Golpo কষ্টের গল্প ডাকপ্রিয়র চিঠি

ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩১


#ডাকপ্রিয়র চিঠি

#লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া

৩১

‘তোরে কইছিলাম এই গেরামে আর আইবি না। ক্যান আইলি? শেষ পযন্ত তোর দুর্ভাগ্যই তোরে এই বাইত্তে লইয়াই আইছে।

একটা রুক্ষ আর স্বল্প পরিচিত গলা কানে যেতেই মারিদ আয়েশার কবর থেকে চোখ সরিয়ে পাশে তাকাতেই এক বৃদ্ধা মহিলাকে দেখতে পেল। মারিদ মহিলাটিকে চেনার চেষ্টা করল; কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে মনে পড়ে গেল। থানচিতে আসার দ্বিতীয় কি তৃতীয় দিন সন্ধ্যায়, মাগরিবের আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে এই বৃদ্ধা মহিলাটির সঙ্গেই মারিদের দেখা হয়েছিল বটগাছের নিচে। তখন মহিলাটি মারিদকে থানচি ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল এবং কখনো এই গ্রামে না ফিরতে এই উপদেশও দিয়েছিল। হঠাৎ মহিলাটি গায়েব হয়ে যাওয়ায় মারিদ এর কারণ জানতে পারেনি। আজও মহিলাটি মারিদকে থানচিতে কেন ফিরেছে, সেই একই প্রশ্ন করছে। মারিদ মহিলাটিকে চিনতে পেরে প্রশ্ন করল—

‘আপনি এখানে?

‘আমারে চিনবার পারছত?

‘জি! আপনার সাথে সেদিন বটগাছটার নিচে দেখা হয়েছিল। আমার মনে আছে।

‘ আমারে চিন্না আত্মীয়তা বাড়াইস না পোলা। আমার লগে আত্মীয়তা করা মানুষগুলা কিন্তু সগলেই এহোন কবরে আছে।

সময় ভোর পাঁচটা তেরো। রাতের অন্ধকার কাটিয়ে ধরণীতে অল্প অল্প আলো ফুটছে, আকাশ পরিষ্কার হচ্ছে। গাছে গাছে পাখির কিচিরমিচির ডাক শোনা যাচ্ছে। মারিদ বৃদ্ধা মহিলাটির থেকে আয়েশার কবরের দিকে তাকিয়ে বলল—

‘আপনি এই বাড়ির কী হন?

বৃদ্ধা মহিলাটি কেমন অদ্ভুত রহস্যময় হাসল। মারিদ আয়েশার কবরের দিকে তাকিয়ে ছিল বিধায় সে দেখতে পায়নি। মহিলাটির হাতে মোটা গাছের ডাল দিয়ে তৈরি একটা লাঠি। মারিদ থেকে চার হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে তিনি। কাঁধে কিসের যেন একটা ব্যাগ ঝুলছে। মহিলাটি বলল…

‘তুই বিয়া করলি ক্যান?

মারিদের প্রশ্নের একটা পাল্টা প্রশ্ন এল বৃদ্ধা মহিলাটির থেকে। মারিদ উত্তর দিয়ে বলল—

‘পরিস্থিতি বাধ্য করেছে করতে।

‘পরিস্থিতি খারাপ হইলেই বা তোর কী? তোরে কেডা কইছে বিইয়া করতে? তুই করলি ক্যান? জান বাঁচাইয়া পালাইতি।

মারিদ পালিয়ে যাওয়ার ছেলে নয়। মারিদ বিরক্তি নিয়ে বলল…

‘আপনি বুঝবেন না, যান এখান থেকে।

‘ভুল করছিস। চরম ভুল করছিস। এই ভুলের প্রতিদান তোর গোটা জীবন গুনতে হইব ছ্যাঁড়া। এই বাড়িডা অভিশপ্ত। এই বাড়িতে কেউ জীবিত নাই। সবাই মরা লাশ। তোর পায়ের নিচেই তাগো কবর। চাইয়া দেখ কতগুলা জীবন্ত কবর তোর পায়ের নিচে পইরা আছে।

রাতের ঘটনায় মারিদ ক্লান্ত ও দুর্বল। নতুন করে বৃদ্ধা মহিলার অদ্ভুত কথাবার্তায় মারিদের কাছে মহিলাটিকে বানোয়াট পাগল আর মানসিক রোগী মনে হচ্ছে। নয়তো এই বাড়ির সুস্থ-সবল জীবিত মানুষগুলোকে ‘মরা লাশ’ কেন বলবে? মারিদ তারপরও কৌতূহলী হয়ে নিজের পায়ের নিচে তাকিয়ে বৃষ্টির পানিতে ভেজা কাদামাটি আর ঘাস দেখতে পেয়ে বেশ বিরক্তি নিয়ে মহিলাটির দিকে তাকিয়ে বলে—

‘আপনি যাবেন এখান থেকে পাগল মহিলা।

‘ আমারে তাড়াইয়া লাভ নাই, সত্য মিথ্যা হইয়স যাইব না ছ্যামরা। আমি মিথ্যা বলি না। উপরওয়ালার ভাগ্য লেখা শেষ। তকদিরের লেখন খণ্ডানো যায় না। আমি সব জানি।

মারিদ ক্ষিপ্ত গলায় বলল….

‘আচ্ছা কী জানেন আপনি? বলেন শুনি?

‘শোন পোলা, তোর দুর্ভাগ্যই তোরে এই বাইত্তে টাইনা আনছে। তোর শেষ ঠিকানা এই বাড়িই হইব। ভাগ্য খণ্ডানো যায় না। তোরে কইছিলাম এই গেরামে না ফিরতে কিন্তু তোর দুর্ভাগ্য তোরে এই বাইত্তে লইয়া আইছে। তোর ধ্বংস নিকটে। মাইয়াডার খেয়াল রাখিস। তোর ভরসায় পথভ্রষ্ট হইয়া তোর লগে সংসার সাজাতে চাইব। কিন্তু কিছু জিনিস কিছু মানুষের লাইগা হই না। হেই যতবার পথভ্রষ্ট হইব ততবারই ধ্বংসের দুয়ারে দাঁড়াইব। কেউ বাঁচব না। কেউ না। একে একে সব মরবে। কাউরে তুই বাঁচাতে পারবি না, কাউরে না।

বৃদ্ধা মহিলাটি কী বলছেন আগামাথা মারিদ কিছুই বুঝতে পারছে না। মারিদের মনে হচ্ছে মহিলাটি পাগল টাইপের কেউ। ভেজা কাদামাটিতে ঘাসের উপর মারিদ খালি পায়ে দাঁড়িয়ে। মহিলাটিও দাঁড়িয়ে কিন্তু কাপড়ের নিচে মহিলাটির পা দেখা যাচ্ছে না। মারিদ বিষয়টি লক্ষ করেনি। মারিদ বিরক্ত হচ্ছে মহিলাটির অদ্ভুত কথাবার্তায়। নূরজাহানের টেনশনে মারিদ এমনিতেই উগ্র, এখন মহিলাটি বাজে বকছে। মারিদ রুক্ষ কণ্ঠে বলল—

‘ বা’ল আপনি এখান থেকে প্লিজ যানতো। ভালো লাগছে না, এমনি মেজাজ চটে আছে। রাগের মাথায় কি করে বসব নিজেও জানি না। ভালো চাইলে যান আপনি।

‘কার সাথে কথা বলছিস তুই?

রাদিল মারিদের জন্য জুতো নিয়ে এসেছে। মারিদ বিরক্তি নিয়ে রাদিলে তাকিয়ে বলল—

‘ বা’ল এই বয়স্ক মহিলাকে চিনি না, কখন থেকে আজেবাজে বকছে দেখতো কি চাই উনি।

রাদিল মারিদের আশেপাশে কাউকে না দেখে মারিদের সামনে জুতো জোড়া রেখে স্বাভাবিক কন্ঠে বলে—

‘ তুই কার কথা বলছিস ? কে আজেবাজে বলছে?

মারিদ জুতো পায়ে পরে বৃদ্ধা মহিলাকে দেখানোর জন্য আঙুল উঁচিয়ে কিছু বলতে গিয়েও থেমে যায়। আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। চারপাশ নিস্তব্ধ নীরবতা। মাত্রই বৃদ্ধা মহিলাটি মারিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, হঠাৎ কয়েক সেকেন্ডের মাঝে কোথায় গেল? সেদিনও রিফাতদের আসার আগ মুহূর্তে মহিলাটি গায়েব হয়ে যায়, পরে আর পাওয়া যায়নি। এখনো রাদিল আসার আগ মুহূর্তে মহিলাটি গায়েব। আশেপাশে কোথাও নেই। রাদিলও দেখতে পায়নি মহিলাটিকে।

‘কিরে বলছিস না কেন? কার সাথে এতক্ষণ কথা বলছিলি? কে ছিল এখানে?

মারিদ খালি পায়ে দাঁড়িয়ে আছে দেখে রাদিল তখন কথার মাঝে মারিদের জন্য জুতা আনতে ঘরে গিয়েছিল, ঘরে যেতে আর ফিরে আসতে যতটুকু সময় লাগে, ঐ দুই-তিন মিনিট সময় মারিদ একা দাঁড়িয়ে ছিল এখানে। এই সুযোগে বৃদ্ধা মহিলাটি এসেছিল, আবার চলেও গেল। বৃদ্ধা মহিলাটি পালিয়ে যেতেও সময় লাগার কথা। বয়স্ক মানুষ চাইলেই দৌড়ে পালানো সম্ভব নয়, সময়ের প্রয়োজন। তাহলে মহিলাটি কোন দিকে দৌড়ে পালাল? মারিদ ফের আশেপাশে মহিলাটির খোঁজ করে রাদিলকে বলে—

‘একজন বয়স্ক মহিলার সঙ্গে কথা বলছিলাম। তুই কি আমার সাথে সত্যি কাউকে দেখিসনি এখানে, শিওর?

‘ এখানে শিওর হওয়ার কি আছে? আমি কি তোকে মিথ্যা বলব? ঘর থেকে তোর একা কথা বলার শব্দ পাচ্ছিলাম। ভেবেছিলাম হয়তো ফোনে কথা বলছিস। ঘর থেকে বেরিয়ে তোকে একা একা কথা বলতে দেখেই এগিয়ে আসলাম। কিন্তু কাছাকাছি এসে দেখলাম তুই একা একাই কথা বলছিস ফোনে নয়। হ্যালুসিনেশন করছিলি নাকি কাউকে?

মারিদ বৃদ্ধা মহিলার বিষয়টা গুরুত্ব না দিয়ে বলল—

‘এখানে একজন বয়স্ক মহিলা আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। মহিলাটি হয়তো পাগল হবে। তোকে দেখে পালিয়ে গেছে হয়তো।

মাহবুব আলম, মকবুল, হীরা চৌধুরী, খালেদকে নিয়ে আসা হেলিকপ্টার দুটো নামল হসপিটালের মাঠে। সময় তখন নয়টার ঘরে। চারপাশের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সারারাতের ঝড়-ঝাপটার পরেও সকালে আকাশ পরিষ্কার ছিল দুই-এক ঘণ্টা। তারপর আবার আকাশে কালো মেঘ জমেছে, বৃষ্টি হবে। হাসিব, মারিদ, রাদিল ও মারিদের ড্রাইভার সকলে মাহবুবদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিল। মারিদকে দেখে ঝাপটে জড়িয়ে ধরেন মাহবুব আলম। ছেলের ছেঁড়া কাপড় আর শরীরের জখম দেখে ক্ষমতাবান মাহবুবও আহাজারি করে বলে উঠলেন—

‘আব্বা? আপনার এই অবস্থা কেন? কে আপনার গায়ে হাত দিসে? কার এত বড় সাহস সৈয়দ মাহবুব আলমের ছেলের গায়ে হাত দেয়? আব্বা আপনি বলেন কে আপনাকে আঘাত করেছে, আমি তার চৌদ্দ গুষ্টি জেলে পঁচিয়ে মারব।

মাহবুব আলম বারবার মারিদের মুখ, বুক, বাহু ও পিঠে হাত বুলিয়ে মারিদের শরীরের আঘাত দেখছেন আর আহাজারি করছেন। হীরা চৌধুরী রাদিলকে জড়িয়ে ধরেছিলেন। ছেলের চিন্তায় অস্থির ছিলেন তিনিও। মাহবুবের কথায় রাদিলকেও তিনি চিন্তিত ভঙ্গিতে পরখ করে দেখলেন ঠিক আছে কিনা। রাদিল সুস্থ। শরীরে আঘাত নেই, তবে জ্বর আছে। মকবুল, খালেদ ও মাহবুবের কথায় তৎক্ষণাৎ তাঁরা মারিদ, রাদিল ও হাসিবের থেকে জানতে চাইলেন কী হয়েছিল এখানে? হাসিব কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু মারিদ তাকাতেই হাসিব চুপ করে যায়। মারিদ শুধু এতটুকুই বলল—

‘সবাই আমার সাথে আসুন।

দুই গাড়ি করে আটজন থানচি সদরে গেল। তারপরও কোথায় কী হলো কারও জানা নেই। মারিদ, রাদিল, হাসিব নূরজাহানদের বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল আটটায়। যাওয়ার পূর্বে মাজিদকে বলে গিয়েছিল ওরা কাজে বেরুচ্ছে। মাজিদ নিজের বাড়ির পরিস্থিতি খারাপ দেখেও মারিদকে বলেছিল সে সঙ্গে যাবে কিনা। মারিদ মাজিদকে নেয়নি। বলেছিল সবার খেয়াল রাখতে, সে জরুরি কাজে যাচ্ছে, শেষ করে চলে আসবে। মাজিদ কিংবা হাসান কাউকে মারিদের বাবার থানচিতে আসার খবরটা দেয়নি।

সারাদিন পর বিকেল পাঁচটায় মারিদের দুটো গাড়িসহ বেশ কিছু পুলিশের গাড়ি এসে থামে সিকদার বাড়ির সামনে বটগাছের নিচে। ত্রিশ-চল্লিশ জনের মতো পুলিশ, জেলা মন্ত্রী হারুন সওদাগর, মোল্লা সওদাগর, পুলিশ সুপার ফয়েজ তালুকদার, পুলিশ কমিশনার সালাউদ্দিনসহ কাল রাতে যে সব গ্রামবাসীরা মারিদ আর নূরজাহানকে বিয়ে দিয়েছিল তাঁরাও আজ এসেছে সবার সাথে। ইকবাল, সবুজ, কাশেম, জাফর (ইমাম সাহেব), মতিন, ইয়াকুব, আজিজ, মাসুদ মাস্টার ও তার বড় ছেলে তৌহিদসহ থানচি গ্রামের গণ্যমান্য সবাইকে মারিদ একত্রিত করে নিয়ে এসেছে সিকদার বাড়িতে।

রাস্তা থেকে বিশ কদম হেঁটে যখন এতগুলো মানুষ একত্রে সিকদার বাড়িতে ঢুকছিল, তা দেখে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা পাহারাদার লোকগুলো হৈ হৈ করে ডাকতে লাগল হাসান ও মাজিদকে। আবারও কেউ হাসানদের ওপর হামলা করেছে ভেবে হাসান নূরজাহানের ঘর থেকে দৌড়ে রাম-দা হাতে বেরুতেই পেছন পেছন মাজিদ, তারানূর ও আশনূর দৌড়ে বের হয়। নদী ভয়ে ছেলে দুটো নিয়ে ঘরে চলে যায়। শাহানা বসার ঘরের পর্দার আড়ালে দাঁড়ায়। হৈচৈ শুনেও সাজিদ নিজের ঘর থেকে বেরুল না। গ্রামবাসী, পুলিশ ও সওদাগর পরিবারের সাথে মারিদ, রাদিল ও হাসিবকে দেখে হাসান কিছুটা শান্ত হয়। কয়েক সেকেন্ডের মাঝে সিকদার বাড়ির উঠান ভরে যায় মানুষে। যারা রাতের অন্ধকারে হিংস্রতা দেখিয়ে নূরজাহানকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছিল, তারা এখন দিনের আলোয় নমনীয় দেখাচ্ছে।

ইকবাল, সবুজ ও কাশেমকে পুলিশ ধরে রেখেছে। হাসান বোকার মতো তাকিয়ে। মারিদ হাসানের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিজের বাপ-চাচাকে দেখিয়ে তাদের পরিচয় দিয়ে বলল—

‘উনি আমার বাবা সৈয়দ মাহবুব আলম, আর উনি হচ্ছে আমার ছোট চাচা সৈয়দ মকবুল শাহ। আর উনি আমার ফুপি, সাথে ডক্টর রাদিলের মা অ্যাডভোকেট হীরা চৌধুরী। আর উনি হচ্ছেন আমার ফুপা। ডক্টর রিফাতের কথা মনে আছে আপনার? আমার সাথে প্রথমবার যে ছেলেটা এসেছিল এখানে? খালেদ খন্দকার হচ্ছে ডক্টর রিফাতের বাবা। সম্পর্কে আমার আপন ফুপা। আমার পরিবারকে আমি রাতে ফোন করে থানচিতে ডেকেছিলাম। উনারা সবাই সকাল নয়টায় এসেছিলেন। সারাদিন ধরে আমার সাথেই ছিলেন কিছু কাজে। এখানে সবাই দাঁড়িয়ে আছে আপনাকে কিছু বলতে চায় বলে। ভয় পাবেন না আঙ্কেল। আমার বাবার মতোন আপনিও আমার একজন বাবা হোন। আমার বাবার সম্মান যেমন আমার কাছে অতুলনীয়, তেমনই আপনার সম্মান রক্ষা করাও আমার দায়িত্ব। আপনি শুধু দাঁড়িয়ে শুনুন ওরা কী বলে। হাইপার হবেন না, আমরা সবাই আপনার সাথে আছি। আশনূর, আপনি ঘরে যান।

আশনূর অবাক চোখে যান্ত্রিকভাবে মাথা নাড়িয়ে ঘরে গেল। শাহানাকে পর্দার আড়ালে দেখে আশনূর মায়ের সাথে কথা বলেনি, তবে অপর পাশে পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সবাই কী বলে শুনতে লাগল। হারুন সওদাগর, মোল্লা সওদাগর, পুলিশ সুপার ফয়েজ তালুকদার, পুলিশ কমিশনার সালাউদ্দিন সবাই মারিদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বাকিরা তাদের ঘিরে গোল করে দাঁড়িয়ে। পুলিশ কমিশনার সালাউদ্দিনের হাতে চিঠির মতো দুটো খাম। তিনি প্রথম খামটি খুলে পড়তে শুরু করলেন—

‘আসসালামু আলাইকুম। থানচি জেলায় অবস্থিত, থানচি গ্রামের উত্তর ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্গত পাঁচ নং ওয়ার্ডের বর্তমান মেম্বার এবং পাঁচ নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মৃত মরহুম ফজল সিকদারের তৃতীয় সন্তান মোহাম্মদ হাসান সিকদার এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং হেফাজতের সকল দায়িত্বের দায়ভার অত্র এলাকার চেয়ারম্যান অর্থাৎ মোল্লা সওদাগর, জেলা মন্ত্রী হারুন সওদাগর, পুলিশ কমিশনার সালাউদ্দিন এবং পুলিশ সুপার ফয়েজ তালুকদারের উপর হস্তান্তর করা হলো। তাঁদের বর্তমানে কিংবা অবর্তমানে, উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতিতে যদি কোনোভাবে অন্য কারও দ্বারাও সিকদার পরিবারের কোনো সদস্যদের কারও কোনো ক্ষতি, সম্মানহানিমূলক কাজ, হেনস্তার শিকার হয়, তাহলে উক্ত বিষয়গুলোর জন্য সরাসরি চেয়ারম্যান, জেলা মন্ত্রী, পুলিশ কমিশনার ও পুলিশ সুপার দায়ী থাকবেন। শুধু দায়ী নন, এর শাস্তি স্বরূপ প্রত্যেকের জেল-জরিমানাও বরাদ্দ থাকবে। আর জেলা মন্ত্রী সরকারি দল থেকে বহিষ্কার পযন্ত হতে পারেন।

‘২. মোহাম্মদ হাসান সিকদারের কনিষ্ঠ কন্যা নূরজাহান পরীর বিয়ে সৈয়দ মাহবুব আলমের বড় পুত্র সৈয়দ মারিদ আলতাফের সঙ্গে হওয়ায়, আইনিভাবে হোক কিংবা ধর্মীয় মোতাবেক হোক তাঁরা দুজন এখন স্বামী-স্ত্রী। এই মতান্তরে নূরজাহান পরীর সকল দায়িত্ব স্বামী সৈয়দ মারিদ আলতাফের নিকট হস্তান্তর হয়েছে। স্বামী সুবাদে যদি সৈয়দ মারিদ আলতাফ স্ত্রীর হেফাজতের জন্য গ্রামবাসীর যাকে খুশি তার বিরুদ্ধে কালরাতের ঘটনার জের ধরে প্রাণঘাতী মা*মলা, নারী নির্যাতনের মামলা করতে পারেন। এই মামলায় সর্বনিম্ন শাস্তি ৬ বছরের জেল এবং পঞ্চাশ হাজার টাকা জরিমানা হবে।

‘৩. আজকের পর যদি কেউ আয়েশা সিদ্দিক হসপিটালের কাজে বাধা প্রদান করে, তাহলে তাঁর জন্যও থাকবে সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের জেলসহ দশ লাখ টাকা জরিমানা।

‘৪. থানচি গ্রামের বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব মোল্লা সওদাগরের বড় ছেলে মানিক সওদাগর দ্বারা যদি কোনোভাবে হাসান সিকদার, তাঁর পরিবার কিংবা সৈয়দ মারিদ আলতাফের স্ত্রী নূরজাহান পরীকে অনৈতিক প্রেমের প্রস্তাব, বিয়ের প্রস্তাব কিংবা কোনো রকম অনৈতিক কাজ বা কথা বলে হেনস্তা করা হয়, তাহলে তাঁর জন্যও আইনি ব্যবস্থা নিয়ে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

‘৫. উক্ত শর্তাবলি যথাযথ পালনের বিষয়টি নজরদারি করবেন জেলা মন্ত্রী হারুন সওদাগর।

নোটিশ নামায় সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামালসহ আরও পাঁচজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য। জিম্মাদার হিসেবে হারুন সওদাগর, মোল্লা সওদাগর, পুলিশ কমিশনার সালাউদ্দিন, পুলিশ সুপার ফয়েজ তালুকদার—সবার সিগনেচার দেওয়া।

হাসান, মাজিদ ও তারানূর সকলে হতবাক, বাকরুদ্ধ ও স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে। কীভাবে কী হচ্ছে কিছু বুঝতে পারছে না। তবে এতটা জানে এই কাগজের পিছনে বিশাল বড় হাত রয়েছে। নয়তো বা সওদাগর পরিবারকে হাসান পরিবারের রক্ষাকারী বাহিনী বানানো চাট্টিখানি কথা নয়। ব্যাপারটা এমন—’ভক্ষক এখন হয়েছে রক্ষক’। এর মাঝে সালাউদ্দিন দ্বিতীয় খামটি খুলে পড়তে শুরু করলেন—

‘কাল রাতের ঘটনায় যে বা যারা ছিল, তাদের তদন্তে সৈয়দ মাহবুব আলমের জ্যেষ্ঠ পুত্র সৈয়দ মারিদ আলতাফ ছয়টি মা*মলা করেছেন। মানহানি মা*মলা, প্রাণঘাতী হামলা মা*মলা, নারী নির্যাতন মা*মলা, অপহরণ মা*মলা, অ্যাটেম্পট টু মার্ডার কেসসহ মোট ছয়টি মামলা করা হয়েছে। এই মামলায় তিনজন আসামি—ইকবাল, সবুজ ও কাশেমকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। উক্ত মামলাগুলোর তদন্ত চলছে, খুব শীঘ্রই বাকি আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে।

‘১/৩/২০১৫ই তারিখ দিবাগত রাতে অর্থাৎ ২/৩/২০১৫ই রাত প্রায় ২:৫৫ ঘটিকায় গ্রামবাসী, জেলা মন্ত্রী হারুন এবং উক্ত এলাকার চেয়ারম্যান মোল্লা সওদাগরের উপস্থিতিতে সৈয়দ মারিদ আলতাফ ও নূরজাহান পরীর বিয়ে দেন মিথ্যা প্ররোচনার ভিত্তিতে। এখানে কোনো রূপ ঘটনাট তদন্ত করার প্রয়োজন মনে করা হয়নি, যেটা আইনের দৃষ্টিতে অন্যায়। আর এই অন্যায়ের প্রতিবাদে বাদী সৈয়দ মারিদ আলতাফ—মোল্লা সওদাগরও তাঁর তিন ছেলেসহ মানিক সওদাগর, রতন সওদাগর ও রনি সওদাগরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে পাঁচটা মামলা করেছেন। এই মামলার ভিত্তিতে মোল্লা সওদাগর ও তাঁর তিন ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। মোল্লা সওদাগরের বড় ছেলে গুরুতর আহত হওয়ায় হসপিটালে তাঁর চিকিৎসা চলায় আপাতত মানিক সওদাগর গ্রেপ্তার হতে খালাস থাকবে, তবে আসামি সুস্থ হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে বাধ্য থাকবে।

নোটিশ নামা পড়া শেষ হতেই সালাউদ্দিন গম্ভীর আর অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে কাগজটি খামে ভরলেন। হারুন সওদাগর দাঁতে দাঁত পিষে দাঁড়িয়ে। রাগে মনে হচ্ছে সবকিছু ধ্বংস করে দিতে। কিন্তু আজ উনার ক্ষমতা মারিদের ক্ষমতার কাছে কাজে আসছে না। তিনি আগেই বুঝেছিলেন মারিদ আলতাফ বড় একটা নাম। এই নামের সাথে হাসানের মেয়ের বিয়ে না দিতে তিনি চেয়েছিলেন। তিনি যদি বুঝতে পারতেন শেষ রাতে বিষয়টা এইভাবে ঘুরে যাবে, তাহলে তিনি মানিকের জায়গায় কখনো এই ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিতেন না, অন্য কোনো কৌশল খাটাতেন। সবচেয়ে বড় কথা নিজের ভাই-ভাতিজাগুলো আজ জেলে যাবে জেনেও তিনি নিরুপায়। এই মুহূর্তে কিছু করতে গেলে দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে যাবে হারুন। দলের সাপোর্ট ছাড়া তিনি সামনের নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন না। হারুন নিজের পরাজয় মানতে না পেরে হাসানদের বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। হারুনের পেছনে বেশ কিছু মানুষও বেরিয়ে গেল। মোল্লা সওদাগরকে এই সমাগমে কথা বলতে নিষেধ করেছেন হারুন। হারুন বলেছেন এই মামলা থেকে এক রাতের ভেতরে খালাস করে দেবেন সে, সেজন্য আপাতত তিনি কিছু বলছেন না। কিন্তু মারিদের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন—

‘কাজটা তুই ঠিক করস নাই ডাক্তার।

মারিদ হাসানের পাশ থেকে সরে মোল্লা সওদাগরের মুখোমুখি হয়ে বলেন…

‘শরীরের তেজ বাঁচাই রাখ চেয়ারম্যান, নয়তো বুড়ো শরীরে হাড্ডি ভেঙে যাবে। বলেছিলাম না রাতটা তোর, আর সকালটা আমার? দেখ, সবে তো সকাল হলো, সারাদিন কিন্তু এখনো বাকি।

‘তোরে আমি দেইখা লমু ডাক্তার।

‘জেলখানায় ছবি পাঠাব নে, তখন দেখিস আর পানিতে ভিজিয়ে খাস তাহলে বেশি করে আমার প্রেমে পরতে পারবি বুঝেছিস?

পুলিশ মোল্লা সওদাগরকে ধরে নিয়ে গেল। হাসিব, সালাউদ্দিন ও ফয়েজকে নিয়ে সিকদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতেই একে একে গ্রামবাসীও বেরিয়ে যাচ্ছে। সকলেই কানাঘুষা করছে—হাসানের মাইয়া কলঙ্কিত হওয়ার পরও মারিদের মতোন একহানা কোটিপতি জামাই পাইছে। গ্রামবাসী রাতে বিয়েটা দেওয়ায় নূরজাহানের কপাল খুলে গেছে। জাফর, ইয়াকুব ও আজিজ চলে যাওয়ার আগে জাফর হাসানের কপালে স্নেহের হাত রেখে বলে গেল—

‘আল্লাহ তোর মাইয়াডারে দুনিয়ার সব সুখ দিক হাসান।।

গ্রামবাসী ও পুলিশ সবাই চলে গেল। হাসান তখনো ঘোরের মধ্যে দাঁড়িয়ে, যেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন। কতবার কত বছর ধরে তিনি চেষ্টা করেছেন সওদাগর পরিবারের লোকজনকে জেল খাটাতে। কতবার মামলা করার পরও থানায় মামলা নেয়নি, উল্টো সেই মামলা ঘুরে উনাদের ওপর চলে আসত। অথচ আজ সওদাগর পরিবারের লোকজন গ্রেপ্তার হয়েছে তাও মারিদের জন্য। মারিদ ফেরেশতা হয়ে কাল রাতে নূরজাহানকে বিয়ে করে বাঁচিয়েছিল, আর আজ গ্রামবাসীর সামনে নূরজাহানের সম্মান ও হাসানের সম্মান ফেরত দিতে সওদাগর পরিবারকে জেলে পাঠাল। উপস্থিত সকলে হাসানের দিকে তাকিয়ে। মারিদ হাসানের মনোযোগ আকর্ষণ করতে বলল—

‘আঙ্কেল, শুনছেন…

হঠাৎ মারিদকে ঝাপটে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন হাসান সিকদার। দীর্ঘ সময়ের চেপে রাখা কষ্টগুলো চোখের জল হয়ে বেরুচ্ছে। মারিদ হাসানের মনের অবস্থা বুঝে তাঁর পিঠে ভরসার হাত বুলিয়ে বলল—

‘আপনি আর একা নন আঙ্কেল। আমি আছি আপনার পাশে। ইনশাআল্লাহ সবসময় থাকব।

মারিদের কথায় হাসানের কান্না জোরালো হলো। মারিদের বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস।

[ চাইলেই আমি তাড়াহুড়ো করে গল্পে রোমান্টিক কিছু লেখতে পারছি না। পরিস্থিতির সাথে মিলে না। তাই বিয়ে যেহেতু হয়েছে ওদের লাভ স্টোরি অবশ্যই দেখানো হবে ইনশাআল্লাহ ]

চলবে…..

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply