#নুসাইবা_ইভানা
#পর্ব -৫৩
আজ কতগুলো মাস কেটে গেছে জারিফকে ছাড়া৷ মেহনুর পরের মাসেই জারিফকে নিয়ে লণ্ডন শিফট হয়ে গেছে। সবার জীবন এখন স্বাভাবিকভাবে চলছে। ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনস ছেড়ে জিয়ান এখন ঢাকা টু চট্টগ্রাম রুটের পাইলট। প্রেগন্যান্সির পুরোটা সময় নয়নার সাথে থাকার জন্যই নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করেছে জিয়ান। চৌধুরী বাড়ির সবাই জারিফকে মিস করে। যদিও দিনে দুই-তিনবার ভিডিও কলে কথা হয়, তবুও ছুঁয়ে দেখা তো হয় না। কিন্তু মেহনুর এখন ভালো আছে, এতেই সবাই খুশি।
মেহনুর অফিস শেষ করে বাসায় ঢুকতেই জারিফ “মাম্মি” বলে জড়িয়ে ধরলো মেহনুরকে৷
মেহনুর আদুরে কণ্ঠে সুধালো, “আজ আবার কিসের বায়না?”
জারিফ হেসে ফেললো। ছোট জারিফের মনে হয় তার মাম্মি একজন ম্যাজেশিয়ান৷ সে না বলতেও কেমন করে যেন সব বুঝে যায়! এই যে সে বায়না করতে এসেছে, সেটাও বুঝে গেল৷
জারিফ তার মাম্মিকে জড়িয়ে ধরে বলল, “দাদু বাসায় যাবো। কতদিন পাপাকে দেখি না, আম্মুকেও দেখি না৷ নিয়ে চলো না মাম্মি।”
মেহনুরের রাগ হচ্ছে। এতবার করে বোঝানোর পরেও জারিফ জিয়ানকে “পাপা” ডাকে আর সুনয়নাকে “আম্মু” ডাকে৷ মেহনুর নিজের রাগ সংযত করে জারিফের কপালে চুমু দিয়ে বলে, “সামনে তো তোমার এক্সাম৷ এক্সাম শেষ হলে তারপর ভেবে দেখবো। হোমওয়ার্ক শেষ?”
জারিফ মন খারাপ করে হাতের মধ্যে হাত রেখে গুটিগুটি পায়ে নিজের রুমের দিকে চলে গেল৷
মেহনুর জারিফের দিকে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস নিল। মনে মনে আওড়ালো, “আমি তোকে কোনো অধিকারহীন সম্পর্কে জড়াতে দেবো না৷ তোর বাবা নেই, একদিন তুই নিজেই বুঝবি। এই পৃথিবীতে তোর উপর শুধু আমার অধিকার, আর কারো না৷ আমি কোনোদিন বাংলাদেশে ফিরবো না। এই ইট-পাথরের শহরে অপরিচিত মানুষের ভিড়ে আমাদের মা-ছেলের সুখের সংসার হবে৷”
জিয়ান ঘুমাচ্ছে৷ রাত তখন দেড়টা। নয়না ব্যথায় ছটফট করছে, চিৎকার করছে। জিয়ানের ঘুম ভেঙে গেল। সে দ্রুত মিতা বেগমকে ডেকে আনল। বারবার নয়নার মাথায় হাত বোলাচ্ছে; চোখ দুটো ছলছল করছে জিয়ানের৷
মিতা বেগম বললেন, “দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে খবর দাও। ব্লাড যাচ্ছে, এক্ষুনি হসপিটালে নিতে হবে৷”
জিয়ান কালবিলম্ব না করে নয়নাকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে দ্রুত গাড়িতে নিয়ে এল এবং নিজেই ড্রাইভ করে হসপিটালে নিয়ে আসল।
তাড়াহুড়ো করে হসপিটালে নিয়ে আসা হয়েছে নয়নাকে৷ সাথে সাথে অনিকেত, মাহবুব তালুকদার, নীলাঞ্জনা, জাহানারা বেগম, ঈশান—সবাই এসে হাজির হয়েছে। দেড় ঘণ্টা পর একজন নার্স এসে জিয়ানের কোলে একটা ফুটফুটে বেবি দিয়ে বলল, “আলহামদুলিল্লাহ, আপনার ছেলে হয়েছে, এই নিন।”
জিয়ান একবারের জন্যও তার দিকে তাকাচ্ছে না৷ সে দ্রুত বেবিটাকে সায়নার কোলে দিয়ে ডাক্তারকে বলল, “আমার বউ কই? আগে আমার বউকে বুঝিয়ে দিন।”
“আপনার স্ত্রীর এখনো জ্ঞান ফেরেনি৷ এত ডেস্পারেট হবেন না মিস্টার চৌধুরী।”
“জ্ঞান ফেরেনি মানে! এখনো কেন জ্ঞান ফিরবে না?”
দুই মিনিট পর আর একটা বেবি এনে জিয়ানের কোলে দিয়ে নার্স বলে, “আপনার জমজ বেবি হয়েছে, আলহামদুলিল্লাহ।”
জিয়ান নার্সের কোলে বেবি ফেরত দিয়ে বলে, “আমার বউয়ের হুঁশ নেই আর আপনারা আমাকে বেবি ধরিয়ে দিচ্ছেন? আগে আমার বউয়ের সাথে কথা বলিয়ে দিন, তারপর বাকি সব৷ সুনয়না কোথায়? আমাকে সুনয়নার কাছে নিয়ে চলুন।”
“একটু সময় লাগবে মিস্টার চৌধুরী। আপনার ওয়াইফের অবস্থা বেশি ভালো না, ওনাকে ইমার্জেন্সি কেবিনে শিফট করা হয়েছে। প্রচুর ব্লাড যাচ্ছে, আপনি একটু ধৈর্য ধরুন। আল্লাহ তায়ালা চাইলে আপনার স্ত্রীর কিচ্ছু হবে না৷”
জিয়ান চিৎকার করে বলল, “আপনারা আমার সুস্থ স্ত্রীকে ভর্তি করালেন, এখন বলছেন তার অবস্থা ভালো না! আপনাকে শুরু থেকেই আমি পার্সোনালভাবে বলেছিলাম আমার ওয়াইফের লাইফ রিস্ক নেই তো? তখন তো বলেছিলেন সব ঠিক আছে, তাহলে এখন কেন বলছেন অবস্থা ভালো না?”
“প্লিজ, এখানে চেঁচামেচি করবেন না। এটা হসপিটাল।”
“আমার ওয়াইফের কিছু হলে আপনাদের হসপিটালে আমি আগুন লাগিয়ে দেবো৷ আমি আমার সুস্থ স্ত্রীকে চাই। শুনতে চাই না আমার স্ত্রীর অবস্থা ভালো না।”
“প্লিজ, এভাবে সিন ক্রিয়েট করবেন না। আপনি যদি আপনার স্ত্রীর ভালো চান তাহলে ধৈর্য ধরুন, আমাদেরকে চেষ্টা করতে দিন। আমরা ডাক্তার, খুনি না।”
নাজিম চৌধুরী এসে জিয়ানের হাত ধরে বলেন, “কী হচ্ছে এসব? তুমি মাথা ঠাণ্ডা করো৷ অনিকেত ব্লাড ডোনেট করছে, সুস্থ হয়ে যাবে নয়না৷ সিজার করলে দুই থেকে চার ঘণ্টা জ্ঞান থাকে না, এটা স্বাভাবিক। এত অস্থির হলে চলে? এখানে আমাদের নিজস্ব ডাক্তার আছে, ঈশান আছে, অনিকেত আছে। স্থির হও। তুমি কি জানো তোমার কী সন্তান হয়েছে?”
“আমি এসব জানতে চাই না৷ আমি জানতে চাই আমার স্ত্রী সুস্থ আছে। আগে আমার ওয়াইফ, তারপর সন্তান। আমার সুনয়নার জীবনের বিনিময়ে আমি সন্তান চাই না।”
নাজিম চৌধুরী জিয়ানের হাত ধরে বলেন, “ধৈর্য রাখো, আমাদের সুনয়নার কিছু হবে না৷”
হসপিটালের অনেকেই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জিয়ানের দিকে৷ যেখানে বেবি ডেলিভারি হওয়ার পর সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে বাচ্চা নিয়ে, সেখানে একজন স্বামী তার স্ত্রীর জীবনের জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছে! এরকম পুরুষকেই হয়তো সুপুরুষ বলে। কত ভাগ্য করে এমন স্বামীর স্ত্রী হওয়া যায়।
এক মাঝবয়সী মহিলা উঠে এসে জিয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে ইশারা করলেন জিয়ানের মাথাটা নিচু করতে৷ জিয়ানের মেজাজ এখন ভালো না, তবুও সে মাথা নিচু করল।
মহিলাটি জিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “আল্লাহ তায়ালা তোমার বউকে সুস্থ করে তোমার কাছে ফিরিয়ে দিক৷ তোমার মা ধন্য যে তোমার মতো একজন ছেলেকে জন্ম দিয়েছে। দোয়া করি পরিবার নিয়ে ভালো থাকো।”
পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলেন, “এই যে দেখো, আমার মেয়েটাকে সিজারে ঢোকানো হবে আর দশ মিনিট পর। অথচ ওর শ্বশুরবাড়ির কেউ আসেনি, আর না এসেছে ওর স্বামী। বাচ্চাটা কি আমার মেয়ের একার? এই সব পুরুষ মানুষ কেন বাচ্চা জন্ম দেয় কে জানে! ডেলিভারির পর এসেও ছেলের বদলে মেয়ে দেখলে চোখ কপালে তুলে রাখবে। যাক বাবা, দোয়া করি সব মেয়ে যেন তোমার মতো আদর্শ স্বামী পায়৷” কথাগুলো বলতে বলতে চোখের কোণে জমে থাকা জলটুকু মুছে নিলেন মহিলা৷
জিয়ান দ্রুত ইমার্জেন্সি রুমের সামনে চলে গেল। এখন যেন সুনয়না ছাড়া আর কোনো কিছুই ইম্পর্ট্যান্ট না।
অনিকেত রুম থেকে বের হয়ে বলল, “সুনয়না এখন বিপদযুক্ত। এত টেনশনের কিছু হয়নি। চল, আমাকে একটু পানি খাওয়া।”
জিয়ান অনিকেতকে জড়িয়ে ধরে বলল, “সত্যি বলছিস! তোর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ থাকবো অনি।”
“দুলাভাই, এত কৃতজ্ঞতা লাগবে না। ওটা আমার বোন, আমি আমার শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও চেষ্টা করতাম আমার বোনকে বাঁচাতে৷ সো দুলাভাই, এখন জড়িয়ে না ধরে মিষ্টি এনে আমাদের মিষ্টিমুখ করান। আহা, আমি মামা হয়ে গেছি! দুলাভাই, কিপ্টেমি ছাড়ুন, মিষ্টি কিনে আনুন।”
“শালা লোভী! কই আমাকে মিষ্টি খাওয়াবি, উল্টো আমার কাছ থেকে মিষ্টি খেতে চাস?”
নাহিদ এসে বলল, “দুলাভাই, সব যখন আপনি করেছেন, মিষ্টিও আপনি খাওয়াবেন৷”
“বন্ধু থেকে সোজা দুলাভাই? তোরা এত মাসুদ হলি কবে?”
“শালা, তুই তো আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাসুদ। ‘এই বিয়ে মানি না’ বলতে বলতে আজকে বাবা হয়ে গেলি!”
“শোন, সব সময় দেখিস না রেজাল্ট যে ভালো করে সে মিষ্টি খাওয়ায়। সো এবার মিষ্টি চাই দুলাভাই।”
“ছিঃ বন্ধু ছিঃ! সামান্য মিষ্টির জন্য তোরা আমাকে সোজা দুলাভাই বানিয়ে দিলি!”
নাহিদ আর অনিকেত দুই পাশ থেকে জিয়ানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “বানিয়ে দিচ্ছি আবার কী! তুই তো অলরেডি আমাদের দুলাভাই।”
অনিকেত জিয়ানের মন ভালো করার চেষ্টা করছে। জিয়ান অনিকেতের কথায় ভরসা পেয়ে কিছুটা স্বস্তি ফিরে পেয়েছে৷
ওই দিকে নয়নার অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে অনিকেত বলল, “তোরা থাক, আমি একটু আসি৷ দেখি কী হচ্ছে ভেতরে৷”
জিয়ান বলল, “ঠিক আছে যা। আমার বউয়ের খেয়াল রাখিস।”
“শালা, তোর বউ ওর নিজের বোন। তোর চেয়ে ওর দরদ বেশি হবে, কম না।” নাহিদের কথা শুনে জিয়ান বলল, “আমার বউকে আমি ভালোবাসি৷”
“হ্যাঁ, দ্যা গ্রেট পাইলট জিয়ান রেজা চৌধুরীই শুধু তার বউকে ভালোবাসে, আর কেউ তো আর বউকে ভালোবাসে না! এখানে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবেন মিস্টার মজনু? আসুন, একটু চেয়ারে গিয়ে বসি।”
#চলবে
Share On:
TAGS: অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২, নুসাইবা ইভানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ৪
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪০
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৭
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৫
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১২
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৩৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২পর্ব ১১
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪৮
-
অর্ধাঙ্গিনী সিজন ২ পর্ব ৪২