তোমাতেই_আসক্ত ২
পর্ব:১২
তানিশা সুলতানা
ঘন ঘন চোখের পলক ঝাপটায় আদ্রিতা। আসলে আবরার কি বললো ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। সময়ও পায় না বোঝার কেনোনা ইতিমধ্যেই আরেক খানা চমক পেয়ে গিয়েছে সে। ওই তো দুটো লাগেজ টানতে টানতে এয়ারপোর্টের ভেতর থেকে অহনা বের হচ্ছে। বরাবরের মতোই তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ। বলা বাহুল্য আদ্রিতার একদমই অহনাকে পছন্দ নয়। কখনোই তার সাথে ভাব জমাতে যায় না। বরং অহনাকে দেখলেই পালাই পালাই করে। বছরে দুই তিনটে কথা হয় কি না সন্দেহ। অথচ ওরা একই বাড়িতে থাকে। সকাল দুপুর এবং রাত একই সঙ্গে খাবার খায়।
অহনা গাড়ির পেছনের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে৷ লাগেজ দুটো হয়ত গাড়ির পেছনে রেখে এসেছে। আদ্রিতা এ্যানিকে গাড়ির সামনে ডেক্স এর ওপর রেখে পেছন ঘুরে বসে। অহনার মুখ পানে তাকিয়ে বলে
“আপি তুমি আসবে বললে না তো। তাহলে তো তুমি আর বড় মা আসতে পারতে। আমাকে আসতে হতো না। জানো না আপি তোমার ভাই আস্ত একটা হাতি। আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলো আবার কলামনা করে নিতে এসেছে।
বলতে বলতে এক পলক আবরারের পানে তাকাতেও ভোলে না।
অহনা শুনলো আদ্রিতার কথা। তবে প্রতিত্তোরে কোনো জবাব দিলো না। নিজের ফোনের দিকে তাকালো।
আদ্রিতা মুখ বাঁকায়। সব গুলোই পাষাণ। তেঁতো খেতে খেতে মুখে মরিচীকা পরে গেছে এদের।
ধুরর কথা বলাই বেকার। তাই ঘাড় সোজা করে সামনে তাকায়।
আবরার গভীর মনোযোগে ড্রাইভ করছে।
লোকটার সব কিছুই আকর্ষণীয়। একবার তাকালে দ্বিতীয় বার তাকাতে ইচ্ছে করবেই।
সেইই ছোট্ট বেলায় আদ্রিতা ক্রাশ খেয়েছিলো। অল্পস্বল্প ভালোও বেসেছিলো। সেই ভালেবাসার একটুখানি রেশ এখনো রয়ে গিয়েছে৷ কিশোরী বয়সের প্রথম আবেগ হৃদয়ের কোনো এক ছোট্ট কুটিরে অতি যত্নে তুলে রাখা।
তবে আসিফ আদনানও রয়েছে কোথাও একটায়। সেই বেচারাই তো এ্যানিকে দিয়েছিলো। তার সাথে দেখা না হলে এতো সুন্দর বাচ্চা আদ্রিতা কোথায় পেতো?
কেই না তাকে এতো ভালোবাসায় জড়াতো?
ভাবতে ভাবতেই এ্যানিকে কোলে তুলে নেয়। ঠোঁট ডুবিয়ে টপাটপ কয়েকটা চুমু খায়। বুকের সঙ্গে মিশিয়ে কলামনা করে বলে
” আমার সোনা পাখি
তোমাকে মাম্মাম এতো গুলো ভালোবাসে।।
বিরক্ত হলো বোধহয় আবরার। চোখ মুখ কেমন কুঁচকে ফেললো। গাড়ির স্পিডও বাড়িয়ে দিলো।
এয়ারপোর্ট থেকে বাসার দুরত্ব খুব বেশি নয়। যার ফলে অতি দ্রুতই ওরা চলে আসে। গাড়ি থামতেই অহনা নেমে পড়ে। ফোন দেখতে দেখতে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে যায়। তখুনি সিয়ামের সঙ্গে ধাক্কা লাগে।
সামান্য ধাক্কা। কাঁধ ছুঁয়ে যায়।
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে “আসতাগফিরুল্লাহহহ, নাউজুবিল্লাহ” বলে ওঠে।
অহনা ভ্রু কুচকে তাকায় সিয়ামের মুখ পানে।
“হোয়াট ডু ইউ মিন?
সিয়াম কবিতার সুরে বলে ওঠে
” ওহে রমনী তুমি কে?
কেনো এসেছো এখানে?
আমি সিয়াম ভালো মানুষ
খাবো না ক্রাশ জীবনেও
অহনা কবিতার ভাষা বুঝলো না। তবে বিরক্ত হলো বেশ। বেশি কথা বলা মানুষ তার পছন্দ নয়। অহনার মনে হলো ছেলেটা বোধহয় এই বাড়ির কাজের মানুষ। তাই আদেশের স্বরে বলে
“গাড়িতে আমার লাগেজ আছে নিয়ে এসো।
সিয়াম অবাক হয়ে বলে
” আমি কেনো আনবো?
“তুমি এই বাড়ির মেইড তাই।
” এই মেয়ে এই
এটা আমার বাড়ি। কোনো মেইড ফেইড নই আমি।
অহনা বিশ্বাস করলে কি না বোঝা গেলো না। তবে জবাব না দিয়ে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে। সিয়াম মুখ বাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে
“এই মেয়ের কপালে জামাই জুটবে না৷ মুখে নয় মধু দেখতে আস্ত একটা কদু।
তারপর থেকে কেটে যায় কিছু দিন। আদ্রিতার দিন গুলো ভালোই কাটছে। বড়মা বিভিন্ন রকমের রান্না শেখাচ্ছে তাকে। সেই সঙ্গে নিজের ফোন খানা পুরোপুরি আদ্রিতাকে দিয়ে দিয়েছে। এ্যানিটাও যেনো স্বাধীন। গোটা বাড়ি চক্কর কেটে ঘুরে বেড়ায়। তাকে থামানোর মতো বা বাঁধা দেওয়ার মতো কেউ নেই।
এই বাড়িটা ভীষণ সুন্দর। বেবি পিংক কালার, দুই তালা, ছাদে সুইমিং পুল রয়েছে। আর বিভিন্ন নাম না জানা ফুলগাছ। সকালবেলা ভীষণ সুন্দর একটা সুঘ্রাণে গোটা ছাদ ম ম করে। আদ্রিতা এক মগ কফি নিয়ে সুইমিংপুলে পা ডুবিয়ে সকালের সৌন্দর্য উপভোগ করে। তাকে সঙ্গ দেয় ছোট্ট এ্যানি। মানতেই হবে বাংলাদেশের থেকে সুইজারল্যান্ড অনেক অনেক গুণ বেশি সুন্দর। এই যে এই ছাদ থেকে দূরের পাহাড় দেখা যাচ্ছে। না না বাংলাদেশের মতো সবুজ রঙের পাহাড় নয়। তবে মন ভালো করার মতো সুন্দর। ছাদের ওপর পাশ থেকে দেখা যায় জুরিখ নদী। টলটলে পানির নিচে চকমকা পাথরগুলো দেখতে বেশ আকর্ষনীয়। আদ্রিতার ইচ্ছে করে এই টলটলা পানিতে পা ভেজাতে। এই পাথর থেকে ওই পাথরে ছুটে বেড়াতে।
সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছে আদ্রিতা। থেকে যাবে সুইজারল্যান্ড।
আসিফ আদনান বা কেউ একজনকে বিয়ে করে সুইজারল্যান্ড সেটেল হয়ে যাবে। এখানেই সংসার করবে। মাঝেমধ্যে কিছু দিনের জন্য বাংলাদেশ বেড়াতে যাবে।
ভাবতে ভাবতেই কফির মগে চুমুক বসায় আদ্রিতা।
আবরার তাসনিন বাড়িতে নেই আজকে পাঁচ দিন হলো। তার বন্ধুরাও মিসিং। তবে প্রতিদিন গভীর রাতে সিয়াম ভাইয়া বাড়িতে আসে।
আবার ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে চলে যায়। বেচারার মুখখানা দেখলেই বোঝা যায় কাজের চাপে আছে।
তবে যাই হোক আদ্রিতা খুশি। ভীষণ খুশি। ওই পাষাণ বাড়ি না থাকলে বাড়ির পরিবেশটাই পাল্টে যায়।
এ্যানিটা ফুল গাছের টবের নিচে পড়ে থাকা একটা ফুল নিজের মুখে করে নিয়ে আসে আদ্রিতার কাছে। ফুলটা ওর কোলের ওপর নামিয়ে মিউ মিউ আওয়াজ তুলে।
ছোট্ট ছানার মনের কথা ঠিকই বুঝতে পারলো আদ্রিতা। তাইতো কফির মগ নামিয়ে ফুলটা এ্যানির কানের পেছনে গুঁজে দেয়।
তারপর প্রশংসার বুলি আওড়ায়
“মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ আমার বাচ্চাটাকে অনেককক সুন্দর লাগছে৷ ঠিক একটা ছোট্ট পরি।
এ্যানি যেনো লজ্জা পেলো। সে দৌড়ে আবার যথাস্থানে চলে যায়। আদ্রিতা হেসে পাহাড়ের পানে তাকাতে যেতেই অনুভব করে ছাদে কেউ প্রবেশ করলো। ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পায় অহনা আসছে।।
তার হাতেও কফির মগ।
আদ্রিতা একটুও খুশি হলো না। তারপরও ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলে
” আরেহহ আপু যে
এসো বসো
অহনা সত্যি সত্যিই আদ্রিতার পাশে এসে বসে।
কফির মগে চুমুক দিয়ে বলে ওঠে
“পাহাড়?
বিউটিফুল
“চলো না আপু আমরা পাহাড়কে কাছ থেকে দেখে আসি।
বা ওইদিকে দেখো জুরিখ নদী দেখা যাচ্ছে।
না হয় সেখান থেকে ঘুরে আসি। যাবে?
অহনা কিছুটা সময় নিয়ে কি যেনো ভাবলো। তারপর কপাল কুঁচকে বলে
” হুমম যাওয়া যায়।
আদ্রিতা খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। হাত থেকে কফির মগটা পড়ে যায় সুইমিং পুলে। একটুখানি পানি এসে লাগে অহনার গালে।
“সত্যি যাবে?
কখন যাবো?
এখনই? আমি কি রেডি হতে যাবো?
“এত হাইপার হচ্ছো কেনো?
বললাম তো যাবো। এখনই যাবো এটা বলিনি।
বিকেলে যাব রেডি থেকো।
কথাগুলো তেঁতো তেতো হলেও আদ্রিতার মনটা খুশি হয়ে যায়। সে মনে মনে নাগিন ডান্স দিচ্ছে। আহা কাছ থেকে জুরিখ নদী দেখবে। আর কি লাগে?
ভাবতে ভাবতেই সুইমিং পুলে নেমে পড়ে।।প্রথমে মগ তুলে ওপরে রাখে।
তারপর ওড়না খানা অহনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ডুব দেয়। এক ডুবে অন্য পাশে চলে যায়। সেখানে গিয়ে অহনাকে বলে
” আপু তুমি কাউন্ট করো। দেখো আমি কতক্ষণ ডুবে থাকতে পারি।
অহনা দ্বীমত করে না৷ গুনতে থাকে। পাক্কা ১০০ পর্যন্ত কাউন্ট করার পরে আদ্রিতা মাথা তোলে। রীতিমতো হাপাচ্ছে।
অহনার হাসি পায়। হাসি চেপে বলে
“দ্যাটস গুড
তুমি এক মিনিটের বেশি সময় ডুবে থাকতে পারো।
আদ্রিতাও খুশি হলো। কিছু মুহুর্ত লাফালাফিও করে নেয়। অহনার কফি শেষ। তাই সে দুটো কফির মগই হাতে নিয়ে চলে যায় বাড়ির ভেতরে।
আর আদ্রিতা সাঁতার কাটতে থাকে।
সূর্যি মামা মাথার উপরে চলে এসেছে। রোদের তাপ খুব বেশি নেই। তারপরও জানান দিচ্ছে যে ” অনেক বেলা হয়েছে”
“এখানে কি করছো তুমি?
হঠাৎ করে গোমরা মুখো পুরুষালী কন্ঠস্বর শুনতে পেয়ে চমকায় আদ্রিতা। পেছনে থাকা চুল গুলো তাড়াহুড়ো করে সামনে এনে পেছন ঘুরে তাকায়।
দেখতে পায় আবরার তাসনিন দাঁড়িয়ে আছে। সবেই বাসায় ফিরলো বোধহয়।
ফর্মাল ড্রেসআপে একটু বেশিই সুন্দর লাগছে লোকটিকে। যেনো নজর ফেরানো দায়। আদ্রিতা পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কিছু মুহুর্ত।
আবরারও তাকিয়ে আছে ভ্রু বাঁকিয়ে।
সাদা রংয়ের শার্ট খানায় ট্রাই বেঁধেছে। দুই হাতা গুটিয়ে কনুই ওবদি ওঠানো। বাম হাতের কব্জিতে ঝুলছে কালো রংয়ের ঘড়ি। কালো প্যান্ট, কালো শু।
সব মিলিয়ে মাশাআল্লাহ।
” শুনুন লাট সাহেব
এমন হিরো হিরো লুক নিয়ে আদ্রিতা চৌধুরীর সামনে গিয়ে ঘুর ঘুর করবেন না।
আমি মোটেও আপনার ওপর ক্রাশ খাবো না। ভালোবাসা তো দূরের কথা।
আবরার ঠোঁট বাঁকায়। ট্রাই খুলতে খুলতে আদ্রিতার ওড়না খানা আদ্রিতার দিকেই ছুড়ে মারে।
“ক্রাশ খেতে হবে না।
অন্য কিছু খেলেই চলবে।
চলবে
Share On:
TAGS: তানিশা সুলতানা, তোমাতেই আসক্ত সিজন ২
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৬
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫২
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৯
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১০
-
তোমাতেই আসক্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৫(৫.১+৫.২)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৭