#প্রেমবসন্ত_২ ।৭০.১।
#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat
ঝড়ের বেগে দৌড়ে এলো স্বার্থ। পিছু পিছু আসছে জারা। কায়নাত চোখ বড় বড় করে জারার অবয়বের দিকে নজর দিচ্ছে। সে গত কয়েক মাস ধরে ঘ্যানঘ্যান করছে ওকে বাংলাদেশে আসার জন্য; অথচ জারার ব্যস্ততাই নাকি শেষ হয় না।
আয়মান স্বার্থকে বলল,
“এমন ব্যাঙের মতো দৌড়াচ্ছ কেন রাস্তায়? মিরকি ব্যাড়াম হয়েছে?”
স্বার্থ দুই হাত ঘষে ডান হাত দিয়ে ঠাস করে মারল আয়মানের কানের নিচে।
“এত বকরবকর করিস কেন? আমি তোর শত্রু লাগিরে? হবু দুলাভাই লাগি, সম্মান দিয়ে কথা বলবি।”
“তোমার সঙ্গে আমার বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছে যে হবু দুলাভাই বলতে যাব?”
কায়নাত ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ করুন। রাস্তার মধ্যে কী শুরু করেছেন?”
আয়মান মুখ কালো করে বলল,
“আপনি শুধু আমার দোষ দেখেন কেন?”
কায়নাত চোখ পাকাল। ততক্ষণে সেখানে হাজির হয়েছে জারা। সে কাছে আসার প্রায় পরেই দৌড়ে এলো কায়নাতকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু ওর এত বড় উঁচু পেট দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকাল। কায়নাত গাল ভোর হেসে বলল,
“ভালো আছো আপু? কতদিন পর এলে তুমি, আমি যে তোমায় কতদিন ধরে আসতে বলছি আসলে না কেন?”
জারা ওর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে কায়নাতের পেটে আঙুল দিয়ে গুতো মেরে বলল,
“কতদিন এই পুঁচকুর?”
“কদিন পর ৮ মাসে পড়বে।”
“এবাবা! তুমি আমায় আগে বলবে না? আমার তো খেয়ালই ছিল না অর্ণর সেই বাচ্চা বউয়ের পেটে আরেকটা বাচ্চা বড় হচ্ছে, তাহলে আমি ওর জন্য কিছু নিয়ে আসতে পারতাম। তবে চিন্তা নেই, আমার সুইটি লেডির জন্য অনেকক্ষণ কিছু এনেছি আমি।”
কায়নাত খিলখিল করে হেসে উঠল। শরীর দুলিয়ে লেপ্টে গেল অর্ণর শরীরে। অর্ণ ওর কাঁধ জড়িয়ে নিয়ে জারাকে জিজ্ঞেস করল,
“ভালো আছো?”
“খুব। তোমাদের দেখে ভীষণ ভালোলাগছে আমার।”
স্বার্থ নাক-মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“বেচারিকে মাত্র এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে এসেছি আমি, তোরা ওকে এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখবি?”
আয়মান জারার দুইটা লাকেজ নিয়ে কায়নাতের জন্য নিয়ে আসা ছোট ব্যাগ জারার হাতে ধরিয়ে দিল। ওদের বাড়ি ফিরতে ফিরতে তখন চারপাশে নেমে এসেছে অন্ধকার। জারাকে দেখে সবাই অবাক হয়েছেন খুব। ও কাউকেই জানায়নি আজ যে বাংলাদেশে আসবে তাও আবার চৌধুরী বাড়ি। আদালের অবশ্য মুখ ভার। সে একবারও জারার সঙ্গে কথা বলেনি। রাতে সবাই একসঙ্গেই খাবার খেল। স্বার্থ জেদ করে আজ এই বাড়ি থেকে গেছে। আগে কত দিনের পর দিন থাকা হয়েছে তবে এখন পরিস্থিতিটা ভিন্ন। নিশা অবশ্য খুশি হয়েছে, ভেবেছে মন খুলে আজ কথা বলা যাবে তার সঙ্গে। বাড়ির বাইরে তো যাওয়াই হয় না প্রায়। বাবার নজর একদম কড়া হয়েছে। কলেজ থেকে বাড়ি আবার বাড়ি থেকে কলেজ। এভাবেই যাচ্ছে তার দিন-কাল।
চৌধুরী বাড়ির ছাদটা থেকে শহরের অনেকটা জায়গা দেখা যায়। জারার খুব পছন্দের একটা জায়গা এটা। সে যখনই চৌধুরী বাড়ি এসেছে তখনই মন হালকা করতে আশ্রয় নিয়েছে এই ছাদের দোলনায়। মা খুব মজা করে বলতেন অর্ণর বউ হয়ে যখন জারা এই বাড়িতে থেকে যাবে তখন সে সারা দিনরাত এই ছাদের কোণায় পড়ে থাকবে। তখন অবশ্য বেশ লজ্জা লাগত তার। এখন তেমন কোনো অনুভূতি হয় না। হওয়ার কথাও নয়।
জারা পিছু না ঘুরেও বুঝতে পারল কারোর উপস্থিতি। এবং বুঝতে পারল কে আছে পেছনে। অনেকটা সময় নীরবতা চলল সেখানে।
“মন তাকেই খোঁজে, যে শুধু অবহেলা আর চোখের জল উপহার দেয়। হৃদয় বড় অদ্ভুত, যে ক্ষত দেয় তাকেই সে বারবার ভালোবাসতে চায়। তাই না আদাল?”
আদালের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো খানিকক্ষণ পর,
“যেখানে প্রত্যাশা নেই, সেখানে অভিমান নেই; আর যেখানে অভিমান নেই, সেই ভালোবাসাই সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী। তুমি আমাকে ভালোবাসো বা না বাসো, আমার হৃদয়ে তোমার জন্য জমানো অনুভূতিগুলো সবসময় নিষ্কলঙ্ক থাকবে। একতরফা ভালোবাসা বড্ড সুন্দর, যেখানে পাওয়ার কোনো লোভ থাকে না, থাকে শুধু পবিত্র ভালো লাগা। যে ভালোবাসায় কোনো দাবি থাকে না, নিখাদ পবিত্রতা ঠিক সেখানেই খুঁজে পাওয়া যায়।একতরফা প্রেমের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো, এখানে প্রিয় মানুষটাকে হারানোর কোনো ভয় থাকে না।কাউকে দূর থেকে ভালোবেসে তার সুখ কামনা করার মাঝেই লুকিয়ে থাকে এক স্বর্গীয় অনুভূতি।”
“কেন এই অপেক্ষা?”
“ভালোবাসি বলে।”
“যাকে পাবে না তাকে কেন ভালোবাসো?”
কথাটা বলতে গিয়ে একটু গলা কাঁপল ওর। আদাল গুটি গুটি পায়ে ওর সামনে এসে দেয়ালে হ্যালান দিয়ে দাঁড়াল বুকে হাত গুঁজল। শীতের রাতের কুয়াশায় ভিজে গেছে মেয়েটার মাথার চুল। তিরতির করে কাঁপছে পাতলা দুটি ঠোঁট। আদাল চেয়ে রইল ওর চোখের দিকে খানিকক্ষণ। অতঃপর, ঠোঁট কামড়ে হেসে ফেলল।
“চড়ুই পাখি কখনও আমায় দেখে লজ্জা পায়নি আগে, তবে আজ কেন পাচ্ছে শুনি?”
জারা তাড়াতাড়ি দৃষ্টি ফিরিয়ে খানিক রাগ নিয়ে বলল,
“তুমি আমার প্রেমিক হও নাকি যে, তোমায় দেখে লজ্জা পাব আমি?”
“প্রেমিক নই তাতেই এত লাজ, প্রেমিক হলে কী হবে?”
“বাজে কথা না বলে যাও তো তুমি!”
“চলে গেলে চড়ুইকে আগলে রাখবে কে? আজীবন কী সে খোলা আকাশে সঙ্গীহীন উড়ে বেড়াবে?”
“যার জন্য হৃদয়ে অনুভূতি নেই তার জন্য মায়া করে লাভ আছে?”
“অনুভূতি নেই বলছ?”
“না।”
আদাল এক-পা দু-পা করে ছাদের গেটের দিকে এগিয়ে গেল। জারা কপাল কুঁচকে চেয়ে রইল ওর দিকে। হঠাৎ, একদম আচমকা এক কাণ্ড ঘটে গেল। আদাল স-জোরে কপালটা বারি মারল দেয়ালে। জারার পরাণ কেঁপে উঠল। এক লাফে দোলনা থেকে নেমে দৌড়ে এলো ওর কাছে। হেঁচকা টানে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ঘাড় উঁচু করে দুই হাতে চেপে ধরল ওর চোয়াল। কাঁপা কাঁপা গলায় ধমক দিয়ে বলল,
“কী করলে এটা? পাগল তুমি? এভাবে কেউ নিজের মাথা নিজে ফা টায়?”
বলতে বলতে জারা হুডির পকেট থেকে টিস্যু বের করে তাড়াতাড়ি ওর কপাল মুছে দিল, তবু র ক্ত বের হওয়া থামল না। রুহুর পানি শুকিয়ে প্রায় খাঁ-খাঁ অবস্থা ওর। হঠাৎ আদালকে রেখেই ছুটে গেল সিঁড়ি বেয়ে। ফিরে এলো মিনিট দুয়েক পরেই। হাতে ইয়া বড় একটা বক্স। ওকে নিয়ে ছাদের দরজার সামনেই নিচে বসল সে। যত্ন নিয়ে মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিয়ে লক্ষ্য করল আদাল পলকহীন নয়নে চেয়ে তারই নয়নে। জারার নাক টানা বন্ধ হলো না। ঠোঁট কামড়ে যে কান্নাটা আটকে রেখেছিল সেটা এবার উপড়ে পড়ল। ওর কান্না দেখে আদালের গম্ভীর মুখ থেকে আপনা-আপনি হাসি ছিঁটকে বের হলো। প্রাণ খুলে শব্দ করে হাসল। জারার মাথাটা গিয়ে ঠেকল আদালের শক্ত-পোক্ত বুকে। জারা বিড়ালছানার ন্যায় কাঁদতে কাঁদতে ওর বুকে আঘাত করে বলল,
“তুমি কী পাগল? এমন কেউ করে?”
আদাল ঠোঁট কামড়ে বলে,
“তাহলে কেমন করে?”
জারা উত্তর দিতে পারল না কান্নার চোটে। আদালের বাহুতে তখন তার ছোট্ট শরীর। আদাল ফিসফিস করে বলল,
“ভালোবাসি চড়ুই পাখি। ভীষণ ভালোবাসি। এই আদাল চৌধুরী তার চড়ুইকে ভীষণ ভালোবাসে।”
জারার দুই হাত তখন আদালের গলা পেঁচিয়ে ধরেছে। আজ সকল বাঁধা ভুলে সে নিজ মুখে স্বীকার করল,
“আমিও বাসি। এবার ছেড়ে গেলে আমি মরে যাব।”
“এতক্ষণ নাটক করছিলে কেন?”
“বেশি কথা বললে চলে যাব কিন্তু!”
আদাল ঠোঁট প্রসারিত করে হাসল। খুশির হাসি। এতদিনের অপেক্ষা তার বিফলে যায়নি।
•••
একটু আগেই অর্ণ ঘর ঝাড়ু দিয়েছে। কায়নাত এটা-ওটা খেয়ে খেয়ে ফ্লোর নোংরা করে ফেলে বারবার। অর্ণ অবশ্য বেশ কয়েকবার বকেছে তাকে, তবু কায়নাত নিজের কাজে ব্যস্ত। বিছানার মধ্যখানে বালিশবিহীন শুয়ে পায়ের উপর পা দিয়ে অর্ণর একটা বই নিয়ে পড়ছিল ও। পড়ছিল কিনা উপর ওয়ালা ছাড়া কেউ জানে না। ডান হাতে ওর ম্যাংগোবারের প্যাকেট। সেটা ছিঁড়ে পুরোটা মুখে পুরে ছুড়ে মারল ফ্লোরে। অর্ণ তা দেখে চোখ গরম করে বলল,
“কায়নাত, কী হচ্ছে এটা? বিছানায় ঝুড়ি রেখেছি, সেখানে ফেলতে বলেছি না এসব? ঘর নোংরা করা আমার একদম পছন্দ নয়।”
কায়নাত উঁচু পেট টা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। কোমরে দুই হাত রেখে চোখ পাকিয়ে বলল,
“আপনি আবার আমার সাথে রাগ দেখাচ্ছেন? আপনি জানেন আমি কে?”
অর্ণ বুকে দুইহাত গুঁজে বলল,
“কে আপনি?”
“আপনার বাচ্চার মা আমি।”
তারপর উঁচু পেটটায় হাত বুলিয়ে বলল,
“এখানে আছে আপনার বাচ্চা। আমার সাথে বেশি তিড়িং বিড়িং করলে সব ছেড়ে-ছুঁড়ে একদম বাপের বাড়ি চলে যাব।”
অর্ণ ফ্যালফ্যাল করে ছোট্ট বউটার রাগ দেখল। শুষ্ক ঢোক গিলে মিনমিনে গলায় বলল,
“তুমি আমায় ভয় দেখাচ্ছ?”
“ভয় নয় সত্যিই চলে যাব। বাবুকে নিয়ে যাব আর আসব না আপনার কাছে।”
“বাঁদরামি বাদ দিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ো। এখন না ঘুমালে কান ধরে সারারাত ঘরের বাইরে দাঁড় করিয়ে রাখব।”
কায়নাত মুখ বাঁকিয়ে বিছানার একপাশে গিয়ে শুয়ে পড়ল। অর্ণ লাইট বন্ধ করে কায়নাতের পাশে এসে শুলো। অর্ণ কায়নাতের থেকে দূরুত্ব রেখে শুয়েছে বলে কায়নাত কপাল কুঁচকে পাশে ফিরল। অর্ণ তখন চোখের উপর হাত রেখেছে।
“আপনি আমার কাছে আসছেন না কেন? অতদূরে সরে থাকলে আমায় জড়িয়ে ধরবে কে?”
অর্ণ বলল,
“আমার শক্ত শরীরের ছোঁয়া তোমার গায়ে লাগলে ব্যথা পাবে। যদি পেটে ব্যথা পাও?”
“আপনার শরীর কী লোহা দিয়ে তৈরি? একখনি আমার শরীর ঘেঁষে না শুলে ঘর থেকে বেরিয়ে যাব বলে দিলাম।”
অর্ণ সত্যি এবার নিকটে এলো। কায়নাত বিড়াল ছানার ন্যায় অর্ণর বুকে মুখ গুজল। টি-শার্টের ঘ্রাণ লম্বা শ্বাস টেনে নিয়ে মিনমিন করে বলল,
“আপনার শরীরের ঘ্রাণ না পেলে ঘুম হয় না আমার।”
অর্ণ ঠোঁট টিপে হাসল। সাবধানে আলিঙ্গে জড়িয়ে নীল বধূকে। মাথায় চুমু এঁকে খুব আদুরে গলায় বলল,
“চুপটি করে এবার একটু ঘুমাও দেখি!”
কায়নাত মাথা তুলে ঘাড়টা উঁচু করে দেখল অর্ণকে। টি-শার্টের গলা টেনে তোতাপাখির মতো করে আবদার করল,
“বাবু বলছে তার মাকে চুমু দিতে। শিগগির দুটো চুমু দিন নাহলে বাবুর রাগ হবে।”
“দুষ্টুমি বাদ দিয়ে ঘুমাও নাহলে আমি বিগড়ে গেলে তোমার কপালে দুঃখ আছে।”
কায়নাত মুখ ভার করে জোর করে অর্ণর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে খানিক দূরুত্ব বাড়িয়ে শুয়ে পড়ল। অর্ণ শুধু চেয়ে চেয়ে দেখল ওর কাণ্ড। কিছু বলল না। অনেকক্ষণ পর কায়নাতের কোনো সাড়া-শব্দ না পেয়ে অর্ণ উঠে বসল। উকি মেরে দেখল কায়নাতের স্থির শরীর। ওর আপছা আলোয় মনে হলো কায়নাতের শ্বাস চলছে না। কপাল কুঁচকে ঘরের লাইট অন করল ও। তারপর ওকে ডাকল কয়েকবার। কোনো সাড়া নেই। অর্ণর বুক ধক করে উঠল। তাড়াহুড়ো করে ওর নিকটে গিয়ে গালে চাপড় মেরে বলল,
“এই কায়নাত? এই মেয়ে, কী হয়েছে তোমার? শ্বাস নিচ্ছ না কেন?”
মাত্র কয়েক সেকেন্ড, এইটুকু সময়ের মধ্যেই অর্ণ পাগল হয়ে চিৎকার শুরু করল। ওকে কোলে তুলে নিয়ে দরজার নিকট ছুটে গেলে কায়নাত খিলখিল করে হেসে উঠল। চমকে উঠল অর্ণ। শুকনো ঢোক গিলে ভেজা চোখে তাকাল কোলে রাখা বউয়ের দিকে। কায়নাত ওর গলা জড়িয়ে ধরে হাসতে হাসতেই বলল,
“বোকা স্বামী, আমার কিছু হয়নি। কেন দিলে না চুমু?”
অর্ণ কথা বলল না। রাগে চোখের মণি লাল হয়ে এসেছে ওর। কায়নাতকে বিছানায় ফের নামিয়ে দিয়ে ঘরের বাইরে যেতে চাইলে কায়নাত বলল,
“কোথায় যাচ্ছেন? মজা করেছি তো!”
অর্ণ শক্ত গলায় বলল,
“ঘুমাও।”
“আপনি না থাকলে ঘুম আসবে না আমার।”
“কেন আসবে না ঘুম? নাটক করো তুমি আমার সাথে? এটা কোন ধরনের মজা? মাথায় বোধ-বুদ্ধি কিছু নেই তোমার?”
ধমকে উঠল অর্ণ। হঠাৎ এহেন আচরণে কায়নাত চমকে উঠল। চোখ বড় বড় তাকাল ওর দিকে। অর্ণ রাগ সামলাতে না পেরে পাশের সোফায় রাখা ল্যাপটপ ফ্লোরে আছাড় মারল। বিকট শব্দে তা ভেঙে ফ্লোর জুড়ে ছড়িয়ে গেল ছোট ছোট টুকরো। এতই জোরে আছাড় মেরেছে যে এক আছাড়েই সব ভেঙে চুড়মার হয়ে গেছে। কায়নাত ভয়ে কেঁদে উঠল। অর্ণ তেরে আসতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিল। রাগ হচ্ছে তার। রাগ নিয়েও অর্ণর চোখে পানি চিকচিক করছে। কত ভয়টাই না পেয়েছিল সে। আর একটু হলে দম বন্ধ হয়ে মারা যেত। এই মেয়েটা কী বোঝে না কিছু? এসব মজা করার জিনিস?
অর্ণ নিজেকে শান্ত করে কায়নাতের দিকে এগোতে নিলে কায়নাত ভয়ে উঁচু পেটটা দুই হাতে আগলে নিয়ে হেঁচকি তুলে তুলে বলে,
“মারবেন না আমায়।”
অর্ণর চোখ জোড়া অসহায়ের মতো দেখে কায়নাতকে। ও ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে ফ্লোরে বসে কায়নাতের পায়ের কাছে। ওর কোলে মাথা রেখে মুখ খানা গুঁজে দেয় ওর পেটে। সেখানে নরম চুমু এঁকে ধরা গলায় বলে,
“এমন পাগলামো কেন করো কায়নাত? বেশি ভালোবাসি বলে যা খুশি তাই করবে? কত ভয় পেয়েছিলাম জানো? মনে হচ্ছিল আমার পুরো পৃথিবী থমকে গেছে মুহূর্তেই। আমার বাচ্চাটা তোমার গর্ভে।”
কায়নাত নাক টেনে টেনে বলল,
“আর করব না। সরি।”
অর্ণ আর কিছু বলল না। কায়নাতের সাথে গরম হয়ে কথা বললে কান্না-কাটি করে শরীর খারাপ বানিয়ে ফেলবে। অর্ণ উঠে এলো। ওর পাশে বসে ছোট্ট গোল মুখটা দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে গাঢ় চুমু খেল অনেকটা সময় নিয়ে। তারপর ঠোঁটে ঠোঁট। আদরে আদরে ভরিয়ে দিল লাজুক বধুর রাঙা মুখ। কায়নাত ফের কেঁদে উঠল স্বামীর সোহাগ পেয়ে। অর্ণ বুকে জড়িয়ে নিল ওকে। একদম শক্ত করে, যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবে। বহুদূর, অজানা শহরে। যেখানে অর্ণ তার লাল বউকে খুঁজে পাবে না। পাবে তার সন্তানের মুখ দেখতে…..
#চলবে….?
\
#প্রেমবসন্ত_২ ।৭০.২।
#হামিদা_আক্তার_ইভা_Hayat
পরিস্থিতি বলতে গেলে এখন কিছুটা ভিন্ন। নিশা যদি স্বার্থর সাথে এখন আলাদা করে একটু কথা বলতে চায় সেটাও এখন সবাই বাঁকা চোখে দেখে। অর্ণ যদিও বাবাকে নিশার ব্যপার নিয়ে বেশি কথা বলতে বারণ করেছিল, তবু কেন যেন নিশার মনে বড্ড ভয়। তখন রাত নেমেছে অনেকটা। শীতের রাতটা অদ্ভুত হয়। নিশা একমনে বসে বসে ডাইনিং টেবিলে নুডলস খাচ্ছিল। একটু আগেই সে নিচে নেমে বানিয়েছে এটা। রাতে সবার সঙ্গে খাওয়া হয়নি ওর। খিদেয় পেটটা চু চু করছিল।
কাটা চামচ নড়াচড়ার মধ্যেই মনে হলো তাকে কেউ দেখছে। নিশা ভ্রু কুঁচকে উপরে তাকাল। আদালের ঘরের এক কোনায় কালো হুডি পরে বুকে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে আছে স্বার্থ। দেয়ালে হ্যালান দিয়ে তাকিয়ে আছে চুপচাপ ওর দিকে। নিশা শুকনো ঢোক গিলল। ভাবল আজ সব খুলে বলবে স্বার্থকে। নিশা শুকনো ঠোঁটে হালকা হাসি টেনে হাতের ইশারায় স্বার্থকে নিচে ডাকল। স্বার্থ যেন এরই অপেক্ষায় ছিল। নিশা ডাকতেই ছুটে এলো নিচে।
ডাইনিং-এ এসে চেয়ার টেনে বসল নিশার পাশে। খানিক শরীর ঘেঁষে। নিশা চোখ দুটো বড় বড় করে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল কেউ জেগে আছে কিনা। কারোর নজরে পড়লে তুলে আছাড় মারবে ওকে।
স্বার্থ নিশার সামনে থেকে নুডলসের বাটি টেনে নিজের দিকে এনে একই চামচ দিয়ে খাওয়া শুরু করল। নিশা মিনমিন করে বলল,
“আস্তে খাও নাহলে গলায় আটকে যাবে।”
স্বার্থ খেতে খেতে বলল,
“একা একা খাচ্ছিলি দেখে নজর দিচ্ছিলাম উপর থেকে। রান্না কি তুই করেছিস?”
“হু।”
“মজা হয়েছে।”
“তোমাকে আমার কিছু কথা বলার আছে।”
“বল।”
নিশা দুহাত কোঁচলে ধরল। দুরু দুরু করে কাঁপছে বুক। স্বার্থর প্রতিক্রিয়া কেমন হবে জানার পর? ও মনে সাহস জোগাড় করে বলল,
“জানি না কিভাবে নেবে কথাটা, আর যাইহোক আমাকে ভুল বুঝো না দয়া করে।”
স্বার্থ খাওয়া থামিয়ে কপাল কুঁচকে তাকাল ওর দিকে। কপালে গাঢ় ভাঁজ ফেলে বলল,
“কী এমন কথা যার জন্য তুই রীতিমত ভয়ে কাঁপছিস? আর তোকে ভুলই বা ভাবতে যাব কেন?”
“তোমাকে হারানোর ভয় হচ্ছে আমার।”
স্বার্থ মুচকি হেসে নিশার গালে হাত রাখল। সেথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“ভয়ের কী আছে? আমি তোকে ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না, বরং নিজের কাছে রাখব বলে তার প্রিপারেশন নিচ্ছি।”
নিশা মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে ধরল কান্না আটকাতে। পারল না তা করতে। নাক টেনে টেনে বলল,
“বাবা আমার বিয়ে ঠিক করেছে। উনি চান না তোমার সঙ্গে আমার বিয়ে হোক।”
স্বার্থর মুখ দেখে বোঝার উপায় নেই তার অনুভূতি এই মুহূর্তে কেমন। নিশা ছলছল চোখে তাকায়। ওকে চুপ করে থাকতে দেখে ভয় পায় খানিক। হাত ঝাকিয়ে বলে,
“কথা কেন বলছ না তুমি?”
“কবে বিয়ে ঠিক হয়েছে?”
“কায়নাতের এইচএসসি পরীক্ষার আগে।”
স্বার্থ চোখ বন্ধ করে দাঁত চেপে বলে,
“কার সঙ্গে?”
নিশা শক্ত একটা ঢোক গেলে। হাতে হাত চেপে বলে,
“আদাল ভাইয়া।”
ঝনঝন এক বিকট শব্দে মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো ড্রইংরুম। নিশা চমকে ওঠে এহেন কাণ্ডে। নুডলসের কাচের বাটিটা স্বার্থ ছুড়ে মেরেছে ফ্লোরে। সেটা ভেঙে টুকরো টুকরো রূপ ধারণ করেছে। নিশা মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠল। স্বার্থ নিশার ছোট চোয়ালটা শক্ত করে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“তুইও বেঈমান। তোর র*ক্তে বেঈমানী লেখা আছে। ভালোবাসার নাটক করে এখন অন্যজনকে বিয়ে করার শখ জেগেছে?”
নিশা বহু কষ্টে কাঁপা গলায় বলে,
“তুমি আমায় ভুল বুঝছ।”
“কী ভুল বুঝছি আমি? তোর বিয়ের কথা চলছে বছর খানেক ধরে আর আজ তুই আমায় এই কথা বলে কী প্রমাণ করতে চাইছিস? আমি কাপুরুষ? আমি তোর অযোগ্য?”
নিশা কিছু বলতে চাইল ওকে, কিন্তু স্বার্থর বাঁধায় তা সম্ভব হয়ে উঠল না। স্বার্থ ওরে ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। সব ফেলে বাড়ির দরজার দিকে যেতে চাইলে নিশা ছুটে গেল নিকটে। ওর পথ বন্ধ করে স্বার্থর একহাত জড়িয়ে নেয় বুকে। কান্নার বেগ বাড়তে বাড়তে নিশা বলল,
“আমি অনেকবার তোমায় বলার চেষ্টা করেছি বিশ্বাস করো? এভাবে আমায় ছেড়ে গেলে আমি কী করে থাকব?”
স্বার্থ জোর করে নিজের থেকে নিশাকে ছাড়িয়ে দাঁত চেপে বলল,
“জাহান্নামে যা। তোর জন্য এতদিন কী না করেছি নিশা? কী করিনি বল? এই তোর কথা ভেবে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে গেছি আমি। অপেক্ষা করা আমার ভুল হয়েছে? তোকে ভালোবেসে ভুল করেছি আমি?”
নিশা কাঁদতে কাঁদতে এগিয়ে এসে ধরতে চাইল ওকে। স্বার্থ দুপা পিছিয়ে গিয়ে হাত উঁচিয়ে বলল,
“ধরবি না একদম। আমি সব সহ্য করতে পারলেও বেঈমানী সহ্য করতে পারব না।”
“কী হচ্ছে কী এই রাত-বিরেতে? কোন ভদ্রলোকের বাড়িতে এইসময়ে চিৎকার চেঁচামেচি হয়?”
মাশফিক চৌধুরী সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বলছেন এই কথা। পেছনে বেহরুজ বেগম এবং বেলি বেগমও আছেন। স্বার্থ ফিরেও তাকাল না তাদের দিকে। বেরিয়ে যেতে চাইল বাড়ির ভাইরে, তার পূর্বেই নিশা মাটিতে বসে পা জড়িয়ে ধরল ওর। এবার চিৎকার করে কান্না শুরু করল।
“কোথায় যাচ্ছ তুমি? আমাকে ভুল বুঝো না স্বার্থ ভাই। আমি বাবার কথায় রাজী হইনি বিশ্বাস করো আমায়! একটাবার বিশ্বাস করে দেখো না!”
স্বার্থ ধমকে উঠল,
“পা ছাড় আমার!”
“না না, তুমি কোথাও যাবে না। তুমি আমায় বেঈমান ভাবছ কেন? আমি..আমি..”
মাশফিক চৌধুরী তখন তেরে-মেরে এসে মেয়েকে টেনে দাঁড় করালেন। মেয়ের কাণ্ড-কীর্তি দেখে যেন মাথায় র*ক্ত চড়ে বসেছে। তিনি ধমক দিয়ে বললেন,
“এসব কী নিশা?”
নিশা তবু স্বার্থর এক হাত চেপে ধরে বাবাকে জড়াল গলায় বলছে,
“তুমি ওকে আটকাও না বাবা। ও আমায় বিশ্বাস করছে না।”
“ওর হাত ছাড়ো নিশা। একখনি নিজের ঘরে যাও।”
স্বার্থ নিজেই ছাড়িয়ে নিল নিজের হাত। মাশফিক চৌধুরীর চোখে চোখ রাখল এবার। বাজপাখির ন্যায় চোখ জোড়া জ্বলজ্বল করছে রাগে। সে বলল,
“আপনার মেয়েকে আপনিই রেখে দিন। আর কোনোদিন ওর হাত চাইতে আসব না আমি।”
স্বার্থ হনহনিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে সদর দরজা খুলে। নিশা ওর পিছু নিতে চাইলে মাশফিক চৌধুরী চেপে ধরেন মেয়ের হাত। ধমক দিয়ে বলেন,
“থাপড়ে তোমার বেয়াদবি বের করব। বেহায়ার মতো ওর পায়ের কাছে গড়াগড়ি করছিলে কেন?”
নিশা বাবার হাত ঝাঁকিয়ে বলল,
“ওকে থামাও না বাবা! ও আমায় ভুল বুঝে বেরিয়ে গেছে বাড়ি থেকে। ওকে তুমি চেনো না বাবা। ও আমার এই মুখ জীবনে দেখবে না। ওকে থামাও তুমি।”
বেহরুজ বেগম স্বামীর থেকে মেয়েকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলেন,
“এমন করার কোনো দরকার ছিল তোমার? বলেছিলাম বেশি বুঝো না। বাচ্চাদের জীবন বাচ্চাদের নিয়েই ভাবতে দাও।”
মাশফিক চৌধুরী গরুগম্ভীর চোয়ালে বলেন,
“যা করছি মেয়ের ভালোর জন্যই করছি। ওকে ঘরে দিয়ে এসো।”
তিনি হনহন করে চলে গেলেন নিজের ঘরে। বেলি বেগম বাকহারা নাতনির কান্না দেখে। বেহরুজ বেগম মেয়ের মাথার এলোমেল চুল ঠিক করতে করতে বলেন,
“কান্না থামা। কী হয়েছে সেটা বল আমায়!”
নিশা মাকে জড়িয়ে ধরল শরীরের শক্তি দিয়ে। হাউমাউ করে কেঁদে উঠল এবার। সেভাবেই বলতে লাগল,
“ওকে আমি সবটা বলেছি মা। আমি এটাও বলেছি বাবার কথায় আমি রাজী হইনি। তবু ও আমায় বিশ্বাস করছে না মা।”
বেলি বেগম বলেন,
“তোদের সমস্যা কী বেহরুজ? আমার মা মরা নাতনির সুখ হোক তোরা চাস না? ও যাকে ভালোবাসে তার সঙ্গে সারাজীবন থাকতে চাইবে এটাই তো স্বাভাবিক। স্বার্থর মধ্যে খারাপের কী আছে? ও কী ছোট বাচ্চা যে, জোর করে ওর উপর নিজেদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া হবে?”
বেহরুজ বেগম বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“মাশফিক আমার কথা শুনলে তো কিছু বলব মা।”
উপর ফ্লোর থেকে অর্ণ নেমে এসেছে। নিচে হাঙ্গামা হয়েছে বেশ বুঝতে পারছে সে। ছোট বোনকে কাঁদতে দেখে নিকটে এগিয়ে এসে কপাল কুঁচকে বলল,
“নিশু কাঁদছে কেন? এত রাত করে কী হয়েছে?”
নিশা বড় ভাইয়ের কণ্ঠস্বর শুনে মাকে ছেড়ে ভাইকে ঝাঁপটে ধরল। অর্ণ হতভম্ব হয়ে বোনকে দেখল। কান্নার ফলে কথা অব্দি বলতে পারছে না। চোখ-মুখ ফুলে একাকার। ফ্লোর জুড়ে ছিটিয়ে আছে কাচের টুকরো আর..আর নিশার পায়ের নিচে র*ক্ত। অর্ণ চমকে উঠল। আর কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজনবোধ করল না। পাঁজাকোলে নিয়ে মাকে বলল,
“তোমরা কী অন্ধ? ওর পা কেটে গেছে দেখতে পাচ্ছ না?”
অর্ণ ওকে নিয়ে ছুটল সিঁড়ির দিকে। মা আর নানি পিছু আসছেন। নিশা ভাইয়ের বুকে মুখ গুঁজেই কেঁদে চলল। বারবার স্বার্থর কথা বলতে লাগল। কিন্তু স্বার্থ তো আর নেই। আর হয়ত আসবেও না তার কাছে।
•••
আজকে কায়নাতের হসপিটালে চেকআপ আছে। সেই হিসেব করে প্রেম হসপিটালে আজ লেট করে যাবে। অর্ণ যেহেতু থাকবে না বাড়িতে তাই তাকেই দায়িত্ব পালন করতে হবে। সঙ্গে অবশ্য আয়মান আর নিধিও হয়তো যাবে। সকালে গিয়ে নিশাকে ঔষধ দিয়ে এসেছে সে। পায়ের অবস্থা যা-তা বানিয়ে রেখেছে। কাচের টুকরো গুলো কাল রাতে বের করতে বেশ ভেজাল হয়েছিল।
অর্ণ অফিসে চলে গেছে ততক্ষণে। কায়নাত সাদা প্রিন্টের একটা গোল জামা পরে মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে এলো। প্রেম ধরে ধরে ওকে নিচে এনে আয়মান আর নিধিকে ডাকল। ওরা আসতেই বের হলো বাড়ি থেকে।
কায়নাত পেছনের সিটে বসে মুখ কালো করে বলল,
“আমি আগেই নিশা আপুকে বলেছিলাম স্বার্থ ভাইয়াকে সব আগে থেকেই জানাতে, কিন্তু আপনাদের সব ভাই-বোনের মনের মধ্যে এত ভয় যে সামান্য সাহস সঞ্চয় করতে পারেন না। প্রেম, আপনার কী উচিত ছিল না ওকে একবার বোঝানোর?”
প্রেম বলল,
“এখানে আমি কী বলব? বলার কিছু আছে? “
“থাকবে না কেন? এখন যে ঝামেলাটা হলো এটা ঠিক হবে কী করে? আদাল আর নিশা আপুকে একসাথে ভুলেও কল্পনা করা যায়? বাবার হয়েছে কী আমি সেটাই বুঝতে পারছি না। আর আপনার বড় ভাইও আছে, আল্লাহর বান্দা মুখ ফুটে একটা কথা অব্দি বলে না।”
বাকি রাস্তা কায়নাত একা একাই বকবক করতে করতে গেল।
অর্ণর অফিস রুমে ওর পিএ এসে তিন কাপ কফি দিয়ে গেল। শেহের কাল রাতে সব ঘটনা শুনে অর্ণর সাথে কথা বলেছিল। অর্ণ বলেছে স্বার্থকে নিয়ে আসতে। স্বার্থ এসেছে বন্ধুর ডাকে তবে ওর হাসি-খুশি মুখটা আজ অন্যরকম। কিছুটা শক্ত, ভারী। অর্ণ কফির কাপ হাতে নিয়ে আড়চোখে ওকে দেখল।
“কাল না বলেই চলে এসেছিস কেন?”
স্বার্থ স্বাভাবিক গলায় বলে,
“ইচ্ছে করছিল না থাকতে।”
“এমন নয় যে আমি কিছু জানি না।”
“জানিসই যখন তখন বাজে বকে যাচ্ছিস কেন?”
শেহের বলল,
“নি…”
ওকে থামিয়ে দিয়ে স্বার্থ কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলে,
“মা আমার জন্য মেয়ে দেখছে আরও কয়েক বছর আগে থেকে। অনেক হয়েছে, আমি রাজী হয়েছি। আজ বিকেলে মেয়ে দেখতে যাব। বিয়ের ডেট ঠিক হলে দাওয়াতও পেয়ে যাবি।”
শেহের বাকরুদ্ধ হয়ে তাকাল ওর দিকে। যে ছেলে নিশা বলতে পাগল সেই ছেলে অন্য কাউকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছে? এটাও সম্ভব?
অর্ণ তৎক্ষণাৎ কিছু বলল না। কিছু সময় অতিবাহিত হওয়ার পর বলল,
“সিউর তুই?”
“না হওয়ার কারণই নেই। তোদের তো অন্তত ভালো বন্ধু মনে করতাম আমি। বন্ধুত্বেরও যে এত বেঈমান লুকিয়ে থাকবে তা তো আমার জানা ছিল না। তোদের কাছে আমি এতটাই গুরুত্বহীন?”
“লিসেন, আমার কথা শোন!”
স্বার্থ উঠে দাঁড়াল চেয়ার ছেড়ে। অর্ণ কপাল কুঁচকে ফেলল। স্বার্থ ফোন পকেটে ঢুকিয়ে অফিস রুমের বাইরে যেতে যেতে বলল,
“আর কিছু শুনতে চাই না আমি। এখন যা হবে হোক।”
স্বার্থ বেরিয়ে গেল। অর্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলল। শেহেরকে বলল,
“বাবা বিয়ের কথা তুলেছে বলে আমি জোর করে আদালের সঙ্গে ওর বিয়ে দিতাম? আমি তো একবার বারণ-ই করেছি এসব নিয়ে কথা না বাড়াতে। পরে যদি এসব একদম সিরিয়াস পর্যায় যেত তখন আমি কিছু করতে পারতাম। শুধু মাত্র সামান্য কথায় তো বাবাকে আমি কিছু বলতে পারি না।”
“ভুল তোরও আছে। তোর মনে হচ্ছে না বাবা মেয়ের লোভে কী করছেন না করছেন নিজেও বুঝতে পারছেন না?”
“বাবাকে আমি বোঝাতে পারতাম। তা-ছাড়া নিশার বিয়ে নিয়ে সবার এখন এত মাথা ব্যথা কেন হচ্ছে? বিয়ের কথা হয়েছে, হয়ে তো যায়নি। আমি সব ধ্বংস করে হলেও ওকে স্বার্থর হাতে তুলে দিতাম। এতটা অবিশ্বাস কবে থেকে হলো ওদের?”
“হওয়াটা স্বাভাবিক। বাবা প্রত্যেক মুহূর্তে নিশাকে নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করেন। আমাদেরই কারোর উচিত ছিল আগেই ওকে সব জানানোর।”
অর্ণ চাপা শ্বাস ফেলে কফির কাপ ঠেলে সরিয়ে দিল। ছোট বোনটা কষ্ট পাচ্ছে ভীষণ। ওর কষ্ট সহ্য করবে কী করে অর্ণ? এর বিহিত হওয়া দরকার এখন। নাহলে দুটো মানুষের জীবন নষ্ট হবে।
••
সন্ধ্যা সন্ধ্যা সময়। বাড়িতে নুসরাত এসেছে ছেলেকে নিয়ে। শেহের কল করে জানিয়েছিল আজ রাতে ডিনার তারা চৌধুরী বাড়িতে করবে। আদি এসেই ছুটে গেছে নিশার ঘরে। সেখানে কায়নাত আছে আর কায়নাতের পেটে তার বউ।
কায়নাত নিশার বিছানায় ওর পাশেই হ্যালান দিয়ে বসেছিল। নিশা চুপচাপ শুয়ে আছে। থমথমে শুষ্ক মুখ বেচারির। সারাটা দিন খুব কেঁদেছে। খবর পেয়েছে আজ স্বার্থ মেয়ে দেখতে গেছে। লোকটা অন্য কাউকে বিয়ে করে ফেলবে তাহলে? তাদের এত দিনের ভালোবাসা কিছুই না? নিশা নাহয় একটা ভুল করে ফেলেছে তাই বলে বিচ্ছেদ? যদি বিচ্ছেদই ভাগ্যে ছিল তবে মিলন কেন হয়েছিল? কেন বসন্তের প্রণয় জাগ্রত হয়েছিল হৃদয়ে? আর কেনোই বা সেই বসন্ত ঝড়ের কবলে পড়ে এভাবে সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে?
আদি দরজার সামনে এসে কায়নাতকে দেখে দৌড়ে এলো। বিছানায় উঠে একদম ওর পেটের কাছে গিয়ে বসল। কায়নাত আদিকে এই সময়ে এখানে দেখে অবাক গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তুমি এখন এই বাড়িতে কী করে এলে? মা এসেছে?”
আদি ঘনঘন মাথা নেড়ে বলে,
“বাবাও আসবে একটু পর।”
“তুমি মামিকে ভুলে গেছ? আসো না কেন এখানে?”
“স্কুলে না গেলে বাবা বকে। কিন্তু তুমি আমার বউকে এখনো বের করছ না কেন? ওর কষ্ট হয় না এইটুকু পেটের মধ্যে থাকতে?”
কায়নাত আদির নাক টেনে দিয়ে বলল,
“এখানে তোমার বউ আছে কিনা ভাই কী করে জানলে? যদি বউ না হয়ে ভাই হয় তাহলে?”
আদি মুখ কালো করল এবার। নাকটা ছিঁটকে বলল,
“ওকে বেচে দিয়ে বউ কিনে আনব। এসব নোংরা কথা বলে আমার মেজাজটাই খারাপ করে দিলে।”
কায়নাত খিলখিল করে হেসে উঠল। আদি চোখ ঘুরিয়ে খালামনির মলিন মুখ দেখে নিজেই ঠোঁটে চুমু খেল ওর। ছোট ছোট হাত খালামনির মলিন মুখে হাত বুলাল। ও বলল,
“তোমার পেটেও বাবু আছে নাকি খালামনি? তোমার বাবু হলে আমার বোন বানাব।”
কায়নাত ওর মাথায় হালকা চাপড় মেরে বলল,
“খালামনির বিয়ে হয়েছে? বাবু আসবে কোত্থেকে?”
“তোমার এলো কোত্থেকে?”
“তোমার মামুকে জিজ্ঞেস কোরো।”
আদি জিভ ভেঙ্গাল। কায়নাত দেয়ালে সময় ঘড়ির দিকে একবার তাকাল। আজ অর্ণর তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার কথা। না জানি আজ কী হবে বাড়িতে!
#চলবে…?
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE