অবাধ্য_হৃৎস্পন্দন (৫১)
সোফিয়া_সাফা
ফুল আর অনিলা কথা বলতে বলতে গার্ডেনে এসে দাঁড়াল। এই বাড়ির গার্ডেনে কোনো ফুল বা ফলের গাছগাছালি না থাকলেও নাম না জানা সৌন্দর্য বর্ধক গাছে ভরপুর। তারা হাঁটতে হাঁটতে একটা বেঞ্চে এসে বসল।
“সোহম স্যার হঠাৎ কেন বিয়ে করতে চাইছে অনিলা আপু?” ফুলের প্রশ্নে অনিলা বলল, “আমি অবাক হচ্ছিনা, ওদের পার্সোনালিটিই অদ্ভুত।”
ফুল একটু ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল উর্বী ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে। সে ফিসফিস করে বলল, “উর্বী আপু হয়তো বিয়েটা করতে চাইছে না।”
“চাক বা না চাক, ওকে বিয়েটা করতেই হবে।”
“কেন জোর করবে? তাকে রেখে আসলেই তো পারে।”
“ওরা একবার যা করবে বলে ঠিক করে তাই করে ছাড়ে।”
ফুল একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করল, “আসলেই কি তারা চায়না উর্বী আপুকে বাইরে যেতে দিতে? এটাই কি কারণ?”
“না ফুল, তেমন কেন হবে? সোহম হয়তো সত্যিই পছন্দ করে ফেলেছে ওকে। তাছাড়া তুমি দেখলেই তো নাদিয়া আর রুমাকেও যেতে দেওয়া হয়েছে।”
“কিন্তু এভাবে জোর করে বিয়ে করাটা কেমন দেখায়?”
“ওরা তো এভাবেই বিয়ে করে, তুমিই কি বলতে পারবে তোমাকে তেহ জোর করেনি।”
ফুল অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। নখ খুঁটতে খুঁটতে বলল, “জোর করেনি তবে বাধ্য অবশ্যই করেছিল।”
“বাধ্য করা না গেলে জোর করেই করতো।”
ততক্ষণে উর্বী এসে আনমনে ফুলের পাশে বসল। ফুল তার দিকে ফিরে নরম গলায় প্রশ্ন করল, “আমি কিছুই বুঝতে পারছি না উর্বী আপু। কী করবে তুমি এখন?”
উর্বী গভীর চিন্তায় নিমগ্ন ছিল। বারবার সোহমের বলা কথাগুলো কানে বাজছে তার। সেই কথাগুলো যেগুলো সে সবসময় শুনতে চেয়েছিল কারো মুখ থেকে। আজ সেই কথাগুলোই এমন একজন বলেছে যাকে সে ঠিকমতো চেনেই না।
উর্বী আনমনা হয়েই জিজ্ঞেস করল, “অনিলা, সোহমের ব্যাপারে বিস্তারিত বলতে পারবে?”
অনিলা মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ, কেন নয়? সোহম T.K গ্রুপের ডিরেক্টর অব লজিস্টিকস পদে…”
উর্বী তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “আমি ওর পারসোনাল লাইফ সম্পর্কে জানতে চেয়েছি। যেমন ওর ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড, ওর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।”
অনিলা একটু দমে গেল, “আমি যেখানে অনির ফ্যামিলি সম্পর্কেই কিছু জানিনা সেখানে সোহমের টা জানবো কী করে?”
ফুল বড় বড় চোখে তাকাল, “কীহ! অনি স্যার তোমাকে নিজের ফ্যামিলি ব্যাপারে কিছু বলেও নি?”
অনিলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে মিনমিনিয়ে বলল, “আসলে আমি কখনও ওভাবে জানতে চাইনি। যাক বাদ দাও, সোহম ছেলে হিসেবে ভালো। আমি যতদূর জানি ওর কোনো কালেই কোনো গার্লফ্রেন্ড ছিল না।”
উর্বী গোপনে শ্বাস ফেলল। কেন যেন সব চোখের সামনে পরিষ্কার লাগলেও মন সেটা বিশ্বাস করতে চাইছে না। হয়তো অপরাধ জগত নিয়ে অত্যাধিক ঘাটাঘাটি করার কারণেই তার মাইন্ড শুধু অপরাধেরই গন্ধ পাচ্ছে। সে ভাবতে ভাবতেই বলল, “আমি সব বুঝতে পারলেও তোমাদের দুজনকে আটকে রাখার কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। বিয়ের পর আমাকেও আটকে রাখা হবে। এটা মানতে পারছি না।”
অনিলা ফোঁস করে একটা শ্বাস ছাড়ল, “একেবারে আটকে রাখেনা তো। যেখানে যেতে চাই সেখানেই নিয়ে যায়, শুধু একা কোথাও যেতে দেয়না। আর আমাকে তো বাবা-মায়ের কাছেও যেতে দেয়না।”
“সেটাই তো, কেন যেতে দেয় না?”
ফুল এবার মুখ খুলল, “আমাকে কিন্তু যেতে দিয়েছে। মায়ের জন্য বাড়তি দুদিন থাকতেও রাজি হয়ে গিয়েছিল। সোহম স্যার কী করে জানিনা।”
অনিলা সায় জানাল, “হুম ওরা একে অপরের থেকে বেশ আলাদা। তুমি একবার এই ব্যাপারে সোহমের সাথে কথা বলে দেখতে পারো।”
উর্বী উদাস চোখে আকাশের দিকে তাকাল। ফুল নিচু স্বরে জানতে চাইল, “তুমি কি বিয়েটা করবে, উর্বী আপু?”
উর্বী শুকনো গলায় বলল, “না করার অপশন আছে?”
অনিলা হাসল, “মানতেই হবে তুমি খুব বুদ্ধিমতী। আমি তোমার জায়গায় হলে অপশন নেই জেনেও কান্নাকাটি করে পুরো এস্টেট মাথায় তুলতাম।”
↓↑
তিনদিন পর,
সানরুমে বসে সানসেট এর দৃশ্য উপভোগ করছে সবাই। গোধূলির ম্লান আলোয় চারপাশটা অপার্থিব দেখাচ্ছে। নীরবতা ভেঙে অনি জিজ্ঞেস করল, “রিদম তুই সবাইকে ইনভাইট করা শুরু করে দিয়েছিস তো?”
রিদম অস্তমিত সূর্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে ছোট করে বলল, “হুম!”
অনি সিরিয়াস গলায় বলল, “আচ্ছা শোন না, এই বিয়ে উপলক্ষে গোল্ডেন প্রোজেক্টের লাস্ট স্টেপ অফিসিয়ালি সিল করে ফেললে কেমন হয়?”
“নট আ ব্যাড আইডিয়া। তেহ কী বলিস?”
উদ্যান হয়তো ফোনে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিল। রিদমের প্রশ্নে সে মুখে থাকা ললিপপটা গালের একপাশে সরিয়ে রেখে বলল, “যা ভালো মনে করিস, তা-ই কর।”
সবাই বেশ অবাক হয়ে উদ্যানের দিকে তাকাল। কাজের কথায় সে সাধারণত এত উদাসীন থাকে না। সোহম বলল, “তোর কিছুই বলার নেই?”
ফোনের স্ক্রিনের ওপর চলতে থাকা উদ্যানের আঙুল থেমে গেল। রিদমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করল, “বেসোরেক্সিয়া, সম্পর্কে তোর মতামত কী?”
উপস্থিত সবার মুখ হাঁ হয়ে গেল। উদ্যান ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “কিছু জিজ্ঞেস করেছি আমি। ফোনে কয়েকটা লক্ষণ লিখে সার্চ দেওয়ার পর রেজাল্ট এলো, ‘it’s the symptom of basorexia.”
রিদম থতমত খেয়ে ঢোক গিলে বলল, “আমি এই নাম জীবনেও শুনি নি। এটা কী খায় নাকি মাথায় দেয়?”
বিরক্তিতে উদ্যানের চোয়াল ফুটে উঠল। রিদম পরিস্থিতি সামলাতে দ্রুত বলল, “ওহহো সিনটম মানে তোর সাথে অদ্ভুত কিছু হচ্ছে তাইতো? এক কাজ কর, সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস কর। সেই তোর প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে পারবে।”
পরামর্শ টা উদ্যানের মনপুত হলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে গেল। তার প্রস্থানের পরপরই বাকিরা একে অপরের দিকে প্রশ্নবিদ্ধ চোখে তাকাল। লুহান কপাল মুছে বলল, “আজই হয়তো সাইকিয়াট্রিস্টের শেষ দিন হবে। বেচারা যে জীবনের কোন কুক্ষণে সাইকিয়াট্রিস্ট হওয়ার ডিসিশন নিয়েছিল কে জানে। তার ওপর আবার দেশের সেরা সাইকিয়াট্রিস্ট। হাহ! বেচারার লাইফ হেল করে দিল তেহ।”
সোহম তৎক্ষনাৎ টেবিল থেকে ফোন তুলে ‘What the hell is basorexia?’ সার্চ দিল। সার্চের রেজাল্ট দেখে ছানাবড়া হয়ে গেল প্রত্যেকের চোখ। ওরা থম মেরে বসে রইল কতক্ষণ। মেলো হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, তারপর হয়তো কোনো এক্সকিউজ দিতে যাচ্ছিল কিন্তু কিছু বলে উঠল পারল না। শুধু চোখ বন্ধ করে লম্বা শ্বাস নিয়ে সানরুম ত্যাগ করল। লুহান তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে গরম নিশ্বাস ছাড়ল।
অনি কপাল চুলকাতে চুলকাতে মন্তব্য করল, “তেহুর অবস্থা হয়তো গুরুতর, নইলে কাজের কথার মধ্যে এই বিষয়টা টানতো না।”
সোহম বলল, “হ্যাঁ, এর আগে কখনো ওকে এতটা অন্যমনস্ক দেখিনি। কাজের ক্ষেত্রে তো একদমই না।”
লুহান চিন্তিত মুখে প্রশ্ন করল, “ফুলের সাথে ওর সম্পর্ক কি স্বাভাবিক নেই?”
রিদম ডানে-বামে মাথা নাড়ল, “স্বাভাবিক থাকলে ও নিশ্চয়ই এই বিষয়টা নিয়ে ভাবতো না?”
অনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, “আমাদের কি কিছু করা উচিত নয়?”
“ওকে ক্লাবে নিয়ে গেলে কেমন হয়?” সোহমের প্রস্তাবে লুহান ভীষণ বেসুরো গলায় বলল, “বউ থাকতে ক্লাবে নিয়ে যেতে বলছিস? এখন আমার সন্দেহ হচ্ছে তুই বউয়ের প্রতি আদৌ লয়্যাল থাকবি তো?”
রিদম বিশ্লেষণী চোখে তাকাল। সোহম ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, “আরে ধুর! আমি তেহকে নিয়ে একটু বেশিই ভাবি কিনা, তাই মুখ ফসকে বলে ফেলেছি, ভুলেই গিয়েছিলাম ওর এখন বউ আছে। আর আমাদের একটা ধারাও আছে, বিয়ে করলে অবশ্যই বউয়ের প্রতি লয়্যাল থাকতে হবে। অনিকেই দেখ, বিয়ের আগে যা খুশি তা করলেও বিয়ের পর কিন্তু গুড বয় হয়ে গেছে।”
অনি মাথা নাড়ল, “তা ঠিক বলেছিস, কিন্তু তোর কি মনে হচ্ছেনা যে তেহুর বেলায় সেটা উল্টে গেছে? তেহ আগে কখনোই এসব নিয়ে কথা বলেনি, এখন বলছে।”
রিদম বলল, “ওসব কিছুই না, বোকাফুল ওকে হয়তো কাছেই ঘেঁষতে দিচ্ছে না। আর ও নিজে থেকেও যাচ্ছে না। ওদের মাঝে হয়তো মনমালিন্য হয়েছে।”
সোহম বলল, “হতে পারে।”
লুহান বলল, “উই নিড টু ডু সামথিং! নইলে মনস্টারের মাথা খারাপ হয়ে যাবে। আর সেই দুর্যোগ পোহাতে হবে আমাদেরকে।”
অনি বলল, “কিন্তু কী করবো? তেহ নিশ্চয়ই জোর করে কিছু করতে চাইছে না। যদি করতেই চাইতো তাহলে ফুলবানুর নিষেধ মানতো নাকি?”
লুহান বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “সেই প্ল্যান টাই এখন কাজে দেবে যেই প্ল্যান টা বান্দরবানে ট্যুরে থাকাকালীন আমার মাথায় এসেছিল।”
সবাই আগ্রহ দেখিয়ে একসাথে বলল, “কী প্ল্যান? জলদি বল।”
লুহান আশেপাশে একবার সতর্ক চোখে তাকিয়ে টেবিলের ওপর মাথা ঝুঁকাল। তার দেখাদেখি বাকিরাও তেমনটা করল। তারপর লুহান সবাইকে তার প্ল্যানটা বুঝিয়ে বলল।
↓↑
ঘড়ির কাটায় রাত এখন নয়টা। সুনশান রাস্তার পাশে থাকা ফুটপাতের এক বেঞ্চের ওপর বসে আছে আবেশ। এ যেন আজকালকার নিত্যদিনের অভ্যাস তার। বাড়িতে থাকলে স্বস্তি খুঁজে পায়না সে। তাই বেশিরভাগ সময়টাই বাইরে কাটায়। আবেশ যেখানে বসে ছিল, ঠিক তার পেছনেই একটি ঝিল; চারপাশটা ঘন গাছপালায় ঘেরা। মৃদু মন্দ বাতাস বয়ে যাচ্ছে। এমন এক পরিবেশে আবেশের মনে নাড়া দিয়ে উঠল পুরোনো আবেগ। সে আনমনেই গিটারের তারে আঙুল রাখল। চোখ বুজে গুনগুন করে গাইতে শুরু করল:
সামহাল কে রাখা ও ফুল মেরা তু
মেরি শায়েরি মে জারুর রাহা তু
জো আখোঁ মে পেয়ারি সি দুনিয়া বাসায়ি
ও দুনিয়া ভি থা তু… ও লামহা ভি থা তু
হা লাগতে হ্যায় মুঝকো, ইয়ে কিসসে সাতানে
দেতা না দিল মেরা তুঝকো ভুলানে
আধুরে সে ওয়াদে… আধুরি সি রাতে
আব হিসসে মে দাখিল মেরে বাস ও ইয়াদে
আবেশ মাথা ঝেড়ে আবেগ গুলো সরিয়ে দিতে চাইল। তারপর চোখ মেলে সামনে তাকাতেই একজনকে আবিষ্কার করল। যাকে দেখতে পেল তাকে সে এর আগেও দেখেছে। বলতে গেলে কয়েকদিন ধরেই মেয়েটা তাকে ফলো করছে। কিন্তু এর আগে কখনোই সামনা-সামনি আসেনি। আবেশ তাকে সবসময় দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে।
মেয়েটা আবেশের সামনে এসে নিজের কপালের ওপর ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো কানের পেছনে গোজার বৃথা চেষ্টা করল। বেশ অনেকটা ঝুকে গিয়ে বলল, “এই ছেলে তোমার নাম কী?”
আবেশ ভারী বিরক্ত হলো। পাল্টা প্রশ্ন করল, “কে আপনি? কেন আমাকে স্টক করছেন?”
মেয়েটা মিহি কণ্ঠে বলল, “তোমার ভয়েস অনেক সুন্দর, একটু আগেই সেই ভয়েসে যখন আমার নাম নিলে তখন আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না।”
আবেশের ভ্রুযুগল কুচকে গেল। “আমি কখন আপনার নাম নিলাম?”
“নিয়েছো, মনে করে দেখো।”
আবেশ শুকনো ঢোক গিলল, “আপনার নাম ফুল?”
মেয়েটা মাথা নাড়ল, “না, আমার নাম লামহা। তুমি যার জন্য গান গাইছো তার নাম বুঝি ফুল?”
আবেশ এবার রেগে গেল, “দ্যাটস নান অফ ইওর বিজনেস! আপনি কেন আমাকে স্টক করছেন, সেটা বলুন?”
লামহা সোজা হয়ে দাঁড়াল। “কই, স্টক করছি নাতো।”
আবেশ নিজেও উঠে দাঁড়াল, “স্টক না করলে প্রতিদিন খুঁজে পান কীভাবে? আমি তো একজায়গায় থাকিনা।”
“সেম টু ইউ! আমিও একজায়গায় থাকিনা। সেই জন্যই হয়তো খুঁজে পেয়ে যাই। বাই দ্য ওয়ে, তোমার নামটা কিন্তু বললে না।”
আবেশ বলার প্রয়োজন বোধ করল না। গম্ভীর গলায় বলল, “নাম জেনে কী করবেন?”
লামহা দুষ্টুমির ছলে বলল, “ভয় নেই, জাদুটোনা করব না। চাইলে বলতেই পারো।”
আবেশ বিড়বিড় করে বলল, “চাইছি না।”
বলেই বাড়ির পথে হাঁটা ধরল আবেশ। তক্ষুণি পেছন থেকে লামহা ডেকে উঠল, “ওই তাজরিদ, আইডিয়া টা কিন্তু ভালো। বলতে না চাইলেও নামটা দেখিয়ে দিয়েছো আমায়। থ্যাঙ্কিউ!”
আবেশ চোখ বন্ধ করে নিজেকে সংযত করল। পেছনে ঘুরে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমার নাম জানলেন কীভাবে?”
লামহা না হেসে পারল না। “পেছনে লিখে রেখে বলছো কীভাবে জানলাম? হাউ কিউট! আই অলরেডি ফাইন্ড ইউ কিউট, তাজ।”
আবেশ পরনের জার্সিটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে নিজেকেই গালি দিল। পরার সময় খেয়াল করে পরেনি সে। যা হাতের সামনে পেয়েছে তাই পরেছে। তবুও সে লামহার দিকে আর ফিরে তাকাল না। দ্রুত পদক্ষেপে বাড়ির পথ ধরে হাঁটা ধরল।
↓↑
রাত দশটা। ফুলের রুমে বসে বসে উনো খেলছে অনিলা, ফুল আর উর্বী। ফুলের হাতে আর মাত্র দুটো কার্ড বাকি ছিল।
“ইয়েহ, উনো।” বলেই ফুল হলুদ কার্ড চেলে দিল।
তখনই পাশে বসা উর্বী একই রঙের টু প্লাস কার্ড চালল। অনিলাও সুযোগ বুঝে ওয়াইল্ড ফোর প্লাস কার্ড টেবিলে ছুড়ে দিয়ে দাঁত বের করে হাসল। ফুল নাক-মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি আর পারছিনা, একঘন্টা ধরে খেলেই যাচ্ছি। তোমরা আমাকে জিততেই দিচ্ছো না। আর নাতো নিজেরা খেলা শেষ করছো।”
উর্বী হাসতে হাসতে ছয়টা কার্ড ফুলের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “শেষ হচ্ছে নাতো, কী করবো বলো।”
ফুল ধৈর্য ধরে আবারও কার্ডগুলো সাজিয়ে খেলায় মন দিল।
একজন মেইড ট্রে নিয়ে ফুলের রুমের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। ট্রে তে তিন ধরনের পানীয়। পথিমধ্যে লুহান আর সোহমের ডাকে মেইড থেমে গেল। সোহম জিজ্ঞেস করল, “এগুলোর মধ্যে কালারফুলের কোনটা?”
মেইড ঠিক বুঝল না তার কথা। লুহান বুঝিয়ে বলল, “ও জানতে চেয়েছে ফুলের কোনটা।”
মেইড গাঢ় লাল রঙা চেরি জুসের গ্লাসটা উঁচু করে বলল, “এটা, মিস্ট্রেসার জন্য।”
সোহম আচমকা খপ করে গ্লাসটা ধরে ফেলল। মেইড একটু হকচকিয়ে গেলে লুহান বলল, “আমরা পরীক্ষা করে দেখবো এটা পুরোপুরি সেইফ কিনা।”
বলেই অন্যদিকে ঘুরে গেল তারা। লুহান হাতে থাকা একটা প্যাকেট থেকে, ঠিক এক চিমটি পরিমাণের সাদা রঙের পাউডার গ্লাসের মধ্যে ঢালল। তারপর ট্রে থেকে চামচ তুলে নিয়ে ভালো করে নেড়েচেড়ে মিলিয়ে দিল।
খেলা প্রায় শেষের দিকে। দেখে মনে হচ্ছে অনিলা জিততে চলেছে। এরইমধ্যে মেইড তাদের জন্য আনা জুস রেখে চলে গেছে। ফুল ঠোঁট উল্টে ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়েও চাল দিচ্ছে। দেখতে দেখতে অনিলা শেষমেশ জিতেই গেল।
“ইয়াহু, জিতে গেছি!” ধুমতানা স্টাইলে নেচে উঠল অনিলা। ফুল আর উর্বী তার সেই নাচ উপেক্ষা করে নিজ নিজ গ্লাস হাতে তুলে নিল। যেন নিজেদের হেরে যাওয়া সম্পর্কে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তাদের।
“কী হলো? তোমরা দুজন হাসছো না কেন?”
একনিশ্বাসে সবটুকু জুস খেয়ে নিয়ে ওড়নায় মুখ মুছে নিল ফুল। ঢেকুর তুলে বলল, “হেরে গিয়ে কে হাসে অনিলা আপু? হয়তো কোনো পাগলই হাসবে।”
অনিলা সামান্য রাগ দেখিয়ে বলল, “ঠিক আছে হাসতে হবেনা। আমি একাই হেসে নিচ্ছি হাহাহা… অবশেষে আমিও আজ তোমাদের দুজনকে হারিয়েই দিলাম। আমার কোনো জবাবই নেই। বাহ! বাহ! কী ভালো খেললাম আজ।”
উর্বী অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে স্বাভাবিক দেখাতে পারল না। মুখ ছোট করে জুস খেতে লাগল। তখনই দরজায় এসে দাঁড়াল অনি। ঘর কাঁপিয়ে ডাকল, “অনিলা… এই অনিলা।”
অনির ডাকে অনিলা ধড়ফড়িয়ে উঠে দরজার দিকে দৌড়ে গেল। অনি মুচকি হেসে বলল, “কিছু কথা ছিল, যাবে আমার সঙ্গে?”
অনিলার কপালে ভাঁজ পড়ল, “মজা করছো? তখনও বললে কিছু বলার আছে অথচ কিছুই বললে না। আবার এখনো একই কথা?”
অনি দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে দাঁড়াল, “তখন আমি চোখে চোখে অনেক কথা বলেছিলাম কিন্তু তুমি বুঝতে পারো নি। এতে আমার দোষ কোথায়?”
“উইয়ার্ড কথা বলবে না অনি। সিরিয়াসলি বলো, কি বলবে। আমার বাবা-মায়ের ব্যাপারে কিছু নয়তো? ওনারা ভালো আছে তো?”
অনিলাকে বিচলিত হয়ে পড়তে দেখে অনি সোজা হয়ে দাঁড়াল, “তারা একদম ফিট অ্যান্ড ফাইন আছে। চিন্তা কোরো না, আমি শুধু তোমার সাথে সময় কাটাতে চাইছি ব্যস এটুকুই। কথা বলতে চাওয়াটা স্রেফ বাহানা মাত্র। আসবে প্লিজ?”
অনিলা দ্বিরুক্তি না করে অনির পিছু নিল। তারা যাওয়ার পরপরই সোহম এলো দরজার কাছে। উর্বী আর ফুল টুকটাক কথা বলছিল। তখনই ভেসে এলো,
“উর্বী… একটু এদিকে এসো তো।” সোহমের ডাকে এবার উর্বীর পিছু পিছু ফুলও এলো।
“হ্যাঁ বলুন?”
সোহম ভদ্র ভাবে বলল, “হাতে গোনা কয়েকদিন পর আমাদের বিয়ে, ভাবলাম একটু কথাবার্তা বললে মন্দ হয়না। তুমি যদি চাও তাহলে আমরা একটু কথা বলতাম।”
উর্বী রাজি হয়ে গেল। এমনিতেও সোহমের ব্যাপারে তার অনেক কিছু জানার আছে। এই ফাঁকে জানার চেষ্টা করা যাবে।
ঘর খালি হতেই ফুল দরজা আটকে বিছানার দিকে পা বাড়াল। হঠাৎই কেমন যেন মাথা ঘুরে গেল তার। মনে হলো, পুরো দুনিয়াটাই দুলছে। টালমাটাল পায়ে খাটের কাছাকাছি এসে ধপাস করে শুয়ে পড়ল ফুল।
অনিলাকে নিয়ে অনি টেরেসে এসে দাঁড়াল। রাতের শান্ত বাতাস বইছে। অনি নিজে থেকে কিছু বলবে না বুঝতে পেরে আজ অনিলাই প্রশ্ন করল, “তোমার বাবা-মা কোথায় অনি?”
এমন অনাকাঙ্ক্ষিত প্রশ্নে অনি বিড়ম্বনায় পড়ে গেল। তার চেয়েও বেশি অবাক হলো অনিলাকে তার ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখে। তবুও ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল, “নেই…”
অনিলার বুকটা যেন কেঁপে উঠল। শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল, “নেই… মানে?”
“মানে হলো আমি তাদের দেখিনি কখনো।”
“এভাবে কীভাবে?”
“আমি জন্ম নিয়েছি কীভাবে সেটাই ভাবছো নিশ্চয়ই? সত্যি বলতে আমিও জানিনা, আমার পরিচয় জানিনা আমি। অবৈধ না বৈধ সন্তান তাও জানা নেই। শুধু মনে আছে খুব ছোট থাকতে অনেকগুলো ছেলেমেয়ের সাথে আমাকে মেক্সিকো পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমি একটু বেশিই আবেগপ্রবণ ছিলাম বলে সবাই ঠাট্টা করে আমায় অনিয়ন বলে ডাকতো। আর সেখান থেকেই একসময় আমার নাম হয়ে যায় অনি।”
অনিলা আর কিছু জিজ্ঞেস করতে পারল না। এটুকুই তাকে বাকরুদ্ধ করে দিয়েছে।
অনি এবার ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন জানতে চাইলে অনিলা?”
ঝাপসা চোখে আকাশের পানে তাকিয়ে অনিলা সংক্ষেপে বলল, “এমনিতেই।”
“জানতে চেয়োনা কখনো, এমন আরও কিছু আছে যা তুমি সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু তুমি জানতে চাইলে আমি এড়িয়ে যেতেও পারব না।”
অনিলা কিছু বলতে পারল না। অনিও তার নিরবতাতেই স্বস্তি খুঁজে পেল।
থিয়েটারের পাশে থাকা গেমিং রুমে থাকা রেসিং আর্কেড মেশিনে বসে গেম খেলছে সোহম। পাশেই চোখে মুখে উপচে পড়া বিরক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে উর্বী। সেকেন্ড বারের মতো জিতে গিয়ে সোহম উৎফুল্ল মেজাজে বলে, “তুমিও একবার খেলে দেখো, অনেক মজা পাবে।”
উর্বী দাঁত চেপে হেসে বলল, “আমার যতদূর মনে পড়ে আমরা কথা বলবো বলে ঠিক করেছিলাম।”
সোহম কথাটা গায়েই মাখল না। উর্বী ক্ষুব্ধ হয়ে চলে আসতে নিল, “থাকুন আপনি, গেলাম আমি।”
সোহম তড়িৎ বেগে তার সামনে এসে দাঁড়াল, “আরে কুল ডাউন। ঠিক আছে চলো, এসব গেমিং টেমিং বাদ, এখন শুধু কথা বলবো।”
উর্বী দুহাতে বুক বেঁধে দাঁড়াল। প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, “আপনার নাম?”
“আরে, তুমি আমার নামই জানো না? আরে আমার নাম সোহম।”
“পুরো নাম?”
“এটাই পুরো নাম।”
উর্বী ক্লান্ত স্বরে বলল, “মানে আগে পড়ে কিছু নেই?”
সোহম বুঝতে পারল কথাটা। তাও বোকার মতো হেসে বলল, “হ্যাঁ আছে তো আগে মিস্টার আছে, আমার নাম মিস্টার সো-হম।”
উর্বী এবার ধৈর্য হারাল। “আমি সারনেমের কথা বলেছি।”
সোহম থতমত খেয়ে গেল। মাথা চুলকাতে চুলকাতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে আমতা-আমতা করতে লাগল। উর্বী বলল, “কী হলো? সারনেম ভুলে গেছেন?”
সোহম পরপরই মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ…হ্যাঁ ভুলে গেছি।”
“ওকে। আপনার বাবার নাম বলুন তবে।”
সোহম এবার জোর করেও হাসতে পারল না। তার চেহারার উজ্জ্বলতা নিমিষেই মিলিয়ে গেল। যেন এক নিমিষেই কোনো ঘোরগ্রস্ত জগতে তলিয়ে গেল সে। অত্যন্ত ভারী গলায় বলল, “শোনো, আমি অন্য কারো পরিচয় দিতে পছন্দ করিনা। তুমি আমার ব্যাপারে যতখুশি প্রশ্ন করো, কিন্তু আমার বাবার ব্যাপারে কোনো কিছু জিজ্ঞেস কোরো না। তার সাথে সম্পর্কিত সবকিছুই ত্যাগ করেছি আমি।”
সোহম এতোক্ষণ উর্বীকে আটকে রাখার চেষ্টা করলেও এবার নিজেই তাকে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। উর্বী হতবিহ্বল হয়ে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। সে তো শুধু বিয়ের আগে সোহম সম্পর্কে একটু জেনে নিতেই চেয়েছিল, তাতেই এমন কেন করলো লোকটা? উর্বীর মন খারাপ হয়ে গেল। সে ধীরপায়ে এগিয়ে গেল আর্কেড মেশিনের দিকে। এটাতে গেম খেলার অভ্যাস আছে তার। এখন সে মন ভালো করার জন্য গেম খেলবে।
দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে সোহম চেপে রাখা শ্বাস ত্যাগ করল। রিদম বলেছিল যে উর্বী গেম খেলতে পছন্দ করে, সেইজন্যই এখানে নিয়ে এসেছিল সে। যাক, উর্বী গেম খেলে সময় কাটিয়ে দেবে। তারপর আর আজকের মতো ফুলের কাছে যাওয়ার সময় পাবে না।
রাত তখন আরও গভীর হয়েছে। লুহান আর রিদম লিভিং রুমে বসে নিচু স্বরে আলাপ করছিল, ঠিক তখনই গটগট শব্দে মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকল উদ্যান। প্রায় তিন ঘণ্টা বাইক ক্রুজিং করে ফিরেছে সে; পরনের জ্যাকেট আর হাতের গ্লাভস খুলতে খুলতে সিঁড়িতে পা রাখতেই রিদম ফোড়ন কাটল, “বোকাফুল খুঁজছিল তোকে।”
উদ্যানের হাঁটার গতিতে কিছুটা ধীরতা এল। দীর্ঘক্ষণ বাইক চালানোর ফলে শরীরটা এখনো উত্তপ্ত। সে থামল না, তবে গম্ভীর গলায় জানতে চাইল, “কেন?”
লুহান পাশ থেকে যোগ করল, “আমরা কারণ জানি না। শুধু বলল, তুই এলে যেন তোকে ওর রুমে পাঠিয়ে দিই। তোর সাথে নাকি বিশেষ দরকার আছে ওর।”
উদ্যান ঘাড় বাকিয়ে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। লুহান ঢোক গিলে বলল, “আমাকে বলতে বলল তাই বলেছি। তোর ইচ্ছা হলে যাবি, না হলে যাবিনা। ওভাবে তাকাচ্ছিস কেন?”
উদ্যান চোখ সরিয়ে বলল, “তুই সিওর ও আমাকে দেখা করতে যেতে বলেছে?”
রিদম এবার তাল মিলিয়ে বেশ প্রত্যয়ের সাথে বলল, “হ্যাঁ আমিও শুনেছি।”
উদ্যান আর একমুহূর্ত দাঁড়াল না। একপ্রকার হন্তদন্ত হয়ে উপরে চলে গেল। সে চোখের আড়াল হতেই রিদম আর লুহান শয়তানি হেসে একে অপরের সাথে হাই-ফাইভ করল। যেন তাদের বড় কোনো প্ল্যান সফলভাবে শুরু হয়েছে।
উদ্যান নিজের রুমের সামনে এসে দাঁড়াল। মনে মনে ঠিক করল, শাওয়ার নিয়ে ফুলের কাছে যাবে। কিন্তু তার মস্তিষ্ক সায় দিল না। তীব্র এক অস্থিরতা তাকে তাড়া করে নিয়ে এল পাশের দরজায়। সে দুপা পিছিয়ে দরজায় লাগোয়া ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সরে আঙুল রাখল। দরজায় ফিংগারপ্রিন্ট সেন্সর আছে এটা অবশ্য ওপর থেকে দেখে বোঝা যায়না।
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে উদ্যান আশেপাশে তাকিয়ে ফুলকে খুঁজল কিন্তু পেল না। হঠাৎ তার কানে ভেসে এল এক ইংলিশ গানের লিরিক্স:
ইটস বিন অ্যাবাউট আ মান্থ অ্যান্ড টোয়েন্টি ডেইজ
অ্যান্ড উইআর গোয়িন ‘রাউন্ড অ্যান্ড ‘রাউন্ড, প্লেয়িং সিলি গেমস…
নাউ ইউআর সেইং, “স্লো ইট ডাউন, নট রাইট নাউ”
দেন ইউ উইঙ্ক অ্যাট মি অ্যান্ড ওয়াক অ্যাওয়ে।
গানটা শুনে উদ্যানের ঘাড় স্বতস্ফূর্তভাবে হেলে পড়ল বামদিকে। শব্দ অনুসরণ করে সে ড্যান্স রুমের দিকে পা বাড়াল।
বাট লেট ইট বি, লেট ইট বি, লেট ইট বি নোন
হোল্ড অন, ডোন্ট গো
টাচিং অ্যান্ড টিজিং মি, টেলিং মি নো
বাট দিস টাইম আই নিড টু ফিল ইউ
ভেতরে এসে যা দেখল তা দেখার জন্য উদ্যান মোটেও প্রস্তুত ছিল না। বিস্ময়ে বড়ো বড়ো হয়ে গেল তার চোখজোড়া।
উইআর অল অ্যালোন
(রাইড ইট) জাস্ট লুজ কন্ট্রোল
(রাইড ইট, রাইড ইট) কাম টাচ মাই সোল
(রাইড ইট, রাইড ইট) লেট মি ফিল ইউ
রুমের একপাশে বসানো পোল ধরে পাগলের মতো নাচছে ফুল। তার প্রতিটা অঙ্গভঙ্গি এতটাই সাবলীল যে, এই মুহূর্তে তাকে কোনো পেশাদার পোল ড্যান্সারের চেয়ে কম লাগছে না।
(রাইড ইট) টার্ন দ্য লাইটস ডাউন লো
(রাইড ইট) ফ্রম হেড টু টো
(রাইড ইট, রাইড ইট) কাম টাচ মাই সোল
(রাইড ইট, রাইড ইট) লেট মি ফিল ইউ
ড্যান্স রুমের নিওন আলোর বিচ্ছুরণে ফুলের ঘামে ভেজা মুখটা আবেদনময়ী দেখাচ্ছে। তার খোলা চুলগুলো তার প্রতিটি মুভমেন্টের সাথে তাল মিলিয়ে দুলে উঠছে। সে পোলটাকে কেন্দ্র করে যখন দ্রুতগতিতে বৃত্তাকারে ঘুরতে শুরু করল, তখন উদ্যানের বুকের ভেতর কিছু একটা চিনচিনিয়ে উঠল। সে আর স্থির থাকতে পারল না, দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই ফুল যেন ভারসাম্য হারিয়ে আছড়ে পড়ল তার ওপর। উদ্যান শক্ত হাতে তাকে পাঁজকোলা করে সামলে নিল।
আচমকা পড়ে যাওয়ায় ফুলের চুলগুলো উদ্যানের মুখ ঢেকে দিয়েছে। সে না পারছে ফুলকে ছেড়ে দিতে না পারছে চুলগুলো হাত দিয়ে সরাতে। নিরুপায় হয়ে ফুলকে ফ্লোরেই বসিয়ে দিল উদ্যান। চুলগুলো সরিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে যাবে অমনি ফুল দুহাতে গলা জড়িয়ে ধরল তার। তাদের দৃষ্টি বিনিময় হতেই উদ্যান থমকে গেল। ফুল ঠোঁটে রহস্যময় হাসি ফুটিয়ে নেশাতুর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আমার কাছে আসেন না কেন, উদ্যান?”
সঙ্গে সঙ্গে উদ্যান ফুলের চুল টেনে ধরল। শাসিয়ে বলল, “তোমাকে বলেছি না, এই নামে ডাকবে না?”
যন্ত্রণায় ফুল গুঙিয়ে উঠল বটে, তবে দমল না। বরং জেদ দেখিয়ে বলল, “একশো বার ডাকবো আমি! উদ্যান… উদ্যান… উদ্যান…।”
আর একবারও ডাকতে পারল না ফুল। তার আগেই উদ্যান তার পাতলা ফিনফিনে ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল। ফুল তাকে বাধা দিল না, বরং আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরল। উদ্যান ফুলের সাড়া পেয়ে উন্মত্তের মতো তাকে চুমু খেতে খেতেই ফ্লোরের সাথে চেপে ধরল।
বেশ অনেকক্ষণ চুমু খাওয়ার পর উদ্যান উঠে বসল। যা ফুলের ভালো লাগল না, সেও উঠে বসে উদ্যানকে আবারও কাছে টানতে লাগল। তার এই অভাবনীয় আচরণে উদ্যান কিছুটা বিস্মিত হলো। বিড়বিড়িয়ে বলল, “কী হয়েছে তোমার?”
ফুল হুট করেই উদ্যানের ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিয়ে বেশ জোরে এক কামড় বসিয়ে দিল। এমন আকস্মিক কাণ্ডে উদ্যান কিছুটা ভড়কে গেলেও ফুল থামল না; সে উদ্যানের শার্ট খামচে ধরে পাগলের মতো একের পর এক কামড় বসাতে লাগল তার ঘাড় আর গলায়। উদ্যান তাকে থামানোর কোনো চেষ্টাই করল না। শুধু শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল, “তুমি যা করছো জেনে-বুঝে করছো তো?”
ফুল ক্লান্ত হয়ে পড়ল। সে উদ্যানের মুখটা নিজের দু-হাতে আগলে ধরে আর্তনাদের মতো মিনতি করে বলল, “আমাকে স্পর্শ করুন, প্লিজ।”
এই একটা কথা উদ্যানের ভেতরে ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা দাবানল মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিল সর্বত্র। সে এক হাতে ফুলের সরু, মসৃণ কোমর পেঁচিয়ে ধরে পুনরায় দস্যুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ফুলের নরম ঠোঁটে। অবাধ্য হাতে শার্টের বোতামগুলো খুলে ছুড়ে ফেলল একপাশে। তার চুমুর রুক্ষতায় ফুলের বন্ধ চোখের কোণ বেয়ে নোনাজল গড়িয়ে পড়তে লাগল। উদ্যান উন্মত্তের মতো ফুলকে স্পর্শ করছে, যেই স্পর্শে আছে দীর্ঘদিনের অবদমিত ক্ষোভ আর তৃষ্ণা। সে অনুভব করল, ফুলের শরীরটা অস্বাভাবিক গতিতে কাঁপছে। কিন্তু সে সেসবের তোয়াক্কা করল না; এলোমেলো স্পর্শে সে ফুলের সর্বাঙ্গে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে লাগল।
দীর্ঘক্ষণ পর সেই আগ্রাসী চুম্বন ভেঙে উদ্যান তাকাল ফুলের দিকে। মেয়েটা চোখ বুজে থরথর করে কাঁপছে। ঠোঁটের কয়েক জায়গায় দাঁতের আঘাতে রক্ত জমেছে। ফুল অকস্মাৎ উদ্যানের উদোম বুকে মাথা নামিয়ে রাখল। ঠিক বুকের বাম পাশে যেখানে হৃৎপিণ্ড থাকে, সেখানে কর্ণপাত করে বিড়বিড়িয়ে বলল, “আপনার হৃৎস্পন্দন এতো স্বাভাবিক কেন? আমারটা দেখুন, কেমন ধুকপুক ধুকপুক করছে।”
বলতে বলতেই ফুল নিজের নাক ডোবাল উদ্যানের বক্ষপিঞ্জরে। মাদকাসক্তের মতো স্বরে বলল, “এতো স্বাভাবিকতা ভালো লাগছে না। বউ কাছে এলে যদি হৃৎস্পন্দন অবাধ্যই না হয়, তবে কেমন হয়ে গেল না ব্যাপারটা?”
উদ্যান মোহাচ্ছন্ন হয়ে ফুলের মাথাটা নিজের বুকের সাথে সজোরে চেপে ধরল। ফুলও কোনো প্রকার সংকোচ ছাড়াই সেখানে নিজের ওষ্ঠাধর ঠেকিয়ে এক গাঢ় চুমু বসাল। উদ্যান যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো; তৎক্ষণাৎ চোখ মেলে তাকাল সে। এক মুহূর্ত দেরি না করে সে ফুলকে সোজা করে বসিয়ে দিল। উষ্ণতা কমে যেতেই ফুল ঠোঁট ফুলিয়ে অস্ফুটস্বরে গুঙিয়ে উঠল।
উদ্যান একমুহূর্ত থেমে পরমুহূর্তেই ফুলের কামিজটা খুলে ফেলতে চাইল। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে টান দিতেই জামাটার কিছু অংশ ছিঁড়ে তার হাতে চলে এল। উদ্যান সেদিকে খেয়াল দেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না; তার সমস্ত ইন্দ্রিয় তখন কেবল ফুলের নেশায় আচ্ছন্ন।
চলবে,,,
শব্দসংখ্যা: ৩৭৫০+
Share On:
TAGS: অবাধ্য হৃৎস্পন্দন, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব (৪০ এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৯
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ১০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৩০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৫০
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৮
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ২৪