Golpo romantic golpo জাহানারা

জাহানারা পর্ব ৮৪


#জাহানারা

#জান্নাত_মুন

পর্ব :৮৪

🚫ক’পি করা নিষিদ্ধ

🔞 সতর্কবার্তা:

এই গল্পে অ’কথ্য ভাষা এবং স”হিং’সতার উপাদান রয়েছে। ১৮ বছরের কম বয়সী বা সং’বে’দনশীল পাঠকদের জন্য উপযুক্ত নয়। পাঠক নিজ দায়িত্বে পড়বেন।

আমি সহাস্যে বাক্যটা আওড়ে বোরকা পরিহিত নতুন বউয়ের নিকাব ওপরে তুললাম। তৎক্ষনাৎ আমার ঠোঁটের মেকি হাসি কর্পূরের মতো উবে গেল। এক লহমায় স্তব্ধ হয়ে গেলাম। আমার পায়ের নিচের নিরেট জমিন থেকে যেন সমস্ত মাটি নিমেষেই সরে গেল। মাথার উপর যেন তীব্র বজ্রপাত হলো। এক মুহূর্তের জন্য পুরোপুরি হতবিহ্বল হয়ে সামনের মেয়েটির দিকে অপলক তাকিয়ে রইলাম। শুধু আমিই নই, উপস্থিত সকলেই জুইকে দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। জুই তার ক্লান্ত ও অবসন্ন নয়নে আমার দিকে অসহায়ত্বের চাতক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মেয়েটার এহেন করুণ চাহনিতে আমার অবশ হয়ে যাওয়া সংবিৎ ফিরে এলো। সহসা রুদ্ধ কণ্ঠে শুধালাম,

–“ত..তুই এখানে?”

জুই কিছু বলার অবকাশ পেল না। তার আগেই পাশ থেকে মাহিন তার গম্ভীর ও ভরাট কণ্ঠে বলে উঠল,“ওকে আমি বিয়ে করেছি। নাউ শি ইজ মাই ওয়া..”

“ঠাস্!”

মাহিন নিজের বাক্য সম্পূর্ণ করার আগেই আমি সপাটে ওর গালে থাপ্পড় বসালাম। অতর্কিতে চারপাশের পুরো অন্দরমহল স্তব্ধ হয়ে গেল আমার এহেন চরম ও দুঃসাহসিক কাণ্ডে। মূহুর্তেই সকলে আঁতকে উঠল। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে থাকা ইফানের পা-ও থমকে গেল। সদ্য ঘুম থেকে উঠে আসায় তার মাথা এখনো ঝিম ঝিম করছে। তারমধ্যে সকাল সকাল আমার এহেন রুদ্রমূর্তি দেখে চতুর্দিকে দৃষ্টিপাত করে পরিস্থিতির গূঢ় গভীরতা ঠাহর করার চেষ্টা করল।

আমার হাতের থাপ্পড় খেয়েও মাহিন বাহ্যিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। বরং মাথা নিচু করে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল। যদিও থা’প্পড়টা অনেক জোরেই লেগেছে। প্রমাণস্বরূপ মুহূর্তেই ওর ঠোঁটের কোণ কেটে তাজা র’ক্তের রেখা গড়িয়ে পড়ল। এদিকে ক্রোধে আমার হাত-পা থরথর করে কাঁপছে। আমি গর্জে উঠলাম,

–“ইয়ারকি হচ্ছে আমার সাথে? সত্যি করে বল জুই তোমার সাথে কি করছে?”

মাহিন মাথা নিচু রেখেই দ্বিধাহীন বলে উঠল,“আমি ওকে বিয়ে করেছি, এটাই সত্যি।”

ওর মুখে এই ধৃষ্টতা শুনে আমার চোয়াল দ্বিগুণ শক্ত হয়ে গেল। ফের হাত উঠাতে গিয়েও থমকালাম। জুই অবচেতন দেহের ভার আর ধরে রাখতে না পেরে আমার উপর হেলে পড়ল। আমি তৎক্ষনাৎ জড়িয়ে ধরলাম নিজের বুকের সাথে। ওর এই বি’ধ্বস্ত দশা দেখে উদগ্রীব হয়ে শুধালাম,

–“বোনু কি হয়েছে তোর?”

মাহিন জুইকে ধরতে নিলেই ফের চণ্ডী রূপে গর্জে উঠলাম,“সাবধান! এক পা-ও আমার বোনের দিকে এগোবে না।”

মাহিন বিপরীতে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। আমি আর মীরা মিলে জুইয়ের অবশ দেহটা কোনোমতে ধরে সোফায় নিয়ে গেলাম। মাহিন ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। ইফান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরপায়ে এগিয়ে এল। মাহিন চোখ তুলে তাকাল না সেদিকে। বরং নিঃশব্দে নিজের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে ঠোঁটের কোণে জমে থাকা র’ক্তটুকু আলতো করে মুছে নিতে লাগল। ইফান মাহিনের কাঁধে হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,

–“মন খারাপ করিস না, আমিও পেয়েছি এটার টেস্ট।”

হতবুদ্ধি নয়নে ইফানের দিকে দৃষ্টি ঘোরাল মাহিন। ইফান গলা খাঁকারি দিয়ে ফের দোতলার দিকে যাওয়া ধরল। এখানে তার থেকে কোনো কাজ নেই। যাদের বিষয় তারা বুঝে নিবে। বরং সে থাকলে মাথা গরম করে কী না কী করে বসবে, তখন হিতে বিপরীত হবে।

পুরো লিভিং রুম জুড়ে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে। আমি জুইয়ের মাথা থেকে হিজাব খুলে নিলাম। অতঃপর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম। মীরা জুইয়ের অবশ চোখেমুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিল, কিন্তু তাতেও মেয়েটার কোনো সংবিৎ ফিরছে না। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ইমরান পলিকে বলল জুইয়ের পায়ের তালু ঘষে দিতে। পলিও তৎক্ষণাৎ বাধ্য মেয়ের মতো তাই করতে শুরু করল। ইতি ফুঁপিয়ে কেঁদে যাচ্ছে। এসবের মধ্যে সোফার পা জড়িয়ে ধরে বসে থাকা নোহা নাক টেনে হেঁচকি তুলতে তুলতে বলে উঠল,

–“আমি আর কারো সাথে খেলব না। ইইই! পিচ্চি মেয়েটাও আমার আগে বিয়ে করে নিল। এ্যঁ…।”

–“নোহা!”

আমি খ্যাপাটে বাঘিনীর মতো চিৎকার করে তড়িৎ বেগে নোহার পানে দৃষ্টি স্থির করলাম। আকস্মিক আমার এহেন চাহনিতে ভরকে গেল নোহা। এতক্ষণ নুলক চৌধুরী দাঁড়িয়ে সব কিছু লক্ষ্য করছিলেন। কিন্তু এবার আর চুপ থাকতে পারলেন না। রাগান্বিত কণ্ঠে বলে উঠলেন,

–“আমার মেয়ের উপর চিৎকার করবে না জাহানারা।”

মনমানসিকতা ঠিক নেই এই মূহুর্তে। তাই নুলক চৌধুরীর সাথে অযথা কোনো তর্কে জড়াতে চাইলাম না। তাতেও তিনি থামলেন না। কটাক্ষ করে বলে উঠলেন,

–“তোমার তো খুশি হওয়ার কথা, প্ল্যান অবশেষে সাকসেসফুল হলো। এবার দুই বোন মিলে চৌধুরী বাড়িতে রাজত্ব করবে।”

নুলক চৌধুরীর এই বিষোদ্গার শুনে দাঁতে দাঁত পিষলাম। কিন্তু এই মহিলা এইটুকুতেই দমে গেলেন না। মাহিনের উদ্দেশ্যে বললেন,

–“খুঁজে খু্ঁজে এই মেয়েকেই বিয়ে করতে হলো তোমার। দেশে কি মেয়ের অভাব পড়েছিল নাকি! আর কিসব শুনেছি! এই মেয়েকে নাকি র..”

নুলক চৌধুরীকে বাক্য সম্পন্ন করতে না দিয়ে মাহিন পুরো লিভিং রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে উঠল,

–“মুখ সামলে কথা বল। না হলে..”

মাহিন দাঁতে দাঁত পিষল। ইমরান ভাইয়ের হাত ধরে শান্ত হওয়ার তাগিদ দিতে লাগল। নুলক চৌধুরী রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললেন,“না হলে কি করবে?”

–“তুমি ভালো করে জান আমি কি কি করতে পারি। নেক্সট টাইম আমার স্ত্রীর সম্পর্কে টু ও যদি তোমার মুখ থেকে বের হয় তাহলে আমি কিন্তু সব ভুলে যাব।”

–“মাহিন ব্যাটা, তুমি আমার সাথে এভাবে কথা বলছ!”

নাবিলা চৌধুরী ফুঁস করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করে বলে উঠলেন,“আহ্! দিভাই থাম। তুমি বরং রুমে যাও।”

নুলক চৌধুরী তীব্র আক্রোশে দাঁতে দাঁত পিষে নাবিলার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। অতঃপর আশেপাশে এক নজর দেখে গটগট করে নিজের রুমের দিকে চলে গেলেন। নাবিল চৌধুরী এবার জুইকে ভালো করে পরখ করলেন। মেয়েটা এখনো নিস্তেজ। তার মিইয়ে যাওয়া ফ্যাকাসে চেহারা দেখে উনার বুকটা ভার হয়ে আসল। পলিকে বলল পানি ঢালতে জুইয়ের মাথায়। মাহিন শুনে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠল,

–“কিছু করার দরকার নেই।”

এতক্ষণ চুপ থাকলেও মাহিনের গলা শুনে পুনরায় মেজাজ খিঁচে গেল। খ্যাপাটে দৃষ্টি মাহিনের দিকে ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে উঠলাম,“সেটা কি তোমার থেকে জানতে হবে? জানোয়ার একটা। কোন সাহসে তুমি আমার বোনের দিকে নজর দিলে? তোমার কি ক্ষতি করেছিল আমার বোন? ওর নিজেরই তো এত বড় ক্ষতি হয়ে গেল।”

–“ভাবি।”

উচ্চ স্বরে চেঁচিয়ে উঠল মাহিন। পরক্ষণেই জোড়ে দিয়ে বলল,“প্লিজ।”

আমি দাঁতে দাঁত পিষে তার দিকে তাকিয়ে। মাহিন দৃষ্টি নত করে নিজেকে সামলে নিল। অতঃপর নিচু গলায় বলল,

–“আমি ওকে ভালোবাসি। তাই ওকে আমার কাছে সারাজীবনের জন্য নিয়ে এসেছি। নাউ শি ইজ মাই রেসপনসিবিলিটি।”

আমার সারা শরীর রাগে রি রি করছে। অতিরিক্ত মাত্রায় রেগে যাওয়ায় কণ্ঠনালী যেন অবশ হয়ে আসছে। মুখ দিয়ে কোনো রা বের হচ্ছে না। মাহিন এগিয়ে এসে জুইকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। আমি চেঁচিয়ে উঠব তার আগেই মাহিন বলে উঠল,

–“ও পাগলামি করছিল। ডক্টর ওকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়েছে। তাই এখন ঘুমচ্ছে।”

আমি বসা থেকে সটান হয়ে দাঁড়াতে গিয়ে মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। হেলে পড়ার আগেই মীরা ধরে ফেলল। সারা দেহ অত্যাধিক ক্রোধে থরথর করে কাঁপছে। মাহিন জুইকে নিয়ে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হচ্ছে তখনই বাইরে থেকে হট্টগোল কানে আসল। মাহিনের পা থমকে গেল। উপস্থিত সকলে একযোগে সদর দরজার দিকে কৌতুহলী দৃষ্টি ঘোরাতেই দেখলাম, সকল সিআইডি অফিসার সহ জিয়াদ এবং রাকিবও ভেতরে প্রবেশ করছে।

আবির পাগলের মতো চারপাশে দৃষ্টি ঘুরাতেই সিঁড়ির কাছে মাহিনের কোলে জুইকে দেখে ছুটে গেল। মাহিন চোয়াল শক্ত করে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু তার আগেই আবির পথ আটকে দাঁড়াল। মাহিনের কোল থেকে এক প্রকার জুইকে ছিনিয়ে নিতে চাইল। কিন্তু মাহিনের থেকে কিছুতেই ছাড়াতে পারছে না। আবির উন্মাদের মতো চিৎকার চেচামেচি আরম্ভ করেছে। আমি, মীরা এবং অরনা ওদের মধ্যে থেকে জুইকে সরিয়ে আনলাম। আবিরের চোখমুখের অবস্থা বেহাল। জিতু ভাইয়া আবিরকে ধমকে উঠলেন,

–“আবির শান্ত হও।”

আবির কানে তুলল না। আমার বুকে লেপ্টে থাকা জুইকে টেনে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে উন্মাদের মতো বলতে লাগল,“এই তো আমি এসে গেছি জুই ফুল। এই জা’’নোয়ারটা তোমার আর কিছু করতে পারবে না। কোনো ভয় নেই, আমি আছি।”

আবির আর কিছু বলার অবকাশ পেল না। মাহিন তেড়ে এসে আবিরের কলার চেপে ধরে জুইয়ের থেকে ছাড়াতে ছাড়াতে গর্জে উঠলো, “বা’স্টার্ড তোর সাহস কি করে হলো আমার স্ত্রীকে স্পর্শ করার।”

আবির আচমকা মাহিনের চোয়ালে চপেটাঘাত করে গর্জে উঠল,“শো’উরের বাচ্চা। তোর সাহস কি করে হলো আমার হবু স্ত্রীকে স্ত্রী বলে দাবি করার।”

অতর্কিত আ”ঘাতের ফলে তাল সামলাতে না পেরে মাহিন মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ইমরান ছুটে গিয়ে মাহিনকে তুলতে চায়লে মাহিন ঝটকা মেরে ইমরানের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিল। মাহিনের নাক দিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে পড়েছে। সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক মুছে ক্রোধোন্মত্ত নয়নে আবিরের দিকে তাকাল। চাপা স্বরে হুশিয়ারি দিয়ে বলল,

–“দ্বিতীয়বার এই বাক্য উচ্চারণ করলে তোর জিহ্বা টেনে ছিঁ’ড়ে ফেলব হা’রা’মির বাচ্চা।”

–“একশবার বলব জুই আমার হবু স্..”

আবির বাক্য সম্পূর্ণ করতে পারল না। তার আগেই মাহিন আবিরের উপর হা’মলে পড়ল। মাহিনের হাতের শক্ত পাঞ্চ আবিরের নাক বরাবর পড়তেই আবির জিতু ভাইয়ার উপর আচড়ে পড়ল। তার নাক দিয়ে ফিনকি দিয়ে র’ক্ত বেরিয়ে আসল। আবির থামল না। পাল্টা আ’ঘাত করার জন্য মাহিনের দিকে ধেয়ে গেল। নাবিলা চৌধুরী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছে ওদের থামানোর জন্য। সকলে কোনো ভাবেই মাহিন আর আবিরকে দমিয়ে রাখতে পারছে না। এসবের মধ্যে আমার বুকে লেপ্টে থাকা জুই নড়েচড়ে উঠল। এতো হট্টগোল কোথা থেকে আসছে দেখার জন্য আধবোজা চোখ ঘোরাল। তক্ষুনি সামনে এমন উশৃংখল দৃশ্য দেখে আবার আমার বুকে মুখ লুকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠল। আমি শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরলাম। আমার বুক অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। হে মাবুদ এ কেমন পরিস্থিতিতে ফেললে আমায়? কেন বারবার আমাদের সাথেই এমন হয়? আচমকা চোখ দুটো নোনা জলে খুব জ্বালা করতে শুরু করল।

মীরা এতক্ষণ চুপ ছিল। কিন্তু নিজের সহোদর ভাইকে এভাবে আ’ঘাত পেতে দেখে তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। তাই দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। টি-শার্টের দু’হাতা খানিকটা গুটিয়ে এগিয়ে গেল। তক্ষুনি পুরুষালি বজ্রকণ্ঠ ভেসে এলো,

–“বাস্।”

এক মূহুর্তের জন্য সকলে থমকে গেল। আমি সহ সকলে তড়িৎ গতিতে দৃষ্টি দোতলার দিকে রাখতেই ইফানের কাঠিন্য মুখাবয়ব নজরে আসল। ইফান দু’হাত টাউজারের পকেটে ঢুকিয়ে সটান দাঁড়িয়ে আছে। সে শক্ত কন্ঠে হুশিয়ারি দিয়ে বলল,

–“এটা আমার বাড়ি। কোনো যু’দ্ধের ময়দান নয়। তোরা তো মাছের বাজার বানিয়ে ছেড়েছিস। এনাফ ইজ এনাফ। আমাকে নিচে নামতে বাধ্য করিস না।”

কথাটি বলতে বলতেই ইফানের তীক্ষ্ণ নজর আচমকা এসে আটকাল আমার অশ্রু-টইটম্বুর কালো চোখের মনিতে। মুহূর্তের ভগ্নাংশে ওর চেহারার রুক্ষ কাঠিন্য উবে গিয়ে সেখানে খানিকটা নমনীয়তা ও ব্যাকুলতার ছায়া পড়ল। পরক্ষণেই আগের রুপে ফিরে জিতু ভাইয়ার উদ্দেশ্য বলল,

–“জিতু এদের নিয়ে বাড়ি যা।”

জিতু ভাইয়া ক্রোধিত র’ক্তচক্ষু নিয়ে ইফানের চোখে চোখ রাখল। চোয়াল তার ইস্পাতের ন্যায় শক্ত। জিয়াদ আমার কাছে এগিয়ে আসল। না চাইতেও বেখেয়ালি দৃষ্টি আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা পলির দিকে গেল। মূহুর্তেই দু’জনের চোখাচোখি হলো। ইতোমধ্যে পলির চোখ দুটো ভেজা। জিয়াদ তৎক্ষনাৎ দৃষ্টি সংযত করে জুইকে নিজের কাছে টেনে নিতে চাইল। এতে জুই আমার কোমর আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আমিও জিয়াদকে বাঁধা দিলাম। জিয়াদ মলিন চেহারায় বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।

আবির ফের জুইয়ের দিকে ছুটে আসতে চাইলে ইফান শক্ত গলায় বলে উঠেল,“জিতু তোকে আমি কিছু বলছি?”

–“তুমি সব জানতে?”

–“এ নিয়ে তোর সাথে পরে কথা বলব।”

জিতু ভাইয়া দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে নিল। অতঃপর চোখ বন্ধ করে তপ্তশ্বাস ছেড়ে নিজেকে শান্ত করে সকলের উদ্দেশ্য বলে উঠল,

–“চল সবাই।”

সকলে হতাশার নিঃশ্বাস ত্যাগ করে যাওয়ার জন্য উদ্যত হলো। কিন্তু আবির ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল। জিতু ভাইয়া তাকাতেই ছলছলে নয়নে তরল গলায় আর্তি জানিয়ে বলে উঠল,

–“জুই ফুলকে নিয়ে যাবেন না?”

জিতু ভাইয়া নিরুপায় হয়ে নিজের দৃষ্টি নত করে ফেলল। মাহিন হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে ঠোঁটের কোণের র’ক্ত মুছে নিল। অতঃপর এগিয়ে এসে নিস্তেজ ও অর্ধচেতন জুইকে নিজের বলিষ্ঠ পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে দোতলার দিকে হাঁটা ধরল। যাওয়ার সময় আবিরের কাঁধের সাথে মাহিনের কাঁধের সংঘর্ষ হলো। জুইয়ের ছোট্ট বিবর্ণ মুখখানার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা বেখেয়ালি আবির ধাক্কা সামলাতে না পেরে নিজের স্থান থেকে কিছুটা নড়ে গেল। মাহিন চারপাশের কোনো কিছুর দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে জুইকে বুকে জাপটে ধরে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। আবির উন্মাদের মতো জুইয়ের পিছু ছুটে যেতে চাইল, কিন্তু সিআইডি অফিসার কবির, হিমন আর রাকিব তৎক্ষণাৎ ওকে পেছন থেকে শক্ত করে জাপটে ধরে আটকে দিল। জুই চোখের আড়াল হতেই আবির হাঁটু গেড়ে মেঝেতে বসে হু হু করে কান্নায় ভেঙে পড়ল। জিতু ভাইয়া কাঁধে হাত রাখতেই আবির তার বুকে হামলে পড়ে বলতে লাগল,

–“স্যার আপনি আমায় কথা দিয়েছিলেন জুই ফুল শুধু আমার। তাহলে কেন আমার হলো না? আমি এখন কি নিয়ে বাঁচব? ওকে নিয়ে তিলে তিলে গড়া আমার সব স্বপ্ন কেন এভাবে ভেঙে দিল? কেন আমার বুক থেকে আমার ফুলটাকে কেঁড়ে নিল? আমার বুক যে শূন্য হয়ে গেল। আমি কি জবাব দিব আম্মাকে? আম্মা তো বলেছিল বামন হয়ে চাঁদে হাত দিতে নেই। আমি বলেছিলাম ভালোবাসার জোরে চাঁদকে নিজের করে নিব। আমার ভালোবাসা যে হেরে গেলো। আমি আম্মাকে কি করে এই মুখ দেখাব? আমি এই না পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে কিভাবে বেঁচে থাকব? মরণ হোক আমার।”

ইমরান এগিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। জিতু ভাইয়া আর কবির আবিরের বাহু জড়িয়ে ধরে উঠে দাঁড়াল। আমি অসহায় চোখে ওদের দিকে চেয়ে রইলাম। আমি বহু আগে থেকেই জানি আবির জুইকে পছন্দ করে। আজ অনেক অপরাধী মনে হচ্ছে নিজেকে। চোখের সামনে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। জিতু ভাইয়া আর কোনো দিকে তাকালো না। তারা চৌধুরী বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবে তখন ইমরান ভদ্রতাসুলভ বলল,

–“আপনারা এভাবে বেরিয়ে যাচ্ছেন খুব খারাপ লাগছে।”

জিতু ভাইয়া এক পলক সেদিকে তাকিয়ে বেড়িয়ে গেল। ইমরান সদর দরজা অব্ধি এগিয়ে দিয়ে আসল। আচমকা নজর পড়ল রাকিবের দিকে। লোকটা তার দিকে অনেক্ক্ষণ ধরে তাকিয়ে। চার চোখ এক হতেই তড়িঘড়ি করে নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিল রাকিব। ইমরান ভ্রু কুঁচকে একটু কৌতূহলী স্বরে জিজ্ঞেস করল,

–“কিছু বলবেন ভাই?”

রাকিব না করল। অতঃপর বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেল। যাওয়ার আগে শেষবার ইমরানের দিকে এক পলক তাকাল। কেন যেন তার মনে হচ্ছে ইমরানের গলাটা কোথাও একটা শুনেছে! কিন্তু কোথায় শুনেছে?

___________

মাহিন নিজ ঘরে জুইকে নিয়ে আসল। জুইয়ের পরনের বোরকা খুলতে চাইলে জুইয়ের দুর্বল কণ্ঠে নিষেধাজ্ঞা ভেসে আসল,

–“আমায় ছুবেন না আপনি।”

মাহিন থমকে গিয়ে এক মুহূর্ত জুইয়ের শ্রান্ত, মলিন চেহারার পানে চেয়ে রইল। মেয়েটা তীব্র অবসাদে এখনো ঠিকঠাক চোখ মেলে তাকাতেও পারছে না। ডক্টরের দেওয়া সেই কড়া ঘুমের ইনজেকশনের রেশ আজ সারাদিনেও পুরোপুরি কাটবে কি না—তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কিন্তু মাহিন কী করতো সেই মূহুর্ত! বিয়ে করবে না বলে জুই তখন উন্মাদের মতো চিৎকার-চেঁচামেচি আর কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছিল। মেয়েটা নিজের অতীত আর অপবাদের কথা ভেবে নিজেকে মাহিনের অযোগ্য, এমনকি এই পৃথিবীর সকলের চোখে মহাকলঙ্কিত অযোগ্য প্রতিরূপ মনে করে বসেছে। বাধ্য হয়ে ঘুমের ইনজেকশন দিতে হয়। অতঃপর যতটুকু হুঁশ ছিল মেয়েটার তারমধ্যেই ধর্মীয়ভাবে এবং রেজিষ্ট্রির মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

মাহিন জুইয়ের বারণকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেই ওর অবশ দেহ থেকে ভারী বোরকাটা খুলে নিল। জুই ফুঁপিয়ে কেঁদে বলে উঠল,“কেন আমার সাথে এমন করছেন? আমার ভালো লাগছে না। দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি একা থাকতে চাই। আমাকে বাড়িতে দিয়ে আসুন। আপোওওও।”

মাহিন জুইকে সজোরে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরল। জুই মাহিনের ইস্পাতের ন্যায় কঠিন বক্ষপটে একনাগাড়ে কিল-ধাক্কা দিতে লাগল। যদিও তার ক্লান্ত আঘাতগুলো মাহিনের কাছে কোমল মোমের মতোই মনে হচ্ছে। আর তা হবেই না কেন? জুইয়ের শরীরে যে আজ এক ফোঁটা শক্তিও অবশিষ্ট নেই। তার ফুলের মতোন কোমল মন যে আজ ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সকল ভালো লাগার অনুভূতি আজ বিষাদের ঘন আস্তরণে ঢাকা পড়েছে। তবুও যে এই ক্ষ’তবিক্ষ’ত র’ক্তাক্ত হৃদয় নিয়ে এখনো বেঁচে আছে। এই যে কয়েকটা রাত গেছে, জুইয়ের মনে হয়েছে এ যেন এক যুগের চেয়েও লম্বা সময়। সারারাত নিঃশব্দে কেঁদেছে। মাথার নিচের বালিশ ভিজে সেঁতসেঁতে হয়েছে। কত শত নিষিদ্ধ আত্মঘাতী ইচ্ছেই না জুইয়ের মনে এই কদিনে বাসা বেঁধেছে! তবুও সেই সব অন্ধকারকে দূরে ঠেলে ও নিজের আহত মন ও ক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক নিয়ে বেঁচে আছে। আজ জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে ও মর্মে মর্মে বুঝতে পারছে—বাস্তব জীবনটা কত কঠিন ও নির্মম!

অবশেষে জুই মাহিনের অদম্য শক্তির কাছে হার মানল। নিস্তেজ হয়ে তার বুকে পড়ে রইল। সারা ঘর জুড়ে এক নিবিড় নৈঃশব্দের বিচরণ বইল ক্ষণকালের জন্য। জুইকে শান্ত হতে দেখে মাহিন মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসল। জুইয়ের গাল দু’টো নিজ দু’হাতে আগলে নিল। অতঃপর মেয়েটার বন্ধ চোখের কার্ণিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুধারা নিজের ঠোঁট দিয়ে আলতো করে আহরণ করে নিল। মাহিনের এই তীব্র ও সিক্ত স্পর্শে কেঁপে উঠল জুইয়ের সমস্ত কিশোরী দেহ। ও ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মাহিন কপালে কপাল ঠেকাল। তরল গলায় হিসহিসিয়ে এক বুক আকুলতা ঢেলে বলল,

–“আমি শুনেছিলাম মানুষ ভালোবাসলে নাকি দুর্বল হয়ে যায়। কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবেসে উন্মাদ হয়ে গেছি। সকল কষ্ট অনুভব করছ তুমি। অথচ যন্ত্রণা হচ্ছে আমার বুকে। ইচ্ছে করছে সব ধ্বংস করে দেই। যদি পারতাম এই পাষণ্ড বুক ছিড়ে তোমাকে দেখাতাম ঠিক কতটা যন্ত্রণা হচ্ছে সেখানে। তোমার দগ্ধ হৃদয়ের পুড়া গন্ধ আমিই সহ্য করতে পারছি না, না জানি তুমি কি করে সহ্য করছ! খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার তাই না? আমি তোমাকে নিয়ে অনেক দূরে চলে যাব। সেখানে তুমি আমি ছাড়া কেউ থাকবে না। দেখো আমি তোমার সব কষ্ট মুছে দিব একদিন।”

জুই ঠোঁটে ঠোঁট চেপে নাক টানল। ব্যথাতুর কাতর গলায় আওড়াল,

–“পারবেন না। ভাঙা জিনিস জোড়া লাগলেও ভাঙা হৃদয় কখনো জোড়া লাগে না।”

_____

আমি হন্তদন্ত হয়ে করিডোর দিয়ে হেঁটে এগিয়ে যাচ্ছি মাহিনের রুমের দিকে। এখনো সারা দেহ কাঁপছে। দেহ থেকে সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ যেন খসে পড়ছে। নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই কিছু। কি হচ্ছে আমার সাথে এসব? হে মাবুদ রক্ষে কর। আর কত পরীক্ষা নিচ্ছ আমার? আর এই বান্দা লড়তে পারছে না। যতবার আমি বুক বেঁধে উঠে দাঁড়াতে চাইছি, ততবারই কোনো না কোনো অশুভ প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের ঝাপটায় ভেঙে চু’রমার হয়ে পড়ছি। একটু সহায় হও আমার প্রতি। আমি যে আর পারি না।

আমার চোখ দুটো নোনা জলে ছলছল করছে। এই বোধহয় বাঁধ ভেঙে সব অশ্রু বেরিয়ে পড়বে। আচমকা আমার হাতে টান পড়ল। খেই হারিয়ে কারো বক্কে গিয়ে পড়লাম। মুহূর্তেই নাকে এসে হানা দিল অতিপরিচিত কোলনের সুঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণে মস্তিষ্ক নেশায় বোধ হওয়ার আগেই নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইলাম। ইফান ফের টেনে তার বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। আমি তার ছায়া আর উষ্ণ বুক পেয়ে হুহু করে কেঁদে উঠলাম। ইফান আমাকে থামাল না। কতক্ষণ যে তার বুকে মাথা রেখে অবুঝ শিশুর মতো কাঁদলাম, তা এই ব্যাকুল অবস্থায় ঠিক ঠাহর করতে পারলাম না। এক সময় কান্নার বেগ কমে চোখের জল শুকিয়ে এল। আমি নিজেকে ছাড়িয়ে তার নিষ্প্রাণ ধূসর বাদামী নেত্রপল্লবের দিকে দৃষ্টি রাখলাম। নাক টেনে অভিযোগের সুরে শুধালাম,

–“কি সুখ পাও আমাকে কাঁদিয়ে?”

ইফান বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে আমার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে হাস্কি স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,“সুখ খুঁজে মানুষে, আমি তো অমানুষ। তোমাদের ভাষায় জা’নোয়ার। তবে তোমাকে কাঁদানোর ইন্টেনটশন আমার কোনো কালেই ছিল না।”

–“তুমি সব জানতে না?”

–“কি জানতাম?”

–“কথা ঘুরিও না। তোমার ভাই যে এই অঘটন ঘটাবে তা তুমি জানতে?”

–“মাই সিলি ঝাঁঝওয়ালি! কে কি করবে না করবে আমি কি করে জানব?”

আমি মাথা নিচু করে চোখ বন্ধ করে নিলাম। অতঃপর নিঃশব্দে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলাম। ইফান আমার এই বি’ধ্বস্ত রূপের দিকে নিষ্পলক চেয়েই রইল। আমি নাক টেনে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম,

–“আমার ভাগ্যটা এত খারাপ কেন বল তো? সব কষ্ট কেন আমার কপালেই জুটে?”

–“সত্যি তোমার ভাগ্যটা ভীষণ খারাপ। তা না হলে আমার মতো ব্লাডিবিস্ট তোমার কপালে দুঃখের পাহাড় হয়ে আসত না।”

ইফানের কথায় অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম। নিজেকে সামলে বললাম,“তুমি আমায় ভুল বুঝছ। আমি এভাবে বলতে চাইনি।”

ইফান স্মিত হাসল। আমার চোখেমুখে আঁচড়ে পড়া চুলগুলো কানে গুঁজে দিতে দিতে বলল,“এটাই সত্যি। আমি ভীষণ অসুভ। জন্ম নেওয়ার আগেই মায়ের পাহাড় সমান কষ্টের কারণ হয়েছি। আর এখন তোমার।”

আমি কাতর চোখে ইফানের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমি নিজের ওষ্ঠাধর উন্মুক্ত করে কিছু একটা বলতে যাব তার আগেই লোকটা কোন পূর্বাভাস না দিয়ে আমার ঠোঁট নিজের ঠোঁটের সাথে আঁকড়ে ধরে আমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।

*

*

*

বর্ষপঞ্জিতে পেরিয়ে গেল আরও কটা দিন। সময় যত অতিবাহিত হচ্ছে, চারপাশের পরিস্থিতি যেন আরও বেশি বেহাল ও জটিল রূপ ধারণ করছে। কিভাবে যেন খবর ছড়িয়ে পড়েছ মন্ত্রী ইকবাল চৌধুরী আর বেঁচে নেই। প্রতিটি নিউজ চ্যানেল, সংবাদ প্রত্রিকায় এখন শুধু এই চাঞ্চল্যকর খবরই প্রকাশিত হচ্ছে। যদিও এই খবরের স্বপক্ষে কোনো চাক্ষুষ প্রমাণ বা অকাট্য যুক্তি এখনও কেউ তুলে ধরতে পারছে না, তবুও এতদিন ধরে মন্ত্রী সাহেবের কোনো হদিস না পেয়ে আমজনতা থেকে শুরু করে গণমাধ্যমগুলো নিজেদের মনগড়া মুখরোচক কথা রটিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে পুরো দেশজুড়ে এক চরম বিশৃঙ্খলা আর অরাজকতা তৈরি হয়েছে।

এমন এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জিতু ভাইয়ার এক প্রকার মাথায় হাত। উপর মহল থেকে নোটিশ এসেছে চলমান মানব পাচারের কেসটি অন্য ডিপার্টমেন্টের হাতে হস্তান্তর করা হবে। তাছাড়া সামনে কি ধরনের পরিস্থিতি আসতে চলেছে তা নিয়ে গভীর চিন্তামগ্ন। সিআইডি অফিসের চারদিকের পরিবেশ এখন থমথমে, সকল অফিসার নিজ নিজ ডেস্কে কাজে ব্যস্ত। আবির আপাতত কিছুদিনের ছুটিতে আছে। জিতু ভাইয়া নিজ ডেস্কে বসে বেখেয়ালি হাতের নখ কামড়ে যাচ্ছেন। বাইরে থেকে ওনার সেই অবয়ব দেখলেই যে কেউ সহজে অনুধাবন করতে পারবে যে, তিনি কোনো এক গভীর ভাবনার অতল গহ্বরে ডুবে আছেন। ঠিক তখনই সিআইডি অফিসের প্রধান ফটক চিরে আকস্মিক সেখানে এসআই রাকিব উপস্থিত হলো। সাতসকালে সিআইডি অফিসে রাকিবের এমন অতর্কিত আগমন দেখে উপস্থিত সকল অফিসার কৌতূহলী চোখে সেদিকে দৃষ্টিপাত করল। রাকিবের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি বেশ অস্থির দেখা যাচ্ছে। কবির এগিয়ে এসে শুধাল,

–“কি ব্যাপার অফিসার, সব ঠিক আছে?”

–“জি স্যার। জিতু স্যারের সাথে দরকার ছিল।”

–“স্যার নিজ কেবিনে।”

–“ওকে স্যার, ধন্যবাদ।

রাকিব দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল জিতু ভাইয়ার কেবিনের দিকে। দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতেই জিতু ভাইয়া ওকে জিজ্ঞেস করল,“এ সময় তুমি?”

–“স্যার কদিন একটা বিষয় আমি অনেক ভেবেছি। অনেক ভাবার পর আজ কিছুটা খোলাসা হয়েছে।”

জিতু ভাইয়া ভ্রু কুঞ্চিত করল৷ রাকিবের কথা বোধগম্য না হওয়ায় শুধাল,“কি বলতে চাইছ পরিষ্কার বল?

–“স্যার ঐ পেনড্রাইভের কথা মনে আছে, যেটা আমি আপনাকে দিয়েছিলাম?”

–“হ্যাঁ। কেন বল তো?”

–“আমি আজ একবার শুনতে চাই।”

জিতু ভাইয়া ঠোঁট কামড়ে এক মূহুর্ত ভাবলেন। অতঃপর তিনি আর সময় নষ্ট না করে কবিরকে নির্দেশ দিলেন পেনড্রাইভের সেই অডিও ফাইলটি পিসিতে প্লে করতে। মুহূর্তেই পুরো সিআইডি অফিস জুড়ে এক গা ছমছমে নিচ্ছিদ্র নৈঃশব্দ বিরাজ করতে লাগল। কবির আর রাকিবের কানে হেডফোন। ঘরের সেই পিনপতন নীরবতার মাঝে ইতোমধ্যে অডিও রেকর্ডটি বেশ কয়েকবার রিওয়াইন্ড করে প্লে করা হয়েছে। অডিওর প্রতিটা স্পন্দনে রাকিবের চোখের মণি স্থির হয়ে আসছিল। অবশেষে রাকিব নিজের মাথা থেকে হেডফোনটা এক ঝটকায় খুলে অত্যন্ত উত্তেজিত ও আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে উঠল,

–“এখন আমি শিউর। একশো ভাগ শিউর।”

উপস্থিত সকল অফিসার চরম বিস্ময়ে একে অপরের সাথে চোখাচোখি করল। পুরো কেবিনের বাতাস যেন এক নিমেষে ভারী হয়ে উঠল। অরণা কৌতূহল আর উত্তেজনা চেপে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করল,“কে হতে পারে?”

–“ইমরান চৌধুরী।”

একদফা হোটচ খেল উপস্থিত সকলে। হিমন বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠল,“হায় আল্লাহ! ভোলাবালা সেজে থাকা ছেলেটাই এত বড় ক্রি’মিনাল। এদিকে আমি ভেবেছিলাম চৌধুরী বাড়িতে এই একটাই মানুষের বাচ্চা।”

কণা অবিশ্বাস্যের ন্যায় বলল,“এত বড় ভুল করে ফেললাম আমরা। সিআইডিদের এভাবে টুপি পড়িয়ে দিল!”

কবির হতাশার শ্বাস ফেলে বলল,“বড় ভুল হয়ে গেছে। আমাদের উচিত ছিল নজরে রাখা।”

–“কিন্তু স্যার আমরা তো নজরে রেখেই ছিলাম। তখন তো ইমরান চৌধুরীর মধ্যে কোনো ঝামেলা খুঁজে পাওয়া যায় নি।”

কণার কথার পর এক মূহুর্ত চারপাশে নিরবতা বয়ে যায়। সকলের দৃষ্টি জিতু ভাইয়ার পানে। তিনি ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলেন। অতঃপর সহাস্যে বলে উঠলো,

–“ইমিডিয়েট ইমরান চৌধুরীকে ট্র্যাক কর। স্পাইয়ের খবর যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে আজ চোর পুলিশের খেলা জমবে।”

সকলেই ঠোঁট কামড়ে হাসল। জিতু ভাইয়া স্থান ত্যাগ করতে করতে বিড়বিড়িয়ে আওড়ালো,“বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান, এবার ঘুঘু তোমার বধিব পরান।”

___________

তেজগাঁও, ঢাকা।।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলেও রোদের সেই প্রখর তেজ আর ভ্যাপসা গরমের তীব্রতায় এক বিন্দু ভাটা পড়ল না। বাজারের চারদিক থেকে ভেসে আসছে সাধারণ মানুষের তুমুল শোরগোল ও কানফাটানো কোলাহল। কাঁচাবাজারে মানুষের এত উপচে পড়া ভিড় যে, তার ফাঁক গলে একটা মাছি পর্যন্ত যাতায়াত করতে পারবে না। এক অত্যন্ত গুমোট আর দমবন্ধকর পরিস্থিতি। তপ্ত বিকেলের এই অস্বস্তিকর গরমে প্রতিটা পথচারীর কপাল বেয়ে অঝোরে ঘাম ঝরছে, অথচ চারপাশের এই চেনা ব্যস্ততায় কারোরই কোনো হুঁশ নেই। ক্রেতাদের এই উপচে পড়া ভিড়ের মাঝেই হকাররা গলা ফাটিয়ে হাঁক ছেড়ে খরিদ্দারদের ডেকে চলেছে।

সিআইডি অফিসাররা ছদ্মবেশে বাজারের চতুর্দিকে সতর্কতার সাথে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। জিতু ভাইয়ার কালো গাড়িটি বাজারের এক পাশে দাঁড়িয়ে। ভেতরে ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন তিনি। কানে একটি সুক্ষ্ম ব্লুটুথ ডিভাইস লাগানো, আর চোখে-মুখে ফুটে উঠেছে চরম বিরক্তির স্পষ্ট ছাপ। কাঁচাবাজারের এমন তীব্র কোলাহল আর হট্টগোলের মাঝে এভাবে ঠাঁই বসে থাকা সত্যিই এক অসম্ভব বিষয়। তিনি গাড়ির কালো কাচ নামিয়ে চারপাশের ভিড়ের ওপর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করলেন। হঠাৎই সেই জনসমুদ্রের মাঝে অরণাকে দেখা গেল। যে কি না সাধারণ এক গ্রামীণ রমণীর স্টাইলে শাড়ি জড়িয়ে নিখুঁত ছদ্মবেশ ধারণ করেছে। মাথায় তার ফেরি করার জন্য একটি কসমেটিকসের ঝুড়ি। আর অবিন্যস্ত চুলের আড়ালে সযত্নে লুকানো কালো রঙের ব্লুটুথ ডিভাইস। অরণা এক পলক জিতু ভাইয়ার গাড়ির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় সিগন্যাল দিল। অতঃপর ভিড়ের মাঝে পলকেই আড়াল হয়ে গেল। জিতু ভাইয়া অন্য পাশে দৃষ্টিপাত করলেন, যেখানে কবির সবজি বিক্রেতার ছদ্মবেশ ধারণ করে একমনে বসে আছে। মাথায় তার একটি লাল গামছা শক্ত করে বাঁধা, আর সেই গামছার আড়ালেই কানে গুঁজা ব্লুটুথ। কবির অবলীলায় সবজির ওপর তাজা পানির ছিটকা দিচ্ছে, যাতে কেউ বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে। ঠিক তখনই কানে জিতু ভাইয়ার গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই ও নিজের চতুর দৃষ্টিটি একবার দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো গাড়িটির দিকে ঘোরাল। সেদিকে তাকিয়ে ও খুব সামান্য ঠোঁট নাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,

–“এখন পর্যন্ত সব ঠিকই আছে।”

জিতু ভাইয়া অন্যপাশে দৃষ্টি ঘোরালেন। ভিড়ের মাঝে দেখা গেল মাছ বিক্রেতার নিখুঁত সাজে কণা মাছের বড় একটি গামলা নিয়ে বসে আছে। ও হাত নাড়িয়ে মনের সুখে মাছি তাড়াচ্ছে আর গলা ফাটিয়ে হাঁক ছেড়ে খরিদ্দারদের ডাকছে। অপরদিকে হিমন নিয়েছে ভিক্ষুকের ছদ্মবেশ। ওর পরনে জরাজীর্ণ, ছেঁড়া জোড়াতালি দেওয়া নোংরা কাপড়। একহাতে ভর দেওয়ার লাঠি আর অপর হাতে ভিক্ষার থালা। উষ্কখুষ্ক এলোমেলো চুলের আড়ালে ওর কানেও গোঁজা রয়েছে সুক্ষ্ম ব্লুটুথ ডিভাইস। ও খুব সাবধানে জিতু ভাইয়াকে নিশ্চিত করল, এখনো তেমন কোনো সন্দেহজনক কিছু নজরে পড়েনি।

জিতু ভাইয়া এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাঁপ ছাড়লেন। গাড়ির ভেতরে এসি সচল থাকা সত্ত্বেও বাইরের প্রখর রোদের তাপে ওনার কপাল বেয়ে অনবরত ঘাম ঝরছে। তিনি পকেট থেকে রুমাল বের করে সারা মুখের ঘাম মুছে নিয়ে এসির পাওয়ারটা আরেকটু বাড়িয়ে দিলেন। ঠিক তখনই হঠাৎ একটা অবাধ্য মাছি ওনার মুখের সামনে এসে বিরক্তিকরভাবে ভনভন করতে লাগল। চরম বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে হাত নাড়িয়ে ওটাকে তাড়িয়ে দিলেন তিনি। অতঃপর একমনে ফ্রন্ট মিররে নিজের চুলগুলো ব্যাকব্রাশ করতে লাগলেন অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে। কিন্তু ঠিক তখনই এত এত শোরগোল আর কোলাহলের বুক চিরে ওনার কানে খুব জোরে একটা হাঁচির শব্দ ভেসে এল, আর তার পরক্ষণেই শোনা গেল এক অদ্ভুত ‘পুত’ আওয়াজ! জিতু ভাইয়ার হাত চুলের মাঝখানেই থমকে গেল। তিনি চোখ পিটপিট করে দুদিকে চতুর দৃষ্টি ঘুরিয়ে একটা শুকনো গলা খাঁকারি দিলেন। কাঁচাবাজারের এতো এতো আওয়াজের মধ্যে কি না কি শুনেছে বলে উড়িয়ে দিল। কিন্তু মুঠো ফোন হাতে নিতেই নাকে এসে হানা দিল বাজে দুর্গন্ধ। জিতু ভাইয়া নাক সিটকে আশেপাশে থাকল। প্রথমে ভেবেছিল কাঁচা বাজার হওয়ায় সেখান থেকে গন্ধ আসছে। পরক্ষণে গন্ধটি তীব্র মাত্রায় রুপ নিল। না পেরে একহাতে শক্ত করে নাক চেপে ধরে গন্ধের উৎস অনুসরণ করে ব্যাক সিটের দিকে উঁকি দিতেই ওনার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! গাড়ির পেছনের সিটে গুটিসুটি মেরে লুকিয়ে বসে থাকা নোহা ওনার দিকে তাকিয়ে নির্লজ্জের মতো বত্রিশ পাটি কেলিয়ে দিয়ে আহ্লাদী সুরে বলে উঠল,

–“জিতু বেবি, আমি পিউ দিয়েছি।”

জিতু ভাইয়া হতবিহ্বল হয়ে পড়ল। নোহা দাঁতে নখ কুটকুট করতে করতে বলল,“আসলে চানাচুর খেয়েছিলাম তো, তাই এখন পেটে গ্যাস্টিক হয়ে গেছে। বেশি গন্ধ লাগছে। কোনো ব্যপার না, আমার কাছে সলিউশন আছে। এক মিনিট, এক্ষুনি দূর করছি।”

নোহা তার সাইট ব্যাক থেকে ছোট্ট একটা পারফিউম বের করে জিতু ভাইয়ার মুখের উপর ফুসফুস করে স্প্রে করতেই জিতু ভাইয়া গর্জে উঠল,

–“নোহাআআআ..”

নোহা হাতের স্প্রে ফেলে গাড়ি থেকে উড়া ধুরা নামতে নামতে চেঁচিয়ে বলে উঠল,

–“ও হলি পালাআআও..”

চলবে,,,,,,,

নেক্সট পর্বে কিন্তু ধামাকা আছে। তাই যারা পড়েছ সকলে বেশি বেশি রিয়েক্ট কমেন্ট করে দাও। আমিও দ্রুত নতুন পর্ব নিয়ে হাজির হব। হ্যাপি রিডিং🥳🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply