#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(২৩)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
হাতের ওপর আরেকটা মোলায়েম হাতের স্পর্শে পিউয়ের বিষণ্ণ চোখ নামল। তাকাল পাশ ফিরে। হাজার মায়ার স্রোত নিয়ে দুপাশে মাথা নাড়ল তানহা। যেন খুব করে অনুরোধ করল,কাঁদিস না!, এই পৃথিবীতে পিউকে সব থেকে ভালো কে চেনে? তানহাই তো। নার্সারি থেকে একই বেঞ্চে বসে বসে আজ এই অবধি দুজনের। পিউ যা কাউকে বলতে পারে না,ওকেই তো বলে সেসব। ধূসর ভাইয়ের প্রতি পিউ যে কী মারাত্মক ভাবে অভিভূত, কী সাংঘাতিক আসক্তি ওর ঐ মানুষটার ওপর তা কি তানহা ছাড়া আর কেউ জানে? ধূসর ভাই নিজেও যদি জানতেন,হয়ত কোনোদিন এভাবে ওকে কষ্ট দিতে পারতেন না। এক কথায় রাজি হতেন,ওর স্বপ্নপুরুষ হতে।
তানহা পোড়া শ্বাস ফেলল, বন্ধুর আহত মনের কথা ভেবে। মেয়েটা যে বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ। ইমোশোন দিয়ে গোটাটাই ভরতি। একটা ছোট্ট ব্যাপার অনেক বড়ো করে ভাবা,পিউয়ের অন্যতম স্বভাব। শক্ত মানসিকতা,কিংবা রেগেমেগে নিজেকে সামলে নেয়ার ঐ শক্তি পিউয়ের মতো তুলতুলে মেয়েটার সাধ্যে নেই।
তানহা যেভাবে পারল,কেবল অনুনয়ই করল যেন পিউ না কাঁদে। নিজেকে সামলে নেয়। এতগুলো মানুষের মাঝে কোনোভাবে একটুও যদি চোখের জল ফেলে,পরিস্থিতিটা যে কী বিব্রতকর হয়ে যাবে তখন!
আর সত্যিই আজ পিউ তানহার কথা শুনলো। চেষ্টা করল ঠোঁট কামড়ে। কিন্তু চোখ তো কথা শোনে না। বারেবার ছলছল করে উঠছে। তাই মাথা নুইয়ে ঢোক গিলল এক চোট। ধূসর গেস্ট রুমে লাগেজ রাখতে গিয়েছে। মারিয়াকে বসানো হয়েছে সোফায়। রুবায়দা, জবা সবাই বেশ খাতির যত্ন করছেন। পুষ্প সাহায্যের নামে ছুটছে তাদের সাথে। পিউ মলিন চেহারায় চেয়ে চেয়ে মারিয়াকে দেখল। সত্যিই সুন্দর মেয়েটা! মুখে কোনো প্রসাধনী নেই,সাজগোজ নেই! তাও কত চমৎকার লাগছে। সাদামাটা-সাধারণ যেন। পায়ে চটি,নখগুলো সাদা, শেপ করে কাটা। হাতেও তাই। পিউ নিজের হাত-পায়ের দিকে চাইল। নেইলপলিশ দিয়েছিল একটু আগে। নখগুলোও বড়ো বড়ো। তাহলে ধূসর ভাইয়ের কি এমন মেয়ে পছন্দ? একবার ওকে বললেই হতো! ও নাহয় ওভাবেই ঘুরতো। ওরকম সেজে! ওর চুল তো মেয়েটার চেয়েও লম্বা,ঘন। ও তাহলে বেনুনি করতো অমন করে। হিল ছুঁতো না,চুরিদার পরতো না। ঠিক তাই তাই করতো,যা করলে ধূসর ভাই তার জীবনের সাথে ওকে জড়াতে রাজি হয়ে যাবেন।
পিউয়ের বুক হুহু করে উঠল।
মারিয়াকে দেখে বোঝা যাচ্ছে, ধূসর ভাইয়ের গার্লফ্রেন্ড যদি হয়ও, মানুষটার পছন্দ ভালো! ভাবতেই পিউয়ের ভেতর সুদ্ধ দুমড়েমুচড়ে দুভাগ হয়ে গেলো। ধূসর ভাই কি ওর হওয়ার জন্যে জন্মাননি? তাহলে ও কেন এত ভালোবাসতে গেল? এক দুদিন তো নয়,আজ প্রায় দু বছর ধরে ভালোবাসছে। সেই পনেরো বছরের পিউ,এখনো সতেরোতে পা রাখার পথে। এখনো তো একইরকম ভালোবাসে ও। এই ভালোবাসা তাহলে অর্থহীন! তাহলে ইকবাল ভাই যে অত জোর দিয়ে বলেছিলেন,ওনার গার্লফ্রেন্ড নেই। সেটা কী ছিল? নাকি ভাইয়াও জানেন না কিছু। পিউ আর ভাবতে পারল না। চোখজোড়া জলে ভেসে যেতে চাইছে,জ্বলছে বুক।
পুষ্প মারিয়াকে বলল,
“ এসো,খাবে এসো।”
মেয়েটা অপ্রস্তুত স্বরে জানাল,
“ আমি আসলে,না মানে খাব না এখন।”
“ আরে এত লজ্জার কী আছে? মা,, মেজো মা সবাই কত কী রেধেছে তোমার জন্যে। এসো এসো।”
পুষ্প ওকে হাত ধরে তুলতেই উঠে এলো মারিয়া। বসল চেয়ারে। একটা সিরামিকের ব্যোল ওর দিকে এগিয়ে দিলেন জবা। কুসুম গরম পানি,আর ওপরে লেবুর স্লাইস ভাসছে। মারিয়ার এত আপ্যায়নের অভ্যেস নেই। মৃদূ স্বরে বলল,
“ আমি না হয় বেসিনে গিয়ে হাতটা ধুতাম।”
“ আরেহ বোকা মেয়ে,এখানেই ধোও না। সমস্যা কী?”
মেয়েটা ভারি লজ্জা পাচ্ছিল। রোজিনা,রওনক দুজনেই মন্ত্রের মতো শিখিয়ে দিয়েছেন লক্ষ্মীমন্ত হয়ে থাকতে। যদিও স্বভাবে মারিয়া লক্ষ্মীই। ও হাত ধুলো। ধূসর বসার ঘরে ফেরত এলো তক্ষুনি। পায়ের শব্দে না চাইতেও চোখদুটো তুলে চাইল পিউ। বোঝেনি,ধূসরের দৃষ্টি ওর ওপর থাকবে। দুম করে চোখাচোখি হয়ে গেল অমনি। দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলতেই ধক করে উঠল পিউয়ের বুক। আরো বেশি কান্না উথলে এলো গলায়। নিজেকে,নিজের অশ্রুকে লুকোতে চট করে মাথা নামিয়ে ওপর তলায় ছুটল বেচারি। ব্যাপারটায়
ধূসর আশ্চর্য হলো বৈকি। কপাল কুঁচকে চেয়ে রইল ওদিকে। পিউ কাঁদছিল না? রুবায়দা খেয়াল করতেই ডাকলেন,
“ কোথায় যাচ্ছিস পিউ,খাবি না?”
পিউ ওপরে উঠতে উঠতেই জানিয়ে দিলো,
“ খিদে নেই,মেজো মা।”
স্যাঁতসেঁতে কণ্ঠের রাশ ধরতে ধূসরের বেশি সময় লাগেনি। চেহারা টানটান করে ফেলল সে। এক পল ঠোঁট কামড়ে ভাবল কী যেন। ওদিকে রুবায়দা বিড়বিড় করলেন,
“ খিদে নেই,মেয়েটা যে কী বলে। দুপুরে তো খেলোই না। আবার বলে খিদে নাকি নেই। পিউরে,খেতে আয়। আপা এসে জানতে পারলে মার একটাও মাটিতে পড়বে না।”
পিউ এলো না,শুনলোও না। তবে ধূসরকে ঘরের পথ ধরতে দেখা গেল।
জবা বললেন,
“ তুই আবার কই যাচ্ছিস? খেতে বোস,ভাত বেড়েছি।”
“আমি খেয়ে এসেছি।”
“ বের হবি না আজ? ঘুমোবি নাকি?” ধূসর মায়ের কথায় থামল, চ সূচক শব্দ করে বলল,
“ নিজের ঘরেই তো যাচ্ছি,মা। সেখানেও এত প্রশ্ন কেন?”
তারপর হনহন করে উঠে গেল ওপরে। রুবায়দা বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে বললেন
“ দেখলি,কী একটু বললাম কেমন করল তাতে?”
জবা সাফাই দিলেন হাসি টেনে,
“ বাইরে থেকে এসেছে তো,মাথাটা মনে হয় গরম!”
“ মোটেও না। আমার সাথেই এমন করে। আপা বা তুই জিজ্ঞেস করতি,সুন্দর করে উত্তর দিয়ে যেত। এক দোষে যে ছেলেটা আমাকে আর কত ভোগাবে!”
রুবায়দা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
মারিয়া এইবার মুখ খুলল। হেসে হেসে বলল,
“ আন্টি,মন খারাপ করবেন না। ছেলেমেয়েরা মায়েদের সাথে এমন একটু করে। আমি আর আমার ভাইয়াও আম্মুর সাথে কিছু হলেই চোটপাট করি। আসলে মা পৃথিবীতে সব চেয়ে আপন তো! তাই মনে হয়, তাকে যাই বলি সে কখনো রাগ করে দূরে চলে যাবে না।”
বলেই মারিয়া জিভ কাটল। মিনমিন করে বলল,
“ সরি, আসলে অনেক কথা বলে ফেললাম। আম্মু বলেছিল চুপচাপ থাকতে।”
রুবায়দা-জবা একে-অপরকে দেখলেন। পুষ্পও সবাইকে দেখল। পরপর হুহা করে হেসে ফেলল তারা। মারিয়া ভারি লজ্জা পেয়ে যায়। চিবুক নুইয়ে মৃদূ হাসে নিজেও। রাদিফের মারিয়াকে এত পছন্দ হয়ে গেল! কিন্তু এসব তানহার ভালো লাগল না। সোফায় বসে মুখটা বেঁকিয়ে ভেংচি কাটল সে। মায়া মায়া চোখে ওপরে চাইল তারপর। যাবে এখন? যদি পুষ্প সন্দেহ করে ওদের? ভারি বিপদ তো!
***
পিউ ঘরে এসেছে কেবল। দুঃখে-কষ্টে জর্জরিত হয়ে গায়ের ওরনাটা ছুড়ে মারল বিছানায়। বসল ধপ করে। ঠোঁট ভেঙেচূড়ে কান্না শুরু করতেও পারল না,এর মাঝেই টোকা পড়ল দরজায়। দুটো আঙুলের পিঠ দিয়ে কেউ ঠকঠক শব্দ করল। মহাবিরক্ত হলো মেয়েটা। একটু শান্তিতে কাঁদাও যাবে না এখন? নিশ্চয়ই না খেয়ে আসায় আপু বা তানহা ডাকতে এসেছে। ফের দরজায় টোকা পড়ল তখন।
পিউ এবার রেগেমেগে বলল,
“ খাব না বললাম তো….”
পিছন ফিরতেই মুখের কথা মুখেই আটকাল ওর। অপ্রত্যাশিত ভাবে ধূসর দাঁড়িয়ে আছে সেথায়। পিউ চমকে দাঁড়িয়ে গেল অমনি। ধূসর একবার ওর দিকে চাইল, একবার বিছানায়। পিউ সেই দৃষ্টি অনুসরণ করে চাইল নিজেও। ওরনাটা পড়ে আছে। অমনি দ্রুত হাতে ওটা তুলে গায়ে পরল নিজের। জিজ্ঞেস করল মৃদূ স্বরে,
“ জি,ক-কিছু বলবেন?”
ধূসর কিছুই বলল না। শুধু চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থেকেই পিউয়ের ঘরটাকে দেখল। এ ঘরে ও সচারাচর আসেনি। এসেছিল হয়ত একবার। হাতের লেখা মেলাতে। সেদিন দেখেনি খেয়াল করে। সোফার ওপর পিউয়ের ইউনিফর্ম ফেলে রাখা। আলুথালু বিছানার চাদর। অগোছালো একটা! অথচ প্রতিদিন ওর রুম ঠিক গুছিয়ে দিয়ে আসে। ধূসরের চোখ পড়ল ড্রেসিং টেবিলে। টম ফর্ড পারফিউমের ফিমেইল ভার্সনের বোতলটা দেখে আজ নিশ্চিত হয়ে গেল, এতদিনের কৌতূহল! যা ভেবেছিল তাই।
ধূসর যেদিকে যেদিকে তাকায়,পিউ সেদিকে সেদিকে নিজেও ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে। বুকটা ওর ঢিপঢিপ করছে। তারপর একেক জায়গার অগোছালো অবস্থায় লজ্জা পায় নিজেই। জিভ কাটে কখনো। ইস,মা এজন্যেই বলে পিউ ঘর গুছিয়ে রাখ। কেন যে শোনে না! ধূসর ভাই কী ভাববেন এখন?
পরপর মনে পড়ল,সে ভাবলেই বা কী? ওর সামনে দিয়ে যে আরেক মেয়ে ঘরে এনে তুলেছে, তার ভাবনা দিয়ে পিউয়ের কিচ্ছু যায় আসে না। ধূসর তক্ষুনি বলল,
“ এ ঘরে আমার চার্জার আছে।”
পিউ ভারি অবাক হয়ে চাইল,
“ আমার ঘরে! কই,আমিতো আনিনি।”
“ খুঁজে দ্যাখ।”
ধূসর নিজেই ভেতরে এলো। বসল খাটে। ভ্রু নাঁচিয়ে এমন ভাবে নীরব হুকুম দিলো,যেন পিউ তার আন্ডারে কাজ করা প্রজা!
মেয়েটার রাগ হলো। ওকে কাঁদিয়ে,দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে এখন চার্জার খুঁজতে বলা হচ্ছে। কেন খুঁজবে? ওই মারিয়া না ডায়রিয়া তাকে দিয়ে খোঁজাক।
“ কী? খুঁজতে বললাম তো!”
ভেতর ভেতর যতই চোটপাট করুক,মুখে পিউ কিচ্ছু বলতে পারল না। ঐ মনের জোর নেই!
অগত্যা মুখ কালো করে পুরো ঘর তল্লাশি শুরু করল। টেবিলের ড্রয়ার ড্রেসিং টেবিলের শেল্ফ,ড্রয়ার। নিচে,খাটের তলায় কোথায় না খুঁজল বেচারি!
আর ঐ পুরোটা সময় পায়ের ওপর পা তুলে বসে রইল ধূসর। ঠোঁট কামড়ে হাসতে হাসতে থুত্নিতে হাত ঘষল মাঝে।
পিউ সবশেষে দাঁড়িয়ে বলল,
“ কোথাও পাচ্ছি না তো! কোথাও নেই।
“ নেই?”
“ না।”
ধূসর কাঁধ উঁচাল,
“ তাহলে নেই।”
পিউ তব্দা খেয়ে গেল। এ কী মশকরা করছে! এখন,এই অবস্থায়, তাও এই লোক?
ধূসর উঠে দাঁড়াল। জিভে ঠোঁট ভেজাল,ঘাড় ডলল। যেন কিছু বলতে চেয়েও বলল না। শক্তপোক্ত চিবুক ফিরিয়ে বেরিয়ে যেতে নিলেই,পিউ উদগ্রীব হয়ে ডাকল,
“ ধূসর ভাই!”
দাঁড়াল মানুষটা। ঘুরে চাইল না। পিউ নিজেই বলল,
“ ঐ মেয়েটা কে?”
“ নাম শুনিসনি?”
“ আমি বলতে চাচ্ছি, আপনার কী হয়?”
ধূসর কপাল কুঁচকে ফিরল,
“ কী হয় বলতে!”
পিউ প্রথম দিনের মতো সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারল না! সেবার গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা ঐ প্রশ্ন করতেই,যে উদুম বকাটা খেয়েছিল তা ওর এখনো মনে আছে। তাই রয়েসয়ে ঘুরিয়ে প্যাঁচিয়ে বলল,
“ আপনার গার্লফ্রেন্ড দেখতে অনেক সুন্দর!”
ধূসরের চোখজোড়া আরো ছোটো হয়ে বসল। কপালে গাঢ় ভাঁজ গেড়ে রইল রাতারাতি। পিউ উশখুশ করল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কেন বলছে না,আমার গার্লফ্রেন্ড নেই! ধূসরকে অমন করে চেয়ে থাকতে দেখে নিজেই বলল,
“ ঐ মানে আপনি যে মেয়েকে পছন্দ করেন সে অনেক সুন্দর সেটা বললাম।”
ধূসর কিছুপল সরু চোখে চেয়ে থেকে,হেসে ফেলল আচমকা। এই হাসি অনাকাঙ্ক্ষিত! পিউয়ের বুকে ছুরি দিয়ে কোপ দেয়ার সমান। এটা কি হাসির কথা? যেন গার্লফ্রেন্ডের প্রশংসা করায় খুশি ধরছে না।
মুখচোখ অন্ধকার করে বলল,
“ মারিয়া আপু সত্যিই আপনার গার্লফ্রেন্ড?”
উত্তরের বদলে ধূসর ভ্রু নাঁচিয়ে পালটা প্রশ্ন ছুড়ল,
“ তোর আমার গার্লফ্রেন্ড নিয়ে এত আগ্রহ কেন?”
পিউ মুখটা ছোট করে বলল
“ এমনি জানতে চাইলাম।”
“ পিউ! খেতে যা।”
বড্ড শক্ত আদেশ দিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল ধূসর। পিউয়ের কষ্টে বুক ফেটে গেল। জোরালো কদমে এসে দাঁড়াল ঘরের দরজায়। ফের বলল,
“ সত্যিটা বললে কী হয়?”
ধূসর যেতে যেতেই বলল
“ তোকে খেতে যেতে বলেছি।”
অথচ কোনোভাবেই সে সোজা উত্তর দিলো না।
পিউয়ের ভেতরটা সুদ্ধ টলমল করে ওঠে। গুটিশুটি মেরে দোর আগলে দাঁড়িয়ে রয়। ধূসর কী ভেবে পিছু ফিরে চাইল এবার। দেখল, একজোড়া ডাগর ডাগর চোখ কেমন বিষণ্ণ হয়ে চেয়ে আছে এখনো। দুই ঠোঁট ফুলিয়ে বিরক্ত শ্বাস ফেলে, উল্টোঘুরে এগিয়ে এলো সে। পর্বতের মতো সটান হয়ে দাঁড়াল পিউয়ের মুখোমুখি। কণ্ঠস্বর যথাসাধ্য পুরু করে বলল,
” এভাবে তাকাবি না।”
পিউয়ের মন খারাপের পাহাড় ভারি হলো আরেকটু। এখন ও তাকালেও বিরক্ত হচ্ছে! তাও কেন,কী জন্য! জিজ্ঞেস করতে পারল না। ধূসর কেমন ঠান্ডা নজর মেলে চেয়ে আছে,তাতেই গলা শুকিয়ে গেল পিউয়ের। সেকেন্ডে ঐ শীতল চাউনি ঘুরে এলো মেয়েটার মসৃণ চেহারা হতে। খসখসে গলায় জানিয়ে দিলো,
” তোর চোখদুটো খুব বিপজ্জনক!”
প্রখর রোদ্দুরে আকাশ ফেটে বজ্র ছুটে আসার মতো পরিস্থিতিতে, পিউ তৎক্ষনাৎ কিচ্ছু বুঝতে পারল না। দুই ঠোঁট ফাঁকা করে চেয়ে রইল বোকার মতো। ধূসর এত কাছে এসেছে এটাই যন্ত্রণার। যে তাকায়ই না ঠিক করে, সে আচমকা এমন কিছু করলে ও নেবে কী করে?
ধূসর ঠিক ওর ঐ মৃগনয়ন পানে চেয়ে সোজাসাপটা জানাল,
“ মারিয়া রওনকের বোন,দ্যাটস ইট!”
হাওয়ার বেগে মানুষটা চলে গেল তারপর। তবে কী বলে গেছে,এটুকু বুঝতেই পিউয়ের পানসে চেহারা বদলে গেল। মূহুর্তে যেন উজ্জ্বল তারার ন্যায় আলোকিত হল চারিপাশ। তার মানে ওটা ওনার গার্লফ্রেন্ড না! খুশি,আনন্দে পিউ দিশাহারিয়ে ফেলল। ওরনার দুইমাথা তুলে পাখির মতো চক্কর কাটল দুদিকে।
তানহা এলো সেসময়। ভেতরের এই দৃশ্যে অতি তাজ্জব হয়ে বলল,
“ তুই নাচছিস? ওমা,আমি ভাবলাম মেয়ে মনে হয় কেঁদে মরে যাচ্ছে।”
পিউ স্ফূর্ত স্বরে জানাল,
“ তানহা তানহা, ওটা ওনার গার্লফ্রেন্ড না।”
“ কে বলল?”
“ উনিই!”
তানহা অতি উত্তেজিত হয়ে বলল,
“ আর, আর? আর কী বলেছে? আই লাভ ইউ বলেছে?”
পিউ ভাবুক চিত্তে বলল,
“ তা তো বলেনি!
“ আর বলবে বলে মনে হয় না।”
“ তুই আবার আমাকে ডিমোটিভেট করছিস?”
আমার বিশ্বাস উনি বলবেন,একদিন ঠিক বলবেন ।”
ধূসর বেরিয়ে গেছে। যাওয়ার আগে মারিয়ার দেখভালের দায়িত্ব তুলে দিয়ে গিয়েছে মায়েদের হাতে। মিনাকে বুঝিয়ে দিয়েছে সব কিছু। রুবায়দার এই একটা ব্যাপারে ভীষণ মন খারাপ হয়। ছেলেটার অভিমান এত গাঢ়,এত! এখনো ঠিক করে তার সাথে দুটো কথা বলে না।
রুবায়দা আহত শ্বাস নেন। কবে যে ধূসর বুঝবে,সেদিন ওর ভালোর জন্যেই তো চুপ ছিলেন তিনি। চেয়েছিলেন বিদেশ-বিভুঁইয়ে গিয়ে ছেলেটার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হোক। কোন মা ছেলের খারাপ চাইবে? ধূসর কেন বোঝে না,কেন!
মিনা যখন শুনলেন বিকেল চারটে বাজে অথচ এখনো খায়নি পিউ! রাগে মুখটা লাল হয়ে গেল। গর্জে ডাকতে গেলেন,
“ পিইইই….”
উ অবধি আসার আগেই দুই ডানা ঝাপটে ছুটে এসে মায়ের সামনে দাঁড়াল পিউ। চোখমুখ ভরতি হাসি নিয়ে বলল,
“ এসে গেছি,এসে গেছি, মা!”
মিনা থতমত খেয়ে গেলেন। পরপর কড়া গলায় শুধালেন,
“ এতক্ষণ খাসনি ক্যানো?”
“ তোমার সাথে খাব ভেবেছিলাম!”
মিনা ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইলেন। পিউ দুলে দুলে হাসল। সন্দেহের জায়গায়ই নেই।
শেষে বললেন – বোসো।”
পিউ স্ফূর্ত গতিতে বসল। মারিয়া টেবিলে নেই। ওকে রুমে দিয়ে এসেছে পুষ্প। বাইরে থেকে এলো,ফ্রেশ হোক।
পিউ হাত চেটেচেটে খেলো। প্রত্যেকটা আইটেম এত মজা! মাঝেমধ্যে গদগদ হয়ে তারিফ করল মায়েদের। মিনা খুব খুশি হন। বাড়ির ছেলেমেয়েদের এমন স্বতঃস্ফূর্ত দেখলে কার না ভালো লাগে। পিউয়ের মাথায় হাতটা রাখলেন তিনি। মোয়ালেম স্বরে বললেন,
“ খাও মা!”
পিউ অবাক হয়ে চাইল। ডাগর দুটো চোখের পাতা ঝাপটে ভাবল, আজ কী কোনো বিশেষ দিন! আজ ওর সাথে এত ভালো ভালো ব্যাপার ঘটছে কেন?
****
সাদিফ বাড়ি ফিরল সন্ধ্যারও বেশ সময় পর। ক্লান্ত,সাথে মেজাজটাও গরম খুব। অফিসে একটা প্রজেক্ট নিয়ে কলিগের সাথে ঝামেলা হয়েছে। আবার ম্যানেজারও কলিগের পক্ষ নিয়েছেন। সাদিফ চাইছে না ব্যাপারটা ফায়াজ বা ওর বাবাকে জানাতে! দুদিন গিয়েই বন্ধুর সাহায্যে কোনো ক্রেডিট খাটানো ওর সাথে যায় না। তাই আপাতত নিয়ে মন-মেজাজ বিধ্বস্ত।
তারওপর তর্কাতর্কিতে সাদিফ লাড্ডুগুড্ডু বলা যায়। মুখের ওপর মোক্ষম জবাব ওর আসে না।
এই পৃথিবীতে, পৃথিবীতে কেবল ঝগড়ায় সাদিফ সেরা হয়েছিল ঐ একজনের সাথে। ঐ ম্যালেরিয়ার মশাটা। ওটাকে দেখলেই কীভাবে কীভাবে যেন সাদিফের জবান খুলে যায়। ইস,এমন যদি সবার সাথে হতো!
সাদিফ আবার সতর্ক হলো। চোখমুখ কঠিন করে ভাবল- আমি ঐ ফালতু মেয়ের কথা কেন ভাবছি? ও তো আমার শত্রু। যেদিন পাব মেরে একদম….”
দাঁত খিচতে খিচতে সাদিফ দরজায় এলো। এখন বাড়ির সবাই যে যার রুমে থাকার কথা। সন্ধ্যার চায়ের আসরের পরের সময়টা শিকদার বাড়ি একটু নীরবই থাকে। মায়েরা বিশ্রাম নেন,ছোটোরা পড়তে বসে। আর আজ তো চাচ্চুরাও বাড়িতে থাকবে না।
তারওপর ও চাবি নিয়ে বের হয়নি। তাই ডোরবেল টিপলো। গেস্টরুম ছিল নিচে। মা-ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলছিল মারিয়া। কলিংবেল শুনে ভাবল,কেউ হয়ত খুলবে। কিন্তু ঐপাশের মানুষটা এতই অধৈর্য, অগত্যা ফোনের লাইন কেটে নিজেই উঠে এলো মারিয়া। ছিটকিনি খুলল।
সাদিফ খেয়াল করেনি। চোখ নিচে ওর। তবে শারিরীক উচ্চতায় ভাবল,পুষ্প হবে। বিস্বাদ মুখে পাশ কাটিয়ে ঢুকতে গেল,এক চিৎকার দিয়ে উঠল মারিয়া,
“ এই এই এই…, আপনি, আপনি এখানে কী করছেন?”
চমকে, থমকে মুখ তুলে চাইল সাদিফ। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল মারিয়াকে দেখে। চোখের চশমাটা টেনে খুলে ফেলল। পা থেকে মাথা অবধি দেখল ওর। আবার পড়ল চশমাটা।
গোল গোল চোখ ঝাপটালো যতক্ষণ না নিশ্চিত হওয়া যায়! ততোধিক বিস্মিত মারিয়া। ওর মাথাও ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। এ ছেলে এ বাড়ি কেন? ওর পিছু নিয়ে এসেছে নাকি? ঐ যে সেদিন লোক ফিট করল মার খাওয়াতে? হায়হায়! পরপর ভাবল,হুহ কী করবি আমার? আমি এখন কাদের বাড়ি আছি জানিস? এরা মেরে তোর হাড়গোড় গুড়ো পাউডার বানিয়ে দেবে।
সাদিফের ঘটে এখনো কিছু ঢুকছে না। ও মানতেই পারছে না,মারিয়া ওদের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে। এটা ওদের বাড়িই তো? ফের দু পা পিছিয়ে এসে দরজার পাশে ঝোলানো একটা লেখায় চোখ বোলাল ছেলেটা। এটা পিউ-পুষ্পর হ্যান্ডমেড জিনিস। ধাপে ধাপে রং-তুলিতে লেখা – ওয়েলকাম টু আওয়ার সুইট হোম!
না,এটা তো ওদেরই বাড়ি। এইবার ভয়ানক রেগে গেল ছেলেটা। ওর বাড়ি এই মেয়ে কেন থাকবে? কী চাই এখানে? চটে এই প্রশ্নটা করতে হাঁ করল পূর্বেই মারিয়া বলল,
“ এখানে কী চাই?”
অমনি সাদিফের হাঁ-টা বন্ধ হয়ে গেল। থতমত খেল এক চোট। ওর মনের কথা এ মেয়ে কপি করল কী ভাবে! মারিয়া বুকের সাথে দুইহাত গুজে বলল,
“ মিস্টার সাদিফ,এটা ভদ্রলোকের বাড়ি। আপনার মতো ফার্মের মুরগীর তো খামারে থাকার কথা। এখানে আপনার কোনো কাজ নেই,সুতরাং আপনি এখন আসতে পারেন।”
সাদিফ আহাম্মক হয়ে চেয়ে রইল। ওর বাড়িতে ওকে ঢুকতে দিচ্ছে না! মারিয়া কোমরে দুইহাত রেখে খিটমিট করে বলল,
“ অ্যাই সাদা মূলা, এভাবে কী দেখছেন হ্যাঁ? আমার পিছু নিয়ে এখানে এসেছেন তাই না! কী ভেবেছেন,আপনাকে আমি ভয় পাই? মোটেও না। শুনুন,সেদিন ঐ ছেলেগুলোকে আমিই ভাড়া করেছিলাম। বলেছিলাম পিটিয়ে আপনার প্যান্ট ছিঁড়ে দিতে। এখন কী করবেন করুন! খবরদার যদি বাড়াবাড়ি করার চেষ্টাও করেছেন আমার সাথে। জানেন আমি কোথায়? চেনেন এদের? জানেন এরা কারা? একবার শিকদার আঙ্কেলকে বললে সোজা ঘাড় ধরে পুলিশে দিয়ে দেবে। তাই নিজের ভালো চান তো,ফুটুন এখান থেকে!”
সাদিফের শুভ্র-সাদা মুখটার সামনে তুড়ি বাজাল মারিয়া। সে কী হাবভাব! তারপর দরজাটা ওর মুখের ওপর লাগাতে গেল,সাদিফ খপ করে চেপে ধরল কাঠটা। চমকাল মেয়েটা। হকচকিয়ে বলল,
“ আবার গুণ্ডামো করছেন? ডাকব,ডাকব সবাইকে?”
তক্ষুনি হাজির হলো পুষ্প। সাদিফকে বাইরে দেখে বলল,
“ এ কী,তুমি বাইরে দাঁড়িয়ে আছ কেন?”
ঝট করে পিছু ফিরল মারিয়া। তাজ্জব হলো পুষ্পর কথা শুনে।
সাদিফ হিঁসহিঁসিয়ে বলল,
“ এই মেয়েটা,এই মেয়েটা আমাদের বাড়িতে কী করছে,পুষ্প?”
মারিয়া আরেক দফা হোচট খেলো। ফিরল আবার সাদিফের দিকে। এরা দুজন দুজনকে চেনে? পুষ্প তো আর এদের ভেতরের কথা জানে না। হেসে হেসে বলল,
“ ওহ, ও হলো মারিয়া! আমাদের গেস্ট। ধূসর ভাইয়ের বন্ধু আছে,তার বোন।”
সাদিফ আর্তনাদ করে উঠল,
“ কীহ! হোয়াট হোয়াট হোয়াট? ধূসর ভাই আর গেস্ট বানানোর মানুষ পেলেন না?”
পুষ্প ঘাবড়ে বলল,
কেন ভাইয়া,তুমি ওনাকে চেনো নাকি?”
সাদিফ হাঁ করেও থেমে গেল। ফুঁসলো সাপের মতো। এদিকে মারিয়া মহাবিপাকে পড়েছে।
ভাইয়া? এটা পুষ্পর ভাইয়া?
প্রশ্নটা করল কাচুমাচু মুখে
,” উনি তোমার কেমন ভাইয়া পুষ্প?”
“ সেজো মা আছে না? তার বড়ো ছেলে,ঐ যে রাদি; সাদিফ ভাইয়া আর রাদিফ আপন ভাই।”
মারিয়ার মাথা চারশো ভোল্টেজে চক্কর কাটল একটা। ঘোলা চোখ ফিরিয়ে চাইল সাদিফের দিকে। পৈশাচিক নজরে বাঁক হাসল ছেলেটা। শার্টের কলার ঝাঁকাল।
পরপর কপাল কুঁচকে বলল,
“ বাই দ্য ওয়ে,ধূসর ভাইয়ের বন্ধু তো ইকবাল ভাই। ওনার তো এরকম কোনো বোন নেই।”
“ আরে ভাইয়া,ওর ইয়ে ওনার বোন না। রওনক ভাইয়ার বোন। ওনারা ওমরাহ যাচ্ছেন তো,আবার ঢাকায় আত্মীয় স্বজন নেই তাই মারিয়া আমাদের বাড়িতে কদিন থাকবে।”
সাদিফ আগেপিছে শুনল না। ঝটকা খেলো রওনকের নামটা শুনে। চোখ বেরিয়ে এলো প্রায়। রওনকের বোন মারিয়া? ও নো!
মূহুর্তে সাদিফের সেই বাধাই করা অতীত মনে পড়ে গেল। কেমন চিবিয়ে চিবিয়ে রওনকের সামনেই বলেছিল,
“ ভাইবোন দুটোকে একইসাথে গাছে বেধে পেটাব!”
ভাবতেই খুকখুক করে কেশে উঠল সাদিফ। পুষ্প বিচলিত হয়ে বলল,
“ দেখেছো, তুমি এখনো বাইরেই দাঁড়িয়ে আছো। ভেতরে তো আসবে নাকি!”
সাদিফ খেয়াল করল, মারিয়ার মুখ শুকিয়ে আমসত্ব হয়ে গেছে। অমনি নিজের চিন্তা ঢেকে ফেলল সে। মুখটাকে রাগী রাগী বানাল। মারিয়া চুপসে সরে দাঁড়াল এক কোণে। নতজানু মেয়েটাকে দেখে সাদিফ আরো মজা পেয়ে যায়। পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে চোখ পাঁকিয়ে চেয়ে থাকে। পুষ্প ততক্ষণে পানি আনতে গিয়েছে। সাদিফ কাশছিল তাই।
সাদিফ চলে গিয়েছে ভেবে, মারিয়া চোরা চোখের কোণ তুলে চাইল,অমনি হাতটা বাড়িয়ে তেড়ে আসার ভয় দিলো ছেলেটা। সত্যিই ছলকে উঠল বেচারি। ‘ওমাগো’ বলে দমকা হাওয়ার মতো ছুটে চলল নিজের ঘরে। সাদিফ হেসে ওঠে,ভীষণ মজা পায়। পরপর মেজাজ খিচড়ে আসে এই মেয়ে এখানে থাকবে মনে পড়তেই। তার মানে রোজ একে সহ্য করতে হবে। যেহেতু বাড়ির গেস্ট, বের করতেও পারবে না। সাদিফ মাথা চুলকে অনেক কিছু ভাবল। আইডিয়া এলো কিছু একটা। প্রফুল্ল চিত্তে বলল,
“ মিস ম্যালেরিয়া,যেচে এসে মুরগীর খামারে ঢুকেছেন না? একটা ঠোকরও মিস যাবে না এবার। অপেক্ষা করুন! পেছনের সব হিসেব এবার আমি কড়ায় গন্ডায় তুলব।”
চলবে…
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭২.১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৩
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২০
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১১
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৯(ক+খ)
-
হেই সুইটহার্ট গল্পের লিংক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ১২
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮৭