Golpo romantic golpo অন্তরালে আগুন

অন্তরালে আগুন পর্ব ৫৬


অন্তরালে_আগুন

পর্ব:৫৬

তানিশা সুলতানা

আদালতের কার্যক্রম আজকের মতো এখানেই সমাপ্ত হয়। জর্জ বিনা বাধা বিনা শর্তে নওয়ানকে মুক্তি দেয়। তার যখন খুশি তখনই সে ধরা দেবে পুলিশের হাতে। নুপুর খুশি হয়েছে কিনা দুঃখ পেয়েছে সেটা তার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে না। কেমন উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নওয়ান এর মুখ পানে। যেনো অনেক কিছু বলতে চাচ্ছে তাকে। কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারছে না৷
নায়েব তালুকদার ছেলের ওপর বেজায় রেগে আছে। কেনো অকপটে সবকিছু স্বীকার করে নিতে হবে? কেনোই বা একটা মেয়ের জন্য নিজেকে এতটা নিচে নামাতে হবে?
এই প্রশ্নটা ছেলেকে করলে সে সোজাসাপ্টা জবাব দেবে যেটা আরও পছন্দ হবে না নায়েব এর। যার জন্যই কোর্ট থেকে বেরিয়ে যায়।
মানিকগঞ্জ কোর্টের সামনে সাধারণ মানুষের ভিড় জমে আছে। সকলের মুখে মুখে নওয়ান তালুকদারের নাম। না না এই মানুষটা নিষ্পাপ নয়। বা ভালো মানুষও নয়। তবুও ওদের নওয়ান তালুকদারের প্রতি অগাধ মায়া। অফুরন্ত ভালোবাসা। বিশেষ করে ইয়াং জেনারেশন এর ছেলেদের।
নওয়ান কোর্ট থেকে বেরিয়ে আসতেই সকলেই হুঙ্কার দিয়ে ওঠে। পুলিশের জন্য পারছে না দৌড়ে এসে নওয়ানকে জড়িয়ে ধরতে।
ছোট্ট আয়াশ ভাইয়ার হাত ধরে আছে। মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে সে ভীষণ বিরক্ত।
নাকের ডগায় পরে থাকা চশমা ঠেলে চোখের সঙ্গে ফিট করে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে
“ওরা এমন সিনক্রিয়েট করছে কেনো?

নওয়ান সহজ ভাষায় জবাব দেয়
” ওরা খুশি হয়েছে তাই।

“আমি কোনো খুশি হতে পারি না?

” তোমার জীবনের সব খুশি আবার ফেরত দিবো আমি।
দেখিও তুমিও খুশি হতে পারবে।

বুঝতে পারলো না আয়াশ। তবে বোঝার চেষ্টা করতে থাকে
নুপুর তার বাবা ভাইয়ের সঙ্গে চলে গিয়েছে তাদের বাড়িতে। যেটা নওয়ান খেয়াল করে নি৷ তবে যখনই খেয়ালে আসে তখন অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছে৷
অগত্য তামিমকে পাঠানো হয়। নুপুর ঠিকঠাক বাড়িতে পৌঁছাতে পারলো কি না দেখতে।
বল্টুকেও তার বাড়িতে পাঠানো হয়৷ কতো দিন হলো ছেলেটা জেল খানায় পরে আছে। নিশ্চয় তার মায়েরও খারাপ লাগছে।
তারপর এম্বুলেন্স এনে আমিনাকে নিয়ে পাড়ি জমানো হয় ঢাকার শহরে। এভারকেয়ার হাসপাতালে আগে থেকেই সব ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিলো যার ফলে ওরা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই আমিনাকে ভর্তি করানো হয়। শুক্রবার হওয়ার ফলে বিদেশ থেকে ডাক্তার এসেছে। তাদের দিয়ে চেকআপ করানো হয়।
সকলেই উপস্থিত হাসপাতালে। করিডোরে বসে আছে। অপেক্ষা ডাক্তার কি জানাবে।
শুধু নেই নায়েব তালুকদার।
নওয়ান এই মুহুর্তে উপলব্ধি করতে পারছে মায়ের দুঃখ।
ছোট বেলা থেকে সে চিন্তা করতো “সবই তো আছে। তাও কেনো আম্মু মন খারাপ করে থাকে? কেনোই বা হাসে না? তার সঙ্গে মন খুলে কথা বলে না?”
মূলত এই জন্যই তার মায়ের থেকে বাবাকে বেশি পছন্দ ছিলো।
কিন্তু এখন বুঝতে পারে মায়ের মন খারাপের কারণ৷ কেনোই বা তার মা এতো গম্ভীর। কেনোই বা তিনি প্রাণ খুলে হাসতে জানে না।
মায়ের প্রতি অনেক অভিমান ছিল নওয়ান। এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে সব অভিমান ধুলোয় মিশে গেছে। ভর করেছে একরাশ আফসোস।
অনলের মতো জ্বলতে থাকা নওয়ান তালুকদার পানির মতো ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।
বহুদিন বাদে নীরবে দেখা মিলল। সে এসেছে হাসপাতালে। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ৷ সে তার বড় মাকে কতটা ভালোবাসে সেটাই প্রকাশ করতে চাচ্ছে।
প্রিন্স ডায়না গোটা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী ছিলেন। তার একটা কথা আজও সকলের মুখে মুখে।
“আমি যাকে ভালোবেসেছিলাম৷ সে ছাড়া গোটা বিশ্ব আমায় ভালোবেসেছে”
আমিনা তালুকদারের ক্ষেত্রেও এই একটা কথাই প্রযোজ্য।


ডাক্তার বের হয়। কিছু চেকআপ করানো হয়েছে, আর কিছুটা কাল করানো হবে।
বিজ্ঞান বড়ই উন্নত। সকল চিকিৎসার ওষুধ আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। আমিনা তালুকদার কেউ তারা সুস্থ করে তুলতে পারবেন এমমটাই আশ্বাস দেয়।
নওয়ান খুশি হতে পারে না৷ সে কিছু মুহূর্ত ডাক্তারের মুখ পানে তাকিয়ে থেকে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যায়।
কাছাকাছিই তাদের একটা বাসা রয়েছে। রাতে হয়তো সকলেই সেখানেই থাকবে।
তবে নওয়ান এখনই মানিকগঞ্জ ফিরে যেতে চায়। তার দুটো কারণ
এক নায়েব তালুকদার অনবরত কল করে চলেছে।
দ্বিতীয় নুপুরকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে৷
মনে হচ্ছে এক্ষুনি দেখতে না পেলে জান টাই বেরিয়ে যাবে। হাসপাতালের সামনেই তাদের তিনটি গাড়ি রাখা ছিলো। কালো রংয়ের মার্সিডিজটা নওয়ান তালুকদারের। সেটা নিয়েই সে বেরিয়ে পরে।
ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জের দূরত্ব খুব বেশি নয়। ওই ৩-৪ ঘন্টার পথ।
তবে রাস্তা ফাঁকা থাকলে আরো আগে পৌঁছানো যায়। এই মুহূর্তে রাস্তায় কোনো জ্যামজোট লেগে নেই। যার ফলে নওয়ান অতি দ্রুতই মানিকগঞ্জ পৌঁছতে পারে। প্রথমেই নিজের বাড়িতে না গিয়ে শ্বশুর বাড়ি যায়।
ধরণীদের সন্ধ্যা নেমেছে আরো অনেক আগেই। অন্ধকারে চারিপাশ ছেড়ে গিয়েছে। বেওথা ব্রিজে জ্বলতে থাকা ল্যাম্পপোস্ট গুলোই শুধু আলো দিচ্ছে। আসমান হতে চাঁদ ও বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। মেঘ গ্রাস করে নিয়েছে।
এমন অন্ধকার রাত নওয়ানের পছন্দ নয়। দম বন্ধ হয়ে আসে।
তারাই ঝলমলে আসমান আর থালার মতো বিশাল চাঁদই যেনো আসমানের পূর্ণতা।
ঠিক যেমন নুপুর নওয়ানের পূর্ণতা।
এসব ভাবতে ভাবতেই নাসির শিকদারের বাড়ির সামনে চলে আসে। দরজাটা খোলাই ছিলো। ড্রয়িং রুম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। টিভিতে কার্টুন চলছে।।
নওয়ান গাড়ির ড্রেক্স থেকে সিগারেট নিয়ে ঠোঁটের ভাজে গুঁজে নেয়। লাইটার দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে টানতে টানতে গাড়ি থেকে নামে।
এবং সিগারেট ঠোঁটের ভাজে নিয়েই বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে।
জুতো জোড়া খোলারও প্রয়োজন বোধ করে না।
নাসির মনোযোগ সহকারে ফেন ঘাটছে। নুপুর তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে শুয়ে টিভি দেখছে। সোনিয়া বেগম অপর সোফায় বসে পরিক্ষার খাতা দেখছে।
নেহাল বোধহয় তার কক্ষে। সেখান থেকে আওয়াজ আসছে।
নওয়ানকে দেখে চমকালো নুপুর। এক লাফে উঠে বসে। সোনিয়া বেগমও খাতা রেখে তাকায় ওর মুখ পানে। নাসির টিভি বন্ধ করে গম্ভীর স্বরে প্রশ্ন করে
“এখানে কি চাই?

নওয়ান নাসিরের মুখোমুখি সোফায় বসে। সিগারেট এ টান দিয়ে বলে
” চাঁদকে নিতে এসেছি।

“ও যাবে না তোমার সাথে।

” ওর জন্য আমি আমার গোটা জীবনটা দিয়ে দিলাম আর ও কয়েকটা দিন আমার সঙ্গ দিতে পারবে না?

এ যাত্রায় নাসির বলার মতো কিছু খুঁজে পায় না।
বলে সোনিয়া
“তোমার সাথে যেটা হচ্ছে সেটা স্বাভাবিক নয় কি?

” নাহহহ
রাজনীতি শব্দটার মধ্যেই অপরাধ লুকিয়ে আছে। গোটা পৃথিবীতে এমন কেনো নেতা নেই যে অন্যায় করে নি।
ক্ষমতার পাওয়ারই এমন৷ হাতে আসলেই রাজা।
তাছাড়াও
আমি শাস্তি পেলে, আমার ফাঁসি হলেও অপরাধ বিলুপ্ত হবে না।।
আমার পরে যেই ক্ষমতায় আসবে সেই রাজা হয়ে যাবে

মন্দ বলে নি নওয়ান৷ ১০০ তে ১০০ কথা গুলো ঠিক।
নাসির প্রসঙ্গ পাল্টে বলে
“গুরুজনদের সামনে সিগারেট খাচ্ছো।
লজ্জা করে না তোমার?

নওয়ান দুই হাত মাথার ওপরে রাখে। নাক মুখে ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে বলে
” লজ্জা নারীর ভূষণ।
সিগারেট জেন্টলম্যানরা খায়।

“বেয়াদব

” সেই জন্যই তো আপনার মেয়েকে নিয়ে যাচ্ছি। সে যত্ন করে আদব শেখাবে আমায়।

বলেই দাঁড়িয়ে পরে।
নুপুরের হাত খানা খপ করে ধরে বলে
“চাঁদ চলোওও

নুপুর নিজেও নওয়ানের সাথে যেতে চাচ্ছে। তাই অমত করার প্রশ্নই আসে না।
তবে বাবার মতামত জানতে তার দিকে তাকায়। নাসির মৃদু হেসে অনুমতি দেয়।
নুপুর খুশি হলো। নওয়ানের মুখ পানে তাকিয়ে বলে
” চেঞ্জ করে আসি?

“এভাবেই মাশাআল্লাহ লাগছে।
চলো

চলবে

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply