Golpo কষ্টের গল্প শেষ পাতায় সূচনা

শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.২


#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫৪.২]

#সাদিয়া_সুলতানা_মনি

[পর্বটি রোমান্টিক। তাই নিজ দায়িত্বে পড়ুন।]

পূর্ণতা সকাল সাড়ে আটটায় ঘুম থেকে উঠে। প্রতিদিনের মতো আজও নিজেকে পাপড় হওয়া অবস্থায় পায়। দুই বাবা-ছেলে তাকে দু’পাশ দিয়ে এমন জাপ্টে ধরে ঘুমিয়ে আছে যে, পূর্ণতা পাপড়ের মতো হয়ে গিয়েছে।

জিনিয়া ফজরের সময় নামাজ পড়তে উঠলে, তাজওয়াদও হিসু দেওয়ার জন্য উঠে। তারপর সে আর জিনিয়ার কাছে থাকেনি। তার বাবা-মায়ের রুমে চলে এসেছে। পূর্ণতা-জাওয়াদ নামাজের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখনই, তাজওয়াদ তাদের রুমে নক করে। জাওয়াদ দরজা খুলতেই সে আধোঘুম ঘুম চোখে তার পাপার কোলে চড়ে বসে।

জাওয়াদ তাজওয়াদকে কোলে নিয়ে বিছানায় শুয়ে দিতে চাইলে, তাজওয়াদ মানা করে দেয়। সে তার বাবার বুকে ঘুমাতে চায়। জাওয়াদ তাকে যখন বলে,

—সোনা তুমি বেডে শোও কিছুক্ষণের জন্য। পাপা আর মাম্মা নামাজ পড়ে এসে তোমায় বুকে নিচ্ছি।

তখন তাজওয়াদও বলে, সেও নামাজ পড়বে। জাওয়াদ মানা করে না। বাচ্চাদের ছোট থেকেই ধর্মীয় কাজগুলোর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করা উচিত। যাতে তারা বড় হওয়ার পর ধর্মীয় কাজগুলো করতে অলসতা বা বিমুখতা না দেখায়।

পূর্ণতা তাজওয়াদকে তার পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিয়ে তৈরি করে দেয়। ফজরের কিছুক্ষণ আগ থেকেই প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হওয়ায় জাওয়াদ ও মি.শেখ আজ বাসাতেই ফজরের নামাজ আদায় করে। অন্যান্য দিন তারা দু’জনই তাদের বাসার নিকটস্থ মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়ে।

তাজওয়াদ আজ প্রথমবারের মতো ফজরের নামাজ আদায় করে। এমনিতে সে প্রতি শুক্রবার তার

দাদাভাই ও পাপার সাথে জুম্মার নামাজ আদায় করতে গেলেও, কখনো ফজরের নামাজ আদায় করেনি। তাই তার মধ্যে আজ আলাদা এক উচ্ছ্বাস কাজ করছে।

নামাজ শেষ করে জাওয়াদ-পূর্ণতা লম্বা সময় নিয়ে মোনাজাত করে। তাজওয়াদের আবার এতক্ষণ মোনাজাত ধরার ধৈর্য হয়ে ওঠে না। সে নিজের জায়গা থেকে উঠে প্রথমে তার মায়ের কাছে যায়, তারপর পূর্ণতার একসাথে করে রাখা হাতের মধ্যে থেকে খাবলা দিয়ে কিছু একটা নেওয়ার ভঙ্গি করে নিজের মুখ মাসেহ করে। পরপরই জাওয়াদের কাছে গিয়েও তাজওয়াদ সেম কাজটাই করে। জাওয়াদ-পূর্ণতা কিছু বলে না। নিজেদের মতো মোনাজাত শেষ করে মুখ ও নিজেদের বুক মাসেহ করা শেষ করে, তখনই তাজওয়াদ নিজের জিভ দেখিয়ে হাসতে হাসতে বলল–

—মাম্মা, পাপা তাজ তোমাদেল সব দোয়া নিয়ে নিয়েছে। তাজ একুন তালাতালি বল হয়ে যাবে। তারপর তাকে আল দুধ খেতে হবে না বল হওয়াল জন্য।

জাওয়াদ-পূর্ণতা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করে হেঁসে দেয়। পরপরই দু’জনে একসাথেই বলে ওঠে–

—আলহামদুলিল্লাহ।

পূর্ণতা কোনমতে বাপ-ছেলেকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে। আজ তারা আরিয়ানদের সাথে সিলেট যাবে। একমাত্র বোন হিসেবে পূর্ণতার থাকা জরুরি। আর সে যদি সিলেট যায় তাহলে তো জাওয়াদের দাদার বাড়ি ও নানার বাড়ি উভয় বাড়িতে অবশ্যই যেতে হবে।

আজ পৌঁছেই তো আর আরওয়াদের বাসায় যাওয়ার সুযোগ ও শক্তি কোনটিই পাবে না। সাত-আট ঘন্টা জার্নি করার পর ক্লান্ত শরীর-মন নিয়ে এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা না বলাই উচিত হবে বলে তারা মনে করে। তাই আজ সিলেট পৌঁছানোর পর তারা জাওয়াদের দাদার বাড়ি উঠবে। সেখানে তারা রেস্ট নিয়ে আগামীকাল সকালের দিকে আরওয়ার বাসায় যাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। এই হলো তাদের প্ল্যান।

পূর্ণতা চটজলদি ফ্রেশ হয়ে এসে জাওয়াদ ও তাজওয়াদকে ডেকে তুলে। তারা দশটায় রওনা হবে অলরেডি সাড়ে আটটা বেজে গিয়েছে। পূর্ণতা জাওয়াদ ও তাজওয়াদের জামা-কাপড় কাবার্ড থেকে বের করতে করতে তাকে তাড়া দিয়ে বলল–

—তাজের পাপা, আপনি তাজকে গোসল করিয়ে দিন। আমি ওকে রেডি করিয়ে ব্রেকফাস্ট নিয়ে আসছি।

কথাগুলো বলে পূর্ণতা বেডের কাছে এসে দেখে দুই বাপ-বেটা বসে বসেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঝিমাচ্ছে। এই কাণ্ড দেখে পূর্ণতার মেজাজ যায় চড়ে। সে গলার স্বর বাড়িয়ে বলল–

—অ্যাই উঠেন, উঠেন বলছি। সারারাত ঘুমিয়েও এদের বাবা-ছেলের ঘুম পূরণ হয় না। বসে বসে ঝিমাচ্ছে। উঠবেন আপনারা দু’জন নাকি পানি এনে ঢেলে দিবো?

পূর্ণতার বকা খেয়ে জাওয়াদ ও তাজওয়াদ দু’জনই ধরফরিয়ে ঘুম থেকে উঠে। চোখ মেলে তারা রাগান্বিত পূর্ণতাকে দেখে পড়িমরি ওয়াশরুমে দৌড় মারে। জাওয়াদ তাজওয়াদকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ভাগতে ভাগতে বলে–

—ভাগ মিলখা, ভাগ! নাহলে তোমার মাম্মা আমাদের ধরে কেলাবে।

তাজওয়াদ আদো আদো গলায় বলল–

—আমি দৌলাবো কিবাবে? তুমিই তো আমাকে কুলে নিয়ে দৌলাচ্ছো। এণ্ড হোয়াই ইজ কেলাবে পাপা? ইজ ইট অ্য ডিশ অর সামথিং ইলস?

জাওয়াদ ততক্ষণে ওয়াশরুমে ঢুকে গিয়েছে, সে তাজওয়াদকে বেসিনের পাশের দাঁড় করিয়ে টুথব্রাশে পেস্ট লাগাতে লাগাতে বিরবিরিয়ে বলল–

—এহহহহ! বাংলা বের হয় ভাঙাচোরা, আর ইংরেজির বেলায় মুখ থামতে চায় না। ছেলেটা ইংরেজদের মাঝে থাকতে থাকতে ওদের মতোই হয়ে গিয়েছে। না, না, এ তো দেশের প্রতি একটা গাদ্দারি। যত জলদি সম্ভব কতগুলো দেশি বাচ্চা ডাউনলোড করে দেশ ও মাতৃভাষা প্রতি অবদান রাখতে হবে।

পূর্ণতা জাওয়াদ ও তাজওয়াদের উপর চিল্লিয়ে আধা ঘন্টার মাঝেই তাদের রেডি করিয়ে বসিয়ে রাখে। এরপর সে নিজে রেডি হতে থাকে। প্রথমবার স্বামীর গ্রামের বাড়ি যাবে বলে সে সিদ্ধান্ত নেয় শাড়ি পরবে। এই ভাবনাকে মাথায় নিয়ে সে সুন্দর একটা মেরুন কালারের মাঝে কাঞ্জিভরাম শাড়ি চুজ করে। শাড়ির ব্লাউজের হাতা থ্রি কোয়াটার। শাড়ি টার পাড় ও জমিনে গোল্ডেন কালারের সুতোর কাজ করা। আর আঁচল পুরোটা গোল্ডেন কালারের সুতোর কাজ। সাথে মাথায় বাঁধার জন্য নিয়েছে হিজাব। যদিও তার হিজাব বেশি একটা বাঁধা হয় না, মাইগ্রেন ও অন্যান্য সমস্যার কারণে। কিন্তু আজ বাঁধবে হিজাব সে।

পূর্ণতা দক্ষ হাতে শাড়িটা সুন্দর করে পরে নেয়। তাজওয়াদ তখন তার পিপি ও দাদাভাইয়ের কাছে গিয়েছে বিদায় নিতে। জাওয়াদ বেলকনিতে গিয়ে ফোনে কিছু অফিসিয়াল কথা বলছে। কথা বলা শেষ করে জাওয়াদ রুমে প্রবেশ করতেই তার নজর যায় পূর্ণতার উপর, যে কিনা একটু ঝুঁকে গিয়ে শাড়ির কুঁচি গুলো ঠিক করছিল। এটা দেখে সে হায় হায় করে চপল পায়ে হেঁটে পূর্ণতার কাছে এগিয়ে আসে।

পূর্ণতা তার এমন অস্বাভাবিক আচরণে হকচকিয়ে গিয়ে বোকার মতো তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করে–

—কি হয়েছে? এমন করলেন কেন?

জাওয়াদ পূর্ণতার সামনে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে তার শাড়ির কুঁচি গুলো নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর মেকি রাগ দেখিয়ে ধমক দিয়ে বলল–

—তুমি সবসময় আমার উপর না-ইনসাফি করার ধান্দায় থাকো পূর্ণ।

—এখন আবার কি না-ইনফাফি করলাম আপনার সাথে?

—এই যে একা একা শাড়ি কুঁচি ঠিক করছো। এটা তো আমার কাজ রে ভাই। স্বামীদের জাতীয় কাজগুলোর মধ্যে একটি হলো, স্ত্রীদের শাড়ির কুঁচি সুন্দর করে গুছিয়ে দেওয়া। কুঁচি গুছিয়ে বখশিশ স্বরূপ একটু দুষ্টুমি করার অনুমতি পাওয়া।

জাওয়াদ পূর্ণতার শাড়ির কুঁচিগুলো সুন্দর করে গুছিয়ে তা গুঁজে দেয়। তারপর হুট করেই পূর্ণতার ধপধপে শুভ্র পেটের মধ্যস্থলে অবস্থিত নাভিকুণ্ডে মুখ ডুবিয়ে চুমু দিতে থাকে। পূর্ণতা জাওয়াদের আকস্মিক কাজে শিহরিত হয়ে পিছিয়ে যেতে নিলে, জাওয়াদ দুই হাত দিয়ে তার কোমড় চেপে ধরে নিজের কাজ চালিয়ে যায়।

পূর্ণতা জাওয়াদের স্পর্শে প্রতিবারের মতোই শিহরিত ও উচ্ছ্বসিত হতে থাকে। সে চোখ বন্ধ করে একহাত দিয়ে জাওয়াদের চুল নিজের হাতের মুঠোয় পুড়ে নেয়, তারপর খুবই আস্তে করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল–

—দরজা লক করা না জাওয়াদ, ছেলে এসে পড়বে যখন-তখন। ছাড়ুন আমায়।

জাওয়াদ নিজের ঠোঁটের কার্য আপাততের জন্য স্থগিত রাখে। কিন্তু তৎক্ষনাৎই উঠে না। বরং সে নিজের নাক ঘষতে থাকে পূর্ণতার পেটে। সেই অবস্থাতেই জাওয়াদ বলে ওঠে–

—ছেলেকে ব্যস্ত থাকার জন্য কয়েকটা ভাই-বোন আনতে হবে পূর্ণ আমাদের। ছেলে ওর খেলার সাথী পেয়ে গেলে, তখন আর মাম্মা-পাপাকে মিস করবে না। আর আমরাও আমাদের রোমান্স নির্বিঘ্নে করতে পারব।

—আপনার যত বাজে কথা। বলি, বুড়ো বয়সে ভীমরতি পেয়েছে নাকি?

—বুড়ো কাকে বলো নির্বোধ প্রেয়সী আমার? এই বুকে তোমার জন্য কত প্রেম-ভালোবাসা নিয়ে ঘুরি, তা যদি কেউ দেখতে তাহলে সেখানেই অক্কা পেয়ে যেতো। এত ফ্যান্টাসি ২০/২২ বছরের ছেলেপেলেদের মাঝেও থাকে না, যতটা আমি তোমায় নিয়ে ভাবি।

কথা শেষ করেই জাওয়াদ পূর্ণতার পেটের একপাশের চামড়া কামড়ে ধরে কিছুটা। পূর্ণতা নিজের হাতের মুঠোয় থাকা জাওয়াদের চুলের উপর বল প্রয়োগ করতেই, জাওয়াদ পূর্ণতার পেটের থেকে দাঁত সরিয়ে আনে।

—নির্লজ্জ, অসভ্য হওয়ার একটা লেভেল থাকা উচিত। কিন্তু আপনি দিনকে দিন সেটাও অতিক্রম করে যাচ্ছেন।

জাওয়াদ এবার নিজ থেকেই উঠে দাঁড়ায় নিচ থেকে। তবে পূর্ণতাকে জনাব এত তাড়াতাড়ি ছাড়তে নারাজ। মেয়েটাকে আরেকটু নাজেহাল না করলে তার কেমন পোষাচ্ছে না। সে পূর্ণতার শাড়ির আঁচলের নিচ দিয়ে হাত গলিয়ে দিয়ে পূর্ণতার তলানো কোমড় চেপে ধরে নিজের খড়খড়ে হাত দ্বারা। তারপর টান দিয়ে তাকে নিয়ে এসে ফেলে নিজের বক্ষের উপর। পূর্ণতা নিজের দুই হাত জাওয়াদের বুকের উপর রাখে।

জাওয়াদ সন্তর্পণে পূর্ণতার কপালের উপর আসা কিছু চুল কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বলল–

—স্ত্রীদের কাছে স্বামীরা লেভেলহীন নির্লজ্জ, অসভ্য হয়ে থাকে। নাহলে পরবর্তী জেনারেশন আসতে দেরি হয়ে যায় জানেমান।

পূর্ণতা হা হয়ে যায় জাওয়াদের এমন ঠোঁটকাটা কথা শুনে। লোকটাকে সে যতই দেখছে, ততই অবাক হচ্ছে। কি সুন্দর অসভ্য মার্কা কথা বলে বলে তাকে নাজেহাল করে তুলছে। এমন জাওয়াদকে সে কল্পনাতেও কখনো ভাবেনি।

আগে কি সুন্দর চুপচাপ, শান্ত, লাজুক টাইপের ছিল পূর্ণতার শ্যাম সুন্দর পুরুষটা। সে কথায় কথায় জাওয়াদকে নাস্তানাবুদ করে তুলত, কিন্তু সময়ের চাকা ঘুরে গিয়ে পূর্ণতা হয়ে গিয়েছে চুপচাপ আর লাজুক। অন্যদিকে জাওয়াদ হয়ে গিয়েছে চূড়ান্ত ঠোঁটকাটা ও অসভ্য লোক।

—অ্যাঁই, আপনার কি হয়েছে বলেন তো? এমন অসভ্যের মতো আচরণ করছেন কেন? সকাল সকাল চিপায়-চুপায় গিয়ে নেশা পানি খেয়েছেন নাকি কিছু?

—চোখের সামনে এমন নেশা ধরানো বউ থাকলে, আমার মতো পুরুষদের আলাদা কোন নেশা পানি করা লাগে না বউ। আচ্ছা একটা কথা রাখো না প্লিজ জান।

জাওয়াদ কিছুটা আকুতি নিয়ে বলে কথাটা। পূর্ণতা বরাবরের মতোই জাওয়াদের আকুতি ফিরিয়ে দিতে পারে না। তাই সে জিজ্ঞেস করে–

—কি কথা?

—শুনো, তুমি তো মাশা আল্লাহ আসমানের চান্দের লাহান সুন্দর। তাই মেকআপটা একটু কম ঘষে কিছুটা সময় বের করে আমার সাথে একটু চিপায় চলো না প্লিজ। ভীষণ নেশা করতে ইচ্ছে করছে তোমায় দ্বারা। তোমার স্বামীর জন্য বর্তমানে, ইট’স ভেরি আর্জেন্ট বউ। বেশি সময় নিবো না প্রমিজ।

পূর্ণতার মেজাজ খিঁচে যায় জাওয়াদের এই আবদারে। বেটার শখ কতো! এই সাত-সকালে চিপায় যাওয়ার জন্য ইনভাইট করছে তাঁকে। সে তার কথায় সম্মতি দিয়ে যাক চিপায়, আর আজকের জন্য সিলেটে যাওয়ার প্ল্যানটা ক্যান্সেল হোক। সোজা বাংলা ভাষায় বললে বলা হবে,শেয়ালের কাছে মুরগি বর্গা দিবে সে।

পূর্ণতা জাওয়াদের অহেতুক আবদারে খেঁকিয়ে ওঠে।

—ফাউল কথা বন্ধ করবেন তাজের পাপা? নাহলে খবর আছে আপনার। আমাকে ছেড়ে দাঁড়ান বলছি। কখন থেকে আজেবাজে কথা বলে সময় নষ্ট করছেন আমার। মেজাজ কিন্তু এবার চারশ বিশ হয়ে আছে।

জাওয়াদ ছাড়ে না পূর্ণতাকে। নাছোড়বান্দার মতো চেপে ধরেই বলে–

—চলো না, চলো না প্লিজ। আর আবদার করবো না সারাদিনে। সারাদিন না, আগামী দু’দিনও করব না।

—পারব না বলেছি না একবার। ছাড়ুন অসভ্য লোক।

পূর্ণতা নিজেকে জাওয়াদের থেকে ছাড়ানোর জন্য মোচড়ামুচড়ি করতে থাকে। জাওয়াদ বুঝে যায়, তার আবদার পূরণ হবে না। তাই সে একদমই ছোট একটা আবদার করে–

—আচ্ছা চিপায় যেতে হবে না, শুধু একটা চুমু দাও তাহলে। সময় নিয়ে, ধীরেসুস্থে তোমার নরম ঠোঁটের একটা কোমল স্পর্শ দিয়ে আমার অশান্ত মনটাকে শান্ত করো একটু। তুমিই দেখো, কেমন অস্বাভাবিক রকমের দ্রুত হয়ে আছে না আমার হার্টবিট। ভীষণ করে মনটা চাইছে তোমার একটা চুমু। দাও না বউ একটা চুমু।

পূর্ণতার ডান হাতটা নিজের বুকের বাম পাশে চেপে ধরে বলে জাওয়াদ। পূর্ণতা সত্যিই অনুভব করে জাওয়াদের হার্টবিট দ্রুত গতিতে চলছে। লোকটার চোখ-মুখের অবস্থাও বেশি একটা ভালো নয়। পূর্ণতা গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

পূর্ণতা জাওয়াদের বুক থেকে হাতটা সরিয়ে নিয়ে তার কাঁধে রাখে। তারপর দুই পায়ের আঙুলের উপর ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল–

—একটা চুমুই। এরপর আর জ্বালাবেন না আমায়।

—আচ্ছা।

সুবোধ বালকের ন্যায় বউয়ের কথায় সম্মতি দেয় জাওয়াদ। পূর্ণতা জাওয়াদের গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে সরে আসতে নেয়, কিন্তু তার ধুরন্ধর জামাই এর পূর্বেই তাঁকে আঁটকে নেয় নিজের মাঝে। লোকটা বেশ সময় নিয়ে, রয়েসয়ে পূর্ণতার ঠোঁটে আচ্ছাদিত লাল লিপস্টিকগুলো ঘেটে দিতে থাকে নিজের ঠোঁট দ্বারা। জাওয়াদের এহেন কাণ্ডে পূর্ণতা চোখ বড় বড় করে নিয়ে সরে যেতে চায়, কিন্তু জাওয়াদ ছাড়লে তো।

একসময় পূর্ণতা নিজেও ছুটোছুটি থামিয়ে স্বামীর ডাকে কিছুটা সাড়া দেয়। পূর্ণতার রেসপন্স পেয়ে জাওয়াদ তো খুশিতে বাক-বাকুম হয়ে যায়। সে পূর্ণতার কোমড়ের দুই পাশে চেপে ধরে তাকে কিছুটা উঁচু করে নিজের পায়ের উপর এনে দাঁড় করায়। তারপর দু’জন দু’জনাতে মগ্ন হয়ে যায়।

তাদের এই রোমান্টিক মুহূর্ত পণ্ড করতে এসো হাজির হয় তাদেরই একমাত্র সন্তান তাজওয়াদ। সে ছুটতে ছুটতে তাদের ডাকতে ডাকতে রুমে প্রবেশ করে–

—মাম্মা, ও মাম্মা… দাদাভাই আমাকে মজা খেতে দিয়েছে দেকো।

পূর্ণতা জাওয়াদকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এবং নিজেও কিছুটা দূরত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জাওয়াদ থতমত খেয়ে যায় ছেলের আকস্মিক আগমনে। মনে মনে বলে সে–

—বাপের রোমান্সে শত্রু যখন ছেলে হয়, তখন দোষ আর কাকে দিবো।

তাজওয়াদ তার মায়ের কাছে গিয়ে হাতে থাকা চকলেট গুলো দেখায় তাকে, যেগুলো তাকে তার দাদাভাই দিয়েছে। পূর্ণতা একটা চকলেটের প্যাকেট ছিঁড়ে তাজওয়াদের হাতে দেয়, আর বাকিগুলো নিজের কাছে রেখে দেয় নাহয় চকলেট প্রেমী তাজওয়াদ সবগুলো এক বসাতেই সাবাড় করে দিবে।

তাজওয়াদ পুরো রুমে হাঁটতে হাটঁতে হঠাৎই খেয়াল করে তার পাপার মুখে কেমন যেন লাল লাল। সে বেশ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে–

—পাপা, তোমাল ফেইসে এগুলো কি? তুমি আমাকে ছেলে একা একা কি খেয়েছো?

জাওয়াদ ছেলের কথা বুঝতে না পেরে ফোনের ক্যামেরা অন করে দেখে, তার ঠোঁটের চারপাশে লিপস্টিক ছড়িয়ে রয়েছে। সে আবারও থতমত খেয়ে যায়। ভাগ্যিস ছেলেটা ছোট, তাই কিছু বুঝতে পারে নি। এই অবস্থায় সে বাহিরে গেলে নির্ঘাত তার মান-সম্মান রাস্তায় গড়াগড়ি খেতো।

জাওয়াদ টিস্যু নিয়ে নিজের মুখ মুছে নেয়। তাজওয়াদও তার রুটিন অনুযায়ী মায়ের পেছন পেছন ঘুরতে থাকে। সে তার মা’কে লিপস্টিক দিতে দেখে তার ভীষণ আগ্রহ হয় জিনিসটার উপর। সে চটজলদি ড্রেসিং টেবিলের সামনের টুলে উঠে দাঁড়ায়। তারপর ডাগর ডাগর চোখে তাকিয়ে বলে–

—মাম্মা, এতা কি দিচ্চো?

—এটা লিপস্টিক সোনা।

—লিপচিক দিয়ে কি কলে?

—এটা লিপসে দেয় সোনা। তাহলে লিপস অনেক সুন্দর লাগে।

—কিন্তু তোমাল লিপস তো আগেল থেকেই সুন্দল।

—তাই বুঝি?

—হুম। আমাল মাম্মা ওয়ার্ল্ডেল সবচাইতে প্রিটি লেডি।

—ওলে আমার বাচ্চাটা! থ্যাঙ্ক ইউ সোনা।

পূর্ণতা ঠেসে তাজওয়াদের দুই গালে চুমু দিয়ে তাজওয়াদের ফুলকো গাল দুটো লালে লাল বানিয়ে দেয়। তারপর নিজেও হাসতে থাকে, তার সাথে সাথে তাজওয়াদও হাসতে থাকে। তাদের মা-ছেলের এমন খুনসুটিপূর্ণ সুন্দর মুহূর্তটাকে জাওয়াদ গোপনে ক্যামেরায় বন্দি করে রাখে।

_______________________________

টিফিন ব্রেকের ঘণ্টা বাজতেই টনি তার আজকের পাঠদান সমাপ্ত করে নিজের লেকচার শিট গুলো গুছিয়ে ক্লাস রুম থেকে বের হয়ে আসে। সে বেড়িয়ে আসতেই ক্লাসের সামনে কান ধরে দাড়িয়ে থাকা তিনজনকে গম্ভীর গলায় বলে–

—সামনের বার থেকে আমার ক্লাসে কোন রকমের ডিস্টার্বেন্স করলে, করিডরে না একদম মাঠের মাঝখানে দাঁড় করাবো তোমাদের। আর হ্যাঁ, বাকি সবার এসাইনমেন্ট জমা দেওয়া হয়ে গেলেও তোমরা তিনজন আজও এসাইনমেন্ট জমা দাও নি।

যদি কালকের মধ্যে এসাইনমেন্ট জমা না দাও তাহলে এই এসাইনমেন্টের নাম্বার তোমাদের ফাইনাল পরীক্ষার খাতা থেকে কাটা হবে।

জাওয়াদ মেয়েগুলোকে এক প্রকার হুমকি দিয়েই সেখান থেকে গটগটিয়ে হেঁটে টিচার্সরুমে চলে যায়। টনি চলে যেতেই মেয়েটির মধ্যে সবচাইতে অহংকারী, ঘাড়ত্যাড়া ও বদমেজাজি মেয়েটি নিজের কলেজ এপ্রোনের ভেতর থেকে একটা ফোন বের করে। কলেজে ফোন আনা এলাউ না থাকলেও, বড়লোক বাবার বিগড়ে যাওয়া সন্তান হওয়ায় সে ফোন আনে নিজের সাথে।

মেয়েটি ফোন বের করে তার বাবাকে কল দিয়ে কান্নাকাটি করে নিজের কান ধরে বাহিরে দাঁড়িয়ে থাকার বিষয়টি জানায়। মেয়েটির বাবা কন্যার কান্না শুনে বিচলিত হয়ে বলেন–

—সামান্তা, মা আমার কেঁদো না। ড্যাডি এখনই আসছি। ওয়েট করো তুমি।

—ওকে ড্যাডি।

সামান্তা কল কেটে দিয়ে একটা শয়তানি হাসি দেয়। আসলে সামান্ত আর তার দুই ফ্রেন্ড মিম ও মোনা ক্লাসে বেয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে প্রায়ই। একদম সামনের সিটে বসে নিজেদের মতো গল্পগুজব করতেই থাকে ক্লাস চলাকালীন সময়। তার বাবা কলেজের ট্রাস্টি বোর্ডের একজন মেম্বার বলে, সব টিচারই তাকে বিশেষ ছাড় দিয়ে থাকে। কিন্তু টনি বরাবরের মতোই ভিন্ন।

সে নিজের ক্লাসে একদমই বিশৃঙ্খলা পছন্দ করে না। ভালো স্টুডেন্টদের কাছে টনি ইতিমধ্যে প্রিয় টিচার হিসেবে নিজের নাম লিখে ফেলেছে। অন্যদিকে ব্যাক বেঞ্চার্সদের কাছে টনি “জল্লাদ টিচার” নামে আখ্যায়িত হয়েছে। সামান্তারা আজ ক্লাস চলাকালীন সময় নিজেদের মতো আড্ডা দিতে থাকলে, টনি রেগে গিয়ে তাদের তিনজনকে কান ধরে ক্লাসের বাহিরে দাঁড় করিয়ে রাখে।

দোষটা সামান্তাদেরই। কিন্তু সামান্তা ফোনে তার বাবাকে ঘটনা বলার সময় পুরো দোষ টনির উপর চাপিয়ে দিয়েছে। তার অপর দুই ফ্রেন্ড তাকে বাহবা দিয়ে বলল–

—আঙ্কেল এই জল্লাদকে আজ দেখিস কলেজ ছাড়া করেই ছাড়বে।

—তা আর বলতে। দেখ না কিভাবে অপদস্ত করে বের করি ঐ শালাকে।

২০মিনিট পর টনিকে একজন পিওন প্রিন্সিপালের অফিসে যেতে বলে। টনির খাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ায় সে হাত ধুয়ে প্রিন্সিপালের রুমে চলে আসে। প্রিন্সিপালের পারমিশন নিয়ে কেবিনে প্রবেশ করতেই, টনি দেখতে পায় সামান্তা ও তার পাশে এক মাঝ বয়সী লোক বসে আছে প্রিন্সিপালের টেবিলের সামনে। সে কেবিনে ঢুকতেই প্রিন্সিপাল গম্ভীর গলায় বলল–

—টনি সাহেব, আপনি নাকি শুধু শুধুই সামান্তা ও তার বান্ধবীদের হেনস্তা করছেন? আজ নাকি বিনা কারণে ক্লাস থেকে ওদের বের করে দিয়েছেন? এটা কি সত্যি?

টনি কিছি বলার পূর্বেই সামান্তার পাশে বসে থাকা লোকটি রেগে-মেগে বলে ওঠে–

—উনাকে জিজ্ঞেস করার কি আছে মি. কবির। আমার মেয়ে কি মিথ্যে বলছে বলে আপনার মনে হয়?

তার কথার জবাবে প্রিন্সিপাল গম্ভীর গলায় বলল–

—এক পক্ষের কথা শুনে বিচার আমি কখনোই করি নি, আপনি ভালো করেই জানেন মি.জাফর। যার উপর অভিযোগ এসেছে তার থেকেও তো বিষয়টা আমায় শুনতে হবে। আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন।

“জাফর” নামটা শুনে টনির বুকটা কেমন একটা করে ওঠে। তার মস্তিষ্ক তখন একজন পুরুষের কথা তাকে মনে করিয়ে দেয়, যে কিনা একসময় তার মৃত মায়ের স্বামী ও তার জন্মদাতা ছিল। লোকটির গলার স্বরও কেমন চেনা চেনা ঠেকে তার কাছে। লোকটি টনির দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে বলে, টনি তার ফেইস দেখতে পারছে না।

টনি নিজের অস্থিরতাকে নিজের মাঝে চেপে রেখেই শান্ত গলায় বলল–

—স্যার, ক্লাসে ৪০জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের রেখে আমার শুধু সামান্তা আর ওর ফ্রেন্ডদের হেনস্তা করার কোন কারণ থাকার কথা কি? যেখানে আমি কলেজে জয়েনই করেছি মাত্র ১৭দিন হতে চলেছে।

সামান্তা, মিম ও মোনা এটা তিনজন ক্লাসে ভীষণ বিশৃঙ্খলা তৈরি করে রাখে। এসাইনমেন্ট করতে দিয়েছিলাম ওদের, পাঁচ দিন পূর্বেই সবাই জমা দিয়ে দিয়েছে একমাত্র এরা তিনজন ব্যতীত। আর আজও ক্লাস চলাকালীন সময় ওরা তিনজন নিজেদের মতো করে আড্ডা দিচ্ছিল বলে, আমি ওদের প্রথমে ওয়ার্ন করি। কিন্তু ওরা শুনে না আমার কথা। তাই আমি বাধ্য হই ওদের তিনজনকে বের করে দেই।

প্রিন্সিপাল সাহেব এবার শান্ত দৃষ্টিতে জাফর সাহেব ও সামান্তার দিকে তাকান। সামান্তাও ঘাবড়ে যায় নিজের জারিজুরি ফাঁস হয়ে যাওয়ায়। সে ভাবতেও পারেনি এমনভাবে তার কীর্তিকলাপ ফাঁস হয়ে যাবে।

জাফর সাহেব নিজের মেয়ের কীর্তিকলাপ শুনে লজ্জিত বোধ করেন। সে চেয়ার ছেড়ে উঠেন দাঁড়িয়ে বলেন–

—আমার মেয়ের পক্ষ থেকে আমিই সরি বলছি মি.টনি।

কথা বলা শেষ করে সে টনির দিকে তাকাতেই একদম স্তব্ধ হয়ে যান। টনিও তাই। বহু বছর পর তার মুখ দিয়ে আকস্মিক বের হয়ে যায়–

—বাবা…

[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]

শব্দসংখ্যা~২৭৬৩

#চলবে?

[কত বড় করে দিয়েছি দেখলেন?🥹 সবাই প্লিজ বেশি বেশি রেসপন্স করার চেষ্টা করবেন। হঠাৎই পেইজের রিচ এতটা কমে গিয়েছে যে, আমার কান্না পাচ্ছে। 🥺সবাই ২/৩ টা স্টিকার কমেন্ট হলেও করিয়েন।

ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন।হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply