Golpo romantic golpo মিস্টার মাংকিম্যান

মিস্টার মাংকিম্যান পর্ব ২


২. [🔺 ১ ৮ + সতর্কতা ]

ক্লাস সিক্সে পড়া মেয়েটা বাথরুমে প্রেগন্যান্সি কিট হাতে নিয়ে অসহায় ভঙ্গিতে বসে আছে হাই কমোডের ওপর। এখনি ঘটনার নিষ্ঠুরতা জানবার সময়।
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। চারপাশের আকাশটা এক গাঢ় কালচে চাদরে ঢাকা। শুকতারা বিদায় নিবে শিঘ্রই। দূর থেকে কোনো এক মসজিদের মাইকে মুয়াজ্জিনের কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে,

আসসালাতু খাইরুম মিনান নাওম…।

ফজরের সেই পবিত্র আজানের সুর সকল নিস্তব্ধতা চিরে নিয়তির শ্রবণগোচর হল। বাথরুমের হাই-কমোডের ওপর বসে থাকা নিয়তি দুই হাঁটু বুকের সাথে চেপে ধরেল। তাকে দেখাচ্ছে পাথরের মূর্তির মতো।

শুধুমাত্র ডান হাত কাঁপছে। সে হাতের আঙুলে ধরে আছে সস্তা প্লাস্টিকের কাঠিটা।

মাত্র কয়েক মিনিট আগের কথা।
স্কুল ব্যাগের চেইনটা অত্যন্ত সন্তর্পণে টেনে, খসখসে কাগজের প্যাকেটটা বের করার সময় তার মনে হচ্ছিল সে যেন একটা জীবন্ত কয়লা হাত দিয়ে ধরেছে। যে কয়লা তাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিচ্ছে।
বাথরুমের নিয়ন আলোর নিচে দাঁড়িয়ে নিয়তির বারবার মনে পড়ছিল মুনার কথা। মুনা চুপিচুপি বলেছিল,

-বড় আপুর আমাকে দেখছিলো রে, নিয়তি। একটা কাঠি থাকে। ওখানে পেচ্ছা*প দেওয়ার পর যদি দুইটা লাল দাগ ওঠে, তবেই বুঝবি পেটে বাচ্চা আসছে। ওটাকে পজিটিভ বলে। আর যদি একটা দাগ ওঠে, তবে নেগেটিভ। মানে তুই প্রেগন্যান্ট না।

নেগেটিভ! মাত্র একটা শব্দ। এই একটা শব্দই এখন নিয়তির নিকট তার সাথে ঘটে যাওয়া নিষ্ঠুরতা থেকে সবচেয়ে বড় মুক্তির চাবিকাঠি।

নিয়তি চোখ বুঁজল। তার দুই চোখ বেয়ে নোনা জল গাল বেয়ে ঠোঁটের কোণে এসে জমল। সে মনে প্রাণে, তার চেনা সবটুকু আকুলতা দিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করতে লাগল,

-আল্লাহ, তুমি একটা দাগ এনে দাও প্লিজ! আমি আর কোনোদিন কোচিং থেকে ফিরতে দেরি করব না। মায়ের কোনো কথা অমান্য করব না। পড়া ফাঁকি দেব না। সময়মত হোমওয়ার্ক করব। প্লিজ একটা দাগ দাও। মাত্র একটা দাগ!

শ্বাসরুদ্ধকর কয়েক মিনিট পার হলো। নিয়তি ভয়ে চোখ মেলতে পারছে না। অবশেষে, চরম এক অনিশ্চয়তা নিয়ে সে কাঠিটার দিকে তাকাল।

প্রথম লাল দাগটি স্পষ্ট হয়ে উঠল। নিয়তির বুকে যেন এক চিলতে আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। কিন্তু সেই আলো স্থায়ী হলো বেশিক্ষণ। প্রথম দাগটির ঠিক পাশেই ধীরে ধীরে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে আরেকটি গাঢ় লাল রেখা ফুটে উঠতে শুরু করল ক্রমশ।

দুটি লাল দাগ! একদম সমান্তরাল। একদম স্পষ্ট। তার মানে প্রেগন্যান্সি পজিটিভ।

নিয়তির চারপাশের বদ্ধ দেয়ালগুলো দুলে উঠল।
এক নিমেষে অন্ধকার হয়ে গেল সব। কানে কেমন টু টু শব্দ বাজছে! সে আর নিশ্বাস নিতে পারছে না। হাত থেকে প্লাস্টিকের কিটটি ছিটকে পড়ে গেল ঠাণ্ডা টাইলসের মেঝেতে।

ক্লাস সিক্সে পড়া বারো বছরের একটা মেয়ে যার এখনো ফ্রক ছেড়ে কামিজ ধরার বয়সটাও ঠিকঠাক পরিপক্ব হয়নি, সে একটা প্লাস্টিকের কাঠির দিকে তাকিয়ে যেন নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা দেখল!

তার পেটের ভেতর নাকি আরেকটা প্রাণ বড় হচ্ছে? এই নোংরা সত্যটা সে কীভাবে বিশ্বাস করবে? শফিক মামার সেই জঘন্য চাউনি, সেই খসখসে হাত, আর সস্তা জর্দার তীব্র বমি আনা গন্ধটা যেন এই বাথরুমের বদ্ধ বাতাসে আবার জীবন্ত হয়ে উঠল। নিয়তি দুই হাতে নিজের মুখ চেপে ধরল। তার ভেতরের বুকফাটা আর্তনাদ দেয়াল ভেদ করে যেন মায়ের ঘর পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে এরই প্রচেষ্টা!

কিভাবে কি সামলিয়ে উঠবে সব? কোথা থেকে এই গোলকধাঁধার শেষ হবে? তার কিছুই নিয়তির মাথায় আসছিল না। এতটুকুন একটা মেয়ে এই অতলান্ত মানসিক ধকল সামলাবে কীভাবে?

এই বয়সের অন্য পাঁচটা মেয়ের জীবন কেমন হয়?
নিয়তি নিজের বান্ধবীদের কথা ভাবল। মুনা, পারভীন, তুলি, নিপা – ওরা কত নিশ্চিন্তে থাকে!
ওদের চিন্তার জগৎ জুড়ে শুধু থাকে স্কুলের মর্নিং শিফটের পড়া শেষ হলো কি না! ক্লাসের স্যার কাল হোমওয়ার্ক না করার জন্য কান ধরে দাঁড় করিয়ে রাখবে কি না! কিংবা বিকেলে বিটিভিতে পছন্দের কার্টুনটা দেখতে পারবে কি না।
আর পড়া ফাঁকি দেওয়ার জন্য মায়ের হাতের দু-একটা চড়-থাপ্পড় বা বকুনি খাওয়াটাই ছিল এই বয়সের সবচেয়ে বড় ভয়।

অথচ, নিয়তির নিয়তি তাকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক ভয়ঙ্কর বাস্তবতার প্রান্তে। এক অন্তহীন নৃশংস সত্যের সামনে। নিয়তি নিজেই ভালোমতো বোঝে না তার সাথে ঠিক কী ঘটেছে এবং কী ঘটতে চলেছে। সে শুধু জানে, তার শরীরের ভেতর এমন কিছু একটা হচ্ছে যা সমাজ, পরিবার এবং তার মা-বাবা কোনোদিন মেনে নেবে না।
সে কেবল বোঝে, তার চেনা শৈশবটা চিরতরে খুন হয়ে গেছে।

বাথরুমের মেঝে থেকে কাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে নিয়তি আবার তা কাগজে মুড়িয়ে নিল। রুমে এসে কোনোমতে স্কুল ব্যাগের ভেতরের চেইনটা খুলে খসখসে কাগজের প্যাকেটটা লুকিয়ে রাখল সে।

এরপর সে বিছানায় এসে ধপাস করে শুয়ে পড়ল। কিন্তু শোয়ার পর থেকেই তার মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে গেল। চোখের পাতা দুটো প্রচণ্ড ভারী হয়ে এলো। সে কম্বলটা টেনে একদম মাথা পর্যন্ত মুড়ি দিল।

সকালের শিফটে নিয়তির স্কুল। অন্য দিনগুলোর মতন সকাল সাড়ে ছয়টার মধ্যেই রেহানা বেগম নিয়তির ঘরে আসেন ওকে ডেকে তুলতে। সকালের সময়টা এই বাড়িতে বেশ তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়েই কাটে।

রেহানা নিয়তির ঘরে ঢুকলেন। ঘরে তখনও আবছা অন্ধকার। জানালার পর্দা ভেদ করে ভোরের এক চিলতে আলো এসে পড়েছে মেঝের ওপর।

রেহানা দেখলেন, নিয়তি তখনও বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু তার শোয়ার ভঙ্গিটা স্বাভাবিক নয়। মেয়েটা কেমন যেন কুঁকড়ে আছে! দুই হাঁটু প্রায় চিবুকের কাছাকাছি এনে নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। আর তার পুরো শরীরটা কম্বলের নিচে ঘনঘন কাঁপছে।

রেহানা কপাল কুঁচকে বিছানার কাছে এগিয়ে গেলেন।

-কী রে নিয়তি? এখনো ঘুমাচ্ছিস? স্কুলের সময় পার হয়ে যাচ্ছে যে! ওঠ, জলদি হাত-মুখ ধুয়ে নে।

নিয়তির তরফ থেকে কোনো উত্তর এলো না। শুধু তার কাঁপুনিটা যেন আরও বেড়ে গেল।

রেহানা কিছুটা বিরক্ত হয়ে কম্বলটা এক টানে সরিয়ে দিলেন। আর সাথে সাথেই তিনি আঁতকে উঠলেন। নিয়তির ফর্সা মুখটা একদম লাল হয়ে আছে। ঠোঁট দুটো শুকিয়ে পাপড়ি ফেটে গেছে। সে অস্ফুট স্বরে কী যেন বিড়বিড় করছে।

রেহানা তড়িঘড়ি করে মেয়ের কপালে হাত দিলেন। হাত দেওয়া মাত্রই তিনি ছিটকে সরে আসার উপক্রম হলেন। সর্বনাশ! এ তো গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে! ১০৩ বা ১০৪ ডিগ্রির নিচে হবে না।

-ওমা! এ কী অবস্থা তোর! নিয়তি… ও নিয়তি, চোখ খোল মা!” রেহানা ব্যাকুল হয়ে নিয়তির গাল মৃদুভাবে থাপড়াতে লাগলেন।

নিয়তি অনেক কষ্টে চোখের ভারী পাতা দুটো মেলল। তার চোখ দুটো এখন জবা ফুলের মতো লাল। মাকে সামনে দেখে তার ভেতরের আতঙ্কটা আবার চাড়া দিয়ে উঠল। ঘুমের ঘোরের প্রেগন্যান্সির কথাটা বলে ফেলেনি তো?

রেহানা মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বিছানায় বসালেন। নিয়তির শরীরটা তখনো কাঁপছে।

-কাল রাতেও তো ভালো দেখলাম তোকে! হঠাৎ করে এত জ্বর কোত্থেকে এলো? রাতে কি গায়ে পানি দিয়েছিলি? কথা বলছিস না কেন? কিভাবে কি হলো বলবি তো!

রেহানা একের পর এক প্রশ্ন করতে লাগলেন।
নিয়তি মায়ের বুকের ওমে মাথা রেখে কেঁদে ফেলতে চাইল। কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ। সে কোনোমতে ঢোক গিলে ভাঙা কণ্ঠে বলল,

-জানি না মা। মাঝরাত থেকে খুব শীত লাগছিল। মাথাটা ঘুরছিল।

-কোচিং থেকে ফেরার পথে কিছু খেয়েছিলি উল্টাপাল্টা? কালকে তো ফিরতেও দেরি করলি।

রেহানার কণ্ঠস্বর এখন চিরন্তন উদ্বেগে রূপ নিয়েছে।
নিয়তি শুধু মাথা নেড়ে ‘না’ বলল।

রেহানা আর এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করলেন না। তিনি দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটা গামলায় ঠাণ্ডা পানি আর একটা পরিষ্কার সুতির কাপড় নিয়ে এলেন।

বিছানার পাশে বসে তিনি কাপড়টা ঠাণ্ডা পানিতে চুবিয়ে আলতো করে চিপে নিলেন। এরপর পরম মমতায় নিয়তির তপ্ত কপালে সেই শীতল জলপট্টিটা দিলেন।
ঠাণ্ডা কাপড়ের স্পর্শ লাগামাত্রই নিয়তি শিউরে উঠল, তার মুখ দিয়ে একটা অবাধ্য উঃ শব্দ বেরিয়ে এলো।

-স্থির হয়ে শুয়ে থাক মা। একটু আরাম পাবি।

রেহানা দরদী গলায় বললেন। তিনি বারবার কাপড়টা পানিতে ভিজিয়ে নিয়তির কপাল, ঘাড় আর হাত-পা মুছে দিতে লাগলেন। মায়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর সেবার নিচে বসে নিয়তির ভেতরের অপরাধবোধ তাকে যেন আরও বেশি করে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগল। যে মা তাকে এত ভালোবাসে, সেই মায়ের মুখে সে কীভাবে এই কলঙ্কের চুনকালি মাখাবে?

ক্ষণিককাল এভাবে জলপট্টি দেওয়ার পর নিয়তির শরীরের কাঁপুনিটা কিছুটা কমল, কিন্তু ভেতরের উত্তাপ খুব একটা কমল না।

রেহানা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,

-তুই একটু শুয়ে থাক। আমি রান্নাঘরে গিয়ে তোর জন্য গরম গরম একটু ডিম-সবজির স্যুপ করে আনি। খালি পেটে ওষুধ খাওয়া যাবে না। স্যুপটা খেয়ে একটা নাপা খেয়ে নিবি, কেমন?

নিয়তি কোনো কথা না বলে শুধু চোখের পাতা টিপে সম্মতি জানাল।

রেহানা রান্নাঘরে চলে গেলেন। নিয়তি চোখবন্ধ করে ঘরের দেয়ালঘড়ির টিকটিক শব্দ শুনতে লাগল।
প্রতিটি টিকটিক শব্দ যেন তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে,
সময় ফুরিয়ে আসছে। আজ না হয় জ্বরের বাহানায় সে স্কুলে গেল না, কিন্তু কাল? পরশু? যখন তার শরীরের পরিবর্তনগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করবে, তখন সে কোথায় পালাবে?

কিছুক্ষণ পর রেহানা একটা কাঁচের বাটিতে ধোঁয়া ওঠা গরম স্যুপ নিয়ে ঘরে ঢুকলেন।
তিনি নিয়তিকে বালিশে হেলান দিয়ে বসালেন।

-নে, চামচ দিয়ে অল্প অল্প করে খেয়ে নে তো মা!

মালতী স্যুপের বাটিটা এগিয়ে দিলেন।

নিয়তি এক চামচ স্যুপ মুখে নিতেই তার পেটের ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। সেই পরিচিত অহেতুক বমি বমি ভাবটা আবার তীব্রভাবে ফিরে এলো।

মুনার কথা মনে পড়ল, এমন সময় খাবারে অরুচি হয়, বমি বমি ভাব হয়!

সে জোর করে গিলতে চাইল, কিন্তু পারল না। মুখ ফিরিয়ে নিয়ে সে বালিশে মাথা গুঁজে দিল।

-কী হলো? খাচ্ছিস না কেন? শরীরটা একদম দুর্বল হয়ে যাবে তো!

রেহানা চিন্তিত মুখে বললেন।

-আমার ভালো লাগছে না মা। বমি আসছে। আমি পরে খাব।

নিয়তির কণ্ঠস্বর একদম বুজে এলো।

রেহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্যুপের বাটিটা টেবিলের ওপর রাখলেন। আবার নতুন করে ঠাণ্ডা পানির গামলাটা টেনে নিলেন। মেয়ের কপালে জলপট্টি দিতে দিতে তিনি কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

জানালার বাইরে তখন সকালের সূর্যটা পুরোপুরি উঠে গেছে। রোদের আলোয় পৃথিবীটা ঝলমল করছে।

আচমকা রেহানা উঠে দাঁড়াল। আপন মনেই বলতে লাগল,

  • গতকাল টিফিন খেয়েছিলি? বক্সটা তো মনে হয় বের করিস নি ব্যাগ থেকে। গন্ধ হয়ে যাবে তো!

একথা বলতে বলতে নিয়তির স্কুলব্যাগের দিকে এগোতে লাগল রেহানা। নিয়তির ভয়ে তখন আরোও জড়োসড়ো হয়ে গেছে। ও তো সত্যিই টিফিন বক্স বের করতে ভুলে গেছে! এখন কেমন হবে? কিভাবে মা’কে আটকাবে! ব্যাগ খুললেই তো চোখে পড়বে কাগজে মোড়ানো প্রেগন্যান্সি কিট। নিয়তির চোখ উল্টে আসতে চাইল।

পরের পর্ব পড়তে চাইলে কমেন্ট করবেন ❤️

মিস্টার_মাংকিম্যান

পর্ব_২

লেখিকাঃ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply