#শেষ_পাতায়_সূচনা [৫৫.২]
#সাদিয়া_সুলতানা_মনি
আরিয়ান শূন্য দৃষ্টি নিয়ে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আছে। তীরে এসে তড়ি ডুববার বিষয়টা একটু বেশিই হৃদয়বিদারক হয়ে থাকে বরাবরই। পেয়েও না পাওয়ার যন্ত্রণা বিচ্ছেদের মতোই কঠিন হয়।
রাসেল এবার কিছুটা গম্ভীর গলায় বলল–
—”শুরুতেই যেই সমস্যাটা চোখে পড়ে সেটা হলো, আরিয়ানের পূর্বে একবার বিয়ে করেছে। এবং এটাই সমাজ ও আমাদের পরিবারের মেইন সমস্যা। আরওয়ার সাথে যদি আরিয়ানের বিয়েটা হয়েও যায়, তখন আরিয়ান বছরে একবার হলেও আমাদের বাড়িতে আসবে। আশেপাশের দশজন আরওয়ার স্বামী হিসেবে আরিয়ানকে দেখে, আমাদের প্রশ্ন করবে না যে, আঞ্জুমানের স্বামীর সাথে আরিয়ানের বিয়ে হলো কীভাবে?
নিশ্চয়ই আমার বোন বা আমরা ছলচাতুরী করে আঞ্জুমানকে সরিয়ে আরওয়াকে বসিয়েছি। নিজেদের ও নিজের বোনের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল করার জন্য অসৎপথ অবলম্বন করেছি। সত্য যাই হোক না কেন, পাড়া-পড়শীরা তখন সেগুলো আর শুনতে চাইবে না। তারা শুধু আমাদেরই দোষী ভেবে একঘরে করে দিবে।
ভিলেজ পলিটিক্স কতটা জঘন্য হয়ে থাকে, সেটা আপনাদের মতো শহরের উচ্চবিত্তরা জানবেই না, বুঝবেন তো দূর কি বাত। আমাদের মতো মধ্যবিত্তরা, কয়েক বেলা না খেয়ে থাকতে রাজি কিন্তু নিজেদের সম্মান খোয়াতে রাজি নয়।
আর আমি অবিবাহিত বোনকে একজন বিবাহিত ছেলের কাছে বিয়ে দিতে আমাদের মন টানছে না। যেভাবেই হোক, আরিয়ান বিয়ে করেছিল আঞ্জুমানকে। সংসারও করেছে কয়েকমাস।”
রাসেলের কথা একদমই ফেলনা নয়। মেয়ের অভিভাবক হিসেবে তার প্রতিটি কথা যৌক্তিক ও সঠিক। তাই বলে কি সমাজের কথা ভেবে, একজোড়া কপোত-কপোতীকে সারাজীবনের জন্য আলাদা হয়ে যেতে হবে। এই সমাজ আমাদের কোন উপকারে এসেছে কি কোনদিন? সমাজ ও সমাজের কিছুসংখ্যক নিচুমানের মানুষদের কাজই তো হলো, অন্যের দোষ-ত্রুটি খুঁজে খুঁজে বের করে সমালোচনা করা।
এতক্ষণ আরিয়ান, পূর্ণতা, আহনাফ সাহেব রাসেলদের সাথে কথা বললেও, জাওয়াদ সম্পূর্ণটা সময় একদম চুপ ছিল। কথা বলার প্রয়োজন অনুভব করেনি সে তাই বলেনি। কিন্তু এখন আর চুপ করে থাকতে পারে না সে। জাওয়াদ নিস্তব্ধতার চাদর ছিন্ন করে শান্ত অথচ এক দৃঢ় ভঙ্গিতে বলল–
—”আচ্ছা ধরো, তোমার বউয়ের কিছু একটা হয়ে গেলো। বড় কোন অসুখে সে মারা গেলো। জাস্ট বিষয়টা কল্পনা করো, সিরিয়াসলি নিও না। আমি দোয়া করি সে তোমার সাথে বৃদ্ধ হোক।
কিন্তু ভাগ্যের লীলা খেলায় তাকে ইহকাল খুব তাড়াতাড়িই ত্যাগ করতে হলো। তখন তোমার আর তোমার সন্তানটার কি হবে? তুমি পুরুষ মানুষ, তোমার ধর্মই হলো পরিবারের ভরণপোষণের ব্যবস্থা করা। আর নারীদের দায়িত্ব হলো, সংসার ও পরিবার সামলানো। তুমি হয়ত তোমার স্ত্রীকে ভালোবেসে নিজের ও তোমার সন্তানের দায়িত্ব ভাড় নিজেই নিলে। কিন্তু দিনশেষে তুমিও তো মানুষ। সারাদিন বাহির সামলে আবার ঘর সামলাবে? বুকে হাত রেখে বলো তো পারবে তুমি?”
জাওয়াদের প্রশ্নে সকলেই একটু নড়েচড়ে বসে। রাসেলের চোখে-মুখেও এক আলাদা ভাবনার রেখা ফুটে উঠেছে ইতিমধ্যেই। রাসেলকে কিছু বলতে না দেখে জাওয়াদই আবার বলতে থাকে–
—”আবার মনে করো, তোমাদের দেখভালের দায়িত্ব আন্টি নিলো। কিন্তু সে কতদিন করবে? বয়স নিশ্চয়ই তার থেমে থাকবে না, যতদিন না তোমার সন্তান বুঝদার হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত। দিনশেষে, সেই তোমাকে নিজের ও সংসারের জন্য একজন সঙ্গিনীর ঠিকই প্রয়োজন পড়বে। এবং তুমি এই প্রয়োজনকে অস্বীকার করতে পারবে না। পরিস্থিতির চাপে পড়ে, একদিন তুমি নিজেই দ্বিতীয় সঙ্গীকে সামাজিক স্বীকৃতি দিয়ে ঘরে তুলবে। তো যেই কাজটা তুমি করতে পারবে, সেটা আরিয়ান কেন নয়? যেখানে ভাগ্য তার সাথে এক চরম বাজে খেলায় মেতে ছিলো? তোমার সেই সঙ্গিনী যদি কারো দ্বিতীয়া হতে পারে, তাহলে আরওয়া কেন নয়? তোমার বেছে নেওয়া দ্বিতীয়া অন্যের বোন, আর আরওয়া তোমার বোন বলেই কি এই ভেদাভেদ?”
জাওয়াদের শান্ত গলায় করা প্রশ্নগুলো বেশ বিভ্রান্তিতে ফেলে দেয় রাশেদ ও তার মা’কে। পূর্ণতা মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে শুনতে থাকে তার শ্যামসুন্দর পুরুষের কথাগুলো। লোকটার এই দৃঢ়তা, বুঝদারিতার প্রেমেই তো পিছলে পরেছিল সে।
রাশেদ এবার নড়বড়ে গলায় বলল–
—”সেসব নাহয় বাদ দিলাম, কিন্তু আমার প্রথম কথার কি যুক্তি দিবেন আপনি ভাই? সমাজ তো আমাদের দিকেই আঙুল তুলে বাজে কথা বলবে।”
—”আচ্ছা, আঙ্কেল যখন মারা যান তখন এই সমাজ তোমাদের কয়দিন ঘরে এসে ভাত দিয়ে গিয়েছিলো একটু বলবে? বা তোমাদের পড়াশোনার খরচ দিয়েছিলো?”
জাওয়াদের এই প্রশ্নটি শুনে রাসেলের মুখটা অন্ধকারে ছেয়ে যায়। কারণ জাওয়াদের এই প্রশ্নটিরও উত্তর তার কাছে নেই। তার বাবা মারা যাওয়ার তারা যখন গ্রামে চলে আসে, তখন তাদের চারপাশের কেউ এগিয়ে আসেনি সাহায্যের জন্য।
এই গ্রাম থেকে তিন গ্রাম পরেই রাসেলদের নানার বাড়ি। সেখানে তারা বহুকষ্টে ছয় মাসের মতো টিকতে পেরেছিল। তারপর একদিন তার মা পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের অংশের দাবী করলে মামীরা তাদের মেরে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। পাশের বাড়িতে তার মায়ের খালা বসবাস করত, সেখানে একটা রাত থাকতে দেয়। কিন্তু পরের দিন তাদের মামীরা মিথ্যে চুরির অপবাদ দিলে তাদের ঐ গ্রাম ছেড়ে চলে আসতে হয় এখানে।
এখানে এসেও যে খুব ভালো ছিল তা কিন্তু নয়। তার মায়ের বিয়ের সময়ের কয়েকটা গহনা ছিল, সেটা বিক্রি করে কোন মতে একটা ঘর ভাড়া নিয়ে থাকা শুরু করে। খুব ছোট বয়সেই তাঁকে কাজে লেগে যেতে হয়। সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে গিয়ে তার আর পড়ালেখা করা হয় না।
রাসেলের মা নিজের স্বামীর অকাল মৃত্যুতে এমনিতেই শোকাহত ছিল, তার উপর ভাইদের বিশ্বাসঘাতকার সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তখন তেরো বছরের ছোট রাসেলকেই কখনো ইটের ভাঁটায় ইট ভেঙে, কখনো বা হোটেলের এঁটো থালাবাসন ধুয়ে ঘরের রান্নার জন্য টাকা জোগার করতে হয়েছিল। তার মা এতটা শিক্ষিত না হওয়ায় তাকে-ও ক্ষেতে-খামারে কাজ করে অথবা কাথা সেলাই করে সংসার চালাতে হয়েছে। আজ পর্যন্ত তারা কখনোই কারো থেকে দু’টো টাকার সাহায্য পায় নি। তার বাবার পেনশন থেকে মাস শেষে একটা এমাউন্ট আসলেও, কয়েকমাস পর অজ্ঞাত এক কারনে সেটাও আসা বন্ধ হয়ে যায়।
—”শুনো রাসেল, বোন আমার ঘরেও আছে। সেও একজনকে পছন্দ করে। ছেলেটা এতিম, আগে পূর্ণতার আন্ডারে কাজ করত। কিন্তু ভবিষ্যতে সে যেন আমার সামনে এসে বুক ফুলিয়ে নিজের ভালোবাসা জাহির করে আমার বোনকে বিয়ে করতে পারে, সেজন্য সে আলাদা চাকরি নিয়েছে। পরিশ্রম করছে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করার জন্য, তাকে ভালো রাখার জন্য। দিনশেষে আমাদের সকল পরিশ্রম, কষ্ট করা, ত্যাগ সবকিছুই কিন্তু আমাদের আপনজনদের ভালো থাকার জন্য আমরা করে থাকি। তাদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য করি। কিন্তু আমাদের এত এত পরিশ্রমের পরও যদি আমাদের আপনজন সুখে না থাকে তাহলে সেই পরিশ্রমের কোন মূল্য থাকবে?
তোমরা চাইলেই তো আরওয়াকে আরো ছোট বয়সে বিয়ে দিয়ে দিতে পারতে। কি পারতে না? কিন্তু কেন দাও নি? যাতে তোমার বোনটা পড়াশোনা করে একটা ভালো পজিশনে গিয়ে নিজের সুখ নিজেই অর্জন করতে পারে। নিজের লাইফ পার্টনার নিজেই বেছে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে। তুমি তো আরিয়ানের বাল্যকালের বন্ধু। আমার থেকে তুমি ওকে বেশি ভালো চিনবে, জানবে, বুঝবে। যেই ছেলেটা আগে কোন জায়গায় গেলে, সেখানকার পরিবেশ হাসি-খুশিতে মাতিয়ে রাখত, সেই ছেলেটাকে আমি বিগত কয়েকমাসে কখনো প্রাণ খুলে হাসতে দেখি নি। সবসময় ওর চোখে-মুখে একটা ভয়, চিন্তা দেখা যায়। আর এসব কিছুই শুরু হয়েছে, আঞ্জুমানের সত্যিটা জানার পর থেকে।
সমাজের কথা ভেবে, আজ দু’টো ভালোবাসার মানুষ একে অপরের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেলো। কালের পরিক্রমায় দেখা গেলো, তারা অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছে। কিন্তু ভালোবাসার মানুষটিকে সঙ্গী হিসেবে পাওয়া আর পরিবারের নির্বাচিত সঙ্গী কি এক হলো? দিনশেষে এই সমাজের কথা ভেবেই চারটা জীবন নষ্ট হবে। কিন্তু তোমরা যদি সমাজের কথা চিন্তা না করে ওদের ভালো থাকাটাকে প্রাধান্য দাও, সমাজের কটুক্তি গুলোকে না শোনা ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যাও, দেখা যাবে একসময় নিন্দুকেরা তোমাদের ভাবলেশহীন ভঙ্গি দেখে ঠিকই চুপ করে গিয়েছে । একসময় আঞ্জুমানের সাথে আরিয়ানের বিয়েটাও তারা ভুলে যাবে।
তোমাদের জন্য আমার একটাই পরামর্শ থাকবে, তাড়াহুড়ো না করে সময় নিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবো বিষয়টাকে নিয়ে। তোমাদের সিদ্ধান্তের উপরই অনেকগুলো জীবনের ভালো থাকা নির্ভর করছে।”
______________________________
—”ভাই খাবে আসো। সারাদিন খেলে না কিছুই।”
কোমল গলায় আরিয়ানকে রাতের খাবার খেতে যাওয়ার জন্য ডাকে পূর্ণতা। সকালে তারা আরওয়াদের বাসা থেকে হালকা কিছু নাস্তা করেই চলে এসেছিল। খাওয়ার মন-মানসিকতা একদমই ছিল না কারোরই। বাড়িতে এসে দুপুরেও খায় নি, আরিয়ান এই পর্যন্ত কিচ্ছুটি মুখে দেয় নি। মন খারাপ করেই জাওয়াদের দাদা বাড়ির পেছনের ঘাটে বসে আছে সে।
—”তুই খেয়ে শুতে চলে যা বোনু। আমার ক্ষুধা নেই তেমন একটা।”
—”তা কোন রাজভোগ খাওয়ার জন্য ক্ষুধা নেই শুনি? দেখো ভাই, এত ভেঙে পড়ো না এখনই। আমরা কালও যাবো আরওয়াদের বাড়িতে। আবারও বুঝাবো, তাদের দেখে বুঝদার মানুষ মনে হয়েছে আমার আর তাজের পাপার। তারা ঠিক বুঝবেন তোমার সিচুয়েশন দেখো।”
আরিয়ানকে আশাহত না হওয়ার জন্য পূর্ণতা তাকে ভরসা সূচক কথা গুলো বলে। বিপরীতে আরিয়ান একটা বিষাদময় হাসি দিয়ে বলল–
—”আর কোন আশা দেখছি না রে বোন। একটা জীবন হয়ত অপ্রাপ্তির বোঝাই বয়ে যেতে হবে। তুই প্লিজ আমাকে একটু একা ছেড়ে দে, আমি নিজেকে একটু বুঝাই। মানসিকভাবে অশান্ত লাগছে। আমি একটু একা থাকতে চাই।”
পূর্ণতা আবারও কিছু বলে সান্ত্বনা দিতে চায়, তখনই পেছন থেকে একটা পুরুষালি গলা বলে–
—”ভাবী আপনি চিন্তা করেন না। আজ আমার বন্ধু আমার সাথে নাহয় আজ খাবে।”
লোকটির কথা শুনে পূর্ণতা ও আরিয়ান দু’জনই চমকে পেছনে তাকালে বাড়ির ভেতর থেকে আসা আবছা আলোয় রাসেলকে দেখতে পায় তারা। বলার অপেক্ষা রাখে না, তারা দু’জনই এই রাতের বেলা রাসেলকে এখানে দেখে যথেষ্ট অবাক হয়েছে।
—”ভাইয়া, আপনি? এত রাতে আমাদের বাড়িতে?”
—”হুম। আপনারা তো না খেয়েই চলে আসলেন। কিন্তু আমার মায়ের মন মানছিল না আপনাদের আপ্যায়ন না করে। আসলে, আমরা গরিব হতে পারি ভাবী, কিন্তু আলহামদুলিল্লাহ আজ পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে কেউ আসলে তাকে আপ্যায়ন না করে ছাড়ি নি। আপনারাই প্রথম যারা আমাদের বাড়িতে গিয়ে খালি মুখে চলে আসলে। তাই আমাদের মনটা ভালো লাগছিল না। এজন্য চলে আসলাম আপনাদের নিতে। চলেন, এই গরিবের ঘরে দু’টো ডাল-ভাত খাবেন।”
পূর্ণতা কিছুটা বিচলতা নিয়ে বলল–
—”আপনি যেমনটা ভাবছেন তেমনটা নয় ভাইয়া। আসলে, ভাইয়ার মন খারাপ দেখে আমাদের কারোরই মন ভালো নেই আজ সারাদিন। আরিয়ান ভাই তো সারাদিন কিছুই খায় নি, ছেলে খায় নি দেখে বড় বাবাও খেতে রাজি হচ্ছিল না। তার ঔষধ খাওয়া লাগবে দেখে, আমি জোর করে আড় বাবাকে খাইয়েছি।
আমার সাহেব আর আমি এখনও ভাইয়ার জন্য বসে আছি না খেয়ে। আমার কোন ভাই বোন নাই। আরিয়ান ভাইয়ারও তাই। ভাই ছোট বেলা থেকেই আমাকে নিজের বোনের মতো করে বড় করেছে। আমার সেই ভাই বিরহে না খেয়ে রয়েছে। আর আমি বোন হয়ে কি করে খেতে পারি বলেন?”
পূর্ণতার কথা শুনে রাসেলের মনটা ভরে যায়। আপন ভাই-বোন না হয়েও এদের মনের কি টান। মন-মানসিকতা কত ভালো। রাসেল সবসময় তার একমাত্র ছোট বোনটার জন্য এমনই একটা পরিবারের দোয়া করত উপরওয়ালার কাছে, যাদের মনটা থাকবে পরিষ্কার, হিংসা-বিদ্বেষহীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হয়ত তার সেই দোয়া কবুল করতে চলেছেন।
রাসেল একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল–
—”তা বেশ, এখন আপনি গিয়ে আপনার সাহেবকে ডেকে নিয়ে আসেন গিয়ে। আমি ওকে নিয়ে হাঁটা দিচ্ছি আমাদের বাড়ির দিকে।”
—”কিন্তু ভাইয়া কি যাবে?”
রাসেল কিছুটা কৌতুক পূর্ণ গলায় বলল–
—”যাবে না, আলবাত যাবে। একে তো, ও এতদিন পর গ্রামে এসে আমার বাড়িতে খাবে না, এটা অসম্ভব বিষয়। দুয়ে, স্ত্রীর বড় ভাইয়ের কথা না শোনা একপ্রকার বেয়াদবি ও অসম্মানকর কাজ। আপনার ভাই নিশ্চয়ই এটা করবে না?”
—”তার মানে…..”
পূর্ণতা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করতেই রাসেল হালকা মাথা ঝাঁকিয়ে নিজের জবাব জানিয়ে দেয়। দ্বিতীয় কথাটি রাসেল পূর্ণতার দিকে একটু এগিয়ে এসে কিছুটা ফিসফিস করে বলে। যার কারণে আরিয়ান তার ফিসফিসানি শুনতে পায় না। সে এতক্ষণ বাদে মুখ খুলে–
—”রাসেল, আজ না ভাই। অন্য একদিন খাবো তোদের বাড়িতে। আজ প্লিজ জোর করিস না। হাতজোড় করছি তোর সামনে।”
রাসেল পূর্ণতার কাছ থেকে সরে এসে আরিয়ানকে বলল–
—”আম্মা আমায় বলে দিয়েছে, তোরা না আসা অব্দি সে নিজের ভাতের থালায় হাত দিবে না। এখন বাকিটা তোর ইচ্ছে।”
আরিয়ানের এবার রাসেলের কথা শুনে চোখে পানি জমতে শুরু করে। তার মনটা একটুও ভালো নেই। কিন্তু তার পরিস্থিতি ও মনের অবস্থা কেউই বুঝতে চাইছে না।
পূর্ণতা একবার নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে যায়। বাড়ির কাছাকাছি আসতেই সে দেখতে পায় জাওয়াদ দাড়িয়ে রয়েছে, কিন্তু তার মুখটা কেমন গুরুগম্ভীর। পূর্ণতা এতকিছু খেয়াল করে না। কারণ তার মন তো ভাইয়ের অদূর ভবিষ্যতের কথা ভেবে খুশি হয়ে রয়েছে।
পূর্ণতা একপ্রকার ছুটেই জাওয়াদের কাছে এসে তার বাম হাতের বাহু চেপে ধরে ভীষণ উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল–
—”তাজের পাপা জানেন, রাসেল ভাইয়ারা রাজি বিয়েতে।”
—”ওহ্হ, ভালো তো তাহলে।”
নির্লিপ্ততা নিয়ে বলে জাওয়াদ। জাওয়াদের মধ্যে কোন উচ্ছ্বাস বা খুশির রেশ না দেখতে পেয়ে পূর্ণতা জিজ্ঞেস করে–
—”ওহ্হ, ভালো মানে? আপনার মধ্যে কোন উচ্ছ্বাস বা খুশির রেশ নেই কেন ভাইয়ার বিয়ের কথা শুনে?”
জাওয়াদ এবার নিজের হাতটা পূর্ণতার থেকে কঠোরতা নিয়ে ছাড়িয়ে নেয়। পূর্ণতা অবাক হয়ে যায় তার এমন ব্যবহারে। জাওয়াদ রূক্ষ গলায় বলে–
—”তুমি কি চাইছো, আমি খুশিতে নাচতে নাচতে যাকে সামনে পাবো তাকেই গিয়ে জড়িয়ে ধরবো? সে কোন মেয়ে হোক বা ছেলে?”
—”এমনটা করতে কখন বললাম? আর আপনি হঠাৎ রেগে গেলেন কেন?”
ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে পূর্ণতা। জাওয়াদ তার প্রশ্ন শুনে পূর্ণতার হাতের বাহু টেনে তাকে নিজের অনেকটা কাছে নিয়ে আসে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে কিড়মিড় করে বলল–
—”রাগবো না কেনো? ঐ রাসেল শালায় তোমার দিকে ঝুঁকল কেন? আর তুমিই বা সরে গেলে না কেন?”
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতা সাত আসমানের উপর থেকে পড়ে। রাসেল আর তার মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব ছিল। হয়ত অন্ধকার ছিল বলে জাওয়াদ তাদের দূরত্বটা বুঝতে পারেনি। তাই বলে এমন রেগে যাবে? আচ্ছা সে কি জেলাস পূর্ণতার কাছাকাছি কোন পুরুষ আসায়?
কথাটা ভেবেই পূর্ণতা মনে মনে একচোট হেঁসে নেয়। লোকটা আস্ত পা”গল একটা। তার বেশ মনে আছে তখনকার কথা, যখন নওশাদ আর তাকে জাওয়াদ একসাথে দেখত। তখন কি ক্ষেপাটাই না ক্ষেপত এই পা”গলা।
পূর্ণতা চোখে-মুখে দুষ্টমি পূর্ণ হাসি ফুটিয়ে ভ্রু নাচিয়ে জাওয়াদকে প্রশ্ন করে–
—”রাসেল ভাইয়া আমার কাছে এসে দাড়িয়েছিল বলে, আর ইউ জেলাস তাজের পাপা?”
পূর্ণতার প্রশ্ন শুনে জাওয়াদের চান্দি আরো গরম হয়ে যায়। সে পূর্ণতাকে ছেড়ে দিয়ে হনহনিয়ে বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বলল–
—”না, আমি ভীষণ খুশি। সেই খুশি উৎযাপন করতে যাচ্ছি। সামনে যেই মেয়েকে পাবো তার দিকে ঝুঁকেই এই খুশি প্রকাশ করবো।”
পূর্ণতাও ছুটে তার পা”গল পুরুষের পেছন পেছন। অনেক বুঝিয়ে-শুনিয়ে, নিজের অবলা ঠোঁটটাকে আহত করার বিনিময়ে জাওয়াদের রাগ ভাঙায় সে। তারপর তারাও হাঁটা দেয় রাসেলদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
_________________________
—”পানি, একটু পানি দাও না কেউ একজন।”
প্রচণ্ড তৃষ্ণায় হাসফাস করতে করতে ভঙ্গুর গলায় বলে ওঠে এক রমণী। তার কথা শুনে একজন মেয়ে ঠিকই পানি এনে দেয় তাঁকে। মেয়ে পানির গ্লাস পেয়ে দিকবিদিকশুন্যের ন্যায় গ্লাসটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে কয়েক চুমুক খেয়ে, ভকভক করে বমি করে দেয়। পানিতে অতিরিক্ত লবণ থাকায় আর এক ঢোকও খেতে পারে না পানি সে। মেয়েটিকে পানি এনে দেওয়া মানবী তাকে বমি করতে দেখেও তেমন একটা রিয়াক্ট করে না। সে ভাবলেশহীন ভাবে বলল–
—আপনার জন্য এই পানিই বরাদ্দ রয়েছে। খেতে হলে খান, নাহয় চুপচাপ বসে থাকুন। আরেকবার আওয়াজ পেলে পরের বার মরিচ গুলানো পানি খাওয়াবো।
কথাটি বলেই সেই লোকটি চলে যায়। আর রমণীটি সেখানে বসে বসেই অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২২১৪
[ শেষের মেয়েটি কে গেস করুন তো সবাই।
পিলিইইইইইজ, একটু রেসপন্স করার চেষ্টা করিয়েন সবাই। পেইজের সব লালে লাল হয়ে আছে।
২/১টা কমেন্ট করিয়েন সবাই।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৪.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫২.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪১.১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫০.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫৪.২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪৩.২