#পর্ব_৬৬
#নিলুফা_নাজমিন_নীলা
★★★
সময় তার নিজস্ব গতিতে বহমান। প্রকৃতির নিয়ম মেনে একটার পর একটা ঋতু পেরিয়ে ক্যালেন্ডারের পাতায় এখন বসন্তকাল। জানালার বাইরে নতুন পাখির কলকাকলি আর গাছে গাছে ফুটে থাকা নতুন ফুলের মায়াবী সুবাস বসন্তের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। চারপাশ জুড়ে ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়া, আর তারই মাঝে দূর মসজিদ থেকে ভেসে আসছে সকালের মধুর সুরের আজানের প্রতিধ্বনি।
বিছানায় শুয়ে থাকা তিন বছরের মিষ্টি রাজকন্যাটি চোখ পিটপিট করে উঠে বসল। ছোট ছোট নরম আঙুলগুলো চোখে বুলিয়ে নিয়ে সে ভালো করে তাকাল তার পাশে শুয়ে থাকা বাবা-মায়ের দিকে। তার তীক্ষ্ণ ডাগর চোখ দুটো খুব মনোযোগ দিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করল। দেখল তার পাপা তার আম্মুকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে, আর সে পড়ে আছে বিছানার এক কোণে! এই দৃশ্য দেখে তিন বছরের ছোট্ট মেয়েটি নিজেই নিজেকে ফিসফিস করে প্রশ্ন করল,
“রোদ্দুর, তুনি কি জেলাস?”
তার ছোট্ট অপরিপক্ক মস্তিষ্ক সায় দিল হ্যাঁ, সে আসলেই ভীষণ জেলাস! নিজের অধিকার ফিরে পেতে মেয়েটি এবার তার স্বভাবসুলভ মিষ্টি কণ্ঠে ডেকে উঠল, “পাপা… আম্মু!”
মেয়ের সেই চেনা ডাক কানে যেতেই তৃণা এবং আরিয়ান দুজনেই ধড়ফড়িয়ে চোখ মেলল। বিছানায় উঠে বসে তারা দেখল, রোদসী তার ফর্সা গোলগাল মুখে চোখ দুটো বড় বড় করে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। তৃণা জলদি শোয়া থেকে উঠে মেয়ের পাশে বসল। রোদসীর তুলতুলে গালে হাত রেখে নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
“মামণি, কী হয়েছে? এখনই উঠে বসলে কেন? ওয়াশরুম যাবে সোনা?”
রোদসী কোনো উত্তর দিল না। সে দুই গালে বাতাস জমিয়ে মুখ ফুলিয়ে অভিমানী মূর্তিতে বসে রইল। আরিয়ান এবার মুচকি হেসে মেয়েকে টেনে একদম নিজের বুকের ওপর নিয়ে এল। মেয়ের কপালে আর তুলতুলে গালে কয়েকটা আদরমাখা চুমু খেয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে আমার রোদ্দুর সোনার? বাইরে তো এখনো ঠিকমতো সকালই হয়নি, পাখিগুলোও ডাকতে শুরু করেনি। তাহলে রোদ্দুর কেন এত ভোরে উঠল?”
রোদসী পাপার বুক থেকে মাথা তুলে মুখটা আরও বেশি ফুলিয়ে আধো-আধো স্বরে বলল,
“তোনরা আমার সাথে তথা বলবে না। রোদ্দুর তোনাল সাথে নাগ করেছে!”
মেয়ের মুখের এই মিষ্টি অভিমানী কথা শুনে আরিয়ান আর তৃণা দুজনেই ভেতরে ভেতরে হাসল। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে আরিয়ান নিজের মুখটা একদম গম্ভীর করে ফেলল। মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সে কী! আমার রোদ্দুর সোনা রাগ করেছে? উঁহু, এটা তো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। পাপা জানতে পারে কেন রোদ্দুর রাগ করেছে?”
রোদসীএবার আরিয়ানের শার্টের কলারটা ছোট ছোট হাত দিয়ে চেপে ধরে নালিশের সুরে বলল,
“রোদ্দুর তো প্রতিদিন পাপা আর আম্মুর মাতখানে ঘুমাই। তাহলে তকালে উঠে কেন দেখি আনি একপাশে পড়ে আছি? আর তোনরা দুজনে জড়ি-ধরে ঘুমোচ্ছ! তোনরা আমাকে একদন ভালুবাসু না!”
মেয়ের মুখে এমন পাকা পাকা কথা শুনে তৃণা লজ্জায় আর বিস্ময়ে নিজের জিহ্বায় কামড় দিয়ে বসল। আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে সে একপ্রকার চোখ বড় বড় করে ইশারা করল, দেখেছেন, আপনার মেয়ের কাণ্ড! অন্যদিকে আরিয়ান মেয়ের এই অকাট্য যুক্তির সামনে কী উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে বোকার মতো হাসতে লাগল।
আরিয়ান আর তৃণার চোখাচোখি হতেই দুজনেই মুচকি হাসল, তৃণার চোখে-মুখে তখন শরতের আকাশের মতো এক চিলতে মিষ্টি হাসির রেখা। আরিয়ান রোদসীকে বুকের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে নিয়ে একদম গম্ভীর, বোঝানোর সুরে বলল,
“তুমি তো জানো রোদ্দুর সোনা, তোমার আম্মুটা বড্ড অবুঝ একটা বাচ্চা! তাকে এভাবে বুকে জড়িয়ে ধরে ঘুম পারিয়ে না দিলে ও একদম ঘুমাতেই পারে না। তুমি তো লক্ষ্মী মেয়ে, গুড গার্ল, তুমি সব বোঝো। তাই তোমার মাম্মাকে ঘুম পাড়ানোর জন্য পাপাকে এই কষ্টটুকু করতে হয়। আর তা ছাড়া শ্যামলিনী নামক পৃথিবীকে বুকে না নিয়ে যে তোমার পাপাও ঘুমাতে পারে না। ”
স্বামীর মুখে নিজের নামে এমন অপবাদ শুনে তৃণা চোখ দুটো ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল আরিয়ানের দিকে। কৃত্রিম রাগে ফুঁসে উঠে বলল,
“বাহ্! এখন সব দোষ বুঝি আমার? আমি ঘুমাতে পারি না?”
আরিয়ান মুচকি হাসল। রোদ্দুরের মুখটা নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে মেয়ের দৃষ্টি আড়াল করল, আর সেই সুযোগে বিদ্যুৎবেগে এগিয়ে গিয়ে তৃণার দুই গালে দুটো গভীর চুমু খেয়ে আবার আগের জায়গায় ফিরে গেল। তৃণা অপ্রস্তুত হয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। এদিকে রোদসী পাপার বুক থেকে মাথা তুলে বড় বড় চোখ করে বলে উঠল,
“তাহলে আম্মুর জন্য তুমি তকোলেট (চকলেট) আনো না কেন পাপা?”
আরিয়ান মেয়ের গাল টিপে বলল, “আনি তো সোনা!”
“কখন আনো? আমি তো দেখিনামতো (দেখি না তো)!”
“এই যে, বুকের মাঝে করে লুকিয়ে আনি,” আরিয়ান নিজের বুকের বাম পাশে হাত দিয়ে দেখাল।
বাবার এমন কথা শুনে তিন বছরের রোদসীর ছোট মাথায় আর কিছুুুু ঢুকল না। সে বিছানা থেকে ধুপধাপ করে নেমে দাঁড়িয়ে বলল,
“ধুর! যাই, গিয়ে দেখি আদ্দা (দাদা) কী করে।” বলেই পিচ্চি মেয়েটা ছোট ছোট পায়ে খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে দৌড়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
তৃণা পেছন থেকে গলা উঁচিয়ে ডেকে বলল,
“আস্তে যাও রোদ্দুর, সাবধানে! পড়ে যাবে তো!”
দেখতে দেখতে মেয়েটার বয়স তিন বছর হয়ে গেল। দিন দিন একদম পাকা বুড়ি হচ্ছে সে। সারাক্ষণ আধো-আধো বুলি আর চঞ্চলতায় পুরো বাড়ি একাই মাথায় করে রাখে। ফর্সা, গোলগাল চেহারার এই মেয়েটাই এখন মির্জা বাড়ির প্রাণভ্রমরা।
রোদসী চলে যেতেই আরিয়ান এক ঝটকায় তৃণাকে টেনে নিজের বুকের ওপর নিয়ে এল। গভীর অনুরাগে বলল,
“এবার তো একটু স্বামীর দিকে তাকাও, শ্যামলিনী।”
তৃণা আরিয়ানের বুকের ওপর দুই হাত রেখে চোখ তুলে তাকাল। বলল, “সারারাত তো আপনার বুকেই বন্দি ছিলাম রাগি সাহেব। এখন সকালে উঠেও আরও চাচ্ছেন?”
“তোমার সান্নিধ্য যত পাই, তৃষ্ণা যেন তত বাড়ে। মন তো ভরে না,” আরিয়ানের কণ্ঠস্বর মায়াবী শোনাল।
“হয়েছে, ঢং ছাড়ুন তো এবার। অনেক কাজ আছে,” বলেই তৃণা আরিয়ানকে আলতো ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে নামতে গেল। কিন্তু নামতে গিয়েই সে থমকে দাঁড়াল। দেখল, আরিয়ান ঠিক রোদসীর মতোই দুই মুখ ফুলিয়ে বসে আছে! তৃণা কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হেসে ফেলল,
“উফ! আপনাদের বাপ-মেয়ের জ্বালায় এ বাড়িতে আর বাঁচা গেল না। কিছুক্ষণ আগে মেয়ে মুখ ফুলিয়ে রইল, আর এখন তার বাবা শুরু করল!”
মুখ ফিরিয়ে চলে যেতে নিয়েও তৃণা পারল না। সে আবার বিছানায় হাঁটু গেঁড়ে বসে আরিয়ানের খুব কাছে এগিয়ে গেল। তারপর তার সেই অভিমানী গালে আলতো করে একটা চুমু খেল। কিন্তু তৃণা যখনই নিজেকে সরিয়ে নিতে গেল, আরিয়ান ঠিক তখনই চিতা বাঘের মতো এক টানে তৃণাকে বিছানায় ফেলে দিল। তৃণার দুপাশে নিজের দুই হাতের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে আরিয়ান তার চোখের দিকে তাকাল। আরিয়ান বলল,
“মাত্র একটা?”
“তো কয়টা চাই আপনার, শুনি?” তৃণা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“হাজারটা!”
“পাগল হয়েছেন?”
“হ্যাঁ, তোমার ভালোবাসায় বহু আগেই পাগল হয়েছি,”
আরিয়ান একচুলও সরল না। তৃণা আরিয়ানের গলার শার্টের কলারটা চেপে ধরে বলল,
“আপনি দিন দিন এত চুমুখোর কেন হচ্ছেন বলুন তো?”
আরিয়ান তৃণার নাকের ডগায় নিজের নাক ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আর তুমি দিন দিন এত সুন্দরী কেন হচ্ছ, তার জবাব দাও?”
তৃণা হেসে ফেলে বলল, “আমি সুন্দর? নাকি সকাল সকাল বানিয়ে বানিয়ে অপমান করছেন?”
“অপমান নয় শ্যামলিনী, আমার চোখের দেখা সবচেয়ে সুন্দরী নারী এখন আমার ঠিক সামনে শুয়ে আছে।”
তৃণা মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “থাক, আর পটাতে হবে না। এসব ভারী ভারী সংলাপ নাটক-সিনেমায় ভালো মানায়, বাস্তবে নয়।”
তৃণাকে কথা শেষ করার বাকি সুযোগটুকু আরিয়ান দিল না। তার আগেই সে ঝুঁকে পড়ে তৃণার ওষ্ঠাধরে নিজের গভীর ভালোবাসার সিলমোহর এঁকে দিল। তৃণা আলতো করে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। বাইরের সকালের মিষ্টি আলো তখন জানালা গলে তাদের ওপর এসে পড়েছে।
কিছুক্ষণ পর তৃণা আরিয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ছাড়ুন এবার, রোদ্দুর যেকোনো সময় চলে আসবে। ও দেখলে আর রক্ষা নেই!”
তৃণার তাড়ানি খেয়ে আরিয়ান এবার হেসে উঠে বসল। তৃণা দ্রুত চুলগুলো ঠিক করতে করতে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
★★★
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সেই কখন থেকে নিজের কামিজের পেছনের ফিতেটা লাগানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে নৌশি। কিন্তু হাতটা ঠিকঠাক নাগাল না পাওয়ায় কিছুতেই ফিতে দুটো একসাথে করা যাচ্ছে না। বারবার ফসকে যাওয়ায় নৌশি এবার চরম বিরক্ত। রাগে, ক্ষোভে ইচ্ছে করছে জামাটাই ছিঁড়ে ফেলতে।
ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরে প্রবেশ করল আদনান। আয়নায় নৌশিকে ফিতের সাথে এমন যুদ্ধ করতে দেখে তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। সে কোনো শব্দ না করে পা টিপে টিপে নৌশির ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। ধীরহাতে ফিতেটা টেনে নিয়ে লাগাতে যেতেই নৌশি এক ঝটকায় দ্রুত পায়ে দু-কদম সরে গেল।
আদনান ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই নৌশি একদম রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করে বলল,
“একটা মেয়ের রুমে ঢোকার আগে যে অনুমতি নিতে হয়, সেই নূন্যতম ভদ্রতাটুকুও কি তোর নেই?”
নৌশির কথা শুনে আদনানের মুখ হা হয়ে গেল! সে বিস্ময়ে নিজের কপালে হাত দিয়ে বলল,
“তোর মাথা ঠিক আছে তো নৌশি? নাকি সকাল সকাল কোনো নাদানের পাল্লায় পড়ে মাথাটা পুরোপুরি বিগড়ে এসেছে? আমি তোর জামাই লাগি, জামাই!নিজের স্ত্রীর ঘরে আসতেও এখন আমাকে ভিসা-পাসপোর্টের মতো অনুমতি নিতে হবে নাকি?”
নৌশি এবার নিজের জিহ্বায় কামড় দিল। আসলে পেছনের ওই অবাধ্য ফিতেটা নিয়ে এতক্ষণ কুস্তি লড়তে লড়তে মেজাজটা এমন চড়ে ছিল যে, সে ভুলেই গিয়েছিল আদনান এখন আর শুধু তার চিরচেনা ক্ষ্যাপানোর পাত্র নয়, বরং তার স্বামী। নৌশি নিজের ভুল বুঝতে পেরে একটু লজ্জা পেল। তবে সেটা আড়াল করে সে চটপট আদনানের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে দাঁড়াল। কাঁধের ওপর ছড়িয়ে থাকা অবাধ্য চুলগুলো একহাতে সামনে সরিয়ে দিয়ে করুণ সুরে বলল,
“আচ্ছা ভাই ভুল হয়ে গেছে, মাফ চাইছি। এবার একটু ফিতেটা লাগিয়ে আমাকে এই চরম উদ্ধার কর তো ভাই!”
নৌশির মুখে ভাই সম্বোধন শুনে আদনান এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আকাশের দিকে তাকালো। তারপর ব্যঙ্গাত্মক সুরে বলল,
“বাহ্! হাউ সুইট! আপন জামাইকে এই সাতসকালে ‘ভাই’ বলে ডাকছিস! তোর এই মধুর ডাক শুনে তো আমার কলিজাটা একদম জুড়িয়ে গেল।”
নৌশি আয়নার ভেতর দিয়ে আদনানের দিকে তাকিয়ে চোখ টিপে হাসল। বলল,
“আরে বোকা, জামাইকে ভাই ডাকার মাঝেও অন্যরকম এক মোহাব্বত লুকিয়ে আছে, তুই বুঝবি না।”
“কী আর বলব, সবই আমার কপাল!” আদনান মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
সে আর কথা না বাড়িয়ে অত্যন্ত ধীর ও যত্নশীল হাতে নৌশির পিঠের অবাধ্য ফিতে দুটোকে একসাথে এনে সুন্দর করে বেঁধে দিল। ফিতে বাঁধার বাহানায় আদনানের হাতের আঙুলগুলো যখন নৌশির পিঠের চামড়া ছুঁয়ে গেল, নৌশি আলতো করে চোখ বন্ধ করে এক মৃদু শিহরণ অনুভব করল। এতক্ষণের রাগ আর বিরক্তি যেন এক নিমেষেই মিষ্টি এক ভালোবাসায় রূপ নিল।
নৌশি আয়নায় শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এই আদুর বাচ্চা, চল এবার নিচে চল। নিশ্চয়ই সবাই নাস্তার টেবিলে বসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
আদনান কপালে মৃদু করাঘাত করে অসন্তুষ্ট গলায় বলল, “উফ! সকাল সকাল এই কর্কশ ভাষায় না বলে কথাটা একটু রোমান্টিক ভাবেও তো বলতে পারিস। তোর মুখ থেকে কি মধুর বাণী কোনোদিন বের হবে না?”
নৌশি কোমরে হাত দিয়ে ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
“কী রকম রোমান্টিক শুনি?”
আদনান একটু ভাব নিয়ে নৌশির কাছে এগিয়ে এসে চোখ টিপে বলল,
“এই যেমন ধর- চলো জান, নিচে সবাই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। আহা, শুনতেও কত ভালো লাগে!”
নৌশি চরম বিরক্তিতে নাক কুঁচকে সোজাসুজি বলে দিল,
“তুই গু খা!”
আদনান এবার সত্যি সত্যি দাঁতে দাঁত চেপে রাগ দেখানোর চেষ্টা করল। তর্জনী উঁচিয়ে বলল,
“খবরদার নৌশি! মনে রাখিস আমি তোর স্বামী। একটু সম্মান দিয়ে কথা বলবি। স্বামী হলো শিক্ষকের সমতুল্য।”
নৌশি ঠোঁটের কোণে এক বাঁকা হাসির রেখা ফুটিয়ে তুলে চটজলদি জবাব দিল,
“আর আমাদের পাঠ্যবইয়ে লেখা আছে শিক্ষক হলো পিতার সমতুল্য!”
নৌশির এই মারাত্মক লজিক বুঝতে আদনানের মাথা খাটাতে হলো কয়েক সেকেন্ড। সমীকরণটা মেলাতেই আদনান রাগে ফেটে পড়ল, “এই নাদান! এই তুই কী বোঝাতে চাইলি শুনি?”
নৌশি একটা মুচকি হাসি দিয়ে দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলল,
“তুই মনে মনে যেটা বুঝেছিস, ঠিক সেটাই!”
সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে নিলে আদনান পেছন থেকে কিছুটা গম্ভীর কিন্তু আদুরে গলায় বলল,
“আমাদের সারাজীবন কি এভাবেই ঝগড়াঝাঁটি করেই কেটে যাবে, নাকি কোনোদিন বাচ্ছাকাচ্চা লাগবে আমাদের?”
নৌশি দরজার চৌকাঠে পা দিয়ে থমকে দাঁড়াল। পেছনে ফিরে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“তোকে নিষেধ করেছে কে?”
সুযোগ পেয়ে আদনান দু-কদম সামনে এগিয়ে এল। একটু দুষ্টুমি মাখানো কণ্ঠে বলল,
“নিষেধ তো কেউ করেনি। কিন্তু তোর কাছে একটু ঘেঁষতে গেলেই তো তুই পাগলের মতো হা-হি করিস, তাহলে বাচ্চাটা কি আকাশ থেকে টুপ করে পড়বে?”
আদনানের এমন অকপট আর সোজাসুজি কথায় নৌশি পুরোপুরি থতমত খেয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড ফ্যালফ্যাল করে আদনানের দিকে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তের মধ্যে লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তার ফর্সা মুখটা একদম টকটকে লাল হয়ে উঠল। এই প্রশ্নের আর কোনো উত্তর খুঁজে না পেয়ে সে চটজলদি এক প্রকার দৌড়ে ঘর থেকে পালিয়ে নিচে নেমে গেল। আদনান নৌশির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে নিজের চুলে হাত বোলালো।
★★★
ড্রেসিংটেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শার্টের বোতামগুলো লাগাচ্ছে নির্জন ইমতিয়াজ। নুসরাত আর নির্জন দুজনেই এখন পেশায় সফল চিকিৎসক, কর্মরত আছে একই হাসপাতালে। প্রতিদিনের নিয়ম মেনে তারা একসাথেই হাসপাতালে যায় এবং দিনশেষে একসাথেই ঘরে ফেরে। হাতঘড়ির দিকে তাকিয়ে নির্জন একটু গলা উঁচিয়ে ডাকল,
“চশমাওয়ালি ম্যাডাম! কোথায় আপনি? হাসপাতালে যাবেন না?”
নির্জন হাকডাক শুরু করতেই ওয়াশরুমের দরজা খুলে বাইরে এল নুসরাত। তার দিকে তাকিয়ে নির্জন কিছুটা অনুযোগের সুরে বলল,
“আজ ঠিক সাতটার মধ্যে আমাদের হাসপাতালে উপস্থিত থাকা জরুরি, একটা ইমার্জেন্সি কেস আছে। তুমি এখনো পুরোপুরি রেডি হওনি কেন?”
নুসরাত কোনো কথা বলল না। সে নিজের দুই হাত পেছনের দিকে লুকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। তার এই নীরবতা দেখে নির্জন পুরো ঘুরে দাঁড়াল। নুসরাতের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে পরখ করে নিয়ে কিছুটা উদাসীনতা কাটাতে তার কপালে হাত রাখল। নুসরাতের ঠোঁট দুটো মৃদু কাঁপছে, মুখটা কেমন যেন ফ্যাকাশে।
তা দেখে নির্জন চরম উতলা হয়ে উঠল। সে নুসরাতের হাত ধরে আলতো করে বিছানায় বসিয়ে দিল, তারপর নিজে মেঝেতে হাঁটু গেঁড়ে বসে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী হয়েছে নুসরাত? বলো আমায়?”
নুসরাতের ফর্সা মুখে লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে পেছনের হাত দুটো সামনে নিয়ে এল। তার হাতে থাকা সাদা রঙের কাঠিটার দিকে নজর পড়তেই নির্জন স্তব্ধ হয়ে গেল। ওটা একটা প্রেগন্যান্সি টেস্ট কিট।
নুসরাত কিটটা নির্জনের কম্পিত হাতের ওপর তুলে দিল। নির্জন দেখল, সেখানে স্পষ্ট দুটি লাল দাগ জ্বলজ্বল করছে। নুসরাত চোখ নিচু করে অত্যন্ত ধীর ও আবেগী কণ্ঠে বলল,
“আপনি বাবা হতে চলেছেন, বাদামওয়ালা।”
কথাটা শোনামাত্রই নির্জন আনন্দের আতিশয্যে চিৎকার দিয়ে উঠল। সে আর এক মুহূর্তও ভাবল না; বিছানা থেকে এক টানে নুসরাতকে পাঁজা কোলা করে তুলে নিল। তারপর সারা ঘর জুড়ে ঘূর্ণিপাকের মতো ঘুরতে লাগল। নুসরাত আকস্মিক এই কাণ্ডে ভয় পেয়ে নির্জনের শার্টের কলারটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে হেসে ফেলল,
“আরে করো কী! আস্তে! মাথা ঘুরছে তো, নামাও আমায়!”
নির্জন পরম সতর্কতায় নুসরাতকে বিছানায় নামিয়ে দিল। নিজের দুই হাত নুসরাতের গালে রেখে চোখে জল নিয়ে বলল,
“থ্যাংক ইউ… থ্যাংক ইউ সো মাচ এত সুন্দর একটা খবর দেওয়ার জন্য, ম্যাডাম!”
বলেই নির্জন আর তর সইতে পারল না। সে আলতো করে নুসরাতের পেটে নিজের মাথাটা এলিয়ে দিল, যেন এখনই ভেতরের সেই ছোট্ট অস্তিত্বটার হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে। নুসরাত স্নিগ্ধ হেসে নির্জনের চুলে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বাইরের ভোরের আলো তখন কেবিনের জানালায় এসে পড়েছে, আর ঘরের ভেতরে এক নতুন জীবনের আগমনের বার্তা তাদের চারপাশকে এক পরম সুখে ভরিয়ে তুলেছে।
★★★
বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিস্পন্দ হয়ে শুয়ে আছে রিনি। নিস শহরের উজ্জ্বল আলোও আজ তার ঘরের অন্ধকারকে কাটাতে পারছে না। রিনির সেই চিরচেনা ফর্সা চেহারাটা আজ বড্ড ফ্যাকাশে, নিষ্প্রাণ দেখাচ্ছে। শরীর শুকিয়ে যেন শুধু কঙ্কাল পড়ে আছে। ঠিক সেই মুহূর্তে দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করল তার রুমমেট লুসি।
লুসি কাঁধের ব্যাগটা টেবিলের ওপর রেখে ধীরপায়ে রিনির বিছানার পাশে এসে দাঁড়াল। রিনির এই অবস্থা দেখে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে ফরাসি ভাষায় অত্যন্ত মৃদু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“আজও অফিসে যেতে পারোনি, রিনি?”
রিনি একবার ক্লান্ত চোখ মেলে লুসির দিকে তাকালো, তারপর আবার নিস্তেজ হয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিল। তার এই উদাসীনতা দেখে লুসি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানার পাশে বসল। রিনির কপালে হাত দিয়ে বলল, “শরীর কি খুব বেশি খারাপ লাগছে? যদি বেশি কষ্ট হয় তাহলে চলো আজও একবার ডক্টরের কাছে যাই।”
রিনি চোখ না মেলেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ম্লান, নিস্পৃহ হাসি ফুটিয়ে তুলল। ফিসফিস করে বলল,
“ডক্টরের কাছে গেলে কী হবে লুসি? আমাকে ভালো করতে পারবে?”
লুসি রিনির এই প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পেল না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রিনির এক হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর একটু শক্ত গলায় বলল,
“তোমার দেশ ছেড়ে তুমি এখানে চলে এসেছ আজ তিন বছরেরও বেশি হয়ে গেছে। আমার মনে হয়, এবার তোমার একবার নিজের দেশে ফিরে যাওয়া প্রয়োজন।”
রিনি এবার চোখ মেলল। তার সেই চাউনিতে এক চরম অসহায়ত্ব আর আর্তি লুকিয়ে আছে। দীর্ঘ তিনটে বছর এক ছাদের নিচে থাকতে থাকতে তাদের সম্পর্কটা এখন আর কেবল সাধারণ রুমমেটের মাঝে সীমাবদ্ধ নেই, তারা এখন একে অপরের পিঠাপিঠি বোনের মতো। রিনির জীবনের অতীত ইতিহাস, তার ভেতরের সব অপরাধবোধ সবই এখন লুসির জানা।
রিনি জানালার বাইরের দিকে তাকিয়ে অবরুদ্ধ কণ্ঠে বলল,
“আমাকে পোড়ায় লুসি… দেশের ওই চেনা মাটি, চেনা বাতাস আমাকে দিনরাত পোড়ায়। তুমি তো জানো না লুসি, আমি কতটা পাপিষ্ঠ আর নিষ্ঠুর একটা মেয়ে ছিলাম! আমি আমার নিজের বোনের গায়ে, তার মনে কতভাবে আঘাত করেছি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আজ এই অবস্থা যেন আমার সেই পাপেরই প্রায়শ্চিত্ত।”
লুসি রিনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। রিনির চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জলটা মুছে দিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“আমি জানি রিনি, তোমার অতীত আমি সব জানি। তুমি ভুল করেছিলে, কিন্তু এখন তুমি অনুতপ্ত। তোমার শরীরের অবস্থা ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। এই অবস্থায় তোমার এখানে একা একা থাকা একদম ঠিক হবে না।”
রিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শূন্য দৃষ্টিতে দেওয়ালের দিকে তাকাল। যেন বহু দূরের সেই চেনা পথগুলো তার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। সে অত্যন্ত মৃদু কণ্ঠে বলল,
“হুম, যাব আমি দেশে। আমার সেই ফেলে আসা প্রিয় মানুষগুলোকে অন্তত একনজর শেষবার দেখার জন্য হলেও আমাকে একবার যেতে হবে। আচ্ছা লুসি, নিশ্চয়ই এতদিনে আমার বোনের সন্তানটা অনেক বড় হয়ে গেছে, তাই না রে? আমার তূর্ণা… ও নিশ্চয়ই এখন অনেক বুঝদার হয়ে গেছে? এখন আর আগের মতো ওভাবে বায়না ধরে না, তাই তো?”
লুসি রিনির এই আকুল প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে শুধু রিনির অশ্রুভেজা, ম্লান চোখ দুটোর দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। রিনি বাংলাদেশ ছাড়ার পর থেকে এই দীর্ঘ তিন বছরে শুধু ওমর হাওলাদারের সাথেই দু-একবার যোগাযোগ করেছে, তা-ও কেবল নিজের বেঁচে থাকার খবরটুকু দেওয়ার জন্য। এছাড়া আর কারো সাথে সে ইচ্ছে করেই কোনো যোগাযোগ রাখেনি।
রিনি নিজের ওড়নার খুঁটটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে আবারও বলল,
“আমার একবার তৃণার সামনে গিয়ে দাঁড়ানো উচিত লুসি। ওর কাছে হাত জোড় করে মাফ চাওয়া উচিত। ও কি আমাকে ক্ষমা করবে? ও আমায় এখনও নিশ্চয়ই মন থেকে মেনে নেয়নি, তাই না?”
লুসি রিনির বরফের মতো ঠান্ডা হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে চেপে ধরে বলল,
“তুমি একদম চিন্তা করো না রিনি। আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার বাংলাদেশে ফেরার ফ্লাইটের টিকিট কেটে দেব। তুমি নিজের দেশে ফিরলে, চেনা মানুষদের মাঝে গেলে এমনিতেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রিনি এবার লুসির দিকে তাকাল। তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক বিদায়ের করুণ হাসি। সে লুসির গালে হাত রেখে অত্যন্ত শান্ত কণ্ঠে বলল,
“লুসি… আমাদের হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। এই জীবনে আমাদের আর কোনোদিন কথাও হবে না।”
রিনির মুখের এই চরম সত্য আর বিদায়ের আভাস যেন লুসির বুকের ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে দিল। ফরাসি মেয়েটি আর নিজের কান্না চেপে রাখতে পারল না। সে ডুকরে কেঁদে উঠে রিনিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। কান্নার তীব্রতায় লুসির মুখ দিয়ে কোনো ভাষা বের হচ্ছিল না, সে কেবল রিনির পিঠে হাত রেখে অবুঝের মতো মাথা নাড়তে লাগল যেন এই জড়িয়ে ধরা ছেড়ে সে রিনিকে কোথাও যেতে দেবে না। হঠাৎ রিনি নিজের নাকে তরল পদার্থ অনুভব করল। হাতের তালু দিয়ে মুছে হাতটা চোখের সামনে ধরতেই দেখা গেল লাল বর্নের তরল পদার্থ। রিনি বিচলিত হলো না বরং হাসল। এটা আর নতুন কি!
#চলবে…
(আর মাত্র একটা পর্ব আসবে। প্লিজ সবাই রেসপন্স করবেন। আপনাদের রেসপন্স দেখে আমি হতাশ।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা, রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৯
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬২ ( বর্ধিতাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬২(প্রথমাংশ)
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৪৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৮
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৫৬ (প্রথমাংশ)