Golpo romantic golpo তোমার সঙ্গে এক জনম

তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৭ (অন্তিম)


তোমার সঙ্গে এক জনম (১৭ – অন্তিম পর্ব)

সানা_শেখ

লামহাদের বাড়ির ভেতর এসে দাঁড়ায় হিমেলের গাড়ি। লামহা আগে আগে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। ছোটো ভাইয়াকে দেখে হাসি মুখে বলে,

“ভাইয়া, কেমন আছো?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই কেমন আছিস?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

রোহান হিমেলের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলে,

“ভাইয়া, কেমন আছেন?”

হিমেল নিজেও সৌজন্য মূলক হেসে বলে,

“আলহামদুলিল্লাহ, আপনি কেমন আছেন, ভাইয়া?”

রোহান লজ্জা পেয়ে বলে,

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো। ভাইয়া, আমি আপনার চেয়ে অনেক ছোটো। আপনি আমাকে ভাইয়া না ডেকে নাম ধরেই ডাকবেন, আপনি আপনি না করে তুমি করে বলবেন।”

“এটা কীভাবে সম্ভব? আপনি আমার সমন্ধি, আপনাকে আমি কীভাবে নাম ধরে ডাকব?”

“যেভাবে শিশির ভাইয়াকে ডাকেন সেভাবেই।”

হিমেল রোহানের হাতে মিষ্টি আর ফলমূলের প্যাকেট ধরিয়ে দেয়। নিজে কাপড়ের ব্যাগটা হাতে তুলে নেয়। তিনজন একসঙ্গে দরজার দিকে এগিয়ে যায়। লামহা কলিং বেল চাপে।
রওশনের বউ তাসফিয়া এগিয়ে এসে দরজা খুলে দেয়। বাইরে তিনজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হাসি মুখে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে পথ ছেড়ে দাঁড়ায়।

রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে লামহার মা কাকি। লামহার দাদি সোফায় বসে আছেন। উনিও উঠে দাঁড়ান।
লামহা ছুটে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে।
হিমেল সালাম দিয়ে হাসি মুখে সকলের সঙ্গে কথা বলে। লামহা মা, কাকি, দাদি, ভাবী সকলের সঙ্গে কথা বলে। কথা বলতে বলতে বারবার ওর চোখজোড়া ভিজে উঠছে।

রুমে এসে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নেয় হিমেল। লামহা-ও চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। হিমেল বিছানায় বসে ফোনে কথা বলছে। কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে বাবার সঙ্গে কথা বলছে।

হিমেল লামহার দিকে তাকিয়ে বাবাকে বলে,

“হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে।”

হিমেলের কথা শুনে লামহা কপাল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ওপাশ থেকে জাবির মির্জা কি বলছেন শোনা যাচ্ছে না। হিমেল আবার বলে,

“হ্যাঁ, বলেছি। হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে বলছি তো। আচ্ছা রাখছি তাহলে, ভালো থেকো।”

কল কে’টে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় হিমেল। লামহা মৃদু স্বরে বলে,

“নিচে চলুন।”

“যাও আসছি আমি।”

লামহা চুপচাপ বেরিয়ে আসে রুম থেকে। সোফার কাছে আসতেই লামহার দাদি লামহাকে কাছে ডাকেন। লামহা দাদির কাছে আসতেই উনি লামহাকে নিজের পাশে বসান। সোফায় এখন শুধু তাসফিয়া বসে আছে।
লামহার দাদি লামহার মুখের দিকে তাকিয়ে হাসি মুখে বলেন,

“জামাই বুঝি অনেক সোহাগ করে? কয় দিনেই দেহি মোডা হইয়া গেছস। সুন্দরও হইছস আগের থেইকা।”

লামহা লজ্জা পায় দাদির কথা শুনে, তবুও প্রকাশ না করে কিছুটা রাগ দেখিয়ে বলে,

“দাদি, একদম এসব বলবে না।”

“কেন? তুমি সোহাগ খাবা আর আমি কইলেই দোষ?”

“দা….দি।”

তাসফিয়া মুচকি মুচকি হাসছে। লামহা সোফা ছেড়ে উঠে বলে,

“এসব কথা বললে আর আসবো না তোমার কাছে।”

“আমার কাছে কেন আইবি? এহন তো জামাই আছে, যাবি তো জামাইয়ের কাছে।”

লামহা রাগ দেখিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়।
হিমেল সোফার কাছে এগিয়ে এসে দাদি আর ভাবীর দিকে তাকিয়ে বলে,

“দাদি, ভাবী চলুন নাস্তা করবেন।”

তাসফিয়া সৌজন্য মূলক হেসে বলে,

“না, ভাইয়া। আমরা খেয়েছি, আপনি যান খাওয়ার জন্য, আম্মারা অপেক্ষা করছেন।”

“আপনারাও চলুন, একসঙ্গে খাই।”

“দুপুরে একসঙ্গে খাব, এখন আপনারা দুজন খান।”

হিমেল আর বেশি কিছু না বলে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যায়। দাদি পিছু ডেকে বলেন,

“জামাই, নাতনী কেমন?”

হিমেল পিছু ফিরে নিচু গলায় বলে,

“ভীষণ ঝাঁঝালো, রাগে জেদে টুইটুম্বর। ডানে যেতে বললে বায়ে যায়, বায়ে যেতে বললে ডানে। আগা গোড়া পুরোটাতেই ত্যাড়ামি তবুও ভীষণ ভালো।”

কথাগুলো বলেই চলে যায় হিমেল।
দাদি নাতি বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“জামাইডা ভালোই আছে তাইনা? আমি তো প্রথম প্রথম ভাবছিলাম কাকার মতো অহংকারী নাক উঁচু মানুষ। এর আগেরবার যহন আইছিল কেমন গম্ভীর হইয়া কথা কইছে, একটুও হাসে নাই।”

“বুঝেন না দাদি, বিয়ের দিন কেমন ঘটনা ঘটল। ওই সব দেখেশুনে ওনার মন নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। বিয়েটাও বোধহয় জোর করে করিয়েছিল। ওনার চোখমুখ দেখে তাই মনে হয়েছিল আমার।”

“যা হোক, লামহা এহন ভালো থাকলেই হয়। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।”

“হুম। লামহার সঙ্গে হিমেল ভাইয়াকে ভালো মানিয়েছে। ভাইয়ার কথা শুনলেই বোঝা যায় লামহাকে ভালোবাসে। ওই জাকির মিয়া বাপ-মা ভক্ত। বিয়ের পরও বাপ মায়ের কথায় উঠবস করতো, বউয়ের কোনো কথার দাম থাকতো না। বেশি বাপ মা ভক্তও ভালো না আবার বেশি বউ ভক্তও ভালো না।”

“আমার নাতি কোনডা বেশি ভক্ত? বউ নাকি মাও?”

তাসফিয়া হেসে ওঠে দাদি শাশুড়ির কথা শুনে। হাসি মুখেই বলে,

“আপনার নাতি সব দিকেই সমান।”

“দেখা লাগবো না নাতিডা কার।”

“দাদি, একটা কথা বলি?”

“কও।”

“আপনি জোয়ান বয়সে কেমন ছিলেন? না মানে এই বয়সে এসেও আপনি যেমন—

তাসফিয়াকে থামিয়ে দিয়ে হাসি মুখে বলেন,

“তুমি কী কইতে চাইতাছ নাতবউ? আমি জোয়ান বয়সে জাউরা আছিলাম?”

তাসফিয়া নিজেও হেসে হেসে বলে,

“থাকতেই পারেন, এখনো যা জাউরামি করেন। দাদা আপনাকে অনেক ভালোবাসতো তাইনা, দাদি?”

“ভালোবাসতো তয় অনেক না। আমার অল্প বয়সে বিয়া হইছিল, সংসার কী বুঝতামই না তহন। রোমানের দাদি অনেক রাগী মানুষ আছিল। একটু কিছু ভুল হইলেই আমারে বকাবকি করতো, সারাদিন কাম করাইত। রোমানের আব্বা একটু মা ভক্তই আছিল। মায় যেইডা কইতো হেইডাই হুনত। খাওয়নের অভাব আছিল না, কিন্তু আমারে পেট ভইরা খাইতে দিতো না। আমি বাপ মায়ের একমাত্র মাইয়া আছিলাম, তিন ভাইয়ের আদরের ছোডো বইন। কষ্ট কী বুঝি নাই বাপের ঘরে তয় কষ্ট কারে কয় এইডা শ্বশুর বাড়িতে আইয়া হাড়ে হাড়ে টের পাইছি। দুঃখে কষ্টে সকলের চোখের আড়ালে চিপা চিপা কাঁনছি। কাউরে কিছু কইতে পারি নাই, সহ্যও করতে পারি নাই। সহজ-সরল পাইয়া সবাই জ্বালাইছে। আস্তে আস্তে মাইনষের গাউপার খাইয়া চালাক হইছি।”

তাসফিয়া দাদির কথা শুনে হা করে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। ও কল্পনাও করেনি দাদির অতীত এমন ছিল। ওনাকে যথেষ্ট হাসি খুশি লাগে সবসময়। নাতি নাতনী আর ওর সঙ্গে সবসময় মজা করেন। ও কখনো দাদিকে তার অতীত নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করেনি, দাদিও বলেননি কিছু। তবে ওর দুই শাশুড়ি কয়েকবার নিজেদের বিয়ের আগের আর পরের ঘটনা বলেছেন ওকে।

তাসফিয়া এই বাড়িতে এসেছে প্রায় দেড় বছর। এই দেড় বছরে একবারও দাদি শাশুড়িকে দেখেনি দুই ছেলের বউয়ের সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলতে বা কোনো প্রকার মনোমালিন্য করতে। ছেলের বউদের অনেক ভালোবাসেন, মা ছাড়া খুব কমই ডাকেন তাদের। ছেলের বউরা-ও ওনাকে অনেক ভালোবাসে। ও এই বাড়িতে আসার পর প্রথম কোনো ফ্যামিলি দেখেছে যেই ফ্যামিলিতে একে অপরের সঙ্গে কোনো ঝামেলা হয় না। একে অপরের সঙ্গে বন্ডিং অনেক ভালো। ওর নিজের বাবার বাড়িতেই কদিন পর পর ঝামেলা লাগে একজনের সঙ্গে আরেকজনের। মা আর দাদির মাঝে কথা কাটাকাটি হয়, দাদি আর কাকিদের মাঝেও হয়। একটার পর একটা ঝামেলা হয়ই একজনের সঙ্গে না একজনের সঙ্গে।

ওর দুই শাশুড়িও ওকে অনেক ভালোবাসে। বাড়ির সবাই-ই ভালোবাসে। ওকে আর লামহাকে কখনো আলাদা নজরে দেখেনি কেউ, দুজনকেই সমানভাবে ট্রিট করে সবাই। ও কোনো ভুল করলেও কেউ রেগে কিছু বলে না। ও মাঝে মধ্যেই ভীষণ অবাক হয় যে এই বাড়ির মানুষগুলো এত ভালো কেন। প্রেগন্যান্ট হওয়ার পর থেকে বাড়ির কোনো কাজে হাত লাগাতে দেয় না কেউ। ওর মাঝে মধ্যেই মনে হয় ও এই বাড়ির বউ না, এই বাড়ির মেয়ে।

“কী হইছে নাতবউ? কাঁন্দো কেন?”

তাসফিয়া চোখের পানি মুছতে মুছতে বলে,

“কাঁদি না, দাদি।”

“তাইলে চোখে পানি কেন? নাতির কথা মনে কইরা কাঁন্দো নাকি? কাঁইন্দো না, বিকালেই আইসা পড়ব।”

বলতে বলতে মুচকি হাসেন। তাসফিয়া কিছু না বলে দাদির মুখের দিকে তাকিয়ে রইল পলকহীন।


সাড়ে চারটায় বাড়ি ফেরেন লাবিব ইসলাম। ওনার সারা গা ঘেমে নেয়ে একাকার। বাইরে যা গরম পড়েছে। বৃষ্টি হওয়ায় দুদিন ভালো ঠান্ডা ছিল প্রকৃতি।
লাবিব ইসলাম হাই স্কুলের শিক্ষক, স্কুল ছুটি হওয়ার পরই তাড়াহুড়ো করে বাড়িতে ফিরেছেন মেয়েকে দেখার জন্য।
ভেতরে প্রবেশ করেই মেয়ের নাম ধরে ডাকতে শুরু করেন।
লামহা ভাবীর সঙ্গে তার রুমে বসে ছিল। বাবার গলার স্বর শুনে ছুটে বেরিয়ে আসে রুম থেকে। ভাবীর সঙ্গে গল্প করতে করতে সময়ের দিকে খেয়াল ছিল না।
দুপুরের খাবার খেয়ে ঘুমিয়েছে হিমেল, এখনো বোধহয় ওঠেনি, নাকি উঠেছে জানা নেই লামহার।

মেয়েকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখে সাবধান করে বলেন,

“আস্তে হাঁট, পড়ে গিয়ে ব্যথা পাবি তো।”

লামহা বাবার কথা আমলে নেয় না। বাবার সামনে এসে দাঁড়ায়, হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,

“কেমন আছো, আব্বু?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, তুই কেমন আছিস?”

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

“হিমেল কোথায়?”

“ঘুমিয়েছে। তুমি ফ্রেশ হয়ে আসো।”

“হুম।”

লাবিব ইসলাম মেয়ের মুখের দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে রুমের দিকে এগিয়ে যান। লামহা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে যায় বাবার জন্য ঠান্ডা ঠান্ডা লেবুর শরবত বানানোর জন্য।

সন্ধ্যার পর পর মির্জা বাড়ির সদস্যরা সোফায় বসে আছে। কথা হচ্ছে জাকিরকে নিয়ে। ও বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত বাড়ির কারো সঙ্গেই আর যোগাযোগ করেনি।
একদিন হিমেলের ফোনে মেইল করেছিল লামহা আর হিমেলকে উদ্যেশ্য করে। মেইলে লামহার কাছে মাফ চেয়েছে নিজের কৃতকর্মের জন্য, হিমেলের কাছেও চেয়েছে। ওদের দুজনের সুন্দর আর উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য দোয়াও করেছে।

জোবেদা মির্জা বড়ো ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন,

“ও জাকারিয়া, কনাকে তোর কাছে কেমন লাগে?”

মায়ের কথায় সেদিকে ধ্যান দেন জাকারিয়া মির্জা। দাদির কথা শুনে শিশিরের কপালে বেশ কয়েকটা ভাঁজ পড়েছে। হাতের ফোন রেখে দাদির দিকে মনোযোগ দেয়।
জাবির মির্জা বলেন,

“খুলে বলো তো, মা।”

“আমি চাইছিলাম কনাকে জাকিরের বউ বানাতে।”

“কিন্তু জাকির কী রা—

শিশির ছ্যাত করে উঠে বসে থেকে উঠে দাঁড়ায়। হঠাৎ ওর এমন রিয়াকশনে সবাই ওর দিকে তাকায়। শিশির কটমট করে তাকিয়ে কাঠকাঠ গলায় বলে,

“মোটেও না।”

“কী না?”

বাবার কথা শুনে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,

“তোমরা পেয়েছোটা কী? বড়ো ছেলের হবু বউকে মেঝ ছেলের বউ বানিয়ে দিয়েছ ঠিক আছে, পরিস্থিতির কারণে ওই কাজ বাধ্য হয়েই করতে হয়েছে। কিন্তু এখন আবার ছোটো ছেলের ভালোবাসার মানুষকে বড়ো ছেলের বউ বানাতে চাইছ কেন? এটা কখনো হবে না। কনা আমার।”

জাবির মির্জা হতভম্ভ হয়ে বলেন,

“কী বললি তুই?”

“আমি কনাকে ভালোবাসি, ওকে আমি বিয়ে করব। ভাইয়ার জন্য অন্য জায়গায় মেয়ে দেখো।”

জাবির মির্জা পায়ের জুতা খুলে ছেলেকে মা’রার জন্য তেড়ে আসতে আসতে বলেন,

“এই হারামী, কী বললি তুই?”

শিশির সোফা ডিঙিয়ে সিঁড়ির দিকে দৌড় দিয়ে বলে,

“কনাকে আমি বিয়ে করব।”

শিশিরকে ধরতে না পেরে জুতা ছুঁড়ে মা’রেন জাবির মির্জা, লাগেও শিশিরের গায়ে। বাড়ির বাকি সদস্যরা শিশিরের কথা শুনে শকড হয়ে বসে আছে। শিশিরের মুখে লাগাম নেই এটা সবারই জানা আছে তাই বলে এসব বলবে?

কনা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এসেছিল। শিশিরের সব কথাই শুনেছে ও। ও নিজেও শকড হয়ে গেছে। সিঁড়ির গোড়ায় এসে কনার হাত ধরে টেনে নিয়ে উপরে ওঠার চেষ্টা করে। জাবির মির্জা আবার তেড়ে আসতে আসতে বলেন,

“এই হতচ্ছাড়া, ছাড় বলছি ওকে।”

ছেড়ে দিয়ে আবার দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায়। উপর গিয়ে গলা ছেড়ে বলে,

“ভুলেও ভাইয়ার সঙ্গে কনার বিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করবে না কেউ, করলেও লাভ হবে না বলে রাখলাম”

কনা সহ বাকি সবাই সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে রইল একপ্রকার হা করেই।

রাতের খাবার খেয়ে সোফায় বসেছে বাড়ির সবাই। হিমেলের খাওয়া বেশি হয়ে গেছে। গরমের মধ্যে বেশি খেয়ে এখন হাঁসফাঁস অবস্থা। সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে নিশ্চুপ হয়ে রইল, বাকি সবাই কথা বলছে।
লামহা হিমেলের দিকে তাকিয়ে দেখে হিমেল আগে থেকেই ওর দিকে তাকিয়ে আছে। অপ্রস্তুত হয়ে দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।

রাত একটু বাড়তেই বড়রা উঠে নিজেদের রুমের দিকে এগিয়ে যান। অনেকদিন পর বাড়ির মেয়েকে কাছে পেয়ে সবাই গল্পে মশগুল হয়ে পড়েছিল।
রওশন-ও বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সকাল সকাল ওকে ঘুম থেকে উঠতে হবে। উঠে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তাসফিয়া ওর দিকে তাকায়। রওশন মুখে কিছু না বলে চোখ দিয়ে ইশারা করে রুমে যাওয়ার জন্য, তারপর পা বাড়ায় রুমের দিকে। ছোটো ভাইয়ের সামনে বউকে রুমে যেতে বলতে পারলেও ছোটো বোন জামাইয়ের সামনে বলতে পারছিল না।
তাসফিয়া বসা থেকে উঠে রওশনের পেছন পেছন রুমের দিকে এগিয়ে যায়।

রোহান ফোন চাপতে চাপতে বসা থেকে উঠে বলে,

“ভাইয়া, গিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন। লামহা, ভাইয়াকে নিয়ে রুমে যা।”

রোহান নিজের রুমের দিকে এগিয়ে যায়। হিমেল লামহার দিকে তাকিয়ে বলে,

“আজকে কি সারারাত জেগে থাকবে নাকি? রুমে চলো।”

“আপনি যান।”

“আর তুমি? অন্যদিন তো নয়টা বাজার আগেই ঘুমে ঢুলতে শুরু করো, আজকে কি ঘুম পায়নি?”

“নাহ।”

“ভাবীকে দেখেছ? ভাইয়ার কত বাধ্য। ভাইয়া চোখ দিয়ে ইশারা করলো আর সঙ্গে সঙ্গে উঠে চলে গেলো ভাইয়ার পেছন পেছন।”

লামহা মুখ বেঁকিয়ে বলে,

“ভাবী ভাইয়ার বাধ্য কারণ ভাইয়া ভাবীকে ভালোবাসে।”

“আমি কী তোমাকে ভালোবাসি না?”

তাকিয়ে রইল লামহা হিমেলের মুখের দিকে তবে উত্তর দিতে পারল না।

“চলো রুমে যাই, ভালোবাসা দেব।”

ছটফটিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় লামহা। দ্রুত পা চালিয়ে পালিয়ে যেতে চায় হিমেলের দৃষ্টি সীমানার বাইরে। হিমেল নিজেও বসা থেকে উঠে দ্রুত পা চালিয়ে এগিয়ে আসে লামহার পেছন পেছন।
রুমে ঢুকে দরজা লাগাতে লাগাতে বলে,

“বাহ, আজকে এত সহজে আমার কথা মেনে নেবে ভাবতেই পারিনি। দারুন।”

লামহা পেছন ফিরে কটমট করে তাকিয়ে আঙুল তুলে বলে,

“একদম বেশি কথা বলবেন না।”

হিমেল কয়েক কদম আগায়। লামহার সামনে দাঁড়িয়ে আকস্মিক কোমর পেঁচিয়ে ধরে। এমন ঘটনা পুরোপুরি অপ্রত্যাশিত ছিল লামহার কাছে। বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে আছে হিমেলের মুখের দিকে। হিমেল ডান হাতে আলতো করে লামহার গাল ছুঁয়ে বলে,

“বেশি কেন কমও বলবো না, তবে—

“ত… তবে কী?”

হিমেল লামহার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে,

“তবে… আদর করতে দিতে হবে।”

কথাগুলো বলেই লামহার কানের লতিতে ওষ্ঠ ছোঁয়ায়। ছিটকে দূরে সরে যেতে চায় লামহা তবে পারে না হিমেলের বাহু বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে থাকার কারণে।
কঠিন গলায় কটা কঠিন কথা শোনাতে চাইলেও পারছে না। ওর কন্ঠ ওর সঙ্গেই বেইমানি করছে, বের হতেই দিচ্ছে না কোনো শব্দ।
এই পর্যায়ে এসে লামহাকে জড়িয়ে ধরে হিমেল। হিমেলের আলিঙ্গনে আবদ্ধ হয়ে স্থির হয়ে গেছে লামহা। হিমেলের হার্টবিট দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। লামহা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে হৃৎস্পন্দনের ধুকপুক শব্দ। ওর কাছে ছন্দের মতো লাগছে এই শব্দ।
ওর নিজেরও হার্টবিট বেড়ে গেছে বহুগুণে। বিয়ের এতদিন পর আজকে প্রথম দুজন একে অপরের এত কাছে।

“লামহা।”

লামহা বুক থেকে মুখ তুলে হিমেলের মুখের দিকে তাকায়। এখন আর হিমেলের বাহু বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার তাড়া নেই ওর মধ্যে, একদম শান্ত হয়ে আছে।
লামহার চোখে চোখ রেখে গভীর কন্ঠে বলে,

“ভালোবাসি।”

লামহা কথা না বলে তাকিয়ে রইল হিমেলের মুখের দিকে। হিমেল আবার বলে,

“আমি কী খুব খারাপ? ভালোবাসা যায় না আমাকে? এক ছাদের নিচে এক বিছানায় থাকি দুজন তবুও যেন দুজনের মধ্যে শত মাইলের দূরত্ব। তোমার সময় লাগলে নাও তবে সম্পর্কটা তো স্বাভাবিক করাই যায় তাইনা? আমি তোমার সঙ্গে যত সহজ হওয়ার চেষ্টা করি, যত আগাই তুমি তত শক্ত হয়ে পিছিয়ে যাচ্ছ। দিন এগিয়ে যাচ্ছে, সম্পর্কের উন্নতি না হয়ে আগের চেয়েও অবনতি হচ্ছে।”

“সম্পর্কটা শেষ করে দিন তাহলে।”

লামহার নির্বিকার গলার স্বর। হিমেল বিস্মিত হয়ে বলে,

“তুমি এখনো এই সম্পর্ক থেকে বের হতে চাইছ?”

“হ্যাঁ।”

“একটা জনম কী আমার সঙ্গে পার করা যায় না?”

“জনম কয়টা? মানুষ কয়বার জন্ম নেয়?”

“জনম একটাই। পুনর্জন্ম বলে তো কিছু নেই, সে জন্যই তো তোমার সঙ্গে এক জনম পার করতে চাই। পরবর্তীতে না-হয় জান্নাতে গিয়ে অনন্তকাল পার করব।”

লামহা তাকিয়ে রইল হিমেলের মুখের দিকে।
হিমেল লামহাকে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলে,

“এই পৃথিবীতে আমি পার করতে চাই তোমার সঙ্গে এক জনম।”

লামহা এবারেও কোনো কথা বলল না তবে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল হিমেলকে, মুখ গোঁজে হিমেলের বুকে।

(সমাপ্ত)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply