Golpo আমার আলাদিন কষ্টের গল্প

আমার আলাদিন পর্ব ২৪


#আমার_আলাদিন

#জাবিন_ফোরকান

#পর্বসংখ্যা২৪

আজ প্রথমবার নিজের ম্যাকবুক নিয়ে বসেছে ইরাম। সামিয়া গতকাল রাতে হাসপাতালে গিয়েছেন, এখনও ফেরেননি। আহমদ নিজের রুম থেকে বের হননি। নাস্তাটা তাই আলাদাভাবেই করা হয়েছে ইরামের। এখন এক মগ ভর্তি চা নিয়ে সে বসেছে ডাইনিং টেবিলে। ম্যাকবুক খুলে প্রয়োজনীয় কিছু টুকটাক ব্যাপার ঠিক করে রাখবে। কিছু সফটওয়্যার যখন সে ইনস্টল করছে তখন নিজের রুম থেকে বেরিয়ে এলো সারিকা। একটা ঢোলা টি শার্ট আর ট্রাউজার পরনে। খুব সম্ভবত আজ চেম্বারে দেরিতে যাচ্ছে সে। ইরামের দিকে একদফা কৌতূহলী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সে সোজা কিচেনে চলে গেল। তার কিছুক্ষণ বাদেই দুই তলার সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো সাইবান। বরাবরের মতোই ট্যাংক টপ পরে আছে, তবে আজ রং পাল্টে সেটি হয়েছে সাদা। সঙ্গে গ্রে সোয়েটপ্যান্ট। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক। ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়েই চলে এসেছে, চুল আঁচড়ানোর প্রয়োজনবোধ করেনি। হেলেদুলে কিচেনে চলে গেল সাইবান।

ইরাম বেশ মনোযোগ দিয়ে নতুন অ্যাপসে খোলা নিজের প্রোফাইলটা সাজাচ্ছিল ঠিক তখনি কিচেন থেকে ধড়াম করে একটা ভয়ানক শব্দ ভেসে এলো। পুরো বাড়ি কেঁপে উঠল বুঝি। চেয়ারে লাফিয়ে উঠল ইরাম। ঝট করে পিছনে ফিরে তাকাল দেখার জন্য।

“ইউ ছুকলি ছোঁচা!”

“সাই! ওয়াক! ওয়াক!”

প্রথমে ইরাম বুঝতে পারলনা কি হয়েছে। সেকেন্ডের মাথায় ডাইনিং টেবিলের উপর ঠাস করে রীতিমত উড়ে এসে পড়ল সারিকা। অদূর থেকে তার উপর পশুর মতন ঝাঁপাল সাইবান। এসেই সে খপ করে সারিকার গলা চেপে ধরে এমনভাবে ঝাঁকাতে লাগল যেন মানুষ নয়, গাছের ডাল ধরে ঝুলছে।

“বের কর…আমার ডিম বের কর এক্ষুণি!”

“তোর ডিম তোর পেটে থাকবে…খক! হাতিয়ে দেখ!”

সারিকা দূর্বলতার কোনো লক্ষণ তো দেখাচ্ছেই না বরং ভাইকে ক্ষেপিয়ে ভীষণ বিনোদন পাচ্ছে বলেই মনে হচ্ছে। তার জবাব শুনে দ্বিগুণ ক্ষেপে গেল সাইবান। সারিকাকে ধরে একেবারে পুতুলের মতন তুলে হলঘরের সোফার উপর আছড়ে ফেলে দিল! ককিয়ে উঠে কোমর চেপে ধরে সারিকা অট্টহাসি হাসতে লাগল। ইরাম চিন্তিত হয়ে দ্রুত জিজ্ঞেস করল,

“আরে! ব্যথা পাবে তো! কি হয়েছে আলাদিন?”

“কি হয়েছে? এই বেটি আমার ডিম খেয়ে ফেলেছে!”

“তুমি ডিম পাড়ো কবে থেকে?”

ইরামের আহাম্মকি প্রশ্নে সাইবান চোখ সরু করে এমন ভঙ্গিতে ঘুরে তাকাল যে না চাইতেও একদফা শয়তানি হাসি গোপন করতে হলো রমণীকে। সাইবান গুরুগম্ভীর গলায় বলল,

“আরে আমার জন্য সিদ্ধ করা ডিম খেয়ে ফেলেছে ছোঁচাটা! এখন আমি খাব কি? আমার ডায়েট নষ্ট হয়ে যাবে!”

“আশ্চর্য্য ব্যাপার! আমি তো শুধু একটাই খেয়েছি। বাকি দুটো গান্ডে পিন্ডে গিয়ে গেল না!”

সারিকা বলতেই প্রতিবাদ করে উঠল সাইবান,

“ইশ! মামার বাড়ির আবদার? আমার তিনটা ডিমই লাগবে। জিমে গিয়ে দেখ একবার কত কষ্ট, তারপর জ্ঞান দিতে আসিস। ইউ নো হোয়াট? ডিম বের কর, এক্ষুণি বের করবি তুই আমার ডিম। দে! আমার ডিম দে ছোঁচা ছেড়ি!”

রোমহর্ষক দৃষ্টিতে ইরাম দেখল সাইবান নিজের অত বড় শরীরটা নিয়ে সারিকার পাতলা শরীরের উপর লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুই ভাইবোনের মাঝে এখন হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে। বালিশ, কুশন সব এদিক সেদিক লুটিয়ে পড়েছে। সারিকাকে উল্টো চেপে ধরে তার হাতটা পিঠের উপর গুটিয়ে ধরে বাঁকা হাসছে সাইবান। দৃশ্যটা বহুদিন আগে টিভিতে দেখা রেসলিং খেলার মত দেখাচ্ছে। যেখানে গাট্টাগোট্টা কিছু পুরুষ নাটকীয় কায়দায় নিজেদের সঙ্গে মারামারি করে। ছোটবেলায় বাবার সাথে বসে বসে ইরামও দেখত, ডব্লিউ ডব্লিউ ই। এখন সেটা তার চোখের সামনে সরাসরি হচ্ছে।

সাইবান পিছন থেকে সারিকার গলা টেনে ধরে সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে,

“আর খাবি? আর লোভ দিবি আমার জিনিসে? এখন যদি বলি ওগুলো আমি আগে থেকে চেটে রেখে দিয়েছিলাম? হজম হবে তোর?”

“ইশ, ছিঃ! ওয়াক!”

হাসির মাঝখানে মাঝখানে কোঁকাতে লাগল সারিকা। ইরাম অদূরে বসে ভাইবোনের কান্ড দেখে গেল। তার কেন যেন হস্তক্ষেপ করতে ইচ্ছা হলনা। কারণ, দৃশ্যটা বাহ্যিকভাবে যতটা আগ্রাসী দেখাচ্ছে, ভেতরে ভেতরে ঠিক ততটাই সুমধুর। এই বাড়িতে আসার পর থেকে সারিকা এবং সাইবানের মাঝে ভাইবোনসুলভ বিশেষ কোনো আচরণ তার চোখে পড়েনি। হয়ত সময়টাই তেমন ছিল। একটার পর একটা গুরুগম্ভীর ঝড়ঝাপটা গিয়েছে পরিবারটার উপর থেকে। আজ, সাত সকালে দুই ভাইবোনকে এক ভিন্ন রূপে দেখে তার কেন যেন ভীষণ মনোমুগ্ধকর লাগছে। খুনসুঁটি, ভালোবাসা, না বলা স্নেহ, উপড়ি রাগ দেখানোই তো ভাইবোনের বন্ধন! তাইনা?

দুজনকে দেখতে দেখতে ইরাম নিজের ভাবনায় হারিয়ে গেল। এইতো কিছুদিন আগেই সামিয়া কিচেনে একসাথে কাজ করতে করতে একটা সুন্দর ঘটনা শুনিয়েছেন তাকে। রোমন্থনের জগতে হারিয়ে গেল সে।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

মোলায়েম আলোতে রুমটা পরিপূর্ণ। নরম গদির উপর নড়চড় করছে একটি ছোট্ট প্রাণ। আরামদায়ক সুতির ফতুয়া আর ডায়পার পরনে। ডাগর ডাগর জ্বলজ্বলে চোখ মেলে চেয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে, যেখানে ঝুলছে হরেক রকমের রং বেরংয়ের বেলুন। ছোট্ট শিশু সারিকা পায়ে পায়ে বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। উঁকি মেরে দেখল নাজুক অস্তিত্বটাকে। একটা হাত তুলে মাপল সে। তার এক হাতের সমান হয়েছে বাবুটা। এত ছোট মানুষ হয়? বিস্ময়ে সারিকার চোখে বুঝি তারা ফুটে উঠল।

ছোট ছোট পা তুলে বিছানার উপর উঠে এলো সে। বাবুটার পাশে উল্টো হয়ে শুয়ে পড়ল। বিস্ময় মাখা নয়নে দেখল কীভাবে হাত পা ছুঁড়ছে সে। এই বাবুটা নাকি তার ভাই হয়! আচ্ছা, ভাই কি জিনিস? যেমনটা তার বান্ধবী রিয়ার আছে? কিন্তু রিয়ার ভাই তো এত ছোট না, অনেক বড়। তাহলে সারিকার ভাই এত ছোট কেন? শিশুসুলভ মনে সহস্র প্রশ্ন জাগল। বাবুটা নড়তে নড়তে উল্টে যেতেই সারিকা দ্রুত হাত বাড়িয়ে আবার চিৎ করে শুইয়ে দিল। কি নরম একটা তুলতুলে শরীর! কেমন আদর আদর লাগে। কিন্তু তার বাবা যে নামটা বলেছে, সেই নামটা তার একদমই পছন্দ হয়নি। এই আদরটাকে সে কীভাবে ওই নামে ডাকবে? এমা, ছিঃ!

এমন সময়েই রুমে এলেন আহমদ। বিছানার উপর নবজাত ছেলে আর তার পাশে মহতি পর্যবেক্ষণে মেতে থাকা মেয়েকে দেখে তার বুকটা ভরে উঠল। নিঃশব্দে পায়ে পায়ে কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। বুকে দুবাহু বেঁধে কর্মকান্ড দেখলেন।

“বেবি ব্রাদার!”

সারিকা টুকটুক করে কথা বলছে। বাবুর গালে আঙুল ছুঁয়ে মোলায়েম গলায় ফিসফিস করে বলে যাচ্ছে,

“তাড়াতাড়ি বড় হও, আমি তোমার সাথে খেলব।”

মুচকি হাসলেন আহমদ। বিছানার কাছে এগিয়ে মেয়ের উপর ঝুঁকে বলে উঠলেন,

“অবশ্যই খেলবে। আমাদের আলাউদ্দিন খুব জলদি বড় হয়ে যাবে। তোমার সাথে ছুটে বেড়াবে খেলার মাঠে। ইওর ব্রাদার ইয গোয়িং টু প্রোটেক্ট ইউ।”

সারিকা উঠে বসল। চোখমুখ কুঁচকে কেমন অসন্তুষ্ট দৃষ্টিতে পিতাকে দেখল। আহমদের হাসিখানি মুছে গেল।

“কি হয়েছে আমার মা?”

কিছু বললনা সারিকা। মেয়ের মান ভাঙাতে বিছানায় বসে নাজুক বাচ্চাটিকে নিজের হাতের মাঝে তুলে মেয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন আহমদ,

“ভাইকে কোলে নেবে না?”

গাল ফুলিয়ে সারিকা হঠাৎ বলে বসল,

“ড্যাড! আমার তো আলাউদ্দিনকে কোলে নিতে ইচ্ছা হয়না!”

আহমদ ছোট্ট মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে তাজ্জব বনে গেলেন। কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলেন। আলাউদ্দিন নামটা তিনিই রেখেছেন। নিজের আহমদ উদ্দিন নামের সঙ্গে মিলিয়ে। তাতেই মেয়ে এত চটবে জানা ছিলনা। মাথা কাত করে তিনি মিষ্টি হেসে শুধালেন,

“তবে কাকে কোলে নিতে ইচ্ছা হয় আমার মায়ের?”

সারিকা দুহাত এগিয়ে দিল। বুকের মাঝে ছোট্ট ভাইয়ের শরীরটা জাপটে ধরে জবাব দিল,

“আলাদিনকে!”

“আলাদিন!”

বিস্মিত হলেন আহমদ। জোরে জোরে মাথা ঝাঁকাল সারিকা।

“আমার আলাউদ্দিন না, আলাদিন লাগবে ড্যাড! লাগবেই লাগবে!”

খিলখিল করে হাসলেন আহমদ, একটি হাত তুলে মেয়ের মাথায় বুলিয়ে ঝুঁকে এসে কপালে চুমু খেলেন।

“ঠিক আছে। আজ থেকে তোমার ভাই তোমার আলাদিন। খুশি?”

“ইয়ে! আমার ভাই আলাদিন!”

মেয়েকে টেনে নিজের কোলে বসালেন আহমদ। অশ্রুসিক্ত মুগ্ধ নয়নে দেখলেন কীভাবে বুকের ভেতর পরম যত্নে সারিকা আগলে রেখেছে নিজের ভাইকে। ওই সময়ে তার মনে হলো, এইটুকু মুহূর্তের মাঝেই তার জীবনের সবটুকু স্বার্থকতা নিহিত।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

রোমন্থনের জগৎ থেকে ইরাম বেরিয়ে এলো হুট করেই। চোখ পিটপিট করে সামনে তাকিয়ে দেখল সারিকা আর সাইবানকে। যারা আপাতত ডব্লিউ ডব্লিউ ই ম্যাচ থামিয়ে একে অপরের সঙ্গে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করছে।

“তোর জন্য আমি চেম্বার থেকে আসার সময় কে এফ সি বাকেট নিয়ে আসব। ডিল?”

সারিকার অফারে সাইবানকে আগ্রহী মনে হলো। গলা খাঁকারি দিয়ে হাতের আঙুল গুণে গুণে সে বলল,

“দুটো কে এফ সি বাকেট, দুটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর তিনটা টাব আইসক্রিম।”

“একটা কে এফ সি বাকেট, একটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, একটা টাব আইসক্রিম!”

“আমার চুলের নেগোসিয়েশন করছিস তুই!”

“আরেকবার চুল বললে তোর সত্যিকার চুল টেনে ছিঁড়ে ফেলব বেয়াদব!”

“ওকে ওকে। ফাইন! একটা কে এফ সি বাকেট, দুটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, দুটো টাব আইসক্রিম।”

“তুই না ডায়েটে আছিস? একটা কে এফ সি বাকেট, দুটো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, একটা টাব আইসক্রিম!”

“ওকে। ডিল!”

দুজন ভাইবোন এমন ভঙ্গিতে করমর্দন করল যেন ডিলারশিপ কনফার্ম করেছে দুজন মাফিয়া বস। সোফা থেকে উঠে হেলেদুলে শীষ বাজাতে বাজাতে ইরামের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল সাইবান। অপরদিকে সারিকা তখনো হাসিমাখা ঠোঁটে উঠে দাঁড়িয়ে কোমর ডলতে ডলতে সামান্য খুঁড়িয়ে নিজের রুমের দিকে আড়াল হয়ে গেল।

“একটা সিদ্ধ ডিমের অনেক খরচা পড়ে গেল মেয়েটার। আহারে।”

মন্তব্য করল ইরাম। তাতে সাইবান ভ্রুকুটি করে তাকাল তার দিকে। ঝুঁকে এসে ম্যাকবুকের স্ক্রীনের দিকে চেয়ে কথা ঘুরিয়ে বলল,

“ফাইভার খুলে ফেলেছেন? বেশ বেশ! এটা কি লিখেছেন? আর্টিকেল লিখে দেবেন মাত্র ৫ ডলারে? মাথা খারাপ? ৫ ডলার কত টাকা জানেন? কিচ্ছু হবেনা ৫ ডলার দিয়ে। বদলান বদলান, লিখুন ১০০ ডলার ছাড়া মুখও দেখাবিনা গরিবস!”

চোখ উল্টে ইরাম বলল,

“প্রোফাইল তোমার নাকি আমার? জ্ঞান দেয়া বন্ধ করো। যাও, বাকি দুটো ডিম খেয়ে আসো। নাহলে আবার সুগন্ধার নজর পড়বে।”

“চোখ তুলে ফেলব না ওটার?”

দৌঁড়ে কিচেনে গিয়ে এক হাতে দুটো ডিম নিয়ে এসে ইরামের পাশের চেয়ারেই বসে পড়ল সাইবান।

“বায় দ্যা ওয়ে….”

পায়ের উপর পা তুলে বসে একটা আস্ত ডিম মুখে পুরে দিল সে। ইরাম অবাক নয়নে দেখল। গাল ভীষণ ফুলে গেছে ছেলেটার। সাধারণত অতিরিক্ত খাবার মুখে নিয়ে চেবালে মানুষকে দেখতে মোটেও ভালো লাগেনা। অথচ সাইবানের এমন বেখাপ্পা আচরণেও তার উপর চোখ আটকে যাচ্ছে। বিশেষ করে খাবার গেলার সময় তার গলার অ্যাডামস অ্যাপল নামক উঁচু জায়গাটা যেভাবে ফুলেফেঁপে উঠছে সেটা ইরামের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছে দারুণভাবে। এক লহমা চেয়ে থেকে দ্রুত দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল রমণী। কোনদিকে তাকিয়ে আছে সে? ইশ! লজ্জাবোধ করল সে ভীষণভাবে। সাইবানের অবশ্য তার নজরের দিকে বিশেষ খেয়াল নেই। একটা ডিম গিলে শেষ করে অন্যটা জাদুঘরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মতন পর্যবেক্ষণ করতে করতে সে বলল,

“আপনি যে কম্পিউটার ক্লাসে যাবেন বলে ঠিক করে রেখেছেন, কীভাবে করবেন? পোটলা? ওকে সাথে নেয়ার চিন্তাও মাথায় আনবেন না এখন।”

ইরাম পুনরায় বাস্তবতায় ফিরে এলো।

“তুমি না বললেও আমি এটাই ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু, ওকে রেখেই বা যাব কোথায়? ভাবছি একটা ডে কেয়ার খুঁজব। কিন্তু এত ছোট বাচ্চা রেখে যেতে মন সায় দিচ্ছেনা।”

“আমি সরি। আসলে আমিও বলতে পারছিনা ওই সময়টায় আমি বাড়িতে থাকব কিনা। আমার প্র্যাকটিস থাকে শো এর। সেক্ষেত্রে…”

“এভাবে চলা যায়না। সবাই তো আর নিজেদের কাজবাজ বন্ধ করে বাড়িতে বসে থাকতে পারবেনা। কম্প্রোমাইজ করতে হবে, সেটা আমাকেই। দেখি, যদি কোর্স ছাড়াই কোনোভাবে কাজ করা যায় তবে আমি বাসায় থেকেই…”

“ইযানকে আমি রাখব।”

অপ্রত্যাশিত কণ্ঠটি সাইবান এবং ইরামকে জমিয়ে দিল। উভয়ে তাকিয়ে দেখল সারিকাকে। সালোয়ার কামিজ এবং তার উপরে অ্যাপ্রোন পড়ে পুরোদস্তুর তৈরি মেয়েটি। চেম্বারে যাচ্ছে স্পষ্ট। সাইবান ভ্রু কুঁচকে ফেলল,

“তুই সিস?”

মাথা দোলাল সারিকা।

“হ্যাঁ। এমনিতেও চেম্বারে দুপুরের সময়ে রোগী তেমন থাকে না, ব্রেক চলে। ওই ব্রেক টাইম চেম্বারে না কাটিয়ে বাসায় চলে আসব। একটা দুটো ঘণ্টা ম্যানেজ করা ব্যাপার না। তাছাড়া সুগন্ধা তো আছেই। আশা রাখছি কোর্সের সময়টা দুপুর থেকে বিকালের মাঝেই।”

“২ টা থেকে ৪ টা।”

ইরাম বলল। সারিকা তার দিকে এক পলক চেয়ে শেষে সাইবানের দিকে ফিরল,

“তাহলে তো হলোই। বাড়িতে মানুষের অভাব নেই। ব্যবস্থা একটা ঠিক হয়ে যাবে।”

“হুম।”

ভাবুক ভঙ্গিতে বলে আরেকটা ডিম মুখে পুরে দিল সাইবান। সারিকা দাঁড়িয়ে নেই। হনহন করে হেঁটে সে চলে গেল বাড়ির বাইরে। ইরাম মেয়েটির চলার পথে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল, ফিরে এলে একা কোনো সময়ে তাকে ধন্যবাদ জানাবে সে। এমনিতেও আগের একটা ধন্যবাদ মেয়েটার প্রাপ্য।

“একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

ইরামের প্রশ্নে সাইবান মুখ তুলে মাথা হেলালো। রমণী প্রশ্ন করল,

“সারিকার কি অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ?”

সাইবান খানিকটা সময় চুপ করে রইল। ইরাম বেশ মনোযোগ দিয়ে তার চেহারাটা দেখল। বিয়ের দিন কিচেনে দেখা দৃশ্যটি ইরাম যেমন আজও ভোলেনি, তেমন কারো কাছে খোলাসাও করেনি। অনুরাগ এবং সারিকা, উভয়ের মাঝে আগে থেকে সম্পর্ক ছিল স্পষ্ট। সাইবান কি নিজের ব্রেস্ট ফ্রেন্ড আর বোনের মাঝকার রহস্যময় সম্পর্কের কথা জানেনা? বুঝতে পারলনা সে অভিব্যক্তি দেখে। সাইবান চেয়ারে হেলান দিয়ে উত্তর করল,

“হ্যাঁ। মিসির দুলাভাইয়ের মায়ের স্কুল ক্লাসমেট ছিল মম। সেখান থেকেই কথাবার্তা। হঠাৎ এই প্রশ্ন?”

“না এমনিই।”

দ্রুত মুখ ফিরিয়ে ম্যাকবুকে মনোযোগ দিল। যেন জবাব দিতে না হয় তাই চায়ের মগটা তুলে নিয়ে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখল। সাইবান মুখ ঘুরিয়ে তাকে দেখল, তারপর মগটাকে।

“চা?”

“হুম।”

মগটা নিজের হাতে তুলে নিল সাইবান। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে বলল,

“কোনখানে চুমুক দিয়েছেন?”

প্রশ্নটা ইরামকে অবাক করল। এটা জিজ্ঞেস করছে কেন হঠাৎ ছেলেটা? খেতে চায় নাকি? ইরাম আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল, তার ঠোঁটে দেয়া লিপজেলের কারণে অতি হালকা একটা ছাপ পড়ে গিয়েছে।

“এখানে।”

ইরাম ভাবল বোধ হয় সাইবান সে যেখানে চুমুক দিয়েছে সেই জায়গাটা এড়িয়ে যেতে চাইছে তাই জিজ্ঞেস করেছে। অথচ তাকে হতবাক করে দিয়ে সাইবান তীর্যক হেসে বলে উঠল,

“ওকে থ্যাংকস।”

চুমুক দিল সাইবান, ঠিক যেখানে ইরাম ঠোঁট বসিয়েছে একদম সেই স্থানের উপর। লিপজেলের হালকা ছাপ লেপ্টে গেল সাইবানের ঠোঁটে। প্রসারিত দৃষ্টি মেলে দেখল ইরাম। এক মুহূর্তের জন্য ইচ্ছা হলো মগটা সাইবানের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। অথচ একটুও নড়তে পারলনা। বেশ লম্বা এক চুমুক চা পান করে অবশেষে মগটা নামিয়ে রাখল সাইবান। সঙ্গে সঙ্গে জিভ বের করে নিজের ঠোঁট চেটে নিতে নিতে বলল,

“উমমম, চা এত সুস্বাদু হয় আগে জানতাম না।”

বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল ইরামের। সাইবান ঝুঁকে এসে সরাসরি তার ঠোঁটের দিকে চেয়ে বলল,

“ক্যান আই হ্যাভ ওয়ান মোর সুইট লিপস্…আই মিন টি প্লীজ?”

তৎক্ষণাৎ মুখ ঘুরিয়ে ফেলল ইরাম। দুই কান বেয়ে আগুন বেরোচ্ছে তার। ম্যাকবুকের কি বোর্ডের উপর বেশ শব্দ করে ঝোড়ো গতিতে টাইপিং করতে করতে সে খড়খড়ে গলায় বলল,

“সুগন্ধাকে বলো বানিয়ে দিতে!”

চেয়ার ঠেলে অযথাই দুলতে দুলতে বিস্তর শয়তানি হাসি মেখে ইরামের উজ্জ্বল শ্যামলা মুখবর্ণে লালচে ছাপ প্রাণভরে দেখে গেল সাইবান।

⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠⁠─⁠──⁠──⁠─⁠─⁠─⁠─⁠──⁠──

পরদিন সন্ধ্যাবেলা।

সাইবান কিছুক্ষণ আগে বাইরে থেকে ফিরেছে। সারাদিন সে প্র্যাকটিসের জন্য বাইরে থেকেছে। পরে জিম, আর জিম থেকে থানায় গিয়েছিল খবর নিতে। কোনো অগ্রগতির কথা জানা যায়নি। বিষয়টা বাড়িতে কাউকে আপাতত বলেনি সে। রুমে চলে গিয়েছে ফ্রেশ হতে। আজ সামিয়া, সারিকা এমনকি আহমদও বাড়িতে আছেন। পরিবারটির উপর দিয়ে গত কয়েকদিনে যত ঝড় গিয়েছে, তার জন্য ইরামের খারাপ লাগছে। সন্ধ্যা হতে না হতেই সে কিচেনে হাজির হয়েছে। আজ বিশেষ নাস্তা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে সবার জন্য। গরম গরম শিঙাড়া, সাথে মাংসের ডুবুডুবু হালিম। বড় কড়াইয়ে ইতোমধ্যে টগবগ করে হালিম ফুটছে। ইরামের বিকালেই বানিয়ে রাখা শিঙাড়া গরম তেলে ভেজে নিচ্ছে সুগন্ধা। অন্য স্টোভে কেতলিতে পানি বসিয়েছে ইরাম। ইযানকে কিছুক্ষণ আগেই খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছে। তাই বিশেষ চিন্তা নেই এখন।

আজ বাড়ির বারান্দায় ছোটখাট একটা গল্পের আসর জমেছে। সামিয়া এবং আহমদ একে অপরের সঙ্গে তেমন না মিশলেও সারিকাই সকলকে মাতিয়ে রেখেছে। তাছাড়া কিছুক্ষণ আগে মিসিরও এসে পৌঁছেছে। সে মূলত সারিকাকে দেখতে এসেছিল, ইরাম অনুরোধ করে আজকে রাতের জন্য থাকতে বলেছে। সেই অনুরোধ ফেলেনি সাইবানের দুলাভাই। কিছুক্ষণ বাদে গোসল সেরে সাইবানও যোগ দিল। ইরাম এবং সুগন্ধা নাস্তার প্লেট সাজিয়ে নিয়ে গেল। পরিবেশন করে দিল সবাইকে। ঠিক এমন সময়েই বাড়ির লোহার গেটের সামনে এসে থামল একটি গাড়ি। দারোয়ান গেট খুলতেই একজোড়া বয়স্ক দম্পতিকে দেখা গেল। সঙ্গে একজন ফিনফিনে শরীরের লম্বা লোক। লোকটার দুই হাতে ধরা প্যাকেট। ওগুলো যে মিষ্টি এবং ফলমূল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ইরাম তাদের চিনতে পারলনা। সবার আগে সাইবানই উঠে গেল।

“আংকেল, আন্টি আপনারা? আসুন আসুন, প্লীজ।”

জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে আসা লোকটার হাত থেকে কিছু জিনিস সাইবান নিজের হাতে নিয়ে নিল। সুগন্ধাও এগিয়ে গেল সাহায্যে। বারান্দায় উঠে আসতে আসতে নরম গলায় সাইবান শুধাল,

“তিতলি আসেনি?”

“ওই বেচারি কি আর ঘরে আটকে থাকে? একটা ফ্যাশন শো আছে আজ, সেখানের ডিজাইনার আর অর্গানাইজার। ওখানেই ব্যস্ত।”

উত্তর করলেন মিসেস চৌধুরী। সামিয়াও উঠে দাঁড়ালেন, অতিথিদের আমন্ত্রণ জানালেন। চেয়ার নিয়ে এসে বসার ব্যবস্থা করে দিল সুগন্ধা। সামিয়া বললেন,

“বসুন বসুন। কি সৌভাগ্য! কতদিন পর দেখা আপনাদের সাথে। সেই তিন বছর আগে তিতলির জন্মদিনের পার্টিতে শেষ দেখেছি।”

“আপনি তো ওই তল্লাটে এখন আর পাই রাখেন না মিসেস মুন্সী। ছেলের সঙ্গে মাঝে মধ্যে যাতায়াত করলে কি এমন ক্ষতি হয়?”

মিস্টার চৌধুরী বললেন এবার। ইরাম অদূরে দাঁড়িয়ে দেখল। এরা তাহলে ওই তিতলি নামের মেয়েটার বাবা মা। সাইবানদের পরিবারের সঙ্গে ভালোই সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে। তবে এত মিষ্টি, ফলমূল, নাস্তার বহর নিয়ে হাজির হয়েছেন কেন? অতিথির বাড়িতে মিষ্টান্ন নেয়ারও একটা সীমা আছে। ইরাম আড়চোখে দেখল, কম করে হলেও দশ কি বারো কেজি মিষ্টি আছে। তাও বিভিন্ন ধরণের। এমন ঐতিহ্য কেবল বিয়ে আর শ্বশুড় বাড়ি কিংবা কুটুম বাড়িতে গেলেই দেখা যায়। তবে বিষয়টায় ভ্রুক্ষেপ না করার সিদ্ধান্ত নিল সে। মেহমান এসেছে বাড়িতে, বাড়ির বউ হিসাবে আপ্যায়ন করা জরুরী। তাই সে সুগন্ধার সাথে ভেতরে চলে গেল। বাটিতে নাস্তা সাজিয়ে মিনিট বিশেক পরে ট্রে হাতে যখন ইরাম আর সুগন্ধা ফিরে এলো তখন গল্পের আসর জমে উঠেছে। মিস্টার চৌধুরী আহমদের উরু চাপড়ে বলছেন,

“তবে যাই বলুন না কেন আহমদ সাহেব, ছেলে একটা তৈরি করেছেন বাঘের বাচ্চা!”

“আপনার এই ছেলেটার প্রতি যত কৃতজ্ঞতা প্রকাশই করিনা কেন, কম হয়ে যাবে। আমাদের মেয়েটাকে সকল বিপদ আপদ থেকে ছায়ার মত আগলে রাখে।”

সাইবানের মাথায় হাত বুলিয়ে হেসে বললেন মিসেস চৌধুরী। ইরামের কেমন যেন খটকা লাগল। তবে সেটা সে প্রকাশ করলনা। ঠান্ডা দৃষ্টিতে ঝুঁকে নাস্তা এবং চায়ের কাপ সাজিয়ে দিল। মিসেস চৌধুরী তাকে দেখলেন, নতুন মুখ লক্ষ্য করে তিনি কিছু জিজ্ঞেসও করতে যাচ্ছিলেন তবে তার আগেই মিস্টার চৌধুরী বলতে শুরু করলেন,

“দেখুন আহমদ সাহেব, ভণিতা পছন্দ না আমার। সরাসরিই বলছি। এসব কথায় যত স্পষ্ট থাকা যায় ততই মঙ্গল, বুঝেছেন?”

“কিসব কথা?”

প্রশ্ন করলেন আহমদ। তিনিও দ্বিধান্বিত। বুঝতে পারছেন না কোথায় ইঙ্গিত করা হচ্ছে। মিসেস চৌধুরী জানালেন,

“সেদিন কিছু না চিন্তা করেই, কোনো পরোয়া না করেই যেভাবে আমাদের পরিবারটাকে সাইবান আগলে গেল, সেটা প্রশংসার দাবিদার। আপনাদের ছেলের যত তারিফই করিনা কেন অনেক কম হয়ে যাবে।”

বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের মুখেই ক্রমশ দ্বিধা ফুটে উঠতে লাগল। সেই দ্বিধা দেখে অবশেষে মিস্টার চৌধুরী আসল উদ্দেশ্যটা প্রকাশ করলেন। আহমদের একটা হাত ধরে বললেন,

“মেয়ের বাবা হিসাবে আগে বলা যদিও অদ্ভুত, তাও বলছিলাম, আপনাদের ছেলেটা যদি আমাদের বাড়ির জামাই হয়, তাহলে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত হব। আমাদের পরিবারের বন্ধনটা শুধু বন্ধুত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে কুটুম বাড়ি হয়ে দাঁড়ালে খুশির কোনো সীমানা থাকবেনা। কি বলেন বেয়াই সাহেব?”

বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ স্তব্ধ হয়ে গেল। কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রত্যেক জোড়া দৃষ্টি গিয়ে স্থাপিত হলো একপাশে বরফের মতন দাঁড়িয়ে থাকা ইরামের দিকে, যার চোখে এই মুহূর্তে শুধুমাত্র শীতলতা ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

—চলবে—

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply