#তুমি_এলে_অবেলায়
#পর্ব_১৬
#আতিয়া_আদিবা
লাউটারব্রুনেনের সেই ছিমছাম কাঠের শ্যলে থেকে সুইজারল্যান্ডের জুরিখ এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পুরোটা জার্নিতে শেহজাদ নিশ্চুপ রইল। গাড়ির পেছনের সিটে তার উপস্তিতি ছিল অদৃশ্যের মত। সে সামাইরার পাশে বসে ছিল ঠিকই, তবুও তারা যেন দুটি ছিন্ন মানচিত্র। মধ্যকার দূরত্বটা কয়েক আলোকবর্ষের চেয়েও বেশি ছিল। কে বলবে ওরা গতরাতে দুজন দুজনকে পাগলের মত ভালোবেসেছে? ওরা ভাবছে ওসব স্বপ্ন ছিল! হয়ত দুঃস্বপ্নের নীল বিষাদ কিংবা সুস্বপ্নের মায়াবী আলো।
এই দম্পতির মনের দোলাচলের খবর কে-ই বা রাখে!
শেহজাদ একবারের জন্যও সামাইরার দিকে তাকায়নি। তার সেই চিরচেনা দম্ভ, জেদ আর ক্ষণে ক্ষণে ঠোঁটের কোণে উঁকি দেওয়া কুটিল মুচকি হাসিও উধাও হয়ে গেছে। সেখানে জায়গা করে নিয়েছে এক আদিগন্ত পাথুরে নীরবতা। সামাইরা যেভাবে তুষারভেজা বাগানে দাঁড়িয়ে শেহজাদের চরিত্র নিয়ে একের পর এক বিষাক্ত তীরের ন্যায় শব্দ ছুঁড়েছিল, তা শেহজাদের মেইল ইগোতে নয় বরং মনে আঘাত হেনেছে। ভীষণ গভীর সে আঘাত।
শেহজাদের এই আকস্মিক নিস্তব্ধতা সামাইরাকেও বেশ অস্থিরতায় ফেলে দিল। হয়ত সামান্য অপরাধবোধ কাজ করছে তার মাঝে। সে নিজেও নেশার ঘোরে ছিল বলে শেহজাদকে বাধা দেয় নি। তবুও গোটা বিষয়টি মেনে নিতে পারছে না সামাইরা। তার সংসারের মেয়াদ সম্পর্কে সে জ্ঞাত নয়। এই সংসারের সময়কাল জড়িয়ে আছে তার শাশুড়ীর চিরবিদায়ের সাথে। সুফিয়া রহমানের শেষ নিঃশ্বাস ইতি টেনে দিবে এই বৈবাহিক সম্পর্কের। যে স্বামী বাসর রাতে স্ত্রীকে ফেলে নিজের প্রেমিকার সাথে ভিডিওকলে মগ্ন থাকে, তার নিকট নিজের সর্বস্ব নির্বাসন দেওয়ার মাঝে সুখ নেই। অনুভূতি নেই। বরং আফসোস আছে। হিমালয় ছাড়িয়েছে সেই আফসোসের উচ্চতা।
জুরিখ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে কাতার এয়ারওয়েজের বিমানটি ডানা মেলল। শেহজাদ সিটে গা এলিয়ে চোখজোড়া ধীরে ধীরে বুজল। বিমানের ফার্স্ট ক্লাসের মৃদু আলোয় তার মুখাবয়ব বড্ড অসহায় দেখাচ্ছিল।
চোখ বন্ধ করতেই শেহজাদের মস্তিস্কের অবচেতন প্রকোষ্ঠে একটার পর একটা ফ্ল্যাশব্যাক ভিড় করতে লাগল। বহু বছর ধরে সযত্নে লুকিয়ে রাখা সেই অন্ধকার শৈশব আজ আবার বিষাক্ত সাপের মতো ফণা তুলল। ক্রমশ ছোবল মারতে লাগল তাকে।
চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল ঢাকার সেই প্রাসাদোপম শ্মশানের মতো নিথর বাড়িটা। ঘড়ির কাঁটা তখন বোধহয় রাত এগারোটা ছুঁইছুঁই। ডাইনিং টেবিলের ওপর বাটি ভরা খাবারগুলো ততক্ষণে ঠাণ্ডা গেছে।
ছোট্ট শেহজাদ চেয়ারে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। দুই হাত টেবিলের ওপর নাচাচ্ছে। মনে আকাশ সমান জেদ।
তার ঠিক সামনে ভাতের থালা নিয়ে বসে আছেন সুফিয়া রহমান। তার ক্লান্ত মুখটা জ্বলন্ত মোমবাতির শেষ আলোর ন্যায় বিবর্ণ দেখাচ্ছে। ছোট্ট শেহজাদ চিৎকার করে উঠল,
– আমি খাব না মা! বাবা আসুক, বাবা আমাকে খাইয়ে দিলে তবেই খাব।
শেহজাদ মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। পা নাচাতে লাগল নিজের মত করে।
সুফিয়া রহমান জোর করে ম্লান হাসলেন। তবে সেই হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘশ্বাসটা এড়াতে পারলেন না। তিনি পরম স্নেহে শেহজাদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
-লক্ষ্মী বাবা আমার, খেয়ে নাও। তোমার বাবা আজ খুব ব্যস্ত, ফিরতে অনেক দেরি হবে।
-প্রতি রাতেই তো বাবা ব্যস্ত থাকে! আমার সাথে কথা বলে না, একটু আদরও করে না। আজকে আমি বাবার হাত থেকেই খাব। বাবা না খাইয়ে দিলে আমি কিচ্ছু খাব না। না, না, না।
শেহজাদের অবুঝ কণ্ঠে এক বুক অভিমান ঝরে পড়তে লাগল।
ঠিক তখনই সদর দরজার ভারী লকটা খোলার শব্দ হলো। শেহজাদের চোখ দুটো মুহূর্তেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে চেয়ার ছেড়ে এবার লাফাতে লাগল।
-ঐ যে বাবা এসেছে! বাবা এসেছে!
ভেতরে ঢুকলেন শেহজাদের বাবা, জাবেদ রহমান।টালমাটাল পা, চোখ দুটোও রক্তবর্ণ। জাবেদ ঘরে প্রবেশ করার সাথে সাথে প্রথমে বাতাসে মদের তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে গেল। দ্বিতীয় ধাপে অপরিচিত এক নারীর কড়া পারফিউমের গন্ধ সুফিয়ার নাকে এসে ঠেকল।
জাবেদের হাত ধরে ভেতরে ঢুকল এক টিশটাশ ভদ্রমহিলা। পরনে উগ্র আঁটসাঁট পোশাক, ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। জাবেদ তার স্ত্রী-সন্তানের দিকে ফিরেও তাকাল না। সেই উগ্র নারীকে নিয়ে সোজা শোবার ঘরের দিকে পা বাড়াল।
সন্তানের সামনে স্বামীর এই চরম অবক্ষয় সুফিয়া রহমান আর সহ্য করতে পারলেন না। তিনি দ্রুতপায়ে শোবার ঘরের দরজার সামনে দাঁড়ালেন। অবরুদ্ধ গলায় মিনতি করলেন,
-অন্তত আজ রাতে অন্য কোথাও যাও জাবেদ। বাচ্চাটা বড় হচ্ছে। ও সব বুঝতে পারে। দেখো তাকিয়ে আছে…
কথাটা শেষ করার সুযোগ পেলেন না সুফিয়া। জাবেদ নিজের ভারী বুট পরা পা দিয়ে সজোরে একটা লাথি মারল সুফিয়ার পেটে। সুফিয়া চিৎকার করে উঠলেন।
দূর হ চোখের সামনে থেকে। – সুফিয়া আঁচলে মুখ গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। শেহজাদ ভয়ে কাঁপছিল বটে তবে তার অবুঝ মন তখনও স্নেহের কাঙাল। সে মায়ের এই করুণ দশা দেখেও অজানা ঘোরের মাঝে বাবার শার্টের কোণটা খপ করে চেপে ধরল। কান্নাভেজা গলায় বলল,
-বাবা, আমি এখনো ভাত খাইনি। তুমি আমাকে খাইয়ে দেবে না?
জাবেদ শেহজাদের দিকে তাকাল। ভ্রুঁ কুচকে একরাশ বিরক্তি নিয়ে সজোরে চড় বসিয়ে দিলেন শেহজাদের নরম তুলতুলে গালে। শেহজাদ ছিটকে গিয়ে পড়ল মেঝেতে কুঁকড়ে থাকা মায়ের গায়ের ওপর।
জাবেদ মেঝেতে পড়ে থাকা সুফিয়াকে আরোও কয়েকবার লাথি মারল।
এ দৃশ্য দেখে আতঙ্কিত শেহজাদ উঠে দাঁড়াল। মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকা মায়ের দিকে তাকানোর সাহসও হলো না তার। সে দৌঁড়ে গিয়ে আশ্রয় নিল ডাইনিং টেবিলের নিচের অন্ধকার, সংকীর্ণ জায়গায়।
সেদিন রাতে ছোট্ট শেহজাদের আর খাওয়া হলো না। টেবিলের নিচে হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে সে বসে রইল। পেটে তীব্র খিদে। তবুও অভুক্ত পেটে টেবিলের নিচেই একসময় ঘুমিয়ে পড়ল সে।
সেই রাতে বাবার হাতের নির্মম কালশিটে ফেলে দেওয়া চড়, চিরতরে খুন করে ফেলল ছোট্ট শেহজাদের শৈশব। পৃথিবী যেন তাকে ভিলেন হবার সবটুকু অধিকার দিয়ে দিল।
স্মৃতির পর্দা ছিঁড়ে গেল।
শেহজাদের হাতের মুষ্টি শক্ত হয়ে এসেছে। আজ সামাইরাও তাকে ওই পশুর আসনে বসিয়ে দিয়েছে। তাকে চরিত্রহীন বলেছে। শেহজাদ আলগোছে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে মনে মনে বলল,
-আমি আমার বাবার মত নই, সামাইরা। আমি আমার মায়ের অবাধ্য ছেলে হতে চাই নি। রাইসার কাছে একজন বিশ্বাসঘাতক হতে চাই নি। আমি তোমাকেও কষ্ট দিতে চাই নি। দ্বন্দ্বে জড়িয়ে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। দ্যাটস ইট। আই এম সরি! তবুও আমি চেষ্টা করছি সবকিছু ব্যালেন্স করার। অথচ কত বড় অপবাদ দিলে তুমি আমায়! আমি কোনোদিনও দেহলোভী ছিলাম না। কোনোদিনও না। Its okay! You can hate me , Samaira. I have earned every valid reason to be a hated man with zero regrets.
দীর্ঘ ফ্লাইট শেষে বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করল। কি ভ্যাপসা গরম! সুইজারল্যান্ডের সেই তুষারশুভ্রতার মোহ কাটতে না কাটতেই এক ঝটকায় তারা ফিরে এল কংক্রিটে ঘেরা যান্ত্রিক কোলাহলের শহরে।
ভিআইপি টার্মিনাল দিয়ে শেহজাদ আর সামাইরা বাইরে বের হলো। হঠাৎ সামাইরা এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। এক বহর কালো রঙের বিলাসবহুল প্রাডো আর মার্সিডিজ দাঁড়িয়ে আছে লাইনে। গাড়িগুলোকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে প্রায় জনা দশেক ব্ল্যাক সুট এবং সানগ্লাস পরা দীর্ঘকায় পুরুষ। তাদের দেখে মোটেও সাধারণ কোনো সিকিউরিটি গার্ড বলে মনে হচ্ছে না।
শেহজাদকে দেখামাত্রই তারা প্রত্যেকে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে একযোগে মাথা নিচু করে গভীর কুর্নিশ জানাল। তাদের মধ্যে একজন এগিয়ে এসে গাড়ির দরজা খুলে দিল। অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল,
-Welcome back, King. Everything is ready as per your command.
সামাইরা একথা শুনে স্তব্ধ হয়ে গেল। ‘কিং’? এরা শেহজাদকে ‘কিং’ বলে সম্বোধন করছে কেন? একজন কর্পোরেট বিজনেস টাইকুনকে তারা এমনভাবে সমীহ করছে যেন সে আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া!
সামাইরা আঁড়চোখে শেহজাদের দিকে তাকাল। তবে বিশেষ কিছু খুঁজে পেল না। শেহজাদের মুখ একেবারে ভাবলেশহীন।
শেহজাদ সামাইরাকে নিয়ে স্কাইলাইন ভিলাতে পৌঁছালো। গাড়ি থেকে নেমে সে সামাইরাকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। সুফিয়া রহমান তখন লিভিং রুমে বসে ওদের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। শেহজাদ মায়ের সামনে গিয়ে শুধু বলল,
-মা, আমার একটা জরুরি মিটিং আছে। এখনই বের হতে হবে। রাতে আসব।
এবার সে সামাইরার দিকে তাঁকাল। সামাইরা অবাক চোখে শেহজাদের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মাথায় গিজগিজ করছে অসংখ্য প্রশ্ন। সামাইরার হাবভাবে শেহজাদ ঘটনা খানিকটা আঁচ করতে পারল বটে তবে পাত্তা দিল না। সে দ্রুত পায়ে মার্সিডিজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে সে নিজেই গাড়ির স্টিয়ারিং ধরল। গাড়ির স্পিডোমিটারের কাঁটা মুহূর্তেই ১০০ ছাড়িয়ে গেল। তার গন্তব্য এখন ঢাকারই কোনো এক নির্জন, পরিত্যক্ত গুদামঘরের নিচে। তার নিজস্ব তৈরি টর্চার সেলে।
পরিত্যক্ত বিশাল গুদামঘরটার একদম শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে মরিচা পড়া ভারী লোহার দরজা। দরজাটা খুলতেই নিচে নেমে গেছে এক সর্পিল সিঁড়ি। উপর থেকে একটি টিমটিমে হলুদ রঙের বাতি ঝুলছে। নিভু নিভু সেই হলুদাভ আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ধূসর কংক্রিটের দেয়ালে খোদাই করে লেখা ‘জোন জিরো’। চতুর্দিকে কেমন গা-ছমছমে আবহ বহমান।
সেই সর্পিল সিড়ি বেয়ে নিচে নামতেই চারপাশের পরিবেশটা একেবারে ভিন্ন। ছাদ থেকে ঝুলছে একটিমাত্র হাই ভোল্টেজ সাদা বাল্ব। সেই বাল্বের তীব্র আলো সরাসরি গিয়ে পড়েছে ঘরের ঠিক মাঝখানে রাখা একটি লোহার চেয়ারে। সেখানে হাত-পা শক্ত করে বাঁধা অবস্থায় বসে আছে নাফিস আহমেদ।
নাফিসের ফর্সা, অহংকারী মুখটা এখন রক্ত আর কালশিটেতে পরিপূর্ণ। প্রথম দেখায় চেনার উপায় নেই। ব্ল্যাক সুট পরা লোকগুলো অলরেডি তার ওপর একচোট থার্ড-ডিগ্রি টর্চার চালিয়েছে। নাফিসের তাজা রক্ত মেঝেতে ফোঁটায় ফোঁটায় টপকে পড়ার শব্দ, এই নিস্তব্ধতার মাঝে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল।
ঠিক তখনই ভারী বুটের চিরচেনা শব্দটা ক্রমশ তীব্র হল।
শেহজাদ রহমান জোন জিরোতে পা রাখল। তার চোখেমুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই। তবুও সে ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই ব্ল্যাক সুট পরিহিত লোকগুলো সতর্ক হয়ে গেল। সামান্য কুঁকড়ে গেল।
নাফিস শেহজাদকে এক পলক দেখে পুনরায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। শেহজাদ কোনো তাড়াহুড়ো করল না। অত্যন্ত ধীর ভংগিমায় বাল্বের ঠিক নিচে রাখা আলিসান চেয়ারে বসল। পকেট থেকে দামী সিগারেটের প্যাকেট বের করে তাতে শলাকা ঠোঁটে চেপে ধরল।
লাইটারের সামান্য ‘ক্লিক’ শব্দেও ঘরটা যেন কেঁপে উঠল। সিগারেটে একটা দীর্ঘ টান দিয়ে, ধোঁয়ার নীলচে কুণ্ডলী বাতাসে ভাসিয়ে দিল শেহজাদ। এবার শান্তচোখে তাকাল নাফিসের দিকে।
নাফিসের মুখে ঠান্ডা পানি ছুঁড়ে মারা হল। নাফিস ভয়ে চিৎকার করে উঠল। তার সামনে শেহজাদকে বসে থাকতে দেখে প্রচন্ড ঘাবড়ে গেল।
শেহজাদ হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল,
-তুমি আর সামাইরা একই কলেজে পড়তে?
-জ্বি।
-শুনেছি তোমরা নাকি অনেক ভালো বন্ধু ছিলে?
নাফিস চুপ করে রইল। অতি সন্তপর্ণে ঢোক গিলল।
শেহজাদের হাসি চওড়া হল। এ হাসি সাধারণ নয়। বরং গায়ের রক্ত হীম করে দেওয়ার মত এ হাসি। নাফিস এবার হু হু করে কান্না করে ফেলল। ভাঙ্গা গলায় বলতে লাগল,
-আমাকে মাফ করে দিন। আমি আর কোনোদিন এরকম কাজ করব না। কোনোদিন না! আমাকে প্লিজ ছেড়ে দিন। খোদার কসম আমি আর কোনোদিন এরকম করব না।
শেহজাদ একটা আঙুল নাফিসের ঠোঁটে চেপে ধরল। সে পুনরায় প্রশ্ন করল,
-যেটুকু বলেছি তার উত্তর দাও। সামাইরার সাথে তোমার কি সম্পর্ক ছিল?
-আমরা… আমরা ভালো বন্ধু ছিলাম।
-তাহলে বন্ধুর এতবড় ক্ষতিটা কেন করতে গেলে?
নাফিস কোনোমতে থুতু গিলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-সামাইরাকে আমি ভালোবাসতাম। অনেক ভালোবাসতাম। কিন্তু ও আমাকে রিজেক্ট করেছে। আপনার ওই কাড়ি কাড়ি টাকার জন্য আমার ভালোবাসার অবজ্ঞা করেছে। তাই আমি ওর জীবন নিজের হাতে নষ্ট করে দিতে চেয়েছিলাম…
নাফিসের কথা শেষ করেও একইভাবে হাঁপাতে লাগল।
ব্ল্যাক সুট পরিহিতদের মাঝে একজন শেহজাদের দিকে সামান্য ঝুঁকে বলল,
-কিং, শুধু ম্যাডামের নয় আরোও অসংখ্য মেয়ের ন্যু*ড ভিডিও ওর ড্রাইভ থেকে পেয়েছি। ইনফরমেশন আছে মেয়েদের ব্ল্যাকমেইল করে টাকা পয়সা হাতিয়ে নিয়ে উল্লাস করে বেড়ায়।
শেহজাদ তার হাতের আধপোড়া সিগারেটটা সামনের টেবিলে চেপে ধরে নিভিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে এবার খেলা করছে হাড়হিম করা হিংস্রতা। মুখের হাসি আরোও বিভৎস হল।
শেহজাদ পকেটে হাত দিয়ে নাফিসের দিকে একটু ঝুঁকে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল,
-এর কোনো এক্সপ্লেনেশন আছে তোমার কাছে?
নাফিস কিছু একটা বলতে চাইল। তবে তার আগেই দু গালে সজোরে ঘুষি মারল শেহজাদ।
নাফিস উচ্চস্বরে কাঁদতে লাগল। কাঁদতে কাঁদতে সুযোগ চাইল। আকুতি মিনতি করে বলতে লাগল,
-আমি আর কোনোদিন এরকম কিছু করব না। আমাকে প্লিজ যেতে দিন। আমি ভালো হয়ে যাব। আমাকে একবার সুযোগ দিন!
শেহজাদ মাথা নাড়ল। বলল,
-তোকে ছেড়ে না দেবার তিনটি ভ্যালিড কারণ আছে। মরার আগে শুনে নে।
প্রথম কারণ, তুই শেহজাদ রহমানের স্ত্রীর সম্মানে আঘাত হেনেছিস। আমার স্ত্রীর সম্মানে, মাদা*চোদ! আমার ওয়াইফ ইউ ফা*কিং বাস্টা*র্ড!
দ্বিতীয় কারণ, তুই মেয়েদের শরীরকে নিজের আয়ের বস্তু বানিয়েছিস।
তৃতীয় এবং সর্বশেষ কারণ, তুই আমার আইডেন্টিটি জেনে গেছিস। তোকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা যদি আমার থাকত, তাহলে আমি নিজে কখনো এখানে আসতাম না।
শেহজাদ এবার ক্রূর হাসি হাসল। তার এই হাসি উপস্থিত সকলের বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল। হাসতে হাসতেই বলল,
-বাইরের দুনিয়া, মিডিয়া, এই সমাজ সবাই আমাকে একজন সাকসেসফুল বিজনেস টাইকুন হিসেবে চেনে।
সবাই আমার এই অল্প বয়সের অবিশ্বাস্য গ্রোথ দেখে
হাততালি দেয়। বাহবা দেয়। কিন্তু তারা বোকা। তারা জানে না, শুধুমাত্র পরিশ্রম করে এত অল্প সময়ে এত বড় সম্রাজ্য দাঁড়া করানো যায় না রে পাগলা। অন্ধকারে ঝুঁকি নিয়ে ঝাঁপ দিতে হয়।
শেহজাদ এবার সোজা হয়ে দাঁড়াল। চিৎকার করে বলল,
-অন্ধকারের এই দুনিয়ায়, আমি কোনো বিজনেস টাইকুন না। আমি হলাম ‘দ্য কিং’। আর কিং কখনো তার ডেরায় আসা অতিথিদের জীবিত ফেরত পাঠায় না।
নাফিসের চোখ দুটো এবার আতঙ্কে চড়কগাছ হয়ে গেল। এতো মাফিয়া! সে পাগলের মতো মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বলল,
-না! প্লিজ! আমি কাউকে কিছু বলব না! খোদার দোহাই লাগে… আমাকে মারবেন না! আমাকে মারবেন না! আমায় ছেড়ে দেন।
কিন্তু শেহজাদ ওরফে কিং একবারও পেছনে ফিরে তাকালো না। সিড়ির দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সে অত্যন্ত শান্ত গলায় অর্ডার দিল,
-ওর জীবনটায় ফুল স্টপ লাগিয়ে দাও।
-না! কিং, প্লিজ! আমায় মারবেন না। আমায় ছেড়ে দিন।
শেহজাদ সেই সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। দুই পাশের দেয়ালে ঝুলন্ত হলুদ ওয়ার্ম লাইটগুলো এখনো দপদপ করছে।ব্ল্যাক সুট পরা লোকগুলো মাথা নিচু করে তাদের কিং এর প্রস্থানের পথে কুর্নিশ জানালো। নাফিসের চিৎকার ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে লাগল। শেহজাদের মুখ থেকে সেই অদ্ভুত চওড়া হাসিও মিলিয়ে গেল। ফিরে এলো দাম্ভিক বিজনেস টাইকুনের ছাপ।
(চলবে..
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, তুমি এলে অবেলায়
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল গল্পের লিংক
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৬
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৬
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩২(বাসর স্পেশাল❤️)
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৮
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ১৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৪
-
তুমি এলে অবেলায় পর্ব ৯