#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(১০)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
পিউ খুব চিন্তায় পড়েছে। ওর রূপার পায়েলটা পড়ে গেছে কোথাও। সারা বাড়ি তন্নতন্ন করেও ও কোথাও পায়নি। খেয়ালও করেনি সারাদিন। পায়েলে ঝুনঝুন ছিল না। সেজন্যে এই একটু আগেই দেখল৷ কত্ত প্রিয় ছিল ওটা!
ঘরে পড়েছে না বাইরে,তাও মনে নেই। শেষ কখন পায়ে দেখেছিল তাও না। পিউ খুঁজতে খুঁজতে পুষ্পর ঘরে এসছে। তখন কল বাজছে। মেয়েটার। ফোন সাইলেন্ট ছিল।
স্ক্রিনে 2003 লেখা। পিউ খেয়াল করল,এই একই নম্বর থেকে কয়েকবার কল কেটে কেটে আসছে। অমনি ঠোঁট চেপে হাসল ও। সিম কোম্পানি থেকে বারবার কল দেয় না। এর আড়ালের মানুষটা কে,পিউ এখন জানে। পুষ্প ঘরে নেই। ওইই রিসিভ করল। কানে ধরতেই ওপাশ থেকে চেনা কণ্ঠস্বর বড়ো অস্থির হয়ে বলল,
“ এখনো রেগে আছো মাই লাভ? ফোন ধরছিলে না কেন?”
পিউ খুব কম আওয়াজে বলল,
“ হু।”
“ হু? মানে রেগে আছো? কিন্তু আমার কী দোষ বলো পাখি? আমি তো জানতাম না আঙ্কেল বাড়ি থাকবেন। আমি পার্সেলে লিখেও দিয়েছিলাম দুপুরের মধ্যে যেন যায়। ব্যাটা গেল বিকেলে। এসব
জানলে কী পাঠাতাম বলো?”
“ হু।”
“ হু হু করো না মাই লাভ। বুকটায় খুব ব্যথা করছে। বলো না,রাগ কমেনি? কী করলে রাগ কমবে? ফুচকা খাবে? পাঠাব?”
“ হু।”
“ আবার হু? আচ্ছা,
তাহলে কি স্ব-শরীরে এসে রাগ কমাতে হবে?”
পিউয়ের চোখ কপালে। ভ্রু কুঁচকে ভাবল,
“ বাড়িতে আবার কীভাবে আসবে?”
ইকবাল বলল,
“ কী হলো, কথা বলো? আসব আমি? আমাকে রাগিও না মাই লাভ। এলে কিন্তু কাউকে মানব না। তোমার হিটলার বাপকেও না। একদম সোজা তড়বড় করে তোমার ঘরে ঢুকে যাব। তারপর বিয়ের আগ….
এটুকুতেই পিউ আর্তনাদ করে উঠল,
“ ভাইয়া আমি,আমি পিউ!”
ওপাশটা থমকে গেল। এক ছটাক নীরবতায় ঘিরে এলো চারিধার। তারপর খট করে লাইন কেটে দিলো ইকবাল। পিউ ফোন নামিয়ে এনে একপল চেয়ে রইল স্ক্রিনে। পরপর হুহা করে হেসে উঠল মেয়েটা।
পুষ্প ঘরে এলো এর মধ্যে। পিউয়ের হাতে নিজের ফোন দেখে বলল,
“ কে ফোন করেছে?”
পিউ হাসতে হাসতে এগিয়ে দেয়,
“ ইকবাল ভাই!”
“ কী বলল?”
“ বলল তোর রাগ না কমলে বাড়ি এসে সোজা রুমে ঢুকবে।”
পুষ্প লজ্জায় হতভম্ব হয়ে বলল,
“ কীইইইই! ও বলল আর তুইও শুনলি? তোদের একটারও কি লজ্জা নেই?”
পিউ হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলো। নিজের ঘরে গিয়ে ফোন তুলে ম্যাসেজ দিলো ইকবালের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে।
“ ভাইয়া,আমি কিন্তু সব জেনে গেছি। বাবাকে যে হিটলার বললেন,বলে দেব?”
উত্তরে একটা ইমুজি পাঠাল ইকবাল।
“ ”
“ বলব?”
“ না মানে পিউ, তুমি ভুল ভাবছো বোনটি। আমি তো পুষ্পকে কল দিইনি। আমি ওয়াশরুমে ছিলাম। এখনো সেখানেই আছি।”
পিউ হাসতে হাসতেই লিখল,
“ আমি কখন বললাম আপনি আপুকে কল দিয়েছেন? তাও একটু আগে?”
“ …
ইকবাল সেন্টি খেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন ভাবছে কত কী! পরপর ব্যস্ত হাতে লিখল,
“ পিউপিউ লক্ষ্মী-সোনা বোন আমার, কাউকে বলে দিও না। এক্ষুনি এসব জানাজানি হলে তোমার বোন আমায় বিয়ের আগেই তালাক দিয়ে দেবে।”
পিউ ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
“ বেশ বলব না,কিন্তু তাতে আমার লাভ কী?”
“ তুমি বলো, কী লাগবে? ড্রেস থেকে যা চা…”
“ উহু, ওসব না। অন্য কিছু!”
“ আচ্ছা, কলেজে উঠলে ভাইয়া তোমাকে আইফোন কিনে দেব।”
“ হ্যাঁ তারপর কোথায় পেয়েছি আম্মু সে নিয়ে পিঠে তাল ভাঙুক।”
“ তাহলে কী চাও আপু?”
পিউ ঢোক গিলে লিখল,
“ ইকবাল ভাই, আমার একটা প্রশ্নের সত্যি সত্যি উত্তর দিলেই হবে।”
ইকবাল ফটাকসে জবাব দেয়,
“ কী? ধূসরের গার্লফ্রেন্ড আছে কিনা!”
পিউ তাজ্জব হয়ে বলল,
“ আপনি,আপনি কীভাবে বুঝলেন?”
“ কেন যেন মনে হচ্ছিল কোনো না কোনোদিন প্রশ্নটা তুমি করবে।”
পিউয়ের হাতজোড়া কাঁপল। ইকবাল ভাই কি সব জানেন? কিন্তু কীভাবে জানবে,ও তো এই কথা তানহা ছাড়া দুনিয়ার কাউকে বলেনি। ইকবাল তক্ষুনি বলল,
“ ইউ লাইক ধূসর,রাইট?”
পিউ হোচট খেল বিস্ময়ের। নিস্তব্ধের ন্যায় লিখল,
“ আপনি জানলেন কী করে?”
ইকবাল চেয়ারটায় নড়েচড়ে বসল এতক্ষণে। লিখল,
“ আমি সব জানি। এমনি এমনি কি আর একটা পার্টি অফিস চালাই?”
“ কাউকে বলবেন না প্লিজ! ধূসর ভাই,আপু কাউকে না।”
ইকবাল দাঁত মেলে হাসে। ধূসর যে আগেই জেনে বসে আছে,এড়িয়ে গেল সেটুকু। লিখল,
“ আচ্ছা,বলব না। তুমি আমারটা সিক্রেট রাখলে আমি তোমারটাও রাখব। আচ্ছা পিউপিউ তোমার কি ধূসরকে সত্যিই ভালো লাগে?”
পিউ একটু নুইয়ে গেল। ঠোঁট টিপে লাজুক চোখে লিখল,
“ আমি জানি না। তবে ওনাকে দেখলে হার্টবিট বেড়ে যায়। সব কিছু ঝাপসা লাগে। ভেতরটা অস্থির অস্থির করে, গলা শুকিয়ে যায়।”
“ আরে বাহ,এটাতো আমারো হতো তোমার বোনকে দেখলে। তবে আমি বলব,আগে শিয়র হও এটা এমনি ফ্যাসিনেশন কিনা। কারণ, তুমি অনেক ছোটো। ধূসর যা শক্ত মানুষ ওকে পাওয়া এত সহজ হবে না পিউ। ধৈর্য ধরতে হবে।”
“ আমি রাজি। তাতে আমার গোটা জনম চলে গেলেও,আমি পারব।”
ইকবাল হতবাক চোখে ওই দুই লাইনের ম্যাসেজের দিকে চেয়ে রইল কিছু পল। মাথার পেছন চুলকাতে চুলকাতে ভাবল,
“ ম্যাসেজটা পিউপিউই করেছে তো? এমন কথা তো আমি নিজেও জানি না।”
পিউ তক্ষুনি অধৈর্য স্বরে ভয়েস পাঠাল,
“ বলুন না ইকবাল ভাই,উনি সিঙ্গেল? ওনার গার্লফ্রেন্ড নেই তো?”
ইকবাল মুচকি হাসে। লিখে পাঠায়,
“ না। ওকে কে পটাবে বলো? ভাবের চোটে তো চোখেই দেখে না। না নিজে কাউকে লাইন মেরেছে,না কাউকে মারতে দিয়েছে।”
ব্যস এটুকুই জানার ছিল পিউয়ের। স্বস্তির শ্বাস ফেলে ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়ল ও।
ছাদের দিকে মুখ তুলে ভাবল,
“ আমি পারব। আমি!
ধূসর নামক প্রস্তরে প্রথম প্রেমের ফুল আমিই ফোটাব,ইকবাল ভাই। নাহলে আমার নামও প্রহর্ষা শিকদার পিউ না!”
****
আজ সেইদিন! ঢাকা উত্তর পার্টি অফিসের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের সময়। বেলা দশটা বাজে এখন। ধূসরের নীল গাড়ি মাত্রই চত্বর-এ থামল। গেইট থেকে দুই তলা ভবনের গোটা প্রবেশপথ ফুল দিয়ে সাজানো। দরজার ওপরেও থোকা থোকা করে লাল-সাদা বেলুন টাঙানো হয়েছে। সিঁড়ির হাতলে রয়েছে হলুদ গাদা ফুল। মাথার ওপর সফেদ সামিয়ানা টাঙানো গোটা উঠোন জুড়ে। খাবারের গন্ধ,সাড়ি সাড়ি লাল চেয়ার পাতানো। দুটো বড়ো বড়ো সাউন্ড সিস্টেম বক্স সব মিলিয়ে যেন এলাহী আয়োজন। তার মাঝে বিশাল ব্যানারে লেখা, “ অভ্যন্তরীন নেতৃত্ব নির্বাচন ,
গণতন্ত্র,ঐক্য,শৃঙ্খলা
আয়োজক, মোহাম্মদ ইকবাল পাঠান, প্রধান সভাপতি, গুলশান ২,ঢাকা উত্তর পার্টি অফিস।”
ধূসর গাড়ি পার্ক করতেই মিখাইল চোখের ইশারায় রওনককে দেখাল। পার্টি অফিসের আন্ডারে একটা স্টেশনারি শপ আছে। ওদের যা লাগে এখান থেকে নেয়, চা থেকে সব এখানেই খায়। বিল মেটানো হয় দল কর্তৃক।
রওনক ঠান্ডা চোখে চেয়ে ঐ চায়ে চুমুক দিলো। ধূসর কি-ফব টিপতেই গাড়িতে বিপ বিপ শব্দ হলো,আলো জ্বলে নেভে থেমে গিয়ে বোঝাল- কার লকড। ও সোজা অফিসের ভেতরেই যাচ্ছিল,হঠাৎ মিখাইল হাত তুলে ডাকল,
“ ধূসর ভাই!”
ধূসর থামল, চাইল ঘুরে।
“ কেমন আছেন ভাই? অনুভূতি কেমন?”
নামাল বলল,
“ ভাই চা খাবেন?”
ধূসর কী যেন ভেবে এগিয়ে এসে মুখোমুখি দাঁড়াল ওদের। দুইপাশে থাকা মিখাইল,নামালকে দেখল একবার করে। তারপর রওনককে বলল
“ অল দ্য বেস্ট।”
এতক্ষণ টিটকারির ফিচেল হাসিটা রওনকের মুছে গেল কিছু। গোমড়ামুখে বলল,
“ সেম টু ইউ।”
“ এভাবে? তুমি কি সব সময় এরকম রেগে থাকো?”
“ আমাকে বলছো? তুমি আয়নায় নিজেকে দেখো না?”
ধূসর থুতনিতে হাত ঘষে হাসল,,
“ আমি রাগী নই। আমার মুখটাই এমন। তবে এটাও ঠিক, আমার সবার সাথে জমে না।”
মিখাইল,নামাল দুজন দুজনের দিক তাকায়। নামাল বিভ্রান্ত চেহারায় চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বলে,
“ ভাই বসেন।”
ধূসর বসল না। রওনকের জ্বলজ্বলে রুক্ষ চোখ দেখে বলল,
“ চা খাও। বিল আমার!”
ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে কটমটিয়ে উঠল রওনক। চায়ের ভার ছুড়ে গেলে দিলো মাটিতে।
নামাল বলল,
“ এরে দেখলে গা জ্বলে। ওইদিন
কইলাম,শুনলেন না। এখন রিস্ক নিয়া কী হইল? ফাপড় দেখছেন? ও নিজেও জানে ও জিতবো।
এর চাইতে ওইদিন সরাইতাম, একদম পানির মতো রাস্তা খুলে যাইত।”
রওনক ঘুরেই ঠাস করে ওর গালে থাপ্পড় বসিয়ে দিলো। চিড়বিড় করে বলল,
“ তোর কি আমাকে ক্রিমিনাল মনে হয়? একটা নির্বাচন আর একটা পদের জন্যে আমি আরেকটা মানুষকে জানে মেরে দেব?
জিতলে আমি এভাবেই জিতব। হারলেও এইভাবেই হারব।”
নামাল চুপসে গাল ডলছিল। মিখাইল কানে কানে বলল,“ চিন্তায় ওর মাথা গরম। কথা বাড়াইস না।”
***
এই নির্বাচন কোনো জাতীয় পর্যায়ের না। শুধুমাত্র অফিস কেন্দ্রিক ছিল। দাঁড়িয়ে ছিল মোট চার জন। ধূসর,রওনক,সাইফ আর আব্দুল্লাহ। এখানে মোট নিবন্ধিত সদস্য, ৩০০ জন। নিয়মিত অফিসে থাকে, ৪০–৭০ জন
কার্যনির্বাহী বা নেতৃত্ব পর্যায়ের আছে, ১৫–২৫ জন। আজই নির্বাচন আর আজই ফলাফল ঘোষণা বলে সবাইকে বাধ্যতামূলক হাজির থাকতে হচ্ছে। চারটে খুঁটি গেড়ে, একটা কালো কাপড় প্য্যাঁচিয়ে ছোট্ট ঘর বানানো হলো। যেখানে গিয়ে সবাই ভোট দিয়ে আসবে। এগারটা নাগাদ কার্যক্রম শুরু হলো ভোটের। খালেদ,আর ইকবালের ভোট দেয়ার মাধ্যমে হালখাতা খুলল। এরপর এলো প্রার্থীদের পালা।
রওনকের নাম ছিল আগে। মিখাইল পিঠে চাপড় কাটে,সাহস দেয়। যোদ্ধার মতো বুক ফুলিয়ে সেই ক্ষুদ্র কক্ষে ব্যালট হাতে ঢুকতে নেয় রওনক। যেতে যেতেই চোখ বোলায় ব্যালটে। অমনি থমকে দাঁড়াল ও। চকিতে ঘুরে চাইল পেছনে। ইকবাল বুকে দুইহাত গুঁজে দাঁড়িয়ে ছিল। রওনক এমন চমকে নিজের দিকে তাকাতে দেখে মিটিমিটি হাসল সে। যেন জানতো,এরকমই হবে। রওনক আবার ব্যালটে তাকায়,আবার ইকবালের মুখে। চোখজুড়ে বিস্ময়, প্রশ্ন হাজার। পরপর তড়িঘড়ি পায়ে ইকবালের কাছে এগিয়ে এলো ও। সবার সামনেই শুধাল,
“ ব্যালটে ধূসরের নাম নেই কেন?”
ইকবাল সাথে সাথেই জানিয়ে দেয়,
“ ও নির্বাচন করবে না। সরে দাঁড়িয়েছে।”
সব কিছু শান্ত,চুপ। আকাশ থেকে পড়ল সকলে। একে অন্যের মুখ দেখল। রওনক হতবাক হয়ে বলল,
“ কীহ! কেন?”
“ তাতো আমি জানি না। পরশু রাতে আমাকে বলেছে ওর নাম তুলে নিতে। বারণও করেছে কাউকে না জানাতে। আমি ওর কথামতো সব তুলে নিয়েছি। এরপর বাকিটা তুমি নিজে জিজ্ঞেস করে দেখো। খালেদ ভাই বসে আছেন,আমার ওনাকে অ্যাটেন্ড করতে হবে। আসি।”
ইকবাল চলে গেল নিজের ব্যক্তিগত কামরার দিকে। রওনক স্তব্ধ মুখে দাঁড়িয়ে রইল দু পল। এখানে সকলেই প্রায় একইরকম বিস্মিত। কানাঘুষা,ফিসফিস আর চাপা স্বরের আলোচনা সব পেরিয়ে হঠাৎ কোনো এক দিকে ছুটে গেল রওনক।
একটা ভাঁজ হওয়া,বাঁকানো নারকেল গাছের গোড়ার চারপাশটা শান দিয়ে গোল করে বাঁধানো। পুরোটা লাল সাদা রং করে রাখা। ধূসর,আরিফ আর সোহেল বসেছিল সেখানে। আরিফ দুঃখে জর্জরিত হয়ে বলল,
“ না ভাই এটা কোনো কথা না। এটা কোনো কামের কাম হয় নাই। আমার ভালো লাগছে না।”
ধূসর কিছু বলল না।
চেয়ে রইল দোতলার করিডোরের পাঁচিলে উড়ে এসে বসা কাকটার দিকে৷ সোহেল বলল,
“ তুই কি মুখে তালা দিয়েছিস? আচ্ছা দে। কিন্তু তোর এই সরে যাওয়ার দাম কেউ দেবে না,ধূসর। উল্টে ভাববে তুই রওনককে ভয় পেয়ে হার স্বীকার করেছিস।”
ধূসর এ যাত্রায় পাতলা ঠোঁটটা তুলে নিঃশব্দে হাসল। আরিফকে বলল,
“ আমার জন্যে একটা স্পিড আনতে পারবে?”
আরিফ হতাশ হলো। অতীষ্ঠ ভঙিতে মাথা নেড়ে উঠে গেল সেই দোকানের দিকে। ধূসরের এক পাশের জায়গা খালি। সোহেল ছিল এ পাশে। হাঁ করল কিছু বলবে,মাঝপথে ও বলে উঠল,
“ তুমি কিছু বলবে রওনক?”
সোহেল থেমে যায়, চমকায়!
তার চেয়েও বেশি চমকে গেল গাছের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা রওনক। ধূসর তো পেছন ফিরে দেখেনি,তাহলে বুঝল কী করে! পুরো শরীরটা নিয়ে বেরিয়ে আসতেই সোহেলের মুখ হাঁ হয়ে গেল৷ বন্ধুর দিকে বিহ্বল চোখে চাইতেই,
ধূসর নির্লিপ্ত বলল,
“ এত অবাক হোস না। রোদে ওর ছায়া দেখা যাচ্ছিল।”
রওনক কিছুটা লজ্জায় পড়ল। ঘাড় ডলল বিব্রত মুখে। এসে দাঁড়াল। সোহেলের দিকে চাইল এক পল। অমনি নিজের বুদ্ধিতে উঠে গেল ছেলেটা।
সেদিক চেয়ে ফোস করে শ্বাস ফেলল রওনক। জিজ্ঞেস করল ইতস্তত করে,
“ তুমি নির্বাচন থেকে নাম সরিয়েছ,কোনো বিশেষ কারণ?”
“ ভয় পেয়েছি তোমাকে।”
“ মজা নিচ্ছ ধূসর? তুমি নিজেও জানতে তুমি জিতবে।”
“ আমার তা মনে হয়নি।”
“ ধূসর প্লিজ,আমাকে লজ্জায় ফেলো না। কেন সরে গেছ?”
ধূসর নিজের পাশের খালি জায়গা দেখাল,
“ বোসো।”
রওনক দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে বসল আজ।
ধূসর বলল,
“ আমি ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খেতে আসিনি। পলিটিক্স ইজ মাই প্যাশন। সেই প্যাশনের জন্যে আমার কোনো পদের দরকার হবে না।
সম্পাদক হই না হই,আমি শিকদার ধূসর মাহতাবই থাকব৷ পদটা বরং তোমার থাক। ওটা আমার চেয়েও তোমার বেশি দরকার।”
রওনকের মুখটা থমকে বসল।
“ আমার দরকার মানে! তুমি কী আমার ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করেছ?”
“ খোঁজ খবর নেয়া কে গোয়েন্দাগিরি বলে না।
তাছাড়া তুমি দিনের পর দিন সম্পাদক হওয়ার জন্যে দলের প্রতি নিজেকে বিলিয়েছ,শ্রম দিয়েছ। আমি সেখানে একটা অতিথি পাখি হয়ে এসে জায়গা দখল করতে চাই না। আমি বসন্তের কোকিল নই। তুমি আমাকে এখনো চেনোনি। যাক গে, সকালে অল দ্য বেস্ট এজন্যেই বলেছিলাম।”
রওনক নির্বাকের মতো চেয়ে থাকে। দৃষ্টির সাথে সাথে জিভটাও ওর শূন্য হয়ে বসেছে।
ধূসর নিজেই সামনে তাকিয়ে থেকে বলল,
“ ভেবো না আমি তোমাকে সহানুভূতি দেখাচ্ছি। বা দয়া করছি নিজের নাম প্রত্যাহার করিয়ে। তুমি এই পদের জন্যে অনেক বেশি ডেডিকেটেড রওনক। ইউ ডিজার্ভ ইট!”
শেষ দিকে ধূসরের কণ্ঠ মোলায়েম ছিল। চোখেমুখে আশ্বস্তি ছিল। রওনকের হৃদয় ছুঁয়ে গেল সেটুকু। তার বিহ্বলতার মাঝে আরিফ স্পিড হাতে হাজির হয়। তবে ধাক্কা খায় রওনক আর ধূসরকে পাশাপাশি দেখে। চোখদুটো গোল করে চেয়ে থাকে ছেলেটা।
ধূসর স্পিড নিতে হাত বাড়াল। আরিফ দেয়ার বদলে অবাক চোখে দেখে গেল তাও। বিড়বিড় করে বলল,
“ আপনারা একসাথে বসছেন? তাও এমন নিরিবিলি জায়গায়?”
রওনক অস্বস্তিতে পড়ল। কী করবে,না করবে বুঝতে না পেরে আরিফের হাত থেকে স্পিডের বোতলটা টেনে নিলো সে। ছিপি খুলে এগিয়ে দিলো ধূসরকে। আরিফের চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেল অমনি। ধূসর নিজেও বিস্মিত কিছুটা। তবে রওনক হাসল একটু। বলল,
“ নাও।”
ধূসর ধরল বোতল। ও বলল,
“ আম সরি ধূসর।”
“ কেন?”
“ ভুল বুঝেছিলাম তোমাকে।”
“ এখন ভেঙেছে?”
রওনক কিছু পল চুপ করে থেকে বলল,
“ সেদিন সবার সামনে ওভাবে বলায়, আমার ওপর রাগ রেখো না। আমি আসলে যা করছিলাম,আমার পরিবারের জন্যে। একটা বোন..”
“ আমি জানি।”
“ কীভাবে?”
“ তোমাকে ডাকছে।”
রওনক পিছু ঘুরে চাইল। অদূরের ভবন হতে মিখাইলরা হাত নেড়ে নেড়ে ওকে। ধূসর উঠে দাঁড়ানোর শব্দে চোখ ফিরিয়ে আনল রওনক। দাঁড়াল নিজেও।
ধূসর হাঁটার জন্যে পা বাড়াতেই ডাকল,
“ শোনো ধূসর!”
থামল ও। ঘাড় ভেঙে চাইতেই রওনক বলল,
“ এতদিন যা হয়েছে সেসব স্ট্রিক্টলি প্রফেশনাল। পার্সনালি নিও না। আমরা শত্রু নই।”
“ শত্রু কে ভাবছে? আমি তো ভাবিনি।”
আরিফ হেসে হেসে বলল,
“ ভাই কাউকে শত্রু ভাবে না। ভাইরে সবাই ভাবে।”
রওনক বিব্রত শ্বাসটা ঝাড়ল। হাত বাড়াল পাঞ্জা লড়ার মতো।
“ তাহলে বন্ধু?”
আরিফের হাসি আটকে বসে। ও আর দাঁড়ায় না। কাউকে একটা খবর দিতে,ছুটে যায় কোনোদিক। ধূসর শান্ত নজর ফেলে রওনকের হাতের দিকে দেখল।
সোজাসাপটা বলল,
“ না।”
রওনকের মুখ কালো হয়ে যায়। আশাহত ছাপ পড়ে। ধূসর তৎক্ষনাৎ একপেশে হেসে বলল,
“ যে মুখে বন্ধু ডাকবে,সেই মুখে তুমি ডাকবে দুটো তো একসাথে হয় না।
রওনকের দুই ঠোঁট ছড়িয়ে গেল এবার। কোণাকুণি তুলে রাখা হাতটা খপ করে ধরল ধূসর। দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরতেই, মাইক্রোফোনে ভেসে এলো ইকবালের কণ্ঠস্বর,
“ ভোট শুরু হয়েছে। কেউ ঘোরাঘুরি না করে ভবনের ভেতরে আসুন। যারা যারা বাইরে কোলাকুলি করছেন, ওসব আদিখ্যেতা ফেলে তারাও আসুন।”
****
ফেব্রুয়ারির ২ তারিখ….
ইকবাল ফোনে কারো সাথে নিরন্তর বকবক করছিল। ধূসর পেছনে এসে দাঁড়াল নিঃশব্দে। শুনতে পেলো ছেলেটা অস্থির হয়ে বলছে,
“ আরে বাবা,এক্ষুনি যাব তো। এদিকের কাজ গুছিয়েই যাচ্ছি।”
“ মাই লাভ, সুন্দরী মেয়েদের বেশি উত্তেজিত হতে নেই। আরে তোমার বোন তো আমারো বোন। আমি যাব না?”
ধূসর পিঠে হাত রেখে ডাকল। ইকবাল না চেয়েই হাতটা ঠেলে দেয়ার মতো করে বলল,
“ কে ভাই,ডিস্টার্ব করিস না।”
“ ইকবাল!”
ব্যস,ছেলেটার শ্বাস আটকে পড়ল সেখানেই। তড়িৎ ফিরল ও। দুহাত পেছনে বাঁধার নাম করে লুকালো ফোনটাকে। ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“ হ্যাঁ, হ্যাঁ বন্ধু, কখন এলি?”
“ কোথায় যাবি?”
ইকবাল ধরা পড়ে চোখ ঝাপটাল। ধূসর কতটা কী শুনেছে বুঝতে৷ বলল,
“ কোথাও না তো।”
“ তোর ভাইয়ের আজ পরীক্ষা না?”
“ হ্যাঁ হ্যাঁ। সে নিয়েই কথা বলছিলাম। মা এত বার বলছে একবার ওর কেন্দ্রে গিয়ে দেখতে।”
“ লাইনে তোর মা ছিলেন?”
ইকবালের চেহারা ফাটা বেলুনের মতো লাগল। কিছু বলতে না পেরে চেয়ে রইল মরা মরা চোখে। পরপর ব্যস্ত ভাবে বলল,
“ আ-আমি এখন যাই বুঝলি। দশটায় তো এক্সাম শুরু হয়ে যাবে। দেখি ভাইটার সীট কোথায় পড়ল। তুই কী করবি,যাবি? গেলে চল।”
ইকবাল নিশ্চিত ছিল ধূসর যেতে চাইবে না। সৌজন্যতায়,আর ওর যাতে সন্দেহ না হয় সেধেছিল সেজন্যে। অথচ মানুষটা ফট করে বলে দিলো,
“ যাব।”
মুখায়ব ভোতা করে হাসল ইকবাল।
অসহায় চোখে বলল,
“ ওহ,যাবি? আচ্ছা! চল তাহলে।”
ধূসর উঠে বসল গাড়িতে। ইকবাল ড্রাইভিং সীটে ওঠার আগে কিড়মিড় করে নিজের কপাল চাপড়াল। কেন গেছিলাম সাধতে? কেন?
পিউয়ের আজ প্রথম পরীক্ষা। কেন্দ্র পড়েছে অন্য স্কুলে। যেখানে পিউ কোনোদিন আগে আসেনি। আজ ওর সাথে বাবার আসার কথা। সকাল অবধি ঠিক ছিল সেসব। অথচ কপাল খারাপ থাকলে যা হয়। ঠিক বের হওয়ার আগ মূহুর্তে আফতাব জরুরি ফোন করলেন। কাতার থেকে যে টিম এসছে,তাদের এক্ষুনি অ্যাটেন্ড করতে হবে। আনিসের হাতে মেয়েটাকে ধরিয়ে দিয়ে,আমজাদ ছুটলেন সে কাজে। সামনে আরো পরীক্ষা আছে,তখন যাবেন নাহয়। আর এ-নিয়েই পুষ্প ভারি চিন্তায় পড়েছে। ছোটো চাচ্চুর আজ একটা মামলার শুনানি আছে। রাতে আলাপ করেছিল ওদের সঙ্গে। চাচ্চু যে বেশি সময় দিতে পারবে না ও জানে। পিউ একা একা কী করবে ওখানে? সেজো মা,রাদিফকে নিয়ে স্কুলে গিয়েছে। সাদিফ ভাই তো আজকাল তার বন্ধুর অডিট ফার্মের পেছনে দৌড়ঝাঁপে ব্যস্ত। মা-মেজো মা এসব বুঝবেন না। বড়ো সাধাসিধা রমনী দুজন। ও নিজেও যেতে পারছিল না,কারণ এরকম ভিড়ভাট্টার মধ্যে মা ওকে ছাড়েন না। মেয়ের বয়স ১৮ চলছে,এখনই তো দেখে রাখতে হবে। ধূসরকে কি বলা যায়? তার তো নাগালও পাওয়া দ্বায়! আবার কথাও বলতে ভয় ভয় লাগে। তাই ঠেলেঠুলে ও ইকবালকেই পাঠাল। অন্তত বড়ো ভাইয়ের মতো গাইড করতে পারবে।
এদিকে গাড়ি জ্যামে পড়েছে। পিউ উদগ্রীব হয়ে বারবার রাস্তায় দেখছিল। পাশে বসা আনিসের কল আসছে শুধু। বাদি পক্ষের লোকজন ওনাকে পাগল করে দিচ্ছেন। দশটা বাজার ঠিক ১৩ মিনিট আগে স্কুল গেইটের একটু দূরে গাড়ি থামল। পিউ নামল দ্রুত পায়ে। আনিস নামতেউ বলল,
“ চাচ্চু,তুমি চলে যাও।”
“ কেন? তোমাকে হলে বসিয়ে দিয়ে আসি।”
“ না না, আমি পারব। তানহা ওরা আছে তো। তুমি যাও। তোমার দরকারি কাজ আছে না?”
আনিস হাসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে একটা হাজার টাকার নোট ওর হাতে দিয়ে বললেন,
“ যাও,বেস্ট অফ লাক।”
চাচাকে বিদেয় দিয়েই মেইন গেইটে ছুটে এলো পিউ। অভিভাবকসহ, শিক্ষার্থীরা ঝাঁক বেঁধে ঢুকছে ভেতরে। চারপাশের শোরগোল,ঠেলাঠেলিতে অস্থির পরিবেশ। ছোটোখাটো মেয়েটা সেই মাতাল ভিড়ে ভেসে যাওয়ার জোগাড়। ফাইলটা উঁচুতে তুলে তুলে এগোচ্ছে পিউ।
দেওয়ালে টাঙানো নোটিশ বোর্ডে সবার রোল,আর হল নম্বর লেখা। এত্তগুলো স্কুলের সীট পড়েছে এখানে, পিউ বুঝতে পারছে না ওরটা কোথায়। এদিকে পরিচিত কাউকে দেখতেও পারছে না। তানহাটা কোথায় গেল? বের হওয়ার আগেই তো কথা হয়েছে দুজনের। মোবাইল ফোন সাথেও আনেনি যে কল দেবে আরেকটা। পিউ প্রবেশপত্র বের করে রোল নম্বরে চোখ বোলাতে গেল , তুরন্ত স্রোতের মতো ধাক্কা মেরে কয়েকজন ওকে ফেলে এগিয়ে গেল সামনে। পেছনে জড়বস্তুর মতো পড়ে রইল মেয়েটা। হাত থেকে ফাইল খসে পড়ল নিচে।
কেউ পায়ে মাড়ানোর আগেই আবার ধড়ফড় করে তুলল পিউ। সোজা হওয়ার সাথে সাথেই ফের ধাক্কা লাগল বহিরাগতদের সাথে। পিউয়ের শীর্ণ শরীর টলমল হয়ে পড়ে। পরীক্ষার্থীদের প্রত্যেকের সঙ্গে অভিভাবক কেউ না কেউ ছিলেন। কী যুদ্ধ করে একেকজন রোল নম্বর খুঁজে দিচ্ছে । পিউ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে রইল। কখন জায়গা ফাঁকা হবে,কখন সীট খুঁজবে ও? স্কুলের এই ভবন পাঁচ তলা। এতগুলো ক্লাসরুম। আন্দাজে যাবেই বা কোন দিকে? কেন যে চাচ্চুকে পাঠিয়ে দিলো? ইস!
ঘন্টা বাজল তক্ষুনি। জটলা বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা ত্রস্ত গতিতে এদিক-সেদিক ছুটতে শুরু করল। এক ঝাঁক ছেলেপেলে যেই দৌড়ে পাশ কাটাতে যাবে, একটা প্রবল সংঘর্ষ হওয়ার সম্ভাবনায় দাঁড়িয়ে ছিল মেয়েটা; তুরন্ত ওর কব্জি টেনে সরিয়ে নিলো কেউ একজন। এক ঝটকায় পিউয়ের মাথা এসে বাড়ি খেল আগন্তুকের প্রস্তরসম বুকে।
আঁতকে উঠল ও। তার চেয়েও বেশি চমকাল গা থেকে ছুটে আসা জেসমিনের গন্ধে। যা ঝাপসা করে দিলো চারপাশের সবকিছু।
ধূসর ভাই! পিউ স্তম্ভিতের মতো মাথা তুলে চাইল। দুশ্চিন্তায় অশান্ত বুকের তীব্রতার চেয়েও,তীব্র হয়ে উঠল ধূসরের এই অবিশ্বাস্য আগমন। পরপর কাঁপা কাঁপা চোখ নামিয়ে একবার নিজের পিঠের ওপর চাইল পিউ। ধূসর এক হাত বেড়ির মতো দিয়ে আটকে রেখেছে সেখানে, যাতে কারো সাথে ধাক্কা না লাগে। শান্ত,সুদৃঢ় দেওয়ালের মতো তা! পিউয়ের গাল দুটো প্রচণ্ড লজ্জায় লালচে হয়ে বসল। ফের চিবুক তুলে দেখল মানুষটাকে। ধূসর ভ্রু কুঁচকে চেয়ে আছে,ছুটতে থাকা ছেলেপেলের দিকে। এতক্ষণে দৃষ্টি নামিয়ে চাইল সে। অমনি খেয়াল পড়ল পিউ ওর খুব কাছাকাছি। মূহুর্তে মেয়েটার পিঠ থেকে হাত সরিয়ে নিলো ধূসর। পিউ নিজেও সরে দাঁড়াল একটু।
। সকালে প্রচন্ড শীত থাকায় সাদা ইউনিফর্মের সাথে একটা বটল গ্রীন ওভারসাইজড সোয়েটার পরেছিল ও। অথচ এক্ষুনি মনে হলো গরমে মরে যাচ্ছে পিউ। হঠাৎ কীসের গরম এত? ধূসর ভাইয়ের হটনেসের?
পিউ জিভ কাটে এপাশ ফিরে। চোখ খিচে ভাবে,
“ ওরে নির্লজ্জ মেয়ে, তোর আজ পরীক্ষা। আল্লাহ আল্লাহ না করে,কী ভাবছিস এসব!”
মেয়েটার হুশ ফিরল,ফাইলে টান পড়ায়। হকচকাল একটু। ধূসর ফাইল নিয়ে সোজা নোটিশ বোর্ডের কাছে এগিয়ে গিয়েছে। এডমিট কার্ডের সাথে মিলিয়ে খুঁজছে ওর রোল নম্বর। পেলোও দ্রুত।
সীট পড়েছে তিন তলায়। সেই পথে চুপচাপ ফাইল সমেত হাঁটা ধরল ধূসর। পিউ পিছু নিলো নিজের বুদ্ধিতে। ধূসরের লম্বা লম্বা পায়ের সাথে তাল মেলাতে বিড়ালের মতো ছুটতে হচ্ছে ওকে। তড়বড় করে একেক সিঁড়ি পেরিয়ে পেরিয়ে শেষে কাঙ্খিত পরীক্ষার হল পাওয়া গেল। ইনভিজিলেটর আসেননি এখনো। ধূসর দরজায় দাঁড়াতেই পিউ বলল ,
“ এই হলটা?”
ধূসর ফাঁকা সীট খুঁজছে।
মাঝে জিজ্ঞেস করল,
“ তোর চেনা কেউ নেই?”
“ হ্যাঁ, আমার বন্ধু আছে তো।”
“ কোথায়?”
পিউ তানহাকে কোথাও পেলো না। তবে বলল,
“ ওই তো রাইসা,ওর পরের রোল আমার।”
ধূসর সেই সাড়ি ধরে এগোয়। পেছনে যায় পিউ। কয়েকটা মেয়ে বড়ো বড়ো চোখ মেলে ধূসরকে দেখছে। কানাঘুষা করছে হেসে হেসে। পিউয়ের মাথা গরম হলো। দাঁত পিষে চোখ রাঙাল ওদের। মেয়েগুলো অচেনা,তব্দা খেয়ে গেল ওর কান্ড দেখে। পিউয়ের বেঞ্চের পরের বেঞ্চে তানহার সীট। ফাইলপত্র থাকলেও সে নেই। কোথায় গেছে কে জানে!
পিউয়ের রোল নম্বর লেখা বেঞ্চের ওপর ফাইলটা রাখল ধূসর। ঘুরে যেতে নিলেই মেয়েটা উদগ্রীব হয়ে ডাকল,
“ ধূসর ভাই!”
থামল মানুষটা। পিউ নিজেই বলল,
“ থ্যাংক ইউ!”
ধূসর তাকাল না। এক কদম এগোতে নিয়েও কী যেন ভাবল। দু দণ্ড পর গম্ভীর স্বর পিউয়ের কানে সেতার হয়ে বাজল,
“ ফোকাস অন ইয়র এক্সাম!”
ধূসর আর থামেনি। দরজার ওপাশে মিলিয়ে গেল তার দীর্ঘ ছায়া। পিউ অনেকক্ষণ চেয়ে রইল সেদিকে। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল অমনি। বুকের ভেতর দোলাচল শুরু হলো। এতদিন ধূসরের প্রেমে পড়া থেকে হৃদয়ের একটা কোণ বাকি ছিল বোধ হয়। কিন্তু আজ,ধূসর নিয়ে গেল সেটাও।
চলবে।
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৯
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৪.১
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৫
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৪(ক)
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৮
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১২
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৪(খ)
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব (০১+০২)
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১১
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ১৩