আদিল মির্জা’স বিলাভড
৪২.
–
রোযা বিছানায় পড়ে থাকল সেভাবেই যেভাবে আদিল রেখে গিয়েছে। অনেকটা সময় যাবত কোনো নড়চড় করল না সে। চোখের দৃষ্টি রইল শূন্যে। স্পষ্ট কিছু দেখছে না। অথচ চোখের পাতায় কতশত দৃশ্যরা ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। সবশেষে দুটো দৃশ্য একে-অপরের সাথে বারবার টক্কর খাচ্ছে। বারবার চোখে আঙুল দিয়ে বোঝাচ্ছে দু-রকম আচরণ! মনে হচ্ছে, দু-রকম মানুষ। কতো ভেদাভেদ সেই দুটো আচরণের সাথে। দৃশ্য দুটো –
এক. খুব মনোযোগের সাথে নিজের পরনের শার্ট খুলে রোযার কাদামাটিতে ভীষণ নোংরা হওয়া পা-জোড়া যত্নের সাথে মোছা আদিল মির্জা।
দুই. ক্রোধে দিকবিদিকশুন্য হয়ে শরীরের শক্তি দিয়ে রোযার গলা টিপে ধরা আদিল মির্জা।
রোযা নড়ল, হাত রাখল গলায়। সূক্ষ্ণ এক ব্যথা এখনো ঠাঁই পেয়ে আছে। দমবন্ধ অনুভূতিটা অবশ্য আর হচ্ছে না। তবে হাঁসফাঁস লাগছে। এতো নিয়ন্ত্রণে কেউ কীভাবে বাঁচবে? রোযা কদিনেই কেমন দিশেহারা পড়েছে। বাকিটা জীবন এভাবে কী কাটাতে পারবে? নাকি তার আগেই দমবন্ধ হয়ে মা রা যাবে? সে-মুহূর্তে পাশ থেকে গোঙানোর আওয়াজ আসে। রোযা মাথা বাঁকিয়ে তাকায় পাশে। হৃদি ঘুমুচ্ছে ঠিক। তবে ওর নরম, ছোট্ট ডান হাতটা হাতাচ্ছে বিছানা জুড়ে। রোযা বিষণ্ণতা কাটে সে-দৃশ্যে। ঠোঁটের ভাঁজগুলো মসৃণ হয়। শরীরটা এগিয়ে নিতেই হৃদি ঘুমের ঘোরে একেবারে কাছে এসে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। মুখটা বুকে গুঁজে দিয়েছে। রোযার মন ভরে যায়। শরীর জুড়ে বয়ে যায় অদ্ভুত শান্তি। এই অনুভূতি ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব না। সম্ভব না স্বেচ্ছায় সরে যাওয়া এখান থেকে। রোযা কখনো পারবে না। দু-হাতে ছোটো শরীরটা বুকে আগলে রাখল। কপালে ঠোঁট ছুঁলো, মাথা বোলাল। সরল মুখে চেয়ে থেকে অজান্তেই বা-চোখের কোণ ঘেঁষে নামল একফোঁটা জল। ভাসা কণ্ঠে বিড়বিড়িয়ে বলা কথাগুলো নিস্তব্ধ ঘরে ভীষণ সূচালো শোনাল –
‘আমার বাকিটুকু জীবন শুধু তোমার জন্য বাচ্চা আমার। তোমার জন্য মা সব মেনে নেবে।’
বাচ্চাটা কী শুনল বা বুঝল কে জানে? রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও সম্ভবত মনের টান আছে। ওটা রক্তের সম্পর্কের চেয়েও বুঝি শক্তিশালী? হৃদি গুঙিয়ে বুকে মুখ গুঁজে আওড়ে উঠল –
‘মম…’
রোযা মাথা নুইয়ে কী ভীষণ কোমল গলায় প্রশ্ন করে, ‘কী মা? ক্ষুধা লেগেছে? তুমিতো কিচ্ছু খেলে না!’
হৃদি ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করে প্রত্যুত্তরে জানায়, ‘কিছু খাবো…’
রোযা আর সময় নষ্ট করল না। ঝটপট বিছানা ছাড়ল। এমনিতেও গাড়িতে সে বড়ো ঘুম দিয়েছিল। এতো দ্রুতো ঘুম আসবেও না। চটজলদি ওয়াশরুম থেকে কাপড়চোপড় বদলে, হাতমুখ ধুয়ে এলো। ওয়াল ক্যাবিনেট ঘেঁটে হৃদির পিজি সেট এনে বেডে রাখল। ঘুমে ঢুলুঢুলু হৃদিকে কোলে তুলে নিলো আলতোহাতে। একদম ঢুলে আছে গায়ের সাথে। সময় নিয়ে ওর পরনের কাপড়চোপড় পরিবর্তন করিয়ে ওকে কোলে নিয়েই বেরিয়ে এলো রুম থেকে। করিডোরের বাতিগুলোর রংটা ভিন্ন, হলদেটে। গ্রাউন্ডফ্লোরের বিশাল ঝাড় বাতিটার মৃদু আলোতে দেখা গেলো সবটা নিস্তব্ধ, ফাঁকা। গার্ডস, মেইডস কেউই নেই। এমতাবস্থা একটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, আদিল মির্জা বাড়িতে নেই। রোযা নেমে এলো সিঁড়িগুলো বেয়ে। হৃদির ঘুম ছুটেছে। বরাবরই বাচ্চাটা লাইট স্লিপার। তবে মায়ের কোলে গদগদ হয়ে পড়েই রইল। তখুনি মরিয়ম বেগমকে বেরিয়ে আসতে দেখা গেলো গেস্টরুম থেকে তাড়াহুড়ো ভঙ্গিতে। এসেই তিনি ব্যস্ত গলায় প্রশ্ন করে গেলেন –
‘ডিনার করবেন, ম্যাডাম? খাবার গরম করব? ভিন্ন কিছু রেঁধে দেব?’
হৃদি দু-হাতে গলা জড়িয়ে রেখেছে। মাথাটা রোযার কাঁধে কাঁত হয়ে পড়ে আছে। এযাত্রায় ওভাবে থেকেই একটা হাতের পাঁচ আঙুল দেখিয়ে বোঝাল কথা বলতে না। মরিয়ম বেগম ঠোঁটে ঠোঁট টিপে চুপ করে গেলেন তৎক্ষণাৎ। সদ্য ঘুম ভাঙা হৃদি সবসময়ই মেজাজি বাচ্চা একটা। রোযার হাসি পেলেও সে হাসল না। জিজ্ঞেস করল –
‘কী হলো?’
হৃদি মাথা ওঠাল না। ওভাবেই জানাল, ‘মম, তোমার হাতের রান্না খাবো।’
‘কী খাবে?’
হৃদি আওড়ে গেলো কাঁদোকাঁদো গলায়, ‘আই ডুননো…’
রোযা হেসে মেয়ের গালে ঠোঁট ছুঁয়ে কদম রাখল রান্নাঘরে। মরিয়ম বেগম পিছুপিছু এলেন। কণ্ঠ নামিয়ে শুধালেন –
‘কী রাঁধবেন ম্যাডাম? আমি সব গুছিয়ে দিই।’
রোযাকে তেমন ভাবতে হলো না। বাচ্চা ক্ষুধার্ত। ঝটপটে যা বানানো যায় আপাতত তাই। সে বলল –
‘ফ্রাইড রাইস করব।’
মরিয়ম বেগম ক্যাবিনেট ঘেঁটে ঘেঁটে সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুলো গুছিয়ে দিচ্ছেন। রোযা রান্নাঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলো। লিভিংরুমে যাওয়ার পথে একটু দুয়ারের সামনে এসে দাঁড়াল। আজ এখানটায় গার্ডস নেই। বাগানের আনাচে-কানাচেতেও নেই। একেবারে সদরদরজার সামনে দেখা যাচ্ছে অনেকগুলোকে। রোযা লিভিংরুমের সোফায় হৃদিকে শুইয়ে দিয়ে ফিরে আসে রান্নাঘরে। মরিয়ম বেগম তখন পানি বসিয়েছেন। তার সাহায্যে দ্রুতো হাতে রান্নাটা শেষ করল। ফ্রাইড রাইসটা প্লেটে সার্ভ করে একটা ওমলেট ভেজে রাইসের ওপর দিয়ে সাজাল। কাঁচের প্লেট হাতে এলো লিভিংরুমে। হৃদির ঘুম ছুটে গিয়েছে। এভাবেই পড়ে ছিলো। রোযা এসে ওকে তুলে ওর পাশেই বসল। চামচ দিয়ে খাওয়াতে চাইলে বাচ্চাটা আবদার ধরল –
‘ইউজ্ ইওর হ্যান্ড, মম।’
রোযা বড্ড বাধ্য। হাত মাখাল। আস্তে আস্তে খাইয়ে দিলো ততক্ষণ, যতক্ষণ না হৃদি বলল –
‘আর না, মম। তুমি খাও। আমি তোমাকে খাইয়ে দিই? দিই? ক্যান আই?’
রোযার অসহায় দৃষ্টির সামনে হৃদি চোখ পিটপিটিয়ে গেলো। যখন রোযা মাথা দোলাল, তখুনি ছুটে গিয়ে হাত ধুয়ে এলো। মরিয়ম বেগম একপাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছেন। রোযা প্লেট ধরে রেখেছে। হৃদি অবিকল রোযার খাওয়ার ধরনটা অনুসরণ করার চেষ্টা করে একমুঠো ফ্রাইড রাইস লোকমা করে রোযার মুখের সামনে ধরে বলল বড়দের মতো –
‘হা করো…’
রোযা খেলো মুখের সামনে ধরা খাবারটুকু। ছোটো মুঠোর খাবার অর্ধেকটাই রোযার কোলে, সোফায় পড়ছে। সেদিকে তার মনোযোগ নেই। সে ভীষণ অনুভব করে খাচ্ছে মেয়ের ছোটো হাতে্ খাইয়ে দেয়া খাবারটুকু। সাধারণ খাবা আজ অমৃত লাগল তার কাছে! এতো মুগ্ধতা নিয়ে রোযা নিজের মায়ের হাতেই খেয়েছিল! খাবার চিবুনোর একফাঁকে মুখ বাড়িয়ে হৃদির তুলতুলে গালে চুমুও খেলো কিছু। এতে হৃদি খিলখিল করে হেসে যাচ্ছে –
‘মমি ডোন্ট বি নটি।’
মরিয়ম বেগম ট্রেতে করে পানির গ্লাস নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন কাছেই। খাওয়ার একফাঁকে রোযা পানির গ্লাস নেয়ার আগে, হৃদিইই দ্রুতো পানির গ্লাস নিয়ে বাড়িয়ে ধরল তার দিকে। রোযার চোখ হাসে। সে নেয়, পানি খেয়ে অবশেষে ফাঁকা প্লেট হাতে উঠে দাঁড়ায়। হৃদিকে নিয়েই আসে রান্নাঘরে। ওর হাত ধুয়ে দিতে নিয়ে শুধাল –
‘ঘুমাবে এখন?’
হৃদি ফিরে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে বলল, ‘এখন আর ঘুম আসবে না।’
‘তাহলে তোমার ফেভারিট কার্টুন দেখি?’
হৃদির চোখদুটো জ্বলজ্বল করল, ‘মম, ট্যাংলড দেখব।’
রোযা প্রথমেই বুঝল না নামটা। ধারণা করল, ‘রপানজেল?’
‘হু…’
‘ঠিকাছে।’
হাত ধোয়ানো হতেই হৃদি ছুটে গিয়েছে লিভিংরুমে। ওয়াল টিভি চালু করেছে। রিমোট দিয়ে টুকটুক করে কার্টুন বের করছে। রোযা নিজেও হাত ধুয়ে এলো। মরিয়ম বেগম ঝাড়বাতিটা বন্ধ করে দিয়েছেন। চালু করেছেন ছোটো বাল্ব। আলোটা নিভুনিভু। রোযা হৃদিকে নিয়ে সোফায় শুয়েছে। কম্ফোর্টটা টেনে নিয়েছে শরীরে। ইতোমধ্যে রপানজেল শুরু। মরিয়ম বেগম রান্নাঘরের কাজ সেরে আসতেই রোযা একফাঁকে তাকিয়ে বলে –
‘আপনি গিয়ে শুয়ে পড়ুন। দরকার হলে আমি ডাকব।’
মরিয়ম বেগম চলে গিয়েছেন। বড়ো টিভির পর্দায় একটা বাচ্চা ঘুরছে। কী বিশাল চুল! কতো সুন্দর মুখ! হৃদি মুগ্ধ চোখে দেখতে দেখতে কতো কথা বলছে! রোযা তালে তাল মেলাচ্ছে। ছোটো ছোটো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে।
–
নেশায় বুদ, এলোমেলো মস্তিষ্ক ঠিক ওসময়তেই নরম পায়ের লাথিটা এসে সোজা পড়েছে শান্তর শক্ত চোয়ালে। লাথি খেয়ে এমনভাবে থমকাল যেন কেউ তাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছে। অবিশ্বাসে ছেয়ে আছে মণিজোড়া। সুযোগে ঝুমুর এলোমেলো ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে হাঁটুতে হেঁটে ঝড়ের বেগে পেছন সিটে চলে এসেছে। ছলছল চোখে, ভীষণ আতঙ্ক নিয়ে চেয়ে আছে শান্তর দিকে। বেশ ভয় পাচ্ছে তা চোখমুখেই লেখা। তারপরও কেমন কাঁপতে কাঁপতে বলল –
‘আপনি একটা দুশ্চরিত্র লোক। শহরে থেকে বাজে হয়ে গেছো। তুমি একটা নষ্ট। ছিহ!’
শান্ত আহাম্মকের মতো ঝুমুরকে দেখে গেলো। কাঁদছে, কাঁপছে…তারপরও চোখ রাঙানো ভুলছে। শান্তকে শেষ কবে কেউ মে রেছে মনে করতে পারছে না! থাপ্পড় না, লাথিও খেলো? এমন বাজেভাবে স্ত্রীর হাতে-পায়ে মার খেয়েও তার রাগ লাগছে না কেনো? রেগেমেগে ঝুমুরকে মাথায় তুলে তার আছাড় মারা উচিত নয় কি? উচি্ত তো। আলবাত উচিত! তবে কেনো মনে চাচ্ছে না? ঝুমুরের ওমন অবস্থা দেখে তার নির্লজ্জের মতো গিয়ে আরও আদর করতে ইচ্ছে করছে। সে পায়ে লাথি মেরেছে, ওই পায়ের পাতায় চুমু খেতে মন চাচ্ছে। কিন্তু না! তা সে করবে না! শান্ত শিকদারকে মা রা!! এই মেয়েকে শিক্ষা না দিলেই না। শান্ত গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ ঝুমুরকে দেখে সোজা হয়ে বসল ড্রাইভিং সিটে। পরনের এলোমেলো লুঙ্গিটা গুছিয়ে উদোম শরীরেই গাড়ি স্টার্ট করল। ফেলে রাখা ব্লুটুথ কানে ঢোকাল। ইতোমধ্যে ফোনে বেশ কিছু মিসডকল শো হচ্ছে। কল ব্যাক করতে করতে গাড়ির স্পিড বাড়াল। এতো জোরসে আর এলোমেলো ভঙ্গিতে গাড়ি চালাচ্ছে যে ঝুমুর আতঙ্কে সিট খামচে ধরল। ক্রমশ ভয়ে, অভিমানে, অনুশোচনায় ভুগতে থাকল। নিজের পা-টাকে কি কেটে ফেলে দেবে? এমন একটা কাজ কীভাবে করতে পারল? মাফ চাওয়া উচিত! অথচ ঝুমুর ভয়ে একটা শব্দও মুখ দিয়ে বের করতে পারল না।
ঘণ্টাখানেকের রাস্তা শান্ত আধঘণ্টায় পেরিয়ে এসেছে। বিশাল আধুনিক বিল্ডিংয়ের সামনে আসতেই দারোয়ান দরজা খুলে সালাম জানাল। শান্ত দেখতে পেলো বিল্ডিংয়ের সামনে পোটলাপুটলি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন ব্যক্তি। একজন যুবক, অন্যজন মধ্যবয়সী মহিলা। গাড়িটা দেখে দুজানাই ছুটে এলো। শান্ত যুবকের দিকে চেয়ে গ্লাস নামাল –
‘কখন পৌঁছালে?’
যুবকের নাম সৌরভ, মহিলার নাম নুরী। দুজানাই তাদের বাড়ির কাজের লোক। শান্ত ঝুমুরের জন্য আনিয়েছে তাদের। একা একা কি করবে মেয়েটা? শান্ত থাকবে কাজে। তখন বাইরের কেনাকাটা কে করবে? লোক লাগবে তো! শান্ত আপাতত শহরের কাউকেই ভরসা করতে পারবে না। অবশেষে সাথে করেই এনেছে তাদের। ওরা আগেই রওনা হয়েছিল। সৌরভ জানাল ঝটপট –
‘কিছুক্ষণ হইব। এই ব্যাডা আমাগোরে ঢুকতেই দিতেসে না।’
শান্ত দারোয়ানকে চাবি, আইডেন্টিটি কার্ড, গাড়ির নাম্বার সহ পরিচয় দেখিয়ে ওদের নিয়ে ঢুকল। গাড়ি পার্ক করল পার্কিং এরিয়াতে। সঙ্গে এলো দারোয়ান। শান্ত গাড়ি থেকে বেরুলো না নিজে। থমথমে মুখে নুরী বেগমের উদ্দেশ্যে বলল –
‘চাচি, ওরে নিয়ে যান। গোছগাছ করে নেন। কিছু প্রয়োজন হইলে সৌরভরে দিয়ে আনাবেন, আমি টাকা দিয়ে যাচ্ছি। দারোয়ানকে বলে যাবো সৌরভকে সাহায্য করবে।’
দারোয়ান মাথা দুলিয়ে বোঝালেন সাহায্য করবে। ইতোমধ্যে গাড়ি থেকে লাগেজ বের করছে সৌরভ। পাশাপাশি সাহায্য করছেন দারোয়ান। শান্ত লাগেজ খুলিয়ে নিজের একটা স্যুট রেখে দিয়েছে। ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে একফাঁকে পরে ফেলিবে। অন্যদিকে নুরী বেগম তাকালেন থমকে থাকা ঝুমুরের দিকে। মেয়েটার চোখমুখ নীল হয়ে আছে মনে হলো! হতবাক যে! কিছুক্ষণের মধ্যে কী হয়ে গেল? শান্ত তাকাল না ঝুমুরের দিকে। গাড়ি স্টার্ট করতে করতে ধমকের সুরে বলল –
‘বের হোন।’
কেঁপে ওঠে ঝুমুর। ধড়ফড়িয়ে লেহেঙ্গা দু-হাতে তুলে দ্রুতো বের হলো। ঠোঁট ভেঙে রেখেছে, এই বুঝি কাঁদবে। শান্ত দারোয়ানের দিকে চেয়ে বলল –
‘ওদের পৌঁছে দিন আমার ফ্ল্যাটে।’
দারোয়ান নিজে কিছু ব্যাগ, লাগেজ নিয়ে আগে আগে হেঁটে ফিরে চেয়ে বলল –
‘আসুন, এদিকে আসুন।’
ঝুমুর ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত তাকানোর ভুল করল না। মোটেও সে দেখবে না দজ্জাল মেয়েকে! কতবড় সাহস! জামাই মা রে! গাড়িটা বেরিয়ে যেতেই ঝুমুর ছুটে গিয়ে নুরী বেগমের কাঁধে মাথা রেখে হু হু করে কেঁদে উঠল।
–
হাসপাতালের পার্কিং এরিয়াতে এসে থেমেছে বেশ কয়েকটা কালো রঙের গাড়ি। দ্রুতো বেরিয়ে বডিগার্ডস বেরিয়ে এসে ঘিরেছে পুরো জায়গাটুকু। ওসময়ে এসে থামল শান্তর গাড়িও। দ্রুতো বেরিয়ে এসেছে। পরনে পারফেক্ট কালো রঙের স্যুট। কানে ব্লুটুথ। এলেনের অপজিটে গিয়ে দরজা মেলে ধরল। আদিল বেরিয়ে এলো সঙ্গে সঙ্গে। পাশাপাশি ম্যানেজার আনোয়ার খন্দকারও বেরিয়ে এলেন। সবগুলো বডিগার্ডস নিচে থাকল। আদিলের সাথে ভেতরে যাচ্ছে, আনোয়ার খন্দকার, শান্ত আর এলেন। আদিলের ডানে-বামে তারা। তাদের গ্রুপটা হাসপাতালে উপস্থিত সকলের নজরে পড়ল বেশ। ভীতু মানুষগুলো ইচ্ছেতেই কেমন চেপে গেলো সব। উজ্জ্বল আলোয়, করিডোর দিয়ে হেঁটে এসে থেমেছে লিফটের সামনে। সোজা এসেছে তৃতীয় তলাতেই। শেষের কেবিনের সামনে আসতেই শান্ত দরজা খুলে ধরল। বড়ো কেবিনে দুটো বেড। ক্লান্ত হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে অ্যাপেল খাওয়ার পাশাপাশি ফোনে গেইমস খেলছিল। আওয়াজ পেয়ে মাথা তুলে তাকাতে দেরি লাফিয়ে বেড থেকে নামতে দেরি হলো না। ধ্রুবও ধড়ফড়িয়ে উঠতে চাচ্ছে, তবে পারছে না। ওর পায়ে তখনো ব্যথা। অন্যদিকে ক্লান্তকে দেখে উপায় নেই, এই ছেলে কাঁধে গু লি খেয়েছে। ব্যান্ডেজ না থাকলে পুরোপুরি সুস্থ মানুষ। আদিল প্রবেশ করতে করতে আদেশ ছুড়ল –
‘শুয়ে পড়।’
ধ্রুব সত্য সতু টানটান করে শুয়ে পড়ল। আদিল বসেছে চেয়ারে। এলেন এসে ফ্লাওয়ার বুকেটে ক্লান্তর মুখের সামনে ঠেলে দিলো। শান্ত দিলো ধ্রুবকে। ফলমূল, খাবারদাবার সাজিয়ে রাখা হয়েছে টেবিলের ওপরে।
‘কী অবস্থা? অপারেশন লাগেনি?’
ক্লান্ত আস্তে করে বলে, ‘লাগেনি বস।’
হঠাৎ থেমে এক আশ্চর্যজনক বিষয়ে বলল ক্লান্ত। এই বিষয়টা ওর মনে যে বাজেভাবে মিশে ছিলো।
‘অপারেশন লাগতো যদি দ্বিতীয় গু লিটা আমার বুকে এসে বিঁধতে পারতো। তা হয়নি কারণ ম্যাডাম আমাকে সামনে থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। বস, ম্যাডাম কেমন আছে?’
আদিলের দৃষ্টি ক্লান্তর চোখে। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলে ক্লান্ত হাঁসফাঁস করে। কিছু বলার আগেই আদিল বলে –
‘রেগে আছে আমার ওপর। তাছাড়া ভালোই।’
আদিল উঠে দাঁড়াল। কাঁধ চাপড়ে বলল, ‘দ্রুতো ফেরার প্রয়োজন নেই। কিছুদিন রেস্ট নে। ভর্তি থাক। ফুললি সুস্থ না হয়ে ফিরবি না।’
ক্লান্ত, ধ্রুব সুর মিলিয়ে বলতে চাইল, তারা সুস্থই প্রায়। সেসব কানে তোলেনি আদিল। এক সপ্তাহেরর বেড রেস্ট বলে তবেই বেরিয়ে এসেছে। কাজের পেন্ডিং মাথায় পড়েছে হিমালয়ের মতো। সম্ভবত পুরোটা সপ্তাহ জুড়ে আদিল দৌড়ের ওপর থাকবে। গাড়িগুলো হাসপাতাল থেকে ছুটেছে কোম্পানির উদ্দেশ্যে। ফাঁকা রাস্তা তখন। দু-একটা গাড়ি ব্যতীত কোনো কুকুরও নেই। রাতের প্রায় দুটো বিশ। গ্লাসটা নামানো। আদিল একটা সিগারেট ধরাল। অন্যমনস্ক হয়েই সিগারেট ঠোঁটে চেপে তাকাল ডান দিকে। বারিধারার বাসস্ট্যান্ড সামনে। তার কাছেই ‘দ্য রয়্যাল ক্যাফে’। ক্যাফেটা বন্ধ। আদিল হঠাৎ হাত ওঠাতেই ওর সামনে গাড়িগুলো থামল কেমন। আনোয়ার খন্দকার ওদিকে চেয়েই একটু থমকালেন। ক্যাফের সামনে একটা কুকুর বসে আছে। ছোটো কুকুর। গায়ের রঙটা সাদা হলেও, ধুলোবালিতে ভীষণ ময়লা হয়ে আছে। আদিল ওদিকে চেয়ে রইল অনেকটা সময় ধরে। আনোয়ার খন্দকার কয়েকবার চোখ পিটপিট করলেন। অবশেষে তার মনে পড়ল কিছু –
–
ওদিন ঝুম বৃষ্টি হচ্ছিল। বৃষ্টির প্রখরতা গাঢ় ছিলো। গায়ে পড়লে ব্যথা পাওয়া যাবে ঠিক ওমন। আদিল কোম্পানিতে ছিলো রাতের দুটো পর্যন্ত। যখন তার গাড়ি কোম্পানি থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছোটে ততক্ষণে তিনটার কাছাকাছি ছিলো ঘড়ি। আদিলের ইশারায় গাড়িটা থামে ক্যাফের সামনেতেই। ছাউনির নিচে একটা বক্স যত্নের সাথে সাজিয়ে রাখা। ওতে দুটো বাচ্চা কুকুর। ভালো ব্রিডের কুকুর। ঘেউঘেউ করছে। বক্সের গায়ে বড়ো করে বাংলায় লেখা –
‘খাওয়াতে না পারুন, তবে মারবেন না প্লিজ। কাইন্ড হোন। পারলে ওদের একটা হোম দিন।’
আনোয়ার খন্দকার তখন পাশেইছিলেন আদিল মির্জার। ওভাবে চেয়ে থাকতে দেখে ধীর গলায় বললেন –
‘মিস রোযা এই দুটোকে এতদিন খাওয়াতেন কাজের ফাঁকে ফাঁকে। আজ তো তার লাস্ট ডেই ছিলো এই কাজে্র।’
অর্থাৎ আর দেখে রাখতে পারবে না। আদিল দৃষ্টি ফিরিয়ে নিলো। ইশারা করতেই গাড়ি চলতে শুরু করল। অথচ কিছুটা পথ গিয়ে আদিলের ইশারায় ফের এলো ক্যাফের সামনে। আদিল বেরুবে দেখে আনোয়ার খন্দকার ছাতা হাতে ঝটপট বেরিয়ে এসে এপাশের দরজা মেলে ধরলেন। আদিল বেরিয়ে এলো। পরনে গ্রে রঙের স্যুট। কোট গায়ে নেই। সাদা শার্টের ওপরে ভেস্ট। টাইট বেশ লুজ। এলোমেলো চুল। বৃষ্টির ফোঁটা এসে চুলে পড়ছে বাতাসে ভেসে ভেসে। আদিল এসে দাঁড়াল বক্সটার সামনে। কালো একটা, সাদা একটা। আনোয়ার খন্দকার বরাবরই স্যারের মুখ পড়তে পটু। বডিগার্ড একটাকে আদেশ করল ঝটপট –
‘নাও, কুকুর দুটোকে তুলে নাও।’
বক্স সহই বডিগার্ড তুলে এনে রাখল গাড়ির ফ্লোরে। আদিল তাকাল বন্ধ ক্যাফেতে। একটা চটপটে শরীরে ভেতরে ছুটছে এমন দৃশ্য ভাসল চোখের পাতায়। অবশেষে কদম বাড়িয়ে ব্যাকসিটে উঠে বসল। ড্রাইভারের পাশে বসল আনোয়ার খন্দকার। ফুরফুরে গলায় বললেন –
‘কী নাম রাখব স্যার? টুনটুন, আর পুনপুন?’
আদিল তাকিয়ে থাকল ভীষণ আদুরে ভঙ্গিতে চুপচাপ বসে থাকা কুকুর দুটোর দিকে। অবশেষে আস্তে করে তাকে বলতে শোনা গেলো –
‘তিতান – থোর।’
____________
চলবে –
® নাবিলা ইষ্ক।
Share On:
TAGS: আদিল মির্জা’স বিলাভড, নাবিলা ইস্ক
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩১
-
আদিল মির্জাস বিলাভড পর্ব ১
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩০
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩২
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৯
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ৩৬
-
আদিল মির্জাস বিলাভড গল্পের লিংক
-
আদিল মির্জ’স বিলাভড পর্ব ২৮
-
আদিল মির্জা’স বিলাভড পর্ব ২৬