#জল_তরঙ্গের_প্রেম
পর্ব সংখ্যা;২৫
#লেখনীতে_নবনীতা_চৌধুরি
সকাল সাড়ে সাতটা বাজে।
ফজরের নামাজ পড়তে উঠে ছিলেন সাহনারা বেগম। নামাজ আদায় করা শেষে, এতক্ষণ কোরআন শরীফ পড় ছিলেন তিনি। পড়া শেষ হতেই, জায়নামাজ তুলে রুম থেকে বেরিয়ে এলেন সাহনারা। পুরোপুরি আলো ফুটে গেছে ধরনীতে। ড্রয়িং রুমের মোটা পর্দার আস্তরণ ঝাঁপিয়ে আলো এসে পড়েছে মেঝেতে। সাদা টাইলসে সেই আলো পড়ে রুমের অন্ধকার কেটে গেছে।
ড্রয়িং রুমের জানলার পর্দা গুলো সরিয়ে জানলা খুলে দিলেন তিনি। গত কাল রাতের অগোছালো সোফার কুশন গুলো জায়গা মতো রেখে। কিচেনের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে সাহানারার চোখ আটকে গেলো সিঁড়ির কাছে। উজ্জ্বল লাল রঙা শাড়ি পরিহিত, পরিপাটি তরীকে দেখে চোখ জোড়া ছানাবড়া হয়ে গেলো ওনার। নিজের মনের ভ্রম ভেবে চোখ কচলে আবার সামনের দিকে তাকালেন তিনি। কিন্তু এবারে ও একই দৃশ্য দেখে রাগে মাথার শিরা – উপশিরা গুলো দপদপ করে উঠলো সাহনারার। এই সাত সকালে এতো সাজের মানে কি? নাটক সিনেমা করতে যাচ্ছে নাকি। ধুপধাপ পা পেলে তরীর সামনে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি।
চাচিকে আসতে দেখে শেষ সিঁড়িটার উপরের সিঁড়িতেই দাঁড়িয়ে পড়লো তরী। ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো তার। মনে মনে আল্লাহর নাম নিয়ে চাচির দিকে তাকালো। সেই মূহুর্তে ঝাঁঝালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করে বসলেন সাহনারা;-
–” সাজ সকালে পটের বিবি সেজে কোথায় যাচ্ছিস তুই? নাটক সিনেমায় নাম লেখালি নাকি?”
জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজালো তরী,
–” একটু বাইরে যাচ্ছি চাচি। ঘন্টা তিনেকের মধ্যে ফিরে আসবো।”
তরীর কথায় তার পা থেকে মাথা অব্দি আরেক বার তীক্ষ্ম নজরে পরোখ করলেন সাহনারা। প্রতিদিনের তুলনায় আজ বেশ সুন্দর লাগছে তরীকে। মানতেই হবে, মেয়েটার গায়ের রঙ শ্যামবর্ণের হলে ও মুখে একরাশ মায়া ছড়ানো। তার দিকে তাকালে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া দায় হয়ে পড়ে। বিশেষ করে তরীর দীঘল কালো মণির চোখ জোড়া। দীঘির কালো জলের অনুরূপ সচ্ছ মণির চোখ জোড়ার উপর নৌকার মতো বাঁকানো আইলেশ গুলো; প্রতিবার চোখের পলক ফেলার সাথে সাথে নড়ে উঠে নিজস্ব গুণে।
দ্বিতীয়ত, তার মাথার ঘন লম্বা কোমর ছাড়ানো কেশরাশি। যা মূহুর্তেই যে কাউকে গায়েল করতে সক্ষম। গায়ের রঙ বাদে কোনো কিছুতেই কমতি নেই এই মেয়ের। পড়াশোনার এলেম ও আছে। অনার্স কমপ্লিট করেছে। সুযোগ পেলে মার্স্টাস ও শেষ করতো সে। মনে মনে হতাশার শ্বাস চাপলেন সাহনারা। এই করেই ওনার রাজপুত্রের মতো ছেলেটাকে ফাসিয়েছে।
–” না হলে কি আর ওমন সুদর্শন ছেলে এই কালিকে বিয়ে করতে পাগল হয়?”
কত শখ ছিলো তার। একটা চাঁদের মতো টুকটুকে বউ আনবে। যাকে তরঙ্গের পাশে দাঁড়ালেই রাজযোটক মনে হবে। নিজ মনের ভাবনায় ব্যস্ত সাহনারাকে চুপ করে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে ভয়ে ভয়ে তরী সুধালো;-
–” আমি যাই চাচি?”
–” তা কোন রাজকার্য উদ্ধার করতে যাচ্ছিস? এমন সং সেজে।”
সং শব্দটা কানে পৌঁছাতে চোখ বুঁজে ফেললো তরী। ছোট্ট হৃদপিন্ডটা মূহুর্তে খান খান হয়ে গেলো তার। সে তো মুখে ফেস পাউডার ও মাখেনি। সামান্য লিপস্টিক, আইলানার আর কাজল পরেছে। এতে সং সাজা হয়ে গেলো? শ্যামা মুখে ধবধবে সাদা পাউডার মেখে সুন্দর হওয়ার প্রচেষ্টা চালানোর পর; তাকে সং সেজেছে বললে তাও সে মেনে নিতো। আজ কতো বছর পর ঠিক এভাবে প্রফুল্ল চিত্তে সে সেজেছে তা কি কেউ জানে। জানবে কি করে?
এই বাড়ির সন্তান হওয়ার পর ও অতিব নগণ্য বিষয়, গায়ের রঙের জন্য সবাই তার সাথে অগাছার অনুরূপ ব্যবহার করে। যেনো বিনা অনুমতিতে কারো ব্যক্তিগত বাগানে জন্মেছে সে। তাই বাগানের মালিক এমন করছে। সময় পেলেই দোষ ধরতে মুখিয়ে থাকে মা, চাচি। অথচ একটু যত্ন নিয়ে কথা বলার কিংবা ভালোবাসার মানুষের বড্ড অভাব তার জীবনে। কিন্তু কটু কথা শোনানোর মানুষের অভাব নেই। পৃথিবীর মানুষ গুলো বড়ই স্বার্থপর। ভালোবাসতে পারে না। অথচ মন ভেঙে দেওয়ার বেলায় তারা এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
–” একটু কাজ আছে।”
ছল ছল চোখে জবাব দিয়ে তরী আর এক মূহুর্ত ও দাঁড়ালো না। গটগট পায়ে প্রস্থান করলো সে। পেছন থেকে ভেসে এলো সাহানার এক ঝাঁক কটু কথার বিষাক্ত বাণ।
–” বুড়ি হয়ে কুঁড়ি সাজতে চাইছে। আমার বাচ্চা ছেলেটার মাথা খেয়ে পেট ভরেনি। এখন আবার কার কপাল পুড়তে যাচ্ছে খোদা জানে।”
কথা গুলো কানে পৌঁছালে ও প্রতিক্রিয়া করলো না তরী। সে সদর দরজা পেরিয়ে যেতেই সাহানারা ভেঙচি কাটলেন। মাথায় কাপড়ের আচঁল টেনে রান্না ঘরে চলে গেলেন তিনি। আজ সকালের নাশতা তাকেই তৈরি করতে হবে। গজগজ করে উঠলেন সাহানারা।
–” সব কাজ এখন আমাকে করতে হবে। মেম সাহেব তো সেজে গুজে বেরিয়ে গেছেন। যত্তসব।”
বাড়ির বাইরে এসে বুক ভরে শ্বাস টানলো তরী। আজ – কাল এই বাড়িটা তার জন্য জাহান্নাম সরূপ হয়ে ঠেকছে। বাড়ির ভেতরে থাকলেই দম আটকে আসে। মনে হয় কেউ গলা চেপে ধরে রেখেছে দু’হাতে। অথচ, মানুষের সবচেয়ে প্রিয় স্থান হচ্ছে তার আপন গৃহ। তরীর ক্ষেত্রে তা পুরোপুরি ব্যতিক্রম।
*******
বাড়ির বাইরে এসে রিকশা ঠিক করে তাতে চড়ে বসলো তরী।
রোদ উঠে পড়েছে। তবে তেমন তেজ নেই এখন। সকালের মিষ্টি রোদ। গাছের ফাঁক ফোকর গলিয়ে তরীর গায়ের উপর এসে নিজেদের বিছিয়ে দিচ্ছে। লাল শাড়িটা চকচক করছে সূর্যের আলোর সান্নিধ্যে এসে। ওমন মোহাচ্ছন্ন আলোয় তরীর সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে গেলো। দেড় ঘন্টার ছোট্ট জার্নি শেষে বুয়েটের সামনে এসে থামলো তরীর রিকশাটা। এর মাঝে দু’বার রিকশা বদলাতে হয়েছে তাকে, আর একবার উঠতে হয়েছে বাসে। শাড়ি পরে বাসে চড়া যে কতটা ঝক্কির, তা আজ হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে সে।
ভাড়া মিটিয়ে ধীর পায়ে রিকশা থেকে নামলো তরী।
অতঃপর, চারপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেললো সে। বিশাল এলাকা জুড়ে টানা সীমানা প্রাচীর ঘিরে রেখেছে ভার্সিটাকে। অথচ তরঙ্গ কোন হলে থাকে, সেটাই জানা নেই তার। ভাবুক ভঙ্গিতে এদিক ওদিক তাকিয়ে ব্যাগে হাত রাখতেই পাশে দাঁড়িয়ে কেউ একজন ডেকে উঠলো তাকে।
–” আরে তরী ভাবি যে! অবশেষে আপনি এলেন। দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমার পা শেষ।”
অপরিচিত কন্ঠে ভাবি ডাক শুনে ঘাবড়ে গেলো তরী। অপ্রস্তুত হয়ে ঘুরে দাঁড়ালো সে। শাড়ির আঁচল টা আরেকটু শক্ত করে মুঠোতে চেপে ধরলো।
–” আমাকে বলছেন?”
রাফিন হাসলো, রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে সুধালো সে।
–” আপনি ছাড়া আর কেউ আছে এখানে ভাবি?”
তরী দৃষ্টি ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালো। সত্যিই সে আর এই ছেলে ছাড়া রাস্তাটা ফাঁকা। মাঝে মধ্যে দুটো রিকশা চলে যাচ্ছে আর কিছু পথচারী।
–” আমাকে ভাবি ডাকছেন কেনো? আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে মনে হয়।”
–” আমার কোনো ভুল হচ্ছে না। আপনার নাম ই তো তরী?”
–” হ্যাঁ!”
–” তাহলে চলুন প্লিজ। ফজরের পর থেকে বসে আছি ওই গাছের গুঁড়িতে।”
রাফিনের আঙুলের ইশারা করা জায়গায় তাকালো তরী। রাফিন ততক্ষণে হাঁটা দিয়েছে। তরী ও দ্রুত পায়ে গিয়ে তার সাথে হাঁটা ধরলো। আসার পথটুকুতে রাফিন আর কথা বললো না। হলের সামনে এসে তরী কে একটু দূরে দাঁড় করিয়ে দিয়ে দারোয়ানের সাথে এসে কথা বলে গেলো রাফিন। তরী খেয়াল করলো; রাফিনের কথা শুনো দারোয়ান দু’বার করে তার দিকে তাকালো। শুধু তাকিয়েছে বললে ভুল হবে। তরীকে দেখে উনি বেশ মিষ্টি করে হাসি দিলেন। তাতে আরো আড়ষ্ট হয়ে গেলো তরী।
*******
–” এটা আমার আর তরঙ্গের রুম। ভেতরে আসুন ভাবি।”
তিনতলার মাঝামাঝি একটা রুমের সামনে এসে উপরোক্ত কথাটি বলে রুমের ভেতর ঢুকে পড়লো রাফিন। পর পর ভেতর থেকে ভেসে এলো রাফিনের উৎফুল্ল কন্ঠ স্বর।
–” এ ভাই, উঠ শালা! তোর বউ এসেছে। তোর বিছানার দিকে তাকা ভাবি বসবেন কোথায়?”
পর পর তরঙ্গের ঘুম ঘুম কন্ঠ শোনা গেলো।
–” সে এখানে বাসর সারতে আসেনি। যে ফুল দিয়ে বিছানা সাজিয়ে রাখবো। থাপ্পড়ে গালের হাড্ডি গুড্ডি নাড়িয়ে দিয়ে। আবার দেখতে আসা হচ্ছে।”
জড়সড় শরীরে তরী রুমের ভেতরে উঁকি দিলো। উদোম শরীরে কোমর অব্দি কাঁথা গায়ে তরঙ্গ শুয়ে আছে। মুখ অন্যদিকে ঘুরানো। ঘাড়ের কাছের গাড়ো কালো তিলটা এখান থেকে ও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তরী। ফর্সা পিঠে কালো তিলটা কলঙ্কের অনুরূপ ফুটে আছে। বলিষ্ঠ পিঠের মাঝ বরাবর আরো একটি তিল আছে। তবে সেটি বাদামি রঙে। ঢোক গিললো তরী। ছেলেদের এতো সুন্দর হতে হয় নাকি? তরঙ্গ টা একটু বেশিই সুন্দর। তরঙ্গ অলগোছে উঠে বসলো। ঘুম ঘুম চোখে দরজায় দাঁড়ানো তরীর পানে চাইলো সে।
মূহুর্তেই তরঙ্গের চোখের ঘুম উধাও হয়ে গেলো। চাতকের দৃষ্টিতে তরীকে পরোখ করলো সে। তাকে মেরে ফেলার ধান্দা নিয়ে এই মেয়ে হাজির হয়েছে নাকি? বাড়ি ছাড়া করে ও শান্তি হয়নি। এখন কি পৃথিবী ছাড়া করবে? গলা খেকাড়ি দিয়ে দৃষ্টি নতজানু করে নিলো তরঙ্গ। না না এভাবে তাকালে চলবে না। আপাতত তাকে রাগ করে থাকতে হবে। রাফিন নিজের ফোনটা পকেটে নিয়ে ওয়ালেট অপর হাতে তুলে নিলো।
–” আমি যাচ্ছি তোরা কথা বল।”
তরী ভেতরে ঢুকে রাফিন কে বেরোবার জায়গা দিলো। রাফিন যাওয়ার আগে দরজা টা মিলিয়ে দিলো। তরঙ্গ ফের চোখের উপর হাত রেখে শুয়ে পড়লো। আমতা আমতা করে তরী এগিয়ে এলো। বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় আওড়ালো সে;-
–” বাড়ি ছেড়ে এসেছেন কেন আপনি?”
–” ইচ্ছে হয়েছে তাই। আপনি এখানে এসেছেন কেন? আমি তো আর ডিস্টার্ব করছি না আপনাকে। আপনার শান্তির জন্য আপনার চোখের সামনে থেকে চলে এসেছি।”
#চলবে
( প্রিয় পাঠক মহল,
কেমন হয়েছে জানাবেন কিন্তু! আর ছোটো বললে ও তুলনা মূলক বড় করে দিলাম।)
Share On:
TAGS: জল তরঙ্গের প্রেম, নবনীতা চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
She is my Obsession পর্ব ৩২
-
She is my Obsession পর্ব ৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ২৭
-
She is my Obsession পর্ব ২১
-
She is my Obsession পর্ব ৩৫
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৮
-
She is my Obsession পর্ব ৯
-
She is my Obsession পর্ব ৪
-
জল তরঙ্গের প্রেম পর্ব ১৪
-
She is my Obsession পর্ব ৩