প্রণয়ের_রূপকথা (৭৫)
ফের দেওয়ান বাড়িতে বিয়ের আমেজ আসতে চলেছে। দীপ্র-কুহুর বিয়ের আমেজ। যদিও আগে কবুল পড়া হয়েছে, তবু পরিবারের সন্তুষ্টি ও সামাজিক বিষয় গুলো তো থাকেই। তাই একদম পুরো আয়োজন করেই বিয়ে হবে। কুহুর এবার সত্যিই কেমন কেমন লাগছে। ও গোসল সেড়ে এসেছে মাত্র। শীত তখনো চলে যায়নি। কিছুটা বাকি। কুহু বুক ভরে দম নিল। তারপর উঠে এসে বাবার ছবিটা বের করল। তাতে হাত বুলিয়ে বলল,”বাবা, ও বাবা। তুমি জানো, দেখতে পাচ্ছ? তোমার কুহুর বিয়ে হবে বাবা। জানো কার সাথে? এক রাজকুমারের সাথে। সেই রাজকুমার,যাকে তুমি সবথেকে বেশি পছন্দ করতে। যাকে তুমি মনে মনে আমার জন্য চাইতে। আমিও তো চাইতাম বাবা। আমরা দুজনেই চাইতাম। সেই সব সত্যি হয়ে এসেছে বাবা। কিন্তু এই সত্যিটা কেন তুমি দেখে যেতে পারলে না বাবা?”
বলতে বলতে কুহুর গলা ধরে আসে। চোখ দুটোও জলে ভিজে যায়। আজ কাদেরের প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী। ঠিক এক বছর আগে, কুহু প্রথমবার অনুভব করেছিল, এতিম হওয়া সহজ কোনো কথা না। এতিম হওয়াটা, পৃথিবীর সবথেকে কঠিন একটা বিষয়।
“আপু।”
দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করল কণা। কুহু চটজলদি চোখের জল মুছে নিল। তবে ছবিটা লুকাতে পারল না। তার আগেই কণা এসে বসল পাশে। বাবার ছবিটা দেখে ওর মনটা বেশ বিষণ্ন হলো।
“তুই কাঁদছিলি?”
ধরা গলায় শুধাল কণা। কুহু বলল,”না, কাঁদছিলাম না তো।”
“মিথ্যে বলিস না আপু। আমি বুঝতে পারছি।”
বলে কণা বোনের বাহুতে মাথা ঠেকায়। দুই বোনের মাঝে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। সেই দূরত্ব আজ যেন কমে গেল। আদুরে হাতে বোনকে ছুঁয়ে কুহু বলল,”কাঁদছি না আর। ঠিক আছে সব। চিন্তা করিস না তো।”
কণা জবাব দিল না। মিশে রইল বোনের সাথে। খানিক বাদে কুহু বলল,”একটা কথা জানতে চাইব। একদম মিথ্যে বলা যাবে না।”
“কী কথা?”
কণা ধারণা করতে পারেনি, কুহু কি বলবে। ও আদুরে ভাবে মাথা তুলে। কুহু সহসাই গাল ছুঁয়ে বলে,”প্রেম করছিস?”
কণার হৃদয় কেঁপে উঠে। ও দৃষ্টি সরায়। বলে,”না। কি সব বলছিস!”
“বলেছিলাম, মিথ্যে বলা যাবে না।”
“মিথ্যে বলছি না। সত্যিই প্রেম করছি না আপু।”
বলে চোখ ফেরাল ও। কুহু একটু সময় নিয়ে বলল,”তবে? কাউকে পছন্দ করিস?”
এবার মেয়েটার গলা শুকিয়ে এল। মিথ্যেটা গলা দিয়ে উচ্চারিত হলো না আর। কুহু বুঝল বিষয়টা।
“ক্লাসমেট? বা আমাদের জানা শোনা কেউ?”
মেয়েটার হাঁসফাস লাগে। ও এখনই কিছু বলতে পারবে না। এটা জানাজানি হলে সর্বনাশ হবে। ও ফট করেই বোনের হাত তুলে নেয়।
“আপু, আর কিছু বলতে পারব না। তুই এখনই চাপ দিস না। আর কাউকে জানাবিও না প্লিজ।”
কুহু বুঝল কণার সময় প্রয়োজন। মেয়েটিকে আরো কিছু বলার পূর্বেই কণা ফের বলল,”প্লিজ আপু। প্লিজ শোন কথাটা।”
কুহু দমল। আর ঘাটাল না। তবে বলল,”ঠিক আছে। আর কিছু জিজ্ঞেস করছি না। তবে বোন, এমন কিছু যেন না হয় যাতে তোর আপসোস হয়। যাকে পছন্দ করিস, সে ভালো না খারাপ তা আগে যাচাই করে নিবি।”
“নেব।”
বলে সম্মতি জানায় ও। কুহু তাকিয়ে থাকে। ওর মনটা তবু সায় জানায় না। ভয় হয়, ছোট বোনটির কথা ভেবে। বয়সটা যে আবেগের।
এতিমখানায় বাচ্চাদের জন্য খাবার দেয়া হয়েছে। মসজিদ গুলোতেও মিলাদের আয়োজন হয়েছিল। সব মিলিয়ে আজ সারাদিন সকলেই ব্যস্ত ছিল। ব্যস্ততা শেষে একসাথে বসার সুযোগ হয়েছে সন্ধ্যাতে। সবাই বসেছিল বসার ঘরে। দীপ্র তখনই ফোনে কথা বলতে বলতে ঘরে প্রবেশ করল। কথা শেষ হতেই বৃদ্ধা ডাকলেন,”দীপ্র, এদিকে আসো ভাই।”
ও গেল দাদিজানের কাছে। দাদিজান বললেন,”কবে যাচ্ছ ইন্ডিয়ায়?”
“সামনের সপ্তাহেই যাব দাদিজান।”
কুহু সবে চা হাতে ফিরছিল। তখনই কথাটা শুনল। দীপ্র ভাই ইন্ডিয়ায় যাচ্ছে? ও তো কিছুই জানে না! সহসাই ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল। যা নজর এড়াল না দীপ্রর।
এবার কুহুর খুব কান্না পাচ্ছে। খুব মানে খুব। দীপ্র ভাই বাড়ি থাকবেন না। এটা ভাবলেই তো কেমন লাগছে। এমন না মানুষটা সারাদিন ওর চোখের সামনে থাকে। ভালোবাসার কথা বলে। তবে দিনশেষে, কোনো এক ফাঁকে মানুষটাকে চোখে যে দেখতে পায়। এই দেখাটাই কুহুর সমস্ত তৃষ্ণা মিটিয়ে দেয়। ও রাতের খাবার খেতে যায়নি। বলেছে ইচ্ছে করছে না। মাথায় যন্ত্রণা। তাই ঘুমাবে। বিষয়টা যে বানোয়াট তা ধরতে পেরেছে দীপ্র। ও নিজের ঘরে ফিরে ম্যাসেজ লিখল,”খাবার খেতে এলি না কেন?”
ম্যাসেজটি পেয়ে কুহু ঠোঁট কামড়ে ধরল। ওর খুব রাগ হচ্ছে। এখন দরদ দেখাচ্ছে! অথচ ও বাদে প্রায় সকলেই জানত দীপ্র ভাই ইন্ডিয়ায় যাচ্ছে। অথচ ওকে বলেনি! এতটাই তুচ্ছ ও? এতটাই? ও লিখল,”ইচ্ছে হয়নি তাই খাইনি।”
কুহুর এই মান অভিমানের একাধিক কারণ আছে। দীপ্র ভাই আজকাল তাকে সময়ও দিচ্ছে না। কাজ নিয়ে এতই ব্যস্ত সে? তার ওপর সাতদিন গিয়ে থাকবে ও দেশে। কুহুর কাছে সাতদিন মানে সাতদিন নয়। ওর কাছে সাত দিন মানে একশত আটষট্টি ঘন্টা। এটা যে অনেক বড়ো সংখ্যা। কুহুর জবাবের ধরণ বুঝল দীপ্র। ও লিখল,”আচ্ছা।”
শুধু আচ্ছা? এমনিতেই মেয়েটির মনে অভিমানের শেষ নেই। তার ওপর শুধু আচ্ছা শুনে সেই অভিমানের পাল্লা আরো ভারী হলো। কুহু বেশ কিছু ম্যাসেজ লিখেও, ব্যাক স্পেসে ডিলিট করে দিল। অভিমানটা নিজের ভেতর গিলে নিয়ে,ফোনটা বিছানায় ফেলে শুয়ে রইল চোখ মেলে।
দুদিন পরের কথা। কথায় কথায় কেনাকাটার কথা উঠেছে। সামনের মাসেই বিয়ের অনুষ্ঠান। এখন থেকে এগিয়ে না রাখলে তো হয় না। শেষে গিয়ে ঝামেলার তো শেষ থাকে না। তাই জেবা বললেন,”এখন থেকেই একটু একটু করে সব কিনতে হবে। শেষে দেখা যাবে তাড়াহুড়ো লেগেছে। কুহু তুই কী বলিস?”
সবার নজর কুহুর দিকে পড়ল। কুহু মিনমিনে সুরে বলল,”তোমরা যা ভালো মনে করো বড়ো মা।”
“আমরা যা ভালো মনে করি মানে কী? তোর কিছু বলার নেই? আচ্ছা, শাড়ি নিবি না লেহেঙ্গা,তা ভেবেছিস?”
এখানেও কুহুর একই জবাব। তোমরা যা ভালো মনে করো। জেবা তাকালেন ববিতার দিকে। মেয়ের বিয়ের কথায় তার ভালো লাগছে। অনেকদিন পর তার মাঝে প্রকৃত সুখ সুখ অনুভূতি এসেছে। কুঞ্জ, কণা একসাথে বসেছিল। দুই বাচ্চার মাঝেই বেশ উল্লাস, উল্লাস ভাব। কণা তো নেট ঘেটে তখনই কিছু লেহেঙ্গা বের করল। রাত্রিকে দেখাতেই রাত্রি বলল,”এই যা, এগুলো তো সব ইন্ডিয়ান। আমাদের এখানে এগুলো পাওয়া যাবে না। পেলেও অথেনটিক হবে না।”
“কিন্তু এগুলো তো খুব সুন্দর। আপুকে খুব সুন্দর লাগত।”
“হুম, সেটা তো বুঝতে পারছি। তবে….
বলে রাত্রি একটু থামল। খানিকটা দূরে, ল্যাপটপ হাতে কাজ করছে দীপ্র। রাত্রি সহসাই হৈ হৈ করে উঠল।
“দীপ্র ভাই, তুমি তো ইন্ডিয়া যাচ্ছ। কুহুকেও নিয়ে গেলে হয় না? ওখান থেকে কেনাকাটা করে এলে, সেটাই তো ভালো হয় বলো?”
এ কথায় দীপ্র মুখ তুলে চায়। কুহুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়। মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বিরোধ করে বলে,”এই না। আমি কোথাও যাচ্ছি না। আমার লাগবে না কিছু।”
কুহু উঠে চলে যায় তখনই। রাত্রি আর কণা একে অপরকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। কুহুর মন খারাপ দুদিন ধরে। তা খেয়াল হয়েছে। সেই জন্যই কৌশলে দীপ্র ভাইয়ের সাথে যাওয়ার কথাটা তুলল ওরা। অথচ, এ মেয়ে বলছে যাবে না!
চলেন একসাথে বিয়ে খাই। দীপ্র-কুহুর বিয়ে। পরের পর্ব পরশু পাবেন ইনশাআল্লাহ।
চলবে….
কলমে ~ #ফাতেমাতুজনৌশি
Share On:
TAGS: প্রণয়ের রূপকথা, ফাতেমা তুজ নৌশি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪০
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৪৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৭৩
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৬
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ৩৮
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ১৫
-
প্রণয়ের রূপকথা পর্ব ২২