#কালারব্লাইন্ড — ০৩
#সোফিয়া_সাফা
“ধ`র্ষিতা বউ” শব্দ দুটো কানে যেতেই আলতার শরীরটা কেমন যেন রি রি করে উঠল।
রঞ্জক মাত্র একবারই তাকে এই নামে ডেকেছে। অথচ এরই মধ্যে শব্দটাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছে আলতা। তবুও নিজেকে অবিচল দেখানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে আড়ষ্ট হয়ে বসে রইল সে।
আলতার নীরবতাকে নির্লিপ্ততা ভেবে রঞ্জকের কপালের রগ ফুলে উঠল। চশমাটা ঠিক করে একপলক তাকাল গুটিসুটি মেরে বসে থাকা নববধূর দিকে।
“আমার ঘরে ঢোকার পারমিশন কে দিয়েছে তোমায়?”
আলতা কোনো জবাব দিল না। তার নীরবতায় রঞ্জকের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙতে শুরু করল। দাঁতে দাঁত চেপে কিছুক্ষণ ক্ষুব্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সে। তারপর আর নিজেকে সামলাতে না পেরে বলে উঠল,
“এই যে তুমি আমার ঘরে এসে বসে আছো—আমি তোমার সঙ্গে কী কী করতে পারি, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে তোমার?”
আলতার শরীরটা কেঁপে উঠল। তবুও সে চোখ তুলে তাকাল না স্বামীর দিকে।
“ওয়েট আ সেকেন্ড, তোমার তো খুব ভালোই ধারণা থাকার কথা। কারণ তুমি তো এই ব্যাপারে ভীষণই অভিজ্ঞ।”
রঞ্জক এবার ভাবুক ভঙ্গিতে নিজ গালে তর্জনী ঠেকিয়ে বলল,
“সো, মিসেস অভিজ্ঞ লতা, তুমি নিশ্চয়ই দশম বারের মতো নিজেকে কারও হাতে তুলে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এখানে এসে বসে আছো?”
কথাটা শুনে আলতা চোখ তুলে তাকাল রঞ্জকের দিকে। অপমানে-লজ্জায় তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠতে শুরু করেছে। অথচ এই পরিবর্তন রঞ্জকের চোখ এড়িয়ে গেল। সে কেবল ঘাড় হেলিয়ে একদৃষ্টে চেয়ে থেকে বলে গেল,
“তুমি যদি ভেবে থাকো, আমি রঞ্জক মাহতাবির তোমাকে বউ হিসেবে মেনে নেব, তাহলে ভুল ভাবছো। আমার এতোটাও খারাপ দিন আসেনি যে তোমার মতো একটা ধ`র্ষিতাকে স্বীকৃতি দিতে হবে।”
এতকিছুর পরও আলতার মুখ থেকে টু শব্দটি বের না হওয়ায় রঞ্জক এবার একটু বিরক্ত হলো। সে নিজের ডান কবজিতে পেঁচানো সাদা কাপড়ের র্যাপটা খুলতে খুলতে আলতার মুখের ওপর খানিকটা ঝুঁকে এল। তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“বেশ তো, আমিও দেখব ঠিক কতোক্ষণ এভাবে মুখ বুজে ন্যাকা সেজে থাকতে পারো।”
রঞ্জক র্যাপটার একপ্রান্ত আলতার মুখের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল,
“এটা নিজের গলায় পেঁচিয়ে নাও।”
আলতা যেন কথাটার মানে বুঝতেই পারল না। নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল কেবল। রঞ্জক তীক্ষ্ণ গলায় হুংকার দিল,
“তোমার দশম ধ`র্ষকে পরিণত হওয়ার আমার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। তাই বলছি আমাকে প্ররোচিত করার চেষ্টাও কোরো না। সত্যি তো এটাই যে আমাকে দেওয়ার মতো তোমার কাছে কিছুই অবশিষ্ট নেই।”
আলতা প্রাণহীন চোখে অপলক চেয়ে রইল শুধু। রঞ্জক চোখ বুজে নিজেকে ধাতস্থ করার তাগিদে দু আঙুলে কপাল চেপে ধরল। ঠান্ডা গলায় হুমকি দিল,
“তুমি যদি আমাকে নিজের গায়ে হাত তুলতে বাধ্য করো, তাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। কেননা একবার আমার হাত তোমার ওপর উঠে গেলে তোমাকে মে`রে না ফেলা পর্যন্ত শান্ত হবো না। তাই ম`রার একান্ত ইচ্ছা না থাকলে নিজের হাতে এটা গলায় পেঁচিয়ে নাও।”
আলতা কাঁপা হাতে র্যাপটা নিজের গলায় পেঁচিয়ে নিতেই রঞ্জকের ঠোঁটের কোণে ক্রুর হাসি ফুটে উঠল। সে তৎক্ষণাৎ র্যাপটার অন্যপ্রান্ত মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরল।
গলার চারপাশে র্যাপটার বাঁধন টানটান হয়ে আসতেই আলতা দু-হাতে সেটা আঁকড়ে ধরল। জুবা এতক্ষণ চুপ করে থাকলেও এবার চেঁচিয়ে উঠতেই রঞ্জক রক্তচোখে তাকাল নিরীহ পাখিটার দিকে। আঙুল উঁচিয়ে বিড়বিড় করল সে,
“ডোন্ট শাউট, হিশশশ!”
জুবা শান্ত হলো না। রঞ্জক বিরক্ত হয়ে র্যাপটায় টান দিতেই আলতা টালমাটাল পায়ে উঠে দাঁড়াতে বাধ্য হলো। রঞ্জক র্যাপটা ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বলল,
“দ্রুত হাঁটবে। আমার গতির সাথে তাল মেলাতে না পারলে তোমাকে পায়ের নিচে পিষে মেরে ফেলবো।”
আলতা একবার হাত বাড়িয়ে জুবার খাঁচাটা তুলে নিতে চাইল। কিন্তু রঞ্জকের টানে তার হাতটা মাঝপথেই থেমে গেল। তাকে হাঁটা ধরতে হলো। অজান্তেই আলতার মুখ থেকে আর্তনাদের স্বরে বেরিয়ে এল,
“জজজুবা!”
রঞ্জক তাকে একটুও ছাড় দিল না বরং হাঁটার গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ওকেও বুঝতে হবে, আমার কথার অবাধ্য হলে তার ফল ভোগ করতে হয়।”
এলিভেটর থাকার পরেও রঞ্জক আলতাকে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগল; আলতা বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতে নিয়েও নিজেকে সামলে নিয়েছে।
নিচের তলার কিচেনে তখন আরজু বেগম খাবার গরম করছিলেন রঞ্জকের জন্য। রঞ্জক আরও কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে হঠাৎ র্যাপটায় হ্যাঁচকা টান দিল। মুহূর্তেই ভারসাম্য হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল আলতা।
আরজু বেগম শব্দ পেয়ে কিচেন থেকে বেরিয়ে এলেন। মেঝেতে পড়ে থাকা আলতাকে দেখে তিনি থমকে গেলেন। বিস্মিত চোখে তাকালেন রঞ্জকের দিকে।
রঞ্জক যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে পকেট থেকে ফোন বের করল।
আরজু বেগম আলতাকে ধরে ওঠাতে উদ্যত হতেই রঞ্জকের গলা ভেসে এলো,
“ওকে স্পর্শ কোরো না ফুপি। তোমার হাতে নোংরা লেগে যাবে।”
এমন কথা শুনে আরজু বেগম হতভম্ব হয়ে গেলেন। রঞ্জক ভ্রুক্ষেপ করল না। তাকালোও না তার দিকে। সে ফোনে এক এক করে সবার নম্বর ডায়াল করে নিচে আসতে বলল।
আলতা আরও কিছুক্ষণ মেঝেতে পড়ে রইল। একে একে বাড়ির সবাই নিচে এসে জড়ো হতে শুরু করলে সে কোনোমতে উঠে দাঁড়াল।
এতক্ষণ নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করলেও ধীরে ধীরে আলতার ভেতরের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ছিল। রঞ্জক যদি সবার সামনে সত্যিটা প্রকাশ করে ফেলে, তাহলে সে কোথায় মুখ লুকাবে, তা জানে না। শুধু জানে, সত্যিটা জানাজানি হয়ে গেলে বেঁচে থাকার অবশিষ্ট ইচ্ছাটুকুও হয়তো তার ভেতর থেকে নিঃশেষ হয়ে যাবে।
সবার শেষে আরিজ মাহতাবির উপস্থিত হতেই রঞ্জক তার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল, “তোমার বাড়িতে কি জায়গার অভাব পড়েছিল? যে এই নোংরা আবর্জনাকে আমার ঘরে পাঠিয়ে দিলে?”
এমন মন্তব্যে উপস্থিত প্রত্যেকটি সদস্য ধাঁধায় পড়ে গেল। আরিজ মাহতাবির গলার স্বর খাদে নামিয়ে বললেন, “আমি ওকে তোমার ঘরে পাঠাইনি। তোমার ফুপিই পাঠিয়েছে। তাই কিছু বলার থাকলে ওকেই বলো। আমাকে কিংবা বউমাকে আর কিছু বলবে না।”
“তুমি সত্যিই চাইছো আমি ফুপিকে সবটা বলে দিই?”
“আমি চাইছি না। কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই আমার চাওয়া না চাওয়ার পরোয়া করবে না। শুধু এটুকু জেনে রাখো, তুমি বউমাকে ইঙ্গিত করে আর একবারও অপমানজনক কথা বললে আমি তোমার সাথে হওয়া চুক্তির কথা ভুলে যাবো। এমনকি তুমি যাতে নমিনেশন না পাও সেটাও নিশ্চিত করবো।”
এই ধরনের কথা শুনে রঞ্জকের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে নজর ফেরাল বাড়ির প্রত্যেকের দিকে। তারপর ধপ করে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে হাঁক ছাড়ল,
“নাবিল!”
তার উচ্চস্বরের ডাকে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ‘নাবিল’ নামের গৃহপরিচারক দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল।
“জি, মেজো সাহেব।”
“যাও, গিয়ে আমার ঘরটা ভালোভাবে ক্লিন করে এসো। ফাস্ট!”
নাবিল মাথা নেড়ে হাঁটা ধরতেই আরিজ মাহতাবির কঠোর গলায় বললেন,
“কোনো প্রয়োজন নেই।”
রঞ্জক প্রশ্ন করল,
“নাবিল তুমি যাচ্ছো কী না বলো।”
নাবিল শুকনো ঢোক গিলে একবার আরিজ মাহতাবিরের দিকে, তারপর রঞ্জকের দিকে তাকাল। শেষ পর্যন্ত ভয়ে উপর-নিচ মাথা নাড়ল।
আরিজ মাহতাবির বেশ বুঝতে পারলেন রঞ্জক কথায় নয় এবার কাজেকর্মে আলতাকে অপমান করছে। তিনি খেয়াল করেছেন কীভাবে বাড়ির প্রত্যেকে আলতার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি নাবিলকে চোখের ইশারায় যেতে নিষেধ করলেন।
রঞ্জক তাদের কথোপকথন বুঝতে পেরে শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে নাবিলের দিকে ধীর কদমে অগ্রসর হতে লাগল। তার হাবভাব দেখে নাবিল কয়েকপা পিছিয়ে গেল,
“আমি এক্ষুণি যাচ্ছি, মেজো সাহেব।”
বলেই প্রায় দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল নাবিল।
আরিজ মাহতাবির আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি ধারাকে বললেন,
“নাটক অনেক হয়েছে। ধারা, বউমাকে আমার বলে দেওয়া ঘরটায় নিয়ে যাও।”
ধারা আলতার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার হাতে হাত রাখতে যাচ্ছিল, তখনই রঞ্জক ফের সাবধান করল,
“আমি ওকে টাচ করতে নিষেধ করেছি। শুনতে পাস নি?”
ধারার হাত মাঝপথেই থমকে গেল। মেজাজ চড়িয়ে বলল,
“দয়া করে একটু ঝেড়ে কাশবি? আমরা তোর কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।”
“আমি তোর ভালোর জন্যই বলেছি। ওর থেকে দূরে থাক।”
“কেন এসব বলছিস, সেটা একটু সহজ ভাষায় বল তো।”
রঞ্জক মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেল। তার দৃষ্টি গিয়ে আটকে গেল আলতার চোখে। মেয়েটা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। রঞ্জক ঠোঁটের আগায় এসে থেমে যাওয়া কথাটুকু গিলে ফেলল। তারপর চোখ সরিয়ে রুক্ষ গলায় বলল,
“যা ইচ্ছে কর, শুধু জেনে রাখ, ওকে টাচ করলে আমি আর কোনোদিনও তোর হাতের রান্না করা খাবার মুখে তুলবো না।”
ধারার কপালে ভাঁজ পড়ল। রঞ্জক বাকিদের উদ্দেশ্যে বলে দিল,
“শুনে রাখো সবাই। এই মেয়েটার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আমি কোনোদিনও ওকে নিজের বউ হিসেবে মেনে নেব না।”
কথাগুলো ছুড়ে দিয়ে রঞ্জক গটগট পায়ে সেখান থেকে চলে গেল।
ধারাকে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আরিজ মাহতাবির নিজেই আলতার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন,
“বউমা, তুমি আমার সঙ্গে চলো। আমি তোমাকে তোমার ঘরটা দেখিয়ে দিচ্ছি।”
তিনি হাঁটা ধরতেই আলতা টলমলে পায়ে তাকে অনুসরণ করল।
ধারা তখনও বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে। মালেকা বেগম চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন,
“যা ভেবেছিলাম তাই হয়েছে। ভাইয়া জোর করে ছেলেকে বিয়ে করিয়ে বউ জুটিয়ে এনেছে। রঞ্জকের এতে কোনো সম্মতিই ছিল না।”
কথাটা আলতার শ্রবণগোচর হলেও সে থেমে দাঁড়াল না। আরজু বেগম কিয়ৎক্ষণ থমকে রইলেন। তারপর রঞ্জকের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
চলবে…
(আমি মারাত্মক রাইটিং ব্লকে পড়েছি। আপনারা যারা পড়ছেন সবাই রেসপন্স করুন প্লিজ। নতুবা এই গল্পটা মনে হয় না কন্টিনিউ করতে পারব।)
Share On:
TAGS: কালারব্লাইন্ড, সোফিয়া সাফা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৬
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৬
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ৯
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১(ক+খ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৩
-
কালারব্লাইন্ড পর্ব ১৪
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৭৭
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব (৪০ এর বর্ধিতাংশ)
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৪১
-
অবাধ্য হৃৎস্পন্দন পর্ব ৬৯