#আলতো_ছোঁয়ায়_সমুদ্রকথন__(০৫)
#নুসরাত_সুলতানা_সেঁজুতি
পিউ বিস্ময়ে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। হতবাক,হতভম্ব, হতবুদ্ধি আরো কত কী! মনে হলো এই রাতের বেলা সাইসাই বেগে এসে একটা বোম ব্লাস্ট হলো মাথার ওপর । সুদৃশ্য কোমল ঠোঁট জোড়া দুইদিকে হাঁ করে ধূসরের চতুরের মতো চোখদুটো দেখে গেল সে। মানুষটা ভ্রু দিয়ে ইশারায় খাতার দিকে দেখাল। শব্দ খরচ না করে তাড়া দিলো লিখতে।
পিউ ঢোক গিলল। হায়হায় করে উঠল নীরবে,
“ ওরে ব্রিটিশ! এই লোক এত ব্রিটিশ ক্যানো!
পিউরে,তুই বোধ হয় গেলি।”
তাও ঠোঁট টেনেটুনে হাসল মেয়েটা।
নিষ্পাপ গলায় বলল,
“ বা হাত দিয়ে কীভাবে লেখে,ধূসর ভাই? আসলে,কখনো লিখিনি তো।”
উত্তরে একটা জলদগম্ভীর স্বর শোনা গেল,
“ সেটা এক্ষুনি বোঝা যাবে। শুরু কর।”
পিউ পড়ল বিপাকে। ডান হাত দিয়ে মানুষ ইচ্ছে করে এঁকেবেঁকে লিখতে পারে না-হয়। কিন্তু বাম হাতে তা হয় নাকি! প্রথম অক্ষরের ‘’এ”টা লিখলেই তো ধূসর ভাই ধরে ফেলবেন।
কলমের নিপ পৃষ্ঠায় ছুঁইয়ে পিউয়ের হাতে যেন জং ধরে গেল। এগোলোই না।
ধূসর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“ লিখতে বলেছি।”
“ লি-লিখছি তো।”
পিউ এ-লিখতে কলমের মাথাটা ঘোরাতে নেবে,তক্ষুনি দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন মেজো মা।
“ ধূসর!”
এক ডাকে পিউয়ের চিন্তিত নত মুখটা সটান হয়ে গেল। চকিতে ফিরল পেছনে।
রুবায়দা ভেতরে ঢুকে বললেন,
“ তুই এখানে? আমি আরো তোর ঘরে গিয়ে খুঁজে এলাম। এখানে কী করছিস?”
পিউ এই মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করল না। মেজো মা এই সময় আসা মানে,তাকে স্বয়ং ওপর থেকে পাঠানো হয়েছে ওকে বাঁচানোর জন্যে। অমনি চেয়ার থেকে এক লাফ দিয়ে উঠে ছুটে গিয়েই মেজো মায়ের গা ঘেঁষে দাঁড়াল ও। আগ বাড়িয়ে হুলস্থুল বাঁধিয়ে বলল,
“ ধূসর ভাইকে একটা পড়া দেখাতে ডেকেছিলাম, মেজো মা। পড়া শেষ হয়ে গেছে। ধূসর ভাই, আপনি তাহলে যান এখন। আর লাগবে না।”
রুবায়দা বললেন,
“ ওমা এত রাত হয়ে গেল,আর কত পড়বি পিউ? মাথায় এত প্রেসার দিলে শরীর খারাপ হবে। এখন শুয়ে পড়।”
পিউ লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘাড় কাত করল।
“ আ-আচ্ছা।”
বলতে বলতে চোখের কোণ তুলে একবার মানুষটাকে দেখার চেষ্টা করল ও। চোরা নজর বুক অবধি পৌঁছালেও,মুখ ছুঁতে পারল না। রুবায়দা ডাকলেন,
“ ধূসর আয়। ভাত বেড়েছি,খাবি আয়।”
ধূসর এগিয়ে আসছে। পিউ ভুলেও আর চোখ তুলল না। গাট হয়ে মেজো মায়ের শরীরে ঢুকে রইল। জিভে ঠোঁট চুবাল কয়েকবার। সেই সাথে টের পেলো,বাবার পরে এই প্রথম পিউয়ের কাউকে প্রচণ্ড ভয় লাগছে। কেন লাগছে? ধূসর ভাই তো আর ওকে মারবেন না। ওই একটু বকবেন বড়োজোর!
তক্ষুনি ওই লম্বাটে পা জোড়া পিউয়ের ঠিক মুখোমুখি থামল। পলিশ করা ডার্বি শু থেকে কাঁপা চোখটা না চাইতেও তুলল পিউ। ততক্ষণে রুবায়দা ব্যস্ত ভাবে বেরিয়ে গেছেন। ধূসরের তেজোদৃপ্ত চোখ দুটো ধারালো খুব। এক দৃষ্টিতেই যেন শত ছুরি বসানো। পিউ একটু ঘাবড়ে গেল। নিভু নিভু চোখটা মেলে রাখল কোনোমতে। ধূসর কিছু বলতে গেলে রুবায়দা ফের ডাকলেন,
“ কই রে ধূসর, আয়।”
ধূসর চোখ বুজে দাঁত পিষে,থামল। গিলে নিলো ওটুকু। পরপর স্থূল গলায় বলল,
“ যতটুকু মানুষ, অতটুক থাক।
এত ছোট্ট গালে পাঁচ আঙুলের ছাপ বসাতে আমার খুব খারাপ লাগবে!”
পিউ কাচুমাচু চোখে চেয়ে রইল। চুপসানো মুখটা দেখে রাগ দমিয়ে মাথাটা একটু ঠান্ডা করল ধূসর। আর কিছু না বলে হনহন করে পাশ কাটাল মূহুর্তে। হয়ত ভাবল,ওর হুমকিতে কাজ হবে। বাচ্চা মেয়ে,ভয় তো পাবেই। অথচ সে যেতেই মাথা তুলে ঠোঁট চেপে হাসল পিউ। দুদিকে দুলে দুলে বলল,
“ হাতের ছাপ বসাতে খারাপ লাগলে ঠোঁটের ছাপ বসিয়ে দিন। আমি কী বারণ করেছি?”
তারপর বড়ো করে শ্বাস নিলো পিউ। গলে গেল আহ্লাদে। একা একা বিড়বিড় করল,
“ কত্ত কিউট করে ধমক দিয়ে গেল! আমার
পুকি ধূসর ভাই…”
রুবায়দা টেবিল ভরতি করে খাবার বেড়েছেন। আজ অনেক পদ রান্না হয়েছে বাড়িতে। ডাল থেকে ভাজি,মাংস- মাছ সবই ছিল। তবে মেইন ডিশ, সরষে ইলিশ।
খুব উচ্ছ্বসিত হাতে ছেলের প্লেটে ভাত দিয়ে চেয়ার টেনে বসলেন তিনি।
ধূসর বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসেছে। বসতে বসতে এক পল মাকে দেখে বলল,
“ বড়ো মা কোথায়?”
রুবায়দার হাসিটা কমল একটু। তিনি জানেন,এই প্রশ্ন কেন!
“ আপা,ঘুমোচ্ছে।”
“ তুমিও চলে যাও।”
“ আমি থাকলে তোর খারাপ লাগবে?”
“ খারাপ কেন লাগবে?”
“ তাহলে খা। আমি দেখি। কতদিন নিজের হাতে বেড়ে তোকে খাওয়াই না। আজ একটু মন ভরি!’’
ধূসর ভাতের লোকমা মুখে তুলতে তুলতে ঠোঁটের কোণ বেকিয়ে হাসল। বিদ্রুপের হাসি। রূবায়দা কষ্ট পেয়ে বললেন,
“ এখনো মায়ের ওপর রাগ করে আছিস?”
ধূসর চুপ করে খেয়ে গেল,যেন শুনতেই পায়নি। নিষ্পৃহ চিত্তে একের পর এক লোকমা তুলল গালে। ছেলে যে আর জবাব দেবে না, রুবায়দা বুঝলেন। নিজেকে সামলে ওকে সহজ করতে নতুন কথা তুললেন,
“ আচ্ছা,কী এই বয়সে গাল ভরে দাঁড়ি রেখেছিস বলতো। কেমন লাগছে দেখতে!”
ধূসর উত্তর দিলো নির্লিপ্ত গলায়,
“ দাঁড়ি নিয়ে কথা বলবে না। এটা আমার শখের!”
“ অদ্ভুত শখ হয়েছে দেখি।
তা রান্না ভালো হয়েছে তো?”
“ হুঁ।”
“ তাহলে আরেকটু দিই?” ধূসর আটকাল না। মানাও করল না।
ভদ্রমহিলা আরেক টুকরো ইলিশ ওর পাতে দিলেন। তৃপ্তি নিয়ে দেখলেন ছেলের খাওয়া। ধূসরের খাওয়া দেখেই বোঝা গেল, মায়ের রান্না সে কত মিস করেছে! শেষ করে
উঠতে নিলেই বললেন,
“ এখানে হাত ধো। বেসিনে যেতে হবে না।”
ছোটো বোলটায় ছেলের হাত রেখে ডলে ডলে ধুইয়ে দিলেন তিনি। ধূসর পুরোটা সময় মায়ের মোমের মতো মুখটা দেখল চেয়ে।
রুবায়দা চোখ তুলে চাইতেই, থমকালেন একটু। ছেলের নিষ্পন্দ – ঠান্ডা নজর বড্ড পীড়া দিলো। বিষণ্ণ চোখে বললেন,
“ যা করেছি তোর ভালোর জন্যেই করেছিলাম,বাবা। আর কত রেগে থাকবি?”
ধূসর হাতটা ছাড়িয়ে আনল। টিস্যুতে আঙুল মুছতে মুছতে বলল,
“ আমি কিছু বলেছি তোমাকে?”
“ তোর কী বলতে হয়? তুই মুখ না নাড়লেও বোঝা যায়, বুঝতে পারি আমি। আমি তো তোর মা।”
ধূসর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ভেবেছিল, কথা তুলবে না। কিন্তু অতীষ্ঠায় বেরিয়ে এলো ভেতর থেকে,
“ সাতটা বছর! একা,একটা নতুন দেশে। মা নেই,পরিবার নেই। অসুস্থ হয়েছি, বিছানায় পড়েছি,আবার একা একাই সেরেছি। একটা মিছিলে যোগ দেয়ার শাস্তি এতটা তীব্র হয় না মা। অনেক দিনের ঘা তো,একটু হালকা হই। তারপর দেখছি।”
রুবায়দা জলে ভরা ঝাপসা চোখ মেলে দেখলেন ধূসর ঘরের দিকে যাচ্ছে। গিয়ে ঘুমোবে হয়ত। কিন্তু যা বলে গেল, তাতে মায়ের ঘুমটা আর হবে আজ?
ধূসরের হুমকিতে আসলেই কাজ হলো না। পিউ থামার বদলে প্রেমিকা সুলভ পাগলামো আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলো । সেদিন তো কাগজ ছিল টেবিলে, আর এরপর থেকে রুমের আনাচেকানাচে ছোটো ছোটো চিরকুট আবিষ্কার করতে শুরু করল ধূসর। কখনো মাথার বালিশের ওপর কাগজে লিখে গেল,
– আপনার মাথাটা বালিশে রাখার অযোগ্য! এই মাথা থাকবে শুধু আমার…”
আর কিছু নেই। কিন্তু পরে কী হতে পারে ভেবেই ধূসর কেশে উঠল।
দাত-মুখ খিঁচে একবার যেতে চাইল,কান মলে দিতে। থামল পরপর। এরকম কথা নিয়ে ও পিউকে চার্জ করবে কীভাবে?
শুধু কাগজটা দুমড়েমুচড়ে বিনে ছুড়ে ফেলতে ফেলতে বিড়বিড় করল,
“ অকালপক্ব একটা!”
এরপর দিন সকালে,ধূসর যখন তৈরি হতে গেল দেখল পারফিউমের বোতলের নিচে ঠেসে রাখা আরেকটা কাগজ। চ সূচক শব্দ করল ও। সেখানে লেখা,
“ এটায় কী মদ মেশানো? নাহলে আপনি পাশ থেকে হেঁটে গেলে আমার এত নেশা নেশা লাগে কেন বলুন তো!”
ধূসর কিছুক্ষণ থম মেরে দাঁড়িয়ে রইল।
ওর মতো একটা ছেলে নিজের বাড়িতেই ইভটিজিংয়ের স্বীকার? তাও ঐ পনের বছরের পুচকের কাছে? কিন্তু কোনো প্রমাণ নেই। পিউ খুব চালাকি করছে। ওইদিনের লেখার সাথে আজকের লেখার মিল নেই,একদমই নেই। ধূসর ফের কাগজটা বিনে ছুড়ে মারল। মাথার রাগ গিলে নিয়ে বেরিয়ে গেল কাজে।
দেশে ফেরার পর সেই থেকে বাপ-চাচাদের সাথে ওর তেমন দেখা হয়নি। দুটোদিনই ও খুব রাত করে ফিরেছে। আবার বেরিয়েছে,যখন তারা ছুটেছেন কাজে। আজকে ধূসরের পার্টি অফিসের একটা বিশেষ দিন। খাতা-কলমে নিজেকে এই রাজনৈতিক দলের প্রতি উৎসর্গ করার দিন। দলের ভালো-মন্দে সে জড়িত থাকবে,আর তার ভালো-মন্দের দায়িত্ব দল নেবে… একটা ছোট্ট ফর্ম পূরণ করে,নিচে প্যাঁচানো হাতে নিজের নামটা সাইন করতেই,
সবাই হৈচৈ তুলল। আরিফ চ্যাঁচাল একটু বেশি। ধূসর দলে যোগ দেয়ায় তার খুশি ধরছে না।
খালেদ সহ সবাই বুকে বুক মেলাল। রওনক মেলাল মুখ ভার করে। তবে সরে গিয়ে ধূসরের দুই বাহু ধরে বলল,
“ ওয়েলকাম, আশা রাখি দলের উন্নয়ণে নিজের বেস্টটাই দেবে।”
ওর মুখের হাসিটুকু যে টেনেহিঁচড়ে আনা,ধূসরের বুঝতে সময় লাগল না। সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট টেনে হাসল সেও। রওনকের কাঁধ চাপড়ে বলল,
“ উণ্ণয়ন একা একা হয় না। দলের সবাইকে এক থাকতে হয়। মুখে এক মনে আরেক, নিজেদের মধ্যে যেদিন এমন কিছু থাকবে না,দলের আসল উন্নতি সেদিন আশা কোরো।”
ধূসর চলে গেলেও রওনক মেজাজ খারাপ করে চেয়ে রইল। বিড়বিড় করল নাক ফুলিয়ে,
“ দুদিনের বৈরাগী আমাকে এসছে জ্ঞান দিতে!”
পার্টি অফিসের প্রধাণ কাজ ইকবাল সামলায়। সেই সিদ্ধান্ত নেয় বড়ো বড়ো ব্যাপারে। মাঝে আলোচনাও করে দায়িত্বরত এমপি মহোদয়দের সাথে। পার্টি অফিসে প্রায়ই খাবারের উৎসব হয়। সরকারের তরফ থেকেও আসে,ওরা নিজেরাও আয়োজন করে। আজকের আয়োজনে ভুনা খিচুড়ি আর মাংস ছিল। রান্না হচ্ছিল অফিসের খালি রুমটায়। ইকবাল একবার তদারকি করে এলো সেখানে। গরমে ওর নীল পাঞ্জাবির পিঠ ছুঁয়ে টপটপ করে ঘাম ঝরছে। এরপর নিজ কার্যালয়ের এসি রুমটায় এলো বাতাস খেতে।
এদিক ওদিক চেয়ে
বলল,
“একটাও টিস্যু বক্স নেই। সব কি পাছা মুছতে নিয়েছে? ঘেমে গেছি আমি।”
ধূসরের এক কানে ব্লুটুথ। কপাল কুঁচকে স্ক্রিনে কিছু দেখছিল। পরনে একটা কালো শার্ট,ভেতরে সেই একইরকম ক্রিউ নেকের কালো গেঞ্জি। ইকবাল বলল,
“ এই যে লাটসাহেব, আপনার কাছে রুমাল আছে? ওই ব্যাটা, আরে ওই?”
ধূসর চোখ তুলে চাইল। কপালের ভাঁজটা গাঢ় করে শুধাল,
“ কিছু বললি?”
ইকবাল ধপ করে ওর পাশের চেয়ারটায় বসল। হা-হুতাশ করে বলল,
“ এই সমাজ আসলে আমার মতো ফুলের জন্যে না। পৃথিবী এখন জালেমদের,দোসরদের,ধূসরদের।”
“ একটা কাজে আছি ইকবাল। কী লাগবে বল!”
“ মুখটা ধুয়ে এলাম। আপনার কাছে মোছার কিছু থাকলে দিন ভাইয়া!”
ধূসর পকেট থেকে
রুমাল টেনে বের করতে গেলে,সাথে সাথে একটা কাগজের দলা পড়ল নিচে। ইকবালের চোখ দেখে মনে হলো বোম পড়েছে। আঁতকে বলল,
“ এএএএ এটা কী?”
অতর্কিতে তুলল ও। অর্ধেক ভাঁজ মেলতেই দেখল আঁকাবাঁকা হাতে লেখা,
“ খান কী আপনি?”
এই এক লাইনেই চোখ তুঙ্গে ছেলেটার। ভ্রু কপালে নিয়ে বলল,
“ ইই গালি দিয়েছে?”
মূহুর্তে বাইরের দিক চেয়ে রেগেমেগে চ্যাঁচাল
“ কোন ফকিন্নিরপূত আমার বন্ধুর পকেটে গালাগালি রেখেছিস? সামনে আয়,শালা সামনে আয়! “
ধূসর চ সূচক শব্দ করে কাগজ ছিনিয়ে নিলো। পুরো ভাঁজ মেলে দেখল,
“ খান কী আপনি, এত ড্যাশিং কেন?”
তারপর শান্ত বিরস মুখে বলল,
“ গালি দেয়নি৷ কী খাই প্রশ্ন করেছে!”
“ হ্যাঁ?”
ধূসর পুরো কাগজ ঘুরিয়ে ওর সামনে ধরতেই,ইকবাল চোখ বড়ো বড়ো করে পড়ল আবার। তাও উচ্চারণ করে টেনে টেনে। সোজা হয়ে বলল,
“ ওওওহ স্পেসটা দেখিনি। এই,এক মিনিট! এমন কথা কে লিখল তোকে?”
ধূসর বলতে চাইল না। ঠোঁট কামড়াল বিরক্ত মুখে। ইকবাল বুদ্ধি দিয়ে নিজেই ধরে ফেলল। মিটিমিটি হেসে বলল,
“ উমহুম, পিউপিউ লিখেছে তাই না।”
তারপর খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠল
সে। ধূসর চোখ রাঙিয়ে ধমকাল,
“ ইকবাল চুপ! এমনিই মেজাজ চটে আছে। কানের গোড়ায় মারব।”
“ মেজাজ চটে আছে? আহা কেন, পিউপিউটা ভীষণ জ্বালাচ্ছে মনে হয়?”
ধূসর এবারেও মুখ শক্ত করে চুপ করে রইল। ইকবাল কাঁধে হাত রেখে বলল,
“ আরে প্যারা নিচ্ছিস কেন, বয়স কম তো। হ্যান্ডসাম দেখে একটু ফ্যাসিনেশনে ধরেছে। বড়ো হতে হতে নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।”
ধূসর পাতলা ঠোঁট একটার ওপর আরেকটা চেপে ছোট্ট শ্বাস ফেলল। সেই নিঃশ্বাসেই যেন চাইল, এরকমই হোক। ও খুব রেগে যাওয়ার আগে,পিচ্চি নিজেই শুধরে যাক।
ইকবালের ফোন ভাইব্রেট হচ্ছে। টের পেতেই ও পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটু করে মাথাটা তুলল ফোনের। স্ক্রিনে ‘ মাই লাভ’ দেখেই চোখটা দাঁড়িয়ে গেল। তড়িঘড়ি করে রাখতে যাবে,ধূসর বলল
“ মাই লাভ!”
এদিক ফিরে আলগোছে জিভ কাটল ইকবাল। হতচ্ছাড়াটার চোখ না আর কিছু? তারপর আমতাআমতা করে হেসে তাকাল ওর দিকে। বলল,
“ ওই যে বললাম না সেদিন, আমার একটা মেয়েকে পছন্দ? কেসটা সেট হয়ে গেছে। কথা বলব একটু?”
“ তোর গার্লফ্রেন্ড, তোর ইচ্ছে। আমাকে জিজ্ঞেস করার কী আছে?”
ইকবাল থতমত ভাব করে উঠে গেল ঐ কোণে। ফোন রিসিভ করে ফিসফিস করল,
“ মাই লাভ,ধূসর পাশেই আছে। পরে ফোন করি পাখি?”
তারপর লাইন কেটে আবার আগের জায়গায় এসে বসল ও। একটু আধটু চিন্তায় ধরলেও,খেয়াল করল ধূসর ওর গার্লফ্রেন্ড নিয়ে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। নিজের মতো কী একটা গেম মেলে বসেছে। কার রাইডিংয়ের ভো ভো শব্দে ইকবাল স্বস্তির শ্বাস ফেলল।
ধূসর যদি বলতো, ভাবিকে দেখা। কী করতো তখন? অবশ্য ছেলেটা এমনই। নিরামিষ! যাক, ভালোই হয়েছে।
সময় তখন দুপুর। বাইরে ভীষণ রোদ।
কিন্তু এসির হিমের মধ্যে মাথা নুইয়ে দাঁড়িয়ে আছে পিউ। এটা প্রিন্সিপালের রুম। বিশাল মানারাতের দায়িত্ব প্রধান,অধ্যক্ষ নুরুল ইসলাম। এমনিতে এই কক্ষে পিউ তার স্কুলজীবনে খুব কমই এসেছে। আঙুলের কর গুণে বলা যাবে সেই সংখ্যা। তাও কাজে,দরকারে। এসেছে,ফুরুৎ করে চলে গেছে আবার। কিন্তু আজ এই প্রথম বার ক্লাস টিচার শিরিনের দ্বায়ের করা অভিযোগের জের ধরে পিউ দাঁড়িয়েছে কাঠগড়ায়।
অপরাধটা হলো, শিরিন ম্যাম হোমওয়ার্ক দিয়েছিলেন। গতকাল পিউ করে আনেনি,ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু বলেছিল, অসুস্থ। ম্যাম মাফ করে দিয়েছিলেন। তবে আজ,আজ যখন আবার হোমওয়ার্কের ডাক পড়ল,আর পিউ জায়গা থেকে নড়ছিল না,ম্যাম নিজেই উঠে এলেন ওর কাছে। খাতা চেইক করতে গিয়ে পৃষ্ঠা উলটে দেখলেন, সাদা কাগজে
কোনো পুরুষের স্কেচ। নাক-মুখ ছাড়া একটা চেহারা,তবে মাথায় চুল, পরনে শার্ট। কানে কাঠগোলাপ গুঁজে নিচে লেখা -” পুকি ধূসর ভাই!”
পিউয়ের এখন ভীষণ ভয়ে মরে যাওয়ার দশা। প্রিন্সিপাল স্যারের সাথে আমজাদ শিকদারের বেশ ভালো সম্পর্ক। ওদের পুরো পরিবারের সঙ্গেই জানাশোনা ভালো। জ্ঞাতিগোষ্ঠী সবই তো এখানে পড়েছে। এটা স্কুল+কলেজ, গুলশানের নামকরা ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক। স্যারের মেয়ের বিয়েতেও গেছিল পিউ। এখন যদি বাবার কানে চলে যায়? শিরিন ম্যাম কী থেকে কী বলেছেন কে জানে!
কেন যে তখন তানহার কথা শুনল না। মেয়েটা কতবার ফিসফিসিয়ে বলছিল,
“ পিউ,ম্যাম ক্লাস নিচ্ছেন। হোমওয়ার্ক চাইছেন!”
“ থাক।”
“ থাক কী? তুই কী ভাবছিস ভাই, পড়ায় মন দে তো!
জবাবে উদাস পিউ বলল,
“ পড়ে কী হবে? বর তো খুঁজেই পেয়ে গেছি।”
নুরুল ইসলাম টেলিফোনে কথা বলছেন। পিউ পেটের কাছে দুহাত বেঁধে জড়োসড়ো ভঙ্গিতে আনত হয়ে আছে। নড়ে উঠল ভদ্রলোকের এক ডাকে,
“ প্রহর্ষা,কী ব্যাপার?”
“ জি স্যার,ভালো!”
“ ভালো? কী ভালো সে তো বুঝতেই পারছি। শিরিন ম্যাডাম তোমার নামে এক ঝুড়ি কমপ্লেইন করে গেলেন কেন তাহলে?”
পিউয়ের চেহারা শুকিয়ে গেল। উনি বললেন,
“ তোমার নাকি ক্লাসে মন নেই? ঠিকঠাক হোমওয়ার্ক করছো না,ক্লাসে পড়া ধরলে পারছো না। কথা বলছো সারাক্ষণ!
I’m extremely disappointed.”
পিউয়ের মাথা আরো নিচে নেমে গেল ।
“ প্রহর্ষা, তুমি কিন্তু শিকদার বাড়ির মেয়ে। তোমার বাবা-চাচাদেরকে চিনি। তোমার বাবা বার্ষিক কতগুলো টাকা ডোনেট করেন এখানে, তোমাদের বাড়ির প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে এখানে পড়েছে। ভালো মার্কস নিয়ে পাশ করেছে। সেখানে শিরিনের কাছে আমাকে শুনতে হলো,তোমাকে নিয়ে তিনি আশাই দেখতে পাচ্ছেন না। আশ্চর্য!”
পিউ কিছু একটা বলতে চাইল। একটু সাফাই দেবে নিজের,নুরুল থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“ সব থেকে বড়ো কথা, তোমাদের বাড়ির ছেলে ধূসর মাহতাব কিন্তু এই মানারতের টপ ফাইভ স্টুডেন্টদের একজন।
তুমি ধূসরের বোন! তোমাকেও তো ওর মতো হতে হবে।”
পিউয়ের কথাটা পছন্দ হলো না। আবার প্রিন্সিপালকে ঠাটবাট দেখাতেও পারল না।
মুখ গোজ করে বলল –
“ চাচাতো বোন।”
“ তুমি ফাঁকিবাজি কম করো, এক মাসও নেই বোর্ড এক্সামের। মনে রাখবে ধূসর তোমার ভাই! ওর নাম একটু হলেও তোমার বজায় রাখা উচিত।”
পিউ বিড়বিড় করে বলল,
“ চাচাতো ভাই।”
ভদ্রলোক শুনতে পেলেন না। নিজের মতো এক দেওয়ালে দেখালেন,” এদিকে দেখেছ?
গোল্ডেন প্ল্যাগে ধূসরের নাম দেখো। টপ ফাইভদের মধ্যে সে সেকেন্ড ওয়ান ,যার পর এই মার্ক্সের রেকর্ড এখন অবধি কেউ ভাঙতে পারেনি। ৯৮.৯%…
আবার, এইচ এসসিতে ও বোর্ড স্ট্যান্ড করেছিল। আমজাদ সাহেব বলেছিলেন তুমি ভালো ছাত্রী। আমিও তাই জানতাম। কিন্তু এভাবে চললে তো একই বাড়ির মেয়ে হিসেবে তোমার নাম থাকবে এখানে?”
পিউ মলিন চোখে ঐ দেওয়ালে চেয়ে রইল। সোনালী ফ্রেমে মোড়ানো,একটা বাঁধাই করা চার্টে পাঁচজন শিক্ষার্থীর নাম। ওপরের দুজন ছেলে। প্রথম নামটা “ সৈকত হোসেন-৯৮%
( পরীক্ষার পাশের সন লেখা)
পরের বছর,এইচ এস সি ব্যাচে
ধূসর মাহতাব – ৯৮.৯%( পাশের সন লেখা)
এরপর একটা মেয়ের নাম,তারপর আবার দুটো ছেলে। কিন্তু ওদের মার্ক্স ধূসরের চেয়ে কম। পিউয়ের ঝুঁপ করে সব অন্ধকার হয়ে গেল।
ও ভালো স্টুডেন্ট ঠিক আছে, সায়েন্সের ছাত্রী! কিন্তু ওর মার্কস তো ৯ এর ঘরে যায়ই না। ৮-এ বসেই এক্কা-দোক্কা খেলে। সেখানে ধূসর ভাই!
চট করেই যেন পিউয়ের সামনে পৃথিবীর তিক্ত সত্যটা উন্মুখ হয়ে গেল। ধূসর ভাই এত মেধাবী হয়ে ওর দিকে ফিরবেন কেন?
পিউ তো নিজেকে যোগ্য প্রমাণই করেনি।
নাহ,এটাই সুযোগ। এসএসসিতে পিউকে খুব ভালো রেজাল্ট করতে হবে। মন দিয়ে পড়তে হবে তার আগে। মেয়েটা মূহুর্তে পিঠ সোজা করে বলল,
“ এখন থেকে ভালো করব স্যার।”
“ শিয়র? আর আসতে হবে না তো এখানে?”
“ নো স্যার।”
ওদের কথার মাঝেই একটা নিরেট কণ্ঠস্বর ছুটে এলো বাইরে থেকে। দরজায় টোকা দিয়ে বলল,
“ আসব স্যার?”
পিউ চমকে ঘুরে চাইল। এই স্বর তো ওর চেনা।
নুরুল ইসলাম বললেন,
“ আসুন।”
দরজাটা ঠেলল ইকবাল। কিন্তু পিউয়ের চোখ গিয়ে আটকাল ধূসরের ওপর। ওরেহ,আজকে কালো শার্ট পরেছে। আবার একটা বোতামও লাগায়নি। এই ব্যাটা রূপের আগুনে ওকে মারবে নাকি?
পরপরই পিউ নিজের বেহায়া নজর সংযত করে ফেলল। ঘুরে গেল মিনিটে। মনে পড়ল ও কোথায় আছে এখন। এটা বিপদসীমা। এখন যদি স্যার ধূসর ভাইকে বলে দেন, ও কেন এখানে এসছে, কীসের জন্যে! ইজ্জত তো চটকানো জুস হয়ে যাবে।
সোহেল,ইকবাল,ধূসর তিনজনই এসেছে। নুরুল ইসলাম অবাক হয়ে বললেন,
“ ধূসর নাকি?”
ঘাড় নাড়ল ছেলেটা। ভদ্রলোক মূহুর্তে হেসে বললেন,
“ আই সী! তাইত এত চেনা লাগছিল। লম্বা হয়ে গেছ। আমি তোমার নাক আর তাকানো দেখে বুঝলাম। কবে ফিরলে? ইকবাল অবশ্য বলেছিল তোমার কথা। বসো।”
ধূসর বসল চেয়ারে। বাকি চেয়ার দুটো টেনে বসল ওরাও। ইকবাল বলল,
“ হ্যাঁ স্যার,আমিই ওকে বললাম। তাই দেখা করতে এলো।”
এত কথাবার্তার মাঝে শুধু পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল পিউ। স্যার তো ওকে যেতেও বলছেন না।
ইকবালের চোখ পড়ল তক্ষুনি। বলল,
“ পিউপিউ না? ক্লাস রেখে এখানে যে?”
পিউ আরো গুটিয়ে গেল। নূরুল ইসলামের দিকে তাকাল করুণ চোখে। খুব মিনতি করে মাথা নাড়ল দুপাশে। যেন না বলে!
ভদ্রলোক দয়া করলেন। বললেন,
“ একটা কাজে এসেছিল। যাক গে, প্রহর্ষা,তুমি যাও এখন।“
পিউ হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। চটজলদি পা বাড়াল ফিরতে। যেতে যেতে আড়চোখে একবার তাকাল ঐ শ্যামলা গড়নের মানুষটার পানে।
নাহ,তার তো এদিকে মন নেই। চোখ দূরের কথা। এমন ভাবে বসে আছে,যেন পিউকে চেনেই না। অগত্যা হতাশ শ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেল মেয়েটা। যেতে যেতে ভাবল,
“ খুব শীঘ্রই আপনাকে আমি জয় করব, ধূসর ভাই। আপনার যোগ্য হব। তখন আপনি আর এভাবে মুখ ঘুরিয়ে রাখতে পারবেন না। আপনার জন্যে পড়তে ভালো না বাসা পিউটাকে আজ থেকে পড়াকু বানাব। নো কাটস,নো বাটস,নো কোকোনাটস- পিউয়ের স্বপ্নের রাজপুত্র শুধু আপনিই হবেন।”
***
দুপুর তিনটা বাজে প্রায়। বেল বাজতেই হাতের কাজ ফেলে ছুটে গিয়ে দোর খুলল মারিয়া। ক্লান্ত রওনক ওকে দেখে মৃদূ হাসল একটু। সারা মুখে ঘাম চিকচিক করছে। মারিয়া ভাইয়ের ওপর রেগে ছিল, কিন্তু চোটপাট গিলে নিলো অমনি। রওনকের অবসন্ন মুখখানা দেখে দরজা খোলা রেখেই ছুটল কোথাও। ছেলেটা আস্তেধীরে ঢুকল ভেতরে। দরজার পাশে রাখা কাঠের চেয়ারটায় বসে জুতো খোলার মাঝে, রোজিনা খাতুন সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“ কী রে,আজকে একটু তাড়াতাড়ি আসতে পারলি না! মেয়েটা রান্নাবান্না করে কখন থেকে বসে আছে একসাথে খাবে। ফোনটাও ধরিসনি। এটা ফেরার সময়, বাজে কটা এখন?”
“ কী করব বলো,শাহবাগে গেছিলাম। ওখানে যা জ্যাম। কাজ শেষ করতেও সময় লাগল। খালিদ ভাই এত ঘোরান!”
রোজিনা পানসে মুখে বললেন,
“ থাক,তোর ওসব রাজনৈতিক আলাপ শুনব না আমি। কাজের কাজ নেই, সারাদিন টইটই শুধু!”
দুপাশে মাথা নেড়ে হাসল রওনক। মা, রাজনীতিকে কাজই ভাবেন না কোনো। অথচ সকালে পার্টি অফিসে গেলে,বিকেল যে কোন দিক থেকে হয় ওরাই জানে। মারিয়া গ্লাসে ঠান্ডা জল নিয়ে এলো। ভাইয়ের দিকে যেতে যেতে মাকে বলল,
“ আহা মা,আসার সাথে সাথেই শুরু করে দিও না। ভাইয়াকে একটু বিশ্রাম করতে দাও।”
রোজিনা তব্দা খেয়ে বললেন,
“ ওমা আমি তো তোর হয়েই বলছিলাম। কী পল্টিবাজ বংশ রে, এতক্ষণ ভাইয়ের ওপর সাপের মতো ফুঁসছিল,আর আসতেই সুর পালটে ফেলেছে।”
রওনক হেসে ফেলল।
“ মারিয়ার সামনে আমাকে কেউ কিছু বলবে মা? তোমারও অত সাহস নেই।”
এক নি:শ্বাসে গ্লাস খালি করল ছেলেটা। তেষ্টা পেয়েছিল খুব। ভেজা মুখ মুছে শুধাল,
“ আজ কী রান্না হয়েছে? এত কল কেন?”
মারিয়া স্ফূর্ত হয়ে বলল,
“ আজ আমি এগারো আইটেমের ভর্তা করেছি। সব নিজের হাতে শিলে বেটেছি জানো।”
“ ওরে বাবা,এলাহী কারবার। তাহলে তো তাড়াতাড়ি গোসল করে আসতে হচ্ছে।”
“ হ্যাঁ! যাও যাও।”
রওনক উঠতে নিলেই ও ডাকল আবার।
“ ভাইয়া!”
“ হুঁ,কী?”
মারিয়া খালি গ্লাসটায় আঙুল টিপে দোনামনা করল। সেদিনের ওই লাফাঙ্গা ছেলেটার কথা এখনো বলা হয়নি ভাইয়াকে। যা বেয়াদবি করল, জানাবে কিনা! গুলশানেই তো থাকে বোধ হয়। বললে ভাইয়া চিনতেও পারে। পরপর ভাবল, না থাক। এতটুকু ব্যাপার, না বলাই ভালো। এমনিও ভাইয়া কত প্যারায় থাকে সারাদিন। ওই সাদা মূলাটাকে ও নিজেই কুপোকাত করে দেবে। আরেকবার দেখা হোক! রওনক তাড়া দিলো,
“ কী,বল?”
“ কিছু না। যাও।”
মা তোয়ালে এগিয়ে দেন। খেয়াল করেন,ছেলের মুখটা ভার ভার লাগছে। প্রশ্ন করলেন,
“ তোর কিছু হয়েছে নাকি?”
“ কই? আসলে একটু চিন্তায় আছি।”
মারিয়া উদ্বীগ্ন হয়ে বলল,
“ কী নিয়ে, ভাইয়া?”
“ পার্টি অফিসের একটা ব্যাপার। আমাদের সভাপতি আছে না,ইকবাল? তার খুব কাছের বন্ধু এসছে বিদেশ থেকে। দলে যোগ দিলো আজ। আমি যে পদটা চাইছি মনে মনে, সেটা যদি ওকে দিয়ে দেয়,সে নিয়েই ভাবছিলাম।”
রোজিনা বললেন,
“ সেতো দেবেই। জানা কথা।”
মারিয়া বলল,
“ কেন দেবে? যে যোগ্য পদ তার, তাই না!”
“ এটা রাজনীতি। এখানে ওসব হয় না। যার হাত বড়ো,সেই আম পাড়ো।
এজন্যেই বলি এতে কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ছাড় এগুলো। হয় একটা ব্যবসা ধর নয়তো চাকরি বাকরি কর। বোনটাকে তো সামনে বিয়েও দিতে হবে।”
মারিয়া মুখ কুঁচকাল,
“ উম না,আমি বিয়ে করব না।”
রওনক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ ওসব কি মুখের কথা মা? চাকরির জন্যে সার্টিফিকেট থাকতে হয়। আমি অনার্সটাই শেষ করতে পারলাম না আব্বা হুট করে মারা যাওয়াতে। আর ব্যবসা,
তাতে মোটা পুঁজি লাগে। আমার তা কই? কত ইচ্ছে ছিল একটা ফিল্ম বানাব। কত কাহিনী আছে মাথায়। কিন্তু প্রডিউসার নেই,টাকাও নেই।”
মারিয়ার মুখটা কালো হয়ে গেল।
“ ভাইয়া আমাকে পড়াচ্ছো তো। এই টাকা দিয়ে নিযে পড়তে।”
“ এসব বলে না। তুই পড়,বড়ো হ। আমি ঠিক একটা উপায় খুঁজে নেব। রিজিকে যা আছে তাই হবে। যা, ভাত বাড়।”
মারিয়া আশ্বস্ত হলো না। মাথা নুইয়ে খাবার আনতে চলল। ওদের বাবা সরকারি চাকরি করতেন। পেনশনের টাকায় সংসারটা চলে। আর টুকটাক যা কামাই করে রওনক। সাথে আছে গুলশানে বাবার রেখে যাওয়া শেষ সম্বল,এই চার কামরার ফ্ল্যাটটা।
মারিয়ার খুব ইচ্ছে ও একটা ভালো চাকরি করবে। ভাইয়াকে আবার পড়াবে। ভাইয়ার সব অপূর্ণ ইচ্ছে পূরণ করবে। কিন্তু ও নিজেই মাত্র ইন্টারমিডিয়েট দিলো,ওকে চাকরি দেবে কে?
চলবে
গল্প অগোছালো লাগবে,কাহিনী কোত্থেকে কোথায় যাচ্ছে বুঝতে সময় দিতে হবে। ৫ পর্বেই এত মাথা খারাপ করেন কেন আপনারা? পড়তে থাকলে সমস্যা কী?
যদি এক সমুদ্র প্রেমই লিখতাম,তাহলে নতুন নাম দিতাম না। সো ধৈর্য ধরো গার্লস…
Share On:
TAGS: আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন, নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৭৯.ক
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৬
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৪(ক)
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৩৪(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
আলতো ছোঁয়ায় সমুদ্রকথন পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৮০
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ২৯(ক+খ)
-
হেই সুইটহার্ট পর্ব ৩
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৯
-
কাছে আসার মৌসুম পর্ব ৪৭