#মন_বোঝে_না (১৫)
#সানা_শেখ
আবির ফ্ল্যাটে প্রবেশ করতেই ডেইজি দৌড়ে এসে তাকে ঝাপটে ধরল। আবির নিজেও জড়িয়ে ধরে উচুঁ করে ফেলল ডেইজিকে।
কিছুক্ষণ পর নিচে নামিয়ে দিয়ে লাল টকটকে গোলাপটা ডেইজির হাতে দিলো হাসি মুখে। ফুলটা হাতে নিয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে আবিরের ওষ্ঠজোড়ায় চুমু খেলো ডেইজি। আবির তাকে ছেড়ে না দিয়ে চেপে ধরে আগ্রাসী চুম্বনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
.
একের পর এক মেসেজ টোনে ঘুম ভেঙে গেল ফারিশের। ঘুমিয়েছিল মাঝরাতে, এখন ঘুমে চোখের পাতা টেনে তুলতে পারছে না। মেসেজের শব্দে নীরব থাকতে না পেরে ফোনটা হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকাল। ভোর চারটা পনেরো বাজে। এই সময়ে কে মেসেজ করছে এভাবে? আবরারের কোনো খোঁজ পাওয়া গেছে? স্ক্রিনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ফারিশের ঘুম পুরোপুরি ছুটে গেল। সে ধড়ফড়িয়ে শোয়া থেকে উঠে বসল। একের পর এক মেসেজ ডেলিভারি হচ্ছে তার হোয়াটস অ্যাপে।
ছয়টার পর সারাহর রুমের সামনে এসে দাঁড়াল ফারিশ। সারাহর নাম ধরে ডাকতে ডাকতে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল জোরে জোরে। সারাহ ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে সোজা উঠে বসল। আতঙ্কিত হয়ে বিছানা ছেড়ে নেমে দরজার দিকে এগিয়ে এলো দ্রুত পায়ে। দরজা খুলে দিতেই হুড়মুড় করে ভেতরে প্রবেশ করল ফারিশ। তাকে এমন অস্থির হয়ে থাকতে দেখে সারাহ ঘুম জড়ানো গলায় বলল,
“কী হয়েছে, ভাইয়া?”
ফারিশ কথা না বলে সারাহর বাম হাত ধরে অনামিকা আঙুল থেকে আবিরের পরিয়ে দেওয়া আংটিটা খুলে আছড়ে ফেলল ভয়ংকর রকমের আক্রোশ নিয়ে। শব্দ তুলে কোন দিকে গিয়ে পড়ল আংটিটা দেখতে পেল না সারাহ। ডিম লাইটের ম্লান আলোয় দেখা সম্ভবও নয়।
সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ভাইয়ের মুখের দিকে। নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কিছু হয়েছে, ভাইয়া? আংটিটা ফেললেন কেন এভাবে?”
ফারিশ দৃষ্টি নত রেখে মৃদু স্বরে বলল,
“সরি।”
সারাহ আরও বেশি অবাক হলো। বিস্ময় মাখা স্বরে বলল,
“সরি বলছেন কেন, ভাইয়া?”
ফারিশ মুখ তুলে সারাহর গালে হাত রেখে অপরাধীর ন্যায় বলল,
“সরি, কলিজা। ভাইয়া তোমার জন্য সঠিক মানুষ নির্বাচন করতে পারেনি। ভাইয়া বিরাট বড়ো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।”
সারাহ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে ফারিশের কথার আগা গোড়া কিছুই বুঝতে পারছে না। সঠিক মানুষ নির্বাচন করতে পারেনি মানে কী? আবির তো রাতে কল করে তাকে সরি বলেছে সবকিছুর জন্য। আগের মতন সুন্দর করে কথা বলেছে। সারাহ-ও সরি বলেছে, সে আর কোনোদিন কোনো ছেলের সঙ্গে কথা বলবে না। তাদের মধ্যে তো রাতেই সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে। ফারিশ এসব কেন বলছে এখন?
“ভাইয়া, আপনি কী বলছেন আমি কিছু বুঝতে পারছি না।”
ফারিশ নিজের ফোন আনলক করে সারাহর হাতে দিলো। স্ক্রিনে তাকিয়েই থমকে গেল সারাহ। এক মিনিট, দু মিনিট, অনেকক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইল স্ক্রিনে থাকা ছবিটার দিকে। নিজেকে সামলে উন্মাদের মতন একটার পর একটা ছবি দেখতে লাগল। আবির! তার আবির যাকে সে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসে। সেই আবিরের সঙ্গে অন্য একটা মেয়ে, তাও এত ঘনিষ্ঠভাবে! আবার তাদের বিয়ের ছবিও আছে দেখা যাচ্ছে। সারাহ অবিশ্বাস্য চোখে ফারিশের দিকে তাকাল। মুখ খুললেও তার গলা দিয়ে আওয়াজ বের হতে চাইছে না। কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“এ…এসব মিথ্যা তা…তাই না, ভাইয়া?”
ফারিশ দুদিকে মাথা নেড়ে থমথমে গলায় বলল,
“না। সব সত্যি। আবিরের সঙ্গে থাকা মেয়েটা ডেইজি। ওরা আরও দু-বছর আগেই বিয়ে করেছে। বিয়ের আগে এক বছর লিভ ইন-এ ছিল দুজন।”
সারাহ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ঢলে পড়ে গেল নিচে। ফারিশ তাকে ধরতে চেয়েও ধরতে পারল না। নিচে পড়ে থাকা সারাহকে ধরে দেখল অজ্ঞান হয়ে গেছে। ফারিশ ছুটে গিয়ে বেডসাইড টেবিলের উপর থেকে পানির বোতলটা এনে সারাহর চোখেমুখে পানি দিতে দিতে অস্থির হয়ে ডাকতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে এলো সারাহর। ফারিশ তাকে ধরে তুলে বসাল। গালে হাত রেখে কাতর কন্ঠে বলল,
“ঠিক আছো?”
সারাহ গুমরে কেঁদে উঠল। উন্মাদের ন্যায় ফারিশের ফোনটা খুঁজতে লাগল এদিক সেদিক।
“কী খুঁজছো?”
“ফোন, আপনার ফোন কোথায়?”
ফারিশ পাশ থেকে নিজের ফোনটা সারাহর হাতে দিলো লক খুলে। সারাহ ছবি আর ভিডিওগুলো দেখতে লাগল কাঁদতে কাঁদতে। সে ঠিকভাবে দেখতেই পাচ্ছে না কিছু। পানি দিয়ে চোখ ঘোলা হয়ে গেছে। বারবার মুছেও কাজ হচ্ছে না। শরীর থরথর করে কাঁপছে। ফোনটাও ঠিকভাবে ধরতে পারছে না। ফারিশ তার হাত থেকে ফোনটা নিয়ে রেখে দিলো দূরে। সারাহর কষ্ট তার একদম সহ্য হয় না। প্রথম প্রথম সারাহর জন্য তার কোনো অনুভূতি কাজ করতো না। সে বাবার বিয়ের সময় একবারই দেখেছিল সারাহকে। তারপর অনেক বছর আর সারাহকে দেখেনি, সে সারাহর নানার বাড়িতেও কখনো যেত না। বাবার বিয়ের সময়ই কথা হয়েছিল সারাহকে তাদের বাড়িতে নেওয়া হবে না। তাই কখনো সারাহকে তাদের বাড়িতে আনা হতো না। ফুয়াদ হাসানও খুব একটা শ্বশুরবাড়িতে যেতেন না। নিতু সুলতানা ফাইয়াজকে সঙ্গে নিয়ে আগের দিন যেতেন, পরের দিন ফিরে আসতেন। তিনিও খুব কম যেতেন, বছরে তিন চারবার। যেতেন বললে ভুল হবে, যাওয়ার সুযোগই পেতেন না।
সারাহর নানার বাড়িতে দাওয়াত ছিল তাদের। ফারিশ কোনোভাবেই যেতে রাজি হচ্ছিল না। সে নিজ বাড়ি ছেড়ে কোথাও যায় না, ফুপুর বাড়িতেও না। মাঝেমধ্যে মামার বাড়িতে যাওয়া হতো, তবে আবরারের সঙ্গে ওই ঘটনার পর সেখানেও যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ি আর ভার্সিটি, এই ছিল তার জগৎ। ফুয়াদ হাসানও যেতে রাজি ছিলেন না। কাজের ব্যস্ততা দেখিয়ে প্রতিবার নিজের যাওয়া ক্যানসেল করতেন। সত্যি বলতে তিনি ব্যস্ত মানুষই। সারাহকে তিনি দেখেছিলেন হাতে গোনা কয়েকবার। সারাহ কখনো উনার কাছে আসতো না। তাই হয়তো সারাহর প্রতি মায়াও জন্মাতো না।
নিতু সুলতানার মুখের দিকে তাকিয়ে আর সারাহর নানার জোরাজুরিতে চারজনই সারাহর নানার বাড়িতে যায়। সারাহ ফাইয়াজের সঙ্গে কথা বললেও ফারিশের সঙ্গে কথা তো দূর তার সামনেও গেল না। ফুয়াদ হাসানকে শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিল ‘কেমন আছেন?’
সবাই যখন ফিরে আসবে তখন সারাহ মাকে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করল। মা যেন আর একটা দিন তার কাছে থেকে যায়। নিতু সুলতানা বা সারাহর নানা-নানি কেউ সারাহকে বুঝিয়ে শান্ত করতে পারছিলেন না।
ফারিশ তখনই ভালোভাবে দেখল সারাহকে। কী মিষ্টি দেখতে মেয়েটা! পুরো চেহারায় শুধু মায়া। কেঁদেকেটে চেহারা লাল বানিয়ে ফেলেছিল। মাকে সে এমনভাবে আঁকড়ে ধরেছিল যে ছাড়ছিলই না কোনোভাবে।
ফারিশ বাবার পাশে দাঁড়িয়ে বাবাকে বলেছিল সারাহকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য। তাদের তো বোন নেই, সারাহ-ই না-হয় তাদের বোন হয়ে থাকবে। আর বোন হয়ে থাকবে কী? হিসেবে তো সারাহ তাদের বোন-ই হয়।
ছেলের জোরাজুরিতে না করতে পারেননি ফুয়াদ হাসান। সেদিন সারাহকে নিজেদের সঙ্গেই নিয়ে এসেছিলেন।
ফ্রন্ট সিটে বসে থাকা ফারিশ পুরো রাস্তা সারাহকে আয়নায় দেখতে দেখতে এসেছিল। তার ভীষণ আনন্দ হচ্ছিল সেদিন। তার একটা বোন হয়েছে, কিউট, সুইট, একদম পুতুলের মতন। যাকে দেখতেই পুরো আদর আদর।
বাবার সঙ্গেও সারাহর ভালো বন্ডিং তৈরি হলো, ফাইয়াজের সঙ্গে তো প্রথম থেকেই ছিল। শুধু হলো না তার সঙ্গেই। কম কথা বলা, গম্ভীর হয়ে থাকা, এসবের কারণে সারাহ তার সামনে আসতে চাইতো না। ফারিশ বুঝতে পারতো সারাহ তাকে ভয় পায়। ফারিশ-ই বা কী করবে? সে নিজের খোলস ছাড়তে পারতো না। যেখানে নিজের আপন ভাইয়ের সঙ্গেই কথা হয় না, যোজন যোজন দূরত্ব, সেখানে সৎ বোনের সঙ্গে আর কী কথা বলবে?
ফারিশ তবুও সারাহর সামনে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা করতো। কখনো কোনো কথা বললেও চেষ্টা করতো গলার আওয়াজ স্বাভাবিক রাখার।
সারাহ তবুও তাকে ভয় পেতো। তাকে দেখলেই কেমন গুটিয়ে যেত। অথচ ফারিশ কোনোদিন সারাহর সঙ্গে উচ্চ স্বরে কথা বলেনি, একটা ধমক দেয়নি, রাগী চোখে তাকায়নি। এত ভালবাসে অথচ বোন তাকে বাঘের মতন ভয় পেত।
ভার্সিটিতে যাওয়া আসার মাধ্যমে সারাহর ভয় কেটে যেতে শুরু করে। ফারিশ-ও আরও বেশি ভালোবেসে ফেলে বোনকে। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় তার ছোটো তিন ভাই-বোনের মধ্যে ফারিশ কাকে বেশি ভালোবাসে তবে ফারিশ সারাহকেই দেখিয়ে দিবে। সারাহর প্রতি তার অনেক মায়া। সারাহ অল্প বয়সে বাবাকে হারিয়েছে, তারপর মা বেঁচে থাকতেও কাছে পেতো না। ফারিশের এখনো আফসোস হয় বাবার বিয়ের প্রথমেই সারাহকে কেন নিয়ে আসেনি তাদের সঙ্গে। যদি নিয়ে আসতো তবে কী সারাহ অত কষ্ট পেতো? নিতু সুলতানা প্রতিবার যখন সারাহকে রেখে আসতেন সারাহ নিশ্চই প্রতিবারই ওভাবেই কাঁদতো মায়ের সঙ্গে আর একটা রাত থাকার জন্য।
ফারিশ সারাহকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
“শান্ত হও, কিছু হয়নি।”
সারাহ ভাইয়ের দিকে ঘুরে বসে কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট স্বরে বলল,
“উনি কেন এমন করল আমার সঙ্গে?”
সারাহর থরথর করে কাঁপতে থাকা হাত দুটো মুঠো করে ধরল ফারিশ। কিছু বলবে তার আগেই সারাহর ফোনে রিং বাজতে লাগল। ফারিশ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বিছানার দিকে। সারাহকে ছেড়ে উঠে এসে দেখল আবিরের কল। ফারিশ দাঁতে দাঁত পিষে ফোনটা হাতে নিয়ে কল রিসিভ করল। ফোন কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো আবিরের গলার আওয়াজ। ফারিশ ক্ষুব্ধ হয়ে বলল,
“আর একবার আমার বোনের নাম উচ্চারণ করলে তোর জিহ্বা টেনে ছিঁড়ে ফেলব আমি। তুই কোন সাহসে চেরির ফোনে কল করেছিস? আমার কথা তোর কানে ঢোকেনি?”
“ফারিশ, তুই শান্ত হয়ে আমার কথা তো শুনবি আগে। আমি সত্যিই সারাহকে ভালোবাসি।”
পুরো বাড়ি কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল ফারিশ। তার চিৎকার শুনে ভয়ে কেঁপে উঠল সারাহ। ঘুমন্ত ফাহিম চমকে উঠে কেঁদে উঠল গলা ছেড়ে। বেচারা ভয় পেয়ে গেছে ভীষণ। ফারিশ দ্রুত মেইন লাইট অন করে ফাহিমকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বলল,
“কিছু হয়নি, ভাইয়া এখানেই আছি। চুপ চুপ শান্ত হও।”
ভাইয়ের গলা জড়িয়ে ধরে শান্ত হয়ে হেঁচকি তুলতে লাগল ফাহিম। তার ভয় অনেকটাই কমে গেছে এখন।
ফোনের অপর পাশে থাকা আবিরকে বলল,
“তুই কোন সাহসে আমার বোনকে এখনো ভালোবাসার কথা বলছিস? তোকে সামনে পেলে এই মুহুর্তেই খু’ন করে ফেলতাম আমি। সাধু পুরুষ সেজে থাকা হয় সকলের সামনে আর ভেতরে ভেতরে— তুই বাকি জীবনেও আর আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করবি না। আবির নামের কাউকে চিনি না আমরা। তোর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই আমাদের। আমার প্রথমেই আরও ভালোভাবে খোঁজ খবর নেওয়া উচিত ছিল তোর সম্পর্কে। আমি ভুলে গিয়েছিলাম তোদের র’ক্তটাই খারাপ। তোর বোন আবরারের জীবনে ঝড় তুলে দিয়েছিল, আর তুই তুললি আমার বোনের জীবনে। তোকে যেদিন সামনে পাব সেদিনই খু’ন করব আমি।”
“তুই মাথা ঠান্ডা করে আমার কথা শোন আগে।”
“কী বলবি তুই? কী বলবি…?”
“আমি ডেইজিকে ডিভোর্স দিয়ে দিবো—
“শাট আপ! তোর কী মনে হচ্ছে আমি জেনেশুনে তোর মতো ইউজড ছেলের কাছে আমার বোনকে বিয়ে দিবো? সো ফানি! কাউয়ার্ড কোথাকার! আমি তোর কথা আগে শুনতাম, তুই যা জিজ্ঞেস করতিস বলতাম কারণ আমি ভাবতাম তুই সারাহকে ভালোবাসিস, ওকে নিয়ে ভাবিস, চিন্তিত থাকিস। কোন ভাই না চাইবে তার বোন ভালো থাকুক? আমিও চাইতাম আমার বোন ভালো থাকুক, ভাবতাম তুই ভালো রাখবি। কিন্তু তুই যে এত বড়ো শয়তান সেটা বুঝতে পারিনি। তুই ওখানে বিয়ে করে বাপ হতে চলেছিস আর আমার বোন অন্য ছেলের সঙ্গে দুটো কথা বলেছে বলে তোর পেছন জ্বলে যাচ্ছিল! তোকে সামনে পেলে সত্যি সত্যিই খু’ন করব আমি। ভাগ্যিস ফুপুর জেদের কারণে বিয়েটা এখন পর্যন্ত হয়নি। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া!”
ফারিশের চিৎকার চেঁচামেচি, আর সারাহর কান্না শুনে ফাইয়াজ নিজের রুম থেকে দৌড়ে এসেছে সারাহর রুমে। বেচারা ঘুমিয়ে ছিল, ভাইয়ের চিৎকার শুনে ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে গেছে।
সারাহ নিচে বসে কাঁদছে। ফারিশ চিৎকার চেঁচামেচি করে ফোনে কথা বলছে। ফারিশকে আজকের আগে এই রূপে দেখেনি ফাইয়াজ। ফাহিম ফারিশের গলা জড়িয়ে ধরে তার কোলে রয়েছে। ভাইয়ের চিৎকার চেঁচামেচি আর ধমক শুনে কেঁপে কেঁপে উঠছে সে। ফাইয়াজ সারাহকে কিছু না বলে আগে বড়ো ভাইয়ের কোল থেকে ছোটো ভাইকে নিজের কোলে নিলো।
ফুয়াদ হাসান ওয়াশরুমে ছিলেন। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ছেলের চিৎকার আর মেয়ের কান্না শুনে তিনিও ছুটে এসেছেন।
নিতু সুলতানা নিচে ছিলেন, তিনিও ছুটে এসেছেন নিচ থেকে।
ফুয়াদ হাসান ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“কী হয়েছে?”
“জানি না, আমি মাত্র এলাম।”
তিনজনই প্রথমে ভেবেছিল ফারিশ সারাহর উপর চিৎকার চেঁচামেচি করছে, আর সেজন্যই সারাহ এভাবে কাদঁছে।
নিতু সুলতানা মেয়ের কাছে বসে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন। সারাহ মাকে জড়িয়ে ধরে আরও বেশি কাঁদতে লাগল। তার সঙ্গে কেন এমন হলো? সে তো সত্যি সত্যিই ভালোবেসে আবিরকে। আবির কেন তাকে ঠকাল এভাবে?
ফারিশ কল কে’টে আবিরের নাম্বার ব্লক করে দিলো। অতিরিক্ত রাগ আর চিৎকার চেঁচামেচি করার কারণে ফারিশের শরীর থরথর করে কাঁপছে। কপাল, ঘাড় আর হাতের রগগুলো ফুলে উঠেছে। চোখজোড়ায় র’ক্ত উঠে গেছে।
ফুয়াদ হাসান ছেলের কাছে এগিয়ে এসে বললেন,
“ফারিশ, কী হয়েছে? কার সঙ্গে এভাবে কথা বললে?”
সবসময় শান্ত থাকা ফারিশ গর্জন করে উঠল আবার।
“ওর এত বড়ো সাহস হলো কীভাবে? এত বড়ো প্রতারণা কীভাবে করতে পারল?”
“কে কী করেছে? পরিষ্কার করে বলো।”
“আবির আগে থেকেই বিবাহিত। দুই বছর আগেই ইংল্যান্ডে বিয়ে করেছে ও। ওর বউ ডেইজি বর্তমানে আট সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট।”
বিস্ফোরণ ঘটল তিনজনের মধ্যে। নিতু সুলতানা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন। ফাইয়াজ সারাহর দিকে তাকিয়ে রইল। ফুয়াদ হাসান বিস্ময় মাখা কন্ঠে বললেন,
“এসব তোমাকে কে বলল?”
“আবিরের বউ ডেইজি। ডেইজির পরিবার বাঙ্গালী, ডেইজি জন্ম সূত্রে ইংল্যান্ডের নাগরিক। ডেইজির বাবা নেই, ভাই কানাডা থাকে বউ বাচ্চা নিয়ে। ডেইজি মায়ের সঙ্গে লন্ডনে থাকে। ভার্সিটির শুরুর দিকেই ডেইজি আর আবিরের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয়। তিন বছর আগে ওরা লিভ ইন-এ থাকতো, দুই বছর আগে ডেইজির মায়ের সম্মতিতে বিয়ে করে দুজন।
আবিরের কোনো এক ফ্রেন্ড জানতো আবিরের ব্যাপারে। হয়তো আবির আর সেই ছেলে ক্লোজ ফ্রেন্ড, তাই আবির তাকে বলেছে নিজের ব্যাপারে। ছেলেটাও বোধহয় আবিরের মতোই। সে ডেইজিকে বলে দেয় আবির বাংলাদেশে বিয়ে করবে, এঙ্গেজমেন্টও হয়ে গেছে, মেয়ের পরিবার জানে না আবির বিবাহিত। সে সারাহর নাম আর আমার নাম জানতো, নাম দুটোও বলে দেয় ডেইজিকে। রাতে আবিরকে ঘুমের ঔষধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে ওর ফোন চেক করে ডেইজি, কিন্তু সারাহর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায় না ফোনে। তবে পায় আমার নাম্বার, আর সবকিছু আমাকে জানিয়ে দেয়। মেয়েটা অনেক ভেঙে পড়েছে। পাগলের মতন কান্না করছিল এভাবে ঠকে যাওয়ার কারণে।”
ফাইয়াজ ভয়ংকর রকমের রেগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“আমি আগেই বলেছিলাম ওই কাউয়ার্ডের সঙ্গে বিয়ে দিও না। ওকে আমার প্রথম থেকেই পছন্দ ছিল না। ভাই-বোন দুটোই চরিত্রহীন। বোন এক নাম্বারের খা**কি, আর ও মাদা***দ! ওদের বংশই খারাপ!”
ফুয়াদ হাসান ছেলের দিকে তাকিয়ে রাগী গলায় বললেন,
“ফাইয়াজ, এসব কী ভাষা?”
“তোমার বোনের ছেলেমেয়ের চরিত্রের মতনই ভাষা! আমি কতবার নিষেধ করেছিলাম, কেউ শোনোনি আমার কথা। তোমার বোন আমার বোনকে নিয়ে বাজে কথা বলেছিল। আমার বোন নাকি তার ছেলের যোগ্য না। তার ছেলে তো আমার বোনের পায়ের নখেরও যোগ্য না।”
ফাহিমকে কোল থেকে নামিয়ে দিয়ে বলল,
“আব্বুর কাছে যা।”
নিচ থেকে ফারিশের ফোন তুলে নিয়ে আনলক করে ফুপুর ফোনে কল করল। রিসিভ হলো বেশ কিছুক্ষণ পর। রিসিভ হতেই ওপাশের মানুষটাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই রাগে গড়গড় করে বলতে লাগল।
“নিজের ছেলেকে নিয়ে খুব অহংকার করেছিলে না? আমার মা-বোনকেও অপমান করেছিলে। তোমার ছেলে আমার বোনের পায়ের নখেরও যোগ্য না। তোমার ছেলের কোনো যোগ্যতাই নেই আমার বোনকে বিয়ে করার। তোমার মেয়ে এক ছেলেকে টেনে নিয়ে অন্ধকার রুমে ঢুকে গিয়েছিল। আর তোমার ছেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে বিয়ে করে বাচ্চা পয়দা করতে চলেছে। দাদি হতে চলার জন্য অভিনন্দন তোমাকে। চাচাতো ভাই অন্যের বউ নিয়ে ভেগে যায়। চাচাতো বোন অন্যের হবু জামাইয়ের সঙ্গে ডেটে গিয়ে ধরা খায়। বোন পরপুরুষকে টেনে নিয়ে অন্ধকার রুমে ঢুকে যায়। আর তার এক বউ দিয়ে হয় না, আরেকটা লাগবে। চরিত্রহীনের বংশধর একেকটা। ছ্যা! থু থু থু!”
মুখের উপর কল কেটে দিলো ফাইয়াজ। খুঁজে খুঁজে আবির আর ডেইজির বেশি ঘনিষ্ঠ ছবিগুলো পাঠিয়ে দিয়ে ব্লক করে দিলো। ফুপু আর ফুপুর বাড়ির মানুষদের তার খুব একটা পছন্দ নয়। তার ফুপু সারাহকে পছন্দ করতেন না। সারাহকে এই বাড়িতে নিয়ে আসার পর তিনি অনেক কথা বলতেন, নিতু সুলতানাকেও কথা শোনাতেন মেয়েকে নিয়ে আসার জন্য। এই জন্যই আরও বেশি অপছন্দ করে তাকে। অবশ্য ফারিশের সামনে কিছু বলতেন না কখনো।
ফারিশের ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল নাম্বার সেভ করা নেই। ফাইয়াজ ভাবলো ফুপু কল করছে, তাই সে কলটা কে’টে দিলো। ব্লক করার আগেই ফারিশ বলল,
“কে কল করেছে?”
“নাম্বার সেভ করা নেই। দাদার মেয়েই হবে।”
“দেখি দাও আমার কাছে।”
ফারিশ এগিয়ে এসে ফাইয়াজের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে কল ব্যাক করল। রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো একটা ছেলের অস্থির গলার আওয়াজ।
“হ্যালো, ফারিশ?”
“হ্যাঁ।”
“আমি জুনায়েদ। আমি সকালে আবরারের ফোনে কল করেছিলাম। কল ঢুকেছিল আ—
জুনায়েদকে থামিয়ে দিয়ে ফারিশ উত্তেজিত হয়ে বলল,
“আবরারের সঙ্গে কথা হয়েছে? ও কোথায়?”
“না। আবরারের সঙ্গে কথা হয়নি। কল রিসিভ করেছিল একজন পুলিশ অফিসার। তিনি বললেন ফোনটা তারা একটা ডেড বডির কাছে পেয়েছেন। বডি মর্গে রয়েছে। আমি উত্তেজনার বশে আংকেলকে কল করে বলে ফেলেছি। শুনেই আংকেল অজ্ঞান হয়ে গেছেন। আপনি একটু আসতে পারবেন?”
“হ্যাঁ। আমি এক্ষুনি আসছি।”
ফারিশ কল কে’টে বাবা-মা আর ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমরা সারাহকে সামলাও আমি আসছি।”
“কী হয়েছে? আবরারের খোঁজ পাওয়া গেছে?”
ফারিশ তাড়াহুড়োয় বলল সবটা, তার পরই রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে ছুটল।
সারাহর কান্না বন্ধ হয়ে গেছে ভাইয়ের কথাগুলো শুনে। আবরার মা’রা গেছে? সে তো এখনো মাফ চায়নি তার কাছে। সারাহর মনে পড়ল আবরারের সেই করুণ চাহনি আর তাকে বলা শেষ কথাগুলো ‘এই দুনিয়ার সবচেয়ে বাজে অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি কী জানো? পাগলের মতন ভালোবাসার পরও ভালোবাসার মানুষটিকে নিজের করে না পাওয়া, আর ভুল মানুষের প্রতি অনুভূতি তৈরি হওয়া।’
তার নিজের অনুভূতিও তো ভুল মানুষের প্রতিই তৈরি হয়েছে। আর ভুল মানুষের অনুভূতিতে অন্ধ হয়ে সে আবরারকে আঘাত দিয়ে ফেলেছে। আবরার তাকে মাফ চাওয়ার সুযোগও দিলো না।
সারাহ ডুকরে কেঁদে উঠল আবার।
চলবে…..
Share On:
TAGS: মন বোঝে না, সানা শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ৭৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ২
-
মন বোঝে না পর্ব ১৪
-
দিশেহারা পর্ব ৫৫
-
দিশেহারা পর্ব ৫৬
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১৩