। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “আমার একদম ইচ্ছে করছে না। বাসায় আসো, আমরা একসাথে একান্ত সময় কাটাই।”
জিয়ান একটু রেগে গেল। কোনো কথার উত্তর না দিয়ে ফোনটা কেটে দিল। প্যান্টের পকেটে মোবাইল রাখতে গিয়ে তার মনে হলো হাতে কিছু একটা অনুভব হলো। দ্রুত সেটা বের করে আনল। একটা চিরকুট, কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটা আছে। জিয়ান চিরকুটটা খুলতেই চোখে পড়ল ক্ষুদ্র একটা বাক্য— “আর ইউ রেডি টু বিকাম আ ফাদার?”
জিয়ান যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। অদ্ভুত রকমের এক অনুভূতিতে ছেয়ে গেল হৃদয়। হার্টবিট দ্রুত চলছে। জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে কাগজের ভেতর থেকে বের করল জিনিসটা—দুটো স্পষ্ট লাল দাগ দেওয়া প্রেগন্যান্সি কিট। খুশিতে জিয়ানের চোখের কোণ বোধহয় ভিজে উঠল। কিছুক্ষণ সেভাবেই বসে রইল। ইচ্ছে করছে নয়নাকে জড়িয়ে ধরে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে। কিছু সময় পর আবার নয়নাকে কল করল।
“মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, রাগ কমল?”
“কমলা সুন্দরী বউয়ের সাথে রাগ করে থাকা যায়? উফ সুনয়না, আমি তোমাকে ভালোবাসতে বাসতে পাগল হয়ে যাব।”
নয়না হেসে বলে, “মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, এখন আর আমাকে ভালোবাসলে হবে না। এখন আপনার আরও একজন ভালোবাসার মানুষ আসছে, তার জন্য সুস্থ থাকতে হবে। নয়তো আমার ছেলেকে কী বলব—তার বাবা পাগল?”
“ছেলে মানে! আমার হবে একটা কিউট পরীর মতো মেয়ে।”
“ইশ শখ কত! আমার একটা ছেলে হবে।”
“দেখো বাটার মাশরুম, আমার কিন্তু মেয়ে চাই।”
“দেখুন মিস্টার প্লেন ড্রাইভার, আমার কিন্তু ছেলে চাই।”
“আচ্ছা দুটোই হবে তোমার। মানে টুইন হলেই তো ঝামেলা চুকে যায়। আমার মেয়ে আর তোমার ছেলে।”
“সন্তানের মধ্যে কোনো আমার-তোমার নেই, আমাদের হবে।”
“আমি আসছি ময়নার মা, তোমাকে ভালোবাসায় ভাসিয়ে নিতে।”
ফোনটা রেখেই নয়না মুচকি হাসছে। এতগুলো বছর পর অবশেষে সুখ তাদের ছুঁয়ে যাচ্ছে।
🌿
“আচ্ছা বলো তো, ভালোবাসার মানে কী?”
“ভালোবাসার মানে হলো ভালো থাকা।”
“অথচ ভালোবাসতে ভালোবাসতে আমরা ভালো থাকা ভুলে যাই!”
“ভালো থাকা ভুলে কি ভালোবাসা যায়?”
“তুমি কি ভালোবেসে ভালো আছো? নাকি ভালোবেসেছ বলেই ভালো থাকা বিসর্জন দিয়েছ?”
অন্তর কিছুক্ষণ চুপ করে রইল; যেন সব কথা হারিয়ে গেছে, শব্দরা সব নির্বাসিত। তার ভেতরে কেবল রয়েছে হাহাকার, যন্ত্রণা আর অব্যক্ত আক্ষেপ। নীলাঞ্জনা অন্তরের চুলের ওপর হাত বুলিয়ে বলে, “আমরা ভালো থাকার জন্য ভালোবাসি। অতঃপর ভালোবাসার সাথে সাথে ভালো থাকাকেও হারিয়ে ফেলি। জীবন বড্ড নিষ্ঠুর, নাকি আমরা নিজেরাই জীবনের প্রতি নিষ্ঠুর—বুঝে উঠতে উঠতে এক জীবন কাটিয়ে দিই দুঃখ বয়ে বয়ে।”
“তুমি কত সুন্দর করে বললে, অথচ এই কথাগুলো মেনে নেওয়া বড্ড কুৎসিত।”
“এর চেয়েও ভয়ংকর দুঃখজনক কুৎসিত কথা শুনবে?”
“বলো।”
“ভালোবাসার আশায় ঘর বেঁধেও শুধু ঘর পেলেও ভালোবাসা না পাওয়ার যন্ত্রণা। আমি কেন এত কপাল পোড়া?”
“নিজেকে দোষ দিও না নীলাঞ্জনা, সব দোষ আমার। আমার ধ্বংসাত্মক জীবনে তোমাকে জড়িয়ে কষ্ট দিচ্ছি। কী করব বলো, আমি যে নিজের কাছেই অপরাধী।”
নীলাঞ্জনা অন্তরকে জড়িয়ে ধরে বলে, “ভুলে যান না সব তিক্ত অতীত। আসুন আমরা দুজন নতুন করে ভালোবেসে বাঁচি।”
অন্তর উঠে চলে গেল। জাহিনের মৃত্যুর পর যেন কোনোভাবেই নিজেকে স্থির করতে পারছে না। নীলাঞ্জনার চোখ থেকে টুপটুপ করে অশ্রু ঝরছে। শেষ আশাটুকুও যেন নিভে গেল। হয়তো এ জন্মে তার আর ভালো থাকা হবে না। বাকিটা জীবন কাটিয়ে দিতে হবে ভালো থাকার অভিনয় করে করে।
চলবে
বিঃদ্রঃ – বইদুটি অর্ডার করুন রকমারি সহ আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে। বই পড়ুন সুস্থ সমাজ গড়ুন।
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব পর্ব ৩৬( সম্পূর্ণ)
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ২৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৬
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৯